বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

ক্যারিয়ারের শুরুটা হোক পরিকল্পনামাফিক

ক্যারিয়ারের শুরুটা হোক পরিকল্পনামাফিক
ক্যালিয়ার গাইডেন্স।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
  • আতিক মোহাম্মদ শরীফ

উচ্চশিক্ষা নেয়া এখন বেশ সহজলভ্য হওয়ায় ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। ভাবেন চাকরির বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক। কিন্তু হতাশায় না থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে পারেন, যা নিজের সাফল্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ক্যারিয়ারের শুরুর পরিকল্পনা কীভাবে করবেন, চলুন তা দেখে নিই।

নিজের দক্ষতা চিহ্নিত করা

প্রথমে নিজের দক্ষতা এবং নিজেকে মূল্যায়ন করা জানতে হবে। নিজে কোন বিষয়ে দক্ষ তা নিজের জানা থাকতে হবে। দক্ষতা আর লক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি হলে তা অর্জন সম্ভব হবে না।

লক্ষ্য নির্ধারণ

নিজের অবস্থান নির্ধারণ এবং ক্যারিয়ার গঠনের একাধিক পথ উদ্ভাবনের পর একজনের পরবর্তী কাজ হলো জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য প্রণয়ন করা। যে যে বিষয়ে দক্ষ তার সে বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।

ছোট ও বড় পরিকল্পনা করা

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণের পর স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পনাগুলো থাকতে হবে সুস্পষ্ট। দুই ধরনের পরিকল্পনায় ক্যারিয়ারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আর থাকবে কী করতে চাই, কীভাবে চাই, কখন করতে চাই, আগামী ৫ বা ১০ বছর পর নিজের অবস্থান- এসব।

শিক্ষা অর্জন ও মেধার ব্যবহার

ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সময় ছোট ছোট অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে।

সময়ের সঠিক ব্যবহার

সময়ের সঠিক ব্যবহার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময় সঠিক কাজটি করতে পারলে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া সহজ হয়। এ জন্য ছাত্রজীবন থেকেই সময়ের সদ্ব্যবহার বিষয়টি আয়ত্ত করা প্রয়োজন।

অন্যের সাফল্যে হতাশ না হওয়া

জীবনে সফলতা কিংবা ব্যর্থতা থাকবেই। কিন্তু সবকিছু নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি অন্যের সফলতার সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলনা করে হতাশ হওয়া উচিত হবে না। বরং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তাতে সফল হওয়া সহজ হবে।

শেষ কথা

সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারিপার্শ্বিক অবস্থা কিংবা বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে যে ধরনের জ্ঞান থাকা দরকার, তা অনেকের মধ্যে অনুপস্থিত। পারিবারিক চাহিদা এবং গোঁড়ামিও কারও কারও ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তাই আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অবস্থান এবং সামর্থ্যের বিষয়ে নিজেরই সবচেয়ে ভালো জানা থাকে। তাই সফল হতে হলে নিজের ওপর আস্থা রেখেই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

লেখক: মানবসম্পদ উন্নয়ন পেশাজীবী


ছায়ানট: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনির্মাণই ছায়ানটের লক্ষ্য

ছায়ানট: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনির্মাণই ছায়ানটের লক্ষ্য
সারোয়ার আলী
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

সারোয়ার আলী

ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ও চিকিৎসক ডা. সারওয়ার আলীর জন্ম ১৯৪৩ সালে ময়মনসিংহ শহরে। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ততা, রমনার বটমূলে ‘বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান আয়োজনসহ প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কর্মকাণ্ড এবং লক্ষ্যগুলো নিয়ে তিনি দৈনিক বাংলার সঙ্গে আলাপচারিতায় মিলিত হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অনিন্দ্য আরিফ

দৈনিক বাংলা: ১৯৬১ সালে ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী’ পালনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতিবন্ধকতা তৈরির প্রতিবাদে ‘ছায়ানটে’র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটটা যদি সংক্ষিপ্ত আকারে বলতেন।

সারোয়ার আলী: ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে শুধু ধর্মীয় অভিন্নতার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো মিল ছিল না। যে কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন শাসকশ্রেণি প্রথম আঘাত হানে ভাষা আর সংস্কৃতির ওপরে। তাদের অপচেষ্টা ছিল আমাদের বাঙালিত্বের পরিচয় মুছে দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত করার। সেই পটভূমিতে কিছু দুঃসাহসী মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করে। এই বার্ষিকী পালন করার পরে তাদের একাংশ জয়দেবপুরে বনভোজনে মিলিত হয়ে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালনের জন্য তখন দুটি কমিটি কাজ করেছিল। একটি প্রেসক্লাবভিত্তিক, আরেকটি গোপীবাগভিত্তিক। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বাধীন ‘গোপীবাগ কমিটি’ই ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম থেকে আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন সুফিয়া কামাল এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক ফরিদা হাসান। এরপর কিছু দিনের জন্য কামাল লোহানী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি বেশি দিন এখানে থাকেননি। কারণ তিনি মনে করেছিলেন ছায়ানটের মাধ্যমে গণসংগীতের প্রচার করা যাবে না। সেজন্য পরে তিনি ‘ক্রান্তি’ গঠন করেন।

ছায়ানটের লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিসত্তাকে সর্বজনের হৃদয়ে প্রোথিত করা। সে লক্ষ্যে প্রথমে ঋতু উৎসব এবং পুরোনো বাংলা গানের আসর আয়োজন করা হয়। বাংলা গানের ভাণ্ডারের অধিকাংশেরই প্রধান উপজীব্য প্রকৃতি ও মানুষ। সেটাকেই ধারণ করার জন্য উপরোক্ত অনুষ্ঠানগুলো আয়োজন করা হতো। তখন বেশ কয়েকটা প্রতিকূলতা ছিল। সেগুলো- ১. শিল্পীর অভাব। দেশভাগের ফলে অধিকাংশ গুণীশিল্পী ভারতে চলে গিয়েছিলেন। ২. রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের সম্পূর্ণ রচনা প্রকাশে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরুৎসাহিত প্রদান। সেসব সংকটগুলোকে মোকাবিলা করার জন্য এবং শিল্পী তৈরি করার উদ্যোগ নিতে ১৯৬৩ সালে ‘সংগীত বিদ্যায়তন’ ছায়ানটের উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সে সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভ্রুকুটির মধ্যেই ছায়ানটের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। তাই ছায়ানটের ভবন বারবার স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। এই প্রতিকূলতার মাঝেই ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে ‘বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এটা পরে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এটাই ছায়ানটের গোড়ার দিকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

দৈনিক বাংলা: ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় ছায়ানটের সদস্যদের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানতে চাই।

