রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে সাতটি কক্ষে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ১৮৪ নম্বর কক্ষে পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে ‘ডাক্তার দেখিয়ে’ বের হন সাদ্দাম হোসাইন ও রোমানা আক্তার দম্পতি। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে আরেকটি রঙিন স্টিকার দিয়েছেন; যাতে একটি কোম্পানির বয়সভেদে ফর্মুলা দুধের (কৌটাজাত গুঁড়া দুধ) নামের পাশে টিক চিহ্ন রয়েছে।
ঘটনাটি এ বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারির। শিশুটির বাবা সাদ্দাম হোসাইন জানান, মেয়ের ওজন কম, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন। শিশুটির মা বলেন, ‘বুকে দুধ আছে, ডাক্তার বলছে বাবুর ওজন কম, কৌটার দুধ খাওয়ালে ভালো হবে।’
দেশে শিশুদের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। সরকারি অনুদানপুষ্ট স্বায়ত্তশাসিত এই হাসপাতালটির সেই কক্ষে ওই দিন রোগী দেখেন দুজন চিকিৎসক। তাদের একজন আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সাইয়্যেদা মাহিনূর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিই না। তবে কর্মজীবী মা অথবা কোনো মা বেশি পীড়াপীড়ি করলে শুরুতে বুকের দুধের জন্য কাউন্সেলিং করি, না মানলে বাধ্য হয়ে ফর্মুলা দুধ দিতে হয়।’
বিদেশি একটি ফর্মুলা দুধের (রিপ্রেজেন্টেটিভ) প্রতিনিধির নির্ধারিত কর্ম-এলাকা এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর। গত পাঁচ বছর ধরে তার প্রাত্যহিক কাজ দুপুর ১২টার পর হাসপাতালটির চিকিৎসকদের ‘সালাম দেয়া’ এবং নার্সসহ অন্য স্টাফদের সঙ্গে ‘হাসি মুখে’ কুশল বিনিময়। তাদের জন্য নানান উপঢৌকনের ব্যবস্থাও করেন তিনি। প্রতিনিধির কাজের ফলাফল হিসেবে হাসপাতাল এলাকায় গত পাঁচ বছরে এই কোম্পানির ফর্মুলা দুধের বিক্রি অন্তত ছয়গুণ বেড়েছে বলে জানান এই প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী জন্মরে প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ার হার ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে তথ্য নিয়ে জরিপটি করা হয়। অথচ নগর স্বাস্থ্য জরপি বলছে, ২০২১ সালে শহর এলাকায় এ হার ৫২ শতাংশের কম।
শিশুর বিকাশের জন্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই।
নগর স্বাস্থ্য জরিপ ২০২১ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের তথ্য ও জরিপ বলছে, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানো গেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়, কমে মৃত্যুঝুঁকি। কিন্তু দেশে জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ছে না। বরং শহর এলাকায় এ হার কমছে। বুকের দুধ খাওয়াতে চান এমন মায়েরা পাচ্ছেন না সঠিক দিকনির্দেশনা। ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ আসে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে।
নিজস্ব অনুসন্ধান এবং জরিপেও ফর্মুলা দুধ ব্যবহারের একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। এতে দেখা যায়, কর্মজীবী মায়েরা বাধ্য হয়ে শিশুকে দেন ফরর্মুলা দুধ। ‘বাচ্চা শুকনা’ বলে আত্মীয়স্বজনের চাপেও দিতে হয়। কোনো কোনো মা অবশ্য ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবে দেন। অনলাইন প্রচারেও বাড়ছে ফর্মুলা দুধের ব্যবহার।
কর্মস্থলে ফিরতে হবে বলে দুই মাস বয়সে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো শুরু করেন রুবানা আহমেদ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত এই কর্মকর্তার কথা, ‘আগেভাগে অভ্যাস না করালে হুট করে ফর্মুলা খাবে না।’ মেয়ে প্রথম ছয় মাসে ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় ভুগেছে। আবার টাঙ্গাইলের মধুপুরের গৃহিণী চায়না আক্তার বলেন, ‘তোলা (গুঁড়া দুধ) খাওয়ালে শিশুর শরীর বাড়ে, তাই জন্মের পরেই দিয়েছি। বাচ্চা মোটাসোটা না হলে শ্বশুরবাড়িতে কথা শুনতে হতো।’ ইউটিউব চ্যানেলে চিকিৎসকদের ভিডিও দেখে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকে ফর্মুলা দিচ্ছেন বলে জানান সাভারের মোহাম্মদ রনি।
জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশু কী খেয়েছে, এ সময়ে শিশুর রোগে ভোগা, ফর্মুলা দুধের পরামর্শ কার কাছ থেকে এসেছেসহ সাতটি প্রশ্ন রেখে ৭০ জন মায়ের মধ্যে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে সরাসরি, অনলাইন, মুঠোফোনে। গ্রাম ও শহরের এই মায়েরা বিভিন্ন বয়সের, নানান পেশার।
সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে)-এর তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ। জরিপটি চালায় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। নিপোর্টের ২০১১ সালের একই জরিপে এ হার ছিল ৬৪ শতাংশ। দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নিপোর্টের ২০২১ সালের নগর স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, এ হার আরও কমে ৫২ শতাংশ হয়েছে।
