বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউনাইটেড এয়ার আবার চালু করে দেশের বাজারের ৩০ শতাংশ আর আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনটিই জানিয়েছেন এয়ারলাইনসটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম নজরুল ইসলাম।
মঙ্গলবার ইউনাইটেড এয়ারের সাধারণ সভা হয়। সেখানে এসব কথা বলেন এ টি এম নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই খাত নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছি। সারা বিশ্বে এভিয়েশন খাত খুব ভালো করছে। আমরা বাংলাদেশের বাজারও বিশ্লেষণ করে দেখেছি। আপনারা জানেন যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর আধুনিক হচ্ছে। এটা আধুনিক হলে এর সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। অনেক দেশের বিমান তখন এই বিমানবন্দরে আসবে। যদি আশা শুরু হয় তখন দেখবেন সব পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের আন্তর্জাতিক বাজার এখন আছে ২২ শতাংশ। আমরা যদি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে না পারি তখন আমাদের বাজার আরও কমে যাবে।’
‘দেশি এয়ারলাইনস যদি না আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজার আমরা হারিয়ে ফেলব। অনেক কমে যাবে। আমাদের এখন ডলারের সংকট আছে, এখন যদি আমরা নতুন এয়ারলাইনসের মাধ্যমে কিছু ডলার বাঁচাতে পারি, তাহলে দেশের জন্য ভালো হবে। আমাদের দেশি এয়ারলাইনস বাড়াতে হবে। আমি মনে করি আমাদের দেশে আরেকটি এয়ারলাইনস বাড়ানো উচিত। এ ধরনের চিন্তা করেই আমরা একটি ব্যবসা পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমরা ইউনাইটেড এয়ারলাইনসকে আবার রিভাইভ করতে চাই। আমরা যদি এখন একটি ফান্ড ক্রিয়েট করতে পারি, তাহলে আমরা ছোট করে শুরু করতে পারি। আমরা কার্গো দিয়ে শুরু করতে চাই দেশে আর বিদেশে। দ্বিতীয় ধাপে আমরা চেষ্টা করব আরও টাকা জোগাড় করতে। যদি পারি আমরা, তা হলে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে যাত্রী পরিবহন শুরু করব। আর কার্গো আরও বড় করে শুরু করব’- বলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমাদের কমপ্লায়েন্সে কিছু সমস্যা ছিল, এর জন্য বিদেশিরা আসতে চাচ্ছিল না। আমাদের প্রথম সমস্যা ছিল, বিমানগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সেটা আমরা করিয়েছি। ইউনাইটেডের সব বিমান সম্বন্ধে আমরা এখন জানি। অনেক ঝামেলা ছিল কিন্তু আমরা করতে পেরেছি। এই সমস্যা আমরা সমাধান করেছি। আরেকটি সমস্যা ছিল বার্ষিক সভা, সেটা আমরা আজকে করেছি। কমপ্লায়েন্সের বড় সমস্যা ছিল, সেটা আমরা শেষ করেছি।’
‘সরকারি সিদ্ধান্ত পেলে আমরা এখন এগোতে পারব। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি আমরা এগোতে পারি, ৫ বছরের মধ্যে আমরা এই দেশে একটি বিরাট পরিবর্তন আনব। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস একসময় দেশের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস ছিল, বাংলাদেশ বিমানের চেয়েও বেশি বিমান ছিল। সেই অবস্থান থেকে আজকে এয়ারলাইনসটি হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এটাকে রিভাইভ করা যায়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ নিতে পারি আর দেশীয় বাজারের ৩০ শতাংশ নিতে পারি, তাহলে এই এয়ারলাইনস দাঁড়িয়ে যাবে।’
এ টি এম নজরুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যারা দেশের বাইরে যায় এবং বাইরে থেকে যারা বাংলাদেশে আসে এ রকম যাত্রীর সংখ্যা বর্তমানে বছরে ৮০ থেকে ৯০ লাখ। এর ২২ থেকে ২৫ শতাংশ বর্তমানে বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোর হাতে। যখন আমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল হবে, তখন এই সংখ্যা হবে বছরে ২ কোটি। তখন যদি আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে না পারি, তাহলে আমরা সেই বাজার হারিয়ে ফেলব।’
