সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ জন

বাংলা একাডেমি
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
প্রকাশিত
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ জন। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার কমিটি ২০২২’র সদস্যদের সম্মতিক্রমে এবং বাংলা একাডেমি নির্বাহী পরিষদের অনুমোদনক্রমে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কবিতায় ফারুক মাহমুদ ও তারিক সুজাত, কথাসাহিত্যে তাপস মজুমদার ও পারভেজ হোসেন, প্রবন্ধ বা গবেষণায় মাসুদুজ্জামান, অনুবাদে আলম খোরশেদ, নাটকে মিলন কান্তি দে ও ফরিদ আহমদ দুলাল, শিশুসাহিত্যে ধ্রুব এষ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় মুহাম্মদ শামসুল হক, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় সুভাষ সিংহ রায়, বিজ্ঞান বা কল্পবিজ্ঞান বা পরিবেশ বিজ্ঞানে মোকারম হোসেন, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনিতে ইকতিয়ার চৌধুরী এবং ফোকলোরে আবদুল খালেক ও মুহম্মদ আবদুল জলিল এ পুরস্কার পাচ্ছেন।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে তুলে দেবেন।

বরাবরের মতো এবারও মাসব্যাপী একুশে বইমেলা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে।


ফ্যাশন হাওয়ায় চলতি বছর

সাদা আইলাইনারে চোখে একরকম চাঞ্চল্যকর ভাব আসে। এ বছর চোখের সাজে সাদা আইলাইনার প্রাধান্য পাবে। ছবি: ফোর্বস
আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৯:১১
তানজিনা আলম

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসে সৌন্দর্য চর্চার ধারায়। সব হাল ফ্যাশনে সবাই একই রকমভাবে অভ্যস্ত হতে পারেন না এটিও যেমন ঠিক, অন্যদিকে কিছু ফ্যাশনপ্রেমী মানুষ যেকোনো হালচাল ধারণ করতে পারেন খুব সহজেই। নতুন বছরে ফ্যাশন পরিমণ্ডলে বিরাজমান থাকতে পারে এমন কিছু বিষয়-

আইলাইনারে সাদার প্রাধান্য

সাদা আইলাইনারে চোখে একরকম চাঞ্চল্যকর ভাব আসে। চোখও দেখায় চওড়া। যারা একটু সাদামাটা মেকআপ লুক পছন্দ করেন, তারা চোখের কোণে এবং নিচের ল্যাশলাইনে ব্যবহার করলে চোখ উজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত দেখাবে। আবার যারা শৈল্পিক সাজসজ্জায় দক্ষ তারাও এটি দিয়ে গ্রাফিক আইলাইনার লুক তৈরি করতে পারেন।

চিকন আই ব্রোতেও লাগবে গ্ল্যামারাস

আই ব্রো আর্টও যে একটি শিল্প, এটি তারাই বেশি স্বীকার করবেন যারা সুন্দরভাবে আই ব্রো সেট করতে গেলেই হিমশিম খান এবং হতাশ হন। তবে নব্বইয়ের দশকে এবং ২০০০ সালের শুরুতে চিকন আই ব্রোই প্রাধান্য পেত। এরপর সবাই বরং এটি এড়িয়ে চলা শুরু করলেন। কিন্তু কিছু সাহসী সুন্দর নারী আছেন যারা আরও একবার চিকন আই-ব্রোর পক্ষেই যাচ্ছেন। তবে এতে নিজেকে মানাবে কি না, পরীক্ষামূলকভাবে দেখার জন্য রয়েছে অ্যাপ, রয়েছে ফিল্টার। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও নির্দিষ্ট গঠনের চেহারার সঙ্গে বেশ মানানসই।

চুলের জন্য পিন বব কাট

বৈচিত্র্যপূর্ণ লেয়ার, ব্যাংস কাটের আগে চুলের জন্য বেশির ভাগ নারীই স্ট্রেইট কাট পছন্দ করতেন। পাতলা এবং সোজা চুলের জন্য এই কাটের প্রচলন শুরু হলেও ভাটা পড়েছিল মাঝে। তবে আবারও চুলকে মসৃণ এবং ঘন দেখাতে এর গ্রহণযোগ্যতা দেখিয়ে আবারও জনপ্রিয় হচ্ছে এই বব কাট।

মখমলে সাজবে নখ

স্টোন, অ্যাকুরিয়াম নেইল আর্ট, স্টাম্পিং নেইল আর্ট কিংবা স্কচ টেপ নেইল আর্ট- নেইল পালিশের পাশাপাশি এমন বিভিন্ন অনুষঙ্গ যুক্ত হচ্ছে নখের সাজে। বিরামহীনভাবে বাড়ছে ডিজাইন আর রঙের ব্যবহার। তবে নখকে খুব সাধারণ কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণভাবে উপস্থাপনে ভেলভেট নেইল বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। রঙের ওপর ভিত্তি করে রোজ ভেলভেট, শ্যাম্পেইন ভেলভেট, আইসি কিংবা মভ ভেলভেট বাছাই করতে পারবেন আগ্রহীরা।

তবে নখকে খুব সাধারণ কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণভাবে উপস্থাপনে ভেলভেট নেইল বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। ছবি: ফোর্বস



ম্যাজেন্টা রং প্রাধান্য পাবে ঠোঁটেও

বর্ষসেরা প্যানটোন রং (সারা বিশ্বে জনপ্রিয় একটি রঙের মডেল, যা সর্বজনীন এবং যেকোনো ধরনের কার্যকলাপের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়) হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ভিভা ম্যাজেন্টা। এ বছর ফ্যাশনে তাই এর প্রাধান্য থাকবে বেশ। কাপড়ের রঙের সঙ্গে মেকআপের ক্ষেত্রেও এই রংটি সর্বত্র দেখা যাবে। নজরকাড়া লুকের জন্য ব্লাশ থেকে ঠোঁটে ম্যাজেন্টার ব্যবহার এমনকি আইল্যাশেও থাকতে পারে এর ছোঁয়া।

কাভারেজ হোক অল্পই

চেহারা যেহেতু প্রথমেই কারও মনোযোগ আকর্ষণ করে তাই নিজের সেরা ত্বকের জেল্লা পেতে সফল মেকআপ রুটিনের প্রথম ধাপ হিসেবে নিয়মিত স্কিনকেয়ার ওপর জোর দিতে হবে। ভারী ফাউন্ডেশন মুখের লোপকূপগুলোকে আটকে দেয়। তাৎক্ষণিক দ্যুতি ছড়াবে এমন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার ছেড়ে সাধারণ ময়েশ্চারাইজারে আসার সময়ও এখনই। সুন্দর ত্বকে ন্যূনতম মেকআপই তখন যথেষ্ট হবে।

একই পণ্যের ভিন্ন ব্যবহার

আইশ্যাডো দিয়ে ব্লাশ বা ব্লাশিংয়ের জন্য আইশ্যাডো কিংবা কালার কারেক্টর দিয়েও আইশ্যাডো। তার ওপর সামান্য হালকা গোলাপি, গোল্ডেন এবং সিলভার কালারের শিমারি হাইলাইটার দিয়ে গিল্টারি ফিনিশিং। আবার পছন্দের লিপিস্টিক দিয়ে ব্লাশ ও করেন অনেকে। আইশ্যাডো থেকে কনট্যুরিংয়ের রং বেছে নিয়ে দারুণভাবে ব্যবহার করতে পারেন অনেকেই। গতিময় এই জীবনে সময় যেন উড়ছে। তাই একই পণ্য দিয়ে দ্রুত এবং কার্যকরী লুক তৈরি করতে নিঃসংকোচে বাছাই করতে পারেন এমন পণ্য যা একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি কাজ করবে।

সূত্র: ফোর্বস


সাজে ফাগুনের ছোঁয়া

বসন্তে পোশাকের আয়োজনে সব সময় ফুলের মোটিফ রাখা হয়ে থাকে এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। মডেল: অন্বেষা ও অতুল, পোশাক: সূঁচ, ছবি: রাকিবুল ইসলাম
আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৯:১১
নাহিন আশরাফ

আজি দখিন-দুয়ার খোলা-

এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।

দিব হৃদয়দোলায় দোলা,

এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো ॥

শীত বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাছের ঝরে যাওয়া শুকনো পাতা আবার যেন একটু একটু করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। বাগানে হরেক রকমের ফুল জানান দিচ্ছে ফাগুনের আগমনী বার্তা। কিন্তু ফুল ফোঁটা দিয়েও কিন্তু খুব একটা যায়-আসে না। কারণ কথাই তো আছে, বসন্তের আগমন মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, শুষ্কতা শেষে হঠাৎ চারপাশ সতেজ হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনটাও হয়তো তাই শুষ্কতায় ভরে ওঠার পর একসময় প্রাণ ফিরে পায়। প্রকৃতির রং যেন মানুষের মনকেও রাঙিয়ে তোলে। বসন্ত এলেই বাঙালি সাজপোশাকের আয়োজনে কোনো কমতি রাখতে চায় না। তাই আমাদের বসন্তের সাজপোশাক নিয়ে আজকের আয়োজন-