বুকের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব, চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ আসা, ফর্মুলা দুধের বিপণনব্যবস্থার প্রভাব, কর্মজীবী নারীদের ছুটির ঘাটতি, স্বজনদের চাপ, অনলাইনে প্রচার, জনসমাগমস্থলে/পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণে মূলত মায়েরা ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না।
চিকিৎসকরা দিচ্ছেন ফর্মুলরা পরামর্শ
সকাল ৯টার পর থেকেই ঢাকা শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের ১১, ১২ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদক হাসপাতালটির বহির্বিভাগের সামনে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। এ সময় দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা অথবা মা হন্তদন্ত হয়ে ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত কক্ষে ছুটছেন। কেউ বের হন স্বস্তি নিয়ে, কেউ আরও উদ্বিগ্ন হয়ে। তারা বের হলেই ঘিরে ধরেন ওষুধ কিংবা ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। দেখেন চিকিৎসক তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখেছেন কি না, ফর্মুলা দিয়েছেন কি না। ছবি তোলেন।
এ সময় দেখা যায়, ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকরা আলাদাভাবে একটা রঙিন স্টিকার দেন। এতে বয়স অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পাশে টিক চিহ্ন দেয়া থাকে। ঘণ্টায় কমপক্ষে ১০ জন বাবা-মায়ের কাছে এমন স্টিকার দেখা যায়। তারা জানান, চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন। এতে সন্তানদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কামরাঙ্গীরচর থেকে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন নুরুন নাহার। তিনি বলেন, প্রতিবার ওষুধ খাওয়ানোর আগে চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন।
চিকিৎসকদের সরবরাহ করা ফর্মুলা দুধের বেশ কিছু স্টিকারের ছবি তুলেছেন এই প্রতিবেদক। এতে দেখা যায়, বহির্বিভাগের ১৮৪ ও ১৮৫ নম্বর কক্ষ থেকেই এই স্টিকার এসেছে। এই দুটি কক্ষের টেবিলের ওপরওে প্রকাশ্যেই এই স্টিকার রাখা ছিল। হাসপাতালের নথি বলছে, প্রতিটি কক্ষে দুজন করে চিকিৎসক ছিলেন। তারা সবাই হাসপাতালটির আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
বহির্বিভাগের চিকিৎসক ও আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূর-উজ-জামান বলেন, রোগীর ডায়রিয়া হলে বা আগে থেকে ফর্মুলা দুধ খেলে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেয়া হয়। কিনতে যাতে ভুল না হয়, সে কারণে ব্যবস্থাপত্রে না লিখে স্টিকারে টিক দেয়া হয়। তবে এর বিনিময়ে দুধ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো উপহার বা আর্থিক লাভ নেননি বলে জানান তিনি।
এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর এলাকায় কাজ করেন- এমন তিনজন ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধির (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে তুলনামূলক নতুন কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, ব্যবস্থাপত্রে ফর্মুলা দুধ লেখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই চিকিৎসককে তার কোম্পানি থেকে স্টিকার সরবরাহ করা হয়। অনেক চিকিৎসক আলাদা কাগজেও লিখে দেন। তবে বেশির ভাগ সময় এ পরামর্শ থাকে মৌখিক।
কেন তার কোম্পানির দুধ এই চিকিৎসকরা লিখছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সাড়ে ১২টার পর চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করি। খাওয়ার পানি, কলমসহ টুকটাক উপহারও দিতে হয়।’ এর বাইরে নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা আছে। আয়োজন করতে হয় বৈজ্ঞানিক সেমিনারের। সেখানে চিকিৎসকদের আলোচক হিসেবে রাখতে হয়, দিতে হয় সম্মানী।
ফর্মুলা দুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা দেখতে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি নমুনা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ আছে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও।
ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের যৌথভাবে করা ‘ফর্মুলা দুধের বিপণন কীভাবে শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে’ শীর্ষক জরিপ বলছে, মা হয়েছেন এমন ৯৮ শতাংশ নারীর প্রবল ইচ্ছা ছিল ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর। কিন্তু সঠিক পরামর্শের অভাবে তারা পারেননি। প্রসব-পরবর্তী অবস্থায় শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেয়ার ৬০ শতাংশ পরামর্শ দেন পেশাদার স্বাস্থ্যসেবাদাতারা।
বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ৮ হাজার ৫০০ মা-বাবা, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে জরপিটি করা হয়। জরিপের প্রকাশকাল ২০২২।
হাসপাতালে জন্ম নেয়ারা ফর্মুলা পায় বেশি
