আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘গণভোট ২০২৬’ সামনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এরই অংশ হিসেবে মাদারীপুর জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে সীমানা প্রাচীর বিহীন ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে অস্থায়ী নিরাপত্তা বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দ্রুত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বলেছে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত নির্দেশনার চিঠি পেয়েছি। মাদারীপুর জেলার ৪০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অস্থায়ী নিরাপত্তা বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। আশা করছি-খুব দ্রুতই অস্থায়ী নিরাপত্তা বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া স্থাপন করা সম্ভব হবে।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এবার মোট ৩৮১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ৪০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। জেলা কোর কমিটির সভায় এই কেন্দ্রগুলোকে নিরাপত্তা বিবেচনায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এসব কেন্দ্রে অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রস্তুতকৃত প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতি মিটার অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৪৯০ টাকা। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ২০০ মিটার বেষ্টনী নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষা সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জেলা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রাথমিক প্রাক্কলন করে প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে, এসব বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ ব্যয় স্থানীয়ভাবে নির্বাহ করা সম্ভব নয়।
উপজেলাভিত্তিক ব্যয়ের বিবরণ তুলে ধরে জেলা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, মাদারীপুর সদর ও কালকিনি উপজেলায় সর্বোচ্চ ১৩টি করে মোট ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভোটকেন্দ্রে বেষ্টনী বা কাঁটা তার নির্মাণ করা হবে। প্রতি উপজেলার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, শিবচরের ৪টি কেন্দ্রের জন্য ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। রাজৈর ও ডাসার উপজেলার মোট ১০টি কেন্দ্রের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৪১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. রাজিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবের আলোকে এই ৪০টি ভোটকেন্দ্রে অস্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা প্রকৌশল এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান বলেন, ‘দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো মেরামতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা ৯ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। মাদারীপুর জেলার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের বিষয়টিও আমাদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
‘বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় কেন্দ্রগুলো নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে’ উল্লেখ করে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম তার লিখিত পত্রে জানান, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় পর্যায়ে এই বিশাল ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয় বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নের জন্য আবেদন করা হয়েছিল।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত হলে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অস্থায়ী বেষ্টনী বা কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ কাজটি পূর্বের মতোই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হবে।
উল্লেখ্য, ‘গণভোট ২০২৬’ ও ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন’কে সামনে রেখে দেশব্যাপী ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে মাদারীপুর জেলায় এই বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল থেকেই চরকাজল ইউনিয়নের চরশিবা এলাকায় সেনাবাহিনী কাজ করছে। একই সঙ্গে অনুমতি না থাকায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় তাদের সভা নিষেধ করেছে প্রশাসন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী-৩ (আসন নং–১১৩) সংসদীয় আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল হক নুর (ট্রাক প্রতীক) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন (ঘোড়া প্রতীক)-এর নির্বাচনী সফরসূচি পর্যালোচনা করে পটুয়াখালী জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) একটি প্রতিবেদন দাখিল করে।
উক্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে বিএনপি নেতারা নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়া, অস্বাভাবিক ভোটার স্থানান্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অপ্রাসঙ্গিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একগুচ্ছ অভিযোগ ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তাঁদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তির বিস্তারিত বিবরণ দেন।
নজরুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাঁদের নিজস্ব এলাকার বাইরে গিয়ে অন্য নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও আইনে সরাসরি এর কোনো বাধা নেই, তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভোটের অন্তত দুই দিন আগে বহিরাগতদের সংশ্লিষ্ট এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে। বিএনপি নেতার মতে, বহিরাগতদের উপস্থিতির কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচন কমিশন এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে বলে তিনি জানান।