পোশাকে ফাগুনের ছোঁয়া

বসন্তকে কেন্দ্র করে দেশের ফ্যাশন হাউসগুলো থেকে শুরু করে লোকাল মার্কেটসহ সব স্থানে পোশাকের পসরা সাজানো হয়েছে। ফ্যাশন হাউসগুলোর ভেতরে ঢুকলেই হারিয়ে যেতে হচ্ছে হলুদ, কমলা, লালসহ হরেক রকম রঙের মেলায়। সব বয়সী ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে পোশাকের কালেকশন সাজানো হয়েছে। মেয়েদের জন্য রয়েছে শাড়ি, সালোয়ারকামিজ, ফতুয়া, শর্ট কামিজ, কটি ইত্যাদি। ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, টি-শার্ট, শর্ট পাঞ্জাবি। প্রতিটি পোশাকে হলুদের প্রাধান্য দেয়া হলেও রয়েছে অন্যান্য রঙের কাজও। বসন্তে পোশাকের আয়োজনে সব সময় ফুলের মোটিফ রাখা হয়ে থাকে এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি শাড়ি আঁচল, কামিজের উড়না, ছেলেদের পাঞ্জাবি ও কটিসহ সব পোশাকে। প্রায় সব পোশাকের ওপরেই ফুলের কারুকাজ লক্ষ করা গেছে। এ ছাড়া পোশাকের ওপর রয়েছে এমব্রয়ডারি ও হাতের সুতার কাজ। সুতি, সিল্ক, মসলিন ইত্যাদি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পোশাক। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা যাচ্ছে সুতির পোশাকের। কারণ, সুতি দামে সাশ্রয়ী এবং পরেও আরাম পাওয়া যায়। পোশাকে রয়েছে বক্ল প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, কারচুপির কাজ। পোশাকে লক্ষ করা যাচ্ছে যুগলবন্দি হওয়ার জন্য একই থিমের পোশাক। হুর নুসরাতের কর্ণধার ও ডিজাইনার নুসরাত আক্তার লোপা বলেন, এবার হলুদের পাশাপাশি লাল, বেগুনি, সবুজ, ফিরোজা রঙের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বসন্তের কোনো দিনও হলুদের কদর কমবে না। তাই সব পোশাকেই হলুদের ছোঁয়া রাখা হয়। এবার বসন্তের আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকবে বলেই আশা করা যাচ্ছে। তাই যে কেউ সহজেই শাড়ি পরতে পারবে। নুসরাত আক্তার লোপা মনে করেন, এই দিন বাঙালি মেয়েদের শাড়িকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত। কারণ উৎসবটা যেহেতু বাঙালিদের। আর শাড়ি খুব দারুণভাবে বাঙালিয়ানার বহিঃপ্রকাশ করতে পারে। ফ্যাশনের পাশাপাশি কোন পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, কোনো পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তা বহন করা যায় না। ফাগুনের বাহারি এসব পোশাক পাওয়া যাবে হাতের নাগালের যেকোনো ফ্যাশন হাউসেই। দেশাল, আড়ং, অঞ্জনস, খুঁত, বিবিয়ানা, বিশ্বরঙ, বাংলার মেলা, ইয়েলো ইত্যাদি শো-রুমে। এ ছাড়া অনলাইনেও হুর নুসরাতসহ বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য পেজে ফাগুনের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। পোশাকের দাম সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে যতটা সম্ভব সাশ্রয়ী রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে ৭,০০০ টাকা, সিংগেল কামিজ ৬০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা, থ্রি-পিস ২,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা, পাঞ্জাবি ৮০০ টাকা থেকে ৪,০০০ টাকা। পোশাকের দাম নির্ভর করছে ব্র‍্যান্ড, পোশাকের মান ও ডিজাইনের ওপর।

মডেল: অন্বেষা, পোশাক: সূঁচ, ছবি: রাকিবুল ইসলাম

ফাগুনের সাজসজ্জা

পোশাকের সঙ্গে চাই মানানসই সাজ। তা না হলে যত সুন্দর পোশাকই পরা হোক না কেন তা সম্পূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না। ফাগুনে সাজের আয়োজন যেন পুরোটাই মেয়েদের ঘিরে। বসন্তের সাজ নিয়ে মেকওভার বাই আফিরনের প্রতিষ্ঠাতা নেয়না আফরিন বলেছেন, ফাগুনে সাধারণত আমরা দুপুরে কিংবা বিকেলেই বেশি বের হই। তাই আমাদের মেকআপ একটু হালকা হওয়াই ভালো। মেকআপের শুরুতে প্রাইমার ও ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিতে হবে। এরপর ফাউন্ডেশনটা হালকা রেখে তার ওপর লুজ পাউডার দিয়ে দেবেন। এরপর গোলাপি রঙের ব্লাশন দিয়ে বেইজ মেকআপের ইতি টানা যেতে পারে। এই দিনে পোশাক যেহেতু কালারফুল হবে। তাই চোখের ভারী সাজ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক দিলে সাজটা বেশ ফুটে উঠবে। অবশ্যই ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন লাগানোর কথা ভুলে গেলে হবে না। যেহেতু আবহাওয়াতে এখনো কিছুটা শুষ্কতা রয়েছে তাই সঙ্গে রাখুন লিপ বাম। লিপ বাম ঠোঁট কোমল রাখে ও লিপস্টিক দীর্ঘস্থায়ী করে। এ ছাড়া মেকআপ যাতে ঠিকমতো বসে তাই আগের দিন রাতে ঘরোয়া হাইড্রেটিং ক্রিম মাখতে হবে। ফাল্গুনের সাজে ঠোঁট একটু কালারফুল রাখার চেষ্টা করেন সবাই। সেহেতু নিজের পছন্দ ও গায়ের রঙের সঙ্গে মানায় এমন রংয়ে ঠোঁট সাজানো উচিত। ফুল বসন্তের সাজে অন্য মাত্রা যোগ করবে। নিজের পছন্দমতো চুলে খোঁপা বা বেণি করে ফুল পরে নিতে পারেন। কাঠ, পুঁতি বা মাটি দিয়ে দেশজ উপকরণে তৈরি গহনা পরতে পারেন, যা ভিন্নমাত্রা যোগ করবে আপনার ফ্যাশনে। কানে পাতলা দুল আর গলায় হালকা মালা পরতে পারেন। হাতে জামার রঙের সঙ্গে মিল রেখে রেশমি চুড়ি কিংবা কাঠের চুড়ি পরতে পারেন। অবশ্যই কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরবেন যা পূর্ণতা দেবে আপনার সাজগোজের।

বেশ কিছু টিপস

ফাগুনের আগের দিন রাতে সেফটিপিন, টিপ, তুলির মতো অনুষঙ্গ গুছিয়ে রাখুন নিজের পার্স ব্যাগে। ফাগুনে খোঁপাতে ফুল পরলে আগের দিন ফুল কিনে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন এতে ফুল কিছুটা তাজা থাকবে, সম্ভব হলে ফাগুনে সকালেই ফুল কেনার চেষ্টা করতে হবে। খোঁপা করতে লাগবে ক্লিপ! আগের দিন রাতে ক্লিপ গুছিয়ে রাখতেও ভুলবেন না। এ ছাড়া বৃষ্টি কিংবা রোদ এড়াতে সঙ্গে ছাতা রাখা বেশ উপকারী।


ভিন্ন স্বাদে বাঁধাকপি ভাজি

হেঁশেল
আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৮:২১

বসন্তের হাওয়া একটু আগেই গায়ে লাগছে। মিষ্টি সে হাওয়া হালকা শীতলতা বুলিয়ে দিয়ে যায়। এমন সময় সন্ধ্যার নাস্তায় গরম স্যুপ কিন্তু মন্দ হয় না। অন্যদিকে দুপুরে কিংবা রাতে খাবার পাতে একটু ভিন্ন স্টাইলে রান্না বাঁধাকপি ভাজিও কিন্তু বৈচিত্র্য আনবে। চমৎকার দুটো রেসিপি জানাচ্ছেন কেয়ার মেডিকেল কলেজের সাবেক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. খালেদা শারমিন।

উপকরণ

  • পাতাকপি কুচি ৩ কাপ
  • গাজর কুচি ১টা ছোট
  • আলু কুচি ১টা
  • সরিষাবাটা ১ টেবিল চামচ
  • তেল ২ টেবিল চামচ
  • পেঁয়াজ কুচি হাফ কাপ
  • কাঁচা মরিচ ৩-৪টা, মাঝ বরাবর কাটা
  • লবণ পরিমাণ মতো
  • লেবুপাতা অথবা কারিপাতা ৬-৭টা

প্রণালি

বাঁধাকপিসহ সব সবজি ধুয়ে, কুচি করে নিতে হবে। এবার প্যানে তেল গরম করে এতে পেঁয়াজ হালকা ভেজে এতে সরিষাবাটা দিতে হবে। এবার লবণ আর অল্প পানি দিয়ে কষাতে হবে। সবজি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে একটু ঢেকে দিতে হবে। রান্নার মাঝে মাঝে নাড়তে হবে। সর্বশেষে কারিপাতা বা লেবুপাতা দিয়ে পছন্দমতো ভাজা ভাজা করতে নামিয়ে নিতে হবে।


আমতলা থেকে বইমেলা

আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৮:০৮
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা

বর্তমানে বইমেলার পরিসর অনেক বড় হলেও শুরুতে এমন ছিল না। সময়টা ছিল ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। মুক্তধারা প্রকাশনীর কর্ণধার চিত্তরঞ্জন সাহা শুরু করেন অদ্ভুত এক কাণ্ড। চট বিছিয়ে বাংলা একাডেমির আমতলায় বসে পড়েন কিছু বই নিয়ে।

যুদ্ধের সময় চিত্তরঞ্জন সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতায়। সেই উত্তাল সময়ে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের ভিড়। তারা লিখছেন, যুদ্ধের কথা, পাকসেনাদের বর্বরতার কথা জানাচ্ছেন- কেউবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, কেউবা নিজের লেখালেখির মাধ্যমে। চিত্তরঞ্জন তখন গাঁটের পয়সা খরচ করে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের বই ছাপাচ্ছেন। ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ পরিষদের আড়ালে সেগুলোর প্রকাশক মুক্তধারা প্রকাশনী, চিত্তরঞ্জন যার কর্ণধার। যুদ্ধের পর দেশ যখন স্বাধীন হয়, সেই বইগুলো নিয়ে দেশে ফিরে আসেন চিত্তরঞ্জন। কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই নিয়ে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে বসে পড়েন তিনি। আমতলায় চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেন।

পরের বছরগুলোতে চিত্তরঞ্জন সাহার দেখাদেখি অনুপ্রাণিত হতে থাকেন আরও কিছু প্রকাশক। ফেব্রুয়ারিতে তারাও চট বিছিয়ে বসে পড়েন বাংলা একাডেমির ঘাসের উঠোনে। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকীর আগ্রহে বাংলা একাডেমিও যুক্ত হয়। পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এই সমিতিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা। এই ছিল বইমেলার আদি ইতিহাস।

‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলা শুরু হয়েছে ১৯৮৩ সালে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে কাজী মনজুরে মওলা আয়োজন করেছিলেন এই মেলা। কিন্তু সে বছর এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দেয়া হয়। এই ঘটনায় দুইজন ছাত্র নিহত হয়। ফলে সে বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। পরের বছর ১৯৮৪ সালে আবারও সাড়ম্বরে সূচনা হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলার। ৩২ বইয়ের ক্ষুদ্র সেই মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও চলছে মহাসমারোহে।

