ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনে দলটি কোনো প্রার্থী দেয়নি। এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি–বাকলিয়া) আসনের প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে তিনি আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া জামাতের ১৪ প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নগদ অর্থের পরিমাণে এগিয়ে আছেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদের সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। অন্যদিকে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শাহজাহান চৌধুরীর কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৫২ টাকা। নগদ টাকার দিক থেকে তিনি জামায়াতের চট্টগ্রামের সব প্রার্থীর মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন। সাতকানিয়া–লোহাগাড়া নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনে নির্বাচন করছেন শাহজাহান চৌধুরী।
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের। হলফনামা অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক আয়ের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের জামায়াত প্রার্থী মো. আবু নাছের। তার বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় জামায়াতের প্রার্থীরা তাদের পেশা, আয় ও সম্পদের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেছেন। পেশাগত দিক থেকে প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং চাকরিজীবী। হলফনামা অনুযায়ী, তিনজন প্রার্থী চিকিৎসক, পাঁচজন ব্যবসায়ী, একজন শিক্ষক, দুজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা অধ্যাপক, একজন আইনজীবী এবং একজন চাকরিজীবী হিসেবে পেশা উল্লেখ করেছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৪ জন প্রার্থীর মধ্যে আটজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পাঁচজন স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী এবং একজন এসএসসি পাস।
আয়ের দিক থেকে প্রার্থীদের মধ্যে চিকিৎসকেরা এগিয়ে রয়েছেন। সর্বোচ্চ আয় করা মো. আবু নাছেরের পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন চিকিৎসক এ টি এম রেজাউল করিম। তাঁর বার্ষিক আয় ৩৮ লাখ ২২ হাজার ৫৩৭ টাকা। এরপর রয়েছেন আরেক চিকিৎসক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, যার বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৩০ হাজার ৯৬৭ টাকা।
সবচেয়ে কম আয় দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবে পেশা উল্লেখ করা এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ১০ লাখ টাকার বেশি আয় করেছেন শাহজাহান চৌধুরী, ছাইফুর রহমান এবং মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী। বাকি প্রার্থীদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকার মধ্যে।
নগদ অর্থ ও ব্যাংকে জমা টাকার হিসাবেও প্রার্থীদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। শাহজাহান চৌধুরীর পর সবচেয়ে বেশি নগদ টাকা আছে মো. আবু নাছেরের—৩৭ লাখ ৩২ হাজার ৬২৯ টাকা। সবচেয়ে কম নগদ টাকা রয়েছে মুহাম্মদ আলা উদ্দীনের—৭৭ হাজার ৬২৯ টাকা।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা টাকার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন এ টি এম রেজাউল করিম। তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ৪১ লাখ ৫৫ হাজার ৯০৬ টাকা। নিজের নামে ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক জমা রয়েছে ছাইফুর রহমান, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং মাহমুদুল হাসানের। বিপরীতে ব্যাংকে সবচেয়ে কম জমা রয়েছে মো. আবু নাছেরের—মাত্র ১৯ হাজার ৪৭২ টাকা।
মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং ব্যাংকে জমা অর্থ মিলিয়ে মোট ৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৯ টাকা রয়েছে। তবে তিনি হলফনামায় এগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করেননি।
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের প্রায় ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার পরেই রয়েছেন এ টি এম রেজাউল করিম এবং শাহজাহান চৌধুরী, যাদের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি।
সবচেয়ে কম অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীন। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্য ১০ জন প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদ ১১ লাখ টাকার বেশি।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রেও মোহাম্মদ ফরিদুল আলম শীর্ষে রয়েছেন। তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এরপর কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পদ রয়েছে মো. আবু নাছের এবং এ টি এম রেজাউল করিমের। সবচেয়ে কম স্থাবর সম্পদ শাহজাহান চৌধুরীর—২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
আয়কর বিবরণী অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্পদ দেখিয়েছেন মোহাম্মদ ফরিদুল আলম। তাঁর আয়কর বিবরণীতে উল্লেখিত সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৮০ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৫ টাকা। সবচেয়ে কম সম্পদ দেখিয়েছেন মাহমুদুল হাসান—১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।
