ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণার দামামা বেজে উঠল। প্রতীক হাতে পাওয়ার পর থেকেই প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যেতে শুরু করেছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত এই প্রচারণা কার্যক্রম চালানো যাবে। এরপর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করছে পুণ্যভূমি সিলেট থেকে। আজ সকালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে ধানের শীষের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুধু সিলেটেই নয়, প্রচারণার প্রথম দিনেই তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করবেন। সিলেট ছাড়াও আজ মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে আয়োজিত একাধিক পথসভা ও সমাবেশে তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজধানী ঢাকা থেকে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করছে। আজ বেলা দুইটায় রাজধানীর মিরপুরের আদর্শ স্কুল মাঠে দলটির পক্ষ থেকে এক নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। এই আসনটি বা ঢাকা-১৫ মূলত জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনী এলাকা। উক্ত জনসভায় শফিকুর রহমান ছাড়াও তাদের ১০-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন বলে দলের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তাদের প্রচারণার সূচনা করছে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থেকে। এনসিপি আজ সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার সমাধি এবং শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। জিয়ারত শেষে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা তিন নেতার সমাধি থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন। অপরদিকে সিপিবি বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে।
এছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ঢাকার বাইরে থেকে তার দলের প্রচারণা শুরু করেছেন। আজ সকাল ৯টায় তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার চরলহনিয়া গ্রামে তার বাবার কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেখান থেকেই তিনি মাথাল মার্কার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী সংযোগ ও প্রচার কাজ শুরু করেন। সব মিলিয়ে প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে।
অপেক্ষা শেষ; শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের লড়াই। যে লড়াইয়ে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ৫১টি রাজনৈতিক দল। রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীও। সব মিলিয়ে এবার প্রতিদ্বন্দ্বি ১ হাজার ৯৬৭। এই নির্বাচনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশি ভারতও। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও কূটনীতিক। তারা এই নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। কারণ, গত দেড় দশকে নির্বাচন ঘিরে যে বিতর্ক, আস্থাহীনতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে বহু নির্বাচন হলেও ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ’-এই তিনটি মানদণ্ড একসঙ্গে পূরণ হয়েছে এমন নির্বাচন হাতেগোনা। ফলে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের নির্বাচন গণতান্ত্রিক চরিত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং ক্ষমতার বৈধতার মূল ভিত গড়ার পথ তৈরি করবে বলে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৩০০ জনের পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এবার সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতি এবার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট এবং পোস্টাল ব্যালট গণনার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সময় প্রয়োজন হবে। সে ক্ষেত্রে অপতথ্য বা গুজব ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য গণমাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে ইসির তরফে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে এক হাজার ৮৪২টিকে বৈধ এবং ৭২৩টিকে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে গত রোববার আপিল নিষ্পত্তি শেষ হয়। ইসিতে ৬৪৫টি আপিল আবেদন করা হয়। এর মধ্যে আপিল মঞ্জুর হয়েছে ৪২৫টি। এ ছাড়া ২০৯টি আপিল নামঞ্জুর করা হয়েছে। আর ১১টি আপিল প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষে ৩০০ সংসদীয় আসনে চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।
ইসির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১ হাজার ৯৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে সারাদেশে মোট ৩০৫ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গতকাল বুধবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতীক পাওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রার্থীরা।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রিটার্নিং অফিসারদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ বাহিনীর সদস্য প্রায় দেড় লাখ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮, বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩, সশস্ত্র বাহিনী প্রায় এক লাখ, র্যাব প্রায় ৮ হাজার, নৌবাহিনী ৫ হাজার, কোস্ট গার্ড ৩ হাজার ৫০০ এবং ফায়ার সার্ভিস ১৩ হাজার। নজরদারিতে ড্রোন ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচনের সময় তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতে উন্নত ইন্টারনেট সেবা দিতে চারটি মোবাইল ফোন কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৫ হাজার ৫০০ বডি অন ক্যাম থাকবে পুলিশের কাছে। এর ফুটেজ সুরক্ষা অ্যাপে যুক্ত হবে, যা দেখে কুইক রেসপন্স নিশ্চিত করা হবে। ভোটের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই নির্বাচন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক বলেন, প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত, ধোঁকাবাজির নির্বাচন এবং জোরপূর্বকভাবে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার নির্বাচন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে মানুষের মনে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি গভীর শঙ্কাও কাজ করছে।