ইউনাইটেড এয়ারের বার্ষিক সাধারণ সভা অনলাইনে হয়। সেখানে ২৬০ জনের মতো শেয়ার হোল্ডার যোগ দেন। আর ভোট দেন ৮ কোটি ১৬ লাখ ২৬ হাজার ৮১৬টি। মোট শেয়ারের ১০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে।
সাধারণ সভায় ২০১৫-২০১৬ থেকে ২০২১-২০২২ মোট সাত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন দেয়া হয়। আর ক্যাপিটাল রিস্ট্রাকচারিং এবং অ্যাসেট রিস্ট্রাকচারিংয়ের অনুমোদন নেয়া হয়েছে।
দেশের একমাত্র উড়োজাহাজ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ার। কোম্পানিটি ২০১৬ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এতে তাদের শেয়ারদর নামতে নামতে ২ টাকার নিচে নেমে আসে।
বিএসইসি মূল মার্কেট থেকে কোম্পানিটিকে স্থানান্তর করে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি মার্কেটে। সেখানে শেয়ার লেনদেন জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে লেনদেনও হচ্ছে না। এতে ৭২ কোটি শেয়ারের মালিকদের টাকা কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইউনাইটেড এয়ারের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান তাসবিরুল আলম চৌধুরীকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় কাজী ওয়াহিদুল আলমকে। ২০১৬ সালের পর কোম্পানিটির কোনো এজিএমই আর হয়নি।
সাধারণ সভায় ইউনাইটেড এয়ারের নতুন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় যেটা চ্যালেঞ্জ, একটি এয়ারলাইনসের কাজ নির্ভর করে তার লাইসেন্সের ওপর। এখন ইউনাইটেড এয়ারের কোনো এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) নেই। আমরা এই সার্টিফিকেটের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলছি। আরেকটি সমস্যা আমরা দেখছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের দুটো এয়ারক্রাফট দেশের বাইরে রয়েছে। একটি ভারতে, একটি পাকিস্তানে। সেগুলো সেখানে থাকার কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যে দেনা রয়েছে সেগুলো না দেয়ার কারণে আমরা আইনি ঝুঁকিতে পড়ছি। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের ঢাকায় যে এয়ারক্রাফট আছে সেখানে আমাদের বড় ধরনের সফলতা আছে। আমরা টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা যদি সরকারের সহযোগিতা পাই তাহলে আমরা শুরু করতে পারব বলে মনে করি।’
ডিজিটাল বাংলাদেশ পেরিয়ে দেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের মহাসড়কে। পকেটে মানিব্যাগ না থাকলেও স্মার্টফোন দিয়ে নিমেষেই কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের গল্প এখন আর রূপকথা নয়। তবে এই ঝকঝকে বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধূসর চিত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী প্রচারণা আর ‘বাংলা কিউআর’ বা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের পরও এ দেশের মানুষের পকেট থেকে এখনো কাগজের নোট বিদায় নেয়নি। দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো নগদ টাকার ওপরেই সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালেও দেশের মোট লেনদেনের দুই-তৃতীয়াংশ—অর্থাৎ ৬৭.২ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে নগদ অর্থে। অবশ্য ইতিবাচক দিক হলো, ২০২৪ সালে নগদে লেনদেনের এই হার ছিল ৭২ শতাংশ। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার কিছুটা বেড়ে ৩২.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গতি ধীর হলেও রূপান্তর যে ঘটছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শত কোটি টাকার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরও কেন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ লেনদেন এখনো নগদের বৃত্তেই আটকে আছে?
