বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউনাইটেড এয়ার আবার চালু করে দেশের বাজারের ৩০ শতাংশ আর আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনটিই জানিয়েছেন এয়ারলাইনসটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম নজরুল ইসলাম।
মঙ্গলবার ইউনাইটেড এয়ারের সাধারণ সভা হয়। সেখানে এসব কথা বলেন এ টি এম নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই খাত নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছি। সারা বিশ্বে এভিয়েশন খাত খুব ভালো করছে। আমরা বাংলাদেশের বাজারও বিশ্লেষণ করে দেখেছি। আপনারা জানেন যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর আধুনিক হচ্ছে। এটা আধুনিক হলে এর সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। অনেক দেশের বিমান তখন এই বিমানবন্দরে আসবে। যদি আশা শুরু হয় তখন দেখবেন সব পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের আন্তর্জাতিক বাজার এখন আছে ২২ শতাংশ। আমরা যদি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে না পারি তখন আমাদের বাজার আরও কমে যাবে।’
‘দেশি এয়ারলাইনস যদি না আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজার আমরা হারিয়ে ফেলব। অনেক কমে যাবে। আমাদের এখন ডলারের সংকট আছে, এখন যদি আমরা নতুন এয়ারলাইনসের মাধ্যমে কিছু ডলার বাঁচাতে পারি, তাহলে দেশের জন্য ভালো হবে। আমাদের দেশি এয়ারলাইনস বাড়াতে হবে। আমি মনে করি আমাদের দেশে আরেকটি এয়ারলাইনস বাড়ানো উচিত। এ ধরনের চিন্তা করেই আমরা একটি ব্যবসা পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমরা ইউনাইটেড এয়ারলাইনসকে আবার রিভাইভ করতে চাই। আমরা যদি এখন একটি ফান্ড ক্রিয়েট করতে পারি, তাহলে আমরা ছোট করে শুরু করতে পারি। আমরা কার্গো দিয়ে শুরু করতে চাই দেশে আর বিদেশে। দ্বিতীয় ধাপে আমরা চেষ্টা করব আরও টাকা জোগাড় করতে। যদি পারি আমরা, তা হলে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে যাত্রী পরিবহন শুরু করব। আর কার্গো আরও বড় করে শুরু করব’- বলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমাদের কমপ্লায়েন্সে কিছু সমস্যা ছিল, এর জন্য বিদেশিরা আসতে চাচ্ছিল না। আমাদের প্রথম সমস্যা ছিল, বিমানগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সেটা আমরা করিয়েছি। ইউনাইটেডের সব বিমান সম্বন্ধে আমরা এখন জানি। অনেক ঝামেলা ছিল কিন্তু আমরা করতে পেরেছি। এই সমস্যা আমরা সমাধান করেছি। আরেকটি সমস্যা ছিল বার্ষিক সভা, সেটা আমরা আজকে করেছি। কমপ্লায়েন্সের বড় সমস্যা ছিল, সেটা আমরা শেষ করেছি।’
‘সরকারি সিদ্ধান্ত পেলে আমরা এখন এগোতে পারব। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি আমরা এগোতে পারি, ৫ বছরের মধ্যে আমরা এই দেশে একটি বিরাট পরিবর্তন আনব। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস একসময় দেশের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস ছিল, বাংলাদেশ বিমানের চেয়েও বেশি বিমান ছিল। সেই অবস্থান থেকে আজকে এয়ারলাইনসটি হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এটাকে রিভাইভ করা যায়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ নিতে পারি আর দেশীয় বাজারের ৩০ শতাংশ নিতে পারি, তাহলে এই এয়ারলাইনস দাঁড়িয়ে যাবে।’
এ টি এম নজরুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যারা দেশের বাইরে যায় এবং বাইরে থেকে যারা বাংলাদেশে আসে এ রকম যাত্রীর সংখ্যা বর্তমানে বছরে ৮০ থেকে ৯০ লাখ। এর ২২ থেকে ২৫ শতাংশ বর্তমানে বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোর হাতে। যখন আমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল হবে, তখন এই সংখ্যা হবে বছরে ২ কোটি। তখন যদি আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে না পারি, তাহলে আমরা সেই বাজার হারিয়ে ফেলব।’
ইউনাইটেড এয়ারের বার্ষিক সাধারণ সভা অনলাইনে হয়। সেখানে ২৬০ জনের মতো শেয়ার হোল্ডার যোগ দেন। আর ভোট দেন ৮ কোটি ১৬ লাখ ২৬ হাজার ৮১৬টি। মোট শেয়ারের ১০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে।
সাধারণ সভায় ২০১৫-২০১৬ থেকে ২০২১-২০২২ মোট সাত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন দেয়া হয়। আর ক্যাপিটাল রিস্ট্রাকচারিং এবং অ্যাসেট রিস্ট্রাকচারিংয়ের অনুমোদন নেয়া হয়েছে।
দেশের একমাত্র উড়োজাহাজ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ার। কোম্পানিটি ২০১৬ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এতে তাদের শেয়ারদর নামতে নামতে ২ টাকার নিচে নেমে আসে।
বিএসইসি মূল মার্কেট থেকে কোম্পানিটিকে স্থানান্তর করে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি মার্কেটে। সেখানে শেয়ার লেনদেন জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে লেনদেনও হচ্ছে না। এতে ৭২ কোটি শেয়ারের মালিকদের টাকা কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইউনাইটেড এয়ারের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান তাসবিরুল আলম চৌধুরীকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় কাজী ওয়াহিদুল আলমকে। ২০১৬ সালের পর কোম্পানিটির কোনো এজিএমই আর হয়নি।
সাধারণ সভায় ইউনাইটেড এয়ারের নতুন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় যেটা চ্যালেঞ্জ, একটি এয়ারলাইনসের কাজ নির্ভর করে তার লাইসেন্সের ওপর। এখন ইউনাইটেড এয়ারের কোনো এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) নেই। আমরা এই সার্টিফিকেটের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলছি। আরেকটি সমস্যা আমরা দেখছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের দুটো এয়ারক্রাফট দেশের বাইরে রয়েছে। একটি ভারতে, একটি পাকিস্তানে। সেগুলো সেখানে থাকার কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যে দেনা রয়েছে সেগুলো না দেয়ার কারণে আমরা আইনি ঝুঁকিতে পড়ছি। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের ঢাকায় যে এয়ারক্রাফট আছে সেখানে আমাদের বড় ধরনের সফলতা আছে। আমরা টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা যদি সরকারের সহযোগিতা পাই তাহলে আমরা শুরু করতে পারব বলে মনে করি।’
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ায় ১৪ মাসের বেশি সময় পর আবারও বাজারে মার্কিন ডলার বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাপ সামাল দিয়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল ছয়টি ব্যাংকের কাছে মোট ১১ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও বাজারে ডলার সরবরাহকারী হিসেবে সক্রিয় হলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বাজারে গতকাল প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা। এর আগের দিন এই হার ছিল ১২৩ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে ডলারের গড় দর বেড়েছে ১৫ পয়সা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগানেও কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের আমদানি ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। জুলাইয়ে এ খাতে আমদানি ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, একই সময়ে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বাড়া এবং রপ্তানি আয় কমার কারণে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কিছুটা বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রির সিদ্ধান্তকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১৪ মাসে বাজার থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় এবং বাজারের ওপর চাপ কমে আসায় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডলার কেনা শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ডলার কেনা-বেচা করা নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বা কমলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তাই এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে রিজার্ভের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
টানা দরপতনের ধাক্কা সামলে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার বড় ধরনের উত্থানের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর আশাতীত বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকগুলোর উল্লম্ফন ঘটেছে। এর আগে সোমবার ডিএসইর প্রধান সূচক বিগত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেলেও মঙ্গলবারের এই ইতিবাচক পরিবর্তনে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে এবং সামগ্রিক লেনদেনের গতিতেও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।
দিনের লেনদেনের শুরু থেকেই সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারার সূচনা হয় এবং কার্যদিবসের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই চাঙ্গাভাব অব্যাহত থাকে। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া সিকিউরিটিজগুলোর মধ্যে ৩৩৬টির দরবৃদ্ধির বিপরীতে মাত্র ২১টির দাম কমেছে এবং ৩৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল। ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন অর্থাৎ ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৭১টির দর বেড়েছে এবং দর হারিয়েছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মাঝারি মানের ৭৪টি কোম্পানির প্রতিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যার ফলে এই ক্যাটাগরিতে কোনো দরপতন দেখা যায়নি। অন্যদিকে লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯১টির দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে ১১টির দর এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ১৬টির দাম বেড়েছে ও ২টির দাম কমেছে।
সার্বিক দরবৃদ্ধির প্রভাবে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৯৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৪৭২ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া বাছাই করা শীর্ষ ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৮৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৩ পয়েন্টে ঠেকেছে। মূল্যসূচক বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫০৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের দিনের ৪৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার তুলনায় বেশি। বাজারটিতে একক লেনদেনে শীর্ষে ছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স (১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা), রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স (১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা) এবং ইস্টার্ন ব্যাংক (১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা)। শীর্ষ লেনদেনের তালিকায় আরও জায়গা করে নিয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, এনভয় টেক্সটাইল, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, সায়হাম টেক্সটাইল, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, মালেক স্পিনিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল।
এদিকে অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮১টি কোম্পানির মধ্যে ১০৫টির দর বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কমেছে ৬১টির দর। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাজারটিতে মোট লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা আগের দিনের ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
তৈরি পোশাকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে একটি একক ও সংবিধিবদ্ধ ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছে শিল্পোদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিকট এ খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এ সময় সংগঠনের প্রণীত ‘হালাল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম প্রধান খাত’ শীর্ষক একটি বিশদ নীতি গবেষণা প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারপ্রধানের হাতে হস্তান্তর করা হয়, যা পরবর্তীতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রেরিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক হালাল পণ্যের বাজারের বর্তমান আকার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা বার্ষিক গড়ে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৪ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক এই সুবিশাল সম্ভাবনার বিপরীতে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি আয় মাত্র ৯৪ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী পরিবর্তিত বাণিজ্য পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম ভোক্তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে হালাল পণ্যের যে বিশাল ভোক্তা শ্রেণি তৈরি হয়েছে, তা ধরতে বাংলাদেশকে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে হবে। বর্তমানে প্রাণ গ্রুপ, বেঙ্গল মিট প্রসেসিং, আকিজ, স্কয়ার, গোল্ডেন হারভেস্ট ও আহমদউল্লাহ অ্যাগ্রো ফুডসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নিজস্ব অর্থায়নে এ খাতে সীমিত পরিসরে রপ্তানি পরিচালনা করছে।
বিসিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই পৃথকভাবে হালাল সনদ প্রদান করলেও একটি একক সমন্বিত সনদ প্রদানকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরির অভাবে উদ্যোক্তাদের ব্যয় ও সময় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সমস্যা নিরসনে ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর সঙ্গে হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি সম্পাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওআইসি-এসএমআইআইসির কারিগরি সহায়তা গ্রহণ, শুল্ক ব্যবস্থাপনায় এইচএস কোডের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ‘হালাল কোড’ প্রবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের স্বকীয় ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলতে দেশ-বিদেশে নিয়মিত হালাল মেলার আয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে।
হালাল শিল্পের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি সহায়ক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে বিসিআই। প্রতিবেদনে এ খাতে বিনিয়োগকারী ও উৎপাদকদের উৎসাহিত করতে ১০ থেকে ১৫ বছরের স্থিতিশীল নীতি সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি ২০৩৪ ও ২০৪০ সালকে লক্ষ্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি ভিশন নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত একাধিক গোলটেবিল বৈঠক ও কর্মশালার সুপারিশের ভিত্তিতেই এই পলিসি গাইডলাইনটি প্রণয়ন করেছে বিসিআই।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন দৈনন্দিন সংসার চালাতে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে, তখন দেশের ব্যাংকিং খাতে এর সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি; অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশে কোটি টাকার বেশি জমা থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।
সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট আমানত চিত্রেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। জুন প্রান্তিক শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে পরিচালিত মোট হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টিতে উন্নীত হয়েছে, যেখানে পুঞ্জীভূত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। মার্চ প্রান্তিকের ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকার তুলনায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক আমানত ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বৈপরীত্য মূলত সমাজে বিরাজমান গভীর আয় বৈষম্য এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ আয়ের মানুষ যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে ব্যাংক থেকে আগের জমানো অর্থ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সমাজের শীর্ষ ধনী শ্রেণির আয় ও উদ্বৃত্ত তারল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে থাকা অলস অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসাও সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে সমাজে প্রকৃত ‘কোটিপতি’ ব্যক্তির সংখ্যা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না; কারণ এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমানত অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক হিসাব থাকার সুযোগ রয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটি টাকার আমানতকারী হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫টি, যা ১৯৯০ সালে ৯৪৩টিতে এবং ২০০৮ সালে বেড়ে ১৯ হাজার ১৬৩টিতে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তা ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে উন্নীত হয়। করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এই ধারা অব্যাহত থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে ঠেকে। পরিশেষে চলতি বছরের জুনে এই সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার অতিক্রম করা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমবণ্টন না হয়ে নির্দিষ্ট একটি ধনিক শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার অর্থনৈতিক প্রবণতাকেই নির্দেশ করে।
অনলাইনভিত্তিক তৈরি পোশাক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ‘জে-ক্রিয়েশন’-এর প্রায় ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ফাঁকি শনাক্ত করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর সেকশন-১২ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়।
ভ্যাট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি ও নানা ধরনের তৈরি পোশাক বিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনার সময় রাজস্ব ফাঁকির সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়। অধিকতর তদন্তের স্বার্থে মূসক-১২.৩ ফরমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিপিইউ এবং বিক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় গোপন নথিপত্র ও হিসাবের খাতা জব্দ করে যৌথ দল। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত ডিজিটাল ডাটা ও বাণিজ্যিক হিসাব পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দ করা যাবতীয় দলিলপত্র ও আর্থিক হিসাবের আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। বড় অঙ্কের এই রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ভ্যাট আইনে মামলা দায়েরসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই দেশের কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে ইতিবাচক গতি সঞ্চারিত হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে দেশের ৫৮টি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে সর্বমোট ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই মাসের ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকার তুলনায় ২৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সামগ্রিক ঋণ বিতরণ ও আদায়ের গতি বাড়লেও ব্যাংকভেদে পুঞ্জীভূত বকেয়া এবং শ্রেণিকৃত ঋণের বৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম মাসেই বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১ হাজার ১১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বিতরণ করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর পরেই বিশেষায়িত ব্যাংক ৬৮৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ইসলামী ব্যাংকগুলো ৫৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২৮৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ছাড় করেছে। তবে নীতিমালায় শস্য খাতে মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ বরাদ্দের নির্দেশনা থাকলেও জুলাইয়ের মোট বিতরণের ৪০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ১ হাজার ৭৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এ খাতে গেছে। বিপরীতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি খাতে নির্ধারিত ২০ শতাংশের জায়গায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ৯২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মৎস্য খাতে ৩৮৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
ঋণ বিতরণের সমান্তরালে আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি দেখা গেছে; জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো মোট ৩ হাজার ৫২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকার কৃষি ঋণ আদায় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি। মাস শেষে কৃষি ঋণের মোট বকেয়া স্থিতি ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৮৬৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২২ হাজার ৩৬৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় এবং শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে ১৮ হাজার ৮১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তবে সামগ্রিক খেলাপি ঋণ কমলেও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ঋণ এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
বিগত এক দশকের তুলনায় কৃষি ঋণের পরিধি ব্যাপক বাড়লেও ঋণমান বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে শ্রেণিকৃত কৃষি ঋণ ছিল ৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এর বাইরে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) জুলাইয়ে ১১৫ কোটি ১২ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংক ও সংস্থাটি মিলিয়ে প্রথম মাসে সম্মিলিত বিতরণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৫ শতাংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেবল বিতরণের সংখ্যা না বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের সঠিক ব্যবহার ও সময়মতো আদায় নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির দেখা মিলেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৬১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৪৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বিশ্বের বৃহত্তম এই রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ ছিল। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ঋণাত্মক ০ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসে সেই ধাক্কা সামলে অভাবনীয় ঘুরে দাঁড়ায় দেশের পোশাক খাত। আগস্ট মাসে এক লাফে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশে।
রপ্তানির এই ঊর্ধ্বগতির কারণে মাসিক গড় আয়ের হিসাবেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি থেকে মাসিক গড় আয় দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। যেখানে বিগত অর্থবছরে মাসিক গড় আয়ের পরিমাণ ছিল ৬৪ কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
এদিকে পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ জানিয়েছে, বর্তমান এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির মোট পরিমাণ আনুমানিক ৮৬২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে প্রবেশের সুযোগ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় ভাষা শেখার ব্যয় নির্বাহে বাংলাদেশি কর্মীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় দেশে যাওয়ার পূর্বে কিংবা যাওয়ার পরে ভাষা শিক্ষার যাবতীয় খরচ মেটাতে এ আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এই বিশেষ ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটিকে ১ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দিয়েছে, যার বার্ষিক সুদের হার ধরা হয়েছে ৯ শতাংশ।
বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও বিদেশে কর্মরতদের একটি বড় অংশই অদক্ষ শ্রমিক। তাই ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চমূল্যের নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই বিশেষ তহবিল কার্যকর করা হয়েছে, যা বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা শিক্ষায় ব্যয় করা হবে।
তবে ভাষা শিক্ষার মতো কোর্সে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারম্যান এম এস শেকিল চৌধুরী মনে করেন, শুধু ভাষা প্রশিক্ষণে এত বিপুল অর্থের প্রয়োজন অবাস্তব এবং ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে এর অঙ্ক বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম জানান, ঋণের টাকা সরাসরি কর্মীদের হাতে নগদ দেওয়া হবে না; বরং জাপানের মতো দেশের কোনো অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা শিক্ষার জন্য ভর্তি নিশ্চিত হলে ব্যাংক থেকে সরাসরি ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে টিউশন ফি হিসেবে অর্থ পরিশোধ করা হবে।
কানাডা থেকে আমদানিকৃত একাধিক পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক মওকুফের সংশোধিত নীতিমালা মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সংশোধিত এই তালিকায় বিভিন্ন পদের পনির ও মোটরবোটের মতো পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও টয়লেট পেপার, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও সিমেন্টকে ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হলো। এমন এক সময়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় বাড়তি ব্যয়ের চাপে দেশটির সাধারণ পরিবার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে কানাডীয় পণ্যে এই নতুন শুল্ক ভোক্তাদের ব্যয়ভার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশোধিত পদক্ষেপের ফলে কানাডা থেকে আমদানি করা সুনির্দিষ্ট কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকলেও মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, দ্বিপক্ষীয় সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় এই শুল্কের আওতাধীন পণ্যের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য।
নতুন সিদ্ধান্তের অধীনে বিভিন্ন ধরণের পনির, মোটরবোট, কাগজ, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাতজাত সামগ্রী, গদি এবং নির্ধারিত কিছু আসবাবপত্রকে বাড়তি শুল্কের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরপক্ষে টয়লেট পেপার, ফেসিয়াল টিস্যু, ছিপের যন্ত্রাংশসহ মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম, চার লিটারের অধিক ধারণক্ষমতার পাত্রের হুইস্কি, সড়ক থেকে বরফ গলাতে ব্যবহৃত লবণ এবং নির্মাণ খাতের অপরিহার্য উপাদান সিমেন্টকে ৫০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর সুসান কলিন্স জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবেই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিকট রাস্তার লবণ ও সিমেন্টের ওপর শুল্কজনিত প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। উল্লেখ্য, সিনেটে রিপাবলিকানদের আধিপত্য ধরে রাখতে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর বিজয়ী হওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।
উত্তর আমেরিকার প্রতিবেশী দুই দেশের চলমান বাণিজ্য সংঘাতে এই শুল্ক পুনর্বিন্যাসকে সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় গত আগস্ট মাসে কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার বিপরীতে কানাডাও সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। কানাডার এই পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউস আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির কিছু দুগ্ধজাত সামগ্রী ও অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং একই সাথে শুল্ক তালিকাতেও রদবদল ঘটায়।