তিনি বলেন, ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তারকারী তিনটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দুটি দল প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ ধীরে ধীরে কলুষিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে হুমকি-ধমকির ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক আস্থার পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায় নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে— এই আশঙ্কা থেকেই যায়।
বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে যেই জয়ী হোক না কেন, তার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করব বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি। এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি—যার মধ্যে আছে অর্থনীতি, বাণিজ্য, ব্যবসা ও নিরাপত্তা।’ বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর ইএমকে সেন্টারে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে মতবিনিময়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এ কথা বলেন। গত ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশে এসে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন।
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাস্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন বলেন, বাংলাদেশে কে নির্বাচিত হবে, কে বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার হিসেবে দায়িত্ব নেবে—এটি বাংলাদেশের জনগণের একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং এটি শুধু বাংলাদেশের জনগণেরই সিদ্ধান্ত। এতে অন্য কোনো দেশের বলার কোনো অধিকার নেই। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে মতপ্রকাশ বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম অধিকার।
বাংলাদেশে সব পক্ষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ততার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমরা সবার সঙ্গে কথা বলি। ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক—সবার সঙ্গে কথা বলার আমাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক পরিসরের সব দিক থেকেই গত ২০ বছর ধরে আমার বন্ধু রয়েছে। তবে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ যে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে যেই জয়ী হোক না কেন, তার সঙ্গেই আমরা কাজ করব।’
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আমরা এখানে ব্যাপক পরিবর্তন দেখেছি। আমার মনে হয় আমরা সামনে আরও পরিবর্তন দেখতে থাকব।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, বাংলাদেশের জনগণ কথা বলেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারা আবারও তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি। এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি—আবারও বলছি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, ব্যবসা ও নিরাপত্তা। আর সে কারণেই আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাকে এই পদে নির্বাচন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এখানে আসার সুযোগ দিয়েছেন।’
বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন উল্লেখ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আপনাদের সবার সঙ্গে কাজ করতে, এই আলোচনা চালিয়ে যেতে আমি আগ্রহী।’
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন এমন একটি নির্বাচন হয়, যা ভবিষ্যতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আদর্শ তৈরি করবে। সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশই এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ, তাদের নির্দেশনা মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা আসলে সাহায্য করব, এটাই আমাদের কাজ। জাতির জন্য এটা বড় এক চ্যালেঞ্জ, যা আমাদের নিতে হবে এবং এই বিশাল কাজটি শেষ করে তাকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দাঁড় করাতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোনো কিছুর অভাব বোধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি কোথাও যেন কোনো গলদ না থাকে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হলো। আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল। ইসির নির্দেশই এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ, ইসির নির্দেশনা মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। আমরা এবারের নির্বাচনে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করব। সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করব, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে।
‘দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে যেন কোনো রূপ ঘাটতি না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে,’ বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, এবার নির্বাচনকে ঘিরে দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক নির্বাচন কাভার করবেন এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা বিপুল আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তারা বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, আমাদেরও এ বিষয়ে সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে।
