আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের যাবতীয় কর্মযজ্ঞ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ভোটারদের সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া ব্যতিরেকে কমিশনের পক্ষ থেকে আর কোনো আয়োজন বাকি নেই। প্রস্তুতির সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিছু আসনে এখনও ব্যালট পাঠানো হয়নি, তবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে।’ নিরাপত্তার বিষয়ে অভয় দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ১১৬টি সংসদীয় আসনে ইতোমধ্যেই ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট আসনগুলোতে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আদালতের আদেশে শেষ মুহূর্তে কিছু প্রার্থীর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু আসনে ব্যালট পুনর্মুদ্রণ করতে হয়েছে। নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী সাত দিন এবং আনসার বাহিনী আট দিন নিয়োজিত থাকবে, যেখানে পুলিশ বাহিনী ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। এছাড়া ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন।
এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন, যেখানে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা নারী ভোটারের চেয়ে কিছুটা বেশি। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে ভোটার সংখ্যা সর্বোচ্চ হলেও ঝালকাঠি-১ আসনে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের জন্য প্রায় আট লাখ নির্বাচনী কর্মকর্তা ও নয় লাখ নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে। নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়েছে। তবে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
ভোটের হার ও পর্যবেক্ষক প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ভোটের হার ৫৫ শতাংশের কম বা বেশি হতে পারে বলে তার ধারণা।’ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৫৬ হাজার পর্যবেক্ষক নিয়োজিত থাকবেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি নাগরিক। এছাড়া ডাকযোগে ভোটদানের জন্য ১৫ লাখেরও বেশি ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন এবং প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার প্রবাসী ভোটার ইতোমধ্যেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্পন্ন করেছেন বলে কমিশন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত ১২ ফেব্রুয়ারির জনরায় পেতে নির্বাচন কমিশন এখন সামগ্রিকভাবে মাঠ পর্যায়ে প্রস্তুত।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে প্রায় সব প্রস্তুতিই গুছিয়ে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক দলগুলোও গণসংযোগ, পথসভা, সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপিকেও যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন উপহার দেওয়া। এই লক্ষ্য নিয়েই সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসি। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই শুধু গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করা সম্ভব। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কমিশন শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকবে-এটাই প্রত্যাশা।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, এই চ্যালেঞ্জে এই কমিশন যদি সফলতা অর্জন করতে পারে এবং ভোটারদের আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলে তাদের আগামী পথচলা মসৃণ হবে। কারণ, এই নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করছে ইসির ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ। এটা দিয়ে যাত্রা শুরু হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই প্রথম ভোট। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর আমূল পাল্টেছে ডিসি-এডিসিসহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। যারা আগামী নির্বাচনে মূল দায়িত্ব পালন করবেন। সেই সঙ্গে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। তবে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের ওপর হামলা ও শঙ্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শঙ্কা প্রকাশ করলেও নির্বাচন কমিশন কোনো শঙ্কা দেখছে না।
ইসি বলছে, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা যে খবর পাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যা দেখছে, তাতে পরিবেশ সন্তোষজনক। ছোট-বড় সব দলের পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোট গণনার নির্ধারিত সময়ের আগে ফলাফল জানার কোনো সুযোগ নেই।
এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টাল ভোটের ফলাফল সংক্রান্ত নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, পোস্টাল ব্যালট পেপার নির্বাচনের দিন বিকেল সাড়ে ৪টার পর নিয়মিত ভোট গণনার সময় একই সাথে গণনা করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উল্লিখিত সময়সীমার পূর্বে পোস্টাল ভোটের ফলাফল জানার কোনো আইনগত বা কারিগরি সুযোগ নেই। এ সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের আগাম তথ্য বা প্রচারণাই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। জনসাধারণকে এ ধরনের কোনো গুজব বা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