পুরো বিশ্বে দীর্ঘসময় ধরে চলা বইমেলাগুলোর অন্যতম আমাদের অমর একুশে বইমেলা। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক-কবিদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে বইমেলা প্রাঙ্গণ। হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা, অভিজিৎ রায়েরা প্রয়াত হলেও তাদের বইয়ের আলোয় এখনো উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলছে বইমেলা।


বাংলাবাজারের ইতিকথা

আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৮:০৪
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা

বাংলাবাজারের বইয়ের জৌলুস দিন দিন বড়ই বাড়বাড়ন্ত। ছোট ছোট গলি, থরে থরে সাজানো বইয়ের স্তূপ। প্রত্যেক বইপ্রেমীর কাছে বাংলাবাজার যেন বইয়ের এক স্বর্গ। পাশাপাশি বহুতল মার্কেটে গড়ে উঠেছে বইয়ের দোকান। সেখানকার আকাশও ছেয়ে গেছে বইয়ে। বইয়ের সঙ্গে বাংলাবাজারের এই সম্পর্ক হুট করেই গড়ে ওঠেনি। এর ইতিহাস সুপ্রাচীন।

১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ বাংলার রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঢাকাকে। পরবর্তীকালে ১৮৬০ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাঙ্গালা যন্ত্র বা ছাপাখানা। এরপর ১৮৬৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে কলকাতার বটতলার পুঁথির আদলে বাংলা বাজারের পার্শ্ববর্তী চকবাজারে গড়ে উঠেছিল কেতাবপট্টি। বাংলাবাজার গড়ে ওঠার সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষক সৈয়দ আবুল মনসুরের মতে, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পরপর একটি-দুটি করে বইয়ের দোকান গড়ে ওঠে এখানে। তৎকালীন সময়ে ছাপাখানাগুলো ছিল বাবুবাজারে আর বাংলাবাজার ছিল বিক্রয়কেন্দ্র। আবার ১৮৬০ সালে হরিশ্চন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘কবিতাকুসুমাবলি’ নামে জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকাও বিক্রি হতো বাংলাবাজারে। এ ছাড়া উনিশ শতকের শুরুতে চকবাজার, পাটুয়াটুলী, মোগলটুলীসহ কয়েক জায়গায় গড়ে উঠেছিল ধর্মীয় বইপত্রের দোকান। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই দোকান স্থানান্তর করেছিলেন বাংলাবাজারে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে জমজমাট হতে শুরু করে বাংলাবাজার। লেখক, সাহিত্যিক, প্রকাশকরাও ভিড়তে শুরু করেন এদিকে। আবার ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলাবাজারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। প্রথমদিকে অবিভক্ত ভারতের প্রকাশনা জগৎ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক হলেও দেশভাগের পর পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। প্রথমদিকে নরওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, খোশরোজ কেতাব মহল, হার্ডান এন্ড কোম্পানি, পুঁথিপত্রের মতো প্রকাশনীগুলো বাংলাবাজারমুখী হয়ে যায়। পাশাপাশি কলকাতা থেকে এপারে এসে দোকান খুলল মল্লিক ব্রাদার্স। এভাবেই বাংলাবাজার হয়ে ওঠেছে বইয়ের স্বর্গ।


ঈশ্বরদীতে আখের সঙ্গে ‘সাথি ফসল’ চাষে সম্ভাবনা

আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৩৯
মিশুক প্রধান

আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। তাৎক্ষণিক অর্থ না আসায় কৃষকরা তাই দিন দিন আখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলেন। কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের সহায়তাকল্পে ঈশ্বরদীর বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট গত ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু করেছে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের নাম ‘আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে ডাল, মসলা ও সবজিজাতীয় ফসল উৎপাদন প্রকল্প।’ এই প্রকল্পের কারণে কৃষকরা সাথি ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে পাশাপাশি আখ শিল্পকে নিয়ে আবার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কৃষকদের মাঝে প্রকল্পটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

সুগার ক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউটসংশ্লিষ্টরা জানান, আখ বাংলাদেশের খাদ্য ও শিল্পে ব্যবহার্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থকরী ফসল, যা জমিতে প্রায় ১৩-১৪ মাস থাকে। উপরন্তু তুলনামূলকভাবে আখের মূল্য না বাড়ার কারণে কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে দিন দিন আখ চাষের জমির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে সার্বিকভাবে দেশের চিনিশিল্পের ওপরে। তাই আখ ফসলকে এ বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষার জন্য আখের সঙ্গে আরেকটি স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষ করে কৃষক ও এই শিল্পকে রক্ষা করার জন্য এই প্রকল্প গঠন করা হয়েছে। আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর, মুগ, আলু, কপি, মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ, রসুন চাষ করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ড. আবু তাহের সোহেল বলেন, ১৫টি সুগার মিল এলাকায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে । ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় এক হাজার কৃষকের জমিতে প্রদর্শনী প্লট করা হয়েছে। প্লটগুলোতে কৃষকরা যথেষ্ট সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আগামীতেও এই প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রাখার চেষ্টা করব।

প্রতি প্লটে কেমন খরচ হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প পরিচালক জানান, এলাকা অনুযায়ী আবহাওয়া ও কৃষকের চাহিদা মোতাবেক তার জমিতে সাথি ফসল আবাদের ব্যবস্থা করা হয়। ভিন্নতা বুঝে কোথাও ডাল, কোথাও সবজি, কোথাও মসলাজাতীয় ফসল চাষের ব্যবস্থা করা হয়। বীজের মূল্যের ওঠানামা বা কমবেশি থাকায় একেক প্লটে একেক বাজেট হয়। এক বিঘা জমি চাষের জন্য একজন কৃষককে এই সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। কৃষকদের নগদ টাকা দেয়া হয় না। তবে যদি সে নিজে সেচ দিতে চায় সে ক্ষেত্রে তাকে সেচের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থটি আমরা দিয়ে দিই। সার, কীটনাশক, বীজ, মসলাসহ চাষাবাদ সামগ্রী আলাদা আলাদাভাবে ক্রয় করে কৃষককে সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক নিজেই শ্রমিকের কাজটা করতে চান। সে ক্ষেত্রে কীটনাশক প্রয়োগ, সার প্রয়োগ, নালা তৈরি, ফসল সংগ্রহে শ্রমিকের মজুরি বাবদ যেই অর্থটি বরাদ্দ করা হয় সেটি কৃষককে দিয়ে দিই। সাথি ফসল চাষে কৃষককে সব সামগ্রী সরবরাহ করা এই প্রকল্পের কাজ। নেট, বাঁশ, সাইনবোর্ডসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সব কিছুই কৃষককে সরবরাহ করতে হয়। বিএসআরআই বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে প্রতিটি প্লটের পৃথক কমিটি রয়েছে। তারা নিজ নিজ প্লটে অর্পিত দায়িত্ব পালন ও খরচাদি করে থাকেন।

উপকারভোগী কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা এই প্রকল্পে যথেষ্ট উপকারী হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের চকশ্রীরামপুর গ্রামের কৃষক আবু মোস্তফা বলেন, ‘আমি ১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে আখের সঙ্গে সাথি ফসল রসুন ও মুগডাল চাষ করেছি। গত বছর আমার এক পরিচিত জন এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছিলেন। তার ৩০ মণ রসুন হয়েছিল, বিক্রি করেছিলেন ৫৫ হাজার টাকা। এবার তার চেয়ে আমি বেশি লাভবান হতে পারব বলে আশা করছি।’

দাশুড়িয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের কৃষক রহিমা খাতুন বলেন, এ বছর আমি আখের সঙ্গে পেঁয়াজ ও মুগডাল করেছি। সব খরচ এই প্রকল্প থেকে দেয়া হয়েছে। ফসলও ভালো হয়েছে। আমি এবার ভালোই লাভবান হতে পারব।

মুলাডুলি ইউনিয়নের কৃষক নুরুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘আমি ১ বিঘা জমিতে বিএসআরআই আখ-৪৬ জাতের সঙ্গে পেঁয়াজ ও মুগডাল চাষ করেছি। গত বছর আমার এক ভাই এই সুবিধা পেয়েছিলেন। তিনি ৮০০০টি চিবিয়ে খাওয়া আখ ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছিল। সাথি ফসলে শুধু রসুন করলেও সেখান থেকেও প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এসেছিল। এ বছর আমি সেই সুযোগ পেয়েছি। দেখা যাক কী হয়। তবে তার চাইতে আমি বেশি লাভ আশা করছি।

দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মাড়মী গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে আলু ও মুগডাল করেছি। গত বছরই এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। এখানকার একজন পেঁয়াজ চাষ করে প্রায় ৫০ মণ পেঁয়াজ পেয়েছিলেন। হাজার টাকা মণ বাজারমূল্য ছিল। প্রায় অর্ধ লাথ টাকার উপরে বিক্রি হয়েছিল। ইনশাল্লাহ আমার এরচেয়ে বেশি লাভ হবে। এ বছর আখেরও বাজার ভালো, সেখান থেকেও আমার ভালো লাভ হবে বলে আমি আশা করি।

বিএসআরআইর মহাপরিচালক ড. মো. ওমর আলী বলেন, আখ চাষে দুই সারির মধ্যবর্তী স্থানের ফাঁকা জমি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে। ওই ফাঁকা জমিতে সাথি ফসল হিসেবে ডাল, মসলা, সবজি চাষ করিয়ে কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করানো হচ্ছে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রথম বছর সফলতার সঙ্গে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় দ্বিতীয় বছরে তারই ধারাবাহিকতায় প্লট স্থাপনের কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়লে কৃষকরা অধিকতর উপকৃত হতেন।

লেখক: প্রতিনিধি, ঈশ্বরদী (পাবনা)


সাইলেজ : গোখাদ্যসংকটে সমাধান

আপডেটেড ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৩৯
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা

দেশের চারণভূমির পরিমাণ দিন দিন ক্রমেই কমছে। দানাদার খাদ্যের দামও ক্রমাগত বাড়ছে। এমন অবস্থায় খামারিদের প্রাণিখাদ্য বিশেষ করে ঘাস খাওয়ানোর জন্য ঘাস সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষাকালে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঘাসের অভাব পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সাইলেজ।

