জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঝিনাইদহ জেলায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা তৎপরতা। ভোটের পরিবেশ শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালে র্যাবের এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না; পরিস্থিতি নষ্টের চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সকালে ঝিনাইদহ র্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এবারের নির্বাচনে ঝিনাইদহে মোট ৫৮৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৩৭টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি থাকবে ভ্রাম্যমাণ স্ট্রাইকিং ফোর্স ও ম্যাজিস্ট্রেট টিম, যারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী ও র্যাব-৬, সিপিসি-২-এর কোম্পানি কমান্ডার জানান, নির্বাচনকে ঘিরে যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে লাল টেপ পেঁচানো অবস্থায় ১০টি বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার করেছে যৌথবাহিনী সদস্যরা। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বানিয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুল-সংলগ্ন বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসের পাশে বোমা সাদৃশ্য বস্তুগুলো পাওয়া যায়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় রাজমিস্ত্রী মো. ফরিদ খান সকালে বানিয়াকান্দি সরকারি স্কুল-সংলগ্ন বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসের পাশে মতিন মাস্টারের নেপিয়ার ঘাস খেতের মধ্যে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে গিয়ে দেখেন দুটি বাজারের ব্যাগ মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তার বিষয়টি সন্দেহ হলে তিনি স্থানীয়দের খবর দিলে স্থানীয়রা পুলিশকে জানায়। খবর পেয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব সদস্যসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছুটে আসেন। পরে সেগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
প্রতক্ষ্যদর্শী মো. ফরিদ খান বলেন, ‘বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই অফিসের পাশে প্রসাব করতে গিয়ে দেখি ওখানে দুটা বাজারের ব্যাগ সুন্দর করে বাঁধা রয়েছে। এটা দেখে অন্যান্য লোকজনকে খবর দিই। পরে তারা পুলিশকে জানায়।’
এ বিষয়ে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে সাথে সাথে চলে আসি। ঘটনাস্থলে এসে দুটি বাজারের ব্যাগ থেকে ৪টি বড় ও ৬টি ছোট সাইজের লাল টেপ পেঁচানো বোমা বা ককটেল সাদৃশ্য বস্তু দেখতে পায়। পরে সেগুলো উদ্ধার করে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।’
কুমারখালী সেনাবাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডার মেজর তারিক বলেন, ‘এনএসআই গোয়েন্দাদের কাছে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসে দুটি বাজারের ব্যাগে লাল টেপ পেঁচানো অবস্থায় ৯-১০টি ককটেল সাদৃশ্য বস্তু পাওয়া গেছে। সেগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেগুলো অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নাশকতা ও অপতৎপরতা ঠেকাতে রাজবাড়ীতে ভোটকেন্দ্রগুলো ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন র্যাব-১০, সিপিসি-৩ ফরিদপুর ক্যাম্পের অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার তারিকুল ইসলাম। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাজবাড়ী পৌরসভার সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি একথা জানান।
র্যাব-১০ ফরিদপুর ক্যাম্পের অধনিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজবাড়ীর জন্য আমরা আলাদাভাবে কেন্দ্র মনিটরিং করার জন্য ড্রোন অপারেটর নিয়ে এসেছি। ড্রোনের মাধ্যমে আমরা ভোটকেন্দ্রে নজরদারি রাখব। আমরা বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নির্ধারণ করে ও কেন্দ্রের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করব। ইতোমধ্যে আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্পের টিমগুলো কেন্দ্র পরিদর্শন করছে। আমরা রাজবাড়ীর দুটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করব। অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর দিকে আমাদের বাড়তি নজরদারি থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন ইতোমধ্যে রাজবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারে নির্বাচনকালীন একটা অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। একজন অফিসারের নেতৃত্বে প্রত্যেকটা আসনভিত্তিক আমরা পেট্রোল দিয়েছি। এর পাশাপাশি আমাদের সিভিল পোশাকেও লোক থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ডেপ্লয়মেন্ট হয়েছি নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী ৩টি বিষয়কে মাথায় রেখে।’
আমরা যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। এরপরেও যদি কোনো প্রকার সহিংসতা ঘটে ও অপতৎপরতার চেষ্টা করা হয়ে থাকে আমরা যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক কঠোর পদক্ষেপ নেব।’
নিরাপত্তা নিয়ে র্যাব সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফরিদপুর জেলা ও রাজবাড়ী জেলায় নিরাপত্তা কার্যক্রম দিয়ে আসছি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীতে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে। একজন অফিসারের নেতৃত্ব ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া ড্রোনের মাধ্যমে আমরা আইনগত ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার জন্য চেষ্টা করব। ভোটের পরেও যদি কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ হয়ে থাকে সেগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষণিক এবং কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনকালে র্যাব-১০, সিপিসি-৩ ফরিদপুর ক্যাম্পের সিনিয়র এএসপি গাজী লুৎফর রহমান, ডিএডি রেজাউল করিমসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের দিন বরিশালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১৬ হাজার সদস্যকে মাঠে সক্রিয় করা হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে গোটা বরিশাল।
