আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ ফুট প্যাট্রোল পরিচালনা করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের বসিলা এবং শেরেবাংলা সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা রায়েরবাজার ও আদাবরসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই সতর্কতামূলক টহল দেন। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা রোধ এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।
সেনাবাহিনীর এই বিশেষ উপস্থিতির ফলে স্থানীয় জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে সাধারণ মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। টহল চলাকালে সেনাসদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বসিলা ও শেরেবাংলা ক্যাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে দিন ও রাত উভয় সময়েই এই নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অবৈধ কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন এবং ভোটারদের মনে আস্থার পরিবেশ ধরে রাখতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ (ন্যাশনাল চার্টার) সংক্রান্ত গণভোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে অভূতপূর্ব আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। আজ শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এক বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবারের বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বড় ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষকের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে প্রভাবশালী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ১৬টি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-সহ ছয়টি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের অন্তত ৬৩ জন প্রতিনিধি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ৩২ জন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। বিগত নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৮ জন, ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ১২৫ জন এবং ২০১৪ সালের ১০ম নির্বাচনে মাত্র চারজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অংশ নিয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবারের ৩৩০ জন পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় রেকর্ড সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।
সংস্থাগুলোর মধ্য থেকে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল) থেকে সর্বোচ্চ ২৮ জন পর্যবেক্ষক অংশ নেবেন। এছাড়া কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৫ জন এবং ওআইসি-র দুই সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই সফরে আসছেন, যার নেতৃত্ব দেবেন ওআইসি-র নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ইউনিটের প্রধান শাকির মাহমুদ বান্দার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে সাতজন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) থেকে একজন অভিজ্ঞ প্রতিনিধি নির্বাচনে উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা এবং সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের ৩২ জন প্রতিনিধি ভোটের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের এই বিশাল সফর সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র সচিব ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ জানিয়েছেন যে, পর্যবেক্ষকের এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অনেক দেশ আগ্রহ দেখালেও বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র এখনো তাদের প্রতিনিধিদের চূড়ান্ত তালিকা পাঠায়নি। ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, মিসর, ফ্রান্স, কুয়েত, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলো বর্তমানে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর ফোরাম ‘ফেমবোসা’ খুব শীঘ্রই তাদের পর্যবেক্ষকদের নাম ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৫০টিরও বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা ন্যাশনাল চার্টার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের এই সরব উপস্থিতি কেবল ভোটের স্বচ্ছতাই নিশ্চিত করবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের পাঠানো ব্যালটগুলো এখন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৩ জন প্রবাসী ভোটারের পোস্টাল ব্যালট দেশে এসে পৌঁছেছে। শুক্রবার রাতে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রকল্পের দেওয়া বিস্তারিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রবাসীদের ঠিকানায় সর্বমোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৬ হাজার ৭ জন প্রবাসী ভোটার সফলভাবে তাদের ব্যালট গ্রহণ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৭ জন ভোটার ইতিমধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট দেওয়ার পর ৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬৪ জন প্রবাসী ভোটার সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে তাদের ব্যালট জমা দিয়েছেন, যা ডাকযোগে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে এসে পৌঁছাচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম বড় কিস্তি হিসেবে ১ লাখ ৩৯ হাজারেরও বেশি ব্যালট এখন কমিশনের হাতে রয়েছে।
প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত যেসব সরকারি কর্মকর্তা বা অন্যান্য ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তাদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সমানতালে চলছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে দেশের ভেতরে (আইসিপিভি) নিবন্ধনকারী ২ লাখ ৬৯ হাজার ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে ৩ হাজার ৭৪৮ জন ভোটার তাদের ব্যালট পেপার গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২২ জন ভোটার ভোটদান সম্পন্ন করেছেন এবং ১ হাজার ১৪৯ জন ভোটার তাদের পূরণ করা ব্যালট পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে জমা দিয়েছেন।