টাকার অঙ্ক যখন ৩১১ লাখ কোটি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে সর্বমোট লেনদেন হয়েছে ৩১১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০৯ লাখ কোটি টাকাই হাতবদল হয়েছে নগদ কাগজের নোটে। আর ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছে ১০২ লাখ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট বলতে আমরা যা ভাবছি, তার সবটা কিন্তু প্রকৃত ‘ক্যাশলেস’ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ) কিংবা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে যখনই কোনো গ্রাহক টাকা ক্যাশ-আউট করছেন বা জমা দিচ্ছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটিকে ‘নন-ডিজিটাল’ বা নগদ লেনদেন হিসেবেই গণ্য করছে। লেনদেন যখন পুরোপুরি অ্যাপ বা ব্যাংকিং চ্যানেলের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে (যেমন এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার বা সরাসরি মার্চেন্ট পেমেন্ট), কেবল তখনই তা প্রকৃত ডিজিটাল ট্রানজেকশন।
ক্যাশলেস সমাজ না হওয়ার ৩টি মূল অন্তরায়: অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্তাদের মতে, এই ধীরগতির পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল পরিধি: দেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান বিশাল। পরিবহন খাত, কৃষি, কাঁচাবাজার, ক্ষুদ্র খুচরা ও পাইকারি বাজারের একটি বিশাল অংশ এখনো প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশের অনানুষ্ঠানিক খাত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতির অনেক বড় অংশে এখনো নগদে লেনদেন হয়। তাদের এখনো ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।’
কর এড়ানোর মানসিকতা: ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা। এখানে প্রতিটি আদান-প্রদানের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা হিসাব থেকে যায়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে চান না কেবল করের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য। নগদে লেনদেন করলে প্রকৃত আয় গোপন করা সহজ হয়, যা ডিজিটাল মাধ্যমে অসম্ভব।
অবকাঠামোর অভাব ও আস্থার সংকট: শহরাঞ্চলে কিউআর কোড বা ডিজিটাল পেমেন্টের চল বাড়লেও গ্রামীণ হাট-বাজার বা প্রান্তিক পর্যায়ে এর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। সবার কাছে স্মার্টফোন বা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধাও নেই। এর বাইরে বড় একটি সমস্যা হলো গ্রাহকের আস্থার অভাব। এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. তৌহিদুল আলম খান সতর্ক করে বলেন, সাইবার জালিয়াতির ঘটনা, মাঝেমধ্যে লেনদেন ব্যর্থ হওয়া (Failed transaction) এবং ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর জটিল ইন্টারফেসের কারণে সাধারণ মানুষের মনে ডিজিটাল অনীহা তৈরি হয়। ফলে তারা সুরক্ষার স্বার্থে আবার নগদ লেনদেনের দিকেই ঝুঁকে পড়েন।
নোট ছাপানোর চড়া মূল্য দিচ্ছে অর্থনীতি: নগদ টাকার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিকে এক বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতের হিসাব অনুযায়ী, বাজারে কাগজের নোটের সরবরাহ ঠিক রাখতে, ছেঁড়া-ফাটা নোট বাতিল করে নতুন নোট ছাপাতে এবং এই মুদ্রা ব্যবস্থাপনার পেছনে সরকারকে বছরে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। দেশ যদি দ্রুত ক্যাশলেস ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারত, তবে এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।
পথ কোন দিকে: ক্যাশলেস সমাজ গড়ার লক্ষ্য এই নয় যে রাতারাতি বাজার থেকে সব নগদ টাকা তুলে নেওয়া হবে। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো নগদ ও ডিজিটাল—দুই মাধ্যমেই যেন মানুষ সমান সুযোগ পায় এবং ধীরে ধীরে ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনে মানুষকে আকৃষ্ট করতে হলে শুধু কঠোর নীতি বা আইন চাপিয়ে দিলে হবে না; বরং এই প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। একই সাথে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা গেলেই কেবল ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন সত্যি হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজ বুধবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মাঝে এটি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে সরাসরি এই বিশাল তেলের চালানটি নিয়ে আসা হচ্ছে। এর আগে গত ৬ মে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে একই জাহাজে করে এক লাখ টন তেল চট্টগ্রামে এসেছিল। গত দুই মাসের মধ্যে এটি ‘এমটি নিনেমিয়া’-র দ্বিতীয় বড় তেলের চালান। এছাড়া গত মাসের মাঝামাঝিতে ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি জাহাজও সমপরিমাণ তেল নিয়ে আমিরাত থেকে বাংলাদেশে পৌঁছেছিল।
উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে গত ১৪ এপ্রিল থেকে তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং পরিশোধন কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
তবে মে মাসের শুরুতে ‘এমটি নিনেমিয়া’-র প্রথম চালানের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারি আবারও পূর্ণোদ্যমে উৎপাদনে ফিরে আসে। এবারের নতুন এই চালানের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের সরবরাহ এবং শোধনাগারের উৎপাদন সক্ষমতা আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে নিয়মিত বিরতিতে জ্বালানি তেলের এমন সরবরাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে সৃষ্ট প্রবল মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাপান। মঙ্গলবার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করতে যাচ্ছে বলে জোরালো পূর্বাভাস দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বার্তা সংস্থা এএফপি-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতিগত সুদের হার ১.