রাজধানীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযানে গিয়ে বারবার সংঘর্ষের মুখে পড়ছে পুলিশ ও প্রশাসন। কখনো হুমকি, কখনো ইটপাটকেল নিক্ষেপ, আবার কখনো সরকারি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ—উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সহিংসতার চিত্র যেন ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে। সর্বশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুর-১০ এলাকায় অভিযানের সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে পুলিশের গাড়ি ও উচ্ছেদে ব্যবহৃত যন্ত্র। আহত হয়েছেন সংবাদকর্মীরাও।
গত ছয় মাসে রাজধানীর অন্তত পাঁচটি ঘটনায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের বাধা কিংবা হামলার মুখে পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। এসব ঘটনা শুধু সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিষয় নয়; একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে, কেন বারবার সংঘাতে গড়াচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান? সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা রয়েছে এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা কতটা সক্ষম—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মিরপুরে আগুন থেকে সংঘর্ষ: বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত সড়কে অবৈধ দোকানপাট ও হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও পুলিশ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোপ মার্কেটের সামনে অভিযান চলার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দোকান ভাঙার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে। এতে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে থাকা ছয় থেকে সাতটি দোকান পুড়ে যায়। আগুনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হকার ও ব্যবসায়ীদের একাংশের সঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
হকারদের একাংশ লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের একটি পিকআপ ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি এক্সকাভেটর। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।
সংঘর্ষের মধ্যে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে আহত হন সমকালের আলোকচিত্রী মাহবুব হোসেন নবীন। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে বেলা আড়াইটার দিকে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ছয় মাসে পাঁচ ঘটনা: মিরপুরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, গেন্ডারিয়া ও জুরাইনে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশকে হুমকি, হামলা ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
৭ মার্চ যাত্রাবাড়ীতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের আপত্তিকর মন্তব্য ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তাদের আটক করে আদালতে হাজির করা হলে বিশেষ মহানগর হাকিম আদালত দুজনকে পাঁচ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
২০ মে পল্লবীর বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধারে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার মুখে পড়েন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় অন্তত সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের জন্য রিকুইজিশন করা চারটি বাসের কাচও ভাঙচুর করা হয়।
৮ জুন গেন্ডারিয়ায় পুরান ঢাকার ডিআইটি পুকুরপাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। এতে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম ও তাঁর দেহরক্ষী কনস্টেবল আহত হন। স্থানীয় একটি কাউন্সিলরের কার্যালয় উচ্ছেদ না করেই অভিযান শেষ করাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।
২৬ জুলাই জুরাইনে সড়ক দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে কদমতলী থানার একটি পুলিশ দল। এ সময় দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করা হয়। ঘটনায় দুজনকে আটক করে পুলিশ।
সর্বশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের গাড়ি ও এক্সকাভেটর ভাঙচুরের পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
ঘটনাগুলোর স্থান, পরিস্থিতি ও সংঘাতের কারণ এক নয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বাধা কিংবা হামলার ঘটনা নগর ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে।
সমন্বয়ের ঘাটতি, নাকি পরিকল্পিত বাধা: মিরপুরের সংঘর্ষের পর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ করেননি। ফলে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল।
অন্যদিকে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রাখা এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিভিন্ন অভিযানে পুলিশ আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করে। কিছু গোষ্ঠী উচ্ছেদের সময় পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ পেশাদারত্বের সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের সময় মামলা বা আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। কখন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, কখন বলপ্রয়োগ প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য। তবে এই দাবির ব্যাপকতা ও মাঠপর্যায়ে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন।
উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ: রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান নতুন নয়। কিন্তু বছরের পর বছর একই জায়গায় উচ্ছেদ, আবার দখল—এই চক্র ভাঙাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মিরপুরের এবারের অভিযান কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে উচ্ছেদের পর নজরদারি কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