নিজস্ব জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশ মা ছয় মাসের আগেই শিশুকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন। সরকারি জরিপেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তথ্য বলছে, ঘরে জন্ম নেয়া শিশুদের তুলনায় হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুরা ফর্মুলা দুধ পায় ২০ শতাংশ বেশি।
স্কুলশিক্ষক সুমি আক্তার সন্তান জন্ম দেন মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতালে। শিশু জন্মের পর কান্নাকাটি করলে চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে বলেন। বাসায় ফিরে চেষ্টা করলেও শিশু আর মায়ের দুধ মুখে নেয়নি। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে শিশু জন্মদানের পর চিকিৎসক ও সেবিকাদের মাধ্যমে একই ধরনের পরামর্শ পেয়েছেন মা রোকেয়া রহমান। তবে এসব পরামর্শ ছিল মৌখিক।
শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশু জন্মের প্রথম তিন দিনে মায়ের বুকে খুব কম পরিমাণে (শাল) দুধ আসে, ২৪ ঘণ্টায় ১ থেকে ২ চা-চামচ। এই দুধকে অপর্যাপ্ত মনে করেন মাসহ স্বজনরা। এ সময়ে পেটব্যথা, গরমসহ নানা কারণে কান্নাকাটি করে শিশুরা। সিজারের মাধ্যমে সন্তান হলে প্রথম দিন অনেক সময় দুধ নামে না। তখন অনেক অভিভাবক ফর্মুলা দুধ দিয়ে দেন। আবার অনেক চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রলোভনের ফাঁদে আটকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেন। হাসপাতালে বিনা মূল্যে দুধের নমুনাও পান মায়েরা।
হাসপাতাল বা বাড়িতে ডেলিভারির সঙ্গে বুকের দুধ পানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গর্ভবতী, প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ছাবিকুন নাহার। তিনি বলেন, সি-সেকশন হলে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে দুধ নামতে কিছুটা দেরি হতে পারে। এ সময় ধৈর্য ধরে সঠিক পজিশনে নিয়ে শিশুকে বারবার খাওয়াতে হবে। এতে দ্রুত অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ হয়ে শিশু দুধ পাবে। শিশু কান্না করলেই ক্ষুধা লাগছে, এ ধারণাও দূর করা জরুরি।
বাধ্য হন কর্মজীবী মায়েরা
গর্ভকালীন অবস্থায় অসুস্থ থাকায় সন্তান জন্মদানের বেশ আগেই ছুটি নিতে হয়েছিল সরকারি কর্মকর্তা সোহানা ইসলামকে। চাকরিতে যোগদান করতে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এ নিয়ে তার অনেক আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘অনেকবার মনে হয়েছে সন্তানকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করছি। কিন্তু চাকরি বাঁচাতে ফর্মুলা দুধ বেছে নিয়েছি।’ একটি স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফরিন শাহনাজও আড়াই মাস বয়স থেকে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়ের বারবার ডায়রিয়া হচ্ছিল, গ্যাসের সমস্যায় ভুগেছে। তবুও ফর্মুলা চালিয়ে গিয়েছি।’ রাত জাগলে সকালে ঠিকভাবে অফিস করতে পারবেন না বলে রাতে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন ব্যাংকার রুমানা সরকার। একই ধরনের কথা বলেন আর কয়েকজন মা।
নিজস্ব জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব মা ছয় মাসের আগেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন, তাদের ৮০ শতাংশ কর্মজীবী। ফর্মুলা দেয়ার পর নানা ধরনের রোগে ভোগার হারও এসব শিশুর বেশি। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরার তাড়া থেকে দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেয়া শুরু করেন বলে জানান মায়েরা। সরকারি জরিপও বলছে, শিশু জন্মের প্রথম মাসে যেখানে ৮৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, শিশুর তিন-চার মাসে সেই হার হয়ে যায় ৪০ শতাংশ। সরকারিভাবে মায়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি দুবার ছয় মাস করে ভোগ করতে পারেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, বেসরকারিভাবে এই ছুটি চার মাস।
মায়েরা আরও বলছেন, এর পাশাপাশি শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য যে যত্ন ও খাবার দরকার, সে ব্যবস্থা নেই অনেক চাকরিজীবী মায়ের। তবে কোনো কোনো মা ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবেও দেন। কর্মস্থলে এবং পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণেও অনেক মা শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেন।
অনলাইন ফর্মুলা দুধের প্রচার
মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে ফর্মুলা দুধের প্রচার জোরেশোরে এখন চলছে অনলাইনে। ফর্মুলা দুধ কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ রয়েছে। চিকিৎসকরাও ইউটিউবে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করেন। মায়েদের বিভিন্ন গ্রুপে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়। এমন গুণগান শুনে অনেক মা-ই ফর্মুলা দুধ দেন। এমন একজন মা হচ্ছেন তাসলিমা আক্তার। তিনি ছেলের বয়স দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেন। দুধ শুরু করার কয়েক দিনের মাথায় হজমের সমস্যা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। পরে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। তাসলিমা বলেন, ‘মনে হয়েছে ছেলের ওজন কম। গুঁড়া দুধ খাওয়ালে ছেলের স্বাস্থ্য ভালো হবে। গ্রুপে পোস্ট করে সবার পরামর্শ নিয়ে দুধ দিয়েছি।’ এ রকম দুটি গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেল ঘেঁটে দেখা যায়, তারা ফর্মুলা দুধসহ শিশুখাদ্য বিক্রি করেন। বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়।