সারোয়ার আলী: ১৯৭১-এ গণহত্যা শুরু হলে ছায়ানটের প্রধান দুই কুশীলব ওয়াহিদুল হক এবং সনজীদা খাতুনসহ আমরা অনেকেই দেশান্তরী হতে বাধ্য হই। তখন সবাই মিলে কলকাতাতে ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তোলেন। এর সঙ্গে ছায়ানটের বাইরের অনেক গুণীশিল্পী যুক্ত হোন। এই সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শরণার্থীশিবির এবং মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করত। সেই কাহিনিকেই উপজীব্য করে প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ‘মুক্তির গান’ নির্মাণ করেছিলেন।

দৈনিক বাংলা: পহেলা বৈশাখের এই বর্ষবরণ উৎসব এখন বাঙালির সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। আজকের বাস্তবতায় আমরা একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে চাই। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বাংলা নববর্ষের আয়োজন শুরুর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই।

সারোয়ার আলী: ষাটের দশকটা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। সে সময় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয়েছিল। আর এই সমান্তরালভাবে চলতে গিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সৃষ্টি হয়। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন, ৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬৩-তে ‘সংগীত বিদ্যায়তন’ প্রতিষ্ঠা, ৬৬-তে ছয়দফা- এ রকম পর্যায়গুলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চরম উদগিরণ ঘটায় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তির আন্দোলন তীব্রমাত্রা পায়। সে সময় ছায়ানটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং এ উত্তাল সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে জনগণের মধ্যে ‍বিস্তৃত করার লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যখন গতি সঞ্চার হয়েছে, তখন ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান মানুষের মধ্যে আরও সাড়া সৃষ্টি করেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল সংগীতের আবহ সৃষ্টি করে মানুষের সৌজন্য সাক্ষাতের উপলক্ষ তৈরি করা এবং জাতীয়তাবাদকে হৃদয়ে গভীরে প্রোথিত করা। সেটা তখন সফলতা লাভ করেছিল। ছায়ানটের মূল কাজই ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। সেটা করতে গিয়ে সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটেছিল। আর রমনার বটমূলে ‘বর্ষবরণ অনুষ্ঠান’ আয়োজন এই মেলবন্ধনের অভিঘাতকে তীব্র করতে সহায়ক হয়েছিল।

দৈনিক বাংলা: ২০০১ সালে রমনার বটমূলে আত্মঘাতী বোমা হামলা ছায়ানটের কর্মকাণ্ডে কি ধরণের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে?

সারোয়ার আলী: পাকিস্তান আমলের আরোপিত সংস্কৃতি চর্চার যে অপচেষ্টা ছিল, তা ১৯৭১-এর পর অনেকটাই কেটে যায়। ৭১ থেকে ৭৫ পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করা যেত। কিন্তু ১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনার পর সামরিক শাসনের আমলে সেই চর্চা আবার প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। তখন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সামরিক শাসকদের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ত। এমনকি রমনার বটমূলের পাশে নববর্ষ উদযাপনের নামে ‘হ্যাপি বেঙ্গলি নিউ ইয়ার’ নামক ইংরেজি অনুষ্ঠান চালানো হয়েছিল। এত প্রতিকূলতায় না দমে গিয়ে ছায়ানটের ‘বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান অব্যাহতভাবে আয়োজন করা হচ্ছিল। তার মধ্যেই ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটল। এই মৌলবাদী হামলায় ১০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন আরও অনেকে। সেদিন আমরা মঞ্চের পেছনে ১০ জনের মতো বসেছিলাম। আর সামনে তিন সারিতে বসে সংগীত পরিবেশন করছিল শিশু-কিশোররা। পরে গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা যায়, ‘আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী’দের মূল লক্ষ্য ছিল মঞ্চে বোমাবর্ষণ করা। তাহলে এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে আরও মর্মান্তিক হতো। তারা আসলে সেদিন ধর্মের নামে অধর্মেরই কাজ করেছিল। তারা সেদিন বাঙালি সংস্কৃতির বিনাশ সাধন করতে চেয়েছিল। তাদের এই প্রচেষ্টা আজও থামেনি।

এই হামলায় ছায়ানটের নেতৃত্বের মাঝে নতুন চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। আমরা তখন মনে করতে শুরু করি শিক্ষা আর সংস্কৃতির যূথবদ্ধতা ছাড়া প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতিকে পরাভূত করা যাবে না এবং শিশু-কিশোরদের বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। তাই তার পরেই ছায়ানট ‘নালন্দা’ নামক শিশু-কিশোরদের উপযোগী ‘সংস্কৃতি সমন্বিত শিক্ষা’ কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এই বিদ্যায়তনে আট শতাধিকের বেশি শিশু-কিশোর অধ্যয়নরত আছে। অন্যান্য বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য সংস্কৃতি এক্সট্রা কারিকুলাম হিসেবে বিবেচিত হলেও নালন্দায় সাংস্কৃতিক শিক্ষা মূল একাডেমিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। এরপর আমরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিশুদের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করার কার্যক্রম ‘শিকড়’ চালু করি। এর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আমরা ‘সুরের জাদু রঙের জাদু’ কার্যক্রম চালু করেছি। আসলে রমনার বটমূলের হামলার পর আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘জ্ঞান রূপে, আনন্দ রূপে’ শিক্ষা প্রদানের ধারণাটিকে বাববার উপলদ্ধি করেছি। আমরা মনে করেছি, শিশুদের যদি বিজ্ঞানমনস্ক এবং সংস্কৃতিমনা না করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে ২০০১-এর রমনার বটমূলে বোমা হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

দৈনিক বাংলা: যতদূর জানা যায়, ছায়ানট তার দীর্ঘ পরিক্রমায় তেমন সরকারি অনুদান বা সহায়তা গ্রহণ করেনি। এই স্বনির্ভরভাবে চলতে চাওয়ার কারণ কি ছিল?

সারোয়ার আলী: আমরা প্রথম থেকেই স্বনির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে চলতে চেয়েছি। কারণ শাসকশ্রেণির অনুদান বা আনুকূল্য নিয়ে চললে, অজান্তেই একটি শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রথমদিকে আমাদের জন্য সরকারি অনুদান বরাদ্দ করেছিলেন। পরে এই অনুদানের ক্ষেত্রে কিছু শর্তারোপ করা হলে তখনকার সভাপতি সুফিয়া কামাল এটি নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকে ছায়ানট আর কখনোই সরকারি অনুদান গ্রহণ করেনি। শুধু ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং শিল্পকলায় ভূমিকা রাখার জন্য ছায়ানটকে ভবন নির্মাণের জন্য কিছু জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ দেন। এ জন্য আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। উল্লেখ্য, তিনি আমাদের ছাত্রী ছিলেন। তবে এই জমির ওপর যে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি কিন্তু আমাদের সংগৃহীত অর্থায়নে। এই সংগ্রহের সিংহভাগ এসেছিল জনগণের মাধ্যমে আর আমাদের শিক্ষকরা তাদের আয়ের কিছু অংশ এ নির্মাণে প্রদান করেছিলেন। ছায়ানটের এই স্বনির্ভর পথচলা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ সমাজের সুস্থতার চাহিদায় কখনো কার্পণ্য করেন না।

দৈনিক বাংলা: ছায়ানট যে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তার সংস্কৃতি জনমানসে বিস্তৃত করতে চায়, সেটা কতটুকু অর্জিত হয়েছে? সেখান থেকে আপনার দৃষ্টিতে আশাবাদ কিংবা শঙ্কার কোন কোন জায়গা রয়েছে?

