বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউনাইটেড এয়ার আবার চালু করে দেশের বাজারের ৩০ শতাংশ আর আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনটিই জানিয়েছেন এয়ারলাইনসটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম নজরুল ইসলাম।
মঙ্গলবার ইউনাইটেড এয়ারের সাধারণ সভা হয়। সেখানে এসব কথা বলেন এ টি এম নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই খাত নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছি। সারা বিশ্বে এভিয়েশন খাত খুব ভালো করছে। আমরা বাংলাদেশের বাজারও বিশ্লেষণ করে দেখেছি। আপনারা জানেন যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর আধুনিক হচ্ছে। এটা আধুনিক হলে এর সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। অনেক দেশের বিমান তখন এই বিমানবন্দরে আসবে। যদি আশা শুরু হয় তখন দেখবেন সব পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের আন্তর্জাতিক বাজার এখন আছে ২২ শতাংশ। আমরা যদি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে না পারি তখন আমাদের বাজার আরও কমে যাবে।’
‘দেশি এয়ারলাইনস যদি না আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজার আমরা হারিয়ে ফেলব। অনেক কমে যাবে। আমাদের এখন ডলারের সংকট আছে, এখন যদি আমরা নতুন এয়ারলাইনসের মাধ্যমে কিছু ডলার বাঁচাতে পারি, তাহলে দেশের জন্য ভালো হবে। আমাদের দেশি এয়ারলাইনস বাড়াতে হবে। আমি মনে করি আমাদের দেশে আরেকটি এয়ারলাইনস বাড়ানো উচিত। এ ধরনের চিন্তা করেই আমরা একটি ব্যবসা পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমরা ইউনাইটেড এয়ারলাইনসকে আবার রিভাইভ করতে চাই। আমরা যদি এখন একটি ফান্ড ক্রিয়েট করতে পারি, তাহলে আমরা ছোট করে শুরু করতে পারি। আমরা কার্গো দিয়ে শুরু করতে চাই দেশে আর বিদেশে। দ্বিতীয় ধাপে আমরা চেষ্টা করব আরও টাকা জোগাড় করতে। যদি পারি আমরা, তা হলে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে যাত্রী পরিবহন শুরু করব। আর কার্গো আরও বড় করে শুরু করব’- বলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমাদের কমপ্লায়েন্সে কিছু সমস্যা ছিল, এর জন্য বিদেশিরা আসতে চাচ্ছিল না। আমাদের প্রথম সমস্যা ছিল, বিমানগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সেটা আমরা করিয়েছি। ইউনাইটেডের সব বিমান সম্বন্ধে আমরা এখন জানি। অনেক ঝামেলা ছিল কিন্তু আমরা করতে পেরেছি। এই সমস্যা আমরা সমাধান করেছি। আরেকটি সমস্যা ছিল বার্ষিক সভা, সেটা আমরা আজকে করেছি। কমপ্লায়েন্সের বড় সমস্যা ছিল, সেটা আমরা শেষ করেছি।’
‘সরকারি সিদ্ধান্ত পেলে আমরা এখন এগোতে পারব। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি আমরা এগোতে পারি, ৫ বছরের মধ্যে আমরা এই দেশে একটি বিরাট পরিবর্তন আনব। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস একসময় দেশের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস ছিল, বাংলাদেশ বিমানের চেয়েও বেশি বিমান ছিল। সেই অবস্থান থেকে আজকে এয়ারলাইনসটি হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এটাকে রিভাইভ করা যায়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের ৪ শতাংশ নিতে পারি আর দেশীয় বাজারের ৩০ শতাংশ নিতে পারি, তাহলে এই এয়ারলাইনস দাঁড়িয়ে যাবে।’
এ টি এম নজরুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যারা দেশের বাইরে যায় এবং বাইরে থেকে যারা বাংলাদেশে আসে এ রকম যাত্রীর সংখ্যা বর্তমানে বছরে ৮০ থেকে ৯০ লাখ। এর ২২ থেকে ২৫ শতাংশ বর্তমানে বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোর হাতে। যখন আমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল হবে, তখন এই সংখ্যা হবে বছরে ২ কোটি। তখন যদি আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে না পারি, তাহলে আমরা সেই বাজার হারিয়ে ফেলব।’
ইউনাইটেড এয়ারের বার্ষিক সাধারণ সভা অনলাইনে হয়। সেখানে ২৬০ জনের মতো শেয়ার হোল্ডার যোগ দেন। আর ভোট দেন ৮ কোটি ১৬ লাখ ২৬ হাজার ৮১৬টি। মোট শেয়ারের ১০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে।
সাধারণ সভায় ২০১৫-২০১৬ থেকে ২০২১-২০২২ মোট সাত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন দেয়া হয়। আর ক্যাপিটাল রিস্ট্রাকচারিং এবং অ্যাসেট রিস্ট্রাকচারিংয়ের অনুমোদন নেয়া হয়েছে।
দেশের একমাত্র উড়োজাহাজ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ার। কোম্পানিটি ২০১৬ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এতে তাদের শেয়ারদর নামতে নামতে ২ টাকার নিচে নেমে আসে।
বিএসইসি মূল মার্কেট থেকে কোম্পানিটিকে স্থানান্তর করে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি মার্কেটে। সেখানে শেয়ার লেনদেন জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে লেনদেনও হচ্ছে না। এতে ৭২ কোটি শেয়ারের মালিকদের টাকা কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইউনাইটেড এয়ারের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান তাসবিরুল আলম চৌধুরীকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় কাজী ওয়াহিদুল আলমকে। ২০১৬ সালের পর কোম্পানিটির কোনো এজিএমই আর হয়নি।