০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ১৯৯৫ সালের পর জাপানে সুদের হার এই প্রথম সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাবে। গত ডিসেম্বরের পর এটিই হবে ব্যাংকটির প্রথম বড় ধরনের সুদের হার বৃদ্ধির ঘটনা। জাপানের স্থানীয় সময় দুপুরে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, গত সপ্তাহেই ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সুদের হার বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শও একই ধরনের কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত দিলেও প্রথম বৈঠকে তা বাস্তবায়িত হবে কি না, সেদিকেই সবার নজর। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আপাতত সুদের হার স্থিতিশীল রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্প্রতি তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সচল হওয়ার সংবাদ বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কাটেনি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই শান্তি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি মূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করতে জাপান এই কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের যৌথ উদ্যোগে সিডনিতে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’। ১৬ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ১১টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
সিডনির এই মেলায় বাংলাদেশি স্টলগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন হাইকমিশনার এফ এম বোরহান উদ্দিন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাইকমিশনের বাণিজ্য কাউন্সেলর রনি চাকমা এবং মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জুলি হল্টসহ অস্ট্রেলিয়ার আমদানিকারক ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বের ২০টি দেশের প্রায় ৬০০ প্রদর্শকের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মেলাটি অস্ট্রেলিয়ার বাজারে পণ্য সরবরাহের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত।
মেলার দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ১৭ জুন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ও অন্যান্য উদীয়মান খাত: টেকসই উৎপাদন এবং অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক এই সেমিনারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা তুলে ধরবেন রনি চাকমা। এছাড়া মেলার শুরুর দিনেই বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের জন্য অস্ট্রেলিয়া ট্রেড অ্যান্ড লজিস্টিকস করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনামূলক সেশনের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেলায় আগত বৈশ্বিক ক্রেতা, বিপণনকারী ও বড় বড় খুচরা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে। মূলত বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা আশা করছেন, এই মেলার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হবে এবং নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূচনা ঘটবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা নিরসনে প্রাথমিক শান্তি চুক্তির খবরটি আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সম্ভাব্য এই সমঝোতার ফলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাসের পাশাপাশি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা কিছুটা স্তিমিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় টানা চতুর্থ দিনের মতো এর দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৬ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৩৩৪.০৬ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি আগস্ট মাসে সরবরাহযোগ্য মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দামও শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,৩৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতার বিস্তারিত তথ্যের জন্য বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। সাধারণত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও, বর্তমান কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং সুদের হার কমার প্রত্যাশা এই মূল্যবৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। স্বর্ণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রতি বিনিয়োগকারীদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএস এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন এই টুর্নামেন্ট চলাকালীন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি বা ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ নতুন আর্থিক প্রবাহ যুক্ত হতে পারে। ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ এখন কেবল ক্রীড়াপ্রেমীদের উন্মাদনা নয়, বরং পর্যটন, প্রযুক্তি, সম্প্রচার ও খুচরা বাণিজ্যের মতো বহুমুখী খাতের বৈশ্বিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
যৌথভাবে এই আসরটির আয়োজন করছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ফিফা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি সমন্বিত সমীক্ষা বলছে, টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকার দাঁড়াবে প্রায় ৮ হাজার ১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে এককভাবে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও এই মেগা ইভেন্টটি বিশ্বজুড়ে প্রায় আট লক্ষাধিক মানুষের পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ফুটবলের এই বাণিজ্যিক শক্তির এক অনন্য উদাহরণ হলো ওয়েলসের ক্ষুদ্র শহর রেক্সহ্যাম। মাত্র ২৫ লাখ ডলারে একটি ডুবতে বসা ক্লাব কিনে হলিউড তারকারা যেভাবে পুরো শহরের চেহারা ও স্থানীয় অর্থনীতি বদলে দিয়েছেন, তাকে এখন বিনিয়োগের নতুন মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করায় ম্যাচের সংখ্যা, দর্শক সমাগম এবং সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয়ের অংকও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এবারের আসরটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর বিশ্বকাপ, যা প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