সাইলেজ আধুনিক খামারিদের কাছে খুবই পরিচিত পদ্ধতি। সাইলেজ মূলত সবুজ ঘাস সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সবুজ ঘাসের পুষ্টি উপাদান সঠিক রেখে বায়ুশূন্য অবস্থায় সবুজ ঘাসকে ভবিষ্যতের জন্য প্রক্রিয়াজাত করে রাখার প্রক্রিয়াকে সাইলেজ বলা হয়।

সাইলেজের উপকারিতা

সাইলেজ পুষ্টিকর একটি গোখাদ্য প্রস্তুত প্রক্রিয়া, যার বহুবিধ উপকারিতা রয়েছে। ভালোভাবে পচন করা হলে সাইলেজের শর্করা খাবার পরিপাকযোগ্য এসিডে পরিণত হয়, যা গরুর খাদ্যের পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সাইলেজে ব্যবহৃত সব পুষ্টি উপাদান খাবারকে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। প্রাকৃতিকভাবে চরে যাওয়া ঘাসের চেয়ে অনেক বেশি খাদ্য উপাদান পাওয়া যায়। এতে শক্তির অপচয় অনেক কম হবে। দুগ্ধবতী গাভির শারীরিক এবং দুধ উৎপাদনের প্রয়োজনে প্রচুর পরিমাণে শক্তি, আমিষ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। ভালো মানসম্পন্ন সাইলেজের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ শক্তি, প্রোটিন, ভিটামিন, ফাইবার রয়েছে, যা গাভির দুধ উৎপাদন অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক ও ভালো রাখে।

সাইলেজের মধ্যে এনার্জি, আমিষ ও প্রয়োজনীয় ফ্যাট বিদ্যমান থাকায় গাভির পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক ও দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সাইলেজ সঠিক মাত্রায় খাওয়ানো হলে প্রজনন প্রক্রিয়া ভালো থাকে। বর্ষা মৌসুমে সবুজ ঘাসে ময়েশ্চার বেশি থাকার কারণে শুকাতে সমস্যা হয়, আর শুকনো হলে পুষ্টিমান কমে যায়। তাই সারা বছর সঠিক পুষ্টিমানসমৃদ্ধ ঘাস গরুকে খাওয়াতে সাইলেজ হতে পারে উত্তম প্রক্রিয়া। কাঁচা ঘাসের তুলনায় এই প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে রাখা ঘাসের গুণগত ও খাদ্যমান বেশি। দেশীয় ঘাস যেমন: দূর্বা, বাকসা, আরাইল, সেচি, দল ইত্যাদি গাছের পাতা যেমন: ধৈঞ্চা, ইপিল-ইপিল উন্নত জাতের ঘাস যেমন: নেপিয়ার, পাকচং, জার্মান, ভুট্টা, সুদান, পারা, সরগম ইত্যাদি সাইলেজ তৈরি করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সাইলেজ তৈরি

সাইলেজ তৈরি হয় একটি পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। প্রতিটি ধাপ সতর্ক থেকে সাইলেজ উৎপাদন করলে তার গুণগত মান অনেক ভালো হয় এবং বেশি দিন সংরক্ষণ করে খাওয়ানো যায়।

ফুল আসার আগে একই পরিপক্বতার ঘাসগুলো কেটে নিতে হবে। সবুজ ঘাসের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সাইলেজ হয় ভুট্টার। কারণ এই সাইলেজে কাণ্ড, পাতার সঙ্গে ভুট্টাও থাকে, যার ফলে দানাদার খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হয়। এ জন্য আধা কাঁচা ভুট্টা থাকার সময় সংগ্রহ করা ভালো।

ঘাসগুলোকে এক দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হবে, যেন ভেজা ভাবটা না থাকে।

ঘাস ১ থেকে ৩ ইঞ্চি পরিমাণ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে হবে। বেশি পরিমাণে কাটার জন্য বাজারে মেশিন আছে, যাকে চপার মেশিন বলে।

ফার্মেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করার জন্য চিনিজাতীয় উপাদান যুক্ত করতে হবে। এ জন্য লালিগুড় বা মোলাসেস ব্যবহার করা যেতে পারে। তা ছাড়া লাল চিনিও ব্যবহার করা যায়। (বি.দ্র. ভুট্টা ও জার্মান ঘাসে পর্যাপ্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট থাকার কারণে মোলাসেস প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না)।

এবার সংরক্ষণের জন্য সিলো বা পাত্র ঠিক করতে হবে। এ জন্য স্টিক ব্যাগ বা বস্তা ও ড্রাম ব্যবহার করা যায়। তা ছাড়া মাটিতে পুঁতেও সংরক্ষণ করা যায়।

স্টিক ব্যাগ বা ড্রামে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যাগটি যেন কোনো রকম ছেঁড়া না হয়। প্রথমে মোলাসেস এবং পানিমিশ্রিত দ্রবণের অর্ধেক পরিমাণ ঘাসে প্রয়োগ করতে হবে। তারপর সেই ঘাস ব্যাগে কয়েক ধাপে ভরতে হবে। এক ধাপ ভরার পর ভালোভাবে চাপ দিতে হবে, যেন ঘাসগুলোর মাঝে ফাঁকা না থাকে। ফাঁকা থাকলে সেখানে বাতাস থেকে যাবে, যার ফলে সাইলেজ ভালো না হওয়ার কারণে বেশি দিন ঠিক থাকবে না। তারপর মোলাসেস মিশ্রিত পানি আবার খানিকটা প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে কয়েক ধাপে ব্যাগ কিংবা ড্রামে ভালোভাবে ভরে শক্তভাবে মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে যেন বাতাস প্রবেশ না করতে পারে।

মাটিতে পুঁতেও সাইলেজ করা যায়। এ জন্য উঁচু স্থান নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গর্ত করে কয়েক ধাপে সমপরিমাণে মোলাসেস এবং পানিমিশ্রিত ঘাস পা দিয়ে ভালোভাবে চাপ দিয়ে কমপেক্ট করতে হবে। তারপর উপরে আবার পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে মাটি চাপা দিতে হবে।

উক্ত প্রক্রিয়াটি ১-২ দিনের মাঝে শেষ করতে হবে। সাইলেজ আরও পুষ্টিসমৃদ্ধ করার জন্য অব্যবহৃত কলা, কলার খোসা, মিষ্টি আলু, আখের খোসা ও যুক্ত করা যায়। ভালোভাবে সাইলেজ তৈরি করলে সর্বোচ্চ ১০-১২ বছর সংরক্ষণ করা যায় এবং পুষ্টিগুণাগুণ অক্ষুণ্ন থাকে।

সবুজ ঘাসের সাইলেজ বানানোর ক্ষেত্রে ঘাসের শতকরা ৩-৪ ভাগ চিটাগুড় মেপে একটি চারিতে নিতে হবে। তারপর ঘন চিটাগুড়ের মধ্যে ১:১ অথবা ৪:৩ পরিমাণে পানি মিশালে এটি ঘাসের ওপর ছিটানো উপযোগী হবে। ঝরনা বা হাত দ্বারা ছিটিয়ে এ মিশ্রণ ঘাসে সমভাবে মিশাতে হবে।

সাইলোর তলায় পলিথিন দিলে আগে বিছিয়ে নিতে হবে। পলিথিন না দিলে পুরু করে খড় বিছাতে হবে। এরপর দু-পাশে পলিথিন না দিলে ঘাস সাজানোর সঙ্গে সঙ্গে খড়ের আস্তরণ দিতে হবে। স্তরে স্তরে সবুজ ঘাস এবং শুকনো খড় দিতে হবে। সম্পূর্ণ ঘাস এক দিনেই সাজানো যায়। তবে বৃষ্টি না থাকলে প্রতিদিন কিছু কিছু করেও কয়েক দিনব্যাপী সাইলেজ তৈরি করা যায়। নিচু জায়গায় সাইলো করা যাবে না। তাতে পানি জমে সাইলেজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সাইলেজ ব্যবহারের নিয়ম

সাইলেজ স্বভাবিক ঘাসের মতোই প্রাণীকে খাওয়ানো যায়। সাইলেজ সবুজ ঘাসের চাহিদা পূরণ করে। সব বয়সের প্রাণীকে সহজে খাওয়ানো যায়। অল্প করে অভ্যাস করিয়ে বেশি করে খাওয়ানো যায়। সঠিকভাবে পরিচর্যার পাশাপাশি নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ সাইলেজ খাওয়ানো হলে গরুর মাংস উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত ঠিকাদান, কৃমিমুক্ত রাখা এবং দানাদার খাবারের সঙ্গে সাইলেজ খাওয়ানোর ফলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

সাইলেজের পুষ্টি এবং উপকারিতা জেনে খামারিরা নিজেরা এটি উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া দেশের কিছু কোম্পানি আধুনিক নিয়মে সাইলেজ উৎপাদন করে খামারিদের প্রয়োজনে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছে। সাইলেজ অন্য খাবারের তুলনায় অনেকটা সাশ্রয়ী, বিশেষ করে শুকনো খড় খাওয়ানোর চেয়ে সাইলেজ খাওয়ানো অনেক ভালো এবং খামারিরা এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লাভবান হচ্ছে।

লেখক: প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল, গোমস্তাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


ব্যায়ামের প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে…

আপডেটেড ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৫:৫০
তানজিনা আলম

অনেকেই নতুন বছরে বেশি ব্যায়াম করার সংকল্প করেছেন। এর মধ্যে বয়স্করাও বাদ যাননি। হয়তো নিজের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করার প্রথম সপ্তাহে শুরুও করেন, কিন্তু কিছুদিন পরই পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যান। হাঁটার জন্য জুতা পরার চেয়েও টেলিভিশন হয়ে ওঠে প্রলুব্ধকর। আর দায় এড়াতে, আজ খুব ঠাণ্ডা বা খুব গরম, একদমই সময় নেই বা ইচ্ছা করছে না- এমন সব অকাট্য অজুহাত তো আছেই।

এভাবে শুয়ে-বসে থাকার জীবনধারা দীর্ঘজীবন এবং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার জিজ্ঞেস করলে এদের অনেকেই বলবেন, এতে জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও তাদের মাথাব্যথা নেই। ফলে একাধিক জটিল ও স্থায়ী রোগ- স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ এবং আরও অনেক রোগ বাসা বাঁধে। ডাক্তার আর পথ্যের খরচ জীবনযাপন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এটি অবশ্য কেউই চান না। কিন্তু এসব প্রতিরোধের জন্য চাই অনুপ্রেরণা। চলুন জেনে নিই নিজের প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে কী করা যেতে পারে-