সাধারণ সভায় ইউনাইটেড এয়ারের নতুন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় যেটা চ্যালেঞ্জ, একটি এয়ারলাইনসের কাজ নির্ভর করে তার লাইসেন্সের ওপর। এখন ইউনাইটেড এয়ারের কোনো এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) নেই। আমরা এই সার্টিফিকেটের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলছি। আরেকটি সমস্যা আমরা দেখছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের দুটো এয়ারক্রাফট দেশের বাইরে রয়েছে। একটি ভারতে, একটি পাকিস্তানে। সেগুলো সেখানে থাকার কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যে দেনা রয়েছে সেগুলো না দেয়ার কারণে আমরা আইনি ঝুঁকিতে পড়ছি। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের ঢাকায় যে এয়ারক্রাফট আছে সেখানে আমাদের বড় ধরনের সফলতা আছে। আমরা টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা যদি সরকারের সহযোগিতা পাই তাহলে আমরা শুরু করতে পারব বলে মনে করি।’
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈরী আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে চরম সংকটের মুখে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ কফি উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী খরার আশঙ্কায় দেশটিতে কফির ফলন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক, রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটির প্রধান কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল দক্ষিণ সুমাত্রা ও জাভা দ্বীপে কফি গাছে ফুল ও ফল আসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ায় ফলন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ সুমাত্রার কফি চাষি রুসি সিরুয়াদি জানান, অতিবৃষ্টিতে গাছের ফুল পচে যাওয়া ও ডালপালা নষ্ট হওয়ায় এবার ফলন আগের বছরের তুলনায় অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে এবং এই ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে আরও দুই থেকে তিন বছর লেগে যাবে।
বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কফি উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত মোট কফির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রোবাস্তা জাতের, যা মূলত প্রক্রিয়াজাত ইনস্ট্যান্ট কফি তৈরিতে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে একমাত্র ইন্দোনেশিয়ারই কফি উৎপাদন কমতে যাচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে, আলোচ্য সময়ে দেশটির অপরিশোধিত কফি উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যাগে (প্রতি ব্যাগ ৬০ কেজি) নেমে আসতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে চতুর্থ বৃহত্তম কফি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিনের অবস্থান হারিয়ে পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার পেছনে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে ‘এল নিনো’ আবহাওয়া প্যাটার্ন, যার প্রভাবে তীব্র খরা দেখা দিলে সামনের মৌসুমে ফলন আরও কমে যেতে পারে।
উৎপাদন সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যে। সরকারি ও বাজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) দেশটির কফি রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। অথচ বিগত ২০২৫ সালে ব্রাজিলে তীব্র সরবরাহ সংকটের সুযোগে ইন্দোনেশিয়ার কফি রপ্তানি আয় ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা অভ্যন্তরীণ আবহাওয়াজনিত কারণে এবার ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কাঁচামাল সংকটের কারণে স্থানীয় বাজারে কফি বিনের দাম ও পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ছোট ছোট ক্যাফে মালিকরা; তাঁদের ব্যবসায়িক মুনাফার হার ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং বড় বড় চেইনশপগুলোও পর্যাপ্ত কাঁচামাল সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ এই সংকটের সমান্তরালে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন পরিবেশগত বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় কৃষকদের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাপানের মতো বৃহৎ বাজারগুলোতে কফি আমদানির ক্ষেত্রে বন উজাড় রোধ ও পরিবেশগত গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের কঠোর শর্তারোপ করা হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্দোনেশিয়া সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার সহায়তা প্রদান, উন্নত জাতের চারা পুনঃরোপণ কর্মসূচি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে; তবে চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামনের দিনগুলোতে এই খাতকে আরও দীর্ঘমেয়াদি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চরম অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি, কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান সামরিক সংঘাতের সাঁড়াশি চাপে পড়ে সর্বকালের রেকর্ড দরপতনের শিকার হয়েছে ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়াল। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুর বরাতে জানা গেছে, দেশটির খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২৫ লাখের ঘর অতিক্রম করেছে। ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা বাজার পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘পাশিজি’র তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার এক দিনেই ডলারের বিনিময় হার ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার রিয়ালে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার লেনদেনের একপর্যায়ে খোলাবাজারে ডলারের দর সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৪৮ হাজার রিয়ালে গিয়ে ঠেকেছিল। মুদ্রাটির এই চরম অবমূল্যায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিগত কয়েক দিন ধরেই রিয়ালের মানে ধারাবাহিক ধস নামছে। এর আগের দিন সোমবারও মুক্তবাজারে ডলারের বিনিময় হার ২৪ লাখ রিয়ালে পৌঁছে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে রিয়ালের দাম আরও পড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও স্থানীয় মুদ্রার ওপর আস্থা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরানের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেহরানের নিয়মিত বাণিজ্যিক পণ্য ও আয়ের প্রধান উৎস অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। তেল বিক্রি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে আসায় দেশের বাজারে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় মুদ্রার মানে।