ফুটপাতের ওপর ছোট ব্যবসা ও হকারির সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। অন্যদিকে ফুটপাত দখল হয়ে গেলে পথচারীদের সড়ক দিয়ে চলতে হয়, বাড়ে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ফলে শুধু উচ্ছেদ নয়, বৈধ বিকল্প ব্যবস্থা, পুনর্বাসন বা নির্ধারিত বাণিজ্যিক স্থান তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানিয়েছেন, দখলমুক্ত জায়গাগুলোকে নাগরিকবান্ধব করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরের ফুট ওভারব্রিজের নিচে উচ্ছেদের পর গাছ লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এবার পরীক্ষা প্রশাসনের: মিরপুরের সংঘর্ষের পর ডিএনসিসির সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অন্যদিকে সংঘাত এড়িয়ে সেই দখলমুক্ত অবস্থা ধরে রাখা।
প্রশাসকের কঠোর ঘোষণা, অভিযান থামবে না। তবে একটি উচ্ছেদ অভিযানের সাফল্য শুধু কতটি দোকান সরানো হলো, তার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কতদিন ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিরপুরের আগুন, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ তাই শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, হকারদের জীবিকা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের জটিলতাকেও সামনে এনেছে। এখন বড় প্রশ্ন, দখলমুক্ত করার পর ফুটপাত কতটা স্থায়ীভাবে নগরবাসীর চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা যায়।
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অভিযান চলাকালে ক্ষুব্ধ হকার ও ব্যবসায়ীরা সিটি কর্পোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি খননযন্ত্র (ভেকু) ও পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালান। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে এ ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত করেছেন মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার মো. শহিদুল ইসলাম।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুটপাত উচ্ছেদ কার্যক্রম চলাকালে একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আকস্মিক আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হকার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সংগঠিত হয়ে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেন এবং পুলিশের গাড়িসহ উচ্ছেদে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে ভাঙচুর চালান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অতিরিক্ত বিশৃঙ্খলা এড়াতে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
রাজধানীর আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযানে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় ধারালো অস্ত্রসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, অভিযানে আসামিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে দুই রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়া হয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত আড়াইটায় আদাবর থানাধীন নবোদয় হাউজিং কাঁচাবাজারসংলগ্ন মেলার মাঠের পেছনে খালপাড় এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন—রাজিব হাওলাদার (৩০), সাগর ওরফে ছোট বিগার (২৪), শাকিব (২৩) ও রাশেদ (২৪)। তাদের মধ্যে রাজিব ও সাগরের পায়ে গুলি লাগে। আহত দুজনকে চিকিৎসার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এডিসি জুয়েল রানা জানান, মঙ্গলবার রাত ২টা ৫ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, মামলার কয়েকজন আসামি নবোদয় হাউজিং কাঁচাবাজারের পেছনে খালপাড় এলাকায় অবস্থান করছেন। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৭-৮ জনকে দেখতে পায়।
পুলিশের দাবি, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলে কয়েকজন ধারালো চাপাতি নিয়ে পুলিশের দিকে এগিয়ে এসে হামলার চেষ্টা করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে শটগান দিয়ে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে রাজিব ও সাগর গুলিবিদ্ধ হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও বাকিরা পালিয়ে যায়।
অভিযানকালে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্টিলের ধারালো চাপাতি ও সামুরাই উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গ্রেপ্তার সাগর ওরফে ছোট বিগারের বিরুদ্ধে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানায় মোট আটটি মামলা রয়েছে। রাজিব হাওলাদার মোহাম্মদপুরের আলোচিত বাবু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি বলেও পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেপ্তার শাকিব ও রাশেদের বিরুদ্ধেও পাঁচটি করে মামলা রয়েছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মামলায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের পেছনে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ ও বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় নাশকতার উদ্দেশ্যে ককটেল ও পেট্রোল বোমা মজুদ করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিস্ফোরক শনাক্তের পর বোম ডিসপোজাল টিম তা নিষ্ক্রিয় করেছে বলে জানিয়েছেন এসআরবি-২ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে রায়েরবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
নয়মুল হাসান বলেন, জুলাই জাদুঘরের পেছনে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ এবং বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের এলাকায় দুষ্কৃতকারীরা নাশকতার উদ্দেশ্যে এসব বিস্ফোরক মজুদ করে থাকতে পারে। এসআরবির গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বিস্ফোরক মজুদের স্থান শনাক্ত করা হয়। পরে বোম ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ককটেল ও পেট্রোল বোমাগুলো শনাক্ত করে।