প্রার্থীদের স্ত্রীদের সম্পদের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ব্যাংক হিসাবে সবচেয়ে বেশি টাকা রয়েছে এ টি এম রেজাউল করিমের স্ত্রী কোহিনূর নাহার চৌধুরীর—১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। বিপরীতে মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের স্ত্রী সুলতানা বাদশাজাদীর ব্যাংক হিসাবে আছে ৫ হাজার ৭৯৪ টাকা।
অস্থাবর সম্পদের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন সুলতানা বাদশাজাদী। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদে এগিয়ে আছেন কোহিনূর নাহার চৌধুরী। তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮৫ লাখ ৯৮ হাজার ৯৬৫ টাকা। নগদ অর্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি টাকা রয়েছে শাহজাহান চৌধুরীর স্ত্রী জোহরা বেগমের-২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর গয়নার হিসাবেও পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে বেশি গয়নার কথা উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী। তার কাছে ৩০ ভরি সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৯৬ হাজার টাকা। তার স্ত্রী ফাহমিনা কাদেরীর কাছেও ২০ ভরি সোনা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গয়না রয়েছে মো. আবু নাছেরের স্ত্রী শেলী আক্তারের কাছে। তার কাছে ৪০ ভরি সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের স্ত্রী শাকেরা বেগমের কাছে রয়েছে ৩০ ভরি সোনা এবং মুহাম্মদ নুরুল আমিনের স্ত্রী জোবাইদা নাসরিনের কাছে রয়েছে ২০ ভরি সোনা।
চট্টগ্রামের ১৪টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা হলেন—চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে ছাইফুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) মুহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) মুহাম্মদ আলা উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) মো. শাহাজাহান মঞ্জু, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) এ টি এম রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও–বোয়ালখালী) মো. আবু নাছের, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি–বাকলিয়া) এ কে এম ফজলুল হক (মনোনয়ন বাতিল), চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর–ডবলমুরিং) মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) মোহাম্মদ শফিউল আলম, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) মাহমুদুল হাসান, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) শাহজাহান চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
উল্লেখ্য চট্টগ্রামের ১৪ সংসদীয় আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই এমন প্রার্থীর সংখ্যায় রয়েছেন আটজন। চট্টগ্রামের ১৫ আসনে জামায়াতের ১০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। বাকি ৬ প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে মোট ২০৪ মামলার রেকর্ড।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার খরচ বহনের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার ব্যয়ভার বহনে ইসির নেওয়া সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী, বৈষম্যমূলক ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ পরিপন্থী।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সরব উপস্থিতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে, এমন ঠুনকো যুক্তিতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার খরচ বহনে ইসির অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এমন সিদ্ধান্ত যে বৈষম্যমূলক, নির্বাচন কমিশন তা অনুধাবন করতে না পারায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করতে পারলে দেশি পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কেন প্রযোজ্য হবে না?
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে একদিকে সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তরা ভাড়াটে হিসেবে পরিগণিত হওয়ার যেমন ঝুঁকিতে থাকবেন, অন্যদিকে তারা নির্বাচন কমিশনের আতিথেয়তায় স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনকে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কারণ পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও মূল্যায়ন করবে। কমিশনেরই আতিথেয়তায় থেকে তা কতটুকু নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত হয়ে করতে পারবে এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
‘বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন—কোন যুক্তিতে তারা ইসি বা বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে এ ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে চাইবেন? তারা কী নৈতিকতার মানদণ্ড ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব বিবেচনায় এমন আতিথেয়তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন তথা সার্বিকভাবে নির্বাচনের বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ, পক্ষপাতহীন ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে পারবেন?’
তিনি আরও বলেন, ২০০৮ বা তার আগে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করার এই প্রচেষ্টার দরকার হয়নি। অথচ ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন কেন হয়েছিল?