যুদ্ধকালীন সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের বহুমুখী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার যৌথ প্রভাবে রিয়ালের এই ধারাবাহিক পতন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় মুদ্রার এমন নজিরবিহীন অবমূল্যায়নের ফলে দেশটিতে আমদানিকৃত পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে, যা সাধারণ ইরানি নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে সামগ্রিক মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে যুদ্ধপরবর্তী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা কেপলারের প্রাথমিক তথ্যের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নেতৃত্বে সেপ্টেম্বর মাসে অঞ্চলটি থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর একক কোনো মাসে এটিই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্মিলিত সর্বোচ্চ তেল রপ্তানির রেকর্ড।
কেপলারের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত ও ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চালান বৃদ্ধি পেলেও এই রপ্তানিপ্রবাহ এখনো যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। সংঘাত শুরুর মাস ফেব্রুয়ারিতে এসব দেশ থেকে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়েছিল; অর্থাৎ বর্তমান রপ্তানি সেই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল কম। তবে কৌশলগত আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কিছুটা সচল হওয়ায় সেপ্টেম্বরে এ পথ দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহনের পরিমাণ প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অঞ্চলে রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটির তেল রপ্তানি দৈনিক ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেলে নেমে এলেও সেপ্টেম্বরে তা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক প্রায় ৫৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। দেশটির প্রধান রপ্তানিকেন্দ্র রাস তানুরা বন্দর থেকেও তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্য গতি পেয়েছে; আগস্টে বন্দরটি দিয়ে দৈনিক মাত্র ৯ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেল তেল পাঠানো হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে, যদিও ফেব্রুয়ারির ৬৪ লাখ ১১ হাজার ব্যারেলের তুলনায় তা এখনো বেশ কম। মূলত লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সংযোগকারী সৌদি আরবের প্রধান ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ হামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রিয়াদ বাধ্য হয়ে তাদের তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ বিকল্প হিসেবে পুনরায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরে ফিরিয়ে এনেছে।
কেপলারের পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, শুধু গত এক সপ্তাহেই সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবোঝাই ১৯টি বিশালাকার ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যার প্রতিটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল করে তেল সংরক্ষিত ছিল; তবে যেসব জাহাজ রাডার বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বন্ধ রেখে পারাপার হয়েছে, সেগুলোকে এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২৫টি বৃহৎ বাণিজ্যিক ও কনটেইনার জাহাজ চলাচল করত; বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মাঝেও ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
তীব্র মূল্যস্ফীতি ও কঠোর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ঐতিহাসিক দরপতনের শিকার হয়েছে ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়াল। দেশটির খোলাবাজারে প্রথমবারের মতো প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ২৫ লাখ ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট পাশিজির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু জানায়, মঙ্গলবার ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমে যায়। এদিন লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৪৮ হাজার রিয়ালে পৌঁছালেও দিনশেষে তা ২৫ লাখ ৪২ হাজার রিয়ালে স্থিতিশীল হয়। এর আগের দিন সোমবারও ডলারের দর ২৪ লাখ রিয়ালে পৌঁছে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং সমুদ্রপথে আরোপিত অবরোধ দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য এবং প্রধান আয়ের উৎস জ্বালানি তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাবে স্থানীয় মুদ্রার এই ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনীতিতে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নতুন