সালীম আহমাদ খান আরও জানান, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ এবং বিদেশ মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবাসীদের এই বিশাল অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আশা করছে, বাকি ব্যালটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে পৌঁছে যাবে এবং সেগুলো নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রবাসীদের কাছে পাঠানো ব্যালটগুলোর মধ্যে ১১ হাজার ২২৬টি ব্যালট কোনো প্রকার ভোট ছাড়াই দেশে ফেরত এসেছে। মূলত সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছে ব্যালটগুলো পৌঁছাতে না পারায় বা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ডাক বিভাগ থেকে সেগুলো সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৮টি পোস্টাল ব্যালট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ১৫ হাজার ৯৫৪টি ব্যালট প্রবাসে অবস্থানরত ভোটারদের হাতে পৌঁছেছে। প্রাথমিক হিসেবে দেখা গেছে, ভোটাররা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭২টি ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট প্রদান শেষে ভোটারদের পক্ষ থেকে ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৩৩টি ব্যালট ডাকযোগে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে পুনরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কমিশন আরও জানিয়েছে যে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংগৃহীত ব্যালটের মধ্য থেকে ৫৫ হাজার ৩৪১টি ব্যালট সফলভাবে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। তবে বড় একটি অংশ অর্থাৎ ১১ হাজার ২২৬টি ব্যালট কোনো প্রকার ভোট গ্রহণ ছাড়াই ফেরত আসায় সংশ্লিষ্ট ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাক বিভাগের সরবরাহ প্রক্রিয়ায় জটিলতা কিংবা ঠিকানাগত ত্রুটির কারণে এই ব্যালটগুলো ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য যে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ এবং প্রবাস মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছিলেন। এর মধ্যে প্রবাসীর সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন। প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও কারিগরি ও সরবরাহগত সীমাবদ্ধতার কারণে একটি ক্ষুদ্র অংশের ব্যালট ভোটহীন অবস্থায় ফেরত আসায় তা নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা চলছে। তবে বাকি ব্যালটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে পৌঁছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন। প্রবাসীদের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ আসন সৈয়দপুর শহরে ভোট প্রার্থনায় বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষায়ও মাইকিং করা হচ্ছে। এতে প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনাসহ উর্দুতে গান ও গজল পরিবেশন করা হচ্ছে। মূলত সৈয়দপুরে শহরে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ উর্দুভাষী (বিহারি) ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই এখানে উর্দু ভাষায় মাইকিং করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
প্রার্থীরা বলছেন, মূলত উর্দুভাষীদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতেই উর্দুতে মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে উর্দুভাষীরা সহজে বুঝতে পারছেন কোন প্রার্থীর কি নাম, কোন প্রতীক (মার্কা)।
তবে ভিন্ন ভাষাতে মাইকে প্রচারণার ব্যাপারে নিন্দা জানিয়েছে অনেকে। তারা বলছেন ‘পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাঙালি জাতি অনেক সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছি। অথচ আজ সেই বাংলা রেখে উর্দু ভাষায় মাইকিং হচ্ছে। এতে করে অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে।
আবার অনেকে বলছেন অবাঙালিরাও এদেশেরই নাগরিক কাজেই উর্দুভাষার নাগরিকদের কাছে তাদের মাতৃভাষায় ভোট প্রার্থনায় দোষের কিছুই নেই।
এ বিষয়ে উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন, উর্দুভাষীরাও এখন এ দেশের নাগারিক। কারণ আমরা ভোটাধিকার পেয়েছি। তবে ভোট এলে অনেকে আশ্বাস দেন, ক্যাম্পবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করবেন, বাড়ি করে দেবেন, রাস্তা দেবেন কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। আমরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে উন্নতি হলেও আমাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। তবে আমরা এবার আশায় বুক বেঁধেছি। দেশে পরিবর্তন এসেছে। সামনের দিন হয়ত যারা জনপ্রতিনিধি হবেন তারা উর্দুভাষীদের ইতিবাচক উন্নয়নে কাজ করবেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ফেনীতে ১৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের পরে দুইদিন পর্যন্ত মাঠে থাকবে তারা। গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর থেকে তারা কাজ শুরু করেছে।
ফেনী ৪ বিজিবি জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ ফেনী জেলার ৩টি সংসদীয় আসনের ৬টি উপজেলায় সর্বমোট ১৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মোতায়েনকৃত প্লাটুন নির্বাচনী এলাকায় ৫টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রোভাস্ট পেট্রোলিং, অস্থায়ী চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশী কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৩টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে এবং অপর ৩টি উপজেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। জনসচেতনামূলক সভার মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)'র অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোশারফ হোসেন জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান দমন, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচন চলাকালীন দুষ্কৃতিকারীরা যাতে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সে লক্ষ্যে বিজিবি সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং নিয়মিত।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরতে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ও নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলের লা ভিতা হলে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৬টি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি সম্বলিত এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামের এই দলিলে দেশের নাজুক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দলটি।