ভোটার তালিকায় বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, অনেক আসনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্বাভাবিক মাত্রায় ‘ভোটার মাইগ্রেশন’ বা ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান যে, অনেক ক্ষেত্রে একটি বাড়িতে যেখানে মাত্র ৪-৫ জন সদস্য থাকার কথা, সেখানে নথিপত্রে ২০ থেকে ৩০ জন ভোটার দেখানো হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কোনো হোল্ডিং নম্বর ছাড়াই ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করার মতো গুরুতর অভিযোগও তাঁরা কমিশনের কাছে পেশ করেছেন। নির্বাচন কমিশন এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ পায়নি বলে দাবি করলেও বিএনপি প্রতিনিধিদল তাঁদের দেওয়া তথ্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বরং কমিশনকে আসনভিত্তিক মাইগ্রেশনের বিস্তারিত তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করার এবং সন্দেহজনক কিছুর প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রচলিত সংস্থাসমূহের বাইরে অন্য কোনো সংস্থাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে আইনে যাদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনে কেবল তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া সমীচীন। বর্তমানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি)-এর মতো সংস্থাকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, আজ বিএনসিসি আনা হচ্ছে, কাল হয়তো স্কাউটকে আনা হবে, যা নির্বাচনের স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য শুভ নয়। একই সঙ্গে তিনি ৫৫ হাজারের বেশি স্থানীয় পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। নজরুল ইসলাম খানের মতে, কেবল যাদের প্রকৃত সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা রয়েছে, তাদেরই পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত যাতে এক কেন্দ্রে অনেক পর্যবেক্ষক ঢুকে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।
বৈঠকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ‘শান্তি কমিটি’ গঠন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন যে, বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে তথাকথিত ‘শান্তি কমিটি’ গঠন করা হচ্ছে, যা মূলত সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং বিরোধী পক্ষকে দমনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এ ধরনের কমিটির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই, তবে বিএনপি নেতারা কমিশনকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া। বিএনপি নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন তাঁদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
দিনাজপুরে পিআইবির উদ্যোগে নির্বাচনকালিন সাংবাদিকতা বিষয়ক দুই দিনব্যাপি প্রশিক্ষণ কর্মশালা সমাপ্ত হয়েছে। সমাপনি দিনে অংশগ্রহণকারি প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করা হয়েছে।
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) দুপুর ২টায় দিনাজপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সমাপনি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারিদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সেখ সাদেক আলী।
সাংবাদিক ইউনিয়ন দিনাজপুরের সভাপতি ও দৈনিক নয়াদিগন্তের দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি সাদাকাত আলী খানের সভাপতিত্বে সমাপনি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পিআইবির প্রশিক্ষক জিলহাজ উদ্দিন নিপুন, ইউনেসকো'র প্রতিনিধি শাকিল এম ফায়সাল ও দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল। দৈনিক বাংলার দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি মো:মিজানুর রহমান.
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ইউনিয়ন দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক মাহফিজুল ইসলাম রিপন।
দুই দিনব্যাপি প্রশিক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫, নির্বাচনি আইন লঙ্ঘন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২, গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সীমা, গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নীতিমালা ২০২৫, ভুয়া তথ্য, অপতথ্য, ভুয়া সংবাদ, হেট স্পিচ, গুজব, প্রোপাগান্ডা ইত্যাদির মোকাবেলার গুরুত্ব, নির্বাচনি সাংবাদিকতা ও নৈতিকতা, নির্বাচনকালে গণমাধ্যমকর্মীদের শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অর্ধশতাধিক গণমাধ্যমকর্মী অংশগ্রহণ করেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। তবে নির্বাচনী পরিবেশ সুশৃঙ্খল রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রচার সামগ্রীর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এবারের নির্বাচনে কোনোভাবেই কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এর আলোকে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী, গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারণা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার মধ্যে শেষ করতে হবে। অর্থাৎ ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগেই সকল ধরণের প্রকাশ্য প্রচারণা বন্ধ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা ব্যানার বা লিফলেট ব্যবহার করতে পারলেও পোস্টার ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয়। বিধিমালার ৭ (ক) ধারায় এই নিষেধাজ্ঞার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ৭ (খ) ধারায় রেক্সিন, পলিথিন বা প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল দ্রব্য দিয়ে তৈরি কোনো ধরণের প্রচারপত্র বা ব্যানার ব্যবহারও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রচার সামগ্রীর ধরণ ও আকার নিয়ে ইসির বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল বা ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন, তবে শর্ত হলো ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যতীত অন্য সব সামগ্রী অবশ্যই সাদা-কালো রঙের হতে হবে। কোনো রঙিন ছাপা সামগ্রী ব্যবহার করা আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। ব্যানারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট এবং ফেস্টুনের আয়তন হতে হবে অনধিক ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি। এছাড়া লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের জন্য এ-ফোর সাইজের কাগজ ব্যবহারের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, এসকল প্রচার সামগ্রীতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিজের ছবি ও দলীয় প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা নেতার ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