নোট মুদ্রণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। এর বিপরীতে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক খরচ বহুলাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সামগ্রিক ডিজিটাল লেনদেন ইকোসিস্টেম পরিচালনায় বাৎসরিক ব্যয় হয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। এ হিসাবে মাথাপিছু বার্ষিক ডিজিটাল লেনদেনের খরচ দাঁড়ায় মাত্র ৩৪৮ টাকা। বিপরীতে প্রচলিত নগদ ব্যবস্থাপনার মাথাপিছু খরচ এর তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ছায়া অর্থনীতির রাজস্ব ক্ষতি ব্যতীত কেবল নগদ টাকা ব্যবস্থাপনায় বছরে খরচ হয় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যার মাথাপিছু পরিমাণ ৪ হাজার ৪৯৫ টাকা। অন্যদিকে ছায়া অর্থনীতির কারণে রাজস্ব ক্ষতি যুক্ত করলে নগদ ব্যবহারের সামগ্রিক ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়; যার ফলে মাথাপিছু ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা। অর্থাৎ সামগ্রিক বিবেচনায় ছায়া অর্থনীতিসহ নগদ ব্যবস্থাপনার এই ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি। এছাড়া ডিজিটাল লেনদেন খাত থেকে প্রতি বছর ২ হাজার ৩১১ কোটি টাকার রাজস্ব বা আয় অর্জিত হয়, যা মাথাপিছু হিসেবে প্রায় ১৩৫ টাকা। তবে নগদ ব্যবস্থাপনার বিপুল ব্যয় সাধারণের দৃষ্টিগোচর না হলেও ডিজিটাল সেবার মাশুল সরাসরি ব্যবহারকারীর নজরে আসে। ফলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও অনেকের কাছে এটি বেশি ব্যয়বহুল মনে হয় এবং নগদ টাকার প্রতিই তাদের নির্ভরশীলতা বজায় থাকে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ হাজার ৮১২ কোটি টাকার ব্যয়ভার বহন করেন সাধারণ গ্রাহকরা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টদের প্রায় ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, ইস্যুকারী বা অরিজিনেটিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা এবং অ্যাকোয়ারার বা রিসিভিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থার কর্মী ও জালিয়াতি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরোক্ষ খাতে প্রায় ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক পরিচালনায় ব্যয় হয় প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিপরীতে এই খাত থেকে অর্জিত মোট আয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫২২ কোটি টাকা আয় করে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেটওয়ার্ক থেকে প্রায় ৩৪৮ কোটি টাকা, রিসিভিং প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৩৪৬ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক কার্ড স্কিম থেকে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা অর্জিত হয়।
ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত ও প্রযুক্তিগত কিছু বাধার কারণে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এখনও প্রত্যাশিত গতি পায়নি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনে দৈনিক ৫০ হাজার টাকার সীমা নির্ধারণ বড় অঙ্কের লেনদেনকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। একই সঙ্গে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কার্যকরী মূলধনের সংকট তৈরি হয়। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগের ঘাটতি এবং নগদ লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল মাধ্যমের বহুমুখী ধাপ ব্যবহারের জটিলতাও সাধারণ মানুষের আগ্রহের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে লেনদেন আরও সহজ করতে এবং বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে একক ‘বাংলা কিউআর’ চালুর পাশাপাশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও অন্তর্নিহিত ঝুঁকি পুরোপুরি না কাটায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে এই সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে তিনি জানান, “গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।” একই সাথে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও তা দীর্ঘ মেয়াদে স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে এখনও যথেষ্ট নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দর সমন্বয় এবং প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় উসকে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে নীতি শিথিল করা হলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামায় সার্বিক সূচকে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের ওপর পণ্য ও সেবামূল্যের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। এছাড়া জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন ও জ্বালানির ব্যয়বৃদ্ধি উৎপাদন এবং পরিবহনে বাড়তি ব্যয় তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও শ্লথগতির মধ্যে রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হলেও তৃতীয় প্রান্তিকে তা ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার ধারণা রয়েছে, যেখানে শিল্প খাতে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকোচন দেখা গেছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি ঋণের দুর্বল গতি অর্থনৈতিক স্থবিরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও চলতি অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা উন্নতির আভাস মিলেছে।
অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকাসহ সর্বমোট ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্যাকেজ ও বিভিন্ন পুনরর্থায়ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট কাটাতে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত আগস্টে নীতি সুদহার কিছুটা কমানোর ফলে আন্তঃব্যাংক লেনদেন ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের ইল্ডে স্বস্তি ফিরলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে রয়েছে। গত আগস্টে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকলেও নতুন অর্থবছরের শুরুতে আর্থিক হিসাবের দুর্বলতায় সামগ্রিক ভারসাম্যে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অবশ্য প্রবাসী আয়ে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশের পূর্বাভাস দিলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের পূর্বানুমান কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও আর্থিক খাতের নানা চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
চীনা বাজারে ক্রমাগত মন্দা ও দুর্বল বিক্রির প্রেক্ষাপটে মুনাফা হ্রাস পাওয়ার পর এবার স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মুনাফার মার্জিন পুনরুদ্ধারে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছে জার্মানির বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ। বুধবার বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিনিয়োগকারীদের জন্য আয়োজিত দুই দিনব্যাপী কৌশলগত সম্মেলনে এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার কথা রয়েছে। বার্নস্টেইনের বিশ্লেষকরা বিএমডব্লিউ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, প্রতিষ্ঠানটির অটোমোটিভ বিভাগ ২০২৮ সালের মধ্যে মুনাফার মধ্যমেয়াদি মার্জিন ৩ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে এই মার্জিন ৮ থেকে ১০ শতাংশে ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
গত জুন মাসে চীনা বাজারে দুর্বল পারফরম্যান্সের জেরে অপ্রত্যাশিত মুনাফা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেয় বিএমডব্লিউ, যা তিন বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ঘটল। চীনে বিক্রি হ্রাস এবং মার্কিন শুল্কের কারণে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এই ধাক্কা সামলাতে জার্মানির কারখানাগুলো থেকে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে মিউনিখভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি, যা ভক্সওয়াগন ও মার্সিডিজ-বেঞ্জের নেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতির অনুরূপ। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। তবে বুধবারের লেনদেনে তাদের শেয়ার দর ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক স্টিফেন রেইটম্যান বলেন, “বিএমডব্লিউ বুঝতে পেরেছে যে এর সমাধান কেবল খরচ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবনী পণ্যের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকেও জোর দিচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বিদ্যুচ্চালিত আইএক্সথ্রি এসইউভি সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্মের ‘নয়ে ক্লাসে’ মডেলের গাড়িগুলো তাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
বিএমডব্লিউর বর্তমান এক্স৭ মডেলের চেয়েও উন্নত একটি বিলাসবহুল এসইউভি বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে এম ও আলপিনা সিরিজের গাড়িগুলোর পরিসর আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি জার্মানিতে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ৩ সিরিজ স্পোর্টস সেডান উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রায় ২০০ কোটি ইউরো বা ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বার্নস্টেইনের তথ্যমতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিএমডব্লিউর কারখানাগুলো শতভাগ সক্ষমতায় চললেও চীনের কারখানাই হচ্ছে “উৎপাদন সমন্বয় এবং সক্ষমতার নমনীয়তা প্রয়োজন এমন প্রধান ক্ষেত্র।”
টানা চার কার্যদিবস ধরে চলা ধারাবাহিক দরপতনের অবসান ঘটিয়ে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবগুলো প্রধান মূল্যসূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এদিন লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইতে ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে, যা দিনের শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯০টির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের দর। ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বাছাই করা ৩০ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ১৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১০৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০২ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে।
কোম্পানিগুলোর শ্রেণিভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো কোম্পানির মধ্যে ৯৫টির শেয়ারদর বাড়লেও কমেছে ৬৯টির এবং ৩১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। মাঝারি মানের ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ২২টির দাম কমেছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ৭টির দর। এছাড়া লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ ‘জেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫০টির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ৩৯টির পতন হয়েছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৯টির দর। লেনদেন হওয়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ৬টির দাম বাড়লেও ১৩টির কমেছে এবং ১৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
মূল্যসূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের গতিও বেড়েছে। এদিন বাজারটিতে মোট ৬৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ কেনাবেচা সম্পন্ন হয়, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের চেয়ে ৬৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বেশি। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে শীর্ষে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় এর পরেই রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, বেক্সিমকো ফার্মা, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সায়হাম টেক্সটাইল, ব্র্যাক ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, নিটল ইন্স্যুরেন্স, ইভিন্স টেক্সটাইল এবং এনভয় টেক্সটাইল।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বেশিরভাগ সিকিউরিটিজের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৭টির শেয়ারদর বাড়ার বিপরীতে ৭৪টির দাম কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনশেষে বাজারটিতে মোট ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের ২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগামী ৪ অক্টোবর দেশব্যাপী ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিনিয়োগ সংক্রান্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অধিকার সুরক্ষার বার্তা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে এ বিশেষ কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) কনভেনশন অডিটোরিয়ামে (লেভেল-১) এই উদ্বোধনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। উদ্বোধনী এ আয়োজনে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারবৃন্দ ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) শীর্ষ প্রতিনিধিগণসহ দেশের পুঁজিবাজারের প্রায় এক হাজার অংশীজন সমবেত হবেন।
বিএসইসির উদ্যোগে এবারের আন্তর্জাতিক এই সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স, ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ‘ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স, ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে এই আলোচনায় আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধ, অনলাইন স্ক্যাম থেকে সাবধানতা অবলম্বন এবং বিনিয়োগকারীদের টেকসই সুরক্ষার নানা দিক নিয়ে বিশদ মতবিনিময় করা হবে।
বাংলাদেশের ব্যক্তিগত পরিবহন খাতে বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের (ইভি) ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আকর্ষণীয় বিক্রয়োত্তর সেবার ওপর ভর করে দেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিলাসবহুল ব্র্যান্ড যেমন টেসলা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ এবং অডির উপস্থিতি থাকলেও সামগ্রিক চার চাকার ইভি বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ শেয়ারই এখন বিওয়াইডি, ডিপাল ও এমজির মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর দখলে। বিশেষ করে দেশে বিক্রিত প্রায় তিন হাজার ব্যক্তিগত ইভির মধ্যে এককভাবে চীনা ব্র্যান্ড বিওয়াইডি দেড় হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বিক্রি ২০০ থেকে ২৫০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আমেরিকা, ইউরোপ বা জাপানি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক গাড়ির আকাশচুম্বী দামের বিপরীতে চীনা ইভিগুলো ৩৫ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে পাওয়া যাওয়ায় দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের প্রধান পছন্দে পরিণত হয়েছে। এছাড়া সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে প্রায় ১৪ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে বিদ্যুৎচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারের পরিচালন ব্যয় নেমে এসেছে মাত্র দেড় থেকে সাড়ে তিন টাকায়। দুই চাকার স্কুটারের বাজারে এই সাশ্রয়ী চিত্র আরও স্পষ্ট; যেখানে মাত্র ৯ থেকে ১০ টাকার বিদ্যুতে একটি ই-স্কুটার ৭০ থেকে ৭২ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ চলতে পারে। ফলে স্কুটারের সম্পূর্ণ বাজারই বর্তমানে চীন আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তবে আমদানির পাশাপাশি দেশীয়ভাবে সংযোজন শিল্পও বিকশিত হচ্ছে; আরএফএল গ্রুপের ‘রাইডো’ ব্র্যান্ড স্থানীয় কারখানায় যন্ত্রাংশ সংযোজনের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে ই-স্কুটার বাজারজাত করছে এবং চীনা বিনিয়োগকারীরাও অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেডে পূর্ণাঙ্গ সংযোজন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশে ব্যাটারিচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে যেখানে দেশজুড়ে মাসে মাত্র ৯৬৯টি স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, তা চলতি বছরের এপ্রিলের জ্বালানি সংকটের সময় সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ হাজারে পৌঁছায় এবং সর্বশেষ আগস্টেও মাসিক বিক্রি ৩ হাজার ৪১৪টিতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আনুষ্ঠানিক তথ্যেও এই রূপান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে নিবন্ধিত ৮২৬টিরও বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৪৭৮টি গাড়ি কেবল চলতি বছরেই নিবন্ধিত হয়েছে; যা ২০২১ সালের মাত্র চারটি এবং ২০২৫ সালের ২৩৮টি নিবন্ধনের তুলনায় এক বিশাল উল্লম্ফন।
