ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে ইচ্ছুক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিবন্ধন কার্যক্রম আগামী রোববার থেকে শুরু হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, নিবন্ধন কার্যক্রম চলবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত।
আজ বুধবার ইসির পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা আব্দুল মমিন সরকার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটদানে ইচ্ছুক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনবিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানিয়েছিলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট দিতে ইচ্ছুক প্রবাসী ভোটাররা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন করতে পারবেন।
এখন দেশের অভ্যন্তরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ (আইসিপিভি) ক্যাটাগরিতে নিবন্ধন শুরু হলো।
আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।
পূর্বে আগামী ১২ নভেম্বর প্রাথমিক নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পরিকল্পনা থাকলেও সেখান থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্কুল-কলেজের পরীক্ষা, ভোটকেন্দ্রের ব্যবহার এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওই সময়ে ভোটগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইসি মাছউদ আরও জানান, ভোটের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এছাড়া ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যে সংলাপের কথা ছিল, সেটিও বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারও নির্বাচনী আবহে ফিরতে যাচ্ছে দেশের তৃণমূলের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১২ নভেম্বর ৮০টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে ভোটের এ দীর্ঘ আয়োজন। এরপর ধাপে ধাপে সারাদেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সোমবার নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। কমিশন সাত ধাপে নির্বাচন করার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সম্ভাব্য তারিখগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে ১২ নভেম্বর। দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর। এরপর আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি চতুর্থ ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম ধাপ, ২২ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপ এবং ২৭ মে সপ্তম ধাপের ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নভেম্বর থেকে শুরু করে প্রায় সাড়ে ছয় মাস ধরে চলতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া। প্রথম তিন ধাপের ভোট হবে নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে। এরপর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই ধাপ এবং বিরতির পর এপ্রিল ও মে মাসে শেষ দুই ধাপে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই সময়সূচিকে এখনই চূড়ান্ত তফসিল হিসেবে দেখছে না কমিশন। মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তারিখ ও ধাপের পরিধিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথম ধাপেই পুরো দেশের ইউনিয়ন পরিষদে ভোট না নিয়ে ৮০টি উপজেলাকে নির্বাচনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে ইসি। এ ধাপের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে।
নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি এক ধরনের পরীক্ষামূলক পর্যায়ও হতে পারে। প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ধাপগুলোর ভোট ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা, ভোটকেন্দ্র পরিচালনা ও মাঠ প্রশাসনের সমন্বয়ে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
একই সঙ্গে কয়েক হাজার ইউনিয়নে একসঙ্গে ভোট আয়োজন না করে সাত ধাপে নির্বাচন করায় কমিশনের ওপর প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত চাপও তুলনামূলকভাবে ভাগ হয়ে যাবে।
ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে দেশের স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বিস্তৃত ও জনগণের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। গ্রামের রাস্তা, সড়কবাতি, পানি ও স্যানিটেশন, স্থানীয় অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কার্যক্রমসহ নানা বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে।
ফলে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন শুধু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সেবা পাওয়ার বিষয়টিও।
জাতীয় রাজনীতির বাইরে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরিতেও ইউপি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনের মধ্য দিয়েই অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা পরবর্তী সময়ে উপজেলা কিংবা জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে উঠে আসেন।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে আইনি কাঠামোও রয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, একটি পরিষদের সাধারণ নির্বাচন পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আইন, নির্বাচন বিধিমালা এবং নির্বাচন আচরণবিধির আলাদা কাঠামো রয়েছে। বর্তমানে কমিশনের তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬-ও রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় নতুন আচরণবিধির কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে।
দেশে সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচনও একাধিক ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদে ভোট নেয় নির্বাচন কমিশন। উদাহরণ হিসেবে, ওই নির্বাচনের চতুর্থ ধাপেই ৮৪০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজন করা হয়েছিল।
এবার সাত ধাপে ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়নে ভোট আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনের পরিধি বিশাল হওয়ায় একসঙ্গে পুরো নির্বাচন আয়োজনের বদলে ধাপে ধাপে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
এবারের ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। কমিশনের পরিকল্পনায় তৃতীয় ধাপে এ আলোচনা করার কথা রয়েছে।
এই আলোচনায় নির্বাচনের সময়সূচি, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, আচরণবিধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার বিভিন্ন বিষয় সামনে আসতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও অবস্থান নির্বাচনের পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা হবে, সেটিও নির্বাচনের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সম্ভাব্য ভোটের তারিখ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও বাড়বে। চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে আগ্রহীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করবেন। রাজনৈতিক দলের সমর্থন পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রার্থীদের জন্য বড় বিষয় হয়ে উঠবে।