ইসি আরও জানায়, যারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করতে সাইবার মনিটরিং টিম কাজ করছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়ালে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত দেশের ১১৬ সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশ থেকে রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে দেশে এসেছে ১ লাখ ৭ হাজার ব্যালট। ইইউ পর্যবেক্ষকরা আসন্ন নির্বাচনে নারী, সংখ্যালঘু এবং সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। ইইউ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় উল্লেখ করে তারা নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
নির্বাচনকালীন অপতথ্য রোধে কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন পর্যবেক্ষণ বিষয়ে মেটার সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, এ প্রসঙ্গে নেটের স্পিড কমানোর কোনো প্রস্তাব নেই এবং সেটি সুপারিশও করা হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনের আগে বর্তমান ইসি নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি। ফলে ফ্রেশার হিসেবেই এই দুটি ভোট একদিনে আয়োজন করতে যাচ্ছে। দুটি ভোট একদিনে আয়োজন ইসির জন্য বড় পরীক্ষা। এই দুটি বিষয়ের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের গলদ হলে সেটি ভোট গ্রহণ ও গণনাকে সংকটের মুখে ফেলতে পারে। এ কারণে গণনায় অপ্রত্যাশিত বিলম্ব হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারে। আর এই এক দিনে দুই ভোট, ব্যালট ব্যবস্থাপনা ও গণনা ছাড়াও নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন এবং সামাজিক মাধ্যম ও এআই ব্যবহারজনিত চ্যালেঞ্জ কমিশনের সামনে বড় হয়ে উঠতে পারে ধারণা করছেন অনেকে।
ইসির চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে নির্বাচন সংস্থার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির সামনে যেটা করণীয় সেটি হলো তাদের আইন-কানুন বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করা। কেউ যদি এসব অমান্য করে তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা নেয়া। তারা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে খুব কঠোরতা প্রদর্শন করতে পারেনি। যেমন তারা এই যে মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় প্যানেল তৈরি হওয়ার কথা, সেটি হয়নি।
তিনি বলেন, আইনের ব্যাপারে আরো কঠোর হতে হবে। একই সাথে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রশাসন কোনোরকম পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে। কারণ এখন তো প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে তাদের এটা দেখার দায়িত্ব। তিনি বরেন, আইন রক্ষাকারী বাহিনী যাতে কোনোরকম পক্ষপাত না করে। এ ব্যাপারে তাদেরকে কঠোর হতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটা যাতে সঠিক হয়, যেমন এখন যাচাই-বাছাই চলছে, এই প্রক্রিয়া যেন কোনোরকম বিতর্কহীন হয়। এখানে যেন স্বচ্ছতা বিরাজ করে। নির্বাচন যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সে ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি থাকতে হবে।
সাবেক নির্বাচন সংস্কার ও ইনকোয়ারি কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আবদুল আলীম বলেন, সংহিসতা ছাড়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অংশগ্রহণমূলক করতে পারাই হলো বর্তমান ইসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট- এটা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার পরে ইলেকশন কমিশনের উচিত হবে, তাদের একটা ইভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়ন করা। যে দুইটা নির্বাচন তারা কিভাবে করল, কতটা সফল হলো, কতটা ভালো হলো, কতটা মন্দ হলো অর্থাৎ একটা সেলফ অ্যাসেসমেন্ট করা। নিজেদের বিশ্লেষণ নিজেরাই করা।
তিনি বলেন, আর তারপরে এবং তার ভিত্তিতে যে লার্নিংগুলো তারা পাবে তার ভিত্তিতে আগামী যে স্থানীয় নির্বাচনগুলো হবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ সব নির্বাচন কিন্তু হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কিভাবে সুন্দর করা যায়? ভালো করা যায় সেই দিকে ফোকাস করা।
তার মতে, দুই ভোট একই দিনে হবে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, অন্তত ৮০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেন। এর মানে হলো ২০ কোটি ব্যালট গুনতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাত কোটি ভোটার ছিল। তাও গণনা শেষ হয়েছিল ভোটের পরদিন সকালে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে এবার সমস্যায় পড়তে হবে।
কমিশনের সামনে নতুন বছরে চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি বলেন, এই বড় দুটো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এটার ওপরই তাদের আগামী নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা আসবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।
জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের সুবিধার্থে ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ শীর্ষক একটি আধুনিক মোবাইল অ্যাপ প্রবর্তন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে ভোটাররা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর ব্যবহার করে ভোট কেন্দ্রের অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় সকল তথ্য অনায়াসেই সংগ্রহ করতে পারবেন।