প্রয়োজন প্রচেষ্টার

ব্যায়ামে ধারাবাহিকতা রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চার করতে হবে। পছন্দ না হলেও ডিমেনশিয়া প্রতিরোধসহ অন্যান্য অঙ্গকেও রক্ষার জন্য এতটুকু করতে হবে। কারণ ব্যায়াম মস্তিষ্কের পাশাপাশি শরীরের বাকি অংশকেও রক্ষা করে। দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে বাঁচতেও এর বিকল্প নেই।

কাজে লাগানো যায় ইউটিউব

ইউটিউবে বয়স্ক ব্যক্তিদের বাড়িতেই করার মতো সহায়ক ভিডিওগুলো দেখতে উৎসাহিত করতে হবে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং ইউটিউবের মাধ্যমে বয়স্কদের ব্যায়ামে উৎসাহিত করতে রেখেছে ‘গো ফর লাইফ’ প্রোগ্রাম। ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভিডিও-নির্দেশিত প্রোগ্রামগুলো দিয়েই দুর্দান্ত সূচনা হতে পারে।

অভিভাবক বার্ধক্যে থাকলে কাছের মানুষের একটু সমর্থন আর উৎসাহ ব্যায়ামে অনিচ্ছুকদের জন্য ভীষণ সহায়ক। বয়স্ক মা-বাবার সঙ্গে ভিডিও দেখা, তদানুসারে চর্চার রুটিন করে ফেলা- এসবই এগিয়ে দেবে অনেকটা। হাঁটতে বা দাঁড়াতে অক্ষম হলে চেয়ারে বসেও ব্যায়াম করা যায়।

করণীয়
*ব্যায়াম করতে প্রচেষ্টা লাগে, এটা ঠিক কিন্তু অসম্ভব নয়। স্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা দূরে রাখতে এবং পরিকল্পিত বার্ধক্যের জন্য এই প্রচেষ্টা ভালো।
*একা ব্যায়াম না করে কারও সঙ্গে ব্যায়াম করা আরও ফলপ্রসূ। কারণ আগ্রহ ধরে রাখা যায়।
*ব্যায়ামের কিছু নির্দিষ্ট জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় হাঁটার জুতা, ঢিলেঢালা প্যান্ট, শার্ট কিংবা জ্যাকেটও খুব ব্যয়বহুল নয়, কিন্তু কার্যকরী।
* ইউটিউবে ব্যায়ামের ভিডিওগুলো দেখে কী করতে হবে তা নিশ্চিত না হলে ১০-১৫ মিনিটের জন্য বাড়িতেই ওয়ার্কআউট করার চেষ্টা করুন।
*অন্য কোনো কিছু ভালো না লাগলে- শুধু হাঁটুন। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে, সিঁড়িতে ওঠানামা করা, শপিংমলে হাঁটা বা হালকা ডাম্বেলের মতো সরঞ্জামসহ বা ছাড়াই যেকোনো ব্যায়াম করুন।

পরিশেষে এটি মাথায় রাখুন, নিয়মিত ব্যায়াম মেজাজ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে এবং স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের পথে এগিয়ে নেবে।


পরিবারে প্রবীণ সদস্যের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

আপডেটেড ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৫:৫০
রবিউল কমল

যেকোনো দেশের মোট জনসংখ্যার একটি অংশ থাকেন প্রবীণ। তবে, প্রবীণদের কখনোই পরিবার বা সমাজের বোঝা ভাবা উচিত নয়। বরং তারা একটি পরিবারের অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা পরিবার ও সমাজের অনেক কিছুতেই অবদান রাখতে পারেন। তাই প্রবীণ সদস্যকে বোঝা না ভেবে তার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। তার অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সাধারণত পরিবারের একজন প্রবীণ সদস্য নানাভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন। কখনো শিক্ষক, কখনো পরামর্শদাতা, বন্ধু কিংবা গাইড হিসেবে তারা একটি পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বব্যাপী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন প্রজন্মের বিচিত্র মনোভাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রতিষ্ঠানের পুরনো কর্মচারী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পুরোনোদের মতামত ও তরুণদের মতামত মিলিয়ে কাজ করছে তারা। যদিও আমরা প্রায়ই বৈচিত্র্যকে শুধু সাংস্কৃতিক পরিভাষায় চিন্তা করি। তবে বিভিন্ন প্রজন্মের যে কাজের ভিন্নতা বা দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য আছে, তার মূল্যায়নে কিন্তু ভালো ফল পাওয়া যায়। একইভাবে আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং বয়স্ক আত্মীয়দের জ্ঞান বিভিন্ন সময়ের বিবর্তনকে বুঝতে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া আমাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ভাবতে কিংবা তুলনা করতে সহায়তা করে।

সমাজের প্রতিচ্ছবি

শিশুরা ধীরে ধীরে তরুণ হয়ে ওঠে। তরুণ বয়স সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে তাদের বয়স্ক আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটাতে উৎসাহিত করা উচিত। কারণ প্রবীণ মানুষগুলো বিভিন্ন মূল্যবোধের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন। তাদের সমাজ নিয়ে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা আছে। বয়স্করা তাদের এসব অভিজ্ঞতা তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। আর দাদা-দাদি বা বয়স্ক আত্মীয়ের সঙ্গে সময় কাটালে নিজস্ব মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়। কারণ, পরিবারের প্রবীণ সদস্যটি আমাদের কাছে একটি সমাজের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি।

যত্নশীল

২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় দাদা-দাদিরা প্রতি সপ্তাহে আনুমানিক ৫৮ ঘণ্টা পরিবারের ছোট সদস্যের যত্নে ব্যয় করেছেন। আর এটি তাদের সন্তানদের কর্মক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত থাকতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে তারা নাতি-নাতনির জন্য বাড়িতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেছেন এবং শিশুদের যত্নের বিষয়টিও সহজ করেছেন। তাই আপনার শিশুকে দাদা-দাদির সঙ্গে মিশতে দিন। তাহলে আপনার প্যারেন্টিংও সহজ হয়ে যাবে, সন্তানকে সামলানোর চাপ কমবে। এতে নিশ্চিন্তে অফিসসহ যেকোনো কাজে মনোযোগী হতে পারবেন। তা ছাড়া পরিবারের প্রবীণ সদস্যটির ছোটদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য অনেক সময় থাকে এবং তারা এটি পছন্দ করেন। আর এতে আপনার সন্তানের সময়গুলোও মজার হবে।

টিপস অ্যান্ড ট্রিকস

প্যারেন্টিং এমন একটি দক্ষতা, যা আমরা চাকরি থেকে শিখতে পারি না কিংবা কখনোই পুরোপুরি আয়ত্ত করি না। অন্যদিকে প্রতিবছর শিশুর মধ্যে নতুন পরিবর্তন আসে, কারণ প্রতিটি শিশু আলাদা। আবার এমন কোনো বই নেই, যা আপনাকে প্যারেন্টিংয়ের যাবতীয় সবকিছু শিখিয়ে দিতে পারে। তাই আপনি দাদা-দাদি, খালা, চাচা, বড় চাচাতো ভাই বা পারিবারিক বন্ধুদের কাছ থেকে টিপস ও পরামর্শ নিতে পারেন। তারা আপনাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে পারবেন। এসব বিষয়ে তাদের আছে বিস্তর অভিজ্ঞতা। আপনি কীভাবে আরও ভালো অভিভাবক হয়ে উঠতে পারবেন, তার একমাত্র সমাধান কিন্তু এই প্রবীণরাই।

অনুপ্রেরণার উৎস

আমাদের পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা প্রায়ই বিভিন্নভাবে লড়াই করেছেন এবং কঠিন সময় পার করে এসেছেন। তাই তারা পরিবারের তরুণ সদস্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাদের প্রতীক‚ লতার গল্প বা দীর্ঘ সময় ধরে জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প তরুণদের পরিশ্রমী হতে সহায়তা করে। তরুণদের উপলব্ধি করতে শেখায়, জীবনে কঠিন সময় আসবে। আর এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু, কোনো পরিস্থিতিতে হাল ছাড়া যাবে না। বরং শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। আবার পরিবারের একজন বয়স্ক সদস্য প্রায়ই পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতে পারেন। যা তরুণদের অনুসরণ করতে উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত করতে পারে। অনেক সময় বাবা-মা-সন্তানের সম্পর্ক চ্যালেঞ্জিং হয়। তখন একজন দাদা-দাদি নিঃশর্ত ভালোবাসার বিমূর্ত প্রতীক হতে পারেন।

খুব বৃদ্ধ ভাববেন না

পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে কখনোই খুব বৃদ্ধ ভাববেন না। বরং আপনার উচিত তাকে সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখার এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার সুযোগ দেয়া। মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ইন্টারঅ্যাক্ট করা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। এতে প্রবীণদের জ্ঞানশক্তি হ্রাস প্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়ে যায়, যা তাদের জন্য খুবই ইতিবাচক একটি দিক। আবার ব্যায়াম এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে দারুণ কাজ করে। তাই তাদের সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ দিন। তাদের সবার সঙ্গে দেখা করতে, দোকানে আড্ডা দিতে, সম্মিলিত ব্যায়ামে অংশ নিতে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বা বাইরে ঘুরতে সহায়তা করুন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা একটি পরিবারের জ্ঞানের উৎস, শান্ত, নির্ভরযোগ্যতা এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রতীক। তারা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শক। এই প্রবীণরা শিশু ও তরুণদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত।


‘আন্ধারমানিক পত্রিকা মানুষের কল্যাণে টিকে থাকুক’

আপডেটেড ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৫:৫০
নাজমুস সাকিব

নিদারুণ কষ্টে দিন চলে তার। তারপরও চেষ্টার কমতি নেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার। তার গ্রামের শিক্ষার মান উন্নত হোক, এমন স্বপ্নেই বাঁচেন হাসান পারভেজ। সবাই লিখতে-পড়তে শিখুক- এমন চাওয়া যেন তার আজন্ম। তাই নিজের মতো চেষ্টাও করে যাচ্ছেন। হাতে লিখে পত্রিকা বের করছেন। গ্রামের সব ছোট ছোট ঘটনা তুলে ধরেন তার সম্পাদিত কমিউনিটি পত্রিকা আন্ধারমানিকের মাধ্যমে। তাকে নিয়ে লিখেছেন নাজমুস সাকিব

ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল তার। ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েই অভাবের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়তে হয় হাসান পারভেজকে।

১৯৯৬ সালে ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। অর্থ নেই, যার কারণে দেয়া হয়নি পরীক্ষা। শিক্ষা নিয়ে কথা বলতেই কেমন যেন মন খারাপ করে থাকেন তিনি। পরীক্ষা না দেয়ার সে কষ্ট আজও ভুলতে পারছেন না। প্রবল আগ্রহ নিয়ে ২০১৫ সালে এসএসসি ও ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন হাসান পারভেজ।

মনের অজান্তেই লেখালেখি করেন গ্রামের পরিবেশ, শিক্ষা, কৃষিসহ ইতিবাচক বিষয় নিয়ে। যদিও ২০০৫ সালে পেয়েছিলেন একটা সংস্থার কাছ থেকে কবি উপাধি। এতে উপহাসের পাত্র হলেন হাসান পারভেজ, বিভিন্ন জায়গায় দিতেন তার লেখা প্রকাশ করার জন্য, কিন্তু প্রকাশিত হয়নি কোথাও।

উপকূলীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টুর সঙ্গে আন্ধারমানিক নদীর তীরে দেখা হয় হাসান পারভেজের সঙ্গে। কথা হয় উপকূল নিয়ে, হাসান পারভেজের লেখা মানুষের গল্প এবং কবিতা দেখেন রফিকুল ইসলাম মন্টু। পরামর্শ দেন নিজ গ্রামে একটি কমিউনিটি পত্রিকা প্রকাশের। রফিকুল ইসলাম মন্টুর পরামর্শে হাসান পারভেজের বাড়ির পাশের নদী আন্ধারমানিকের নাম অনুসারে ১ মে ২০১৯ সালে নামকরণ ও প্রথম প্রকাশিত হয় কমিউনিটি পত্রিকা আন্ধারমানিক।

শুরুতে গ্রামের মানুষ হাসাহাসি করত হাসান পারভেজকে নিয়ে। নানা কটূক্তিও সহ্য করতে হয়েছে তাকে। উপকূলীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু হাসান পারভেজকে সাহস দিয়ে বলেন, গ্রামের বিভিন্ন ইতিবাচক লেখা নিয়ে কাজ করতে, এতে মানুষ সমর্থন করবে।

হাসান পারভেজ কাজ শুরু করলেন। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা, সফলতা এবং শিক্ষা বিষয়ে লেখা শুরু করলেন। একপর্যায়ে সমর্থনও পাওয়া শুরু করলেন গ্রামের মানুষের। আন্ধারমানিক কমিউনিটি পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন হাসান পারভেজের মতোই দিনমজুররা, যারা অল্প পড়ালেখা জানেন। একজন প্রতিবন্ধীসহ নারী-পুরুষ মিলিয়ে গ্রামে ১২ জন রিপোর্টার আছেন আন্ধারমানিক পত্রিকায়।

আন্ধারমানিক কমিউনিটি পত্রিকার মাধ্যমে ভাগ্যের দুয়ার খুলেছে গ্রামের অনেকেরই, পেয়েছে গৃহহীন তার বাসস্থান এবং কৃষকের সাফল্য দেখে আগ্রহী হন গ্রামবাসী। এভাবে পাঠকপ্রিয়তা বাড়তে থাকে হাসান পারভেজের আন্ধারমানিক কমিউনিটি পত্রিকার।

পত্রিকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে শিরোনামগুলো কম্পিউটারে টাইপ করে লিখলেও প্রতিটি গল্প কিন্তু হাতেই লিখেন হাসান পারভেজ। এবং ফটোকপি করে বিলি করেন গ্রামে। আর পত্রিকার কাজে তাকে সাহায্য করেন তার স্ত্রী শাহানা। অর্থসংকট এবং সময়ের অভাবে নিয়মিত প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে প্রতি মাসে একবার প্রকাশিত হয়। তার পত্রিকার মাধ্যমে অনেকের জীবন বদলালেও বদলায় না দিনমজুর হাসান পারভেজের জীবন। তার দিন চলে অভাবেই।

আশার কথা হচ্ছে, হাসান পারভেজের গল্পে জীবন পরিবর্তন হয় শিশু রুবিনা ও তার ভারসাম্যহীন শিকলবন্দি মায়ের। সরকারিভাবে রুবিনা পায় ঘর। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন অনেকে। রুবিনা ও তার ভারসাম্যহীন মায়ের খবর নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে যায়। এ খবরের সূত্র ধরেই হাসান পারভেজকে খুঁজে বের করে ‘ইত্যাদি’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। এতে হাসান পারভেজকে নিয়ে আসার পর সহজ হয়ে যায় তার পথ চলা। ইত্যাদি ম্যাগাজিন হাসান পারভেজকে দুই লাখ টাকা উপহার দেয় এবং এর কিছু অর্থ দিয়ে হাসান পারভেজ ডিগ্রিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

বিভিন্ন স্থান থেকে হাসান পারভেজের কাছে ফোন আসতে থাকে। অনেকে সহযোগিতাও দিতে চান। কিন্তু হাসান পারভেজ নিজের জন্য কিছু নিতে নারাজ। তবে তিনি কিছু অর্থ সংগ্রহ করেন গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য। হাসান পারভেজ প্রায় আড়াই লাখ টাকার সহযোগিতা করেছেন। গ্রামের দরিদ্র মানুষের মাঝে ঈদে শাড়ি-লুঙ্গি ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন এবং গৃহহীন পাঁচজনকে নতুন ঘর তৈরি করে দিয়েছেন।

সবার জন্য যিনি করে যাচ্ছেন অক্লান্তভাবে, তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম আন্ধারমানিক কমিউনিটি পত্রিকা নিয়ে কী ধরনের স্বপ্ন দেখেন? জিজ্ঞেস করতেই থমকে গেলেন তিনি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি একদিন থাকব না। কিন্তু আমি চাই আমার এ পত্রিকা যুগ যুগ ধরে মানুষের কল্যাণে থাকুক।’


চকবাজারের কেতাবপট্টি

আপডেটেড ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৩:২০
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা

বটতলার মতো ঢাকায়ও ছিল সস্তা ও চটুল বইয়ের বাজার। চকবাজারে। পূর্ববঙ্গে তখন জ্বলছে নীল বিদ্রোহের আগুন। সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দিতে সে বছর ঢাকার চকবাজার থেকে প্রথম প্রকাশ হলো দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘নীল দর্পণ’খান থেকেই বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পের মহীরুহ হয়ে ওঠার সূচনা। চকবাজারের বইয়ের জগৎকে ‘বাংলাদেশের বটতলা’ বলে উল্লেখ করেছেন মোহাম্মদ আবদুল কাইউম নামের এক লেখক। তিনি একটি বইও লিখেছেন। ‘চকবাজারের কেতাবপট্টি’ সেই বইয়ের নাম। কলকাতার বিখ্যাত ইতিহাস লেখক শ্রিপান্থ ‘বটতলা’ নামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ের একটি অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে চকবাজারের কেতাবপট্টির ইতিহাস। এ জন্য তিনি তথ্যসূত্রে আবদুল কাইউমের ‘চকবাজারের কেতাবপট্টি’ বইয়ের উদ্ধৃতি টেনে বলেছেন, ‘এই কেতাবপট্টিই ছিল ঢাকার বটতলা’।


বই বিক্রির সনাতনী পন্থা

বই বিচিত্রা
আপডেটেড ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৩:১১
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
    ফেব্রুয়ারি এসেছে। ফাগুনও আসার পথে। একুশের গান যখন প্রাণে বাজতে শুরু করেছে, বাংলা একাডেমিতে তখন শুরু হয়ছে বইমেলা। বইই যেখানে মুখ্য চরিত্র, পাঠকের উদ্দেশ্য ও বিধেয়। বইমেলার এই দিনে তাই আমরা বাংলা বইয়ের বিচিত্র ইতিহাসের খোঁজ করছি।

বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায় বলে বিব্রত হয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ। বিজ্ঞাপনে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বটে, কিন্তু কখনো কখনো স্বপ্নালু আবেশও তৈরি পারে পড়ুয়াদের মনে, সেটা যদি হয় বইয়ের বিজ্ঞাপন।

কনকনে শীতের বুড়ি সদ্য যখন বিদায় নেয়, আড়মোড়া ভেঙে যখন গাছেরা জাগে, শিমুল-পলাশের ডালে ডালে আগুনের আভা দেখা দেয়, ভ্রমরের গুঞ্জরন বসন্ত বাতাসে ভাসে, বাংলা একাডেমি কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসগুলো ঢেকে যায় পাঠকের পদধূলিতে, জাতীয় দৈনিকের মুখ তখন আক্ষরিক অর্থেই ঢেকে যায় বইয়ের বিজ্ঞাপনে। অনলাইনের এই যুগে বইয়ের বিজ্ঞাপনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক আর ইউটিউব। কিন্তু আজ থেকে দুই শ বছর আগে, হুগলির শ্রীরামপুরের মিশনারির বাইরে, কলকাতার কলুটোলা কিংবা শোভাবাজারের বটতলাকে ঘিরে আমজনতার মনের খোরাক মেটাতে যে বইয়ের দুনিয়া গড়ে ওঠে, বঙ্কিমচন্দ্রের যেগুলো ‘রুচিহীন’, ‘অশ্লীল’ বলে ভর্ৎসনা করছেন, বিদ্যাসাগর আবার সেই বইগুলোকেই ‘ভারতীয় সংস্কৃতির চিরকালীন উপাদান’ বলে বঙ্কিমের বিরোধিতায় বিকল্প সুর চড়িয়েছেন, বটতলাকেন্দ্রিক সেই হাটুরে সস্তা বইয়ের জন্যও বিজ্ঞাপনের দরকার পড়েছিল। আর সেই বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সত্যিকারার্থে কোনো মিডিয়ার আবির্ভাব হয়নি, ‘সমাচার দর্পন’-এর মতো সদ্যোজাত কিছু পত্রিকা ছিল কিংবা সাময়িকী- সেগুলোতেও বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো, তবে সে সংখ্যা নগণ্য।

কইয়ের তেলে কই ভাজতেই প্রকাশকদের ভরসা ছিল ষোলআনা। অর্থাৎ একই মলাটের ভেতরেই থাকতে আরেক বইয়ের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য যখন সর্বাধিক গ্রাহকের কাছে নিজের পণ্যের কথা প্রচার করা, তাই পঞ্জিকাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী মাধ্যম। আদি রসাত্মক, হিতোপদেশ, ধর্মকাহিনির বইয়ের চেয়েও পঞ্জিকার কাটতি ছিল বেশি। হাটে, ঘাটে, পথে, প্রান্তরে, বিজন পল্লিতেও পৌঁছে যেত বটতলায় প্রকাশিত পঞ্জিকা। তাই রসিয়ে রংচং মাখিয়ে তথাকথিত সস্তা ভাষাতেই পঞ্জিকার পেছনের পাতায় প্রচারিত হতো প্রকাশকদের চোখে জমজমাট বিজ্ঞাপন।

বিখ্যাত গবেষক, নন ফিকশন লেখক শ্রীপান্থ তার ‘বটতলা’ নামের বইটিতে লিখেছেন, ‘বটতলার প্রকাশিত পঞ্জিকার আরও একটি বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে পড়ে। সেটি হচ্ছে বইয়ের বিজ্ঞাপন। নতুন বাংলা বইয়ের সংবাদ সমাচার দর্পণের কাল থেকে কিছু কিছু কাগজে ছাপা হতো। কোনো কোনো সাময়িকপত্রে বইয়ের বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। যেমন ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘এডুকেশন গেজেট’। কিন্তু পঞ্জিকার বইয়ের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে এসবের তুলনাই চলে না। বটতলার প্রকাশকরা পাতার পর পাতা জুড়ে প্রকাশ করতেন নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন। কখনো কখনো সচিত্র বিজ্ঞাপন পর্যন্ত।’

বিজ্ঞাপন ছাপা হতো পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। বিজ্ঞাপনের ভাষাটাই তাই গুরুত্বপূর্ণ, ভাষা চটকদার বা আকর্ষণীয় করতে যত রকম চেষ্টা, তার সবই করতেন লেখক-প্রকাশকরা। চলিত গদ্যের পাশাপাশি হাটুরে পদ্য কিংবা পুঁথির ভাষায় লেখা হতো বিজ্ঞাপন। ‘গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিনী’ বইয়ের নামপত্রে লেখা বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এমন : ‘চিৎপুর রোড আছে সর্বলোকে জানে। দুই শত ছয়চল্লিশ নম্বর ভবনে॥ /তার সঙ্গে বিদ্যারত্ন যন্ত্র পরিষ্কার। গোলাম তিতুর যার পেশী জমাদ্দার॥ /সেই প্রেশে এই পুঁথি সংশোধন দ্বারে। মুদ্রাঙ্কিত হৈল পুনঃ উত্তম অক্ষরে॥ /আবশ্যক হবে যার আসিবে হেথায়। লয়ে যাবে ভক্তিভাবে মজিবে মজা।’

বিজ্ঞাপনে বইয়ের ছবি বা প্রচ্ছদপট ছাপার চল কিছুদিন পরে শুরু হয়েছে। শুধু বিজ্ঞাপন কেন, খোদ বইয়ের প্রচ্ছদেও কিংবা ভেতরে ছবি ব্যবহারের চল শুরু হতে কয়েক বছর লেগে গেছে। বইয়ের নিজের মুখই হারিয়ে যেত বিজ্ঞাপনের আড়ালে। ‘দুর্গেশন্দিনী’ কিংবা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের মতো এক দুই কিংবা তিন চার শব্দে বইয়ের নাম দেয়ার চল তখনি শুরু হয়েছিল, তেমনি অনেক বইয়ে নামের বদলে প্রচ্ছদপটে থাকত ‘নামপত্রের’ আড়ালে বিজ্ঞাপন। পঞ্জিকায় বিজ্ঞাপনের ভাষাটা যেমন, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। তখনকার বেশির ভাগ জনপ্রিয় কেচ্ছাই ছাপা হতো ধারাবাহিকভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এক ফর্মা এক সপ্তাহ, পক্ষ কিংবা মাসে। জনপ্রিয় কাহিনিগুলো তাই চলত কয়েক মাস বা বছর। তাই বইয়ের প্রতিটা খণ্ডের পেছনে থাকত পরবর্তী খণ্ডের বিজ্ঞাপন।

বটতলার বিজ্ঞাপনের বড় একটা মাধ্যম ছিল ফেরিওয়ালা। কলকাতা কিংবা ঢাকা, তখনো কোনো বইয়ের দোকান গড়ে ওঠেনি। ফুটপাতের হকার আর ফেরিওয়ালারা- শুধু কোম্পানির প্রচারের স্বার্থে ঢাকা শহরে অলিতে-গলিতে যেমন তিন শ টাকার পণ্য এক শ টাকায় বিকোচ্ছে দেদারসে- সেকালে ফেরিওয়ালারা তেমনি তুলনামূলক কম দামে বই ফেরি করে বেড়াত। বিংশ শতব্দী যদি বইয়ের বিকিকিনি দোকানকেন্দ্রিক হয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর বটতলার যুগে ঠিক এই কাজটিই করত ফেরিওয়ালারা। বাঁশের ঝুড়িতে বই বোঝাই করে, হেঁকে হেঁকে বই ফেরি করে বেড়াতেন। কখনো-কখনো জিরিয়ে নেয়ার জন্য ‘একটু ছায়াতলে থমকে দাঁড়ায়’ ফেরিওয়ালা, তখন চারপাশে লোক ঝুটে যেত, গোল হয়ে ঘিরে ধরত ফেরিওয়ালাকে। তখন বইয়ের প্রকাশকের প্রচারের স্বার্থে আর নিজের বিক্রিবাট্টা বাড়াতে কাহিনির চুম্বক অংশ কখনো গল্পের ছলে, কখনো পুঁথিপাঠের মতো করে গেয়ে শোনাতেন ফেরিওয়ালা। তাকে ঘিরে লোক বাড়ে, লোকে বই নেড়েচেড়ে দেখে, পছন্দ হলে কেনে। সে যুগে এই ফেরিওয়ালারাই ছিল বটতলার বইয়ের শোরুম, প্রচারক এবং বড় বিজ্ঞাপনও বটে। এসব বিজ্ঞাপনের যে জোর ছিল, বইয়ের কাটতি দেখেই বোঝা যায়। প্রকাশকরা নাকি মাসে ৫০০ টাকা আয় করতেন। আর ফেরিওয়ালাদের আয় ২০০ টাকার মতো। দুই শ বছর আগে যখন একজন লেখাপড়া জানা চাকুরে মাসে ৫০ টাকা মাইনে পেলে বর্তে যান, সেখানে একজন প্রকাশকের ৫০০ টাকা আয় কিংবা ফেরিওয়ালার ২০০ টাকার অঙ্কটা মোটাসোটা না বলে উপায় আছে?

ফেরিওয়ালাদের প্রসঙ্গে শ্রীপান্থ রেভারেন্ড লঙের উদ্ধৃতি সহকারে বলেছেন, ‘শুধু কলকাতা আর কাছাকাছি এলাকায় বটতলার ফেরিওয়ালারা বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামে-গঞ্জে। হাটে-বাজারে, মেলায় পসরা সাজিয়ে বসতেন তারা। এভাবে বছরে আট-নয় মাস সরস্বতীর সেবা করে যে যার গ্রামে ফিরে চাষবাসের দিকে নজর দিতেন। লঙ বলেছেন, ‘এরা বাংলা বইয়ের সেরা বিজ্ঞাপন। পাঠকরা জীবন্ত একজন প্রতিনিধিকে দেখতে পান এমন একজন, যিনি বইটি দেখাতে পারেন। বটতলা অতএব শুধু বই প্রকাশ নয়, প্রচারেও সমান উৎসাহী।’

বিজ্ঞাপনের আরও এক কার্যকরী পদ্ধতি ছিল। বইয়ের বিজ্ঞাপনের হ্যান্ডবিল ছেপে বিলি করতেন লেখক-প্রকাশকেরা। বইয়ের আখ্যানপত্রে, কিংবা পেছনের পাতায় কিংবা পঞ্জিকাতে যে ভাষাতে, যে ঢঙে ছাপানো হতো, একই ছিরি-ছাঁদে হ্যান্ডবিলের বিজ্ঞাপন বিলি হতো। সুকুমার সেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বইয়ে জানিয়েছেন জানিয়েছেন, 'এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাদের হাতে কতকগুলো রাঙ্গা ছাপানো কাগজ দিয়া যায়। তাঁহারা পাঠ করিয়া দেখেন—নূতন পুস্তক, নূতন পুস্তক, সংসার-সহচরী মূল্য ৩ টাকা, পৌষ মাস মধ্যে লইলে তৎসহ উপহার দেওয়া যাইবে।'

বিজ্ঞাপনের আরেকটা জনপ্রিয় ধারা ছিল বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা। লেখকদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল বেশ, ঢাকার চকবাজারের কেতাবপট্টি থেকে যেসব বই বের হতো, সে বইয়ের বেশকিছুতে দেখা যায় এক লেখক আরেক লেখকের বন্দনা করছেন। সরসরি বইয়ের বিজ্ঞাপন হয়তো এ নয়, কিন্ত লেখককে বিজ্ঞাপিত করার মধ্যে তাঁর বইয়ের কাটতি বাড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য কৌশল। চকবাজারের কেতাবপট্টি নামের বইটিতে মোহাম্মদ আবদুল কায়উম, জনৈক কবি শেখ ঘিনুর বন্ধুপ্রীতির উদাহরণ দিয়েছেন :

'আর এক দোস্ত মুন্সি জহিরুদ্দিন নামেতে।

কি কব তারিফ তার রচনার বাতে।।

শুনিলে রচনা তার দেলে হয় খোশ।

যত শুনি তত খুশি বাড়ে খাসে জোশ।।'