সারোয়ার আলী: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ধর্মাশ্রয়ীগোষ্ঠী দেশটিকে স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তানের মৌলবাদী কাঠামোতে ফেরানোর অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। এখনো সে অপচেষ্টার তীব্রতা কমেনি। ২০১২ সালের পর দেখা যাচ্ছে, বারবার সাম্প্রদায়িক হামলা হচ্ছে। গত বছরও হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘দুর্গোৎসবে’ হামলা হয়েছে। আর এই হামলা যখন ঘটছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। এটা দুঃখজনক। আমি মনে করি, পাকিস্তান আমলের সাম্প্রদায়িকতা আর এখনকার সাম্প্রদায়িকতার মৌলিক পার্থক্য আছে। সে সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করা হতো, এখন ভারতে যেমনটা করা হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে কিছু ধর্মাশ্রয়ীগোষ্ঠী ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে উগ্রবাদী চিন্তা গ্রামীণ সমাজ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক চিন্তা ধর্মবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ এবং সংস্কৃতিবিনাশী চিন্তা তৈরি করছে। বিপ্রতীপে মুক্তমনা, অসাম্প্রদায়িক মানুষের তেমন প্রতিরোধ নেই। এ জন্য শঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশ তার মূল পথ থেকে ভ্রষ্ট হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত হবে। আর তাই স্বাধীনতার আগে ছায়ানটসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি দরকার।



সমৃদ্ধির সংযোগ সেতু

সমৃদ্ধির সংযোগ সেতু
আইনুন নিশাত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

আইনুন নিশাত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ এখন জটিল ও বড় প্রকল্প নিতে সাহস পাচ্ছে। বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের যে ১৭টি দিকনির্দেশনা এসডিজিতে দেয়া আছে, তার একটি হচ্ছে যেকোনো দেশের উন্নতি করতে গেলে উপযুক্ত অবকাঠামো লাগবে। নদীবহুল বাংলাদেশে প্রধানতম উপাদান হচ্ছে সেতু। সেখানে পদ্মা সেতুর নির্মাণ বাংলাদেশের অগ্রগতিতে একটি বিশেষ স্থান দখল করল।

এ ক্ষেত্রে, প্রথমেই পদ্মা সেতুর আগে আমি বঙ্গবন্ধু সেতুর কিছু অভিজ্ঞতা বলতে চাই। মনে রাখা দরকার, এই সেতু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল। ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তৃতা দেখলে দেখা যাবে, সেখানে বারবার বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং যমুনার ওপর সেতুর দাবি করেছেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সেতুর সমীক্ষা শুরু হলো। আমরা চাচ্ছিলাম রেল এবং রোড একসঙ্গে হোক। কিন্তু যানবাহন চলাচলের দিক বিবেচনায় সেতুটি যুক্তিযুক্ত হচ্ছিল না। সমীক্ষায় হিসাব করা হয়, এই সেতুর মাধ্যমে সরাসরি কত উপকার হবে? কিন্তু একটি সেতুর তো আরও ইনডাইরেক্ট উপকার আছে। সেটার ওপরে বিশ্বব্যাংক যখন গবেষণা চালাল, তখন চমকে উঠে লক্ষ করল রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া বাংলাদেশের বাকি অংশ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। বগুড়ার একজনকে জিজ্ঞাসা করলে বলত বাংলাদেশে যাই, মানে ঢাকায় যাই। উত্তরবঙ্গে তেমন উন্নতি নেই, শিল্পায়ন হয়নি। তখন এসব বিষয় ধরে সুবিধা হিসাব করা হলো। একপর্যায়ে সেতু দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। সত্যি কথা বলতে কি গ্যাস পাইপলাইনের কারণেই প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত হয়েছে। তখন ঠিক হলো রেল, রোড, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইন সব কিছু একসঙ্গে করা হবে। যমুনা সেতুর সরাসরি উপকার দিয়ে সেতুটি যুক্তিযুক্ত হয়নি। কিন্তু সেতুটি হলে সমাজের যে উপকার হবে, সেটা দিয়ে যুক্তিযুক্ত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে কাজে এসেছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে যে আয়ের হিসাব করা হয়েছিল, তা প্রত্যাশার চেয়েও খুব দ্রুত পূরণ হয়েছে। এসবই পদ্মা সেতুর পথ সুগম করেছে।

তার পরও পদ্মা সেতু প্রকৌশল জগতে প্রায় অসম্ভব একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি আরিচায় মিলিত হয়। এই সম্মিলিত পানি মাওয়া দিয়ে যায়। নদীটা সেখানে অদ্ভুতভাবে আচরণ করে। ব্রহ্মপুত্র সিরাজগঞ্জের কাছে ১২-১৪ কিলোমিটার চওড়া। রাজশাহীতে গঙ্গার প্রশস্ততা ছয় কিলোমিটার। তাহলে যে পানি প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ততায় পার হচ্ছে, সেটা মাওয়ায় ছয় কিলোমিটার প্রশস্ত নদী দিয়ে যেতে চেষ্টা করে। এ ছাড়া এই নদীতে প্রচুর পলি আছে। তা সেখানে জমে যায়। যে কারণে যেখানে পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে, সেখানে নদী তিন কিলোমিটারের বেশি চওড়া নয়। এই সেতুর নকশা প্রণয়নে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভিত্তি। মনে রাখতে হবে, পদ্মা বিশ্বের সবচেয়ে খরস্রোতা ও বিপুল প্রবাহ নদীগুলোর একটি। এর চাইতে বেশি পানির প্রবাহ আছে কেবল ব্রাজিলের আমাজন নদীতে। বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্য দিয়ে যত পানি বঙ্গোপসাগরে বয়ে যায়, তার দুই-তৃতীয়াংশ যায় পদ্মা দিয়ে। কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় যে দুই নদী, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র, এর যোগফল হচ্ছে পদ্মা। সিরাজগঞ্জের উজানে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা গড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার চওড়া। ওদিকে গঙ্গার প্রশস্ততা প্রায় ছয় কিলোমিটার। কম করেও যদি ধরি, দুই নদীর মিলিত প্রশস্ততা ২০ কিলোমিটারের বেশি। কিন্তু মাওয়ার কাছে পদ্মা মাত্র ছয় কিলোমিটার চওড়া। তার মানে, ২০ কিলোমিটারের পানি ছয় কিলোমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার মতো খরস্রোতা ও অস্থির একটি নদীতে মাটির গভীরে পাইল বসানোর কাজটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন। মনে রাখতে হবে, পদ্মা একটি পলল নদী। এর তলদেশে রয়েছে হয় বালু না হয় নরম মাটি। শুধু পদ্মা নয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীর তলদেশে পাথর নেই। পাথর থাকলে পাইলিং বা খুঁটি বসানো সহজ হয়। এ ক্ষেত্রে সেটা ছিল প্রায় অসম্ভব। এজন্য আমরা প্রথমে যেখানে পাইল বসানো হবে সেখানে একটি শক্ত ফাউন্ডেশন তৈরি করতে চেয়েছি, যাতে করে সেগুলো সেতুর ভর ধরে রাখতে পারে। এজন্য নদীতে জিওব্যাগ, কংক্রিটের ব্যাগ ও বড় বড় পাথর বসানো হয়েছে আগে। পাথরগুলোর একেকটির ওজন এক টন পর্যন্ত আছে। এসব পাথর, জিওব্যাগ, কংক্রিট ব্যাগ নদীর তলদেশেরও মাটির গভীরে বসিয়ে পাইলিংয়ের ফাউন্ডেশন তৈরি করা হয়েছে।