‘আমাদের সব কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে একটি সুন্দর নির্বাচন সম্ভব,’ বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা প্রত্যেকেই ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলছেন। আশা করি, তারা কেউই এই মনোভাব থেকে সরে যাবেন না।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে তার মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
সেই সঙ্গে নির্বাচনের দিন সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানকালে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে তিন হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুট অস্ত্রের ৬২ দশমিক চার শতাংশ।
তিনি আরও জানান, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়েছিল। ইতোমধ্যে দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে, যা ৫২ শতাংশ।
নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোতে কার্যকর করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া সম্ভব, যোগ করেন ওয়াকার-উজ-জামান।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্য ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। ফলে চাইলেই কেউ কেন্দ্র থেকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দিতে পারবে না। কাউকে কেন্দ্রের ভেতর কোনো প্রকার বেআইনি কাজ করতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবে। সুতরাং, প্রয়োজন হলে তারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে বডি-ওর্ন ক্যামেরা পৌঁছে যাবে। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর তারা আরও সাত দিন মাঠে থাকবে। তবে আজ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একাধিক টিম নির্বাচনসংক্রান্ত মাঠ পর্যায়ের যাবতীয় তথ্য ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড করবে।
ক্ষমতাসীন নেতাকে তুষ্ট করে পদোন্নতির সংস্কৃতি দেশে আমলাতন্ত্রকে গ্রাস করেছে, তা ভাঙতেই আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কোনো দলের নয়; তিনি হবেন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, জনগণের সেবক।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শহরের অম্বিকা মেমোরিয়াল ময়দানে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই শুনছি, এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের, ওই কর্মকর্তা বিএনপির, আরেকজন জামায়াতের। এসব কথা শোনা যাবে না। কর্মকর্তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সময় সেটার প্রতিফলন হতে পারে না।”
তিনি বলেন, দেশের আমলাতন্ত্র দীর্ঘদিন জনসেবায় অভ্যস্ত না হয়ে নেতা তুষ্টিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীন নেতাকে খুশি করতে পারলেই পদোন্নতি নিশ্চিত-এই বিশ্বাসই প্রশাসনকে দুর্বল করেছে। “এই সিস্টেম ভাঙতেই হ্যাঁ ভোট দিতে হবে,” স্পষ্ট উচ্চারণ তার।
সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর্মকর্তা হলেও পরবর্তীতে তাদের দলীয় রঙে রাঙিয়ে ফেলা হয়।
তিনি বলেন, “কর্ম কমিশনের সিদ্ধান্তে বিরোধী দল যুক্ত থাকলে নেতার তুষ্টির সুযোগ থাকবে না, নিয়োগ হবে স্বচ্ছ।” ব্যক্তিপূজা নয়, জবাবদিহিমূলক সংসদ।
সংসদীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করে উপদেষ্টা বলেন, সংসদে জনগণের স্বার্থে আইন প্রণয়নের পরিবর্তে ব্যক্তি স্তুতি ও দলীয় আনুগত্যই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
গান শুনে খুশি হওয়া স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার-এভাবে সংসদ চলতে পারে না। আমরা সংসদ সদস্য নির্বাচন করি জাতীয় স্বার্থে আইন করার জন্য, ব্যক্তি বন্দনার জন্য নয়।
তিনি জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট হলে স্পিকার সরকার দল থেকে এবং ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন, যা সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীত্বে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণ হলে রাজনৈতিক দলগুলো নতুন নেতৃত্ব গড়তে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “একই মুখ বারবার ক্ষমতায় থাকার কারণে নতুন নেতৃত্ব বিকশিত হয় না। এই সীমা রাজনীতিতে তরুণদের আগ্রহ বাড়াবে।”
বিচার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, খুনের মতো গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ক্ষমা পেয়ে যায়-এটা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর। “আমরা দুষ্টের দমন করব, সৃষ্টের পালন করব—এই নীতিতেই রাষ্ট্র চলবে।
তিনি এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে গণভোটের প্রচার রিকশা ও কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে বর্ণাঢ্য র্যালিতে অংশ নেন উপদেষ্টা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন। তাহলে কোনো একক দল সব সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট হলে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে না, রাতের ভোট বা ভোট চুরির সুযোগ থাকবে না। “এ ভোট শুধু আজকের নয়-ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, সেটি নির্ধারণ করবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় গৃহীত জুলাই সনদের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সনদ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্য ও ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১২টি বিষয়ে চারটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কথা বলতে পারে। আমরা কাউকে না ভোট দিতে নিষেধ করছি না-এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