সর্বশেষ এই শুল্ক কার্যকরে ট্রাম্প ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত ৩৩৮ ধারা প্রয়োগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতাধীন পণ্যের পাশাপাশি পূর্বে আরোপিত খাতভিত্তিক শুল্কসমূহের ওপরেও নতুন এই নিয়মাবলী কার্যকর থাকবে। এদিকে দুই দেশের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক উত্তেজনা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর বিদ্যমান ২৫ শতাংশ শুল্ক আগামী জানুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার বিষয়ে ট্রাম্পের যে হুঁশিয়ারি ছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যকার মোটরযান বাণিজ্যেও সংঘাত আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ভয়াবহতা নিয়ে খোদ এই খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের সতর্কবার্তা এবং উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানে বিশ্ব শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এই খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ এবং বিপুল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন উদ্বেগের কারণে সোমবার ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারগুলোতে প্রযুক্তি সূচকগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোডেই এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাঁর এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় অল্টম্যান ঘোষণা দিয়েছেন যে, চলতি বছর ওপেনএআই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়ন করা হবে না। এই সতর্কবার্তাগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের ওপর ভর করেই বিশ্ব শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি বজায় ছিল। এখন ঋণের উচ্চ খরচ ও পারস্পরিক অর্থায়নের নির্ভরতার মধ্যে কোম্পানিগুলোর উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এই দরপতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চিপ নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোর ওপর। ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক এক দিনেই ৫ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে এনভিডিয়ার শেয়ার ৩ শতাংশ, অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মাইক্রনের শেয়ার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জাম নির্মাতা ল্যাম রিসার্চ ও অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস এবং ব্লুম এনার্জির শেয়ারও ৬ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক-১০০ সূচক দিনের শুরুতে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে গিয়েছিল।
শুধু মার্কিন বাজারেই নয়, এআই নিয়ে এই উদ্বেগের ছোঁয়া লেগেছে ইউরোপ ও এশিয়ার পুঁজিবাজারেও। ইউরোপের প্রযুক্তি খাতের সূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা এএসএমএলের শেয়ার ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। এশিয়ার বাজারেও সফটব্যাংক ১০ শতাংশ এবং তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্য হারিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে ব্যয়ের গতি কমানোর যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল প্রযুক্তি খাতেই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে ওমানে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎচালিত মোটরসাইকেল (ইভি বাইক) রপ্তানি, প্রযুক্তি বিনিময় এবং উভয় দেশের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশের পিটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ওমানের মডার্ন স্টার বিজনেসেস এলএলসির (স্টার ড্রোনস) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সোমবার রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। সমঝোতা স্মারকে পিটন ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ইকবাল জাহেদী এবং স্টার ড্রোনসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদ আব্দুল গাফুর সাইফ উদ্দিন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির প্রাথমিক শর্তানুযায়ী, ওমানের জনপ্রিয় খাদ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ‘বিজ’ (Bees)-এর ডেলিভারি বহরের আধুনিকায়নে বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ইভি বাইক সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় ওমানে একটি যৌথ অ্যাসেম্বলি কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ইভি উৎপাদন কৌশল ও কারিগরি দক্ষতা ওমানে হস্তান্তরের পাশাপাশি উভয় দেশের প্রকৌশলীরা যৌথ গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাবেন। এ ছাড়া স্টার ড্রোনসের আধুনিক ড্রোন লজিস্টিকসের সঙ্গে বাংলাদেশি ইভি বাইকের সংযোগ ঘটিয়ে একটি বহুমুখী সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং ওমান থেকে প্রয়োজনীয় মূলধন ও আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগের রূপরেখাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয় উদ্ভাবক, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের এক ছাদের নিচে আনার উদ্যোগ হিসেবে এই উদ্ভাবন মেলা থেকেই এমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। স্টার ড্রোনস কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশি প্রযুক্তির মান ও দেশীয় উদ্ভাবনী সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় তাঁরা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এই প্রযুক্তি প্রসারে অংশীদার হয়েছেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ওমান দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ফাথিয়া বিনতে আহমেদ আল বালুশি। এ ছাড়া সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী এবং পিটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান শামসুল আলম লিটনসহ দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
টানা দরপতনের ধাক্কায় দেশের পুঁজিবাজার আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক বিগত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি লেনদেনের গতিতেও বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।
দিনের লেনদেনের শুরুতে অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দরবৃদ্ধির সুবাদে ইতিবাচক ধারায় যাত্রা শুরু করে ডিএসই, যার ফলে একপর্যায়ে প্রধান সূচক ৩৬ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তবে দুপুর ১২টার পর থেকে তীব্র বিক্রয়চাপ শুরু হলে বাজার পুরোপুরি নিম্নমুখী রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের দরপতনের মধ্য দিয়েই লেনদেন শেষ হয়। দিনশেষে ডিএসইতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৫৬টির দরবৃদ্ধির বিপরীতে ২৯৯টির দাম কমেছে এবং ৩৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এর মধ্যে ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো কোম্পানির মধ্যে ১৬৮টির দরপতনের বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ২৪টির দাম। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মাঝারি মানের ৬৩টি প্রতিষ্ঠানের দর কমার বিপরীতে বেড়েছে ৯টির দাম। এ ছাড়া লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপভুক্ত ২৩টি প্রতিষ্ঠানের দর বাড়লেও কমেছে ৬৮টির এবং ৩৩টি মিউচুয়াল ফান্ডের দরপতনের বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ১টির দর।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দর হারানোর ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৯ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৩৭৯ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে, যা গত ১ জুনের পর সর্বনিম্ন। পাশাপাশি শীর্ষ ৩০ কোম্পানির ডিএসই-৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৬২ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৮ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৭৬ পয়েন্টে নেমেছে। সূচকের অবনমনের সঙ্গে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ৮৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ৫৭১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। একক লেনদেনে শীর্ষে ছিল এনভয় টেক্সটাইল (২৫ কোটি ২ লাখ টাকা), প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল (১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা) এবং শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ (১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা)। শীর্ষ লেনদেনের তালিকায় আরও জায়গা করে নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স, সায়হাম টেক্সটাইল, সায়হাম কটন, নিটল ইন্স্যুরেন্স, যমুনা ব্যাংক ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স।
অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেন হওয়া ১৮৪টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩৯টির দর বাড়লেও কমেছে ১৩৬টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৯টির দর। এর ফলে বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৬১ পয়েন্ট কমেছে। তবে সিএসইতে লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর ওঠানামাজনিত আর্থিক ঝুঁকি সামাল দিতে দেশীয় আমদানিকারকদের জন্য ‘কমোডিটি প্রাইস রিস্ক হেজিং’ সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে দেওয়া এক নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যের আকস্মিক উল্লম্ফন মোকাবিলা, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সহজতর করার লক্ষ্যেই এ বিশেষ নীতিগত সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার আওতায় প্রকৃত আমদানি দায়ের বিপরীতে যোগ্য আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত বিভিন্ন আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন। এর মধ্যে কমোডিটি ফিউচারস, সোয়াপস, অপশনস এবং পণ্য সূচকভিত্তিক ফরোয়ার্ড চুক্তির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, ধাতু, রাসায়নিক সার ও খাদ্যশস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা তাদের মূল ঝুঁকির সর্বোচ্চ শতভাগ পর্যন্ত হেজিং করার সুযোগ পাবেন। তবে এ সুবিধা গ্রহণের জন্য আমদানির সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, এই সুবিধা কোনোভাবেই ফটকা বা অনুমাননির্ভর বাণিজ্যের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববাজারের মূল্য অস্থিতিশীলতা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যকে সুরক্ষা দেওয়া। এডি ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ অভিমত প্রকাশ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সময়ে এ উদ্যোগ আমদানিকারকদের সঠিক ব্যয় নিরূপণ, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শক্তিশালী সুরক্ষা দেবে।