মায়ের দুধ খাওয়ানো নিয়ে কাজ করে জাতিসংঘের এমন একটি সংস্থার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ (নাম না প্রকাশের শর্তে) বলেন, প্রকাশ্য বা অনলাইনে ফর্মুলা দুধের প্রচার নিষিদ্ধ কিন্তু চলছে। শাস্তিযোগ্য এসব ফৌজদারি অপরাধ প্রকাশ্যেই ঘটছে। পর্যবেক্ষণ নেই। শাস্তি হয় না বলেই দিন দিন ফর্মুলা দুধের আগ্রাসন বাড়ছে বলে মন্তব্য এই জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদের।
করণীয় কী
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (ফিল্ড) মাহবুব আরেফীন রেজানুর বলেন, ‘ফর্মুলা দুধের আধিপত্য কমাতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিদ্যমান আইনটি সম্পর্কে অংশীদারদের সচেতনতার কাজ জোরেশোরে চলছে। লোকবলের অভাবে তদারকি করা যাচ্ছে না। তবে কোনো চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ দিচ্ছেন, প্রমাণ পেলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’ এখন পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধে কেউ শাস্তি পেয়েছেন বলে এই কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। যদিও একদল চিকিৎসকের বিদেশ সফর বন্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, গুঁড়া দুধ কোম্পানি অবাধে প্রচার করছে, মায়েরা প্রভাবিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি আইন লঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
হামের উপসর্গ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সকাল আটটা তেকে শুক্রবার (১২ জুন) সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশু মারা গেছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫৩ জনের। শুক্রবার (১২ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৫১ শিশু। নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয় ৯২ শিশুর। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৬৪৩।
প্রতিবেদন বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ২৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৮৪ হাজার ২৬৬।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২৬ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১০ হাজার ১৮৫ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৮ হাজার ৯৩৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৬৫ হাজার ২৭৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে খুলনায় ওই শিশু মারা যায়।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন কয়েকশ রোগী। সেবা দেওয়ার বিধান না থাকায় এসব রোগীকে ছয় হাসপাতালকে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
শুক্রবার (১২ জুন) রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমতাবস্থায় এ হাসপাতাল থেকে রেফার্ডকৃত রোগীদের তাৎক্ষণিক যথাযথ চিকিৎসা প্রদানের জন্য ছয় হাসপাতালকে নির্দেশ দেওয়া হলো।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও ছয় হাসপাতালের তালিকায় রয়েছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) হাসপাতালটির নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে পাঠানো এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ)। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
চিঠিটির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ২ বড় মগবাজার, ঢাকা-এর কারণ দর্শানোর জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সিদ্ধান্ত।’ চিঠিতে বলা হয়, গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন এই হাসপাতালটির ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ৭ জুন বিকেল পাঁচটার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কারণ দর্শানোর সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করলে এই সময়সীমা ৯ জুন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