ইসির জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে ‘Smart Election Management BD’ নামক এই অ্যাপটি বর্তমানে গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে ডাউনলোড করা সম্ভব। এই অ্যাপের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এটি ব্যবহার করে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রের সঠিক জিও লোকেশন, ম্যাপ, চিত্র এবং দূরত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করবেন যা কেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার পথ সুগম করবে।
ভোট কেন্দ্রের তথ্যের পাশাপাশি এই অ্যাপ থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহের বিবরণ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ও ফলাফল জানা যাবে। ফলে আগ্রহী ভোটার এবং সাধারণ নাগরিকগণ নির্বাচন সম্পর্কিত যাবতীয় নির্ভরযোগ্য তথ্য দ্রুততম সময়ে হাতের মুঠোয় পাবেন। অ্যাপটি সফলভাবে ইনস্টল করার পর ব্যবহারকারীকে কেবল নিজের জন্মতারিখ এবং এনআইডি নম্বর প্রদান করতে হবে। এরপরই স্ক্রিনে বর্তমান সংসদের তথ্য, ব্যক্তিগত ভোটার আইডি নম্বর, নির্ধারিত ভোট কেন্দ্রের সুনির্দিষ্ট নাম ও ঠিকানা এবং ভোট দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সিরিয়াল নম্বর প্রদর্শিত হবে।
মূলত স্বচ্ছ ও আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন এই প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা ভোটারদের অভিজ্ঞতাকে আরও সহজতর ও সমৃদ্ধ করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে পঞ্চগড়-১ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী ও এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বুধবার রাত ৮টার পর জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় নির্ধারিত সময়ের বাইরে পথসভা ও মাইক ব্যবহার করার অপরাধে তাকে এই দণ্ড প্রদান করা হয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরণের ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে তেঁতুলিয়া উপজেলার একটি এলাকায় নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন সারজিস আলম। সভা চলাকালে সেখানে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আকাশের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি দল উপস্থিত হয়। আদালত দেখতে পান যে, নির্বাচনী সভার জন্য নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেখানে মাইক ব্যবহার করে বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে। নির্বাচনী আচরণবিধির ১৭ নম্বর ধারার ২ উপধারা লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ঘটনাস্থলেই প্রার্থী সারজিস আলমকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই সময় পথসভায় সারজিস আলমের সাথে পঞ্চগড় জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা ইকবাল হোসাইনসহ পুলিশ, প্রশাসন ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই সারজিস আলমের নির্বাচনী প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান হাবিব জরিমানার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করেন। একই সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ে মাইক ব্যবহার এবং প্রচারণার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আকাশ সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের এই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে। কোনো প্রার্থী বা দল আইন ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জরিমানার বিষয়ে সারজিস আলমের নির্বাচনী প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, পথসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় নির্ধারিত সময় সম্পর্কে কিছুটা অসতর্কতা তৈরি হয়েছিল এবং এর ফলে সময় কিছুটা বেশি লেগে যায়। তবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তারা আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার টাকা পরিশোধ করেছেন। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, আগামীতে তাদের প্রতিটি নির্বাচনী কর্মসূচি ও সভা নির্ধারিত আচরণবিধি মেনেই পরিচালিত হবে। পঞ্চগড়-১ আসনের এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে এমন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে 'পোস্টাল ভোট বিডি' মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসে অবস্থানরত রেমিট্যান্সযোদ্ধা এবং দেশের ভেতরে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৪টি প্রবাসীর পূরণকৃত পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। এই বিশাল সংখ্যক ব্যালট দেশে ফিরে আসাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের একটি বড় প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রবাসীদের জন্য মোট ৭ লাখ ৬৬ हजार ৮৬২টি ব্যালট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮ জন প্রবাসী ভোটার তাদের ব্যালট হাতে পেয়েছেন এবং ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১৬ জন সফলভাবে তাদের ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। ভোট দেওয়ার পর ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ জন ভোটার সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিসে তাদের ব্যালট জমা দিয়েছেন। বিদেশ থেকে ডাকযোগে আসা এসব ব্যালটের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৮টি ব্যালট আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে পেয়েছেন। প্রবাসীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ নির্বাচনী আমেজকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিয়েছে।
বিদেশের পাশাপাশি দেশের ভেতরে যারা বিশেষ প্রয়োজনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিচ্ছেন, তাদের কার্যক্রমেও যথেষ্ট গতি লক্ষ্য করা গেছে। ইসি জানায়, দেশের অভ্যন্তরে ভোটারদের নিকট মোট ৬ লাখ ৬২ হাজার ১৯১টি ব্যালট প্রেরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৪৭ জন ভোটার তাদের ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং ২ লাখ ১১ হাজার ১২২ জন ইতোমধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। অভ্যন্তরীণ এই পোস্টাল ভোটারদের মধ্যে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৯ জন তাদের ব্যালট ডাকবাক্সে জমা দিয়েছেন, যার মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৩৬৭টি ব্যালট গ্রহণ করেছেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমবারের মতো অ্যাপ এবং ডাক ব্যবস্থার এমন সমন্বিত প্রয়োগ ভোটারদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা ও উৎসাহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য ঘরে বসেই জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই সুযোগটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিদিন যে হারে ব্যালট পেপার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে জমা হচ্ছে, তাতে আশা করা যাচ্ছে যে ১২ ফেব্রুয়ারির আগেই অধিকাংশ পোস্টাল ভোট গণনার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে এবং প্রতিটি ভোট যেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছায়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও ডাক বিভাগ নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মূলত প্রযুক্তির সফল ব্যবহারই এবার পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহে এমন অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যদি আচরণবিধি ভঙ্গ করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে কমিশন তা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অভিযোগ যদি গুরুতর হয়, তা সরাসরি কমিশন গ্রহণ করবে এবং প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার এসব কথা বলেন।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘নির্বাচনী দায়িত্বে কর্মরত যে কেউ যদি আইন ভঙ্গ করেন বা তার মধ্যে পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয় তাহলে যে কেউ আমাদের ইনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
অভিযোগ গুরুতর হলে কমিশন নিজেই সেটাকে আমলে নিতে পারেন। অভিযোগ পেলে কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, এমনকি তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা দুর্ব্যবহার যদি আইনের কাঠামোতে আচরণবিধি ভঙ্গের কারণ বলে নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে নিশ্চয়ই তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
রহমানেল মাছউদ আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি নির্বাচনী পরিবেশ তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট ভালো আছে।
সব রাজনৈতিক দলের কর্মী ও নেতাদের কাছে কমিশনের আবেদন থাকবে যেন তারাও একটা সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার জন্য আমাদের সহযোগিতা করেন।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, এ সংক্রান্ত একটি চিঠি সকল রিটানিং অফিসারকে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বাসসকে এ তথ্য জানান তিনি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ১৬-তে উল্লেখ রয়েছে— ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে— (ক) প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করবেন।’
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এ নির্বাচনী ব্যয়সীমা সম্পর্কে বিধি ২২-এর (২) এ আরো উল্লেখ রয়েছে যে, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তৎকর্তৃক মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনবিষয়ক কোনো কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন প্রদান, বুস্টিং ও স্পন্সরশিপসহ সকল প্রচার-প্রচারণার ব্যয়ের শিরোনামে সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যয়সহ নির্বাচন কমিশন বরাবর দাখিল করিবেন।’
এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার প্রচারণায় যে ব্যয় হবে তা নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে রিটার্নিং অফিসারকে দাখিল করার বিধান রয়েছে।
এমতাবস্থায়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায় উল্লিখিত বিষয়সমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশিত হয়ে অনুরোধ করা হলো। একইসাথে রিটার্নিং অফিসারগণকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীগণ কোন কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, সে সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে জনসংযোগ শাখায় প্রেরণ করার জন্য নির্দেশিত হয়ে অনুরোধ করা হলো।’