তৃণমূলের নির্বাচনে স্থানীয় সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রভাব বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তফসিল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার, মতবিনিময় ও গণসংযোগ বাড়তে পারে।
সাত ধাপে হাজার হাজার ইউনিয়নে নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ইউপি নির্বাচন সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। একই গ্রামের বা এলাকার একাধিক প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিরোধও নির্বাচনী উত্তাপে রূপ নিতে পারে। তাই ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রার্থীদের আচরণবিধি মানানো এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হবে।
নির্বাচনী প্রচারে অর্থের প্রভাব, অতিরিক্ত পোস্টার-ব্যানার, আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো কিংবা ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ স্থানীয় নির্বাচনে নতুন নয়। ফলে নতুন আচরণবিধির কার্যকর প্রয়োগ কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।
নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিমালার তালিকায় ২০২৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণবিধি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই বিধিমালা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার ওপর নির্বাচনের পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
১২ নভেম্বর থেকে ২৭ মে পর্যন্ত সম্ভাব্য সময়সূচি বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাত মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রম চলবে। এক ধাপের ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে কমিশনকে।
এতে ব্যালট, ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের সমন্বয় দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভোটের ফলাফল, অভিযোগ ও পুনঃভোটের মতো বিষয়গুলোও সামলাতে হবে।
২০২১ সালের নির্বাচনেও কমিশনকে বিভিন্ন ধাপে পুনঃভোটের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। ওই নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে কিছু ভোটকেন্দ্রে পুনঃভোটের সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে।
সব মিলিয়ে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা দেশের তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন করে নির্বাচনী তৎপরতা তৈরি করতে যাচ্ছে। ১২ নভেম্বরের সম্ভাব্য প্রথম ধাপ থেকে শুরু করে ২৭ মে শেষ ধাপ—এই দীর্ঘ সময়সূচি বাস্তবায়নে কমিশনকে একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
তবে সম্ভাব্য তারিখ এখনো চূড়ান্ত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে কোন ইউনিয়ন কোন ধাপে ভোটে যাবে। সেই সঙ্গে জানা যাবে তফসিল ঘোষণার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি।
চার হাজার ৫৮০ ইউনিয়নের এই বিশাল নির্বাচনী কর্মযজ্ঞে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকবে—ভোটার যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থীরা সমান সুযোগ পান এবং ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয়। সেই পরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রবিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা মোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সমন্বয় সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। দুই মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ সভার পর সন্ধ্যায় দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সমন্বয় সভায় দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা এবং আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান। সভায় ঘোষিত দুই মেয়র পদপ্রার্থী দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ও দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এতে অংশ নেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পরবর্তীতে গত মার্চ মাসে দেশের পাঁচটি সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিল দলটি। সে সময় প্রাথমিক ঘোষণায় আসিফ মাহমুদকে ঢাকা দক্ষিণ এবং আরিফুল ইসলাম আদীবকে ঢাকা উত্তরের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কৌশল ও দলগত পর্যালোচনার ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে আসিফকে উত্তরে এবং পাটওয়ারীকে দক্ষিণে চূড়ান্ত করা হলো।
দুই সিটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল সম্প্রতি তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মাধ্যমে। এনসিপির মিডিয়া কমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে সম্প্রতি আসিফ মাহমুদ দক্ষিণ সিটি থেকে উত্তরে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উত্তর সিটি থেকে দক্ষিণ সিটিতে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেন। জাতীয় নির্বাচনে যেকোনো আসনের ভোটার হয়ে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া বাধ্যতামূলক। গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হয়েও ভোটার না থাকায় নিজের ভোট দিতে পারেননি পাটওয়ারী; অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ সংসদ নির্বাচনের আগে কুমিল্লা থেকে ঢাকা-১০ আসনে ভোটার হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ২ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর সময়সীমার মধ্যে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন করে তাঁরা যথাসময়ে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্য বর্তমানে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় আসনটি শূন্য হয়। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর এই উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে ২৯ সেপ্টেম্বর।
তিনি আরও বলেন, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ আপিল করতে চাইলে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিন সময় পাবেন। আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ৬ অক্টোবর। ৭ অক্টোবর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ৮ অক্টোবর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। এরপর আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ভোটার ও কেন্দ্রের পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইসি সচিব বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৫ লাখ ৭ হাজার ২০৩ জন। তবে গত ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে ৮ হাজার ৩২২ জন নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় বর্তমান ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৫২৫ জনে।’
তিনি বলেন, পূর্বের নির্বাচনের মতো এবারও ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ৯৮৯টি ভোটকক্ষ অপরিবর্তিত থাকছে। ভোটগ্রহণের সার্বিক দায়িত্বে থাকবেন ১৮৫ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ৯৮৯ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ১ হাজার ৯৭৮ জন পোলিং অফিসারসহ মোট ৩ হাজার ১৫২ জন কর্মকর্তা।
এবারের উপনির্বাচনে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা—এই তিনজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান তিনি।
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে আখতার আহমেদ বলেন, গত নির্বাচনে এই আসনে ৩৩টি দেশ থেকে ৩৮৬ জন প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটের (আউট অব কান্ট্রি) মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়েছিলেন। এবার আমরা প্রবাসীদের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ জনকে টার্গেট করেছি। এছাড়া দেশে অবস্থানরত (ইন-কান্ট্রি) সরকারি চাকরিজীবী, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, কারাবন্দি ও আনসার সদস্যদের জন্য গতবার ৪ হাজার ৪৫ জন নিবন্ধিত ছিলেন। এবার সেখানে ৫ হাজার পোস্টাল ব্যালটের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে আগের নিবন্ধিত প্রবাসীরা দেশে ফিরেছেন কি না, সে বিষয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে নতুন করে কেউ নিবন্ধন করতে চাইলে, সেই সুযোগও থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ওই নির্বাচনে মোট ৭৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এর মধ্যে বাতিল হওয়া ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোট বাদে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিজয়ী প্রার্থী (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) ৬১ দশমিক ০৩ শতাংশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ৩৬ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ১ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফেরানোর উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে ইউপি নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতিতে।
গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি জানান, নির্বাচন কয়েক ধাপে হলেও একটি উপজেলার আওতাধীন সব ইউনিয়নে একই সঙ্গে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে পাঁচ, ছয় বা অন্য কত ধাপে পুরো ইউপি নির্বাচন শেষ হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দুই বছর পর স্থানীয় ভোটের প্রস্তুতি: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর বড় অংশও কার্যত জনপ্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকারের সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
ইসি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন উপযোগী বিভিন্ন পদে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
স্থানীয় সরকারের এত বড় পরিসরের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন না করে ধাপে ধাপে করার কারণ হিসেবে প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোট ব্যবস্থাপনা ও জনবল ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক ইউপি ভোটে নতুন কৌশল: এবারের ইউপি নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে উপজেলাভিত্তিক ভোটগ্রহণ। ইসি সচিব আখতার আহমেদ ৭ সেপ্টেম্বর জানান, একটি উপজেলার সব ইউনিয়নে একই দিনে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো উপজেলায় পাঁচটি বা ছয়টি ইউনিয়ন থাকলে সেগুলোকে আলাদা আলাদা ধাপে না রেখে একই ধাপে ভোট নেওয়ার চিন্তা করছে কমিশন।
ইসি সচিবের যুক্তি, একই উপজেলার কিছু ইউনিয়নে আগে এবং অন্য ইউনিয়নে পরে ভোট হলে নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে পুরো উপজেলাকে একটি নির্বাচনী ইউনিট হিসেবে বিবেচনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনো কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এদিকে ইউপি নির্বাচনের মোট ধাপ কতটি হবে, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি। কমিশনের আলোচনায় পাঁচ বা ছয় ধাপসহ বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণার সময়ই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সেপ্টেম্বরেই তফসিল, নভেম্বরে ভোট: ইসির বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইউপি নির্বাচনের তফসিল এবং নভেম্বরে ভোট শুরু হতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও এর আগে জানিয়েছিলেন, ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হবে।
তবে তফসিলের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের কোন তারিখে তফসিল ঘোষণা হবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।
এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা এবং নির্বাচনী মাঠের হিসাব-নিকাশও দ্রুত বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
দলীয় প্রতীক থাকছে না, পোস্টারও নয়: স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নতুন ও সমন্বিত আচরণবিধি জারি করেছে ইসি। এতে পোস্টার ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি। তবে ব্যানার, ফেস্টুন, হ্যান্ডবিল ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকছে।
ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রাখা হলেও প্রচারণায় বিধিনিষেধ থাকছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা অপব্যবহারমূলক প্রচারণা ঠেকাতে বিধান রাখা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজনের প্রস্তুতি। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন—এমন কাঠামোতেই বিধিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে।
ইউপির পর কোন নির্বাচন: ইসির পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য ধারাবাহিকতা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরে সিটি করপোরেশন এরপর উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সবশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন স্তরের নির্বাচন কোন মাসে হবে, সেই পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ইসির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করা। দেশের কয়েক হাজার ইউনিয়ন, শত শত উপজেলা ও পৌরসভা এবং সিটি ও জেলা পরিষদ মিলিয়ে এটি হবে বড় ধরনের নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা ও গ্রহণযোগ্যতা: দীর্ঘ সময় পর স্থানীয় পর্যায়ে ভোট হওয়ায় নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভাব বিস্তার, অর্থের ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ইসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
উপজেলাভিত্তিক ভোটের পরিকল্পনাকে ইসি মূলত নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সহজ করা এবং একটি উপজেলার ভেতরে নির্বাচনী কার্যক্রমকে একই সময়ের মধ্যে রাখার কৌশল হিসেবে দেখছে। তবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রার্থী ও ভোটারদের সমন্বয় নিশ্চিত করাই হবে এর বাস্তব পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরের তফসিল এবং নভেম্বরে ইউপি ভোট এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টাইমলাইন। তফসিল ঘোষণা হলেই পরিষ্কার হবে কোন ধাপে কোন উপজেলার ইউনিয়নগুলো ভোটে যাচ্ছে। এরপরই ধাপে ধাপে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।
চলতি মাসের মধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বহুল প্রতীক্ষিত তফসিল ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এই নির্বাচন একসঙ্গে সব ইউনিয়নে না হয়ে ব্যয় সংকোচন নীতি বজায় রেখে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে।
অন্যদিকে, রাজনীতিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরাসরি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ব্যবস্থার প্রয়োগ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে কঠোর নিরাপত্তার আওতায় আনার জন্য বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। রোববার আগারগাঁওয়ের নিজ কার্যালয়ের সাংবাদিকদের এ কথা বলেন কমিশনার।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যে আবহ তৈরি হয়েছে, সেটির অংশ হিসেবে চলতি মাসের শেষেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, দেশের সব ইউপি নির্বাচন একই সঙ্গে করা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কঠিন। তাই সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে সব ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষার পরিবেশের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং শিক্ষকরাই মূলত ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তার (প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার) দায়িত্ব পালন করেন, তাই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময় বাদ দিয়ে পরীক্ষার আগে কিংবা পরেই ইউপি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
একই সঙ্গে ভোটার স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করে তিনি জানান, ভোটার স্থানান্তর একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও রুটিন কাজ। অনেকে মনে করেন এই কাজটি কোনো বিশেষ উদ্দেশে করা হয়, যা সঠিক নয়। ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এবং অনিয়ম রোধে ইসি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে সবাই নিয়মের মধ্যে থেকেই এই সুযোগ নিতে পারেন।
নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইসির কাছে দাবি জানানো হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত পরিষ্কার। ইসি মনে করে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। এর ফলে শিক্ষকদের নিরপেক্ষতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হবে, যা সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।
জামায়াতের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে ইসি সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের চাপে রয়েছে। এই দাবির বিষয়ে কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের চাপে আছে, এমন ভিত্তিহীন দাবি তোলাই হচ্ছে মূলত কমিশনকে উল্টো চাপে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল।
আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে ভোটারদের ভোটদান প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিক করতে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। পোস্টাল ব্যালট ভোটিংকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর করে তোলাই ইসির মূল উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
এছাড়া আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও সব ধরনের কারচুপি রোধে নজিরবিহীন নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। সব ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য বডি ওর্ন ক্যামেরার সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো হবে এবং যেকোনো বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। সেই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত নানা সমস্যা সমাধানের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন নিশ্চিত করে সার্বিকভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ, এম, এম, নাসির উদ্দিন বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সিইসি এসব কথা বলেন।
এর আগে তিন নির্বাচন কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। একজন কমিশনার বিদেশে অবস্থান করায় এ সাক্ষাতে যোগ দিতে পারেননি।
প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী এ বৈঠকে রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান সিইসি।
তিনি বলেন, অভিনন্দনের জবাবে রাষ্ট্রপতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনকে অত্যন্ত সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও দেশে-বিদেশে প্রশংসিত একটি নির্বাচন বলে অভিহিত করেন এবং এ জন্য কমিশনকে অভিনন্দন জানান।
সিইসি বলেন, আমরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছি, জাতীয় নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সমান পেশাদারিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করে বলেন, আপনারা যেভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান, আমিও তা চাই। নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে আমার পক্ষ থেকে যাবতীয় সহযোগিতা থাকবে।
নাসির উদ্দিন বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের জানান-তিনি দেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও একই বিষয়ে আগ্রহী।
নির্বাচন প্রসঙ্গে ইসির সার্বিক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। আচরণ বিধিমালা সংক্রান্ত নথি আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং শেষে ফেরত এসেছে, এখন শুধু সংশ্লিষ্ট ম্যানুয়াল তৈরির কাজ বাকি। আমরা সচিবালয়কে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখতে বলেছি। সবুজ সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনী কাজে নেমে পড়বে কমিশন।
তফসিল ও ভোটের সময়সূচি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এ বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচনও ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুটি নির্বাচনের সময় যাতে পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করেই এগোতে হচ্ছে। আশা করছি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই একটি তফসিল দিতে সক্ষম হবো। তবে নির্বাচন শেষ হতে আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
এদিকে বন্যা, দুর্গাপূজার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যস্ততা এবং আগামী বছর ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে রমজান শুরু হয়ে তার পর ঈদুল আজহা, গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুম চলে আসায় হাতে থাকা উপযোগী সময় খুবই সীমিত বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শীতকালে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হওয়ায় এবং সে সময় স্কুলভবন ও শিক্ষকদের ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে বিষয়টি মাধ্যমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বয় করা হবে। পরীক্ষা দ্রুত শেষ হলে নভেম্বরের শেষ নাগাদ ভোট শুরুর চেষ্টা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন সিইসি।
কোন এলাকা অগ্রাধিকার পাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ আইন অনুযায়ী আগেই শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোকে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আগে ছয়টি ধাপে এবং আরও কিছু বিবিধ আসনে মিলিয়ে মোট সাতটি ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও যেসব ইউনিয়নে আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, সেগুলো আগে চিহ্নিত করা হবে। তাছাড়া এসব নির্বাচন যেন খারাপ মৌসুমে না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখা হবে। উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের শুষ্ক মৌসুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
দেশে ও প্রবাসে থাকা ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সিইসি। তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক কম। তাই সীমিত পরিসরে সেখানে পোস্টাল ব্যালট চালু করা হবে, যা প্রবাসী ভোটারদের জন্যও প্রযোজ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতি যাতে ভবিষ্যতেও ব্যবহার করা যায়, সেজন্য পরামর্শকদের মাধ্যমে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং একটি ম্যানুয়ালও তৈরি করা হচ্ছে। এতে বর্তমান কমিশন দায়িত্বে না থাকলেও ভবিষ্যতে অন্য কমিশন এই ব্যবস্থা চালিয়ে নিতে পারবে।
সাতক্ষীরায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে বিরোধ নিরসনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের পক্ষ থেকে কোনো চিঠি এসেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এখন পর্যন্ত চিঠি পাননি তারা; পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, রাষ্ট্রপতি কমিশনের ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি। তিনি শুধু প্রস্তুতি কেমন চলছে তা জানতে চেয়েছেন এবং কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, পেশাদারভাবে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে শিগগিরই সমন্বয় সভা শুরু করবেন এবং সংস্থাগুলোকে অ্যালার্ট করা হবে। প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীকে 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় সহায়তার জন্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতির ‘কনজিউমার সুভারেনটি’ বা ক্রেতার সার্বভৌমত্ব ধারণার উদাহরণ টেনে এ, এম, এম, নাসির উদ্দিন বলেন, নির্বাচনে ‘ভোটার সুভারেনটি’ বা ভোটার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অর্থাৎ ভোটারদের ইচ্ছাই হবে চূড়ান্ত। জাতীয় নির্বাচনে আমরা যে মান বজায় রেখেছিলাম, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ন্যূনতম সেই স্ট্যান্ডার্ড, ক্রেডিবিলিটি ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
সূত্র: বাসস
অক্টোবর থেকে পিছিয়ে এখন নভেম্বরে এ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুরুতেই ইউপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
আগের মতোই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ভোটের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তুলনামূলক সহায়ক সময়।
তবে দুর্গাপূজা, রমজান, পাবলিক পরীক্ষা ও বার্ষিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণ করা হবে। আগে অক্টোবর ধরে পরিকল্পনা করা হলেও এখন নভেম্বরে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটের ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ইউপি দিয়ে নির্বাচন শুরু হবে জানিয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, এর সঙ্গে পৌরসভা নির্বাচনও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল, সেটি ফেরত এসেছে। তবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আইন সংস্কারের বিষয়ে ইসির সুপারিশ এখনো পাঠানো হয়নি। বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা ধরেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
এর আগে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্বাচন উপযোগী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য চেয়েছিল ইসি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পর্যন্ত ইউপি ও পৌরসভার তালিকা কমিশনে পৌঁছেছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আগামী সপ্তাহে ইসির সঙ্গে বৈঠক করা হবে। নির্বাচনের তফসিল ও ভোটের তারিখ ইসিই নির্ধারণ করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে ইসি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালক এবং আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সিইসি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা বেশি। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রস্তুতি প্রয়োজন। আবহাওয়া, বন্যা, পূজা, পাবলিক পরীক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র ও শিক্ষকরা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সেটি বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণ করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আইন ও বিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। ভোটের ২৫ দিন আগে চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করা হবে। ভোটার তালিকা ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৪ হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২৬টি পৌরসভা, ৫০০টি উপজেলা ও তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে।
আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একমাস পিছিয়ে নভেম্বরে এই নির্বাচন শুরু হতে পারে। তবে এর আগে অক্টোবরের শেষভাগে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছে সংস্থাটি।
ইসি সূত্র বলছে, মূলত উপনির্বাচন আয়োজনের কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন একমাস পেছানোর এমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বরে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। আইন অনুযায়ী, ভোটের ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হয়।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো আসন শূন্য ঘোষণা করা হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। এটা আইনের বাধ্যবাধকতা। ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি এরই মধ্যে শূন্য হয়েছে। এই কারণে আগামী অক্টোবরের শেষে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে ইসি।’
তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে থেকে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইসি আগে অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা করে এসেছে। এখনো সব প্রস্তুতি আগামী অক্টোবরের মধ্যেই শেষ করা হবে। কিন্তু ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা এখন নভেম্বর করা হচ্ছে।’
আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আমরা সবসময়ই বলে আসছি, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি- এগুলো নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে সহায়ক মাস। এই মাসগুলোর মধ্যে এপ্রিলও ধরা যেতে পারে। এখন এর মধ্যে দুর্গাপূজা, রমজান কিংবা পরীক্ষা বা বার্ষিক পরীক্ষা আছে কি না অথবা বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে কি না- এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল নিয়ে ইসিতে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা কেবল ভোটের সহায়ক সময় নিয়ে আলোচনা করেছি। আইন অনুযায়ী যেদিন ভোট গ্রহণ করা হবে, তার ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হয়। তার মানে, নভেম্বরে যদি ভোট হয়, তাহলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।’
কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চান জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে শুরু করব। একসঙ্গে পৌরসভাও করতে পারি। এরপর উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।’
আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিমালা চূড়ান্ত হয়ে এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি এসে পড়েছে। তবে আমরা নির্বাচনের বিধিমালার সুপারিশগুলো এখনো পাঠাইনি। আমরা আইনে আরও কিছু পরিবর্তন আনার চিন্তা করছি। এ কারণে এখনো পাঠাইনি।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজয়ী হন। ওই দিনই নির্বাচন কমিশন তাকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। পরদিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। পরদিন সংসদ সচিবালয় থেকে রাষ্ট্রপতির সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনে ফাইল দেওয়া হয়।
দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে সহিংসতামুক্ত স্থানীয় নির্বাচন সম্ভব: ইসি সানাউল্লাহ
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে দ্য অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি নামের পর্যবেক্ষক সংস্থা আয়োজিত সংলাপে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে সহিংসতামুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সম্ভব। কাজেই সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই সদিচ্ছা কাজে লাগাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন একটি অনন্য নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচনেও ভায়োলেন্স চায় না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা বেশি থাকায় এ বিষয়ে কমিশন বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে। এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার দায়িত্ব কমিশনের। তবে শুধু মনোনয়ন পেলেই কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হবেন না। নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন।’
সানাউল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও নির্বাচনের পরিবেশ সুন্দর রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা থাকবে কমিশনের।’
নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর। নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা রাখতে হবে। নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।’
এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আইন প্রণয়নের এখতিয়ার সংসদের। সংসদ যে আইন করবে, নির্বাচন কমিশন সেটি বাস্তবায়ন করবে। রাজনৈতিক দলগুলো কী নিয়ম মেনে নির্বাচনে অংশ নেবে, তা আইনে আছে। কোনো রাজনৈতিক দল সেই নিয়ম না মানলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বাদ পড়তে পারে।’
অনুষ্ঠানে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ‘সামনের নির্বাচনগুলো নির্ভুলভাবে করতে ইসির অ্যাকশন প্ল্যান থাকা জরুরি। নির্বাচনে ফান্ডিং এর ক্ষেত্রে দেশের ভেতর থেকে কীভাবে ফান্ড সংগ্রহ করা যায় তা লক্ষ্য রাখতে হবে।’
সংসদ সদস্য সাইফুল আলম মিলন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ভালো থাকলেও কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার নিরপেক্ষ ছিল না। ভোট গণনায় অস্বচ্ছতা, অনিরপেক্ষতা ছিল। ভোট গণনায় অনেক দেরি হয়েছে। এসব কারণে জামায়াত অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসি কীভাবে ভালো করবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে।’
সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে দেশের বাইরে পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ ছিল না।’
ডায়লগে বিভিন্ন দলের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সংস্থাটি জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করে জানায়, জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য নির্বাচনের চেয়ে ভালো ছিল। তবে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কম ছিল।
রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে সহিংসতামুক্ত স্থানীয় নির্বাচন সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই সদিচ্ছা কাজে লাগাতে হবে। নির্বাচন কমিশন ভায়োলেন্স চায় না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা বেশি থাকায় এ বিষয়ে কমিশন বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তবে শুধু মনোনয়ন পেলেই কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হবেন না। নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও নির্বাচনের পরিবেশ সুন্দর রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা থাকবে কমিশনের।’
রাষ্ট্রপতি পদে লড়তে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এ মনোনয়নপত্র জমা দেয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ২০২৬ এর ‘নির্বাচনী কর্তা’ এএমএম নাসির উদ্দিন।
অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হলেন- বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। সমর্থক হলেন- এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সিইসির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব আখতার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।
১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন- মোহাম্মদ কামাল হোসেন, আব্দুল বাতেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ইঞ্জি. রাশেদ প্রধান এবং মোস্তফিজুর রহমান ইরানসহ জোটে শরিক প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতারা।
ইসি ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিল
আজ ১৩ অগাস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা (নির্বাচনী কর্তার অফিস কক্ষ)।
মনোনয়নপত্র বাছাই
১৬ অগাস্ট সকাল ১০টা থেকে বাছাই পর্যন্ত (নির্বাচনী কর্তার অফিস কক্ষ)।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়
১৮ অগাস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত (নির্বাচনী কর্তার অফিস কক্ষ)।
ভোটগ্রহণ
২০ অগাস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত (জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষ)।
দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বিতর্কহীন করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন অক্টোবর মাসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন তাদের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় বড় ধরনের সংস্কার আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান আইনি অসঙ্গতি দূর করে একটি অভিন্ন ও কঠোর আইনি কাঠামো দাঁড় করাতেই ইসির এই মহাপরিকল্পনা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত আইনের খসড়া সংশোধনী প্রায় প্রস্তুত। এটি চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য দ্রুতই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত এবং জাতীয় সংসদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই ঐতিহাসিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি: এই সংস্কার প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত দিক হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সংজ্ঞায় নতুনত্ব আনা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করা যায়। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে এই সুযোগ বা সংজ্ঞা সব আইনে সমানভাবে স্পষ্ট নয়।
নির্বাচন কমিশন এবার সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের সহিংসতা রোধ, কেন্দ্র দখল এবং নির্বাচনী অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব স্তরের স্থানীয় নির্বাচনে একই ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দাগী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের জন্য বন্ধ হচ্ছে দুয়ার: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুস্থ ধারা বজায় রাখতে প্রার্থীদের যোগ্যতার মাপকাঠিতে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করছে ইসি। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত কোনো আসামি স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংশোধনের মাধ্যমে এই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছিল। এবার তৃণমূলের নেতৃত্বকেও এই কলঙ্কমুক্ত রাখার উদ্দেশে নিয়মটি সব স্থানীয় সরকার আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহী বা গুরুতর মামলার ফেরারি (পলাতক) আসামিদেরও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করার কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে।
ঋণখেলাপি ও জামিনদারদের ওপর কঠোর নজরদারি: আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে ইসি এবার আরও এক ধাপ এগিয়েছে। শুধু সরাসরি ঋণখেলাপিরাই নয়, বরং ঋণখেলাপি কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টার বা জামিনদারদেরও আসন্ন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর ফলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে বা অন্য কারও ঋণের জামিনদার হয়ে খেলাপির দায় নিয়ে কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাবেন না। এতে করে সৎ এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছ ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন, যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নত করবে।
হলফনামায় অসত্য তথ্যে প্রার্থিতা বাতিলের খাঁড়া: বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাঙ্গণে অন্যতম একটি বড় সংস্কার ছিল হলফনামার তথ্যের সত্যতা যাচাই। প্রার্থীরা অনেক সময় তাদের সম্পদ, মামলা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিতেন, যা পরে প্রমাণিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতো।
নির্বাচন কমিশন এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে সরাসরি প্রার্থিতা বাতিলের বিধান যুক্ত করতে চায়। প্রস্তাবিত আইন পাস হলে, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপনের বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল বা বিজয়ী হলে তার প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
এর পাশাপাশি প্রার্থীদের ওপর যারা সরাসরি নির্ভরশীল (যেমন: সন্তান বা স্ত্রী), তাদের সম্পদের তথ্য বা ডিপেন্ডেন্ট সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রেও সব আইনে একটি অভিন্ন নিয়ম বা ইউনিফর্মিটি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও লাভজনক পদের জটিলতা নিরসন: স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের আইনে দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সরকারের কোনো লাভজনক পদে (Office of Profit) বহাল থেকে নির্বাচন করার যোগ্যতার বিষয়ে কিছু আইনি ধোঁয়াশা ছিল। কোনো কোনো আইনে এটি স্পষ্ট থাকলেও অন্যটিতে ছিল শিথিলতা।
ইসি কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম এই বিষয়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং লাভজনক পদে থাকার কারণে অযোগ্যতার বিষয়টি সব স্থানীয় আইনের ক্ষেত্রে সমানভাবে স্পষ্ট ও কার্যকর করা হবে। সরকারি বা আধা-সরকারি কোনো লাভজনক পদে থেকে কেউ প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।
অভিন্ন নির্বাচনী সময়সীমা ও পর্যবেক্ষক নীতি: বর্তমানে বাংলাদেশে একেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নির্বাচন আয়োজনের সময়সীমা একেক রকম। যেমন, সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে এক নিয়ম, ইউনিয়ন বা উপজেলার ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম। এই ভিন্নতার কারণে নির্বাচন কমিশনকে বছরজুড়ে দফায় দফায় নির্বাচনী সূচি তৈরি করতে হয়, যা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ ব্যয়বহুল।
এই জটিলতা এড়াতে নির্বাচন কমিশন সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সীমা একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে বা কাছাকাছি সময়ে দেশের বড় অংশের স্থানীয় নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
একই সাথে, সব স্তরের নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সমতা আনা হচ্ছে। কোনো কোনো নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠানো সহজ হলেও অন্যগুলোতে জটিলতা থাকত। এখন থেকে পর্যবেক্ষকদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং আচরণবিধি সব নির্বাচনের জন্য একই হবে।
নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের স্পষ্টীকরণ: আইনে ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’ কথাটি উল্লেখ থাকলেও অনেক সময় কোন অপরাধগুলো এর আওতায় পড়বে, তা নিয়ে আদালতে বা আইনি ব্যাখ্যায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতো। নতুন খসড়ায় নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের সংজ্ঞা ও পরিধিকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট করা হচ্ছে, যাতে চরিত্রগতভাবে বিতর্কিত বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা আইনি ফাঁকফোকর গলে নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারেন।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও সংস্কারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা মূলত আইনগুলোর মধ্যে একটি ইউনিফর্মটি বা সমতা আনার চেষ্টা করছি। কোনো আইনে কোনো বাহিনী আছে, কোনোটিতে নেই—এমনটা হওয়া উচিত নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডেফিনেশনে আমরা সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করব। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিট হলে জাতীয় সংসদের মতো এখানেও তারা অযোগ্য হবেন। হলফনামা ও নির্ভরশীলদের তথ্যের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বজায় থাকবে। আমাদের এই পর্যবেক্ষণ ও খসড়া সরকারের দৃষ্টিগোচরে নেওয়া হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী আইন পাস হলে তা কার্যকর হবে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। স্থানীয় সরকার হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে তৃণমূলের স্তম্ভ। সেখানে যদি ঋণখেলাপি, মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি বা অসত্য তথ্য প্রদানকারীরা স্থান পেয়ে যান, তবে পুরো শাসনব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে নির্বাচন কমিশনের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।
আসন্ন অক্টোবর মাসের নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংস্কারগুলো যদি সত্যি কার্যকর করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাসে একটি নতুন এবং স্বচ্ছ অধ্যায়ের সূচনা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং এতে একগুচ্ছ বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিক এই সংস্থাটি জাতীয় নির্বাচনের আদলে স্থানীয় নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ইভিএম বর্জন এবং দলীয় প্রতীকের বদলে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে ভোট আয়োজনের পথে এগোচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার পরিকল্পনা থাকলেও বর্ষা মৌসুমের কারণে ইসি নভেম্বর থেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করতে চায়।
নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দলীয় প্রতীকের বিলুপ্তি। এর ফলে প্রার্থীরা কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার বা প্রতীক ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। এর ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য আগে বিদ্যমান ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বিধানটিও তুলে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রচারণায় পরিবেশ সুরক্ষায় পোস্টার নিষিদ্ধের পাশাপাশি নির্বাচনকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে ইভিএমের বদলে কাগজের ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনলাইনের পরিবর্তে আগের মতো সরাসরি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পদ্ধতি বহাল রাখা এবং ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়েও ইসি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রার্থীদের যোগ্যতার পাশাপাশি নির্বাচনি ব্যয় ও জামানতের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ এবং নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা বাড়ানো হতে পারে, যা অযাচিত প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা যেন স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে বিষয়েও কঠোর বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের বসা এবং প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। তবে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা এই নির্বাচনে থাকছে না।
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইসি একটি কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। ইসি মনে করছে, যেহেতু নির্বাচন ধাপে ধাপে বা অঞ্চলভিত্তিক হবে, তাই পুলিশ, আনসার ও বিজিবি দিয়েই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে কোনো এলাকায় সহিংসতা বা বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সেখানে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ডাকার সুযোগ রাখা হবে। জুন মাসের মধ্যেই এই নতুন নির্বাচনি বিধিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কমিশন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকারকে পুনরায় নির্দলীয় করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাত কমাতে এবং যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচিত হতে সহায়তা করবে। ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নেওয়ার নিয়মটি গোপন ব্যালটের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেটি তুলে দেওয়াকেও তারা যৌক্তিক মনে করছেন। তবে সংঘাতমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ও কমিশনের কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক নতুন ধারার সূচনা হবে।