পাশাপাশি, নদীশাসনের মতো আরেকটি জটিল কাজ ছিল। বর্ষার সময় এখানে নদী নিজে নিজে ২০০ ফুট গভীর খাদের সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই সেতু নির্মাণ করতে হলে নদীর দীর্ঘ ঢালকে রক্ষা করতে হবে। এই কাজে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা আমাদের দেশীয়। ৮০০ কিলোগ্রাম ওজনের জিওব্যাগ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর তলদেশে ঢাল তৈরির জন্য যে পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে, এর প্রতিটির ওজন এক টন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সাধারণ ২৫০-৩০০ কিলোগ্রাম ব্যাগ ব্যবহার করে। এটা একটা সাময়িক ব্যবস্থা। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে এমন নকশা ভাবতে হয়েছে, যাতে সেতুর জীবদ্দশায় এর ক্ষতি না হয়। সেতুতে ভার পরিবহন (লোড ট্রান্সফার) হয় দুই স্প্যানের সংযোগস্থলে। অভিনব জিনিস হচ্ছে সেখানে ১০০ টনের বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের বিয়ারিং পৃথিবীর কোথাও ব্যবহার হয় না, যা ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।

এ ছাড়া এই সেতু নির্মাণের আগে আমরা ইলিশের প্রজননের বিষয়টিও মাথায় রেখেছিলাম। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় যেখানে নদীর গভীরতা বেশি সেখানে ইলিশ চলাচলের মৌসুমে কাজ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। যাতে করে ইলিশ মাছ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে। পাইলিংয়ের সময়ও শব্দ পরিমাপ করা হয়েছে, যাতে করে ইলিশ ভীত হয়ে পদ্মা নদী ছেড়ে না যায়। এ ছাড়া নদীর পশ্চিম পাশে চর জানাজাতের কাছে কচ্ছপের প্রজননস্থল সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আপনি দেখবেন, পদ্মা সেতুর দক্ষিণে একটি সংরক্ষিত চরাঞ্চল রয়েছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবেশ ব্যবস্থা বা মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, আর কোনো সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

পদ্মা নদীতে পদ্মা সেতুই প্রথম সেতু না। এই বিষয়টাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। পদ্মা নদীতে প্রথম সেতু হচ্ছে লালন শাহ সেতু। এই সেতু পাবনার ঈশ্বরদীর সঙ্গে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার সংযোগ স্থাপন করেছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর ব্যবহার বাড়াতেই সেতুটি নির্মাণ করতে হয়। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। এটি এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় সেতু। এর পরই রয়েছে ৪.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বঙ্গবন্ধু সেতু। আর লালন শাহ সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৭৯ কিলোমিটার।

এর আগে বঙ্গবন্ধু সেতু যখন তৈরি হচ্ছিল তখন একটা ধাপের পর আরেকটা ধাপ করা হচ্ছিল। ফলে এতে কিছুটা সময় বেশি লেগে যায়। বিশ্বব্যাংকের চাপ, রাজনৈতিক জটিলতা তো ছিলই। কিন্তু যখন পদ্মা সেতু নির্মাণের আলোচনা শুরু হয় তখন প্রাক-সম্ভাব্যতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রায় একসঙ্গে করা হয়। এতে কিছুটা ঝুঁকি ছিল; কিন্তু এটা ছিল সময় বাঁচানোর কৌশল। পদ্মার বেলায় সেতু হওয়ার আগেই দক্ষিণাঞ্চলে অনেকগুলো বড় বড় সেতু করা হয়েছে। ফলে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে গেছে পদ্মাকে ঘিরে।

মনে রাখা প্রয়োজন, ফেরি হচ্ছে অনিশ্চিত মাধ্যম। আর সেতু হচ্ছে নিশ্চিত ব্যবস্থা। সেতু অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেবে। খুলনা-যশোর অঞ্চলে দ্রুত শিল্পায়ন হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে কুয়াকাটা ও সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন বিস্তার লাভ করবে। সবচেয়ে বড় কথা আগে মানুষ যেভাবে ফেরিঘাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসে থাকত, সেই অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। জীবন সহজ হবে। প্ল্যান দেখেছি বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যাওয়া হবে। এটা দ্রুত করতে হবে। রেল যোগাযোগও দেশের সব বিভাগকে সম্পৃক্ত করবে।

আমি মনে করি, আমাদের চারটি প্রধান সেতুর সংযোগ তৈরি করার মাধ্যমে পুরো দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সেতু, লালন শাহ সেতু ও ভৈরব সেতু আগেই নির্মিত হয়েছে। এর বাইরেও মাঝারি আকারের অনেক সেতু যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে সমৃদ্ধ করেছে। পদ্মা সেতুর ফলে সারা দেশের মধ্যে একটা সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা কমে আসবে। এখন মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ ভালো না। কাজেই পদ্মা সেতু বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, খুলনাসহ ওই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের জন্য অনেক সুবিধা বয়ে আনবে। সময় কম লাগবে। তবে মূল উপকার হবে মালামাল পরিবহনে। চট্টগ্রাম বন্দর মোংলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। মোংলা থেকে মালামাল দেশের যেকোনো স্থানে ট্রেনের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া যাবে। রেললাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করার কারণে দেশের যেকোনো জায়গায় মানুষ কিংবা মালামাল পৌঁছানো সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। এর মাধ্যমে দেশকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

লেখক: পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক



সুজলা সুফলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে

সুজলা সুফলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে
জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