“এ ভোট শুধু আজকের নয়-ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, সেটি নির্ধারণ করবে।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন, জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা। উপস্থিত ছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়ক লামিয়া আহমেদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, ফরিদপুর পুলিশ সুপার মো: নজরুল ইসলাম, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ ভোটাররা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের বিএনপি, জামায়াত জোটসহ স্বতন্ত্র ১৯জন প্রার্থীর মধ্যে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছেন জেলা রিটার্নিং অফিসার।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মিলনাতয়নে প্রার্থীদের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার নাজমুন আরা সুলতানা প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জ-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর আবু বকর (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির এস.এ জিন্নাহ কবির (ধানের শীষ), গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ ইলিয়াছ হুছাইন (ট্রাক), জনতার দলের মোহাম্মদ শাহজাহান খান (কলম), ইসলামী আন্দোলনের মোঃ খোরশেদ আলম ইসলামী (হাতপাখা) ও বিএনপি বহিস্কৃত স্বতন্ত্র মোঃ তোজাম্মেল হক তোজা স্বতন্ত্র (ঘোড়া)।
মানিকগঞ্জ-২ আসনের জাতীয় পার্টির এস. এম আব্দুল মান্নান (লাঙ্গল), বিএনপির মঈনুল ইসলাম খান শান্ত (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আলী (হাতপাখা) ও খেলাফত মজলিসের মোঃ সালাহ উদ্দিন (দেওয়াল ঘড়ি)।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির আফরোজা খানম রিতা (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির আবুল বাশার বাদশা (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র মফিজুল ইসলাম খান কামাল (সূর্যমুখী ফুল), খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর (রিক্সা), জেপির মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ (বাইসাইকেল), বিএনপি বহিস্কৃত স্বতন্ত্র মোঃ আতাউর রহমান আতা (ফুটবল), বাংলাদেশ জাসদের মোঃ শাহজাহান আলী সাজু মটরগাড়ি (কার), স্বতন্ত্র রফিকুল ইসলাম খান (মোটরসাইকেল) ও ইসলামী আন্দোলনের সামসুদ্দিন (হাতপাখা) প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার নাজমুন আরা সুলতানা জানান,ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশীল অনুযায়ী মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের দলীয় ও স্বতন্ত্র ১৯ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। প্রতীক বরাদ্দের ফলে প্রার্থীরা আগামীকাল (বৃহস্পতিবার)থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচরণা করতে পারবেন।এছাড়া প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে এবং নির্বাচনীয় আচারণ বিধি রক্ষায় প্রতিটি উপজেলায় দুজন করে ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবে। এছাড়া জেলা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর আছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে (ঢাকা-১, ২, ৩, ১৯ ও ২০) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রতীক বরাদ্দের পাশাপাশি প্রার্থীরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোরালো দাবি জানান।
প্রতীক গ্রহণকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণে প্রার্থী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। সভায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা বিগত নির্বাচনগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবারের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করার এবং সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকার জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম প্রার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা প্রার্থীদের উত্থাপিত সব অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখব। সব প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার অনুরোধ জানাচ্ছি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কেউ যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, আমাদের জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” একইসাথে ডিজিটাল মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অপপ্রচার বা গুজব থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে ও পরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। যাতে সকলেই নিরাপদে ভোট কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন, সে ব্যবস্থা প্রশাসন নিশ্চিত করবে।”
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “নিরাপত্তা ও অন্যান্য সহযোগিতার জন্য পুলিশ বাহিনী সবসময় প্রস্তুত থাকবে। কোনো এলাকায় যদি পুলিশের সহযোগিতা না পাওয়া যায়, তাহলে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে জেলার পাঁচটি আসনের মোট ৩২ জন প্রার্থীর অনুকূলে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও ঢাকা-১, ১৯ ও ২০ আসন থেকে চারজন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকায় দেখা যায়, ঢাকা-১ আসনে খন্দকার আবু আশফাক, মো. নজরুল ইসলাম ও অন্তরা সেলিম হুদাসহ ছয়জন এবং ঢাকা-২ আসনে আমানউল্লাহ আমানসহ তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঢাকা-৩ আসনে সর্বোচ্চ ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও মো. শাহীনুর ইসলাম লড়ছেন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৯ আসনে দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনসহ আটজন এবং ঢাকা-২০ আসনে মো. তমিজ উদ্দিনসহ ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতীক বরাদ্দের কাজ শেষ হলেও প্রার্থীরা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) এক জরুরি ও বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, যেসব