ঢাকা-১ আসনে (দোহার ও নবাবগঞ্জ) আসনে বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী আবু আশফাক। বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী পেয়েছেন এক লাখ ৭৩ হাজার ৭৮১ ভোট।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম বেসরকারিভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, আসনটিতে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার। মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৮৫টি। এর মধ্যে এক লাখ ৭৩ হাজার ৭৮১ ভোট পেয়ে আবু আশফাক বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম পেয়েছেন এক লাখ ১২ হাজার ৬২২ ভোট।
চার হাজার ৮৮০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিম হুদা। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ছয় হাজার ৬০০, লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মো. নাসির উদ্দিন মোল্লা এক হাজার ৩৬২ ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির শেখ মো.আলী ২৭৩টি ভোট পেয়েছেন।
রেজাউল করিম বলেন, “আসনটিতে মোট ভোট পড়েছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৫২৩টি। বাতিল হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৯৯টি।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি আসনের চারটিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এছাড়া বাকি একটি আসনে জামায়াত জোট থেকে এনসিপির প্রার্থী জয় পেয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারী) ভোর ৫ টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির এই ফল ঘোষণা করেন ।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি ইমদাদুল্লাহ হাসেমী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭ হাজার ১৮৬ ভোট। এই আসনে ৬৩. ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মোঃ ইলিয়াস মোল্লা ৮২ হাজার ৯৮৭ ভোট পেয়েছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খান আঙ্গুর ১৮ হাজার ৯৩৩ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৮ ভোট পেয়েছেন। ফুটবল প্রতিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ২০ হাজার ৩৭৯ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে ৫৭. ৪১ শতাংশ ভোট পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেজুর গাছ প্রতীকে বিএনপি জোট থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট পেয়েছেন। এছাড়া হরিণ প্রতিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোঃ শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট পেয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবুল কালাম ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেয়াল ঘড়ি প্রতীকের খেলাফতে মজলিশের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন ১ লাখ ১ হাজার ১৯৬ ভোট পেয়েছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীকে মাকসুদ হোসেন ৩৪ হাজার ১৫১ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে ৫৬. ৫১ শতাংশ ভোট পড়েছে।
প্রসঙ্গত, জেলার পাঁচটি আসনে ৪৭ জন প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মো.আব্দুল আজিজ বিজয়ী হয়েছেন। দুই উপজেলার ১৬৭টি কেন্দ্র ও পোষ্টাল ব্যালটের ফলাফল একত্রিত করে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত ১ টার দিকে নিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বেসরকারিভাবে আব্দুল আজিজকে বিজয়ী ঘোষনা করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নাটোর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আজিজ ৩৫ হাজার ৮৬৫ ভোটে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। পোষ্টাল ব্যালটের ৭০৪ ভোটসহ তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৫৫১ ভোট। তার নিকটতম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল হাকিম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৬ ভোট। এরমধ্যে পোষ্টাল ব্যালটের ১ হাজার ১৯৭ ভোট যুক্ত করা হয়েছে।
এ আসনের ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন। অন্যদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী এমদাদুল্লাহ্ (হাতপাখা) পেয়েছেন ৩ হাজার ৮১৮ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম ইউসুফ আহম্মদ (লাঙ্গল) পান ২ হাজার ৭৭০ ভোট এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মোকছেদুল মোমিন (ঈগল) পেয়েছেন ২৫৪ ভোট। ১৬৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার ছিলো ৭১.৬৪ শতাংশ।
বিজয়ী আব্দুল আজিজ বলেন,এ বিজয় ১৭ বছরের ভোটের অধিকার ফেরানো আন্দোলন সংগ্রামের ফসল। এ বিজয় মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের শক্তির বিজয়। ৭১ সালের মতো ব্যালট যুদ্ধে এ আসনের মানুষ আমাদের বিজয়ী করেছে। এ বিজয় গুরুদাসপুর বড়াইগ্রামবাসীর বিজয়,বিএনপির বিজয়,তারেক রহমানের বিজয়।