তবুও শঙ্কায় রয়েছেন জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা। পাশাপাশি সব ধরনের বৈধ কাগজপত্রসহ তিন দিনে তিনবার আবেদন গ্রহণ করা সত্ত্বেও বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণের কার্ড না দিয়ে চরমভাবে হেনস্তা ও হয়রানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
সূত্রমতে, নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হওয়ার পর থেকে শুরু করে বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছেন তাদের শঙ্কার কথা। সবশেষ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বরিশাল-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী রাজিব আহসান অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনী এলাকায় বাহিরের আসন থেকে (যেখানে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী নেই) জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এসে অবস্থান করায় তিনি আতঙ্কিত বোধ করছেন।
একইদিন বরিশাল-৬ আসনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা মার্কার প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী তালুকদার। তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে উদাসীনতার, অসহযোগিতা ও পক্ষপাতমূল আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িপাল্লার কর্মী সমর্থক ও এজেন্টদের ওপর হামলার অভিযোগ করে সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে নির্বাচনী প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলনিরপেক্ষ পেশাদার ভূমিকা পালনের আহ্বান করেন।
অপরদিকে বরিশাল-১ আসনের ফুটবল মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী গতকাল বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘একটি দলের প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা তার (ফুটবল) মার্কার কর্মী সমর্থক ও এজেন্টদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া তারা সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে দেখিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে।’ যে কারণে তিনি (ইঞ্জিনিয়ার সোবহান) ভোট গ্রহণের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটকেন্দ্রসহ ভোটারদের আসতে যেন কেউ বাধা প্রদান করতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
এর আগে বরিশাল-৩ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ নির্বাচনের দিন শঙ্কার কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এ ছাড়া বরিশালের একাধিক প্রার্থী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের নির্বাচনী এলাকায় বিশেষ দলের ক্যাডারদের দ্বারা ভোটারদের হুমকি, কেন্দ্রে যেতে বাধা ও নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এ ছাড়া জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন স্থানে একাধিক হামলা-মামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রার্থীসহ কর্মীদের কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেও প্রশাসন থেকে অভিযোগ করা প্রার্থীরা কোনো ধরনের সহযোগিতা পায়নি বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
বরিশাল জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম সূত্রে জানা গেছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, আনসার ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সেখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বড় একটি জনবল নিয়োগ করা হয়েছে পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, বরিশাল জেলা পুলিশের অধীনে সাধারণ কেন্দ্রে দুজন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। জেলায় সর্বমোট ১ হাজার ৩৮২ জন পুলিশ সদস্যর পাশাপাশি ৯৯টি মোবাইল টিম এবং ১২টি স্ট্রাইকিং টিম কাজ করছে।
ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকবে জোরালো। বরিশাল জেলার প্রতি উপজেলায় গড়ে ১০০ জন ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ৪০০ জন করে সেনাসদস্য অবস্থান করবেন। এ ছাড়া প্রতি দুই থেকে তিনটি ইউনিয়নের জন্য একটি করে পেট্রোল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি বিজিবির ১৪ প্লাটুন সদস্য জেলার বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে।
নদীবেষ্টিত অঞ্চল হওয়ায় বরিশালের জলপথেও কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জেলার নদীপথগুলোতে অবস্থান করছে জাহাজ ‘বানৌজা সালাম’। যেখানে ৬০ জন কর্মকর্তা ও নাবিক দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে কোস্ট গার্ডের দেড় শতাধিক সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। নদী এলাকার আটটি ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষায় নৌপুলিশও দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সিসিক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে ভোটকেন্দ্রগুলোকে।
নির্বাচন অফিস জানায়, বরিশাল জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে বরিশাল-১ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১২৯টি। এর মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৪৩টি, গুরুত্বপূর্ণ ৫১টি ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি। বরিশাল-২ আসনে মোট ১৪০টির মধ্যে সাধারণ কেন্দ্র ২৫টি, গুরুত্বপূর্ণ ৫১টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ৬৪টি।
বরিশাল-৩ আসনের ১২৬টির মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৩৭টি, গুরুত্বপূর্ণ ৩৯টি ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি। বরিশাল-৪ আসনে ১৪৯টির মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৯৮টি, গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি। বরিশাল-৫ আসনের ১৭৬টির মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৯৩টি, গুরুত্বপূর্ণ ৪৬টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি।