প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে ইচ্ছুক, তাদের আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রবাস থেকে পাঠানো ব্যালট পেপার যাতে যথাসময়ে দেশে পৌঁছায় এবং গণনা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাকযোগে বিদেশ থেকে দেশে চিঠি বা নথিপত্র পৌঁছাতে নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই ২৫ জানুয়ারির পরে যদি কেউ ব্যালট পোস্ট করেন, তবে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে না পৌঁছানোর প্রবল ঝুঁকি থাকে। ভোট গণনার আগে ব্যালট না পৌঁছালে তা বাতিল বলে গণ্য হবে, যার ফলে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নষ্ট হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতেই কমিশন আগেভাগেই প্রবাসীদের সতর্ক করে দিয়ে ২৫ তারিখের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে।
কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী ভোটারদের অনুরোধ করা হয়েছে, তারা যেন ২৫ জানুয়ারির মধ্যেই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ব্যালট পেপারটি প্রস্তুত করেন এবং তা নিকটস্থ পোস্ট অফিসে জমা দেন। প্রবাসীদের কষ্ট করে দেওয়া ভোট যেন কোনোভাবেই বিফলে না যায় এবং নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই নির্বাচন কমিশন এই ত্বরিত নির্দেশনা প্রদান করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার ২১ জানুয়ারি ২০২৬ দুপুরে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নতুন মোড় নিয়েছে। এদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বহুল আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার কাঙ্ক্ষিত হাঁস প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রতীক বুঝে পাওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ১৩ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ফলে বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৮ জন বৈধ প্রার্থী। বুধবার তাদের সকলের মধ্যেই প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থীরা তাদের নিজ নিজ দলের নিবন্ধিত প্রতীক পেয়েছেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের পছন্দ ও লটারির ভিত্তিতে প্রতীক বেছে নিয়েছেন। রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার পছন্দের হাঁস প্রতীকটিই পেয়েছেন।
নিজের পছন্দের প্রতীক হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তিনি তার ভোটার, কর্মী ও সমর্থকদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন এবং তাদের সমর্থনেই তিনি আজ এই পর্যায়ে এসেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনী এলাকায় গেলেই ছোট ছোট বাচ্চারা হাঁস মার্কা বলে স্লোগান দেয়, যা তাকে আবেগাপ্লুত করে। রুমিন ফারহানা মনে করেন, এই প্রতীকটি কেবল তার একার নয়, বরং এটি তার সমস্ত ভোটারের প্রতীক।
কথপোকথনের একপর্যায়ে নিজের পালিত হাঁস চুরির একটি অতীত ঘটনার স্মৃতিচারণ করে রুমিন ফারহানা প্রতিপক্ষ বা ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, অতীতে তার পালিত হাঁস যখন চুরি হয়েছিল, তখন তিনি চোরকে ছাড় দেননি। আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে চোরকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। ঠিক একইভাবে নির্বাচনে তার এই হাঁস প্রতীক যদি কেউ চুরি করার বা ছিনিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র চিন্তা করে, তবে তিনি যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
পরিশেষে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করতে গিয়ে রুমিন ফারহানা নিজেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সাধারণ মানুষের প্রার্থী হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ভোটাররা যদি তাকে নির্বাচিত করেন, তবে তিনি জনগণের নির্দেশনা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এলাকার উন্নয়ন করবেন। জনগণ যেভাবে চাইবে, ঠিক সেভাবেই তিনি তার এলাকার সেবা নিশ্চিত করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে লড়বেন। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতীক সংগ্রহ করেছেন এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে ভোটার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রতীক পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার নির্বাচনী যাত্রায় একটি বড় ধাপ সম্পন্ন হলো।
প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর নিজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ডা. তাসনিম জারা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিনি ঢাকা-৯ আসনের অন্তর্গত খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন। এ সময় ভোটারদের অনেকেই তাকে সমর্থন জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তার নির্বাচনী প্রতীক সম্পর্কে জানতে চান। এতদিন প্রতীক চূড়ান্ত না থাকায় তিনি সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি, তবে আজ ফুটবল প্রতীক পাওয়ার মাধ্যমে সেই প্রশ্নের একটি পরিষ্কার উত্তর সবার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, প্রতীক হাতে পাওয়ার পর আগামীকাল থেকেই তারা পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন। তিনি তার রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা উল্লেখ করেন। তাসনিম জারা বলেন, তারা যে ধরনের রাজনীতি আগামী দিনে দেখতে চান, তার ওপর ভিত্তি করেই তাদের ক্যাম্পেইন বা প্রচারণা পরিচালিত হবে। তিনি তার এই নতুন যাত্রায় সকলের কাছে দোয়া ও শুভকামনা প্রত্যাশা করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠানের ওপর জোর দিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থার এই অবস্থান তুলে ধরেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার কথাও তিনি ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের স্থায়ী সংবাদদাতা আবু সুফিয়ান ফারাবী বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করেছে। এমতাবস্থায় গণতন্ত্র এবং বাকস্বাধীনতা সমুন্নত রাখার স্বার্থে নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের কোনো পরামর্শ আছে কি না। এই প্রশ্নের জবাবে ফারহান হক স্পষ্ট করেন যে, জাতিসংঘ বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করে।