তবে দেশে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে পর্যাপ্ত গণ-চার্জিং স্টেশনের অভাব। বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি চার্জিং স্টেশন কার্যকর রয়েছে, যার বেশিরভাগই বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত। ফলে দূরপাল্লার যাতায়াতে চার্জিং নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কাটাতে অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি গাড়ির সাথে নিজস্ব হোম চার্জার সরবরাহ করছে এবং মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরগুলোতে নতুন করে অর্ধশতাধিক দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও মোটরে ছয় থেকে আট বছরের দীর্ঘমেয়াদি ওয়ারেন্টি এবং তিন বছরের মধ্যে বাইব্যাক বা পুনরায় ক্রয়ের সুবিধা নিশ্চিত করায় ক্রেতাদের মাঝে প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট যানবাহনের ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎচালিত করার যে নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং বাজেটে শুল্কছাড় দিয়েছে, তার ফলে আগামী দিনগুলোতে ই-বাইক ও সাশ্রয়ী গাড়ির দাম আরও পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট দুই কোটি ২০ লাখ ইভির প্রায় ৭৫ শতাংশই তৈরি করছে চীন এবং দেশটি বছরে রেকর্ড ২৫ লাখ ইভি রপ্তানি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু তৈরি গাড়ি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশে পূর্ণাঙ্গ সংযোজন, ব্যাটারি কারখানা এবং সহায়ক লজিস্টিকস শিল্প গড়ে তুলতে পারলে জ্বালানি সাশ্রয় ও নগরীর বায়ুদূষণ হ্রাসের পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের যাবতীয় ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের সব তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। বিএফআইইউর দায়িত্বশীল এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংকগুলোকে পাঠানো নির্দেশনায় সালমান মুক্তাদিরের নামে পরিচালিত সব ধরনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য, হিসাব খোলার ফরম (এওএফ), গ্রাহক পরিচিতি সংক্রান্ত কেওয়াইসি নথি এবং বিস্তারিত হিসাব বিবরণী বা ব্যাংক স্টেটমেন্টের সফটকপি জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএফআইইউর সরবরাহ করা এক্সেল ফাইলে তাঁর হিসাবগুলোর বিস্তারিত তথ্য, অর্জিত সুদ এবং উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) সংক্রান্ত যাবতীয় বিবরণ পূরণ করে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় এই আর্থিক তথ্য তলব করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পরিপত্রের আলোকে এসব তথ্যের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি ভবনে সালমান মুক্তাদিরের কার্যালয় ও স্টুডিওতে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার পর চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং পরবর্তীতে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান মন্তব্য করেছেন যে, সালমান মুক্তাদিরসহ সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করে সরকার।
ইউরোপের জ্বালানি ও ঋণসংক্রান্ত উদ্বেগের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নীতি সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান চলতি বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে গত ১৪ মাসের মধ্যে ইউরোর বিপরীতে ডলারের সবচেয়ে বড় মাসিক উত্থান হতে চলেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
মঙ্গলবার ইউরোর দর কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৩১২ ডলারে, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন। বুধবার এশিয়ার বাজারে তা সামান্য পরিবর্তন হয়ে ১ দশমিক ১৩৩৭ ডলারে লেনদেন হয় এবং জাপানি মুদ্রা ইয়েনের বিপরীতেও তা প্রায় ১৭৮ পয়েন্টে সমর্থন খুঁজছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোর বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা টানা তৃতীয় প্রান্তিক ধরে ডলারকে মুনাফার ধারায় রেখেছে।
ডলারের শক্তিমত্তার প্রভাবে অস্ট্রেলীয় ডলারের দর আগস্টের শুরুর পর প্রথমবারের মতো ৭০ সেন্টের নিচে নেমে গেছে। দেশটির মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য কম হওয়ায় মুদ্রাটির মান নয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬৯৫৯ ডলারে নেমে আসে। বৈদেশিক মুদ্রা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা মার্কেটস-এর প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ট ডনেলি বলেন, “মার্কিন অর্থনীতি অত্যন্ত চাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে, বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও ফ্রান্সের রাজনীতি ইউরোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপে গ্যাসের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা, যার কারণে জার্মানির সঙ্গে ফরাসি বন্ডের মুনাফার ব্যবধান বেড়ে ১১৫ বেসিস পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা ইউরোর সম্ভাব্য পতন থেকে রক্ষা পেতে আগাম সুরক্ষা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে ডলারের এই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখতে আগামীতে আরও জোরালো মার্কিন