নেত্রকোনার আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক এ সভায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক এ সভায় জেলা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামসহ সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা নির্বাচনের দিন এবং এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজ নিজ দপ্তরের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন। সুষ্ঠু নির্বাচন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, মব ভায়োলেন্স বলে কোনো কিছু নেই। পুলিশের মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করছে না। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি মিলনায়তনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো প্রার্থী অশোভন আচরণ করলে, তা সমাজে প্রকাশ পেলে এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে যাবে। বেশি কিছু করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, নির্বাচনে কোনো সহিংসতা হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতি ভালো। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্র নিয়মিত উদ্ধার হচ্ছে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এর মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, অতিরিক্ত মহা পুলিশ পরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি। এই সভায় রাজশাহী বিভাগের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নওগাঁর নির্বাচনী ময়দানে উত্তাপ বাড়ছে। তবে ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের মাঝে কেন্দ্র দখল আর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ ততই প্রকট হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার ৭৮২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৪টিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও বেসরকারি ও অন্যান্য সংস্থার হিসেবে এই সংখ্যা চার শতাধিক ছাড়িয়েছে।
জানা যায়, জেলায় ৬টি আসনে বিভিন্ন দলের ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যেখানে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৭৮২টি। মোট ভোটার রয়েছে ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে হিজড়া ভোটার ২১ জন।
সরেজমিনে জেলার মহাদেবপুর, মান্দা, বদলগাছী ও নওগাঁ সদর উপজেলার বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র পরিদর্শন করে জানা যায়, জেলার মহাদেবপুর উপজেলার নাটশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে অর্ধেক সীমানা প্রাচীর না থাকা ও গণ্ডগোলের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়নি।
এছাড়া মান্দা উপজেলার খুদিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো নিরাপত্তা প্রাচীর নেই। এসব বিদ্যালয়ে দুইদিন আগেই সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। গোটগাড়ী শহীদ মামুন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠের উত্তর পাশে টিনের প্রাচীর আছে। এ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা আছে।
মান্দা গোটগাড়ী শহীদ মামুন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। সবগুলো চালু রয়েছে। তবে নির্বাচন উপলক্ষে নতুন করে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, সদর উপজেলার বরুনকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি প্রাচীর থাকলেও অপেক্ষাকৃত নিচু। এখনো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়নি এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানও জানেন না লাগানো হবে কিনা। পশ্চিম নওগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর ও পূর্ব পাশে প্রাচীর না থাকলেও ডোবায় কচুরিপানায় পূর্ণ। তবে নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা আছে।
বরুনকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা আকতার বলেন, একটা মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছিল ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কিছু দেখছি না। আদৌ ক্যামেরা লাগানো হবে কিনা জানা নেই।
নওগাঁ সদর উপজেলার পশ্চিম নওগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসেম আলী বলেন, আমাদের স্কুলটি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা এসে পরিদর্শন করে গেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কিনা জানা নেই। স্কুলের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা কিছু আছে। তবে সিসিটিভি ক্যামেরা দেবে কিনা এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, নির্বাচন কমিশনারের কাছে আশা করেছিলাম, একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে। যা সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু তা হয়নি। ব্যানার ছেড়া হচ্ছে এবং কর্মীদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশনারের কাছে এটুকু চাওয়া শুধু ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র না প্রতিটি কেন্দ্রেই সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে এসে নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হোক। প্রশাসনের যারা মাঠে থাকবেন তারা যেন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
একই আসনের বিএনপির প্রার্থী ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, ভোটাররা যদি স্বতস্ফূতভাবে ভোটকেন্দ্রে আসে এবং ভোট প্রদান করে আমার মনে তাহলে হয়ত কেউ কিছু করতে পারবে না। তবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে নেমে আতঙ্ক তৈরি করছে। এতে অনুমান করা যায়, কোন কোন কেন্দ্র দখল হতে পারে। কয়েকটি কেন্দ্র আমরা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছি এবং প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। প্রশাসন যেন সেগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করে।
নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের জামায়াত প্রার্থী আবু সাদাত মো. সায়েম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যে-কোনো সময় সুযোগ পেলেই তারা হামলে পড়তে পারে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৩৬৪টি গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ২৫৫টি অফলাইন বডি অন ক্যামেরা থাকবে। পাশাপাশি ১০৯টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে অনলাইন বডি অন ক্যামেরা থাকবে। যা সিসিটিভি ক্যামেরার মত কাজ করবে যা কন্ট্রোল রুম থেকে দেখা যাবে। আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটে দুই সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য মাঠে থাকবে। নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর, উৎসবমুখর ও নিরপেক্ষভাবে সম্পূর্ণ করতে পুলিশ সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে।
নিরাপত্তার জন্য সব কেন্দ্রেই সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে জানিয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলায় ৭৮২টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সকল কেন্দ্রেই সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও মাঠে আছে। পাশাপাশি এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে তদারকি করছে। এছাড়া প্রার্থীদের কোনো ধরণের আপত্তি থাকলে তা যাচাই-বাছাই করে সমাধান করা হচ্ছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট-২০২৬ কে সামনে রেখে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে অংশ নিলেন গাইবান্ধা সদর-২ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে পৌর পার্কে জবাবদিহিতা, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় নাগরিকদের বহুল আলোচিত অনুষ্ঠান ‘জনগণের মুখোমুখি’।
নাগরিক সংগঠন সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক, গাইবান্ধা জেলা কমিটির উদ্যোগে জেলা শহরের পৌর পার্কের বিজয় স্তম্ভ চত্বরে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।সুজন জেলা সভাপতি নিউটন প্রামাণিকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক প্রবীর চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সদর আসনের মোট ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী) মনোনীত কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী আহসানুল হাবীব সাঈদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী মিহির কুমার ঘোষ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল মালেক এবং জনতা দলের কলম প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহেদ সরওয়ার।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে প্রার্থীরা পর্যায়ক্রমে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন এবং ভোটারদের কাছে নিজ নিজ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ সময় উপস্থিত সাধারণ নাগরিকরা এলাকার উন্নয়ন, সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের লক্ষ্যে সাধারণ ভোটারদের শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। পাশাপাশি প্রার্থীরাও একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা পাঠ ও স্বাক্ষর করেন, যেখানে তাঁরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এবং জয়-পরাজয় নির্বিশেষে এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
ভিন্নধর্মী এই আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করেন উপস্থিত ভোটাররা। তাঁদের মতে, এ ধরনের মুখোমুখি আয়োজন প্রার্থীদের চিন্তা-চেতনা ও যোগ্যতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে সহায়ক।
আয়োজক সংগঠন সুজন জানায়, “একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ নেই”—এই বিশ্বাস থেকেই ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আবদুর রহমান মাছউদ। বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির আগে এই আসনে পুনরায় নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কোনো সুযোগ নেই। মূলত প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সৃষ্ট জটিলতায় আরপিও অনুযায়ী এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তফশিল সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সামগ্রিক নির্বাচনী প্রস্তুতির সমন্বয় করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রসঙ্গে কমিশনার জানান, বর্তমানে সারা দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা সরাসরি ‘ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি’র কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা যদি নিজে আইন ভঙ্গ করেন কিংবা কোনো বিশেষ প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধেও ইনকোয়ারি কমিটির কাছে অভিযোগ দেওয়া যাবে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে সরাসরি নির্বাচন কমিশন থেকেও তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন।
দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আবদুর রহমান মাছউদ বলেন, কমিশনের পর্যবেক্ষণে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ যথেষ্ট ভালো ও স্থিতিশীল রয়েছে। একটি সুন্দর, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের পরিবেশ বজায় রাখতে তিনি দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রতি উদার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সহযোগিতা থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি সফল জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে।