জাহাঙ্গীর আলম

গত বছর বাংলাদেশ বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় অনেক গৌরবময় অর্জনের সাফল্যগাথা রচনা করেছে বাংলাদেশ। একসময় এ দেশের পরিচয় ছিল অতি দরিদ্র একটি দেশ হিসেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। গত বছর তা অনুমোদন করেছে জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্লেনারি সেশনে গৃহীত হয় আমাদের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই প্রস্তাব। আগামী ২০২৬ সালে স্থায়ীভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। এর আগে ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানদণ্ডে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। আগামী ২০ বছর পর দেশে আর কোনো দরিদ্র থাকবে না। এখন থেকে ৫০ বছর আগে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল গড়ে মাত্র প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার। এখন তা উন্নীত হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৯১ ডলারে। দেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০৩১ সালে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং আগামী ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে স্থান করে নেবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার কোনো উল্লেখযোগ্য মজুত ছিল না। এখন তা ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বছরের পর বছর আমাদের রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়ছে। সেইসঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে রেমিট্যান্স আয়। একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ছিল ছনের ছাউনি দেয়া ঘর। এখন তা আর চোখে পড়ে না। শিক্ষার প্রসার, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাশের দেশ ভারতকেও টপকে গেছে বাংলাদেশ। নারীর ক্ষমতায়ন বিবেচনায় বিশ্বের অনেক  উন্নত দেশের ওপরে আমাদের অবস্থান। গত ১৩ বছর ধরে এ দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ থেকে ৮ শতাংশ হারে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৪১৬  বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ২০৩৩ সালে তা ৮৫৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৪তম। এরই মধ্যে ক্ষুধা সূচকে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। কমেছে পুষ্টিহীনতা। লাগাতার বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন। শিল্পোদ্যোগ এবং অবকাঠামো বিনির্মাণেও বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। এ বছরই নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে পদ্মা সেতু। এ ছাড়া মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ১০-১২টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে চলছে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর দেশের বিভিন্ন খাতে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান খাতটি হলো কৃষি খাত। অতীতে বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। এ অঞ্চলে প্রতিবছর গড়ে খাদ্য আমদানি করা হতো ১৫ থেকে ২০ লাখ টন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় কৃষির উৎপাদন। ফলে ১৯৭১-৭২ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ টনে। এটি ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ। বর্তমানে সে ঘাটতির হার নেমে এসেছে ১৫ শতাংশেরও নিচে। স্বাধীনতার পর দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ টনে। গত ৫০ বছরে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রতিবছর গড়ে ৩ শতাংশ হারে। যে কৃষক আগে খাদ্য ঘাটতিতে ছিল, সে এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত। যে শ্রমিকের দাবি ছিল দৈনিক ৩ কেজি চালের সমান মজুরি, সে এখন কাজ করে ১০ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরিতে। কী কৃষক, কী শ্রমিক-কারোরই আর তেমন খাদ্যের অভাব হয় না। না খেয়ে দিন কাটে না কোনো মানুষেরই। কৃষি খাতে এখন উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার ওপরে। তা ছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, গম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর থেকে এ নাগাদ চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। আলু, মৎস্য, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। চিরকালের দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা আর ক্ষুধার দেশে এখন ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে। প্রতিবছর এ দেশে মানুষ বাড়ছে ২০ লাখ। কৃষি জমি কমছে ৮ লাখ হেক্টর। তারপরও জনপ্রতি সরবরাহ কমছে না কৃষিপণ্যের। বরং তা বাড়ছে নিরন্তর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জনপ্রতি আমাদের খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক ৪৫৬ গ্রাম, ২০০০ সালে তা ৫২২ গ্রাম এবং ২০২০ সালে তা ৬৮৭ গ্রামে বৃদ্ধি পায়। এর কারণ দ্রুত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি। সম্প্রতি নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে আমাদের কৃষি খাতে। আগের খোরপোশ পর্যায়ের কৃষি এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষিতে। এক নীরব বিপ্লব সূচিত হয়েছে কৃষির প্রতিটি উপখাতে। দানাদার খাদ্যশস্যের পর আলুর উৎপাদনে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করার মতো। দেশের মানুষের দৈনিক জনপ্রতি আলুর চাহিদা হচ্ছে ৭০ গ্রাম, প্রাপ্যতা অনেক বেশি। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে আমাদের আলুর মোট উৎপাদন ছিল প্রায় অর্ধকোটি টন। এখন তা ১ কোটি ৯ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে এখন আলু রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। তাতে প্রতিবছর গড়ে আমাদের আয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। তা ছাড়া আলুর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে এর ব্যবহারও বহুমুখী হচ্ছে। আগে আলুর ব্যবহার হতো মূলত সবজি হিসেবে। এখন তা চিপস ও পটেটো ক্রেকার্স হিসেবেও অনেক সমাদৃত। বিদেশিদের মতো অনেক বাংলাদেশিও এখন মূল খাদ্য হিসেবে রোস্টেড পটেটো খেতে পছন্দ করেন। আলু উৎপাদনে গত ২০ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ।

খাদ্যশস্যের আরেকটি বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে সবজি উৎপাদনে। ২০০৮-০৯ সাল থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত সবজি উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন ও ভারতের পর বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো থাকায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবজি রপ্তানি সম্প্রসারিত হওয়ায় দেশের কৃষকরা এখন সবজি চাষে বেশ উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন আধুনিক সবজি চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে স্বীয় উদ্যোগে এরা গড়ে তুলছেন সবজির খামার।

বাংলাদেশে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ফলের উৎপাদনে। বর্তমানে এ দেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। গত দুই দশক ধরে এ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে ১১ শতাংশের ওপরে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৫ গ্রামে। তাতে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে আমাদের পুষ্টিহীনতা। বর্তমানে আমাদের দেশে আমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চিরায়তভাবে গড়ে ওঠা রাজশাহী, চাপাই নবাবগঞ্জ, দিনাজপুরের বাগানগুলো ছাপিয়ে এখন প্রচুর আম উৎপাদিত হচ্ছে সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায়। তা ছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক ধানি জমি পরিণত হয়েছে আমবাগানে। অধিকন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে নতুন ফল স্ট্রবেরি। আরো চাষ করা হচ্ছে রাম্বুতান, ড্রাগন ফল ও অ্যাভোকাডো। মানুষ আপেলের পরিবর্তে বেশি করে খাচ্ছে কাজি পেয়ারা। তাতে বিদেশি ফলের আমদানি হ্রাস পাচ্ছে। সাশ্রয় হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা।

এ দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। দীর্ঘ মেয়াদের আবাদি এলাকা কমেছে। তবে একরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। ২০১০ সালে পাটের জিন রহস্য উন্মোচনের ফলে এর উৎপাদন বৃদ্ধির পথ আরো সুগম হয়েছে। বিশ্ববাজারে এখন পাটের চাহিদা বাড়ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ। বর্তমান করোনাকালেও পাটের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজার বেশ চড়া। এখন দেশে কৃষকের খামারপ্রান্তে কাঁচা পাটের মূল্য ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রতি মণ। এটা বেশ লাভজনক মূল্য। বর্তমানে দেশে পাটের উৎপাদন প্রতি বছর ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল। আগামীতে এর উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে আবার ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের পাট খাত।

কেবল শস্য খাতই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষির সব উপখাতেই বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে এ দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন। ২০২০-২১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ টনে। মৎস্য খাতে বর্তমানে গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৬ শতাংশ। হিমায়িত খাদ্য ও চিংড়ি রপ্তানি থেকে প্রতিবছর আমাদের আয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ইলিশের উৎপাদনে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল চোখে পড়ার মতো। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশের উৎপাদন বহুল পরিমাণে বেড়েছে। তা ছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উপাদান ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদনে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ এখন ডিম ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ম্ভর। দুগ্ধ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি আছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে তাতে এর ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে অচিরেই। বন খাতে বৃক্ষের মোট আচ্ছাদিত এলাকা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১২ বছর আগে দেশের ৭/৮ শতাংশ এলাকা বনরাজির আওতায় ছিল বলে ধরে নেয়া হতো। এখন তা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭ শতাংশে। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী এবং গ্রামীণ কৃষি বনায়ন দেশের পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

কৃষি কাজে যন্ত্রের ব্যবহার এখন অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। ভূমি কর্ষণ, ফসল কর্তন ও মাড়াই, ধান ভানা ইত্যাদি ক্ষেত্রেই এখন কায়িক শ্রমের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে। বাড়ছে যন্ত্রের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর ভূমি কর্ষণের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো কাঠের লাঙল দিয়ে। ব্যবহার করা হতো পশুশক্তি। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। বাকি ৯৫ শতাংশই আবাদ হচ্ছে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখন বেশ প্রচলিত। তবে তার পরিধি এখনো বেশ সীমিত। বর্তমানে কৃষিযন্ত্র সংগ্রহে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য সরকার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে যন্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। হাওর, চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় ভর্তুকির পরিমাণ বেশি। তবে এর সুবিধাভোগীর সংখ্যা খুবই কম। এটি বাছাইকৃতভাবে এখনো কার্যকর হচ্ছে গ্রামীণ এলাকায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চলছে শ্রমিক সংকট। তাতে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময়ক্ষেপণ, অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কৃষির উৎপাদনে লাভজনকতা হ্রাস পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত করা দরকার। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্প্রতি ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয়েছে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’। ভবিষ্যতে আরো বড় আকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে। যে কোনো কৃষক তার প্রয়োজন অনুসারে ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে সক্ষম হবেন।

একসময় নতুন কৃষি প্রযুক্তি প্রসারের একমাত্র বাহন ছিল কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী। এখন তাতে যোগ হয়েছে ই-কৃষি। কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বাড়ি থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন গ্রামের কৃষক। তাদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে স্থাপিত হয়েছে কল সেন্টার। যেখান থেকে টেলিফোনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিপণনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ই-কমার্স। এর মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। শাকসবজি এবং ফলমূলও এসেছে ই-কমার্সের আওতায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এগিয়ে চলার পাশাপাশি কৃষিকাজের ও পণ্য বিক্রির প্রক্রিয়াও চলে এসেছে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায়। তবে এ ক্ষেত্রে দেশের মোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেকের স্মার্টফোন নেই। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেই। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে ১ হাজার গ্রামকে স্মার্ট-ফার্মিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ছোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই প্রয়োজন। এর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। আর্থিক সহায়তা দিয়ে স্মার্টফোন সংগ্রহে তাদের উৎসাহিত করা দরকার। বাংলাদেশের ছোট কৃষকরা অধিক উৎপাদনশীল। তারা কৃষিকাজে নিজেরাই শ্রম দেন। উৎপাদন পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি করেন তারাই। ফলে তাদের খামারে প্রতি ইউনিট উৎপাদন বেশি। খরচ কম। উৎপাদন দক্ষতাও বেশি। কিন্তু সমস্যা পুঁজিস্বল্পতা। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ও বিস্তারে ছোট কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণে তাদের অভিগম্যতা। এটা নিশ্চিত করার জন্য ছোট কৃষকদের অনুকূলে নগদ সহায়তা প্রদান ও বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিবাচক নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপাচার্য,  ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ



উন্নয়নের নেপথ্যে প্রবাসীরা, ভরসা সংকটেও

উন্নয়নের নেপথ্যে প্রবাসীরা, ভরসা সংকটেও
শরিফুল হাসান
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

শরিফুল হাসান

অর্থনৈতিক মন্দা হোক কিংবা করোনা মহামারি! যুদ্ধ হোক কিংবা দুর্যোগ! বাংলাদেশের যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে বড় ভরসা এখন প্রবাসী আয়। আর এই প্রবাসী আয়ের নেপথ্যে আছেন এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি, যারা বিদেশে কাজ করেও নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে তারা গড়ে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন। আর করোনা মহামারির সময় তারা ২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে।  

বিশ্বব্যাংকের ‘অভিবাসন ও উন্নয়ন’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সপ্তম। অথচ ৯ মাসের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন বিজয় লাভ করে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটি ছিল পৃথিবীর দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ। একদিকে প্রায় শূন্য রিজার্ভ, আরেকদিকে ডলারের তীব্র সংকট, ভাঙা সব রাস্তাঘাট। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আজ অন্য এক উচ্চতায় সম্ভাবনার এক বাংলাদেশ। এই তো গত বছরই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘের অনুমোদন পেয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) বলছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। এ যেন অন্যরকম এক বদলে যাওয়া।

কিন্তু মাত্র পাঁচ দশকে কী করে বদলে গেল বাংলাদেশ? বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আমার নিজের একটা তত্ত্ব আছে। আমি বলি বাংলাদেশের অর্থনীতি হলো ইএফজির অর্থনীতি। ই মানে এক্সপার্টিয়েট ওয়ার্কার বা প্রবাসী শ্রমিক। এফ মানে ফার্মারস বা কৃষক। আর জি মানে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স বা পোশাকশ্রমিক। মূলত এ তিন শ্রেণির মানুষই বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত টিকিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে প্রবাসীদের অবদান অনন্য। বিশেষ করে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায়।

এক যুগ আগের বিশ্ব মন্দার কথা মনে আছে? ২০০৮-০৯ সালের বিশ্বব্যাপী ওই অর্থনৈতিক মন্দায় বাংলাদেশকে কোনো সংকটে পড়তে হয়নি, কারণ ওই প্রবাসী আয়। শুরুতেই বলেছি, করোনা মহামারির মধ্যেও রেকর্ড পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারা বিশ্বে যখন সংকট সেই সময়ও বাংলাদেশ প্রবাসী আয়ে ভরসা করছে।  সংকটময় এই সময়ে মানে চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) প্রথম মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই মাসে প্রবাসী আয় ছিল ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার (২.০৯ বিলিয়ন) ডলার। বিনিময়মূল্য এক ডলার সমান ৯৪ দশমিক ৭০ টাকা ধরলে বাংলাদেশি অর্থে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৭৯২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই অঙ্ক গত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাইয়ের এই ইতিবাচক ধারা আগস্ট মাসেও বজায় ছিল।

বৈশ্বিক সংকটময় এই সময়ে প্রবাসী এই আয় বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। অবশ্য প্রবাসীরা পরিবারের কাছে ডলার পাঠালে দেশের     আশীর্বাদ কেন এই তথ্য সাধারণ মানুষের অনেকেই বুঝতে পারেন না। তাদের জন্য সহজ করে বলছি। আসলে ডলার ছাড়া একটা দেশ চলতে পারে না। কারণ, এই পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন নিষ্পত্তিতে ডলার ব্যবহৃত হয়। এই যে আমাদের জ্বালানি তেলসহ বিদেশ থেকে নানা কিছু আনতে হয় সেটা ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। বৈশ্বিক ঋণের ৪০ শতাংশ  ইস্যু হয় ডলারে। আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কারেন্সি বা ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ হিসেবে ডলার ব্যবহৃত হয়। কাজেই আমাদের ডলার দরকার। আর সেটি শুধু প্রবাসীরাই পাঠান। আরও সহজ করে বললে আমরা চাইলে ধান, চাল, মাংস বা সব কিছুর উৎপাদন বাড়াতে পারি, কিন্তু একটা ডলার তৈরির ক্ষমতাও আমাদের নেই। আর সে কারণেই আমরা চাই প্রবাসীরা ডলার পাঠাক। রিজার্ভ বাড়ুক।

মূলত সাধারণ শ্রমিকরাই প্রবাসী আয় পাঠান। আর শিক্ষিত যে শ্রেণিটি একেবারে বিদেশে চলে যায় তারা কিন্তু দেশ থেকে সব নিয়ে যায়। আরেক শিক্ষিত শ্রেণি অবসরে বিদেশে চলে যাবার জন্য বিদেশে টাকা পাচার করে, কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা নিজ দেশে টাকা পাঠান মা মাটি আর স্বজনদের জন্য। এই যে করোনার মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা সেটি ভীষণ স্বস্তির খবর ছিল। আচ্ছা, ২৪ বিলিয়ন ডলার মানে কত টাকা? সহজ করে বললে, সারা বিশ্ব মিলে বাংলাদেশকে এখন যে পরিমাণ ঋণ বা অনুদান দিচ্ছে বা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) যে অর্থ আসছে তার চেয়ে ছয় থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এই যে বাংলাদেশ এখন আর বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল কোনো দেশ নয়, তার কারণ এই প্রবাসী আয়।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের একটি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নারী। বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৭৫ শতাংশই আছেন মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটিতে ২০ লাখ প্রবাসী আছেন যেখান থেকে প্রতিবছর গড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় আসে। অবশ্য ২০২০-২১ অর্থবছরে সেটি সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আছেন আরব আমিরাতে, সংখ্যাটা অন্তত ১৫ লাখ। এ ছাড়া কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনে গড়ে তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশি আছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মালয়েশিয়াতে আছেন ছয় থেকে সাত লাখ বাংলাদেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, জর্ডান,  লেবানন, ইতালি, মরিশাস কিংবা দক্ষিণ কোরিয়াতেও আছেন কয়েক লাখ বাংলাদেশি। মূলত এই দেশগুলো থেকেই বাংলাদেশের প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি আসে। চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা। গত দেড় দশকে এ জেলা থেকে ১০ লাখেরও বেশি লোক বিদেশে গেছেন। শীর্ষ ১৫ তে থাকা বাকি জেলাগুলো হলো যথাক্রমে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, ঢাকা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, সিলেট ও গাজীপুর। এই জেলাগুলোতে গেলে বাংলাদেশের অন্য এলাকার সঙ্গে পার্থক্যটা ধরতে পারবেন। ছিমছাম সবুজ গ্রামের ভেতরকার রাস্তাঘাট-বাড়িঘর দেখে মনে হয় উন্নত এক বাংলাদেশ। কারণ এই জেলাগুলোর প্রায় সব বাড়ি থেকেই কেউ না কেউ বিদেশে গিয়ে কাজ করছেন। প্রবাসী আয়ে এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। শুধু যে প্রবাসীদের পরিবারগুলোই এ টাকা ব্যবহার করে তা নয়, এখানকার পুরো অর্থনীতিই সচল রাখে প্রবাসী আয়। কৃষি হোক, মৎস্য কিংবা ছোট-বড় বেশির ভাগ উদ্যোগের পেছনেই আছে প্রবাসীদের বিনিয়োগ।

শুধু প্রবাসী আয়ের কারণে নয়, কর্মসংস্থানের জন্যও অভিবাসন খাত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ আসে। এদের বেশির ভাগই যেখানে কাজে যুক্ত হতে পারেন না সেখানে ছয় থেকে সাত লাখ লোকের বিদেশে কর্মসংস্থান ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আর সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে তো ১০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। বিএমইটির তথ্য অনুসারে, মূলত নির্মাণশ্রমিক, প্ল্যান্টেশন, কৃষি, সার্ভিস বা উৎপাদন খাতে কাজ করেন বাংলাদেশিরা। যারা যাচ্ছেন তাদের একটা বড় অংশই অদক্ষ বা আধাদক্ষ। তবে একটা বিষয় ভীষণ ইতিবাচক। অদক্ষ কর্মীরা গেলেও খুব দ্রুত কাজ ও ভাষা শিখে যায়। এখন যদি তাদের দেশ থেকেই দক্ষ করে পাঠানো যায় সেটি ইতিবাচক। এজন্য নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান জরুরি। বিশেষ করে করোনার পর যেসব পেশার চাহিদা বেড়েছে কিংবা চতুর্থ শিল্প বিল্পবের কারণে যেসব খাতে কর্মী লাগবে সেসব পেশায় দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারলে আরও বেশি প্রবাসী আয় আসবে। তবে একটা বিষয় ভীষণ রূঢ়। দেশের জন্য এত অবদানের পরও প্রবাসীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু যথেষ্ট ইতিবাচক নয় বরং তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। মূলত, পাসপোর্ট তৈরি থেকেই সংকটের শুরু। এরপর এজেন্সির দালাল ও প্রতারক এজেন্সি, চাকরির বিষয়ে অসত্য তথ্য, উচ্চমূল্যে ভিসা কেনাবেচা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সরকারি ছাড়পত্র —সবক্ষেত্রে সীমাহীন যন্ত্রণা। দেশের আকাশ পার হলে শুরু হয় বিরূপ প্রকৃতি, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন, মালিকদের প্রতারণা, নির্যাতনসহ আরও কত-কী। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে গেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা মেলে না, দেশে ফিরলেও ভোগান্তি। ভারত কিংবা ফিলিপাইন যেভাবে প্রবাসীদের মর্যাদা দেয় সেটা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