বরিশাল-৬ আসনের ১১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৪৬টি, গুরুত্বপূর্ণ ৩২টি ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের ছয়জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অন্যান্য দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র ৩০ জন প্রার্থী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ ১১৫টি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে উখিয়া-টেকনাফ উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে কোস্ট গার্ডের কড়া নিরাপত্তায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়।
দ্বীপ এলাকায় কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে উখিয়া ও টেকনাফের অন্যান্য কেন্দ্রেও ব্যালট ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর নিরাপত্তায় এসব সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।’
জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ আসনের ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কেন্দ্রগুলোতে আগেরদিন ব্যালট পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’
এ আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির প্রার্থী চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী এবং জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির ও টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চারবারের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক এবং জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-এর সাইফুদ্দিন খালেদ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তবে মাঠের পরিস্থিতিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উখিয়া উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালটপেপারসহ অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছানো হয়েছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম ও বন্দর স্টেডিয়াম থেকে ভোটের সরঞ্জাম কেন্দ্রে পাঠানো শুরু হয়।
চট্টগ্রামের অতিরিক্তি আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘বন্দর স্টেডিয়াম থেকে চট্টগ্রাম ১১ আসনের এবং চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম থেকে মহানগরীর অন্যান্য আসনগুলোর নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রিসাইডিং অফিসারদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলার কেন্দ্রগুলোর প্রিসাইডিং অফিসাররা স্ব-স্ব আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাদের কেন্দ্রের সরঞ্জাম বোঝে নিয়েছেন।’ রাতের বেলা কেন্দ্রে বুথ তৈরিসহ সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা বলে জানান তিনি।
এদিকে ভোটের সরঞ্জাম পাঠানোর সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৪, ৫, ৮-১০ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়া উদ্দিন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবারের নির্বাচনের প্রস্তুতি দেশের অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে বড় প্রস্তুতি।’
নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন কোনো ধরনের ‘ঝুঁকি অনুভব করছে না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করতে সকল সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আমরা প্রত্যেক কেন্দ্রের ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছি।’
চট্টগ্রাম জেলার ১০টি কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার ভালো। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪০ হাজারের বেশি ফোর্স, ১১৫ জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছে। তাদের অধীনে স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করছে। চন্দনাইশে গত মঙ্গলবার রাতে টাকা জব্দ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ২০টি ভোটকেন্দ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সব সরঞ্জাম ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট লোকবল পাঠানো হয়েছে। গত চার দিন ধরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সহায়তায় জেলার চারটি উপজেলার এসব ‘হেলিসর্টি’ ভোটকেন্দ্রে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার মোট ২০টি ভোটকেন্দ্রে ব্যালটবাক্স, নির্বাচনী উপকরণ এবং প্রিসাইডিং অফিসারসহ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার অবশিষ্ট ৬টি ভোটকেন্দ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সরঞ্জাম ও জনবল পাঠানো হলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সব হেলিসর্টি কেন্দ্রে নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
উপজেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, বাঘাইছড়িতে ৬টি, বরকলে ২টি, জুরাছড়িতে ৭টি এবং বিলাইছড়িতে ৫টি হেলিসর্টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৩ হাজার ৫৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৯০২ জন এবং নারী ভোটার ১৫ হাজার ৬৪১ জন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব ভোটকেন্দ্র পাহাড়ের চূড়া ও গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। স্থল বা জলপথে যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকায় হেলিকপ্টারই একমাত্র ভরসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে জেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন প্রায় ৩ হাজার ৪০০ জন সেনাবাহিনীর সদস্য, ৩৭ প্লাটুন বিজিবি, ১ হাজার ৫৯৫ জন পুলিশ এবং ২ হাজার ৭৬৯ জন আনসার সদস্য। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট।
নির্বাচন অফিস সূত্র আরও জানায়, হেলিসর্টি কেন্দ্রের বাইরে রাঙামাটিতে এমন ৩৬টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই এবং ৬৫টি ভোটকেন্দ্র বিদ্যুৎবিহীন। এসব এলাকায় ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল সংগ্রহ ও প্রেরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এবার রাঙামাটি ২৯৯ সংসদীয় আসনে মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বিএনপির দীপেন দেওয়ান, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জুঁই চাকমা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু বক্কর সিদ্দিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহাম্মদ জসীম উদ্দিন, গণঅধিকার পরিষদের এম এ বাশার, জাতীয় পার্টির অশোক তালুকদার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা।