পর্যটন খাতের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একজন আন্তর্জাতিক দর্শক আয়োজক দেশে অবস্থানকালে গড়ে ৫ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারেন, যা স্থানীয় আতিথেয়তা ও পরিবহন খাতের জন্য বড় আশীর্বাদ। তবে এই বিপুল সম্ভাবনার মাঝেও কিছু নেতিবাচক দিক ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় টিকিটের দাম প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় একে ‘ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন অনেক সাধারণ সমর্থক। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান তেলের দাম এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ভিসা নীতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের চড়া বাজার এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে আসায় অনেক শহরের হোটেল বুকিং এখনো আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছেনি। তা সত্ত্বেও নিউ ইয়র্ক, হিউস্টন ও কানসাস সিটির মতো আয়োজক শহরগুলো বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তাদের যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামো ঢেলে সাজাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্পগুলো সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করবে। অন্যদিকে, ফিফার প্রাইজমানির অংকও আকাশছোঁয়া হয়েছে; এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল রেকর্ড ৫ কোটি মার্কিন ডলার লাভ করবে, যা ১৯৮২ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি।
কেবল আর্থিক লাভ-ক্ষতিই নয়, বিশ্বকাপ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। খেলা দেখা মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও পরিচয়বোধকে সুসংহত করে এবং এক ধরনের সামষ্টিক আনন্দ ও একাত্মতা সৃষ্টি করে। পরিশেষে, ২০২৬ বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঠের ট্রফি যেই জিতুক না কেন, চূড়ান্ত বিজয় হবে বৈশ্বিক অর্থনীতির—এমনটাই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
চীনের কুনমিং শহরে অনুষ্ঠিত দশম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপো এবং ৩০তম চায়না কুনমিং আমদানি-রপ্তানি মেলায় বড় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (১৬ জুন) মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) ‘আউটস্ট্যান্ডিং এক্সিবিশন অর্গানাইজার’ হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। ইপিবির পক্ষ থেকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করেন পরিচালক মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন এবং উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম।
এবারের মেলায় বাংলাদেশ ৪টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৬টি পুরস্কার অর্জন করেছে। এর মধ্যে দেশীয় জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান আড়ং, সাসটেইনেবল বাংলাদেশ এবং ক্লে ইমেজ ‘বেস্ট এক্সিবিটর’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ দলগতভাবে ‘বেস্ট প্যাভিলিয়ন’ এবং ‘বেস্ট বুথ ডিজাইন’ ক্যাটাগরিতেও পুরস্কার জিতে নিয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের উপ-মহাপরিচালক সুন মিং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
গত ১১ জুন এই মেলার উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং ইউনান প্রদেশের গভর্নর ওয়াং ইউবো। এবারের মেলায় বাংলাদেশ ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে অংশগ্রহণ করে এবং রেকর্ড সংখ্যক ১০১টি দেশি প্রতিষ্ঠানের ১৭৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মেলার সাইড লাইন ইভেন্টে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ চীনে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বিশ্বের ৬৮টি দেশের ২৩০০ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মেলায় ‘বাংলাদেশ ডে’ পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও পণ্যের ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। এই অর্জনের মাধ্যমে চীনের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রসারের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের সময় আরও ৫ মিনিট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) ডিএসই কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন সময়সূচির কথা জানিয়েছে, যা আগামীকাল বুধবার (১৭ জুন) থেকেই কার্যকর হবে। নতুন সূচি অনুযায়ী, এখন থেকে ডিএসইতে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টা নিয়মিত লেনদেন চলবে।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে মূল লেনদেন দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে শেষ হয় এবং পরবর্তী ৫ মিনিট পোস্ট ক্লোজিং সেশন হিসেবে নির্ধারিত থাকে। তবে পরিবর্তিত নতুন সূচিতে মূল লেনদেন দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে। পাশাপাশি ৫ মিনিটের পোস্ট ক্লোজিং সেশনটির সময় বাড়িয়ে ১০ মিনিট করা হয়েছে। অর্থাৎ দুপুর ২টা থেকে ২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত পোস্ট ক্লোজিং সেশন থাকবে।
নতুন এই ১০ মিনিটের পোস্ট ক্লোজিং সেশনে বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো শেয়ার দর প্রস্তাব করতে পারবেন না। তবে কেউ চাইলে ওই দিনের সমাপনী মূল্যে (ক্লোজিং প্রাইজ) শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয় করার সুযোগ পাবেন। লেনদেনের সময় এই সামান্য বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগকারীরা আরও কিছুটা সময় পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শক্তিশালী কাঠামোগত সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। এই ইতিবাচক খবরের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারগুলোতে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন ঘটেছে এবং বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। এপি-র এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিনিয়োগকারীরা এই সমঝোতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ডাও জোন্স ফিউচার দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের বাজারেও একই ধারা দেখা গেছে; জার্মানির ডিএএক্স সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি-৪০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