ইশতেহার ঘোষণার এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং দলের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সভায় অংশ নেন। তারুণ্যনির্ভর এই দলটির ৩৬ দফার ইশতেহারে মূলত রাষ্ট্র সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
কী আছে এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহারে—
১. জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের ওপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ারসম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সব জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পারফরমেন্সভিত্তিক। পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং পে স্কেলে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সব সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০. গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২ শতাংশে উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
১১. পরিকল্পিতভাবে এলডিসি উত্তরণের জন্য আগাম এফটিএ সিইপিএ করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস, কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২.স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানো হবে। ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে Youth Civic Council গঠন করা হবে।
১৫. আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এসএমই খাতে ক্যাশফ্লোভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সব ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের সিনিয়রিটি ও ল্যাবের জন্য এককালীন ফান্ডিং দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১. দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুল্যান্স ও প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে, যেখানে ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত থাকবে। সব বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত আইসিইউ ও সিসিইউয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে, যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস করা হবে।
২৪. সব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫. উপজেলা-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।
২৬. একটি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে ‘RemitMiles’ নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০ শতাংশ ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সব শিল্পকারখানায় ইটিপি (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২. এনআইডিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সব বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫. দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন রয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সন্দ্বীপের উপকূলীয় এলাকা এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে বাহিনীর সদস্যরা। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে বশিরিয়া আহমদিয়া আলহাজ আবু বকর সিদ্দিক ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের সুবিশাল সমুদ্র, উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে কোস্ট গার্ড উপকূলবাসীর নিকট আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট- অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষভাবে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য বাহিনীর পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে কোস্ট গার্ড। নির্বাচন উপলক্ষে গত ১৮ জানুয়ারি থেকে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৮ দিনব্যাপী কোস্ট গার্ডের প্রায় ৩,৫০০ সদস্যের ১০০ প্লাটুন উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমূহের ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে।
এই প্লাটুনসমূহ স্থলভাগ ও জলভাগে বিভক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার নির্ধারিত নির্বাচনি এলাকাসমূহে ৬৯টি ইউনিয়নের ৩৩২টি ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে। এ সময় ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাসমূহে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি উৎসব মুখর ভোটের পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এছাড়াও, একটি জবাবদিহিমূলক, জনকল্যাণমুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একই দিনে গণভোটের আয়োজন করেছে। আমরা আমাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সব বয়স ও শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষদের নিকট গণভোটে সকলকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা দমনে সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। নির্বাচনকালীন অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কোস্ট গার্ড জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে রাঙামাটিতে ৫ হাজার ৩৬০ পোস্টাল ভোট ১৩টি ব্যালট বক্স দিয়ে লক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটানিং অফিসার নাজমা আশরাফী। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে জেলা প্রশাসনের মিলনায়তনে এসব ব্যালট বক্স দিয়ে লক করা হয়।
এসময় জেলা রিটানিং অফিসার নাজমা আশরাফী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটিতে এ প্রথম ৫হাজার ৩৬০জন আবেদন করেছে। ৫হাজার ৩৬০জনের জন্য ১৩টি ব্যালেট বক্স সকলের সামনে লক করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এইবারের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা রিটানিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, গণমাধ্যমকর্মী এবং সকল প্রতিদ্বন্ধী এবং নিরাপত্তা বাহিনী সকলে মিলে-মিশে কাজ করছি।