বিষয়টি উল্লেখ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীকে চিঠিতে বলা হয়েছে, ৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো। এই অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। রবিবার (৭ জুন) সকাল ১১টা থেকে তারা এই কর্মবিরতি শুরু করেন। রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন প্রতিনিধি ডা. তানভীর আহমেদ তৌকির বলেন, “কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে।”রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, “হাসপাতালে ২৬২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন। আজ সকাল থেকে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন।” স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি নোটিশ এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বৃহস্পতিবার (৬ জুন) বাংলাদেশ সম্মিলিত ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে দেশের সব ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করেছেন। সমাবেশে তাদের ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। তারা দাবি করেন, এর আগে বিএমডিসি প্রকাশিত একটি নোটিশের মাধ্যমে তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাকি দাবিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে তারা হতাশা প্রকাশ করেন।এ অবস্থায় সংগঠনটি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, দেশের সব মেডিকেল কলেজের প্রথম থেকে পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বেলা ১১টার পর থেকে ক্লাস বর্জন, সব মিড-লেভেল চিকিৎসকদের চলমান আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কর্মসূচিতে দেশের সব ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালীকরণে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে গত বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পরিদর্শন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার নির্দেশনা জারি করেছে। অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী আদেশে সই করেন।
আদেশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য অধিকতর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা সংখ্যা সীমিত হওয়ায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে উপজেলা পর্যায়েই অধিকসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাবেন এবং জেলা সদর হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শন দল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পরিদর্শন করবে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে অবকাঠামোগত সক্ষমতা, বিদ্যমান ভবন, সম্প্রসারণের সম্ভাবনা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং অতিরিক্ত শয্যা স্থাপনের উপযোগিতা যাচাই করা হবে।
নির্দেশনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) পরিদর্শন দলের সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিদর্শন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, নথিপত্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হলে চিকিৎসাসেবার পরিধি আরও বাড়বে। এতে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, জরুরি চিকিৎসা, মেডিসিন, সার্জারি ও অন্যান্য বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি রোগীদের দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে আসবে।
অফিস আদেশটির অনুলিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ই-মেইলের মাধ্যমেও নির্দেশনাটি জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, রুমে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সচিবালয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালটি কার্যক্রম পরিচালনার উপযুক্ত নয়। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন সুবিধা না থাকা, ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি করা এবং দায়িত্বে চরম অবহেলার বিষয়গুলো তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়ে তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে আগামী রোববার (৭ জুন) সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকার আরও কঠোর হতে যাচ্ছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এর আগে, গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৩ ঘণ্টার মধ্যে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শিশুর স্বজনের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রমনা থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। সেদিন রাতেই মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) জাহিদুল ইসলাম।
রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একই ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঈদের আগ মুহূর্তে এমন ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশু মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর নিকট জমা দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটি আজ তাদের রিপোর্ট জমা দেবে।
এছাড়া আগামীকাল দুপুর ৪টায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল গণমাধ্যমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলেও জানানো হয়েছে।
গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর মৃত এক নবজাতকের স্বজন রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন করে বিভিন্ন অসঙ্গতি পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি কমিটি। পরে তারা ৩ জুন পর্যন্ত সময় চান। এ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইংয়ের উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