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পতিত সরকারের প্রচেষ্টা কতটুকু সার্থক হয়েছিল, আশা করছি—বর্তমান নির্বাচন কমিশন তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেবে না। একইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে জনমনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, তা বিতর্কিত করার পথ থেকে ইসি সরে আসবে বলেও আমরা বিশ্বাস করি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে নতুন উপাদান হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। এর মাধ্যমে অপপ্রচার, ঘৃণা ছড়ানো হয়; তা বন্ধ করার মতো কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারে নাই। এর অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য এই সরকার কিছু করতে পারছে না। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা’ শীর্ষক ধারাবাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক এক আলোচনা সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী, বারভিডা’র সাবেক সভাপতি আবদুল হক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশের (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংক পিএলসির অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানের সূচনায় জিল্লুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরপরই শুরু করেছি।
অনেকেই প্রশ্ন করেন—আমরা যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করি, সেগুলো কি নীতি নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলে? বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে থিংক ট্যাংকগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না; বরং সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় বৈরী হয়ে ওঠে। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উপস্থিত হলে দেখা যায়, তারা শোনার চেয়ে বলতেই বেশি আগ্রহী হন।
তিনি আরও বলেন, গত এক দশকে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু কেবল কারো হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই দেশ ডিজিটাল হয়ে যায় না। বরং এই ডিজিটালাইজেশনের আড়ালেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে; এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে, যা আমরা ঠেকাতে পারিনি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য, কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আমাদের আস্থা কমে গেছে; ফলে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। অনেক ক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়া থেকে পাওয়া যাচাইহীন তথ্যই মূলধারার মিডিয়ায় প্রচারিত হয়ে যাচ্ছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটালাইজেশন আমাদের সমাজকে অনেক ক্ষেত্রে প্রগতিশীল করেছে, তবে একই সঙ্গে এটি নতুন ধরনের বৈষম্যও সৃষ্টি করেছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হলেও, অন্যদিকে প্রথাগত কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হচ্ছে। আগস্ট মাসের আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ থেকেই বোঝা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় ইন্টারনেট কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল একটি নৈতিক পরাজয়ের প্রতিফলন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, আমরা যতই অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি না কেন, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনাও মূলত ব্যক্তিগত অসচেতনতার ফল। এনবিআর অটোমেশনের কাজ ভিয়েতনামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল, যারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিয়ে চলে গেছে—আমরা কিছুই করতে পারিনি। সুন্দরবনের বাঘকে যেমন ডিজিটাল হতে বলা যায় না, তেমনি মানসিকতা না বদলালে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা থাকে না।
তিনি বলেন, আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস কমিউনিকেশন পড়াই, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের মৌলিক বিষয়ই শিখতে চায় না। সেখানে শুধু ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করে লাভ হবে না। নীতিগতভাবে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি দরকার, যার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। পাশের দেশগুলো থেকে লোকজন সিলিকন ভ্যালিতে শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করছে, অথচ আমরা পারছি না—কেন পারছি না, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যারা জনমনে বিভ্রান্তি ও সংশয় ছড়াচ্ছেন, তাদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আজ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা বা আয়োজন নিয়ে যারা ভিত্তিহীন সন্দেহ ছড়াচ্ছেন, তাদের ওপর সরকারের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের সংশয় প্রকাশের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
প্রেস সচিব সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তিনটি বৃহৎ জনসমাগমের উদাহরণ টেনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির জানাজা, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার মতো ইতিহাসের বিশাল তিনটি ঘটনা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরকারের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়েছে। এই সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোনো অবকাশ নেই এবং এই পরিস্থিতিতে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো অর্থহীন।
নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনগণের অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়ার কথা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। শফিকুল আলম উল্লেখ করেন, এবার অনলাইনের মাধ্যমে রেকর্ড সংখ্যক ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৩ জন নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের ভেতরে থাকা প্রায় ৭ লাখ মানুষ সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন না, কারণ তারা নির্বাচনের দিন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেই এই পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো প্রচারণা চালানো হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি আরও জানান যে, দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রায় ৭০ শতাংশের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সামগ্রিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় একটি উৎসবমুখর ও নিরাপদ নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণ আশাবাদী।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (অব.) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সেলের এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, নির্বাচনের সময় কোনোভাবেই যাতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার না হতে পারে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য এই মুহূর্তে সাড়াসি অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। ইসি সানাউল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই নির্বাচন সফল করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট সকলকে এর কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