জেলারিটানিং অফিসার নাজমা আশরাফী আরও বলেন, অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ হলো এখন পর্যন্ত কোন প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী নির্বাচনের আচরণ বিধি ভঙ্গ করেনি। নির্বাচনের আর যেকদিন আছে সকল প্রতিবন্ধী নির্বাচন আচরণ বিধি মেনে প্রচারণা চালাবেন। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেগণ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন যাতে কোন ধরণের নির্বাচনী আচরণ ভঙ্গ না হয়।
এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিশাত শারমিন, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালনকারী গণমাধ্যমকর্মীদের কার্ড ও গাড়ির স্টিকার সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দীর্ঘ আলোচনা ও সাংবাদিক নেতাদের দাবির মুখে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে এখন থেকে সশরীরে বা ম্যানুয়ালি কার্ড ইস্যু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এর ফলে নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহে ইচ্ছুক সাংবাদিকদের জন্য এক বড় ধরনের প্রশাসনিক বাধা দূর হলো বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব জানান, অনলাইন প্রক্রিয়ায় কার্ড আবেদনের বিষয়টি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনেই এই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ম্যানুয়ালি কার্ড ইস্যু করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যারা এরই মধ্যে অনলাইনে সফলভাবে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদনগুলো যথাযথভাবেই প্রক্রিয়াজাত করা হবে। আর যারা এখন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন করতে পারেননি বা করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, তাদের আর নতুন করে অনলাইনে আবেদনের প্রয়োজন নেই। সাংবাদিকেরা সরাসরি নির্বাচন ভবনে এসে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
মূলত নির্বাচন কমিশন শুরুতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কার্ড ও স্টিকারের জন্য অনলাইনে আবেদনের নিয়ম চালু করেছিল। কিন্তু সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, ইসির এই অনলাইন পোর্টালটি মোটেও ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’ বা ব্যবহারবান্ধব নয়। কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক সংবাদকর্মী আবেদন করতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে দ্রুতই এর সমাধান করা হবে। পরে সাংবাদিক নেতারা আগামী ১ ফেব্রুয়ারি রোববারের মধ্যে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কমিশনকে একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা আল্টিমেটাম প্রদান করেন। সেই আল্টিমেটামের চারদিন আগেই ইসি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল।
নির্বাচনী মাঠের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে কমিশন। তবে অনলাইন সিস্টেমের জটিলতায় মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরণের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পেশাদার সাংবাদিক সংগঠনগুলো দাবি জানিয়ে আসছিল যে, নির্বাচনী ডামাডোলে মাঠের কাজ ফেলে জটিল ডিজিটাল প্রক্রিয়ার পেছনে সময় দেওয়া তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। কমিশনের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে গণমাধ্যমগুলো তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের কার্ড সংগ্রহের জন্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করতে পারবে। এর ফলে নির্বাচনী সংবাদ প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য আরও স্বচ্ছ ও সাবলীল পরিবেশ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব, যা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৫০ জন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন (১০ বিজিবি) ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ, পিএসসি।
তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান প্রতিরোধ, নারী ও শিশু পাচার দমন এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজিবি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। সরাইল রিজিয়নের আওতাধীন কুমিল্লা সেক্টরের অধীনে কুমিল্লা জেলার ৯টি এবং চাঁদপুর জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে বিজিবি সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
অধিনায়ক জানান, নির্বাচনী কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ২৯ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন উপজেলায় বিজিবি মোতায়েন শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে। এছাড়া ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ভোটকেন্দ্রসমূহে রেকি কার্যক্রম শুরু হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম দুইটি করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় তিনটি করে প্লাটুন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোট ২২টি উপজেলায় ২২টি বেইজ ক্যাম্পের মাধ্যমে ৪৭টি প্লাটুনে বিভক্ত ৭৫০ জন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা তদারকিতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু থাকবে। প্রতিটি প্লাটুনে বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা অথবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথ টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব ও উপস্থিতিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। সিইসি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহের কাজ সহজতর করতে কমিশন সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তবে সিইসির এই ইতিবাচক বার্তার বিপরীতে পেশাগত প্রতিবন্ধকতা ও নীতিমালা নিয়ে নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