ব্যানার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হওয়ায় নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি একটি স্পষ্টীকরণ নির্দেশনাও জারি করেছে। ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত মাপ ঠিক রেখে ব্যানারটি আনুভূমিক বা উলম্ব—যেভাবেই হোক না কেন, তা ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ ব্যানারের উচ্চতা বা প্রস্থের ধরণ যাই হোক না কেন, ১০ ফুট বাই ৪ ফুটের ভেতরে থাকলে তা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই নির্দেশনার ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করা আরও সহজ হবে বলে মনে করছে কমিশন।
অন্যদিকে, বিধিবহির্ভূত প্রচার সামগ্রী উৎপাদন ঠেকাতে মুদ্রণালয় ও ছাপাখানাগুলোর প্রতিও কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের কিছু এলাকায় পোস্টার ব্যবহারের ঘটনা কমিশনের নজরে এসেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। তাই মুদ্রণ মালিকদের কোনো ধরনের নির্বাচনী পোস্টার মুদ্রণ না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী বা তাদের সমর্থকদের কেউ যদি এই নিয়ম অমান্য করেন, তবে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একটি পরিচ্ছন্ন ও নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের স্বার্থে এই আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বরিশালের সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, নির্বাচনে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ডিজিটাল ও অবজারভেশন টিমের সদস্যদের সঙ্গে আয়োজিত এই সভায় তিনি কমিশনের অবস্থান কঠোরভাবে তুলে ধরেন।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে সততা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নে কমিশন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। নির্বাচনে বড় দল কিংবা ছোট দল বলে কোনো বিভাজন নেই; কমিশনের কাছে সব প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল সমান অধিকার পাবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো কর্মকর্তা কোনো বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ইসি সানাউল্লাহ জানান, প্রবাসীদের ভোটদান প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ রাখা হয়নি। জালিয়াতি রোধে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে লাইভ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবহৃত ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিক তদারকি করবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রবাসীদের ব্যালটে মোট ১১৯টি প্রতীক থাকায় খাম খোলা এবং ভোট গণনার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণনা প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
ভোটের দিনের শৃঙ্খলা ও জালিয়াতি রোধে নতুন কিছু নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম ঠেকাতে কেবল প্রিসাইডিং অফিসার কলম সঙ্গে রাখতে পারবেন। অন্য সকল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টদের শুধুমাত্র পেন্সিল ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিটি আসনে ১০ জন করে ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে নির্বাচনী ব্যয় বা ভোট কেনাবেচায় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অপব্যবহার রোধে কমিশন বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।
পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের স্থানীয় কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো ধরনের আপ্যায়ন বা আতিথেয়তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এই নির্দেশনা অমান্য করলে তা নৈতিক স্খলন হিসেবে গণ্য হবে। মূলত জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে কমিশন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলে তিনি সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সভায় স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশ পর্যালোচনার লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি শুরু হয়। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের সাথে কমিশনের এই সাক্ষাৎকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই প্রতিনিধিদলটি আজ নির্বাচন কমিশনে পৌঁছান। প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিশেষ কারিগরি ও প্রশাসনিক পরামর্শের জন্য প্রতিনিধিদলে যুক্ত করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়াকে।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমান নির্বাচনী ময়দানে প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কমিশনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার লক্ষ্যেই বিএনপি এই বৈঠকের আহ্বান করে। বিশেষ করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ রোধে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হওয়ার দাবি জানানো হতে পারে এই বৈঠক থেকে। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে পারেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য যে, গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী উত্তাপ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। আজকের বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে সিইসি নাসির উদ্দিন বিএনপি নেতাদের আশ্বস্ত করতে পারেন যে, একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন বদ্ধপরিকর। এর আগে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচনে কোনো কর্মকর্তার পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুই পক্ষের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের নির্বাচনী কৌশল ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরও সুসংহত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈঠকটি দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল এবং বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার কথা রয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে চট্টগ্রাম জেলায় ৭১ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, এলডিপি ও জাতীয় পার্টিসহ ২৫টি রাজনৈতিক দলের মোট ১১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিজিবির রিজিয়ন সদর দপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল মো. মাহামুদুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, নির্বাচনকালীন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। টহল কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সময়ে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজিবি সদস্যদের নিয়মিত টহল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই টহল কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকেও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন যে, পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও বডি অন ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা বডি অন ক্যামেরা ব্যবহার করছে। ভোট কেন্দ্রগুলোতেও নিরস্ত্র ও সশস্ত্র পুলিশ মোতায়ন থাকবে।’ এভাবে বিজিবি ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ ফুট প্যাট্রোল পরিচালনা করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের বসিলা এবং শেরেবাংলা সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা রায়েরবাজার ও আদাবরসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই সতর্কতামূলক টহল দেন। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা রোধ এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।
সেনাবাহিনীর এই বিশেষ উপস্থিতির ফলে স্থানীয় জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে সাধারণ মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। টহল চলাকালে সেনাসদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বসিলা ও শেরেবাংলা ক্যাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে দিন ও রাত উভয় সময়েই এই নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অবৈধ কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন এবং ভোটারদের মনে আস্থার পরিবেশ ধরে রাখতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ (ন্যাশনাল চার্টার) সংক্রান্ত গণভোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে অভূতপূর্ব আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। আজ শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এক বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবারের বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বড় ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষকের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে প্রভাবশালী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ১৬টি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-সহ ছয়টি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের অন্তত ৬৩ জন প্রতিনিধি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ৩২ জন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। বিগত নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৮ জন, ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ১২৫ জন এবং ২০১৪ সালের ১০ম নির্বাচনে মাত্র চারজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অংশ নিয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবারের ৩৩০ জন পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় রেকর্ড সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।
সংস্থাগুলোর মধ্য থেকে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল) থেকে সর্বোচ্চ ২৮ জন পর্যবেক্ষক অংশ নেবেন। এছাড়া কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৫ জন এবং ওআইসি-র দুই সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই সফরে আসছেন, যার নেতৃত্ব দেবেন ওআইসি-র নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ইউনিটের প্রধান শাকির মাহমুদ বান্দার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে সাতজন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) থেকে একজন অভিজ্ঞ প্রতিনিধি নির্বাচনে উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা এবং সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের ৩২ জন প্রতিনিধি ভোটের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের এই বিশাল সফর সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র সচিব ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ জানিয়েছেন যে, পর্যবেক্ষকের এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অনেক দেশ আগ্রহ দেখালেও বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র এখনো তাদের প্রতিনিধিদের চূড়ান্ত তালিকা পাঠায়নি। ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, মিসর, ফ্রান্স, কুয়েত, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলো বর্তমানে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর ফোরাম ‘ফেমবোসা’ খুব শীঘ্রই তাদের পর্যবেক্ষকদের নাম ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৫০টিরও বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা ন্যাশনাল চার্টার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের এই সরব উপস্থিতি কেবল ভোটের স্বচ্ছতাই নিশ্চিত করবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের পাঠানো ব্যালটগুলো এখন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৩ জন প্রবাসী ভোটারের পোস্টাল ব্যালট দেশে এসে পৌঁছেছে। শুক্রবার রাতে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রকল্পের দেওয়া বিস্তারিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রবাসীদের ঠিকানায় সর্বমোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৬ হাজার ৭ জন প্রবাসী ভোটার সফলভাবে তাদের ব্যালট গ্রহণ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৭ জন ভোটার ইতিমধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট দেওয়ার পর ৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬৪ জন প্রবাসী ভোটার সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে তাদের ব্যালট জমা দিয়েছেন, যা ডাকযোগে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে এসে পৌঁছাচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম বড় কিস্তি হিসেবে ১ লাখ ৩৯ হাজারেরও বেশি ব্যালট এখন কমিশনের হাতে রয়েছে।