মতবিনিময় সভায় লুণ্ঠিত অস্ত্রের হিসাব তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার জানান, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। প্রশাসনের নিরলস প্রচেষ্টায় বড় একটি অংশ উদ্ধার হলেও এখনো ১৫ শতাংশ অস্ত্র এবং ৩০ শতাংশ গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে থাকা নির্বাচনি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে কমিশন। নিখোঁজ এসব অস্ত্র ও গুলি দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। তিনি মনে করেন, নির্বাচনি পরিবেশকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে এই লুণ্ঠিত অস্ত্রের পুরোপুরি উদ্ধার অপরিহার্য।
নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্ত ও শরণার্থী ইস্যু নিয়েও কথা বলেন এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বিশেষভাবে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ভোট চলাকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো কার্যত সিল করে দিতে হবে যাতে কেউ বাইরে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। এছাড়া দেশের স্থল সীমান্ত ও সমুদ্রপথে নজরদারি আরও জোরদার করার কথা উল্লেখ করেন তিনি, যাতে কোনো দুষ্কৃতকারী বা বহিরাগত শক্তি অবৈধ পথে প্রবেশ করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। সামগ্রিকভাবে একটি স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পুলিশ, প্রশাসন ও অন্যান্য বাহিনীকে কঠোর পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান ব্রিগেডিয়ার সানাউল্লাহ। এই সভার মাধ্যমে চট্টগ্রামের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারির এক নতুন কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই নির্বাচনী এলাকায় যদি একাধিক প্রার্থীর নাম হুবহু এক হয়, তবে ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে এবং প্রার্থীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী, একই আসনে একই নামের একাধিক স্বতন্ত্র বা দলীয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ব্যালট পেপার ছাপানো এবং সাধারণ ভোটারদের পক্ষে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে চিহ্নিত করা বেশ জটিল হয়ে পড়ে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এখন থেকে একই নামের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের নামের সঙ্গে বাবা, মা অথবা ক্ষেত্রবিশেষে স্বামীর নাম ব্যবহার করে পার্থক্যের সৃষ্টি করা হবে। এতে করে ব্যালট পেপারে ভোটাররা খুব সহজেই নির্দিষ্ট প্রার্থীকে চিনে নিতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তটি দেশজুড়ে সকল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের পাশাপাশি দেশের সকল জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনাটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৭(২) অনুযায়ী সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নামের তালিকা বর্ণক্রমানুসারে তৈরি করার নিয়ম রয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে নামের মিল থাকলে আইনি কাঠামোর মধ্যেই এই পরিচয় বিভাজন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, প্রয়োজনে বিধি ৯(১) অনুযায়ী বরাদ্দ করা প্রতীকের ক্রমানুসারে নামগুলো পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা বা ফরম-৫ প্রস্তুত করতে হবে। অনেক সময় একই এলাকায় জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নাম এক হওয়ায় প্রার্থীরা একে অপরের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভোট লাভের চেষ্টা করেন, যা সুস্থ নির্বাচনের পথে বাধা। ইসির এই ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনার ফলে ব্যালট পেপার মুদ্রণের সময় কোনো ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না এবং নির্বাচনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজও অনেক সহজতর হবে। মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক ও নির্ভুল নির্বাচন উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন এই ধরনের কারিগরি ও আইনি সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগটি তৃণমূল পর্যায়ে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগকে আরও সহজ ও বিতর্কমুক্ত করবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় গণভোটকে কেন্দ্র করে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই নির্দেশনায় সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কোনো একটি বিশেষ সংসদীয় আসনের সকল প্রিজাইডিং অফিসারকে ঢালাওভাবে অন্য কোনো আসনে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। মূলত নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষা করতেই কমিশন এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে দেশের সকল সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে এই বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল চূড়ান্ত করার সময় প্রথমত সংশ্লিষ্ট উপজেলার জনবলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি কোনো উপজেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে না পাওয়া যায় বা তীব্র সংকট দেখা দেয়, তবেই কেবল পার্শ্ববর্তী বা নিকটবর্তী উপজেলা থেকে জনবল সংগ্রহের সুযোগ থাকবে। তবে এই সুযোগ ব্যবহার করে কোনো আসনের সম্পূর্ণ প্রিজাইডিং অফিসার প্যানেলকে অন্য কোনো নির্বাচনি এলাকায় একযোগে সরিয়ে নেওয়া যাবে না। কমিশন মনে করছে, এমন গণহারে নিয়োগ নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সন্দেহ তৈরি করতে পারে এবং ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৫ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ সংক্রান্ত একটি মূল নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ২৯ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জনবল নিয়োগের বিষয়ে কিছু স্পষ্টীকরণ চেয়ে কমিশনে একটি পত্র পাঠানো হয়। সেই প্রেক্ষিতেই কমিশন বর্তমান এই নতুন ব্যাখ্যা ও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করল। কমিশন আরও জানিয়েছে যে, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করেই চূড়ান্ত প্যানেল তৈরি করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য দেশের সকল রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইসির এই পদক্ষেপটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একটি বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠক শেষে এনসিপির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, যেহেতু জাতীয় পার্টি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, তাই তাঁদের এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের কোনো নৈতিক অধিকার নেই। এনসিপি মনে করে, নির্বাচনের মাধ্যমে এই ধরনের রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসন হওয়া দেশের জন্য শুভকর হবে না।
বৈঠক শেষে আসিফ মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ইতিহাস ও বিগত দিনগুলোতে তাঁদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তাঁরা কমিশনকে বিস্তারিত অবহিত করেছেন। তাঁরা কমিশনকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন যে, জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী কোনো পক্ষকে নির্বাচনে দেখতে চায় না ছাত্র-জনতা। আসিফ মাহমুদের মতে, যারা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করেছে, তাঁদেরকে পুনরায় রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া মানেই হলো শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি জানান যে, কমিশন তাঁদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুনেছে এবং আশ্বস্ত করেছে যে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে বিধিবদ্ধভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে মোট ২২৪ জন প্রার্থী তাঁদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন আইনি ও দাপ্তরিক অসংগতির কারণে ৫৭ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। বর্তমানে দলটির ১৬৭ জন প্রার্থী বৈধ হিসেবে নির্বাচনি মাঠে টিকে আছেন। এমতাবস্থায় এনসিপির পক্ষ থেকে পুরো দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার এই দাবি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষিতে আইনি কোনো পথে হাঁটে কি না।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলার ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কার অবকাশ নেই। তিনি তথ্য দেন যে, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে প্রায় ২০০টি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা জননিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি বড় সাফল্য। সানাউল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন যে, নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ়তার নীতিতে অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পর্যালোচনা করার কথা জানান এই কমিশনার। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জোনগুলোর নিরাপত্তা-সংবেদনশীল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে ইতিবাচক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে এবং দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের হারও বেশ কম। কমিশন চায় শেষ পর্যন্ত এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক এবং একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটুক। তবে কোনো পক্ষ যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে, তবে কমিশন তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
নির্বাচনি তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান ইসি সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সঠিক সময়ে জনগণের সামনে তুলে ধরাই এখন সাংবাদিকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সমাজে অপতথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়া রোধে গণমাধ্যমকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করে দেন যে, কেবল অপতথ্য ছড়ানোই নয় বরং যাচাই না করে ভিত্তিহীন সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করাও আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষপাতিত্বের কোনো অভিযোগ থাকলে তা সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে নির্বাচনি ইনকোয়ারি কমিটি বা ইসির কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন এবং জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিয়াসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার এক বিশেষ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আজ বিকেল ৩টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন কমিশন ভবনে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপির এই প্রতিনিধিদলে আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি আরও তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তাঁরা হলেন দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব ফয়সাল মাহমুদ শান্ত, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাকিল আহমাদ এবং নির্বাচনী মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান মাহাবুব আলম। মঙ্গলবার দুপুরে দলটির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও বৈঠকের সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি জানানো হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে যে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রচার-প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা এবং নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে এনসিপির নেতারা সিইসির সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে একটি নবগঠিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বৈঠক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে মনোনয়ন সংক্রান্ত আপিল কার্যক্রম এবং মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে এনসিপির প্রতিনিধিদল তাঁদের সুচিন্তিত মতামত ও পর্যবেক্ষণ কমিশনের সামনে তুলে ধরতে পারেন। বিকেল ৩টার এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ফলাফলের