এসআরবি-২ অধিনায়ক বলেন, কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা থাকলে তা নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিস্ফোরকগুলো কারা এনে সেখানে রেখেছে, তা শনাক্তে কাজ চলছে বলে জানান নয়মুল হাসান। এরই মধ্যে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিস্ফোরক মজুদের পেছনে কারা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এর আগে গত বছর একই এলাকার কাছাকাছি একটি স্থান থেকে পেট্রোল বোমা ও ককটেল উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছিল। নিরাপত্তার দিক থেকে এলাকাটি একটি চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে যে কেউ সহজে আসা-যাওয়া করতে পারে। এই সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা জায়গাগুলো বেছে নিতে পারে।
এসব স্থান নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এসআরবি-২ অধিনায়ক জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে রাতে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা হবে না। ককটেলগুলো এসআরবি-২-এর সদর দপ্তরে নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দিনের আলোয় সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা হবে।
বিস্ফোরকগুলো কে বা কারা মজুদ করেছিল এবং সেগুলো কোনো নাশকতার পরিকল্পনার অংশ কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষ কীভাবে সেবা পাচ্ছেন, সেবা নিতে গিয়ে কোনো ভোগান্তি বা অনিয়মের মুখোমুখি হচ্ছেন কি না, তা সরেজমিনে জানতে সাধারণ সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে ভূমি অফিসে গেলেন ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বোরকা পরে পরিচয় গোপন রেখে উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান তিনি। সেখানে সাধারণ নাগরিকের মতো ভূমিসেবা নেওয়ার পাশাপাশি সেবা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক। তাদের কাছে সরাসরি জানতে চান, ভূমিসেবা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের হয়রানি, ভোগান্তি, অতিরিক্ত অর্থ দাবি কিংবা অন্য কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কি না।
এ সময় ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম, সেবার পরিবেশ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণও পর্যবেক্ষণ করেন ডিসি ফরিদা খানম। সাধারণ সেবাগ্রহীতার দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমি অফিসের সেবার বাস্তব চিত্র বোঝার চেষ্টা করেন তিনি।
পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষকে দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত ভূমিসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক।
ফরিদা খানম বলেন, ‘আমি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি অফিসগুলো পরিদর্শন করি। তবে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের সময় অনেক ক্ষেত্রে সেবার প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি জানা সম্ভব হয় না। সাধারণ মানুষ ভূমিসেবা নিতে গিয়ে বাস্তবে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটি সরেজমিনে জানতেই আমি সাধারণ সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে এখানে এসেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং সেবাগ্রহীতারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি বা ভোগান্তির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এ ধরনের সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেবার বাস্তব চিত্র জানা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের জন্য ভূমিসেবা আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে ভূমি অফিসগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সেবার প্রকৃত চিত্র জানতে আকস্মিক ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর এলাকায় পরিচালিত নিয়মিত কার্যক্রমে গত চব্বিশ ঘণ্টায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৯৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরিচালিত এই অভিযানে সর্বোচ্চ ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তেজগাঁও বিভাগ এলাকা থেকে।
সোমবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আকতার হোসেন জানান, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে তেজগাঁওয়ে ১০১ জন ছাড়াও মিরপুরে ৯৬, মতিঝিলে ৮৩, ওয়ারীতে ৭৯, উত্তরায় ৩৭, লালবাগ ও গুলশানে ৩৬ জন করে এবং রমনা বিভাগে ২৭ জন রয়েছেন। এর বাইরে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ৩ জন এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ১ জনকে গ্রেপ্তার করে।
তল্লাশি ও অভিযানকালে পুলিশ ১২৫ পিস ইয়াবা, ১০৪ গ্রাম হেরোইন, মাদক বিক্রির নগদ ৪৭ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল এবং একটি ডিজিটাল ওজন পরিমাপক যন্ত্র উদ্ধার করে। একই সঙ্গে ১১টি মুঠোফোন, ৪টি সিমকার্ড, ৩টি ধারালো ছুরি, পরিত্যক্ত অবস্থায় ৫ রাউন্ড গুলির খোসা ও প্রায় ৩৫ লাখ টাকার জাল নোট জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
রাজধানীর আদাবরে একটি আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বাড়িটির দখল ফিরে পাওয়ার দেড় বছর না যেতেই—আবারও সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছেন সেখানে বসবাসকারীরা। গত শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শ্যামলী হাউজিং এলাকার ওই বাড়িতে রামদা, চাপাতি ও পিস্তল নিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন বাড়ির মালিকের স্বজনেরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়ির গেট খুলে সবাইকে বের হয়ে যেতে বলে। গেট না খোলায় তারা বলতে থাকে, ‘টাকা দে, বাসায় থাকিস, টাকা দিবি না? বের হয়।’ এরপর রামদা ও চাপাতি দিয়ে বাড়ির মূল ফটকে কোপাতে শুরু করে। একপর্যায়ে জানালার কাচ ভাঙচুর করে তারা।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ বাড়িটি পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এরপর হামলাকারীরা ক্যামেরা দুটিই নষ্ট করে দেন। ফলে হামলার পুরো সময়ের দৃশ্য সিসিটিভিতে ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