প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত যেসব সরকারি কর্মকর্তা বা অন্যান্য ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তাদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সমানতালে চলছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে দেশের ভেতরে (আইসিপিভি) নিবন্ধনকারী ২ লাখ ৬৯ হাজার ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে ৩ হাজার ৭৪৮ জন ভোটার তাদের ব্যালট পেপার গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২২ জন ভোটার ভোটদান সম্পন্ন করেছেন এবং ১ হাজার ১৪৯ জন ভোটার তাদের পূরণ করা ব্যালট পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে জমা দিয়েছেন।
সালীম আহমাদ খান আরও জানান, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ এবং বিদেশ মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবাসীদের এই বিশাল অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আশা করছে, বাকি ব্যালটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে পৌঁছে যাবে এবং সেগুলো নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রবাসীদের কাছে পাঠানো ব্যালটগুলোর মধ্যে ১১ হাজার ২২৬টি ব্যালট কোনো প্রকার ভোট ছাড়াই দেশে ফেরত এসেছে। মূলত সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছে ব্যালটগুলো পৌঁছাতে না পারায় বা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ডাক বিভাগ থেকে সেগুলো সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৮টি পোস্টাল ব্যালট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ১৫ হাজার ৯৫৪টি ব্যালট প্রবাসে অবস্থানরত ভোটারদের হাতে পৌঁছেছে। প্রাথমিক হিসেবে দেখা গেছে, ভোটাররা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭২টি ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট প্রদান শেষে ভোটারদের পক্ষ থেকে ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৩৩টি ব্যালট ডাকযোগে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে পুনরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কমিশন আরও জানিয়েছে যে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংগৃহীত ব্যালটের মধ্য থেকে ৫৫ হাজার ৩৪১টি ব্যালট সফলভাবে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। তবে বড় একটি অংশ অর্থাৎ ১১ হাজার ২২৬টি ব্যালট কোনো প্রকার ভোট গ্রহণ ছাড়াই ফেরত আসায় সংশ্লিষ্ট ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাক বিভাগের সরবরাহ প্রক্রিয়ায় জটিলতা কিংবা ঠিকানাগত ত্রুটির কারণে এই ব্যালটগুলো ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য যে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ এবং প্রবাস মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছিলেন। এর মধ্যে প্রবাসীর সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন। প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও কারিগরি ও সরবরাহগত সীমাবদ্ধতার কারণে একটি ক্ষুদ্র অংশের ব্যালট ভোটহীন অবস্থায় ফেরত আসায় তা নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা চলছে। তবে বাকি ব্যালটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে পৌঁছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন। প্রবাসীদের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ আসন সৈয়দপুর শহরে ভোট প্রার্থনায় বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষায়ও মাইকিং করা হচ্ছে। এতে প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনাসহ উর্দুতে গান ও গজল পরিবেশন করা হচ্ছে। মূলত সৈয়দপুরে শহরে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ উর্দুভাষী (বিহারি) ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই এখানে উর্দু ভাষায় মাইকিং করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
প্রার্থীরা বলছেন, মূলত উর্দুভাষীদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতেই উর্দুতে মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে উর্দুভাষীরা সহজে বুঝতে পারছেন কোন প্রার্থীর কি নাম, কোন প্রতীক (মার্কা)।
তবে ভিন্ন ভাষাতে মাইকে প্রচারণার ব্যাপারে নিন্দা জানিয়েছে অনেকে। তারা বলছেন ‘পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাঙালি জাতি অনেক সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছি। অথচ আজ সেই বাংলা রেখে উর্দু ভাষায় মাইকিং হচ্ছে। এতে করে অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে।
আবার অনেকে বলছেন অবাঙালিরাও এদেশেরই নাগরিক কাজেই উর্দুভাষার নাগরিকদের কাছে তাদের মাতৃভাষায় ভোট প্রার্থনায় দোষের কিছুই নেই।
এ বিষয়ে উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন, উর্দুভাষীরাও এখন এ দেশের নাগারিক। কারণ আমরা ভোটাধিকার পেয়েছি। তবে ভোট এলে অনেকে আশ্বাস দেন, ক্যাম্পবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করবেন, বাড়ি করে দেবেন, রাস্তা দেবেন কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। আমরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে উন্নতি হলেও আমাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। তবে আমরা এবার আশায় বুক বেঁধেছি। দেশে পরিবর্তন এসেছে। সামনের দিন হয়ত যারা জনপ্রতিনিধি হবেন তারা উর্দুভাষীদের ইতিবাচক উন্নয়নে কাজ করবেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ফেনীতে ১৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের পরে দুইদিন পর্যন্ত মাঠে থাকবে তারা। গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর থেকে তারা কাজ শুরু করেছে।
ফেনী ৪ বিজিবি জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ ফেনী জেলার ৩টি সংসদীয় আসনের ৬টি উপজেলায় সর্বমোট ১৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মোতায়েনকৃত প্লাটুন নির্বাচনী এলাকায় ৫টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রোভাস্ট পেট্রোলিং, অস্থায়ী চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশী কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৩টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে এবং অপর ৩টি উপজেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। জনসচেতনামূলক সভার মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)'র অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোশারফ হোসেন জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান দমন, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচন চলাকালীন দুষ্কৃতিকারীরা যাতে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সে লক্ষ্যে বিজিবি সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং নিয়মিত।