দিকে এখন রাজনৈতিক মহলের বিশেষ নজর রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের পক্ষ থেকেও বৈঠকটি সফল করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় গণভোটের স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই বিশাল নির্বাচনি যজ্ঞ সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বের ২৬টি দেশ এবং সাতটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই আমন্ত্রণের মাধ্যমে মোট ৮৩ জন বিদেশি প্রতিনিধিকে বাংলাদেশে আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপটি মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আমন্ত্রিত দেশগুলোর তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া এবং তুরস্ক। এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়াকেও নির্বাচন দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সার্ক, কমনওয়েলথ, ওআইসি, অ্যানফ্রেল, এ-ওয়েব, আইআরআই এবং এনডিআই-এর প্রতিনিধিরা পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, যাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাদের আগামী ১৭ জানুয়ারির মধ্যে কমিশনকে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশি প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তি বা সংস্থাগুলোকে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ইসির কাছে আবেদন জমা দিতে হবে। আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ আতিথেয়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিমান ভাড়া ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সকল খরচ কমিশন বহন করবে। অতিথিদের জন্য রাজধানীর অভিজাত পাঁচ তারকা হোটেলে আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা এবং তথ্য সরবরাহের জন্য বিশেষ তথ্যকেন্দ্র বা মিডিয়া সেল স্থাপন করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের তফশিল অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সরব উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পর্যবেক্ষকদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় সকল দাপ্তরিক সহযোগিতা এবং মাঠ পর্যায়ে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনের সুব্যবস্থা রাখা হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলের এই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে ইসি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। বর্তমানে আমন্ত্রিত দেশগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ইসি সচিবালয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের লক্ষ্যে ডিজিটাল নিবন্ধনের নির্ধারিত সময়সীমা সোমবার দিবাগত রাত ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে সর্বমোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য সফলভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য গত ১৯ নভেম্বর থেকে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছিল। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা, যা মূলত প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার একটি সফল প্রচেষ্টা।
নিবন্ধিত ভোটারদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তর থেকে মোট ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন নাগরিক এই বিশেষ সুযোগ গ্রহণের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে সরকারি চাকুরিজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন এবং আনসার ও ভিডিপির ১০ হাজার ১০ জন সদস্য নিবন্ধিত হয়েছেন। একটি অনন্য মানবিক দিক হিসেবে এবার দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ৬ হাজার ২৮৩ জন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদেরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে নির্বাচন কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের মধ্যেও পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্বের ১২৩টি দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা এই অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচনি তফশিল অনুযায়ী, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হবে। প্রতীক পাওয়ার পর দিন অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি থেকেই নিবন্ধিত ভোটাররা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে স্ব-স্ব আসনের প্রার্থীর নাম ও প্রতীক দেখে ‘টিক’ চিহ্ন দিয়ে তাঁদের ভোট প্রদান করতে পারবেন এবং পরদিন থেকেই ফিরতি ডাক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার হিসেবে ১ হাজার ২৩৪ জন তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কমিশন এখন পরবর্তী ধাপের কারিগরি প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই পরবর্তী আপিল কার্যক্রমের প্রথম দিনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনের নির্দিষ্ট দশটি বুথে প্রার্থীরা তাঁদের এই আপিল দাখিল করেন। ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ৪২টি আবেদনের মধ্যে ৪১টিই জমা পড়েছে মূলত রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়া প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে। অন্যদিকে, কুমিল্লা অঞ্চল থেকে বৈধ ঘোষিত একজন প্রার্থীর মনোনয়ন গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটিমাত্র আপিল আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এই আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়ন সংক্রান্ত আইনি অসঙ্গতি দূর করার শেষ সুযোগ পাচ্ছেন।
অঞ্চলভিত্তিক আবেদনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা অঞ্চল থেকে সর্বোচ্চ ১৫টি আপিল জমা পড়েছে যা প্রথম দিনের মোট আবেদনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া ফরিদপুর অঞ্চল থেকে সাতটি, রাজশাহী ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে পাঁচটি করে এবং খুলনা ও রংপুর অঞ্চল থেকে তিনটি করে আপিল আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে দুইটি এবং ময়মনসিংহ ও বরিশাল অঞ্চল থেকে একটি করে আবেদন প্রথম দিনে ইসির দপ্তরে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ইসির জারি করা বিশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ কোনো প্রার্থী নিজে অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ মেমোরেন্ডাম আকারে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ এই আপিল দায়ের করার সুযোগ পাচ্ছেন। আপিল আবেদনের ক্ষেত্রে মূল কাগজপত্রের এক সেটের পাশাপাশি ছয় সেট