বাড়ির মালিক আমিনুর রহমানের ভাতিজা মনির হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জন লোক এসে কিছুক্ষণ বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করে। পরে চারজন মূল ফটকের সামনে আসে। তাদের দুজনের হাতে চাপাতি, একজনের হাতে রামদা ছিল। ফটকের কিছুটা দূরে পিস্তল হাতে আরেকজন দাঁড়িয়েছিলেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তিই হামলাকারীদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
মনির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গেট না খোলায় হামলাকারীরা প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে ভাঙচুর চালায়। তারা মূল ফটকের সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। ইটের টুকরা ছুঁড়ে দোতলার আরও দুটি জানালার কাচও ভাঙা হয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে না পেরে পরে তারা চলে যায়।
হামলা চলার সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন মনির। তার অভিযোগ, প্রায় তিন ঘণ্টা পর পৌনে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পরে আদাবর থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়।
মনির হোসেনের দাবি, এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তি বাড়িটি দখল করে নিয়েছিলেন। তখন আদাবর থানায় অভিযোগ দিয়েও সমাধান না হওয়ায়, আদালতে মামলা করেন তারা। আদালতের নির্দেশে পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বিষয়টি তদন্ত করে।
মনির জানান, পিবিআই প্রায় চার মাস তদন্তের পর অভিযোগপত্র দেয়। এরপর গত ১২ মার্চ তারা বাড়িটির দখল ফিরে পান।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের নির্দেশে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল হতে মিরপুর ১০ মেট্রোরেল পিলারে সকল প্রকার পোস্টার ও লিফলেট সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
রোববার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ছাত্রদল ও যুবদলের স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন।
স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা রোববার সকাল ১০টা হতে মিরপুর-১০ মেট্রোরেল পিলারের পোস্টার ও লিফলেট অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেন এবং বিকেল নাগাদ শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল এলাকায় এসে অপসারণ কার্যক্রম শেষ হয়।
এ সময় মেট্রোরেলের প্রতিটি পিলার ও আশপাশের এলাকা হতে সকল ধরনের লিফলেট ও পোস্টার অপসারণ করা হয়।
এই অপসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে বলে পথচারীরা জানান।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল এলাকায় সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম উদ্বোধনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মেট্রোরেলের নিচে পিলারের লিফলেট ও পোস্টার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেন।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি নগরীর খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধনে কাজ করছে সরকার। রোববার বিকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন নন্দীপাড়া এলাকার জিরানী খাল পরিদর্শনকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এসব কথা বলেন।
পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, এমপি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি খালের দুই পাড়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রিটেইনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এতে করে পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি অবৈধ দখল রোধ হবে এবং নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত বিনোদন ও চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর পয়ঃবর্জ্য সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে শোধন করে নদীতে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার জন্য গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা একদিনেই দেশকে সিঙ্গাপুর বা অস্ট্রেলিয়া বানিয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। বাস্তবতাকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে চাই। তবে নদী-খাল রক্ষা ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়; ঢাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত, কারিগরি ও সর্বাত্মক প্রশাসনিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
পরিদর্শনকালে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘ডিএসসিসির নতুন যুক্ত হওয়া অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ, ড্রেনেজ ও অবকাঠামোগত সুবিধার জন্য বর্তমান সরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়েছে। তবে একটি সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য আরও বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্য: পরিদর্শনকৃত ৩.৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৪ থেকে ২৫ মিটার প্রস্থের জিরানী খালটি ‘ডিএসসিসির কালুনগর, মান্ডা, জিরানী ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের অধীনে সংস্কার করা হচ্ছে।
৮৯৮.৬১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে (জিওবি ৭০শতাংশ, ডিএসসিসি ৩০শতাংশ) অক্টোবর ২০২২ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএসসিসি। ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ২১.৮৪ শতাংশ। (খালভিত্তিক অগ্রগতি: মান্ডা খাল ৭.৮৩শতাংশ, জিরানী খাল ৫.৬০শতাংশ, কালুনগর খাল ৬.৩৬শতাংশ এবং শ্যামপুর খাল ২.০৫শতাংশ)।