তবে বই-ই সবসময় বিজ্ঞাপনের পণ্য হতো তা নয়, কখনো কখনো বই হয়ে উঠত অন্য পন্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। ব্রিটিশ সরকার রীতিমতো অশ্লীলতা বিরোধি আইন পাশ করে বটতালার সাহিত্যের নিজস্ব ঢঙে যখন সেন্সরের কাঁচি চালাতে চাইছে, বঙ্কিমের মতো কুলীন লেখকরা তাতে সাই দিচ্ছেন, বিদ্যাসাগরেরা যখন সরকারের এই নীতি বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তখন স্বদেশী ভাবধারার বেশকিছু শীল্পউদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন বটতলার লেখক প্রকাশকদের পাশে। কুন্তুলীন কেশ তেল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বটতলায় লেখকদের উৎসাহিত করতে তারা চালু করে সাহিত্য পুরস্কার। তবে শুধু লেখার মান যাচাই করে এই পুরস্কার দেওয়া হতো না। শর্ত ছিল, যিনি যত ভালোভাবে কুন্তুলীন কেশ তেলকে ঢুকিয়ে দিতে পারবেন কাহিনির ভেতর, তিনিই পাবেন এই পুরস্কার। বিখ্যাত সাহিত্য গবেষক সুকুমার সেন তাঁর ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি বইয়ে জানাচ্ছেন, ‘১৩০৩ সালের কথা। তখন স্বদেশী হাওয়া দেশে সবে বইতে শুরু করেছে। স্বদেশী কেশতৈল কুন্তলীন ও এসেন্স প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা হেমেন্দ্রমোহন বসু এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করেছিলেন দুটি উদ্দেশ্যে। এক, নবীন গল্প লেখকদের সাহিত্য সৃষ্টিতে উৎসাহ দেওয়া আর দুই, স্বদেশী দ্রব্যকে শিক্ষিত সমাজে বিজ্ঞাপিত করা। বছর বছর কয়েকটি পুরস্কার দেওয়া হত শ্রেষ্ঠ গল্প লেখকদের, যাঁরা তাদের গল্পের মধ্যে সুকৌশলে কুন্তলীন তৈল ও দেলখোস এসেন্সের নাম ঢুকিয়ে দিতে পারবেন।'

‘মুখের কথা একলা হয়ে গলির কোণে পড়ে থাকে’ বলেই বিজ্ঞাপনের দরকার হয়। বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি। সমাজের বইবিমুখ শিক্ষিত অংশটাকে বিনোদনের জন্যও যদি বই পড়ানোরে চেষ্টা করা যায়, তো ক্ষতি কী? আর সেটা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। এ কথা বুঝেছিলেন বলেই দুই শতাব্দী আগের কলকাতার বটতলা কিংবা ঢাকার চকবাজার কেন্দ্রীক প্রকশকেরা বইয়ের মুখোশ বিজ্ঞাপনে ঝোলানোর সেকেলে পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন।


মেঘ পাহাড়ের দুর্গাপুর-কলমাকান্দা

আপডেটেড ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১১:৫৪
সালাহ উদ্দীন খান রুবেল

সাদা গোলাপি দেখতে পাহাড়, নীল জলের পুকুর এবং প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনুভব করতে দুর্গাপুর অতুলনীয়। এই নয়নাভিরাম স্থানটি বাংলাদেশের উত্তরে নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত। এই জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা দেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো একটি স্থান। আজকের প্রতিবেদনে রইল দুর্গাপুর-কলমাকান্দা নিয়ে বিস্তারিত।

দুর্গাপুর বহুমুখী টপোগ্রাফিতে সমৃদ্ধ। দুর্গাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে সোমেশ্বরী নদী, সাদামাটির পাহাড়, নীল পানির লেক, রানিখং চার্চ, হাজং মাতা রাশিমণি মনুমেন্ট, কালচারাল একাডেমি, মহারাজা সুসঙ্গের প্রাসাদ, হাজং জনগোষ্ঠীর আদিবাসী সম্প্রদায়, গারো গ্রাম, দশাভুজা মন্দির, রামকৃষ্ণ মন্দির, বিজয়পুর বর্ডার, অরেঞ্জ ফরেস্ট, কংশ নদী, গজারি ফরেস্ট ইত্যাদি।

সোমেশ্বরী নদী

দুর্গাপুরের মাটিতে পা রাখলেই সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য মন কেড়ে নেবে। ভারতের মেঘালয়ে গারো-খাসিয়া রেঞ্জের অন্তর্গত গারো পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই পাহাড়ি নদীটি বিজয়পুর সীমান্ত, নেত্রকোনা দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গাপুরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখতে নৌকায় করে সোমেশ্বরী নদী পার হতে হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই মায়াবী নদী সোমেশ্বরী এই প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিবর্তন আনে।

সাদামাটির পাহাড়

দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের সিরামিক হিলস সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। কুল্লাগড়া ইউনিয়নের লাইমস্টোন লেকের আশপাশেও এই মাটির টিলা পাওয়া যায়। এই পাহাড়গুলোকে সাধারণ পাহাড় থেকে আলাদা করে তুলেছে তাদের সাদা গোলাপি রঙের মাটি। আর এই রঙের রহস্য হলো মাটির বিশেষ রাসায়নিক গঠন। ১৯৬০ সালে সিরামিক কোম্পানিগুলো সিরামিক পণ্য এবং ক্রোকারিজের উপাদান সংগ্রহের জন্য বিরিশিরিতে খনন করেছিল। ভ্রমণে কিছু রোমাঞ্চ যোগ করতে এই সিরামিক পাহাড়গুলোকে হাইক করতে পারেন। বর্ষাকালে এসব পাহাড়ের উপত্যকায় নীল জল জমে থাকে পুরো পরিবেশকে আনন্দময় করে তোলে রোমান্স।

নীল পানির লেক

দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নে অবস্থিত ‘নীল পানির লেক’ নামে এমন একটি স্বর্গীয় স্থান দেখা যায়। এই হ্রদটি নীল পুকুর, সাদামাটির হ্রদ নামেও পরিচিত। নীল জলের পিছনের রহস্য হলো মাটিতে রাসায়নিক কপার সালফেটের উপস্থিতি। তবে এই পুকুরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জলে ঝাঁপ দেয়া যাবে না। চুনাপাথর হ্রদটি মোটামুটি গভীর তাই সাঁতার কাটার জন্য যেকোনো প্রচেষ্টা জীবন বিপন্ন হতে পারে।

বিজয়পুর দুর্গাপুর

দুর্গাপুরে ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় তালিকায় রাখতে পারেন বিজয়পুরকেও। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তসংলগ্ন বিজিবি ক্যাম্প। এই জায়গা থেকে ভারতের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, মেঘ উপভোগ করতে পারবেন। সোমেশ্বরী নদীর পাশে বিজিবি ক্যাম্প থাকায় আশপাশের জায়গা দেখার জন্য নৌকাভ্রমণ করা যায়। দুর্গাপুরের উত্তরে বাদামবাড়ী, দাহাপাড়া, লালটিলা, ফান্দা ভ্যালি, গোপালপুরের সৌন্দর্যও মুগ্ধ করে।

দুর্গাপুর থেকে কলমাকান্দা পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক দিয়ে বর্ডার ড্রাইভে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। বিজয়পুর বিডিআর ক্যাম্পের দিকে যাত্রার সময় দেখা যায় হাজং রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, যা টঙ্ক আন্দোলনে শহীদ হাজং রাশিমণির সাহসী আত্মত্যাগের স্মরণে নির্মিত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় জমিদাররা ছিলেন এই এলাকার সব জমির মালিক ছিলেন। দরিদ্র কৃষকদের জমি চাষ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল কিন্তু তাদের ফলন দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধী করে তুলেছিল। ১৯৩৮ সালে নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের জাতিগত কৃষকরা টঙ্ক আন্দোলন নামে একটি সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৪৬ সালে স্বৈরশাসকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন রাশিমণি হাজং।

বিজয়পুরের অন্যতম আকর্ষণ হলো কমলা বাগান। বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পের কাছে এই কমলা বাগান এলাকার একটি বহুল পরিচিত পর্যটন পাহাড় স্পট, যেখানে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের সুন্দর দৃশ্য এবং রয়েছে মৌসুমি কমলাগাছ। রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। সামগ্রিকভাবে নান্দনিক এবং চোখ ধাঁধানো দৃশ্য এখানে দেখা যায় যেখানে। অনেক পর্যটক এই স্পট পরিদর্শন করেন এর আশপাশে দোকান রয়েছে যেখানে এলসির মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বিক্রি হয়। পাহাড়ের উপরে মনপ্রাণে প্রশান্তি এনে দেয় সোমেশ্বরী নদী ও ভারতের মেঘালয়ের অপরূপ দৃশ্য। এই পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য। তা ছাড়া বিজিবি ক্যাম্পের আশপাশে রানিখং চার্চে কিছু সময় কাটানো যায়। টিলার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক গির্জাটি ১৯১০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত নির্মিত হয়েছিল।

দুর্গাপুরে হাজং এবং গারো- দুটি জাতিগোষ্ঠীর জীবনধারা পর্যবেক্ষণ করা যায়। এই জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানা যায় দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে ট্রাইবাল কালচারাল একাডেমি এবং মহারাজা (রাজা) সুসঙ্গের প্রাঙ্গণে।

যাবেন যেভাবে

ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে বাসে দুর্গাপুর, ট্রেনে নেত্রকোনা বা ব্যক্তিগত পরিবহনে আসা যায়। ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বিরিশিরির যাওয়ার বাস। কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাওর এবং মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে নেত্রকোনা সাতপাই এলাকায় রেলওয়ে স্টেশন। এ ছাড়াও শ্যামগঞ্জ নেমে দুর্গাপুরে যাওয়া যায়। পাশাপাশি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে জারিয়া রেলওয়ে স্টেশন নেমে দুর্গাপুর যাওয়া যায়।

থাকবেন যেখানে

বিজয়পুর স্বপ্নপুরী রিসোর্টটি বিজয়পুরের মধ্যে বহেরাতলীতে অবস্থিত, যা দুর্গাপুরের ঠিক পাশেই পাহাড়ি এলাকাজুড়ে রয়েছে যেখানে পর্যটকরা সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ পাহাড়ের উপরে বসবাসকারী পাহাড়ি পরিবেশের মধ্যে এই জায়গায় কিছু সময় কাটানো যেতে পারে। এই রিসোর্টটিতে একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। যেখান থেকে অর্ডার মাফিক খাবার সরবরাহ করা হয়। রয়েছে পিকনিক স্পটও। এ ছাড়াও আদিবাসী কর্তৃক পরিচালিত ডব্লউওয়াইএমসি, কালচারাল একাডেমিসহ বেশ কয়েকটি হোটেল-মোটেল রয়েছে এখানে থাকার জন্য।


banner close