এর আগে গত তিন দিন আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তারা সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ওই দিন বিকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েক মাসে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গে মৃতের মোট সংখ্যা বেড়ে ৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার (৩০ মে) সকালে মমেক হাসপাতালের হাম মেডিক্যাল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মৃত শিশুরা হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়াসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজন কিশোরগঞ্জের চৌদ্দশত ইউনিয়নের ৪ মাস বয়সী ছেলে শিশু। গত ২২ মে দিবাগত রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। হামের উপসর্গের পাশাপাশি শিশুটি নিউমোনিয়া, হৃদরোগজনিত জটিলতা ও মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত ছিল। দীর্ঘ কয়েকদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়। অন্য শিশুটি ময়মনসিংহের সদর উপজেলার আকুয়া এলাকার সাড়ে তিন মাস বয়সী এক কন্যা শিশু। মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ মে থেকে সে চিকিৎসাধীন ছিল এবং শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ময়মনসিংহে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৮ জন শিশুকে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে এই বিশেষায়িত ওয়ার্ডে মোট ১১৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশই হামের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট ও মারাত্মক নিউমোনিয়ার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৭ মার্চ থেকে ৩০ মে সকাল পর্যন্ত মমেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট ১ হাজার ৭০৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ১ হাজার ৫৪৯ জন শিশু ছাড়পত্র পেয়ে বাড়িতে ফিরে গেছে। তবে অপুষ্টি ও সঠিক সময়ে টিকা না নেওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে জটিলতা বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। বর্তমানে হাসপাতালে আসা প্রতিটি শিশুর নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, মমেক হাসপাতালে শিশুদের ভিড় বাড়ার সাথে সাথে অভিভাবক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ শিশুদের পরিচ্ছন্ন রাখা এবং যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও জনসচেতনতাই এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পবিত্র ঈদ উল আযহার ছুটির মাঝে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বিএমইউ এর বহির্বিভাগ-১ এবং বহির্বিভাগ-২ এ আজ ২৭ মে বুধবার ২০২৬ইং তারিখ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত খোলা ছিল। এসময় সম্মানিত চিকিৎসকবৃন্দ প্রায় দুইশত (১৯৮) রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। বুধবার চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন সম্মানিত উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ। এসময় বিএমইউর সম্মানিত পরিচালক হাসপাতাল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, সহকারী প্রক্টর ডা. শাহরিয়ার শামস লস্কর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রোগীদের সুবিধার্থে আগামী ৩০ মে শনিবার ২০২৬ইং তারিখে বিএমইউর বহির্বিভাগ খোলা থাকবে। বিএমইউর সম্মানিত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়। আগামী ৩০ মে ২০২৬ইং তারিখের বহির্বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম সফল করার জন্য কে বিএমইউর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রচলিত নিয়মে ইনডোর ও জরুরি বিভাগসমূহ খোলা রয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বিএমইউ এর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে পবিত্র ঈদ উল আযহা উপলক্ষে ঈদের দিন ২৮ মে ২০২৬ইং তারিখ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এই তথ্য জানিয়েছেন বিএমইউর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এর পেশ ইমাম ও খতীব হাফেজ মাওলানা মুফতী আব্দুল আহাদ। উক্ত ঈদের জামাতে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অংশগ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
রোগীদের সুবিধার্থে বিএমইউর বহির্বিভাগ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আগামী ২৭ মে বুধবার এবং ৩০ মে শনিবার ২০২৬ইং তারিখে খোলা থাকবে। বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়। ২৭ ও ৩০ মে বহির্বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম সফল করার জন্য বিএমইউর পরিচালক হাসপাতাল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমানকে বিএমইউর প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে ২৫ মে ২০২৬ইং তারিখ সোমবার থেকে ৩১ মে রবিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে এই সময়ে প্রচলিত নিয়মে ইনডোর ও জরুরি বিভাগসমূহ খোলা থাকবে। এছাড়া ২৭ ও ৩০ মে বহির্বিভাগ খোলা থাকবে।