সম্প্রতি ঢাকা-১৭ আসনের এক প্রার্থীর সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণের বিষয়ে ইসি মাছউদ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ণ হয় কিংবা তাদের মর্যাদাহানি ঘটে এমন কোনো আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করা কমিশনের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে তিনি পুনরায় ব্যক্ত করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ‘সম্মানী’ বা পারিশ্রমিক পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য ও বিকাশ নম্বর হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে এই চক্রটি। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত জাতীয় পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মকর্তাদের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতেই এই ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে একটি অসাধু চক্র ০১৩৪২০৪৬২৩২ এবং ০১৬১২৬৭৭০৭৮—এই দুটি নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণামূলক ফোনকল করছে। তারা নিজেদের নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে দ্রুত সম্মানী পাঠানোর নাম করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশ নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই নম্বরগুলো বা এই ধরণের কোনো ব্যক্তিগত ফোনকলের সঙ্গে কমিশনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এ ধরণের ভুয়া ও প্রতারণামূলক ফোনকলে কোনোভাবেই সাড়া না দেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্মানীর অর্থ প্রদানের সঠিক ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ ও গণভোট কার্যক্রম শেষে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারদের মাধ্যমেই বিধি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তাকে নির্বাচনকালীন সম্মানী প্রদান করা হবে। এটি একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া, যার জন্য কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগের কোনো প্রয়োজন নেই। কমিশন আরও নিশ্চিত করেছে যে, সরকারিভাবে এই লেনদেনের জন্য ইসি বা অন্য কোনো সংস্থা কখনো কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর বা ওটিপি চাইবে না।
জাতীয় নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে এবং অশুভ উদ্দেশ্যে এই প্রতারক চক্রটি মাঠে নেমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, অপরিচিত কোনো নম্বর থেকে নির্বাচন সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কথা বললে তাতে কান না দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। সন্দেহজনক কোনো কল এলে তা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূলত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব ধরণের জালিয়াতি রুখতে কমিশন এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে ভোটারদের সুবিধার্থে ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামে একটি অত্যাধুনিক মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ডিজিটাল উদ্যোগের ফলে ভোটাররা এখন থেকে অত্যন্ত সহজে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে নিজের ভোটকেন্দ্রের সঠিক অবস্থান খুঁজে বের করতে পারবেন। সোমবার নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিকের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতেই এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কাজে লাগানো হচ্ছে।
ইসি জানিয়েছে, ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপটি বর্তমানে গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। ভোটাররা তাদের স্মার্টফোনে এটি ডাউনলোড করে সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে কেবল ভোটকেন্দ্রের নামই নয়, বরং কেন্দ্রটির ভৌগোলিক অবস্থান বা জিও লোকেশন, কেন্দ্রের ছবি, ভোটারের বর্তমান অবস্থান থেকে কেন্দ্রের দূরত্ব এবং ম্যাপের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছানোর সঠিক পথও দেখা যাবে। এর ফলে ভোটের দিন অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের মধ্যে কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা অনেকাংশেই নিরসন হবে বলে আশা করছে কমিশন।
ভোটকেন্দ্রের তথ্যের বাইরেও এই অ্যাপে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী তথ্য ও সেবা যুক্ত করা হয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তারিত তথ্য, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসহ তাদের দাখিলকৃত হলফনামা ডাউনলোড ও দেখার সুযোগ থাকছে এখানে। এছাড়াও নির্বাচনের দিন এই অ্যাপের মাধ্যমেই সর্বশেষ ফলাফল এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তাৎক্ষণিক তথ্য সরাসরি আপডেট করা হবে। ফলে ভোটাররা এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই একটি পরিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত হতে পারবেন।
উল্লেখ্য যে, এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও এই অ্যাপটি চালু করা হয়েছিল এবং সে সময় এটি ভোটারদের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। সেই সফলতার ধারাবাহিকতায় এবং বর্তমান যুগের ডিজিটাল চাহিদার কথা মাথায় রেখে এবার আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ করে অ্যাপটি পুনরায় সচল করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেশের সকল সচেতন ভোটারকে এই অ্যাপটি ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে নির্বাচনের দিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ধরণের স্মার্ট নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।