বৈঠকে সাংবাদিক নেতারা নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বর্তমান সাংবাদিক নীতিমালা এবং ভোট পর্যবেক্ষণের জন্য পাস সংগ্রহের জটিল অনলাইন পদ্ধতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা অবিলম্বে এই নীতিমালা সংশোধন এবং পাস ইস্যু করার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সাবলীল করার জোরালো দাবি জানান। নেতাদের মতে, বর্তমান অনলাইন পদ্ধতি সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে সহায়তার বদলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, যা অবাধ তথ্য প্রবাহের পথে অন্তরায়। তারা পাস প্রদানের ক্ষেত্রে আগের মতো সহজতর পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন সাংবাদিক নেতারা কমিশনকে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন যে, আগামী রোববার (১ ফেব্রুয়ারি)-এর মধ্যে নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং পাস সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান না হলে সাংবাদিক সমাজ আসন্ন সংসদ নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করবে কি না, তা নতুন করে ভেবে দেখবে। সাংবাদিকদের এই পাল্টা হুঁশিয়ারি নির্বাচন কমিশনের ওপর এক ধরণের বাড়তি চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিইসি নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়ে জানান, কমিশন চায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে, যেখানে সাংবাদিকদের ভূমিকা হবে অপরিসীম। তবে একই সময়ে উচ্চ আদালত থেকে সিইসির বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন রুল জারির বিষয়টির দিকেও ইঙ্গিত করে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত সুরক্ষার দাবি তোলেন। মূলত নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে সাংবাদিকদের এই ‘অবাঞ্ছিত’ নীতিমালার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রচারণায় নতুন মাত্রার উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী রোববারের মধ্যে কমিশন সাংবাদিকদের এই আল্টিমেটাম আমলে নিয়ে কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত করে, এমন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এ বিষয়ে দেওয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা। সাংবিধানিক এই সংস্থাটি বলছে, যারা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে চায়, তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। যারাই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধেই নিতে হবে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে সব বাহিনীকে; লক্ষ্য একটাই— ভোটের পরিবেশ নষ্টের অপচেষ্টা আগেই নস্যাৎ করা।
ইসি জানিয়েছে, ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা কোথাও কোথাও কেন্দ্র দখলের মতো ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে,তোরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকেও নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে-পরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও পরিবহন চলাচল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত দুটি বড় ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ভোটের আগে বা ভোটের দিন হঠাৎ নাশকতামূলক ঘটনা ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা। এতে বিস্ফোরণ, আগুন, ককটেল বা সহিংস হামলার মতো ঘটনা থাকতে পারে—যার উদ্দেশ্য হবে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাদের সমর্থকদের দ্বারা ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা। এর মধ্যে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ভোটারদের ভয় দেখানো কিংবা সংঘর্ষ সৃষ্টির মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।
পাশাপাশি নির্বাচনের আগে গুপ্ত হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ জন্য নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে টহল, তল্লাশিচৌকি, মোবাইল প্যাট্রল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। সারা দেশে পেশাদার সন্ত্রাসী এবং ভাড়াটে কিলার ও শুটারদের গ্রেপ্তারে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) বিভিন্ন সময়ে শুটার ও ভাড়াটে খুনিদের একটি তালিকা করে সারাদেশে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে পাঠিয়েছে। তালিকায় কেবল রাজধানীর এমন ১০৩ জনের নাম রয়েছে। গত ১০-১৫ বছরে বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় এদের নাম এসেছে।
ভোটের নিরাপত্তায় শুধু ক্যামেরা নয়, ৫০০ ড্রোন ও ৫০টির মতো ডগ স্কোয়াড থাকবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, নির্বাচনে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোয় ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ক্যামেরায় সিম কার্ড সংযুক্ত থাকবে। কোনো ভোট কেন্দ্রে গোলমাল শুরু হলে এসওএস বা জরুরি বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এসব ক্যামেরা থেকে সরাসরি ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। সার্বক্ষণিক লাইভ ছবি ও ভিডিও দেখার ব্যবস্থা আছে। বাকি প্রায় ১০ হাজার ক্যামেরা থাকবে অফলাইন। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও পরে প্রয়োজনে যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এই ক্যামেরাগুলোর বিতরণ ও ব্যবহারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি)। তাদের তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত হবে কোন কেন্দ্রে কতটি ক্যামেরা যাবে, কোথায় অনলাইন আর কোথায় অফলাইন ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হবে। স্থানীয় ঝুঁকি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিটি থানা, জেলা ও রেঞ্জ ডিআইজি বা মেট্টোপলিটন এলাকায় কমিশনারের কার্যালয়ে মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যাতে যার যার এলাকার ক্যামেরাগুলো মনিটর ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেরা ব্যবস্থা নিতে পারে।
ভোটের নিরাপত্তায় শুধু ক্যামেরা নয়, ৫০০ ড্রোন ও ৫০টির মতো ডগ স্কোয়াড থাকবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশে ২১ হাজার ৯৪৬টি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় এমন কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫২টি কেন্দ্রে আগে থেকেই সিসি ক্যামেরা ছিল। এসবের সঙ্গে সারাদেশে বিদ্যুৎ-সংযোগবিহীন ২৯৯টি ভোটকেন্দ্রে সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে।