দীর্ঘ কয়েক মাসের যুদ্ধাবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা এখন দূর হওয়ার পথে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে যে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।
এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলার ৩৭ সেন্ট কমে ৮২ ডলার ৯৬ সেন্টে নেমে এসেছে। একইভাবে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ ডলার ৫৩ সেন্ট কমে ৮০ ডলার ৩৫ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের এই দরপতন বৈশ্বিক পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিশ্লেষক স্টিফেন ইনেস মন্তব্য করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরটি বাজারের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক।
সমঝোতার খবরের সবচেয়ে বড় প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬৯ হাজার ৩১৭ পয়েন্টের নতুন রেকর্ড গড়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত, চীন এবং হংকংয়ের বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর থেকে চাপের পাহাড় কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা করতে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে দেশি রফতানিকারকরা আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি বিদেশের খুচরা ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্ববাজারের দুয়ার খুলে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১৫ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যবসা-থেকে-ভোক্তা (বি-টু-সি) ভিত্তিক রফতানি কার্যক্রম সহজতর করা এবং আন্তঃসীমান্ত ই-কমার্স বা ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নির্দেশনার ফলে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা আমাজন বা ই-বে’র মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনলাইন মার্কেটপ্লেসে নিজেদের পণ্য প্রদর্শন ও তালিকাভুক্ত করতে পারবেন। এর ফলে বিদেশি ক্রেতারা কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশি পণ্য পছন্দ করে ক্রয় করতে পারবেন।
সার্কুলার অনুযায়ী, রফতানিকারকরা প্রতি চালানে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য সিএফআর (CFR) শর্তে রফতানি করার সুযোগ পাবেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ১ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের রফতানি চালানের ক্ষেত্রে ইএক্সপি (EXP) ফরম দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার খাতিরে এ ধরনের রফতানির সম্পূর্ণ অর্থ অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেল বা বৈধ ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে অগ্রিম গ্রহণ করতে হবে।
ডিজিটাল বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে শিপিং ডকুমেন্টগুলো এখন সরাসরি বিদেশি ক্রেতার নামে ইস্যু করা যাবে, যা পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও সহজ করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি বা সদস্যপদ ফি বিদেশে পাঠানোর অনুমতিও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদি কোনো কারণে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ক্রেতা পণ্য ফেরত দিতে চান, তবে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই নীতিমালায়।
এতদিন বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করতে হলে সাধারণত ‘বিজনেস-টু-বিজনেস-টু-কনজ্যুমার’ মডেল অনুসরণ করতে হতো, যা ছিল বেশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে আগাম পণ্য পাঠিয়ে সেখানে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করতে হতো। নতুন এই নীতির ফলে উদ্যোক্তারা সরাসরি ভোক্তার সাথে সংযুক্ত হতে পারবেন।
ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বিশেষ করে হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়াতে সহায়ক হবে। এটি দেশের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বাণিজ্যের এই যুগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিগত সহায়তা দেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র চেয়ারম্যানসহ বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেওয়া সিদ্ধান্তকে জোরালোভাবে স্বাগত জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ’ (এবিবি)। এই পদক্ষেপকে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতা নিরসনে ‘সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। এবিবি মনে করছে, এর ফলে আমানতকারীসহ সকল অংশীজনের মধ্যে পুনরায় আস্থার পরিবেশ ফিরে আসবে।
এবিবির চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের ইস্যুটি একটি রাজনৈতিক রূপ নেওয়ায় গত ১০ জুন এবিবির পক্ষ থেকে গভর্নরের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান হওয়াটা খাতের জন্য জরুরি ছিল। সেই বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’
এবিবি চেয়ারম্যান তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেন যে, ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়; এর প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানত এবং দেশের বৃহত্তম রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব’ বা গণ-আন্দোলনকেন্দ্রিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পরিচালনা ও তারল্য সংকটের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় যে ফাটল ধরেছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপে সেই উদ্বেগের অবসান ঘটবে বলে সংগঠনটি বিশ্বাস করে।
বিবৃতিতে এবিবি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে যে, এই পরিবর্তনের ফলে ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং একটি রাজনীতিমুক্ত সুস্থ ব্যাংকিং পরিবেশ ফিরে আসবে। পাশাপাশি ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে বলেও তারা আশাবাদী। এবিবি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ব্যাংকিং সেক্টরে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা একটি বড় বিপদ সংকেত, যা রোধ করা সরকারের উচ্চ মহলের একটি বিশেষ দায়িত্ব। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সংগঠনটি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