উল্লেখ্য নাটোরের ৪ টি সংসদীয় আসনের সবক’টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। অন্যরা হলেন- নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে ব্যরিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল, নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসনে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে আনোয়ারুল ইসলাম আনু।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে নামলেও তিনি কেবল পরাজিতই হননি, বরং নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী ন্যূনতম ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ায় তার নির্বাচনী জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। শুক্রবার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেটলি প্রতীক নিয়ে মান্না মাত্র ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়েছেন। অথচ এই আসনে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা মোট ভোটারের ৭২.৬৩ শতাংশ।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর জামানত রক্ষা করতে হলে তাকে মোট বৈধ ভোটের কমপক্ষে ১২.৫ শতাংশ বা এক-অষ্টমাংশ ভোট পেতে হয়। বগুড়া-২ আসনের ভোটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জামানত টিকিয়ে রাখতে মাহমুদুর রহমান মান্নার প্রয়োজন ছিল অন্তত ৩০ হাজার ৪৭৬ ভোট। কিন্তু তিনি প্রাপ্ত বৈধ ভোটের মাত্র ১.৪ শতাংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় তার জমা দেওয়া জামানতের অর্থ এখন সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বড় কোনো জোটের সমর্থন না পাওয়া এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা ব্যর্থ হওয়া মান্নার এই ভরাডুবির প্রধান কারণ। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আসনটি বিএনপির পক্ষ থেকে মান্নাকে ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও, শেষ পর্যন্ত বিএনপি সেখানে নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। ফলে শক্তিশালী কোনো সাংগঠনিক সমর্থন ছাড়াই এককভাবে লড়াই করতে গিয়ে তিনি এই প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। এক সময়ের তুখোড় এই ছাত্রনেতা নিজের জন্মভূমিতে এমন শোচনীয় ফলাফল করবেন, তা ছিল অনেকেরই ধারণার বাইরে। সব মিলিয়ে শিবগঞ্জের নির্বাচনী লড়াইয়ে মান্নার এই ফলাফল তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে বিএনপি প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন, যেখানে জামায়াতে ইসলামী ৬টি আসনে জয় পেয়ে চমক দেখিয়েছে। এছাড়া ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়েছেন। শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এই বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা-১৭ হাই-ভোল্টেজ আসনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর স ম খালিদুজ্জামানকে পরাজিত করেন। রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসনের মধ্যে ঢাকা-৮ এ বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পরাজিত করেছেন। ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির ইশরাক হোসেন এবং ঢাকা-৩ আসনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। এছাড়া ঢাকা-১ আসনে খন্দকার আবু আশফাক, ঢাকা-২ আসনে আমানউল্লাহ আমান এবং ঢাকা-৭ আসনে হামিদুর রহমান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ঢাকার উত্তরের আসনগুলোতেও বিএনপির আধিপত্য দেখা গেছে, যেখানে ঢাকা-১০ আসনে শেখ রবিউল আলম, ঢাকা-১৮ আসনে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ঢাকা-৯ আসনে হাবিবুর রশিদ জয় নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা-১৩ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ববি হাজ্জাজ জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মামুনুল হককে পরাজিত করে বিজয়ী হন।
অন্যদিকে, ঢাকার নির্বাচনী মানচিত্রে জামায়াতে ইসলামী তাদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দিয়েছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে ৮৫ হাজার ১৩১ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেছেন। ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমাদ বিন কাসেম বড় ব্যবধানে বিএনপির সানজিদা ইসলামকে পরাজিত করেছেন। এছাড়া ঢাকা-৪ আসনে সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা-৫ আসনে মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল আলম এবং ঢাকা-১৬ আসনে আব্দুল বাতেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রার্থীরাই শেষ হাসি হেসেছেন।
এবারের নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রমী ফলাফল এসেছে ঢাকা-১১ আসনে। সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা নাহিদ ইসলাম ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি মাত্র ২ হাজার ৩৯ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুমকে পরাজিত করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ঢাকার আসনগুলোতে গড় ভোট প্রদানের হার ৪৫ থেকে ৪৮ শতাংশের মধ্যে ছিল এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল। সাভার ও ধামরাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসনেও (ঢাকা-১৯ ও ঢাকা-২০) বিএনপির দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও তমিজ উদ্দিন বড় জয় পেয়েছেন। এই ফলাফলের মাধ্যমে ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতার ভারসাম্য ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম শোচনীয় ফলাফলের মুখ দেখেছেন। ট্রাক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই প্রার্থী তিনটি কেন্দ্রের ফলাফলে সর্বসাকুল্যে মাত্র ৯টি ভোট পেয়েছেন বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে ভোট গণনা শেষে বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মেঘনা আলম পেয়েছেন ৭টি ভোট এবং শান্তিবাগ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে তার বাক্সে পড়েছে মাত্র ২টি ভোট। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, কমলাপুর শেরে বাংলা রেলওয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে তিনি একটি ভোটও পাননি; অর্থাৎ সেখানে তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা শূন্য। ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর এমন ফলাফল দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
এদিকে সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। দু-একটি জেলায় ককটেল বিস্ফোরণসহ বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে নির্বাচন চলাকালে পৃথক ঘটনায় অসুস্থ হয়ে চার ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কিছু অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ভোটের হার সম্পর্কে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ের সামনে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গড় ভোট পড়ার হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। দিনশেষে এই হার আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) দুর্গ হিসেবে খ্যাত রংপুরে দলটির চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। দীর্ঘদিনের আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও এবার রংপুরের একটি আসনেও জয়ের দেখা পায়নি লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা। দলের এই ভরাডুবির মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে এসেছে খোদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর শোচনীয় পরাজয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই দুই শীর্ষ নেতা নিজ নিজ আসনে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন, যা দলটির জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রংপুর-৩ (সদর ও সিটি কর্পোরেশন) আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বিগত সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার তিনি ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। এই আসনে তিনি মাত্র ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। বিপরীতে এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবার রহমান বেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে জিএম কাদেরের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শামসুজ্জামান সামু। একইভাবে গাইবান্ধা-১ আসনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ৩৩ হাজার ৯৭৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে থেকে পরাজিত হয়েছেন। সেখানেও জামায়াতে ইসলামীর মো. মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
জাতীয় পার্টির এই নজিরবিহীন ব্যর্থতার বিপরীতে রংপুরে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোট সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রংপুর-৪ আসনে চমক দেখিয়েছেন এনসিপির প্রার্থী ও ছাত্রনেতা আকতার হোসেন। তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে বিএনপির এমদাদুল হক ভরসাকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। এছাড়া রংপুর-১ আসনে জামায়াতের রায়হান সিরাজী ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৪৫ ভোট, রংপুর-২ আসনে এটিএম আজাহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট, রংপুর-৫ আসনে গোলাম রব্বানী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট এবং রংপুর-৬ আসনে নুরুল আমীন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, রংপুরের প্রায় প্রতিটি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীদের। বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিটি আসনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোটের লড়াইয়ে কার্যত কোণঠাসা ছিলেন। রংপুরের রাজনীতিতে এরশাদ-পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টির এমন অস্তিত্ব সংকট এবং জামায়াত ও এনসিপির এই অভূতপূর্ব উত্থান উত্তরের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করেছেন।
তবে আইনি জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে কমিশন থেকে জানানো হবে। ইসি সচিব তার সমাপনী বক্তব্যে জানান যে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ২৯৭টি আসনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে আনা হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়েই নির্বাচনের মূল ফলাফল ঘোষণার কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটল।
নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সকল কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আখতার আহমেদ বলেন, "সবার সহযোগিতা ও ধৈর্যের মধ্য দিয়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই ধৈর্যের পরীক্ষায় সবাই উত্তীর্ণ হয়েছেন।" উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে আদালতে মামলা চলমান থাকার কারণে শেরপুর-২ সহ চট্টগ্রামের ওই দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত রাখার বিষয়ে তিনটি পৃথক নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে শেরপুর-২ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হলেও ওই আসনের গেজেট আপাতত প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাকি দুই আসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম ও পর্যালোচনা শেষে দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী আমীর এজাজ খান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আলোচিত হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক দল থেকে হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ায় এই আসনটি দেশজুড়ে বিশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, ধানের শীষ প্রতীকে আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৯২ ভোট। অন্যদিকে, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৬৫৮ ভোট। ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৪৩৪। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোট গণনা শেষে সন্ধ্যায় স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা এই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। ফলাফলে দেখা যায়, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থীর ওপরই তাদের আস্থা রেখেছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি দেশজুড়ে সাংবিধানিক সংস্কার ও অন্যান্য ইস্যুতে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দীর্ঘ দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের চিত্র উঠে এসেছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা থেকে প্রকাশিত চূড়ান্ত তথ্যে জানানো হয়েছে, এবারের নির্বাচনে সারা দেশে গড় ভোটার উপস্থিতির হার দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফেরানোর অন্যতম মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলের আকস্মিক মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, প্রদত্ত মোট ভোটের হার ৬০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট পড়েছে ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ, যার মধ্যে বৈধ ভোটের হার ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ জন, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার প্রথমবারের মতো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কারাবন্দিরাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
নির্বাচনটিকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং নির্বাচনী আচরণবিধি তদারকিতে মাঠে ছিলেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এমনকি পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে দেশব্যাপী প্রায় এক হাজার ড্রোন ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ব্যতীত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টিসহ মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। ২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৩ জন।
দীর্ঘদিনের শঙ্কা কাটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের ভোটকেন্দ্রগুলোতে তরুণ থেকে প্রবীণ ভোটারদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পর দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভোটাররা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পর তারা নির্বিঘ্নে ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের পথও সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে সবকয়টিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি। কোন আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি প্রতিদ্বন্দ্বিরা। তবে নিকটতম ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা।
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা-মধ্যনগর-তাহিরপুর-জামালগঞ্জ) আসনে বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল জয়ী হয়েছেন। বৃহস্পতিবার কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত ভোট গণনায় প্রায় ১১ হাজার ভোট বেশি পেয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, এই আসনে ১৭৭ ভোটকেন্দ্রের সবগুলোর গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এতে বিএনপি প্রার্থী সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল পেয়েছেন এক লাখ ৬৪ হাজার ২৬১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা উপাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ খান পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৩৩৪ ভোট। নির্বাচনী এলাকার চার উপজেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিস থেকে এই ফলাফল পাওয়া গেছে।
সুনামগঞ্জ-২ আসনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, নাছির উদ্দিন চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি মোহাম্মদ শিশির মনির দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৫৮ ভোট। ৩৯ হাজার ৯৩২ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী। বিজয়ী প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ফেসবুক আইডি থেকে ফলাফল প্রচার করা হয়েছে। পরাজিত জামায়েতের প্রার্থী শিশির মনির বিজয়ী নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে অভিনন্দন জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ৯৬ হাজার ৬৬৬ ভোট পেয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন তালা প্রতীকে ৪১ হাজার ৯৮৪ ভোট পেয়েছেন। ৫৪ হাজার ৬৮২ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন কয়ছর আহমেদ। রাত সাড়ে ৯টায় দিকে কয়ছর আহমেদের নির্বাচনী কন্ট্রোল রুম থেকে এই তথ্য জানানো হয়।
সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপির নূরুল ইসলাম নূরুল পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৫৫৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াতের মো. সামছ উদ্দিন পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৭৪ ভোট। এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন পেয়েছেন ১৮ হাজার ৯১১ ভোট। বিজয়ী নূরুল ইসলাম নূরুলের ফেসবুক আইডি থেকে এই ফলাফল প্রচার করা হয়।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনের বেসরকারি ফলাফলে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবু তাহির মুহাম্মদ আবদুস সালাম। জানা যায়, ছাতক উপজেলায় ধানের শীষ প্রতীকে কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮০৭ ভোট। অপরদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আবু তাহির মুহাম্মদ আবদুস সালাম পেয়েছেন ৬১ হাজার ৮৩০ ভোট। এখানে ব্যবধান রয়েছে ২৯ হাজার ৯৭৭ ভোট। দোয়ারাবাজার উপজেলায় ধানের শীষ পেয়েছে ৬১ হাজার ১৯০ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আবু তাহির মুহাম্মদ আবদুস সালাম পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৯৮ ভোট। এ উপজেলায় ব্যবধান ২৩ হাজার ৯২ ভোট।
দুই উপজেলা মিলিয়ে কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন (ধানের শীষ) মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৭ ভোট পেয়েছেন। আবু তাহির মুহাম্মদ আবদুস সালাম (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৯৯ হাজার ৯২৮ ভোট। বেসরকারি হিসাবে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ৫৩ হাজার ৬৯ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসনের ৭টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয় লাভ করেছেন। তারা হলেন-বগুড়া-১ কাজী রফিক, বগুড়া-২ মীরশাহে আলম, বগুড়া-৩ মুহিত তালুকদার, বগুড়া-৪ মোশাররফ হোসেন, বগুড়া-৫ গোলাম মোঃ সিরাজ, বগুড়া-৬ তারেক রহমান, বগুড়া-৭ মোরশেদ মিলটন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় এ ফলাফল পাওয়া যায়। এর আগে এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এদিন দেশজুড়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় পাওয়া প্রাথমিক ফলাফলে বগুড়া জেলার সাতটি সংসদীয় আসনেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ চলে, যেখানে সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররা 'জুলাই সনদ ২০২৫' বাস্তবায়নের প্রশ্নে একটি গণভোটেও অংশ নিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত আংশিক তথ্যে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি আসনেই ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
ভোলা জেলার চারটি সংসদীয় আসনের বেসরকারি ও আংশিক ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের জোটের প্রার্থীদের একচ্ছত্র আধিপত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রাপ্ত সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, ভোলা-১ আসনের ১১৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯৪টি কেন্দ্রের ফলাফলে গরুর গাড়ি প্রতীকের প্রার্থী ও বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে ভোলা-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম ১ লাখ ২১ হাজার ৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৪৯৮ ভোট। মূলত ২৭ হাজার ৫০৭ ভোটের ব্যবধানে এই আসনে জয় নিশ্চিত করেছেন হাফিজ ইব্রাহিম।
একইভাবে ভোলা-৪ আসনে বড় ব্যবধানের জয় পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম নয়ন। তিনি ১ লাখ ৯০ হাজার ৫ ভোট সংগ্রহ করে বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁর বিপরীতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন ৮২ হাজার ৩৯৮ ভোট। ফলে ১ লাখ ৮ হাজার ৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে নয়নের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে।
এদিকে ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। এই আসনের ১১৯টি কেন্দ্রের সবকটির ফলাফলে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭৪ ভোট পেয়েছেন, আর তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের মুহা. নিজামুল হক নাঈম ফুলকপি প্রতীক নিয়ে সংগ্রহ করেছেন ৫৫ হাজার ৬৬০ ভোট। লালমোহন উপজেলার ৮৩টি কেন্দ্রে তিনি ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৯ ভোট এবং তজুমদ্দিন উপজেলার ৩৬টি কেন্দ্রে ৪৮ হাজার ৫০৫ ভোট অর্জন করেছেন। অভাবনীয় এই সাফল্যের পর বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ২৩ মিনিটে এক আবেগঘন ফেসবুক বার্তায় তিনি লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, সিজদায় অবনত হয়ে শোকরিয়া জানাই মহান আল্লাহর প্রতি। কৃতজ্ঞতা জানাই প্রিয় লালমোহন-তজুমদ্দিন বাসীর প্রতি। সপ্তম বারের মতো আমাকে আপনারা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী করেছেন।” তবে পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. শাহ আজীজ জানিয়েছেন যে, চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হতে রাত ১১টা থেকে ১২টা বাজতে পারে। ভোলার এই নির্বাচনী ফলাফলগুলো বর্তমানে জেলাজুড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।