ডিজিটাল নজরদারির জন্য আনা সরঞ্জাম পরিচালনাসহ নির্বাচনে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের মতো সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অপরাধ করে যেন কেউ অস্বীকার করতে না পারে, এ জন্য ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এতে করে কোনো অভিযোগ এলে বা কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ফুটেজ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’
ডিজিটাল নজরদারির জন্য আনা সরঞ্জাম পরিচালনাসহ নির্বাচনে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের মতো সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যই থাকবেন দেড় লাখ। সেনাবাহিনীর সদস্য থাকবেন এক লাখের বেশি। আর নৌবাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি ও বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জনের বেশি সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও থাকবেন ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্বে।
এদিকে, নির্বাচনী নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন পরিকল্পনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিক। দেশজুড়ে ৪৮৯টি উপজেলায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি। সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় একক স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে তারা। এই দায়িত্ব পালনে বিজিবি তার সবচেয়ে বড় শক্তিকে সামনে আনছে— ভূ-খণ্ডভিত্তিক দক্ষতা। পাহাড়, বন, চর ও নদীবেষ্টিত এলাকায় দীর্ঘদিনের অভিযানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নৌযান, মোটরসাইকেল ও অল টেরেইন ভেহিকেল ব্যবহার করে প্রত্যন্ত ভোটকেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আগাম উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। লক্ষ্য একটাই— ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা আগেই নস্যাৎ করা।
প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেও নতুনত্ব এনেছে বিজিবি। দূরবর্তী বিওপিতে দায়িত্বরত সদস্যদের জন্য হাইব্রিড প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এবং মোবাইল ট্রেনিং টিম সরাসরি বিওপিতে গিয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি না রেখেই সারাদেশে অভিন্ন মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
নির্বাচনি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহারে। ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে বিজিবির জন্য এমন একটি নির্বাচন, যেখানে প্রথমবারের জন্য নন লেথাল অস্ত্র বিজিবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাবার কার্টিজসহ ১২ গেজ শটগান এবং সাউন্ড ও স্মোক গ্রেনেড যুক্ত করা হয়েছে রায়ট কন্ট্রোল সরঞ্জামের তালিকায়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চরম বিপর্যয়কালীন সময়ও বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি, বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম রেকর্ড এবং আধুনিক ওয়াকিটকির মাধ্যমে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি শুধু নজরদারি নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বিজিবি ঢাকা ব্যাটালিয়নের (৫ বিজিবি) অধীন মোট ৩৮ প্লাটুন দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সংসদীয় আসনে ১১ প্লাটুন, সাভার ও ধামরাই উপজেলার দুটি সংসদীয় আসনে ৬ প্লাটুন, ফরিদপুর জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ১৩ প্লাটুন এবং মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিজিবির বিশেষায়িত ক–৯ ডগ স্কোয়াড ইউনিটও মাঠে থাকবে। মোট ১২টি বেইজ ক্যাম্প থেকে এসব ইউনিট তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, দেশের বর্তমান সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি জাতীয় অগ্রাধিকার এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষে বাংলাদেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে মাঠপর্যায়ে যে কোনো ঘটনা ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি (নির্বাচনি তদন্ত) কমিটি ও রিটার্নিং অফিসার, ম্যাজিস্ট্রেটরা দেখছেন। নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি বা বিশৃঙ্খলা (যে কোনো মাত্রায় হোক না কেন) তারা দেখবেন। নির্বাচন কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট, কাউকে ছাড় দেওয়ার কিছু নেই।
ইসি সচিব বলেন, সমস্যা দেখভাল করার জন্য ইসি বিভিন্ন কমিটি করেছে। নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো নিজস্ব বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু কোনো ধরনের মতামত দিতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার কোনো ধরনের বহিরাগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি।
নির্বাচন নিয়ে বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক আগ্রহের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশগুলো আমাদের নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে, এটি তাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমাদের নির্বাচনে তারা কোনো মতামত দিতে পারে না। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের বিষয় এবং একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া।’
নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার যে কোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করে, তবে তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। এ বিষয়ে সরকারের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে।’
তিনি জানান, সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা মাত্র।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন নয় জানিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় কোনো অবনতি হওয়ার তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু কিছু রাজনৈতিক দল আচরণের ক্ষেত্রে ‘সীমালঙ্ঘন’ করছে। এই পরিস্থিতি যদি বাড়তে থাকে, তবে সরকার আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।