কখনো কখনো পর্দার কল্পকাহিনী বাস্তব জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে কতটা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘জ্যাক রায়ান’। ২০১৯ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পাওয়া এই স্পাই থ্রিলার সিরিজের দ্বিতীয় সিজনের একটি বিশেষ দৃশ্য বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পিপল ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ছয় বছর আগে সিরিজের একটি কাল্পনিক সংলাপে ভেনেজুয়েলার যে পরিণতির কথা বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে ঠিক তেমন এক ঘটনারই সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী। এই অদ্ভুত মিল দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের মধ্যে রীতিমতো বিস্ময় ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সিরিজের সেই চর্চিত দৃশ্যে দেখা যায়, জন ক্রাসিনস্কি অভিনীত মূল চরিত্র ‘জ্যাক রায়ান’ সিআইএ-র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোন রাষ্ট্র হতে পারে। কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও চীনের নাম প্রস্তাব করা হলেও জ্যাক রায়ান দ্বিমত পোষণ করে ভেনেজুয়েলার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিপুল পরিমাণ তেল, স্বর্ণ ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যা পরবর্তীতে সরাসরি মার্কিন নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। ছয় বছর আগের সেই কাল্পনিক শঙ্কা এখন বাস্তব রূপ পাওয়ায় সিরিজের জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় এক ঝটিকা সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। অভিযানের পরপরই ট্রাম্পের এক হুঙ্কার—‘এখন থেকে আমেরিকাই ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে’—পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সিরিজের কাল্পনিক চিত্রনাট্যে ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে যে কৌশলগত আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের এই সরাসরি পদক্ষেপ যেন তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই ধরণের আশ্চর্যজনক মিল দেখে অবাক হয়ে গেছেন।
সিরিজটি নিয়ে সাধারণ মানুষের তুমুল আগ্রহ ও নানা তত্ত্বের মাঝে মুখ খুলেছেন এর সহ-নির্মাতা কার্লটন কিউস। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, চিত্রনাট্য লেখার সময় তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক থ্রিলার দর্শকদের উপহার দেওয়া। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাঁরা কোনোভাবেই ভবিষ্যৎবাণী করার চেষ্টা করেননি, বরং কেবল তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কিছু সংকট তুলে ধরেছিলেন। তবে কিউস স্বীকার করেছেন যে, অনেক সময় বাস্তবের রাজনীতি কল্পনাকেও হার মানায়, যার প্রমাণ ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি। পর্দার গোয়েন্দা চরিত্রের সেই দূরদৃষ্টি এখন আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব রাজনীতির এক নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘জ্যাক রায়ান’ সিরিজের দর্শকদের সংখ্যা পুনরায় বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা কেন্দ্রিক দ্বিতীয় সিজনটি এখন বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে। দর্শক ও সমালোচকরা বলছেন, শিল্প অনেক সময় ভবিষ্যতের বার্তাবহ হয়ে ওঠে এবং এই সিরিজটি তারই একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। এক সময়ের জনপ্রিয় বিনোদনমূলক এই কাজ এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি গভীর পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, পর্দার জ্যাক রায়ানের সেই অমোঘ বাণী আর হোয়াইট হাউসের বর্তমান পদক্ষেপের মেলবন্ধন ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত বৈশ্বিক ঘটনায় রূপ নিয়েছে।