প্রকল্পের প্রধান কাজসমূহ: চার খালের প্রায় ২০.৫৯ কিমি পুনঃখনন ও স্লাজ অপসারণ, সীমানা নির্ধারণ ও স্লোপ প্রটেকশন।
৩২.৫৬ কিমি রিটেইনিং ওয়াল, ৩৮.০৬ কিমি সুরক্ষা বেষ্টনী এবং ৩২.৪৪ কিমি ওয়াকওয়ে নির্মাণ। ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন এবং পরিবেশ দূষণ রোধে ৮টি ইটিপি নির্মাণ। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ১৪৯টি এবং পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৫৯০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকরণ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খালের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ উচ্ছেদের জটিলতা, অচল কালভার্ট অপসারণ, সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় জমির সীমিত প্রাপ্যতাকে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ. কে. এম. শাহাবুদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর মিরপুরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাঁর অভিযোগ, ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও তা ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনে যান আসিফ মাহমুদ। প্রায় ৫০ বছর ধরে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনায় বৃহস্পতিবার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির চারটি ভবনসহ স্থাপনার বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পরিদর্শনের সময় এনসিপির কর্মীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে টাঙানো একটি দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড সরিয়ে দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ মাহমুদ বলেন, রাড্ডার ভেতর থেকে ওষুধ, ইনজেকশন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করা হয়েছে। দরিদ্র শিশুদের জন্য রাখা টিকাও লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তাঁর দাবি, সেখানে এক্সকেভেটর ও ট্রাক আনা হলেও পুলিশ তা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো স্থাপনায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি রয়েছে কি না, তা পুলিশের যাচাই করা উচিত ছিল।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ভাঙচুর শুরু হওয়ার সময় পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়। পরে পরিদর্শনের সময় প্রবেশপথ ও ভেতরে পুলিশ সদস্যদের দেখা গেছে উল্লেখ করে তিনি পুরোনো বাংলা সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘ঘটনা ঘটার পরে পুলিশ এসেছে পরিদর্শন করতে।’
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়িত্ব পালনে পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তারও হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার আরও ছয়জনকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এর আগে চারজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও পৃথক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। হামলার ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। রোববার পরিদর্শনকালে আসিফ মাহমুদ ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত চালু এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এনসিপির পক্ষ থেকে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়েছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় দায়ীদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তুচ্ছ বিরোধের জের ধরে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় সংলগ্ন গ্রিন রোড এলাকায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। এর ফলে সায়েন্সল্যাব ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলেজ ছুটির পর ঢাকা কলেজের একটি যাত্রীবাহী বাস সায়েন্সল্যাব মোড় অতিক্রম করার সময় আইডিয়াল কলেজের কিছু শিক্ষার্থী বাস লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে। এতে বাসের জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করার চেষ্টা চালান।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, তাঁরা ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে কোনো উসকানি ছাড়াই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এতে তাঁদের কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন এবং কয়েকজনের মাথা ফেটে যায়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস জানান, কলেজ ছুটির পর বাস সায়েন্সল্যাব দিয়ে যাওয়ার সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে আইডিয়াল কলেজের কিছু শিক্ষার্থী বাস ভাঙচুরের চেষ্টা করে। এর জের ধরেই দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ঢাকা কলেজের অন্তত তিনজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
অধ্যক্ষ আরও উল্লেখ করেন, সকাল থেকেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কা আঁচ করতে পেরে কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি থানা পুলিশকে সতর্ক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শান্ত রাখতে এবং সংঘর্ষে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে কলেজ থেকে শিক্ষকদের একটি দলকেও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
রাজধানীর মিরপুরে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’-এ হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি থেকে লুট হওয়া মালামালভর্তি দুটি ট্রাক উদ্ধার করেছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শুক্রবার ক্লিনিকের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় হানিফ মিয়া নামের এক ব্যক্তিসহ অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ শনিবার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করে।
ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে প্রায় আড়াই শ মুখোশধারী ব্যক্তি সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। এরপর চিকিৎসা সরঞ্জাম, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, সরকারি টিকা এবং নগদ অর্থ লুট করার পর ভারী খননযন্ত্র (ভেকু) ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে। পরবর্তীতে জায়গাটি জবরদখলের উদ্দেশ্যে হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ চলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এ হামলার নেপথ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ইন্ধন থাকার অভিযোগ উঠলেও তাঁর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং লুটপাটে জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত বেসরকারি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’-এ ভেকু (খননযন্ত্র) দিয়ে হামলা, অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং লুটপাটের ঘটনায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে সেখান থেকে লুট হওয়া চিকিৎসাসামগ্রী ও বিভিন্ন মালামালভর্তি দুটি ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শাহ আলী থানাধীন রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একদল দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও হাতুড়ি নিয়ে সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। হামলাকারীরা শুরুতেই দায়িত্বরত দুই নৈশপ্রহরী আন্দ্রিয় সরকার (৪৩) ও মো. আব্দুল হাইকে (৬৩) মারধর করে দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখে। এরপর তারা হাতুড়ি দিয়ে প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে একটি ভারী ভেকু ঢুকিয়ে বিভিন্ন ভবন ও চিকিৎসাকেন্দ্রে তাণ্ডব চালাতে শুরু করে।
এজাহারের তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের পূর্ব পাশের প্রায় ২৮ ফুট দীর্ঘ একটি সেমিপাকা ঘর ভেকু দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যার আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় তিন লাখ টাকা। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার আরেকটি সেমিপাকা অবকাঠামো ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। ক্লিনিক ইনচার্জ ও চিকিৎসকদের ব্যবহৃত প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ সেমিপাকা কক্ষ এবং আসবাবপত্র ভাঙচুরে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ রেজিস্ট্রেশন শাখায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে আরও ২০ লাখ টাকার এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়।
অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি থেকে দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, দুটি প্রিন্টার, তিনটি রেফ্রিজারেটর, তিনটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি), তিনটি স্টিলের আলমারি এবং বিপুল পরিমাণ জরুরি ওষুধসহ প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ ঘটনায় রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ এ পর্যন্ত নয়জনকে আইনের আওতায় এনেছে এবং লুট হওয়া মালামালভর্তি দুটি ট্রাক জব্দ করেছে।
রাজধানীর ইসিবি চত্বর সংলগ্ন নিউগ্রিনি প্রপার্টিজের একটি ভবনে অবস্থিত জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের নিজস্ব স্টুডিওতে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে স্টুডিওর মূল্যবান প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ জরুরি কাজের সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে হামলায় কর্মরত কোনো কর্মী শারীরিকভাবে আহত হননি।
ঘটনার সময় ঢাকার বাইরে অবস্থান করছিলেন সালমান মুক্তাদির। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিমানে রাজধানীতে ফিরে তিনি স্টুডিও পরিদর্শন করেন এবং ফেসবুক লাইভে এসে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেখানে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি চলমান প্রজেক্টের শুটিং ফুটেজ ও মূল্যবান ডেটা সংরক্ষিত ছিল, যা ধ্বংস বা খোয়া যাওয়ায় বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিও প্রদর্শন করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের স্টুডিও ডিস্ট্রয় হয়ে গেছে।’
চাঁদা দাবির জের এবং ভবন মালিকের সঙ্গে থাকা বিরোধের প্রেক্ষাপটেই এই হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন সালমান। ফেসবুক লাইভে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘ভিডিওটা শুধু খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, উনার জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।’ হামলার মূল কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যারা অ্যাটাক করছে, ওরা হয়তো জানত না যে এটা আমার জায়গা। বাট আমি পড়ছি অ্যাজ আ নরমাল সিটিজেন হিসেবে। ...আমাদের এখানকার যে ল্যান্ডওনার, উনি হয়তো খুব সম্ভবত আওয়ামী লীগ…উনার সাথে চাঁদাবাজি নিয়ে কোনো একটা কিছু হইছে যে-চাঁদা চেয়েছে বা সামথিং...। তো ওদের রিভেঞ্জ থেকে মাঝখানে আমাদের মানুষজন পড়ে গেছে। উনার প্রপার্টি ড্যামেজ করতে গিয়ে আমার প্রপার্টি এখানে মাঝখানে পড়ছে।’
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সহকর্মীদের সাহস জুগিয়ে সালমানকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমরা রিলাক্স। এটা কিছুই না। আমরা এখানেই কাজ করব।’ যেকোনো মূল্যে সৃজনশীল কাজ অব্যাহত রাখার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি থেমে থাকব না। আমি আমার প্যাশন চালিয়ে যাব। দেশ থেকে না হলে দেশের বাইরে থেকে চালিয়ে যাব।’ ভয় না পেয়ে কাজের প্রতি অবিচল থাকার বার্তা দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি এর থেকে বড় কিছু করব।’ দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা স্টুডিওতে এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।