উত্তরে ফারহান হক বলেন, আমরা নির্বাচনের আয়োজনকে উৎসাহিত করছি এবং তা যেন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। জাতিসংঘের প্রত্যাশা অনুযায়ী এটা স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভোটাররা যেন তাদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত এবং পছন্দ স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
মূলত নির্বাচনের আগে সহিংসতা রোধ এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফারহান হকের এই বক্তব্যে নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি মনে করে, গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সেখানে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটা অপরিহার্য।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে আজ থেকে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ কার্যক্রম শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বুধবার ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবন এবং সারা দেশের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে এই প্রতীক বরাদ্দ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতীক হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচনী দৌড়ে তাদের স্বতন্ত্র পরিচিতি নিশ্চিত করলেন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রতীক পাওয়ার পরদিন অর্থাৎ আগামীকাল ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকেই প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে মোট ১ হাজার ৯৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা-১২ আসনে এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থীর সমাগম ঘটেছে, যেখানে ১৫ জন প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বেন। এর পরেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৩ জন প্রার্থী। অন্যদিকে সর্বনিম্ন দুইজন করে প্রার্থী রয়েছেন কিছু আসনে। তবে এবারের নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কোনো আসনেই একক প্রার্থী নেই, ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কোনো সুযোগ এবার থাকছে না।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী ধাপগুলোর পরিসংখ্যান তুলে ধরে কমিশন জানায়, গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়। সে সময় ৩০০টি সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। পরবর্তীতে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত যাচাই-বাছাই শেষে ৭২৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় এবং ১ হাজার ৮৫৮ জন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ ছিল ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়ে ৬৪৫ জন প্রার্থী আপিল করেন এবং ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলা শুনানিতে ৪৩১ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পান।
তবে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সীমানা জটিলতার কারণে এই দুটি আসনে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও ভোটের তারিখ একই রাখা হয়েছে। নতুন তফসিল অনুযায়ী গত ১৮ জানুয়ারি ছিল এই দুই আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাবনা-১ আসনে সাতটি এবং পাবনা-২ আসনে পাঁচটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। আগের তফসিলে বৈধ হওয়া প্রার্থীরা নতুন প্রক্রিয়ায় বাদ পড়বেন বলে জানা গেছে।
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারণা চলবে ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রার্থীরা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রচার কাজ চালাতে পারবেন। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। উল্লেখ্য, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই সময়ে ভিন্ন ব্যালটে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হতে যাচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও পথসভার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ গরম করে তুলবেন। তবে উৎসবমুখর এই প্রচারণাকে ঘিরে বড় ধরনের শঙ্কার কথাও জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংস আচরণ এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। নজরদারির জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহারও নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনমনে আস্থা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান টহল বাড়ানো হয়েছে এবং দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এছাড়া কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া দাগি অপরাধীদের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে যাতে তারা ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সোমবার চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হন। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও লক্ষ্মীপুর সদরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রচার শুরুর দিন থেকেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনী আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ এবং কঠোর তদারকি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে এবার তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।