জেলার ১০টি উপজেলায় মোট ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে এবারের নির্বাচনে ভোট দেবেন ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭ জন ভোটার।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার নাজমা আশরাফী জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়েই কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছেন এবং দুর্গম এলাকার ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটের দিন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভোটার উপস্থিতির হার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটগ্রহণ চলাকালে সারাদিনে মোট চার ধাপে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ও শতকরা হার কমিশন সচিবালয়ে পাঠানোর জন্য দেশের সকল রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠির মাধ্যমে এই নতুন কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের প্রকৃত চিত্র এবং জনগণের অংশগ্রহণের হার তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের উচ্চপর্যায় ও কমিশন থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের দিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর সারাদিনে মোট চারবার ভোটের তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করতে হবে। প্রথম প্রতিবেদনটি পাঠাতে হবে সকাল ১০টায়, এরপর দুপুর ১২টায়, তৃতীয় দফায় দুপুর ২টায় এবং সর্বশেষ প্রতিবেদনটি পাঠানো হবে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসাররা তাঁদের নিকট রক্ষিত ব্যালট পেপারের মুড়ি গণনা করে ওই সময় পর্যন্ত ঠিক কতটি ভোট পড়েছে এবং তার হার কত, তা সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করবেন। এর ফলে মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভোটের গতির সঠিক ধারণা পাবেন।
তথ্য সংগ্রহের পর তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠানোর জন্য বিশেষ কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত তথ্য সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা আরএমএস (রিজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ইউজারের মাধ্যমে অনলাইনে এন্ট্রি করবেন। রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা ‘কপোত’ নামক একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে এই সকল তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এই সিস্টেমটি ব্যবহারের ফলে তথ্যের নির্ভুলতা বজায় থাকবে এবং যেকোনো কেন্দ্র থেকে আসা তথ্যের অসামঞ্জস্য দ্রুত শনাক্ত করা যাবে বলে কমিশন মনে করছে।
এই পুরো পরিসংখ্যান ও তথ্য প্রবাহের বিষয়টি কেবল নির্বাচন কমিশন নয়, বরং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও সরাসরি মনিটর করা হবে বলে ইসির চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নির্ধারিত সময়ে এবং নিখুঁতভাবে ডাটা এন্ট্রি করাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তথ্যে কোনো প্রকার গরমিল বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার তথ্য সংগ্রহের সময় ভোটগ্রহণ শুরু থেকে নির্ধারিত রিপোর্টিং সময় পর্যন্ত ব্যবহৃত ব্যালটের মুড়ি সংখ্যা মিলিয়ে চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করতে হবে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চার ধাপে তথ্য সংগ্রহের এই সিদ্ধান্তটি একটি আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে একই সময়ে সংসদীয় আসন ও গণভোটের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া সহজ হবে। ইতিমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তথ্য এন্ট্রি করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ইন্টারনাল নেটওয়ার্কের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। সব বাধা কাটিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন এই প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।
ভোট আসে ভোট যায়; কিন্তু তাদের দূরত্ব কমে না। ভোট ছাড়াও সারা বছরই তাদের সীমাহীন ভোগান্তি নিয়ে নিজ জেলা ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা-যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরবাসীকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌ, সড়ক ও বালুময় পথ পাড়ি দিয়ে ভোট দিতে আসতে হয় ভোটকেন্দ্রে।
চরবাসী সেখানে অবস্থিত বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্র স্থাপন করে আগামীতে তাদের এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের বেতকা ও রাখালগাছি এবং দৌলতদিয়া ইউনিয়ন ১নং ওয়ার্ডের কুশাহাটা চরাঞ্চলে অন্তত ৫ হাজার মানুষের বসবাস। চর দুটি রাজবাড়ী-১ আসনের অন্তর্ভুক্ত।
জানা গেছে, দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা ও রাখালগাছি চরে রয়েছে ২৬৬ জন ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছে ১৪৪ জন এবং মহিলা ভোটার রয়েছে ১২২ জন। অপরদিকে দৌলতদিয়া ইউনিয়নের কুশাহাটা গ্রামে মোট ভোটার সংখ্যা ৮১ জন।
স্থানীয়রা জানান, তাদের দীর্ঘ প্রায় ১৫ কিলোমিটার নৌ, সড়ক ও পায়ে হাটা বালুময় পথ পাড়ি দিয়ে নদীর ওপারে অবস্থিত ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসতে হয়। এতে করে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ওই চরে অবস্থিত বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