যুক্তরাজ্য ও জাপানের মধ্যে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিশাল ও কৌশলগত বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় জাপানি বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো, আর্থিক সেবা, জ্বালানি এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই চুক্তিকে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন দিগন্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ‘নতুন এক যুগের’ সূচনা করবে।
লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো ও আর্থিক খাতে ৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করবে। এছাড়া সমুদ্র উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে আরও প্রায় ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার আশা করছে, এই বিনিয়োগের ফলে আগামী কয়েক বছরে দেশে প্রায় ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে। লন্ডনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। পরবর্তীতে দুই নেতা জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। বৈঠক শেষে স্টারমার এই আলোচনাকে ‘খুবই ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগের পুরো অর্থ সম্পূর্ণ নতুন নয়; এর একটি অংশ আগে থেকে ঘোষিত প্রকল্পের ধারাবাহিকতা হতে পারে। বর্তমানে ব্রিটিশ অর্থনীতি যখন নানামুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই চুক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাজ্য জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ০.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তবুও অর্থনীতিবিদরা আগামী দিনগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাব ব্রিটিশ অর্থনীতিতে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে। তবে সংস্থাটি আশাবাদী যে, দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটিশ অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এবং আগামী বছর ইউরোপের জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।
বিনিয়োগের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেও গভীর সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইতালিকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়িত ‘জিসিএপি’ যুদ্ধবিমান প্রকল্পের বিষয়ে উভয় দেশ নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। এছাড়া ব্রিটিশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রোলস-রয়েস জাপানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করবে। দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার সঙ্গে জাপানের শক্তিশালী উৎপাদন খাতকে সমন্বিত করা হবে। দোভাষীর মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি মন্তব্য করেন যে, “যুক্তরাজ্য জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার।”
চুক্তির বিস্তারিত অনুযায়ী, মিতসুবিশি এস্টেট, মিতসুই ফুডোসান এবং নোমুরা রিয়েল এস্টেটের মতো জাপানি ব্যবসায়িক জায়ান্টগুলো আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যের রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে। এদিকে ব্রিটিশ বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও লেবার সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেছে। ছায়া বাণিজ্যমন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ জানিয়েছেন, যেকোনো বিনিয়োগ সহায়ক চুক্তিকে তারা সমর্থন করেন, তবে কর বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে এই চুক্তিকে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি চাঙ্গা করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংক উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে আর্থিক খাতের জন্য একটি ‘যুগান্তকারী ও সাহসী’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃ মূলধনীকরণের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে সংগঠনটি স্বাগত জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বিএবি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার এই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
বিএবি মনে করছে যে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে করপোরেট ও মিউনিসিপ্যাল বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এছাড়া আমানতের আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ঋণের আবগারি শুল্ক যৌক্তিকীকরণের ফলে সাধারণ আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারা সরাসরি উপকৃত হবেন। তবে সংগঠনটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, বেসরকারি খাত যাতে ঋণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়, সরকারকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
বিবৃতিতে বিএবি আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আটটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো—ব্যাংক থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ দ্রুত উদ্ধার এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এছাড়া অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত শেয়ারের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি, খেলাপি ঋণ কমাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন এবং আর্থিক খাতের ক্ষতিসাধনকারীদের পুনরায় এই খাতে প্রবেশ রোধে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিএবি আরও সুপারিশ করেছে যে, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর করহার কমানো, প্রাতিষ্ঠানিক লভ্যাংশ কর মওকুফ এবং বোনাস লভ্যাংশের ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারকে শুল্কমুক্ত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিএবি মনে করে, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।