কোনো সন্দেহ নেই, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবেই। তবে রাষ্ট্র-দূতাবাস-স্বজন সবাইকে মনে রাখতে হবে প্রবাসীরা শুধু টাকা পাঠোনোর যন্ত্র নয়। তারাও মানুষ। কাজেই সব সময় তাদের মানবিক মর্যাদা দিতে হবে। আসলে এক কোটিরও বেশি প্রবাসী শুধু দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন তা নয়, অনেক দূর থেকেও বুকের মধ্যে পরিবার ও লাল-সবুজের বাংলাদেশের জন্য অনেক ভালোবাসা যত্ন করে রাখেন। আর পৃথিবীর প্রতিটা দেশে তারাই তো বাংলাদেশের প্রতিনিধি! কাজেই প্রবাসীদের যথাযথ সম্মান তো দিতেই হবে। আর শুধু উন্নয়ন নয় সংকটেও সবচেয়ে বড় ভরসা কিন্তু এই প্রবাসীরাই।

লেখক: প্রোগ্রাম হেড, মাইগ্রেশন প্রেগ্রাম ও ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভস, ব্র্যাক এবং কলামিস্ট।



এমএফএস : বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধির সহযাত্রী

এমএফএস : বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধির সহযাত্রী
কামাল কাদীর।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

কামাল কাদীর

পঞ্চাশের বাংলাদেশ সমৃদ্ধির বাংলাদেশ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো নতুন অর্জন যোগ হচ্ছে সফলতার ঝুলিতে। এই মুহূর্তে ক্রয়সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই। শুধুমাত্র যে আমরা পরিসংখ্যানেই দৃষ্টি কাড়ছি তা নয়, বরং একটি সামগ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। যেমনটা গত ১১ বছরে দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। বিকাশের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের দৈনন্দিন লেনদেনে এনে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য, সক্ষমতা ও স্বাধীনতা। পাশাপাশি ২০৪১ এর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের ডিজিটাল অভিযাত্রার সহযোগী হয়ে ক্যাশলেস পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করার পথে হাঁটছি আমরা।

বাংলাদেশের এমএফএস খাত আজ বিশ্বে উদাহরণ হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাস্তবসম্মত নীতি-সহায়তার কল্যাণে। নবীন এই আর্থিক সেবা খাতের বিকাশে নেটওয়ার্ক সংযোগের জন্য মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে অংশীদারত্ব, ক্যাশ ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংকের সহায়তা, এমএফএস এজেন্টদের নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য পরিবেশকদের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই খাত-সংশ্লিষ্ট সবার নিরলস পরিশ্রম সফল হয় যখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের জীবনমান পরিবর্তনের জন্য এমএফএসের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে।

মাত্র এক দশকের ব্যবধানে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে গ্রাহকদের অভ্যস্ততায় ইতিবাচক ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। একদম সাধারণ কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় যেসব সেবা দিয়ে এমএফএসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেমন ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট, সেন্ড মানি- সেই সেবাগুলোর ধারাবাহিকতায় আরও অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ, প্রয়োজনীয় ও গ্রাহকবান্ধব প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবা চালু হয়েছে।

এমএফএস খাত এখন যে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে তা বাংলাদেশকে একসময় ‘লেস ক্যাশ’ বা ‘ক্যাশলেস’ সমাজ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। বছরের পর বছর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে এখন এ খাতে দেশব্যাপী শক্তিশালী মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। গ্রাহকদের মধ্যে ক্যাশ আউট করার প্রয়োজন এবং প্রবণতাও কমে আসছে; তারা বিভিন্ন মার্চেন্ট পয়েন্টে পণ্য এবং সেবা কিনে ডিজিটাল পদ্ধতিতেই পেমেন্ট করছেন ক্যাশ আউট খরচ এড়িয়ে। ২০২১ সালে এমএফএস প্ল্যাটফর্মে যত ধরনের লেনদেন করা হয়েছে তার একটি বড় অংশ ছিল মার্চেন্ট পেমেন্ট।

বাংলাদেশের এমএফএস খাতের একটি অনন্য অর্জন হলো ‘হিউম্যান এটিএম’ খ্যাত এজেন্টদের নিয়ে দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যা সত্যিকার অর্থেই এই সেবাকে সব শ্রেণির মানুষের কাছে সহজলভ্য করেছে। পাশাপাশি, প্রান্তিক, ছোট, বড়, ক্ষুদ্র, মাঝারি- সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ তৈরি করতে শক্তিশালী মার্চেন্ট নেটওয়ার্কও গড়ে তোলা হচ্ছে, যা সার্বিকভাবে ব্যবসায় গতিশীলতা আনছে, তৈরি করছে আরও অনেক সম্ভাবনার পথ। তবে দেশের মানুষকে ক্যাশবিহীন জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে আরও সচেতন ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করাটা এই মুহূর্তে একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে থাকা বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এমএফএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র অংকের ঋণসেবা চালু করাটা ছিল সাম্প্রতিক সময়ে একটি অনন্য উদাহরণ। এক বছরব্যাপী সফল পাইলট প্রকল্পের পর সিটি ব্যাংক ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিকাশ ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল ন্যানো লোন প্রদান করা শুরু করে। গ্রাহকবান্ধব এই সেবা ব্যবহার করে ঋণ গ্রহণের উপযুক্ত গ্রাহক ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারছেন, যা ব্যাংক সেবার বাইরে থাকা লাখ লাখ স্বল্প আয়ের মানুষ ও একইসঙ্গে দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দারুণভাবে উপকৃত করছে। আসলে এরাই এ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং আর্থিক সংকটের মুহূর্তে তাদের জন্য বিপদের বন্ধু হয়ে উঠছে এই ন্যানো লোন।

এমএফএস খাতে উদ্ভাবনের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে বিকাশ গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল সেভিংস স্কিম বা সঞ্চয় সেবা। অত্যন্ত সহজলভ্য এই সেবার কল্যাণে ব্যবহারকারীর বিকাশ অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স থাকলে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঞ্চয়ের কিস্তি জমা হয়ে যায়। এটি কার্যকর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে আরেকটি বড় পদক্ষেপ যা অসংখ্য মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করছে। নিঃসন্দেহে সঞ্চয় হলো সমৃদ্ধির অন্যতম একটি উপায়৷

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এখন আর কারও অজানা নয়। বৈশ্বিক পুঁজি বাজারের মনোযোগও এখন বাংলাদেশের দিকে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্তর্গত ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, আলীবাবা গ্রুপের অ্যান্ট গ্রুপ-এরপর বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি বিনিয়োগ ফান্ড, জাপানের সফটব্যাংক সম্প্রতি বিকাশে যে বিনিয়োগ করেছে, তাতে প্রমাণ হয় দেশীয় ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম।

উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমএফএস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সুনিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ সেবা প্রদান অব্যাহত রাখে তাহলে একদিকে যেমন গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হবে, আবার দেশে বিশ্বমানের বিদেশি বিনিয়োগ আনাও সহজ হবে।

ডিজিটাল মানির ওপর আস্থা বাড়িয়ে দিয়ে এমএফএস খাত এরই মধ্যে সাধারণের অর্থ ব্যবহারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে এই অগ্রযাত্রার কেবলমাত্র শুরু। আরও নতুন সেবা ও উদ্ভাবন নিয়ে এই খাতের সম্ভাবনা অপার।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিকাশ