শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২২

স্থাপত্যে জারীনের বৈশ্বিক পুরস্কার জয়

স্থাপত্যে জারীনের বৈশ্বিক পুরস্কার জয়
জারীন তাসনীম শরীফ।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
  • মাতুয়াইলে পরিবর্তনের প্রকল্প পেল বৈশ্বিক পুরস্কার

বাংলাদেশ থেকে এই প্রথম গ্লোবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডসে ‘গ্লোবাল উইনার ২০২২’ পুরস্কার পেয়েছেন জারীন তাসনীম শরীফ। রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও হলি ক্রস কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষে গত বছর তিনি স্নাতক করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে। মাতুয়াইলের ভাগাড় নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের থিসিসের জন্যই ‘আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন’ বিভাগে সম্মানজনক এই স্বীকৃত পেলেন জারীন। তার প্রকল্প এবং পরিকল্পনা নিয়ে গতকাল কথা বলেন দৈনিক বাংলার সঙ্গে।

আপনার গবেষণার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলুন। থিসিস অনুযায়ী মাতুয়াইলে আপনি কী করতে চান?

জারীন তাসনীম শরীফ: বর্জ্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সব সময়ই নেতিবাচক। মাতুয়াইলে কাজ করতে গিয়ে জানলাম, ল্যান্ডফিল হওয়ার আগে আশপাশের সবাই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। প্রায় তিন দশক ধরে ঢাকার বর্জ্য মাতুয়াইলে ফেলা হচ্ছে। মাতুয়াইল ও সেখানকার মানুষের গল্পও ভুলে গেছে এই শহর। কিন্তু মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্য এর ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি। এটি কৃষিজমি, জল এবং বায়ু দূষিত করছে। বিত্তশালীরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। বছরের পর বছর ধরে মাতুয়াইল বর্জ্য-ভিত্তিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায় কাজ করছে।

আমরা যদি এই মানুষগুলোর রিসাইকেল করার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যকে রিসাইকেল করার একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে পারি তাহলে পরিবেশও রক্ষা পাবে। মানুষগুলোও দক্ষ হয়ে উঠবে। আমার থিসিসে এই সিস্টেমটাই ডিজাইন করেছি। চেষ্টা করেছি বর্জ্য নিয়ে আমাদের ধ্যান-ধারণা পাল্টাতে। বর্জ্যকে যেন শুধু ফেলনা কিছু হিসেবে না দেখি। বরং বর্জ্য থেকেই কীভাবে একটা স্বয়ংসম্পন্ন কমিউনিটি তৈরি করা যায় তা দেখিয়েছি।

এই পুরস্কারপ্রাপ্তি আপনার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

জারীন তাসনীম শরীফ: গ্লোবাল গ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডস বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ডগুলোর একটি। এই পুরস্কার জয় আমার জন্য অত্যন্ত বিশেষ, কারণ আমি মাতুয়াইলের মানুষদের কথা এত বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরতে পারব। হয়তো এক দিন আমার প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। তখন ওই মানুষদের জীবনে পরিবর্তন আসবে।

আপনার নিজের সম্পর্কে বলুন। আপনি কি এখনো একাডেমিক পড়াশোনা করছেন?

জারীন তাসনীম শরীফ: গত বছর আমি স্নাতক শেষ করেছি। বর্তমানে এমজিএইচ গ্রুপে স্থপতি হিসেবে কাজ করছি। ভবিষ্যতে আমি আরও গবেষণামূলক কাজ করে যেতে চাই।

গ্লোবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডস সম্পর্কে

বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক একাডেমিক পুরস্কারগুলোর একটি গ্লোবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডস। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাজের স্বীকৃতি এবং তা বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় এই প্ল্যাটফরম। প্রতি বছর বিশ্বের ৭টি অঞ্চল থেকে মোট ২৫টি বিভাগে গবেষণাপত্র আহ্বান করা হয়। এই সাতটি অঞ্চল হলো এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য, আয়ারল্যান্ড, লাতিন আমেরিকা, ওশেনিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।

আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট মাইকেল ডি হিগিনসের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিটি শ্রেণিতে তিনটি ধাপে প্রকল্পগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়- হাইলি কমেন্ডেড এনট্র্যান্টস, রিজিওনাল উইনার এবং গ্লোবাল উইনার। এ বছর বিশ্বের ৭৩টি দেশের ৪১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২৮১২টি প্রকল্প জমা পড়ে। ২৫টি শ্রেণিতে ২৫টি প্রকল্পকে গ্লোবাল উইনার ঘোষণা করা হয়।


মুক্তি স্বপ্নের ভাঙা-গড়া

মুক্তি স্বপ্নের ভাঙা-গড়া
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ব্রিটিশ উপনিবেশের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষকে যে সংগ্রাম করতে হয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে যে স্বাধীনতা এল সেটা যে প্রকৃত স্বাধীনতা নয়, তা বুঝতে মানুষের বিলম্ব ঘটেনি। প্রথম কারণ, স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, যার পেছনে ব্রিটিশদের উসকানি এবং সামনে ছিল প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্তের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব। স্বাধীন বঙ্গকে ভাগ করে ফেলল, দাঙ্গায় মানুষ প্রাণ দিল, উৎপাটিত হলো কিন্তু স্বাধীনতা যে মুক্তি আনতে পারবে বলে আশা করা হয়েছিল সেটা আর দেখা গেল না। পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য স্বাধীনতা যে অর্থবহ হয়নি তার প্রমাণ তো বঙ্গভঙ্গ এবং সেই সঙ্গে যে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ও শোষণভিত্তিক সমাজব্যবস্থা আগে ছিল তাতে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়াল ক্ষমতা হস্তান্তর এবং তাতে লাভবান হলো পশ্চিম পাকিস্তানিরা, বিশেষভাবে তাদের বেসামরিক এবং সামরিক আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়িক মহল। দুর্বৃত্তকে তারা একটি ঔপনিবেশিকে পরিণত করতে চেয়েছিল। যেটা পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল, যখন উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা এল।

বাঙালি মুসলমান দেখতে পেল তার বাঙালিসত্তা বিলীন হয়ে যাবে এবং উপলব্ধি করল যে দ্বিজাতিতত্ত্ব ভ্রান্ত। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অহিংস অভ্যুত্থান, এর মধ্য দিয়ে একদিক দিয়ে যেমন দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হলো, অপরদিকে তেমনি পাকিস্তান শাসকরা যে নতুন ঔপনিবেশিক শোষণব্যবস্থা পূর্ববঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল তার বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের প্রতিরোধের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে উঠল। ১৯৫৪ সালে যে প্রাদেশিক নির্বাচন হয় তাতে পূর্ববঙ্গবাসী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকারী মুসলিম লীগকে সর্বাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এটা ছিল পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায়। এই রায়কে মুছে ফেলার জন্য তখন কেন্দ্রীয় সরকার তাদের শাসন জারি করে এবং আরও পরে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন কায়েম হয়। এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গবাসী প্রতিবাদ করেছে, আন্দোলনে নেমেছে এবং আন্দোলনের একপর্যায়ে ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনেরই ফল, কিন্তু এর মাত্রা ছিল ভিন্ন প্রকারের। এটা ছিল সমগ্র জনগণের একটি অবস্থান। এর অভ্যন্তরে যে বোধটা ছিল সেটি কেবল স্বায়ত্তশাসন নয়। এটি সামাজিক বিপ্লবেরও। এই অভ্যুত্থানের চেতনাকে মোকাবিলা করতে গিয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের পতন ঘটে এবং সেখানে ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন চলে আসে।

ইয়াহিয়া খান জনবিক্ষোভকে স্তিমিত করার জন্য দ্রুত নির্বাচন দেয়; কিন্তু সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের মানুষ যে রায়টি ঘোষণা করে সেটি স্বায়ত্তশাসন নয়, পূর্ণ স্বাধীনতার। এই রায়কে দর-কষাকষি বা দল ভাঙাভাঙির মধ্য দিয়ে নিষ্ক্রিয় করা যাবে না, এটা টের পেয়ে পাকিস্তানি শাসকরা সেনাবাহিনীকে পূর্ববঙ্গে গণহত্যায় নামিয়ে দেয়। এই গণহত্যার প্রতিরোধ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। এই যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ছিল না, এ ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও। আমরা যাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি, আসলে এটা সমাজ বিপ্লবের চেতনা, কেন না শোষণভিত্তিক সমাজ কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না আনলে মুক্তি অসম্ভব। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ ওই মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে। সেটা ছিল একটি সমষ্টিগত স্বপ্ন। কিন্তু স্বাধীনতার পরে মুক্তির এই সমষ্টিগত স্বপ্ন আর অক্ষত থাকেনি। সেটা ভেঙে পড়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত উন্নতির স্বপ্নই প্রধান হয়ে উঠেছে। সেজন্য সমষ্টিগত মুক্তি অর্জিত হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের বৈপ্লবিক চেতনার পক্ষে না দাঁড়ালে আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে- তেমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই। আমাদের স্মরণ করে দেয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী উন্মেষ ঘটেছিল, তারই পরিণতি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে। অথচ সামগ্রিক অর্থে আমরা সমাজকে পরিবর্তন করতে পারিনি এবং এটাও বলে দেয় যে, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনের সমষ্টিগত স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা। এই বাস্তবায়নের পথে প্রধান কর্তব্য হচ্ছে মূল শত্রুকে চিহ্নিত করা। দ্বিতীয় কর্তব্য সেই শত্রুকে মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগোবার পথ খুঁজে বের করা। শত্রু হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের শত্রুতাই হচ্ছে মূল ঘটনা। ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ছিল আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী, পাকিস্তান আমলেও রাষ্ট্রের সেই চরিত্র বদলায়নি। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছিল মাত্র। একাত্তরের যুদ্ধ ছিল ভিন্ন ধরনের। এটি ছিল রাজনৈতিক জনযুদ্ধ। তার লক্ষ্য ১৯৪৭-এর মতো ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাধীনতা নয়, লক্ষ্য ছিল সার্বিক মুক্তি। এই মুক্তির জন্য কেবল পুরোনো রাষ্ট্রকে ভাঙা নয়, রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করাও ছিল অভীষ্ট এবং গণতান্ত্রিক করার আইনে আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী কাঠামো ভেঙে ফেলে রাষ্ট্রের মালিকানায় জনগণকে প্রতিষ্ঠিত করা। এর জন্য দরকার ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ১৯৭১-এ রাষ্ট্র ভাঙল, কিন্তু তার মূল কাঠামোতে পরিবর্তন এল না। সে আগের মতোই আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী রয়ে গেল। পুরোনো আইন-কানুন, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, বিভিন্ন বাহিনী ও আমলাতন্ত্র সবকিছুই আগের মতোই রয়ে গেল। মানুষ আশা করেছিল বৈপ্লবিক পরিবর্তন; কিন্তু সেটা ঘটেনি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সবাই মিলে আমরা একটা বড় মাপের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেটি হলো মুক্তির। না, কেবল স্বাধীনতার নয়, অর্থাৎ পরাধীনতার অবসানের নয়, সার্বিক মুক্তিরই। যার অর্থ নতুন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাটা তো ছিলই, আমরা আশা করেছিলাম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নতুন সমাজও গড়ে তুলতে পারব। আমরা মুক্তি চেয়েছি, কেবল স্বাধীনতা চাইনি। মুক্তির জন্য সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল, সেই সামাজিক বিপ্লবের কথাই লোকে ভেবেছে। যদিও অস্পষ্টভাবে। আমাদের যুদ্ধ স্বভাবতই হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। যারা একে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ বলেন তারা ব্যাপারটা বোঝেন না, কেউ কেউ হয়তোবা বোঝেন, কিন্তু মানেন না; কোনো কোনো মহল হয়তোবা বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করতে চান।

একাত্তরের যুদ্ধে দুটোই ছিল। একদিকে ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্ন, অপর দিকে সমষ্টিগত মুক্তির আশা। দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না, সে-অবস্থায় সেটা থাকবার কথাও নয়। বরং ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্ন সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নকে সংহত ও দৃঢ় করেছে। আমরা বুঝে নিয়েছি যে, ব্যক্তির মুক্তি নিহিত রয়েছে সমষ্টির মুক্তির ভেতর। হত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, উচ্ছেদ, আতঙ্ক- সব মিলিয়ে এমন ব্যাপক দুঃসময় বাঙালির জীবনে আগে কখনো এসেছে কি না সন্দেহ। না, আসেনি। তবু ওই ভীষণ অন্ধকারও মুক্তির সমষ্টিগত আশাটিকে নির্বাপিত করে দিতে পারেনি। বরং অত্যাচার যত বেড়েছে মানুষের মনোবল তত দৃঢ়তা পেয়েছে। অস্পষ্টভাবে হলেও মানুষ এমন একটি সমাজ গড়ে তুলবে বলে আশা করেছে যেখানে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।

হানাদাররা পরাজিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা বাধ্য হয়েছে তাদের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আত্মসমর্পণে। অপ্রত্যাশিত এই জন্য যে, তাদের তো কোনো কিছুর অভাব ছিল না। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ, সরবরাহ, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন, যা ইচ্ছা তা করার অবাধ স্বাধীনতা- সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণেই পেয়েছে। তাহলে হারল কেন? হারল কার কাছে? হারল সমষ্টিগত স্বপ্নের কাছে। যত আঘাত করেছে ততই তারা টের পেয়েছে ওই স্বপ্ন শক্তিশালী ও অপরাজেয় হয়ে উঠছে। হারল এই স্বপ্নের কাছেই। বাইরে তারা আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর কাছে, কিন্তু ভেতরে তাদের আত্মসমর্পণ বাঙালির সমষ্টিগত মুক্তির যে স্বপ্ন তার কাছেই।

কিন্তু জয়ের পরেই সূত্রপাত ঘটল আমাদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের। অন্য কারও কাছে নয়, পরাজয় ঘটল আমাদেরই ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলোর কাছে। হানাদাররা যা পারেনি, না-পেরে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে আমরা তা করলাম, আমরা সমষ্টিগত স্বপ্নটাকে ভেঙে খান খান করে দিলাম ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলোর আঘাতে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধিকেই মনে করা হলো মুক্তির পথ। লোভ, লালসা, দখলদারত্ব উগ্র হয়ে উঠল। বিদেশি হানাদারদের হাঁকিয়ে দিয়ে আমরা নিজেরাই হানাদার হয়ে উঠলাম। লুণ্ঠন, ছিনতাই, ভেজাল, ঘুষ, চোরাচালান, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহ, পরিত্যক্ত এবং সামাজিক সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত করা, জাতীয়করণের নামে কলকারখানা দখলে নেয়া, পরীক্ষায় নকল, চাকরিতে অবৈধ উন্নতি, সম্পদ পাচার- কোনটা বাদ রইল। বাঙালি বাঙালির সঙ্গে এমন ব্যাপক শত্রুতা আর কখনো করেনি। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক পর্যায়ে নানা ধরনের ব্যাধি দেখা দিয়েছে। এই ব্যাধিগুলো আগেও ছিল, তবে এত প্রকট আকারে প্রকাশ পায়নি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ওই স্বপ্নটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি বলেই আজকের আমাদের জীবন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন, বিপৎসংকুল। সমাজের বৈষম্য বেড়েছে। এটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রধান শত্রু। যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক তাদের কর্তব্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সমাজবিপ্লবী চেতনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করা। মুক্তিযুদ্ধ যে শেষ হয়ে যায়নি তার একটি পর্যায় আমরা অতিক্রম করেছি মাত্র। সেই সত্যটা আজ চারদিকে পরিব্যাপ্ত।

একাত্তরের পরে দেশে যে নতুন প্রজন্ম এসেছে তারা পাকিস্তান দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধও দেখেনি, তাদের সামনে দেশপ্রেমিকতার ও আত্মত্যাগের কোনো দৃষ্টান্ত নেই, এবং অন্যদিকে তারা সঠিক ইতিহাসও জানে না, সুযোগ পায় না জানবার, শাসকশ্রেণি তাদের সে-সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে রাখে। তরুণ প্রজন্ম মনে করে এ-দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেয়াটা যে সম্মানজনক এটাও তারা বোধ করে না। তাদের স্বপ্ন ব্যক্তিগত।

কিন্তু ব্যক্তিগত স্বপ্নের লালন-পালন যা করে এবং করতে পারে তা তো আমরা দেখছি। ওই সব স্বপ্নের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সার্বক্ষণিক দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশ এখন নৈরাজ্যের দিকে এগোচ্ছে। এ থেকে মুক্তির পথ আমাদের অবশ্যই জানা আছে। সেটা হলো সমষ্টিগত স্বপ্নের কাছে ফিরে যাওয়া। সেই স্বপ্নকে চালিকাশক্তি করে তোলা। কারা করবেন? করবেন তারা, যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক, যারা মনে করেন ব্যক্তিগত স্বপ্নকে মুখ্য করে আমরা উন্নতি নয়, অধঃপতনের রাস্তা ধরেছি। মুক্তির স্বপ্নকে সামনে রেখে তারা সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হবেন। যে-যুদ্ধ শেষ হয়নি, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। নইলে আমরা নামতেই থাকব, উঠতে পারব না।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


অসাম্প্রদায়িক রূপান্তরে আওয়ামী লীগ

অসাম্প্রদায়িক রূপান্তরে আওয়ামী লীগ
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মলগ্নেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ রোপিত হয়েছিল। কারণ ’৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত স্বাধিকারের লাগাতার সংগ্রাম ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে তুলনামূলকভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল প্রধান। সত্যি কথা বলতে কি, এই মানুষটি ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দ্রষ্টা ও স্রষ্টা।

জন্মলগ্নের (২৩ জুন ১৯৪৯) আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল সাম্প্রদায়িক। কিন্তু দলটি একসময়ে অসাম্প্রদায়িক নাম ধারণ করে হলো আওয়ামী লীগ (২১ অক্টোবর ১৯৫৫)। জন্মলগ্নে দলটির নাম মওলানা ভাসানী বা শেখ মুজিবুর রহমান কারও পছন্দ ছিল না; কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা নামটি গ্রহণ করেছিলেন। মূলত তাদের প্রচেষ্টাতেই একটি অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হয়।

আওয়ামী লীগ বাঙালি স্বাধিকারকেন্দ্রিক দল হলেও বঙ্গবন্ধু দলটির জন্মের অনেক আগে থেকেই বাঙালি-মুক্তির স্বপ্ন রচনা করেছিলেন। ’৪৭-এর ১৬ আগস্ট কলকাতার ভবানীপুরে ইসলামিয়া কলেজের সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার কিছু তরুণকে বললেন, ‘মিয়ারা ঢাকায় যাইবেন না। ওই মাউড়াদের সাথে বেশিদিন থাকা যাইব না। এখন থিকাই কাম শুরু করতে হইব’। উপরন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালি-মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগকে যথেষ্ট মনে করতেন না; কাজেই যুক্ত হয়েছিল তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধু তার দলকে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। ’৫৩তে সাধারণ সম্পাদক হলেও ’৬০-এ তিনি গড়লেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। সারা পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিমনস্ক তরুণরা ছিল প্রতিষ্ঠানটির চালিকাশক্তি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারাবরণ করতে শুরু করলে প্রতিষ্ঠানটি গতিপথ হারায়। সামগ্রিক বিশ্লেষণে মনে হয়, বঙ্গবন্ধু দলের কার্যক্রমকে ব্যবহার করেছেন তার একান্ত নিজস্ব প্রকল্প বাঙালি-মুক্তির লক্ষ্যে; এবং যা প্রমাণ করে লক্ষ্যাভিসারী বঙ্গবন্ধুর উদগ্র বাসনা।

’৬১তে বঙ্গবন্ধুর এমন উদগ্র বাসনা-সংক্রান্ত দুটো ঘটনা ঘটেছিল, এবং তা দলের অজান্তেই। প্রথমটি ছিল পূর্ববঙ্গ মুক্তিফ্রন্ট নামে একান্ত নিজস্ব প্রকল্প চালু করা। নিজের মুসাবিদা করা ইংরেজিতে একটি প্রচারপত্র ছাপা হয় তার নিজের অর্থে; যা তিনি সাইকেল চালিয়ে ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাস/বিদেশি সংস্থায় বিলি করেন। প্রচারপত্রে ছিল বাঙালির অভিযোগ ও দাবি। দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল কমরেড মণি সিংহ ও কমরেড খোকা রায়ের সঙ্গে গোপন বৈঠক, যেখানে স্বাধীনতা/মুক্তির প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এই বৈঠকের ফল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলো সমন্বিতভাবে আইউববিরোধী আন্দোলন শুরু করে।

’৬৩তে চুপিসারে বঙ্গবন্ধু আগরতলা যান এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ-এর শরণাপন্ন হন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল নেতাজি সুভাষ বসুর অনুকরণে ভারতের সহায়তায় লন্ডন যাওয়া এবং সেখান থেকে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করা। তবে মুখ্যমন্ত্রীর সুপারিশ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নেহেরু সম্মত হলেন না। কারণ ছিল, ভারত-চীন যুদ্ধপরবর্তী ভারতের নাকাল অবস্থা। ফলে আবার গোপনে বঙ্গবন্ধু খালি হাতে ফিরে আসেন।

’৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে প্রমাণিত হয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার নাজুক অবস্থা, যা প্রদেশে দারুণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা করতে হবে।’ এই নতুন চিন্তার ফসল ছিল ’৬৬-এর ছয় দফা, যার সূচনায় আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কাউন্সিল সভায় সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ দ্বিমত পোষণ করে পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু হন সভাপতি; আর সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। লক্ষণীয়, মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধু প্রায় চার বছরের মতো সভাপতি থাকার সময়ে (তিনি সভাপতিত্ব ছাড়েন ১৯৭৪-এ; ১৯৫৭তেও তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলে ফিরেছেন। তিনি গণতান্ত্রিক রীতি মেনে কখনো দল ও সরকার একাকার করেননি) দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় সারির নেতা তৈরি করেছিলেন; যার ফলে জাতীয় চার নেতার পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। যা হোক, ছয় দফা ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক স্বীয়তার ( ‍autonomy) দাবি, যা আসলে ছিল ১৯৪৯ থেকে চলে আসা আওয়ামী লীগের দাবিসমূহের সমন্বিত রূপ; বঙ্গবন্ধু নতুন কোনো কথা বলেননি। উপরন্তু ছয় দফার কথাগুলো বঙ্গবন্ধু নতুন দিন পত্রিকায় লিখেছিলেন। ছয় দফার আন্দোলনকে বেগবান করেছিল ছাত্রলীগ (প্রতিষ্ঠা ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮)।

ছয় দফা আন্দোলন থেকে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে নেয়ার জন্য আইউবের অনেক কৌশলের চূড়ান্ত রূপ ছিল, আগরতলা মামলা (১৯৬৮) (বঙ্গবন্ধু বলতেন ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা)। আগরতলা মামলাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের  স্লোগান ছিল ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হলো। শেখ মুজিবসহ অন্য বন্দিরা মুক্তি পেলেন। পরদিন রেসকোর্সে শেখ মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু। প্রস্তাবকারী ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ; চয়নকারী রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক (গত বছর প্রয়াত)।

৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯, সোহরাওয়ার্দীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে বাংলাদেশ। আইউবের স্থলাভিষিক্ত হন ইয়াহিয়া খান (২৫ মার্চ ১৯৬৯)। তার ঘোষিত ১৯৭০-এর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে গোল বাঁধল আইনি কাঠামো (legal framework order) নিয়ে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিপক্ষে ছিলেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন দৃঢ়ভাবে পক্ষে। তার কথা ছিল, ‘আমার লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা। নির্বাচন হয়ে যাবার পর আমি এলএফও টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো।’

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বরাদ্দ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়ী হয়ে সারা পাকিস্তানে একক গরিষ্ঠ দল হলো (অন্য দুটি আসনে জয়ী হলেন নূরুল আমীন ও রাজা ত্রিদিব রায়)। নির্বাচনের তিন দিন আগে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে এমন ফলাফলের কথা বলেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল অনুযায়ী যা হবার কথা, তা হলো না; আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পেল না। ইয়াহিয়া-ভুট্টো সামরিক বাহিনীর চক্রান্তে পাকিস্তানের রাজনীতি ঝুলে গেল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলে দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এদিকে ১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলেছিল এক দৃষ্টান্তরহিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। ১৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সঙ্গে প্রহসনের সংলাপ করল। প্রহসন এই কারণে যে, ইতিমধ্যে পাকিস্তানি সামরিক শক্তি বাড়ানো হলো; আর ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় শুরু হলো গণহত্যা, যার সাংকেতিক নাম ছিল, ‘অপারেশন সার্চলাইট।’ বাঙালি প্রতিরোধ করতে গিয়ে শুরু করল মুক্তিযুদ্ধ, যার সমাপ্তি ঘটল ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।

ইতিমধ্যে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে রাত ১২:২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসে রেকর্ড করলেন, ‘সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে ফিরে রেসকোর্সে ১৭ মিনিটের ভাষণের শুরুতেই বললেন, ‘আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, আজ বাংলাদেশ স্বাধীন।’ বাংলাদেশ নিয়ে এমনভাবে কেউ তো আর বলেনি।

লেখক: বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস


ঊনসত্তরের পথরেখায় মুক্তিযুদ্ধ

ঊনসত্তরের পথরেখায় মুক্তিযুদ্ধ
রাশেদ খান মেনন।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

রাশেদ খান মেনন

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। কোভিড-১৯-এর কারণে সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানাদি কিছুটা সীমিত রাখতে বাধ্য হলেও রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবার ধারাবাহিক পথপরিক্রমার অনেক জানা-অজানা কথা উঠে এসেছে। তবে স্বাধীনতা আন্দোলনের এই ধারাক্রমে যে সব পর্যায় সমান গুরুত্ব পেয়েছে এমন নয়। বরং স্বাধীনতার পৌঁছবার বেশ কিছু ধাপকে একেবারে বিস্মৃতির অন্তরালে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। কোনোটাকে আবার উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের কথা। এই কাগমারী সম্মেলনেই মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন। আর তার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল তা যে এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেশ কিছু দূর পিছিয়ে দিয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কাগমারী সম্মেলনের ওই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সোহরাওয়ার্দীর ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া হয়ে গেছে বলে দাবি, সিয়েটো-সেন্টো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ- এসব এ দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। পূর্ব বাংলার রাজনীতির এই বিপর্যস্ত অবস্থাই পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ক্ষমতা গ্রহণের পথকে প্রশস্ত করে দেয়। জারি করা হয় প্রথম সামরিক শাসন। সেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন এ দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আন্দোলনকে নতুন পর্বে উন্নীত করে। বস্তুত, ষাটের দশকের এই কালপর্বই বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার চেতনাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেয়, যা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করে। বস্তুত, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানই এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব। এই গণ-অভ্যুত্থানই পাকিস্তানি অপশাসনের মাজা ভেঙে দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অবস্থানের ভাগ্য নির্ধারিত করে দিয়েছিল। সেই শাসনের কীভাবে অবসান ঘটবে পরবর্তী ঘটনাবলি সেটাই নির্ধারিত করেছে।

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মূল্যায়ন করলে এই সত্যটাই বেরিয়ে আসবে। ছাত্রদের যে ১১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল তাকে একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে, এটা ছিল পাকিস্তানের জাতিগত নিপীড়নের হাত থেকে পূর্ব বাংলার জনগণের জাতীয় মুক্তি, ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলমুক্ত করার একটি ঐতিহাসিক কর্মসূচি। এই কর্মসূচি সব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সংগ্রামের উৎসমুখ খুলে দিয়েছে। ঊনসত্তরের এই গণ-অভ্যুত্থানেই বাঙালি জাতীয়তার সংগ্রাম জাতীয় স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষায় সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেছে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথানেই অস্ত্র হাতে দেশ স্বাধীন করার স্লোগান ওঠে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানেন, কী বিপ্লবী উন্মাদনায় আইয়ুর-মোনেমের কারফিউ ভেঙে ঢাকার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে। কী বিপুল প্রবাহে এই গণ-অভ্যুত্থান ঢেউয়ের মতো বিস্তৃত হয়েছে সারা দেশের শ্রমিকাঞ্চল-গ্রামাঞ্চলে। নিজ নিজ দাবির পাশাপাশি মানুষ  স্লোগান তুলেছে- ‘শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’। যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেই স্লোগানের উৎপত্তিও ঊনসত্তরের এই গণ-অভ্যুত্থানে।

স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত মানুষ শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নিজেরাই সংগঠিত হয়েছে এই গণ-অভ্যুত্থানে। দেশের বিভিন্ন শ্রমিকাঞ্চলে ‘ঘেরাও’ আন্দোলন সমগ্র শ্রমিক আন্দোলনকেই নতুন ব্যাপ্তি ও জঙ্গিত্বের মাত্রা দিয়েছে। দেশের অসংগঠিত কৃষকরাও পিছিয়ে থাকেনি। তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে গ্রামাঞ্চলে সরকারের ও গ্রামীণ শোষণের প্রতিভূ তহসিল অফিস আক্রমণ ও জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। গরু চোরদের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রামীণ বদ মাতব্বর, সুদখোর মহাজন- এ সবই কৃষকদের আন্দোলনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। অবস্থাটা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, গ্রামাঞ্চলে কোনো সরকার ছিল না। আন্দোলনরত ছাত্ররা, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা, গ্রামাঞ্চলের কৃষক নিজেরা তুলে নিয়েছিল শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব।

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের জাতীয় স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই আকাঙ্ক্ষার আমরা বহিঃপ্রকাশ দেখি সত্তরের প্রথমার্ধে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা, স্বাধীন বাংলা এবং একাত্তরে স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণার মধ্যে। বস্তুত এই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শ্রমিক-কৃষকের নিজস্ব সংগ্রামের ধারায় সারা দেশে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পক্ষে এককভাবে নির্বাচনী রায় পায়। একাত্তরে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় এ দেশের মানুষকে পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা ও সেনা অভিযানের মুখে পড়তে হলেও অচিরেই দেশবাসী বিহবলতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুক্তি-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই মুক্তি-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র-যুবক কাউকে নতুন করে উদ্বুদ্ধ করতে হয়নি। তারা নিজেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সেই অংশগ্রহণের মানসিকতা ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল পরিবর্তনের অভিমুখে পরিচালিত হয়, তারও ভিত্তি রচিত হয় ওই ১১ দফায় ও ঊনসত্তরের গণ-ভ্যুত্থানে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেশবাসীর সামনে হাজির ছিল না। ১১ দফায় বিধৃত কর্মসূচিই বস্তুত বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সমাজ পরিবর্তনের চেতনায় উন্নীত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে পরবর্তী সংবিধান রচনা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পদক্ষেপসমূহ ওই কর্মসূচির আলোকেই গৃহীত হয়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের দেশের আন্দোলনের চেহারার যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল সেটা অনেকেই উপলব্ধির ক্ষেত্রে সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে যেতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ১১ দফার রাজনৈতিক মূল্যায়নে একে কেবলমাত্র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। ১১ দফা আন্দোলন প্রণয়ন ও নেতৃত্বে থাকার পরও তারা ১১ দফাকে কেবলমাত্র ছয় দফারই এক বিস্তৃত রূপ বলে চিত্রিত করতে প্রয়াসী হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান সারা দেশের আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের যে পরিবর্তন সাধণ করেছিল তা অনুধাবন করে ১৯৬৯-এর ১০-১৩ মার্চ রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন: ‘কোন সব মৌলিক সমস্যাকে কেন্দ্র করিয়া দেশে আজ গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়া গেলো তা নির্ণয় করিয়া অবিলম্বে তাহার প্রতিকারের ব্যবস্থা করিতে যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে তাহার চাইতে বিপর্যয়কর আর কিছু হইতে পারে না। ... পরিস্থিতি আজ সুস্পষ্ট রকমে অতীব গুরুতর। তাই আপাতমধুর বা আধাআধি কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান কোনক্রমেই সম্ভব নহে।... জাতীয় জীবনে বিভিন্ন স্তরের মানুষের কণ্ঠে যে সব দাবি দাওয়া আজ ধ্বনিত হইতেছে যত্নসহকারে সেগুলো পরীক্ষা করিলে দেখা যাইবে যে, উহার মূলে মাত্র তিনটি মৌল প্রশ্ন নিহিত। প্রথমটি হইল, রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার অবলুপ্তি। দ্বিতীয়টি, সীমাহীন অর্থনৈতিক অন্যায় অবিচার যাহার ধকল পোহাইতে হইতেছে এ দেশের শ্রমিক-কৃষক নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ- মোট কথা আপামর জনসাধারণকে।... তৃতীয়টি হইল, পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের প্রতি সমানে অবিচার করা হইতেছে এই উপলদ্ধি।... (গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ (পুস্তিকা)। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে যে নতুন বিপ্লবী স্তরে উন্নীত করেছিল, তৎকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই তাদের মূল্যায়নে স্বীকার করেছে। নিজেদের মধ্যে তীব্র মতভেদ থাকার পরও তারা সবাই স্বীকার করেছেন যে, এবারই সর্বপ্রথম বাংলাদেশের গণ-আন্দোলন একটি বামপন্থি কর্মসূচিতে বিকাশ লাভ করে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানই এ দেশের তরুণদের ব্যাপকভাবে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনে যোগদান করতে উৎসাহী করেছিল। বিপুলসংখ্যক তরুণ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় আকৃষ্ট হয়ে এ দেশের বাম আন্দোলনকে নতুন মাত্রা প্রদান করে।

এ প্রসঙ্গে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ আসাদ সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা প্রয়োজন। বস্তুত শহীদ আসাদের জীবন দান ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সূচিমুখ খুলে দিয়েছিল, সেই আসাদ ছিলেন একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী। মার্কসবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ ও কৃষক সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শহীদ আসাদ সাংগঠনিকভাবে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন)-এর ঢাকা হল শাখার সভাপতি এবং তৎকালীন বাম কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। ছাত্র আন্দোলনের শেষে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পূর্বেই মওলানা ভাসানী কৃষকদের দাবিসহ রাজনৈতিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী যে হাট-হরতালের ডাক দিয়েছিলেন, আসাদ ছাত্র হয়েও তাকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং হাতিরদিয়ার হাট হরতালে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সম্মুখীন হন। ঢাকায় ফিরে সেই আসাদ জ্বরাক্রান্ত দেহ নিয়ে কেবলমাত্র আন্দোলনের চেতনার তাগিদে ২০ জানুয়ারির মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। আসাদের মৃত্যুকে তাই ছাত্রসহ দেশবাসী একটি সচেতন রাজনৈতিক মৃত্যু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। শহীদ আসাদের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর যে আকাঙ্ক্ষা বিধৃত হয়েছিল তা-ই তাদের অভ্যুত্থানে সংগঠিত করেছিল।

কেবল আসাদের মৃত্যু নয়, ঊনসত্তরের প্রায় প্রতিটি মৃত্যুই ছিল সচেতন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিফলন। কিশোর মতিউরের যে মৃত্যু ঢাকার সব জনগণকে ২৪ জানুয়ারির সুবিশাল উত্থানে একত্রিত  করেছিল, সে ছিল নবকুমার স্কুলের ছাত্র। আন্দোলনে যোগ দিতেই সে এসেছিল। তার শোকাহত বাবা মতিউরের মৃত্যুতে কোনো আহাজারি করেননি বরং পুত্রের লাশ সামনে নিয়ে সমবেত জনতাকে ‘লক্ষ মতিউর’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারির রাতে কারফিউ ভেঙে যারা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে ইপিআর-মিলিটারির গুলিতে শহীদদের অনেকের পকেটেই নাম-ঠিকানা লিখা কাগজ পাওয়া গিয়েছিল- যা প্রমাণ করেছে এরা মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সংগ্রামের কাতারে শামিল হয়েছিল। ঊনসত্তরের এই শহীদদের মধ্যে শ্রমিকরাই ছিল সংখ্যায় বেশি। এরপর ছাত্ররা। এ ছাড়া বাকি শহীদরা ছিলেন কৃষক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

এ ধরনের একটি ঘটনা যা বাঙালি জাতির চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে স্বাধীনতার একক লক্ষ্যের দিকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করেছিল, যে অভ্যুত্থান পাকিস্তানি অপশাসন অবসানের সূচনা করেছিল, যে অভ্যুত্থানের বিপ্লবী মর্মবস্তু হাজার হাজার তরুণকে জাতীয় স্বাধীনতার চেতনার পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের কঠিন ও কঠোর কর্তব্যের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল সেই গণ-অভ্যুত্থানকে এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে বিবেচনা করা তাই অস্বাভাবিক হবে না। বরঞ্চ তার স্বীকৃতিই হবে ইতিহাস স্বীকার করে নেয়া। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাতের প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের পর্দা উন্মোচন করেছে। কিন্তু সেই পর্দা উন্মোচনের পূর্বে ড্রেস রিহার্সেলটি ছিল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান।

লেখক: জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি


‘ছাত্রলীগের ইতিহাসটা বাংলাদেশেরই ইতিহাস’

‘ছাত্রলীগের ইতিহাসটা বাংলাদেশেরই ইতিহাস’
মোহাম্মদ হাননান
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

মোহাম্মদ হাননান

শিরোনামে ব্যবহৃত সনদটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যখন তিনি ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রথম জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন। এ সম্মেলনে ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদও বক্তৃতা করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রলীগের ভূমিকা ও অবদানের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘ছাত্রলীগ না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন বিলম্বিত হতো’। এ দুটো মন্তব্য অতিশয়োক্তি কি না তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।

১৯৩৮ সালে কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সারা ভারতের মুসলিম ছাত্রদের মহাসম্মেলন। সম্মেলনে মুসলিম ছাত্রদের জন্য আলাদা ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস অরগেনাইজেশন’ সংগঠন জন্মলাভ করে। কিন্তু বাংলার মুসলিম ছাত্রসমাজ ‘অল ইন্ডিয়া’ অর্থাৎ ‘সর্বভারতীয়’-তে থাকতে চাইল না। তারা বাংলার ছাত্রদের জন্য একই সম্মেলনে আলাদা ছাত্র সংগঠন ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ গঠন করল, যদিও এর আগেই ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন’ নামে একটি সংগঠন ছিল, এর মাধ্যমে সে সংগঠনটিরও বিলুপ্তি ঘটে। এই মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন আবদুল ওয়াসেক (ঢাকা) এবং শামসুর রহমান (যশোর)। সংগঠনটির নেতারা প্রথম থেকেই ছিলেন মুসলিম লীগের এবং ঢাকার নবাবদের তাঁবেদার। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এভাবেই চলছিল।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৪৩ দিনের মধ্যেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা দেখল। পাকিস্তানে তখন কোনো বিরোধী দল নেই, সরকারের আছে মুসলিম লীগ। মুসলিম ছাত্রলীগের নেতারা তখন মুসলিম লীগ সরকারের নেতা ও মন্ত্রীদের মোসাহেবিতে ব্যস্ত। এ সময় কলকাতা থেকে ঢাকায় সদ্য-আগত ছাত্রনেতা শেখ মুজিব উদ্যোগ নিয়ে গঠন করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। এটা পূর্বের ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ ভেঙে আরেকটি গ্রুপ হলো, এমনটা নয়। বরং এটি ছিল একটি নতুন ছাত্রসংগঠন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি নবগঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’-এর প্রথম আহবায়ক নির্বাচিত হলেন নইমুদ্দিন আহমদ (রাজশাহী)। নেপথ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি তখনো ঢাকার রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি কিছুই চেনেন না, সঙ্গে অলি আহাদ (কুমিল্লা)। ইতিহাসের এই পর্বে মুজিবের সঙ্গে আরো যারা ছিলেন, আবদুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল), আজিজ আহমদ (নোয়াখালী), আবদুল মতিন (পাবনা), দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), মুফিজুর রহমান (রংপুর), শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা), নওয়াব আলী (ঢাকা), নুরুল কবির (ঢাকা শহর), আবদুল আজিজ (কুষ্টিয়া), সৈয়দ নুরুল আলম (ময়মনসিংহ) এবং আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী (চট্টগ্রাম)। ফজলুল হক হলে নতুন ছাত্রসংগঠন গড়ার এ সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন নাজমুল করিম (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকলেও এ সংগঠনের প্রায় সবাই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। যদিও অলি আহাদ ‘মুসলিম’ শব্দ রাখার তীব্র বিরোধী ছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সদ্য-গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ‘মুসলিম’ শব্দটি রেখে দেন। অধিকাংশ ছাত্রনেতা এ রণকৌশল বুঝতে পারলেও অলি আহাদ পারেননি। দেশ ও সমাজের এ বাস্তবতা না বোঝার কারণে কমিউনিস্টদের ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারশনও পাকিস্তানে সংগঠন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি, বিলুপ্ত হয়ে যায় এ সংগঠন। আবার দালালি, ভোগবিলাসে ব্যস্ত শামসুল হুদা চৌধুরী (জেনারেল এরশাদের সময়ের স্পিকার) এবং শাহ আজিজুর রহমান (জেনারেল জিয়ার আমলে রুটিন-প্রধানমন্ত্রী)-এর নেতৃত্বাধীন ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ও বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি।

পূর্ব পাকিস্তানে তখন বিরোধী দল নেই। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সেই ঝাণ্ডা হাতে তুলে নিল: ‘মন্ত্রিসভা বা বিরোধীদলের হস্তে ক্রীড়াপুত্তলি  হওয়া আমাদের নীতি নয়।... সরকারের জন ও ছাত্র স্বার্থ বিরোধী কর্মপন্থাকে আমরা রুখিয়া দাঁড়াইব।’ [প্রচারপত্র: ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আবেদন’, মার্চ ১৯৪৮]। নবগঠিত এই মুসলিম ছাত্রলীগের বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ডই নতুন দেশ পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিরোধীদলীয় তৎপরতার সূত্রপাত করে। এর একটা বড় ঘটনা দেখতে পাই, তিন দফা (১৯৪৭, ১৯৪৮ এবং ১৯৫২) ভাষা আন্দোলনকালে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি সামনে আসে। কিন্তু সে সময়ের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী মহল এ নিয়ে বিশেষ চিন্তাভাবনা করতেন না। ফলে শিক্ষিত মহলে একটা হতাশার ভাব ছিল। এ প্রেক্ষাপটেই ভাষার সংগ্রামকে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করে ঢাকার  ছাত্রসমাজ। ঢাকার ছাত্রসমাজ বলতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগই। পেছনে কৌশল বাতলে দিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, অথচ ছাত্র এবং ছাত্রনেতারা বন্দি মুজিব থেকেই পরামর্শ নিয়ে আসছেন কীভাবে সংগঠিত হবে আন্দোলন। অলি আহাদ লিখেছেন, ‘প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার (মুজিবের-লেখক) সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি’। [অলি আহাদ: জাতীয় রাজনীতি, ১৯৪৫-১৯৪৭, পৃষ্ঠা ১৫১]।

মুজিবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে সফল হচ্ছে। তিনি যে আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদেরই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তা প্রাথমিক অবস্থা থেকেই সুফল বয়ে আনছিল। প্রথম জীবন থেকেই বয়স্ক রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে মুজিব ছিলেন হতাশ। ১৯৪৭-পূর্ব রাজনীতিতে কীভাবে চক্রান্ত করে বাংলা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, তার দুঃসহ কলকাতা-স্মৃতি তাকে প্রতিনিয়ত ভাবী করে রাখত। এর থেকে উত্তরণের জন্য তিনি সেভাবেই ছাত্রলীগকে গড়ে নিচ্ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজটা প্রধানভাবে ছাত্রলীগই করে। মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে একটি বড় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে ১৯৫৪,Ñ১৯৫৮ সালের পাকিস্তানের রাজনীতি, যখন গোয়েন্দা বিভাগের ষড়যন্ত্রে বয়স্ক রাজনীতিকরা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগকে সংখ্যালঘিষ্ঠ দলে পরিণত করে ফেলেছিল। যার পরিণামে খুব সহজে দেশে সামরিক শাসন প্রবেশ করে।

এ অবস্থার প্রতিকারে মুজিব আবার কাজে লাগান ছাত্রসমাজকেই। এর মধ্যে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয় লাভের ফলে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় ১৯৫৫ সালেই ছাত্রলীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ এমনি-এমনি উঠে যায়। ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তিনি ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। এ লক্ষ্যে ছাত্রলীগের সঙ্গে যাতে ছাত্র ইউনিয়নও অংশ নেয় তার জন্য মুজিব গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে মুজিব এক ‘অসম্ভব প্রস্তাব’ পেশ করে কমিউনিস্ট  নেতাদের প্রায়  ভরকে দেন। মুজিব ভেবেছিলেন কমিউনিস্টদের সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা আছে, তাই তিনি  পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রস্তাবটি আলোচনায় রাখেন। কিন্তু কমিউনিস্ট নেতারা ‘অপরিপক্ব’, ‘অসময়োচিত’ মূল্যায়ন করে মুজিবের প্রস্তাবে সম্মতি দিতে বিরত থাকেন। ফলে মুজিব আবার ছাত্রলীগেই ফিরে যান। ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে পয়লা ফেব্রুয়ারি (১৯৬২) পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকায় প্রথমবারের মতো বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক শাসনবিরোধী এত বড় ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হওয়ায় মুজিব বুঝতে পারেন ছাত্রলীগকে নিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হবে।

এ সময় মুজিব নিজেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার দাবিসংবলিত পোস্টার ও লিফলেট ছেপে গোপনে ছাত্রলীগ নেতাদের মাধ্যামে তা বিলি করেন। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা সর্বত্র প্রচার করতে থাকেন। এভাবে সংগোপনে পোস্টার-লিফলেট বিলির মূল উদ্দেশ্য ছিল জনমত যাচাই করা। ছাত্রলীগ নেতারা লক্ষ করেন, এ নিয়ে সর্বত্র ‘হুসহাস-ফিসফাস’ চলছে, যা ছাত্রসমাজকে রোমাঞ্চিত করে  তুলেছিল। [সূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ: প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খান, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২১, পৃষ্ঠা ১৯-৮২]।

পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগকে কতটা আস্থায় নিয়েছিলেন তা বোঝা যায় ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি পেশ করার পর থেকে। ছয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা ছিল লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে। সে সম্মেলনে সভাপতিত্বও করেছিলেন পাকিস্তান আওয়ামী লীগেরই কেন্দ্রীয় সভাপতি নবাবজাদা নসুরুল্লাহ খান, কিন্তু তিনিসহ বিরোধী দলের অন্য নেতারা ছয় দফাকে বিষয় নির্বাচনী কমিটিতেই ওঠাতে দেননি। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু বিরোধিতার সম্মুখীন হন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের কাছ থেকেও। আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রমুখ ছয় দফা ও অন্যান্য প্রশ্নে মুজিবকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। এ সময় থেকেই আওয়ামী লীগ (এনডিএফ) এবং আওয়ামী লীগ (ছয় দফাপন্থি) নামে দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গ, কিন্তু তার পাশে সদা জাগ্রত ছিল ছাত্রলীগ। লাহোর সম্মেলনে ছয় দফা উত্থাপন করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি করাচি হয়ে ঢাকায় ফেরেন। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা তাকে ঢাকা বিমানবন্দরে ‘বীরের মর্যাদায়’ বরণ করে নেয়। তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন শামসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি আমাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই বিমানবন্দরে তাকে বরণ করে নিতে আসা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগ দখল করে নিতে বলেন। মুজিব বলেন, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের দিয়ে তিনি ছয় দফা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না’। (সূত্র: মোহাম্মদ হাননান: বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮০০-১৯৭১, অখণ্ড: ১, আগামী প্রকাশনী ঢাকা ২০০৬)। ছাত্রলীগ এ ভাষণে ‘মেসেজ’ পেয়ে যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হলে প্রবীণ নেতাদের বাদ দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ছাত্রলীগ জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রামপর্যায় পর্যন্ত ছয় দফাকে জনপ্রিয় করে তোলে। ছয় দফাকে জনগণের ম্যান্ডেটে পরিণত করার কৃতিত্বটা তাই ছাত্রলীগেরই।

এরপরই এসে যায় মোক্ষম সময়। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করে ফেলার কথিত ষড়যন্ত্রের দায়ে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সেনানিবাসে বন্দি করা হয় এবং ‘আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা’ নামে এক কঠিন মামলা দায়ের করা হয়। ছাত্রলীগ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সমগ্র দেশ ‘জেলের তালা ভাঙবো: শেখ মুজিবকে আনবো’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে ছাত্রলীগ যুক্ত করে ‘তোমার আমার ঠিকানা: পদ্মা মেঘনা যমুনা’ শীর্ষক নতুন একটি   স্লোগান। জনগণ এ স্লোগানের মাধ্যমে নতুন একটি ‘মেসেজ’ও পায়, আর তা হলো বাঙালির জাতিসত্তার ঠিকানা এখন তৈরি হয়ে গেছে।

শেখ মুজিবুরের মুক্তির পর রেসকোর্স ময়দানে সংবর্ধনা সভায় ছাত্রলীগ নেতা ও ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ তাকে যে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব প্রদান করেন, তাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি স্মারক হয়ে দাঁড়ায়। এর অর্থ মুজিব এখন আর পাকিস্তানের কারো নয়, তিনি শুধুই ‘বঙ্গের বন্ধু’। এভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু এবং ছাত্রলীগ সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের পেছনে রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম। তারা যে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি  উচ্চারণ করল, তা প্রতিধ্বনিত হলো বাংলার ঘরে ঘরে। বাংলার আনাচে-কানাচে  দুর্গ এভাবে আগেই গড়ে উঠল।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ছাত্রলীগের সমাবেশে বাংলার স্বাধীনতার পতাকা হঠাৎ করে উত্তোলিত হয়েছিল, এমনটা কিন্তু নয়। এর আগের রাতে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের সাবেক ও চলমান কমিটির আট নেতার বৈঠকে পরদিন স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আট নেতার মধ্যে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দস মাখন। শেষোক্ত চারজন ‘চার খলিফা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। এ বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ ফল বেরিয়ে আসে ৩ মার্চ ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের যৌথ পল্টনের জনসভায়। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন, তিনি প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। ছাত্রলীগ বাংলার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটি করে এ জনসভায়। জনসভায় একটি ইশতেহার পাঠ করা হয়। ইশতেহারে বলা হয়:

১.   স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হলো । ৫৪ হাজার ৫ শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার সাত কোটি মানুষের আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’।

২.   বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনার জন্য নিম্নলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি অঞ্চলে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করতে হবে।

৩.  মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে।

৪.  স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা হবে নিম্নরূপ: বর্তমান সরকারকে বিদেশি সরকার গণ্য করে এর সকল আইনকে বেআইনি বিবেচনা করতে হবে। অবাঙালি সেনাবাহিনীকে শত্রুসৈন্য হিসেবে গণ্য এবং তাদের খতম করতে হবে।

৫.  আক্রমণরত শক্তিকে প্রতিরোধ করতে সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

৬.  স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ ব্যবহৃত হবে।

৭.   পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হবে।

৮.  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োজিত থাকবেন। [সংক্ষিপ্ত । দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, ৪ মার্চ ১৯৭১]।

পল্টনের জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার আনন্দে উদ্বেলিত মানুষ রাজপথে প্রথম প্রকাশ্যে স্লোগান ধরে: ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর: বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘গ্রামে-গ্রামে দুর্গ গড়: মুক্তিবাহিনী গঠন কর’।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি নতুন ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন, মাত্র ২৩ বছরেই ছাত্রলীগ তা পূরণ করে দেয়। এটা শুধু বিস্ময়কর নয়, এটা বিশ্বরাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল ঘটনা যে ছাত্রসমাজই একটি স্বাধীন দেশের রূপকার হয়ে স্বপ্নকে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। নিঃসন্দেহে ছাত্রসমাজের এ ইতিহাসের ধারার ছাত্রলীগই অগ্রগামী ছিল। যদিও অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), পূর্ববঙ্গ ছাত্র ইউনিয়ন  (মেনন) প্রমুখ দলও এর সঙ্গে নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সহযোদ্ধা ছিল, তথাপি ছাত্রলীগের তৎপরতা ও কর্মকাণ্ড ছিল লাগাতার আপসহীন ও দৃঢ় মনোবলে বলীয়ান। সে জন্যই ছাত্রলীগের ইতিহাস যেন বাংলাদেশেরই ইতিহাস। স্বাধীনতার জন্য অনেক কাজ ছাত্রলীগ নিজেরাই একা এবং আগে আগে করে ফেলে। ছাত্রলীগের বিপ্লবাত্মক এ ভূমিকা না থাকলে হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতো।

ড. মোহাম্মদ হাননান: লেখক ও গবেষক। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থের রচিয়তা।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি নতুন ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন, মাত্র ২৩ বছরেই ছাত্রলীগ তা পূরণ করে দেয়। এটা শুধু বিস্ময়কর নয়, এটা বিশ্বরাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল ঘটনা যে ছাত্রসমাজই একটি স্বাধীন দেশের রূপকার হয়ে স্বপ্নকে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। নিঃসন্দেহে ছাত্রসমাজের এ ইতিহাসের ধারার ছাত্রলীগই অগ্রগামী ছিল


স্বাধীনতার সূতিকাগার হলেও একুশের চেতনা এখনো অসম্পূর্ণ

স্বাধীনতার সূতিকাগার হলেও একুশের চেতনা এখনো অসম্পূর্ণ
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আহমদ রফিক।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

আহমদ রফিক

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আহমদ রফিকের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে, ১৯২৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। একাধারে প্রাবন্ধিক, কবি ও কলাম লেখক আহমদ রফিক রবীন্দ্র গবেষক হিসেবেও খ্যাতিমান। দৈনিক বাংলার উদ্বোধনী সংখ্যার জন্য তিনি সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেছেন এবং মাতৃভাষার বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে কথা বলেছেন।

দৈনিক বাংলা: ভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে কোন কোন বিষয়গুলো ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছিল?

আহমদ রফিক: একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষার প্রতিষ্ঠা পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির আর্থসামাজিক ও নান্দনিক ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেবে- এমন আশঙ্কা থেকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় বাঙালি ছাত্র-যুবসমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। বিস্ময়কর যে, এ প্রতিবাদের তাত্ত্বিক সূচনা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছু আগে জুন-জুলাইতে (১৯৪৭) বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে লেখালেখিতে। এরপর সংগঠিত পর্যায়ের আন্দোলন ১৯৪৮, ১৯৫০, সর্বশেষ ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে। শেষোক্ত আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু ভাষা আন্দোলনকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়; এমনকি দূর গ্রামের শিক্ষায়তনে। এখানেই ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য।

মূলত রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত নানামাত্রিক জাতীয় উন্নয়নের বিষয়টি নিয়েই ভাষা আন্দোলনের কারিগরদের আপসহীন লড়াই শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ নেতাদের পিছুটান তাদের লড়াকু তৎপরতায় প্রভাব ফেলতে পারেনি। যেমন ২০ ফেব্রুয়ারিতে জারি করা ১৪৪ ধারা ভাঙার বিষয়টিতে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা প্রকাশ করে ছাত্র-যুবসমাজ, যদিও রাজনৈতিক নেতারা এ ক্ষেত্রে লড়াইয়ে নামতে রাজি ছিলেন না। অকুতোভয় ছাত্র-যুবসমাজ সব বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে লড়াইয়ে নেমেছিল। লক্ষ্য- রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাজনীতির ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দাবি আদায়।

এ ছাড়াও ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির বৈষম্য, রাজস্ব আয়-ব্যয়ে বৈষম্য, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে বৈষম্য (ছোট্ট উদাহরণ- ঢাকার মধ্যেই দ্বিতীয় রাজধানী তথা সেকেন্ড ক্যাপিটাল নির্মাণ, তাও আবার ঐতিহাসিক মনিপুরি ফার্মটিকে ধ্বংস করে)। এ জাতীয় বৈষম্য ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থায়। সেচ ব্যবস্থায়, শিল্পকারখানা স্থাপনে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ভারী শিল্প স্থাপনের মতো বহুবিধ ক্ষেত্রে। আর বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান বা সাহায্য ব্যবহারে দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ও একদেশদর্শিতা হয়ে ওঠে বহু আলোচিত বিষয়। রাজনীতিসচেতন বাঙালি শিক্ষিত শ্রেণির অনেকেরই চোখে পড়েছে পূর্ববঙ্গের শিল্পকারখানা ও বৃহৎ বাণিজ্যে অবাঙালি পুঁজিপতি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিপত্য এবং সেই সূত্রে অর্জিত সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার। পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানে পাচার কোনো কোনো বাঙালির চোখে অনৈতিক মনে হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের পূর্ব প্রান্তিক প্রদেশ পূর্ববাংলা তার ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্রমে দুর্বল হয়েছে। বলতে হয়, জিন্নাহর পাকিস্তান মূলত পাঞ্জাব-সিন্ধুর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্যই। বাঙালি ও পূর্ববঙ্গের প্রতি বিজাতীয় বিরূপতা ও বৈষম্য বিশেষত ভাষিক বৈরিতা বাঙালি তরুণদের ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে।

দৈনিক বাংলা: ভাষা আন্দোলন বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটটি আলোচনা করবেন।

আহমদ রফিক: ১৯৪৮-এ ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন শুরু করেছিল তমুদ্দিন মজলিস আর প্রগতিশীল ছাত্র-যুবারা। কিন্তু আন্দোলন তুঙ্গে না উঠতেই জিন্নাহ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন শান্তি প্রস্তাব পাঠালে তা গ্রহণ করে আন্দোলন স্থগিত করা হয়। এটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তোয়াহা সাহেব, তাজউদ্দিন সাহেব তখন বলেছিলেন একবার আন্দোলন স্থগিত করলে আবার তা চাঙা করা কঠিন হবে। তাদের কথা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল। আন্দোলন চাঙা করতে ১৯৪৮-এর মার্চ থেকে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ প্রায় চার বছর লেগে গিয়েছিল। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলেও তা তখন আন্দোলনকে খুব বেশি বেগবান করতে পারেনি। ভাষা আন্দোলনে মূলত চারটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ছাত্রদের কেউ আন্দোলন করতে শেখায়নি। সরকারের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ছাত্ররা এই আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। তৃতীয়ত, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত। ছাত্ররাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রাজনীতিবিদরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। আমার লেখা বইতে এই ইতিহাস আছে। চতুর্থত, পুলিশের গুলি চালানো। পুলিশের গুলি চালানোর খবর প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিল। আমি গ্রামাঞ্চলে ভাষা আন্দোলনের বিষয় নিয়ে ‘ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ এই শিরোনামে একটি বই লিখেছি। প্রথমা প্রকাশন বইটি প্রকাশ করেছে। সেখানে আমি গবেষণা করে দেখিয়েছি যে, পুলিশের গুলি চালানোর খবর সারা দেশে কোথাও ২২ তারিখ, কোথাও ২৩, এমনকি ২৪ তারিখও পৌঁছায়। তারপর তা তুঙ্গে ওঠে এবং দেশব্যাপী পরিসর পায়। মূলত এই চারটি বিষয় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে কাজ করেছিল।

দৈনিক বাংলা: ভাষা আন্দোলনের সময়কার স্মৃতিচারণ…

আহমদ রফিক: একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে রাজনীতিবিদরা এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বলল, ১৪৪ ধারা ভাঙা যাবে না। সে কারণে ছাত্ররা একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জমায়েত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, যেকোনো মূল্যে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। সে অনুযায়ী ১০ জনের একেকটি গ্রুপ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙার পরিকল্পনা করে। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে দুপুর ১২টা নাগাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়, যেহেতু এটা পরিষদ ভবনের কাছাকাছি ছিল। ছাত্ররাই ছিল বেশি সেখানে। ছাত্রদের চেষ্টা ছিল পরিষদ ভবনের সামনে যাওয়া এবং শান্তিপূর্ণভাবে ঘেরাও করা। কিন্তু সে পর্যন্ত যাওয়া গেল না পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড, প্রবল লাঠিপেটা এবং টিয়ার গ্যাসের কারণে। ৩টা ২০ মিনিটে সরকারি হিসাবে পুলিশ ২৬ রাউন্ড গুলি ছুড়ে মূলত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েতের দিকে লক্ষ্য করে। হোস্টেলের উল্টোদিকে রাস্তার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। সেখানে একজন তরুণের গায়ে গুলি লাগে। এলিস কমিশনের রিপোর্টে একজন যুবকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা আছে। কাজেই আমরা চোখ বন্ধ করে বলি রফিক, বরকত, সালাম জব্বারসহ অন্তত ছয়জন কিংবা এর বেশিও হতে পারে পুলিশের গুলিতে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন। ১৪ নম্বর ব্যারাকের সামনে রাস্তার ওপরে রফিক উদ্দীনের মাথায় গুলি লাগে। তার মানে তিনি প্রথম শহীদ। দ্বিতীয় শহীদ হলেন জব্বার।

শহীদ দিবস সফল করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ২৩ তারিখ সকালে চিন্তা করে শহীদ মিনার নির্মাণের। সেদিনই রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দুজন রাজমিস্ত্রি নিয়ে কাজ করে সাড়ে ১০ ফুট লম্বা ৬ ফুট চওড়া শহীদ মিনার তৈরি করেছিলাম। এর নাম ছিল ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। আমরা জোগালির কাজ করেছি অর্থাৎ মাটিকাটা, ইট বহন করা, হাসপাতালের স্টেচারে করে বালু বহন করা। রোগীকে বহন করা স্টেচার দিয়ে বালু বহন করেছি, সিমেন্ট বহন করেছি। হোসেনি দালানের পিয়ারু সরদার আমাদের কলেজের সম্প্রসারণ কাজের ঠিকাদার ছিলেন। তার উদার মন ছিল। তার কাছ থেকেই চাবি নিয়ে সিমেন্টের গুদামের তালা খুলেছিলাম। আমি প্রায়ই রসিকতা করে বলি, আজকের মতো দিন হলে সিমেন্ট গুদামের তালা মোচড় দিয়ে ভেঙে ফেলত কিংবা দরজা ভেঙে সিমেন্ট বের করত। তখন আমরা সবকিছু করেছি শান্তিপূর্ণভাবে। চাবি এনে সিমেন্ট বের করে দুদিন পর আবার চাবি ফেরত দিয়ে এসেছিলাম। এভাবে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি হলো। অর্থাৎ সবাই সহযোগিতা করেছিল স্মৃতিস্তম্ভটি করতে। ২৪ ফেব্রুয়ারি রোববার ছিল সরকারি ছুটির দিন। ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সবস্তরের মানুষ বিশেষ করে পুরান ঢাকার লোকজন শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে ভেঙে পড়ল ফুল, টাকা-পয়সা দেয়ার জন্য। এক ভদ্র মহিলা গলার হার খুলে দিয়েছিলেন শহীদ মিনারের পাদদেশে।

দৈনিক বাংলা: ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পূর্তি হয়েছে। এই বিশেষ মুহূর্ত উদযাপনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের ফলাফলকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আহমদ রফিক : ভাষা আন্দোলনের পর দীর্ঘ সময় ধরে দৃশ্যপটটা একই রকম থেকে গেছে। ভাষা আন্দোলনের যেসব উদ্দেশ্য ছিল তার মধ্যে মূল দাবি ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। অর্থাৎ তৎকালীন পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কিন্তু এটাই একমাত্র দাবি ছিল না। আরও কিছু দাবি ছিল, যেমন : ‘সকল রাজবন্দির মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু কর’। এর মধ্যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার দাবিটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দাবিগুলোর ভিত্তিতে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে এবং ষাটের দশকে এর বিকাশ ঘটে। এরই পথ বেয়ে ৬ দফা, ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এসব সংগ্রামে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল ছাত্র-যুবসমাজ। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর একুশের চেতনা অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হয়নি। ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ কিছুটা বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার পর যে সংবিধান প্রণীত হলো তা একটি ভালো সংবিধান। একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। সেখানে উল্লেখ আছে, প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় জীবনে তথা জাতীয় জীবনে সর্বক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। গোটা ইংরেজ আমলে রাজভাষা হিসেবে ইংরেজির প্রচলন ছিল। এই ভাষার মাধ্যমে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান শিক্ষিত হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা দেখলাম ইংরেজি ভাষার দাপট। অর্থাৎ গোটা পাকিস্তান আমলে যে স্লোগানগুলোর ভিত্তিতে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তা মিথ্যা হয়ে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষায় ইংরেজি ভাষার আধিপত্য। শুধু ভাষাগত আধিপত্য নয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যও বজায় থেকেছে। সর্বক্ষেত্রেই বিদেশি সংস্কৃতির প্রাধান্য বিদ্যমান। লক্ষ করুন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এখনও বিচারকদের ‘মাই লর্ড’ বলে সম্বোধন করা হয়। যা ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আধিপত্যকেই ইঙ্গিত করে। এটা তো স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই দিকটাতে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি, শিক্ষিত শ্রেণি কখনোই মনোযোগ দেয়নি। তাই ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়িত হয়নি। নামকাওয়াস্তে রাষ্ট্রভাষা, নামকাওয়াস্তে ভাষা আন্দোলন। একটি জাতিরাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা হয় তার মাতৃভাষা। সেটা শুধু জাতীয় ভাষাই নয়, জীবিকার ভাষাও হয় মাতৃভাষা। যারা শিখছে তাদের দোষ নেই। কেননা তাদের পরিবারের অভিভাবকরা সবাই মিলে প্রতিবাদ করছে না যে, ভাষা আন্দোলনের মূল যে চেতনা তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই ভাষা আন্দোলনের মূল যে চেতনা তার বাস্তবায়ন অধরাই রয়ে গেছে।

দৈনিক বাংলা: ভাষা আন্দোলনের সামগ্রিক কি কি অর্জন আপনার কাছে উপলব্ধ হচ্ছে?

আহমদ রফিক :  আমরা এটা সবাই জানি যে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় একাত্তরে নতুন রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। এরপর দেশ পরিচালনার জন্য বাহাত্তরে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হলো। আমি বলব যে, সেই সংবিধানটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে অনেকটা উদার সংবিধান। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার যে দাবি উঠেছিল তা স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেল বটে, কিন্তু তা কতখানি ক্ষমতায়ন হলো সেটি বিবেচ্য। যদিও ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধানেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকরা।

তবে ভাষা আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশের ‘সূতিকাগার’ বলে এখানকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব অভিহিত করলেও ভাষা আন্দোলনের সব দাবি কার্যকর হয়নি, সংকলিত ও প্রকাশিত হয়নি বহু খণ্ডে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও দলিলপত্র, যেমনটি হয়েছে, অংশত হলেও স্বাধীনতাযুদ্ধের ক্ষেত্রে। তেমনি নির্মিত হয়নি হামিদুর রহমানের নকশা ও নভেরা আহমদের ভাস্কর্যখচিত পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার। এমনকি সংগৃহীত এবং সংকলিত ও প্রকাশিত হয়নি শহীদ মিনারের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, যে শহীদ মিনার ১৯৫২ থেকেই ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে দেশময় ছড়ানো। শহীদ মিনার নির্বাক স্থাপত্য, তাই প্রতিবাদ করার শক্তি তার নেই।

দৈনিক বাংলা: জাতীয় শিক্ষানীতিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, মাদ্রাসাসহ নানা মাধ্যমে বিভক্তি আছে এবং বাংলা ভাষা এখনও উচ্চশিক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে না। আপনার মূল্যায়ন কী?

আহমদ রফিক: আমাদের দেশের শিক্ষায় চরম দুরবস্থা চলছে। ত্রিধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। একদিকে সবচেয়ে উঁচুতে ইংরেজি ভাষার ইংরেজি মাধ্যম, এরপর আরবি ভাষার কওমি মাদ্রাসা আর বাংলায় সাধারণ শিক্ষা। আমরা ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি। এর মাধ্যমে কিছু মানুষের শ্রেণিগত স্বার্থ পূরণ হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় যে আদর্শিক ভিত্তি ছিল তা আজ আর নেই। ইংরেজি মাধ্যম, কিন্ডারগার্টেন, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গাতেই বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই ব্যাপারে সরকার চরম উদাসীন। তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা শুধু নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ পূরণে তৎপর। সে জন্য শিক্ষাব্যবস্থাতেও এত বিভক্তি। আর ইংরেজি মাধ্যমের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের এই অবহেলা স্পষ্ট।

দৈনিক বাংলা: বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশুদের এখনও মাতৃভাষায় ‘প্রাথমিক শিক্ষা’র সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আহমদ রফিক: প্রত্যেক নৃগোষ্ঠীরই নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তাদেরও অধিকার রয়েছে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের। কিন্তু এটা একটা সমস্যাও বটে। কেননা এতগুলো ছোট ছোট ভাষাকে তো আর রাষ্ট্রভাষা করা যায় না। তবে একটা স্তর পর্যন্ত তারা মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করতে পারে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষাটা তারা মাতৃভাষায় সম্পন্ন করতে পারে। তাদের সেই অধিকারের সুযোগ দেয়া উচিত। তাদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা উচিত।

দৈনিক বাংলা: প্রাচীন বাংলা সম্পর্কিত ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চায় এখনও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের মতো এত বড় অনুপ্রেরণা সত্ত্বেও বঙ্গবিদ্যাচর্চার মতো বিষয়টি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে না। এর কী কারণ মনে করেন?

আহমদ রফিক: আমি খুব সংক্ষেপে এটা আলোচনা করতে চাই। এর দুটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, মেধাবী, বিশেষ করে শিক্ষকদের গবেষণায় মনোযোগ নেই। তাদের গবেষণায় আগ্রহ কম। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণে তৎপর। আর রাষ্ট্রও এই ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। দ্বিতীয়ত, আমাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত নই। আমরা এই বিষয়টিকে খুবই অবহেলার চোখে দেখি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও তেমন শক্তিশালী নয়।

ভাষা আন্দোলনে মূলত চারটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ছাত্রদের কেউ আন্দোলন করতে শেখায়নি। সরকারের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ছাত্ররা এই আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। তৃতীয়ত, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত। ছাত্ররাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রাজনীতিবিদরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। আমার লেখা বইতে এই ইতিহাস আছে। চতুর্থত, পুলিশের গুলি চালানো। পুলিশের গুলি চালানোর খবর প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিল