কথা দিয়ে কথা না রাখার মতো ঘটনা আগে কখনও চোখে পড়েনি। এবার সত্যি কথার বরখেলাপ হয়ে গেল। ২২ নভেম্বর ‘তুমিহীনা’ গানটি প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়ে কথা রাখতে পারলেন না শিল্পী মৌমিতা তাসরিন নদী। অবশ্য এ ক্ষেত্রে নদীকে দোষারোপ করা যাবে না, কারণ গান প্রকাশ না করার বিষয়টি সত্যি ভেবে দেখার মতো। কারণ শ্রোতাপ্রিয় এই শিল্পী চাননি ভূমিকম্প আতঙ্কের মাঝে নতুন কোন গান প্রকাশ করে দর্শক-শ্রোতার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে।
এও সত্যি যে এ নিয়ে কিছু ভক্তের মন খারাপ হতেই পারে, বিশেষ করে যারা অনেকদিন থেকে প্রহর গুনছিলেন নদীর নতুন গানের। নদীর কথাও তো অযৌক্তিক নয়; যেখানে উঠে এসেছে বাস্তবতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন। আপনারাই বলুন, যখন ভক্ত-অনুরাগারীকে আনন্দ দিতে, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে বিশেষ কোন আয়োজন করছেন আর ঠিক সেই সময়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো, তাহলে কী করবেন? জানি, এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকে বলবেন, তারা তাদের সমস্ত আয়োজন পিছিয়ে দেবেন। কারণ, ভয়াবহ কিংবা অস্বস্তিকর কোন পরিস্থিতিতে আর যাই হোক, কারও কোন প্রত্যাশা পূরণ করা যায় না। নদীও সেই কাজটিই করেছেন। পিছিয়ে দিয়েছেন তার নতুন একক গানের প্রকাশনা। এ নিয়ে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টও দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘২১ নভেম্বর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে অনেকের অনেক রকম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ এখনও আতঙ্কিত, অনেকে মানসিক আঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। আর এমনই একটা সময়ে অর্থাৎ ২২ নভেম্বর আমার নতুন গান ‘তুমিহীনা’ প্রকাশিত হবার কথা ছিল। এই পরিস্থিতিতে, এই মন-মানসিকতায় গান প্রকাশ আপাতত স্থগিত রাখা হলো। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সময়মতো গান প্রকাশের পরবর্তী তারিখ জানানো হবে। তার আগে এটাই চাওয়া, সবাই পরিবারের সঙ্গে থাকুন। যা যা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, তা অবশ্যই করুন। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ।’
নদীর এই কথা থেকে তার মানবিক হৃদয়ের পরিচয় যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় নামের সার্থকতা। নদী মানেই এঁকেবেঁকে চলা জলস্রোত। কেন সেই জলস্রোত এঁকেবেঁকে চলে? এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো–চলে প্রাকৃতিক বাধাবিপত্তি, পানিপ্রবাহের শক্তি ও তার স্থিতিশীলতার কারণে। এতো গেল প্রকৃতির অঙ্গ, জলময় নদীর কথা। আমরা যে রক্ত-মাংসের নদীর কথা বলছি, সেই নদীও এঁকেবেঁকে পথ চলছে সংগীতপ্রেমীর তৃষ্ণা মেটানো আর মানবিক দাবি পূরণে। তাই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ভক্ত-শ্রোতার প্রত্যাশা পূরণে। ভার্সেটাইল শিল্পী হিসেবে গানের ভুবনে পথচলা তার। এরপরও মেলোডি গানের সুবাদে সবচেয়ে বেশি দর্শক-শ্রোতার মনোযোগ কেড়েছেন। সেই সব শ্রোতার কথা ভেবেই নতুন একটি মৌলিক গান তৈরি করেছেন; যার শিরোনাম ‘তুমিহীনা’। যৌথভাবে এর কথা লিখেছেন সৈয়দা হেমা, হাসিন ও শিল্পী নদী নিজে।
পাশাপাশি হাসিনের সঙ্গে যৌথভাবে গানের সুরও করেছেন এই শিল্পী। সংগীতায়োজন করেছেন হাসিন হাসনাত হৃদয়। নদীমাত্রিক প্রযোজিত এই গানের ভিডিও নির্মাণ করেছেন সোহেল রাজ। এসব তথ্য এবং গানের পোস্টার প্রকাশের পর থেকে অনেকে এই গানের জন্য প্রহর গোনা শুরু করেছিলেন। সব এলেমেলো হয়ে গেল ‘ভূমিকম্প’ নামের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে।
এরপর আশার কথা এটাই যে, জনমনে স্বস্তি ফিরে এলেই গানটি প্রকাশ করবেন নদী। কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের ভাসিয়ে নেবেন সুরেলা স্রোতে। এর আগে নদী তার গাওয়া ‘যেও না একা করে’, ‘মন মানে না’, ‘মন আমার তোমার কথা কয়’, ‘জলছায়া’, ‘নিঃশ্বাস’, ‘মুগ্ধতা’, ‘দেশি গার্ল’, ‘শিশির ভেজা নদী’, ‘হতে পারে’, ‘হারানো যাবে না’, ‘আসবে না ফিরে’, ‘কথা দিলাম’, ‘দেবো মায়া’, ‘সুতো কাটা ঘুড়ি’ গানগুলোর মধ্যে দিয়ে শ্রোতার মনে অনুরণন তুলে যাচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই নতুন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির আনন্দ ভাগ করে নিতে চান সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে। কারণ একটাই, সংগীত এখন তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠেছে এবং এটিই হওয়ার কথা ছিল। কেননা মাত্র তিন বছর বসয়ে যার সংগীতে হাতেখড়ি; ছয় বছর বয়স থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়ার পাশাপাশি শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীত চর্চা, তাকে তো সংগীতবলয়ে আটকে পড়তেই হতো। তাই নানা রকম গানের চর্চার পর আধুনিক গানের শিল্পী হয়ে ওঠেছেন শুধু শ্রোতার ভালো লাগা আর প্রত্যাশা পূরণের দাবি থেকে। তাই যত কিছুই করুন, নদীর জীবনজুড়ে সুরের স্রোতে বইতে থাকবে–এই অনুমান ভুল হওয়ার আশঙ্কা নেই।