ছায়ালিপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ৯ জানুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রতিদিন এই আপিল গ্রহণ কার্যক্রম চলমান থাকবে। পরবর্তীতে ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ফুল কমিশন এই আবেদনগুলোর ওপর ধারাবাহিক গণশুনানি গ্রহণ করবেন। শুনানির জন্য ইতিমধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট তফশিল নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে পর্যায়ক্রমে ৭০টি করে আপিলের বিষয়বস্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিষ্পত্তি করা হবে। আগামী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে সকল আপিল নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমেই মূলত নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রতিযোগীদের নাম ও প্রার্থিতা নির্ধারিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই স্বচ্ছ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর এখন বাদ পড়া কয়েকশ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ভর করছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে সারাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। এর বিপরীতে ১৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ২.৬ শতাংশ ও অন্যান্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির জনসমর্থন ১.৪ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ০.১ শতাংশ।
এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)-এর উদ্যোগে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত জাতীয় জনমত জরিপে এমন ফলাফল বেরিয়ে এসেছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (কেআইবি) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
জাতীয় জনমত জরিপটি সারাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে মোট ২০ হাজার ৪৯৫ জনের মতামত নিয়ে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায় যে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৫ হাজার ৩৮৪ জন পুরুষ, যা মোট সংখ্যার ৭৫% এবং ৫ হাজার ১১১ জন নারী, যা মোট সংখ্যার ২৫%।
অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট- এরিউপদেষ্টা ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেননুর এবং জরিপের ফলাফল প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন ইএএসডি- এর প্রধান নির্বাহী ডা. শামীম হায়দার তালুকদার।
সংবাদ সম্মেলনে প্যানেললিস্ট হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ এবং ইউএনডিপির সাবেক কর্মকর্তা মীর নাদিয়া নিভিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর এবং জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক রিপোর্টিং বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ। অনুষ্ঠানটির আয়োজন মিডিয়া ল্যাব র্যাডিয়েন্ট।
জরিপে লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি, যেখানে ৭১% নারী ভোটার বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ১৮-৩০ বছর বয়সের তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল মোট ২৭% এবং ৩১-৫০ বছর বয়সি অংশগ্রহণকারীর হার ৫০%, যেখানে ৩১-৪০ বছর বয়সি ২৭% এবং ৪১-৫০ বছর বয়সি ২৩%। নতুন প্রজন্মের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তরুণ সমাজ বর্তমানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
জরিপে পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৩৪% উত্তরদাতা ছিলেন ব্যবসায়ী; এদের মধ্যে ৪২% পুরুষ এবং ৯.৪% নারী। পাশাপাশি, কৃষি ও গ্রামীণ শ্রমজীবী খাতে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ১৫%, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ২১% এবং নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ০.১%। অন্যদিকে, গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ২৪%; এ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ সর্বাধিক ৭২%, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৭.৯%।
জরিপের আঞ্চলিক বিশ্লেষণে বিএনপির প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন পাওয়া গেছে যথাক্রমে চট্টগ্রামে ও রাজশাহীতে ৭৪%। তবে বরিশাল ও খুলনায় জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে দলটির সমর্থন যথাক্রমে ২৯% এবং ২৫%। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রংপুরে জাতীয় পার্টি ৫.২% ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা বর্তমানে অত্যন্ত সুদৃঢ়।
এই জরিপে অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ ৭৭% মানুষ বিশ্বাস করেন যে আসন্ন নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে এবং ৭৪% ভোটার তাদের নিজ নিজ আসনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সামগ্রিকভাবে এই জরিপটি দেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং একটি বৃহৎ পরিবর্তনের জন্য বিএনপির প্রতি প্রত্যাশাকেই জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। জরিপে উঠে আসা আরেকটি তথ্য হলো পূর্বে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়া ভোটারদের বর্তমান রাজনৈতিক ঝোঁক।
এদিকে জরিপের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগে ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। যাদের মধ্যে ৬০% আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, আওয়ামীলীগের সাবেক ভোটারদের ২৫% জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং বাকি ১৫% অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জরিপটি দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ক্রস-সেকশনাল বর্ণনামূলক গবেষণা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতার তথ্য ‘কোবো টুলবক্স' ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর ১২০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ভোটার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নির্বাচনী আসনকে দুই থেকে তিনটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ২১৬টি আসনের দুইটি ইউনিয়ন থেকে এবং ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আটটি সিটি করপোরেশন এলাকার ৮৪টি আসনে তিনটি ওয়ার্ড থেকে সর্বমোট ৬৮৪টি ইউনিয়ন/ ওয়ার্ড দৈবচয়ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন এবং শহরাঞ্চলে ওয়ার্ডগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা নিশ্চিত করেছে যে এই জরিপে গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।