তথ্যের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুইস ফ্রাঁ-এর বিপরীতে ডলার প্রায় ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৮৩৫৮ ফ্রাঁতে উঠেছে। তবে জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ মুদ্রা হস্তক্ষেপ এবং ব্যাংক অব জাপানের নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে ডলারের বিপরীতে ইয়েন কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দর ২ শতাংশ এবং পুরো তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এশিয়ার বাজারে ১৫৬ দশমিক ৩৮ ইয়েনে লেনদেন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সুদহার নির্ধারণের বিষয়ে ধারণা পেতে বাজার বর্তমানে দেশটির কোর পিসিই মূল্যস্ফীতি সূচক এবং আসন্ন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের ওপর নজর রাখছে। তবে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে “জরুরি কোনো প্রয়োজন নেই” বলে মন্তব্য করার পর নীতি সুদহার বৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা ম্লান হয়েছে। এর প্রভাবে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা ৩ দশমিক ৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে এবং আগামী মাসে সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৭১ শতাংশ থেকে কমে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে নিউজিল্যান্ড ডলারের দর শূন্য দশমিক ৫৬৪৬ ডলারে নেমে গেছে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড তিন মাসের সর্বনিম্নে নেমে ১ দশমিক ৩২৩৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে চীনের জাতীয় ছুটির প্রাক্কালে শেষ কার্যদিবসে ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা ইউয়ান টানা সপ্তম প্রান্তিকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার পথে রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ধাতু ভোক্তা দেশ চীনে সেপ্টেম্বর মাসে কারখানা খাতের কার্যক্রম পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার তথ্যে বুধবার বিশ্ববাজারে তামার দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দেশটিতে সপ্তাহব্যাপী আসন্ন জাতীয় ছুটির কারণে সামগ্রিক লেনদেনের গতি কিছুটা শ্লথ ছিল।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি তামার বেঞ্চমার্ক মূল্য জিএমটি ০৩টা ৩০ মিনিট নাগাদ শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন ১৪ হাজার ৪৭১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জে (এসএইচএফই) সর্বাধিক লেনদেন হওয়া নভেম্বর মেয়াদের তামার দর শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩০ ইউয়ান বা ১৬ হাজার ৩৪০ দশমিক ২০ ডলারে পৌঁছায়। তবে দীর্ঘ ছুটির কারণে সংক্ষিপ্ত হওয়া চলতি সপ্তাহে পণ্যটির সার্বিক দর শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ কমে সমাপ্তির পথে রয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) আগস্টের ৪৯ দশমিক ৮ পয়েন্ট থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৫০ দশমিক ১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে রেটিংডগ-এর একটি বেসরকারি জরিপে কারখানা কার্যক্রমে আরও দ্রুতগতির সম্প্রসারণ পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে পিএমআই সূচক আগের ৫১ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ১ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
চীনের জাতীয় দিবসের ছুটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে এসএইচএফই-এর কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং আগামী ৮ অক্টোবর তা পুনরায় চালু হবে। দীর্ঘ ছুটির মুখে পড়ে ধাতুটির সরাসরি বা ভৌত চাহিদাও কিছুটা কমেছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রিমিয়াম আগের দিনের শীর্ষ অবস্থান থেকে কমে প্রতি টনে ১ হাজার ৫০ ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। তবে আমদানিকৃত কাঁচামালের প্রতি চীনা শিল্পখাতের চাহিদার নির্দেশক ইয়াংশান কপার প্রিমিয়াম সামান্য বেড়ে টনপ্রতি ১১৯ ডলার হয়েছে।
মার্কিন বন্ডের ক্রমবর্ধমান মুনাফার ওপর ভর করে ডলারের মান শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, যা মাসভিত্তিক হিসাবে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধির পথে রয়েছে। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য ডলারে নির্ধারিত ধাতুর ক্রয়মূল্য বেড়ে যায়। পাশাপাশি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দর ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজার চাঙ্গা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক পুনরায় নীতি সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে বজায় রেখেছে।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া অন্যান্য ধাতুর মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ এবং নিকেলের দর শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে জিংকের দর শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ ও টিনের দর শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সিসার দাম অপরিবর্তিত ছিল। অন্যদিকে সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জে অ্যালুমিনিয়ামের দর শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ, জিংক শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, সিসা শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ এবং নিকেলের দর ১ দশমিক ০০ শতাংশ কমেছে, তবে টিনের দাম ছিল অপরিবর্তিত।