এ বিষয়ে বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য বদলিকৃত শিক্ষক হুমায়ন কবির জানান, বেতকা রাখালগাছি ভোটারদের প্রায় ১৪-১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাউয়লজানি চর ৪৯নং দেবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভোট দিতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে তাদের কষ্ট বেশি হয়। কমপক্ষে ৬-৭ কিলোমিটার পথ হেঁটে পরে ট্রলারযোগে পারাপার হয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। আমি বেশ কবছর প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে নদী পাড়ি দিয়ে ওখানকার স্কুলে চাকরি করেছি।
কুশাহাটা গ্রামের মুদি দোকানদার আব্দুল হালিম ও স্কুলশিক্ষক ওয়াজউদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ ১২-১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের ভোট দিতে আসতে হয়। বর্ষা মৌসুম হলে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। তখন অবশ্য বাড়ির ওপর থেকেই ট্রলারে ওঠে ভোটকেন্দ্রে আসা যায়। কিন্তু এখনকার মতো শুকনা মৌসুমে কষ্ট একটু বেশিই হয়। কমপক্ষে ৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পরে ট্রলারযোগে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিতে হয়। এ কারণে অনেকে ভোট দিতে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আগামীতে স্থানীয় ভোটের মতো জাতীয় নির্বাচনেও আমরা এখানে কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানাই।’
দুই ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন ভোটার আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভোট আসে ভোট যায়; কিন্তু তাদের দূরত্ব কমে না। ভোট ছাড়াও সারা বছরই তাদের সীমাহীন ভোগান্তি নিয়ে নিজ জেলা ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়।’
তারা আরও বলেন, ‘ভোট দিতে গেলেও জ্বালা, আবার না দিতে গেলেও জ্বালা। আমরা চরবাসী আজীবন কষ্ট করেই যাচ্ছি। প্রচণ্ড রোদ আর ধুলাবালি মাড়িয়ে অবশেষে বিশাল পদ্মায নদী ট্রলার যোগে পার হয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়।’
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস বলেন, ‘বেতকা-রাখালগাছি ও কুশাহাটা ভোটাররা বিগত নির্বাচনে যেভাবে কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে এসেছে এ বছর একইভাবে ভোটকেন্দ্রে আসতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা নেই। নির্দেশনা পেলে আমরা হয়তো নদীপার হওয়ার জন্য ট্রলার ও কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে অটোরিকশার ব্যবস্থা করতাম। তবে দুর্গম চরাঞ্চলের ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাতে করে আসতে পারে সে ব্যাপারে শতভাগ নিরাপত্তা দেবে উপজেলা প্রশাসন।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল আগামী শুক্রবার সকালে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। বুধবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। সানাউল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবারের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সারা দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গণনা শেষে পরদিন সকালেই চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগের ভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি জানান, পোস্টাল ভোটের রেজিস্ট্রেশন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হলেও পরবর্তী কার্যক্রমগুলো ম্যানুয়েল বা সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই ভোটগুলো প্রতিটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসন অনুসারে গণনা করা হবে। তবে এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে; ভোটের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে যে ব্যালটগুলো ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছাবে, কেবল সেগুলোই চূড়ান্ত গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর পরে আসা কোনো ব্যালট গ্রহণ করা হবে না।
নির্বাচনি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ঘিরে তিন স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। এ ছাড়া বিগত গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে তিনি জানান যে, ইতিমধ্যে ৯ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা নির্বাচনি এলাকার নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ বজায় থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দ্বৈত নাগরিকদের ভোটাধিকার এবং প্রার্থিতা নিয়ে সৃষ্ট আইনি ধোঁয়াশাও এই ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেন তিনি। সানাউল্লাহ জানান, দ্বৈত নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বাধা নেই, তারা ভোটার হিসেবে নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে কেউ সংসদ সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন না। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই অন্য দেশের নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করতে হবে।
উল্লেখ্য, আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কোনো বিরতি ছাড়াই বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সনদের ওপর গণভোটের ভোটগ্রহণ চলবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন তাদের যাবতীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সরব উপস্থিতি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে আরও জোরালো করবে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় এবং নির্বাচনি অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। মূলত মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য যাচাই-বাছাই এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই সেল গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ১ নম্বর ভবনের ১৮০২ নম্বর কক্ষে এই কন্ট্রোল রুমের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ সেবা আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। পুরো কার্যক্রমের সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন একজন করে যুগ্মসচিবকে সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি শিফটে একজন করে উপসচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিবের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অফিস সহায়কদের একটি দল নিয়োজিত থাকছে।
জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য কন্ট্রোল রুমে একটি বিশেষ হটলাইন নম্বর (+৮৮০২২২৬৬৪১১১৮) চালু করা হয়েছে। এই নম্বরে যোগাযোগ করে নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ বা জরুরি তথ্য প্রদান করা যাবে। কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ পর্যালোচনার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর রিটার্নিং অফিসারদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করবেন। কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে নির্বাচনি স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শোবিজ জগতের তারকারাও এই নির্বাচনি আমেজে শামিল হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন দেশের প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী আবদুল কুদ্দুস বয়াতি। গত সোমবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নির্বাচনি প্রচারণার একটি বিশেষ বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কুদ্দুস বয়াতি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘গানকে হারাম বলা দলটাও গানে গানে ভোট খুঁজছে।’
যদিও তাঁর এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে তিনি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি, তবে নেটিজেনদের মধ্যে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেরই ধারণা, তিনি সেইসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দলগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন যারা আদর্শগতভাবে সংগীতের বিরোধিতা করে থাকলেও ভোটের ময়দানে সাধারণ মানুষের সমর্থন টানতে সংগীত ও প্যারোডি গানের ব্যাপক আশ্রয় নিচ্ছে। এই পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা নেটদুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর অনুসারীদের বড় একটি অংশ এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
আবদুল কুদ্দুস বয়াতি দীর্ঘ দিন ধরেই জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব থাকেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নির্দেশনায় ‘এই দিন দিন না আরও দিন আছে’ শিরোনামের জনসচেতনতামূলক গানের মাধ্যমে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। এরপর থেকে লোকসংগীতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কথা বলা এই শিল্পী বিজ্ঞাপনচিত্র, নাটক ও প্রামাণ্যচিত্রে কণ্ঠ দিয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এমনকি করোনা মহামারির সময় সচেতনতামূলক গান গেয়েও তিনি বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
নেত্রকোনার এই গুণী শিল্পী বর্তমানে তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ি কেন্দুয়া উপজেলার রাজীবপুরে অবস্থান করছেন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর এই মন্তব্যটি নির্বাচনি প্রচারণার এক বিশেষ দিকের ওপর আলোকপাত করেছে। সাধারণ মানুষের মতে, গ্রামীণ জনপদে প্রচারণার ক্ষেত্রে লোকজ সুর ও ছন্দের আবেদন এতটাই বেশি যে, রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা থাকলেও প্রচারণার কৌশল হিসেবে সংগীতকে এড়িয়ে চলা দলগুলোর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুদ্দুস বয়াতির এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণটি তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের কাছে এর নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান করার লক্ষে জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে ‘ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম’ গঠন করা হয়েছে। কমিশনের এই বিশেষ উদ্যোগের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনি পরিবেশ এবং ভোটগ্রহণের সার্বিক চিত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জেলা ও মেট্রোপলিটন পর্যায়ে গঠিত এই টিমগুলোর নেতৃত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার। এই টিমে বিভিন্ন সরকারি বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের দলনিরপেক্ষ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে তৃণমূল পর্যায়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে পৃথক ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম গঠন করা হয়েছে। এর বাইরে নির্বাচনি কার্যক্রম সরাসরি তদারকির জন্য রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ ‘নির্বাচন মনিটরিং টিম’ কাজ করবে, যেখানে সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধিদেরও সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এই সমন্বিত ব্যবস্থার ফলে প্রার্থীরাও সরাসরি নির্বাচনি তদারকিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
নির্বাচনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে সমন্বয় সাধনের লক্ষে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে একটি ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’ গঠন করা হয়েছে। এই সেলটি মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ে কাজ করবে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ভোটারদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এই সেলের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার ও গুজব মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ইসি। এজন্য একটি পৃথক ‘আইনশৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেল’ গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ সেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সেলটি মূলত নির্বাচনি এলাকায় সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অপতথ্য বা গুজব শনাক্ত করে তা নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সব মিলিয়ে একটি উৎসবমুখর ও সফল নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রশাসনিক ও তদারকি কাঠামো চূড়ান্ত করেছে।