পবিত্র ঈদুল আযহা ছুটি শেষে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আগামী ১ জুন সোমবার সম্পূর্ণভাবে খুলবে এবং ওইদিন ১ জুন ২০২৬ইং তারিখ সোমবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান উদযাপিত হবে।
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৩ শিশুর। এ রোগ ও উপসর্গে ৫০০ ছাড়িয়েছে মৃত্যু।
শনিবার এ তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২ হাজার ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে।
১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭১ হাজার ১ জন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৮৯ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১ জন এবং সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ১২ জন।
আক্রান্ত এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের মধ্যেও দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। নতুন করে মৃত্যু হয়েছে আরও ১১ শিশুর। এর মধ্যে নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে আর অন্য দুটি হামের উপসর্গ নিয়ে। শুক্রবার (২২ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এতে (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ২৪ ঘণ্টার তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪১৪ শিশু, আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৮৫ শিশু। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯।
নতুন করে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ২৬১ জনের। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১০৪ জন। একই সময়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ হাজার ৭৫ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে এবং বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, সময়মতো চিকিৎসা এবং শিশুদের পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকায় উদ্বেগ: এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের দাবিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দেওয়া স্মারকলিপিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় শিশুর মধ্যে হামের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটির শঙ্কা, অনেক শিশু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে শিশুদের জীবন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় নিয়মিত টিকাদান সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহিলা পরিষদ পাঁচ দফা সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে– হামপ্রবণ ও দুর্গম এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু, মাঠপর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, আক্রান্ত শিশুকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে বুধবার (২০ মে) থাইরয়েড টাস্কফোর্স, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির উদ্যোগে থাইরয়েড সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে থাইরয়েড রোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা (গাইডলাইন) এর শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে এবং বিশ্ব থাইরয়েড দিবস ২০২৬ কে সামনে রেখে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হলো থাইরয়েড স্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিক পুষ্টি।
এসকল আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউ এর মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। মাননীয় উপার্চা তার বক্তব্যে গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে থাইরয়েড রোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা (গাইডলাইন) ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিন প্রাকটিসে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন এবং জন্মের পর নবজাতকের থাইরয়েড পরীক্ষাসহ রোগ নির্ণয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে জানানো হয়, এই নতুন গাইডলাইনটি গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের জটিলতা নিরসনে, অকাল প্রসব, গর্ভপাত, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো এবং সুস্থ সন্তান জন্মদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন আয়োজক চিকিৎসকরা। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য এটি একটি হাতে-কলমে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির (বিইএস) সভাপতি ডা. ফারিয়া আফসানা। বিশেষ অতিথি ছিলেন বারডেম এর পরিচালক (একাডেমী) অধ্যাপক ডা. মোঃ ফারুক পাঠান। মূল বক্তা ছিলেন বিইএস এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ও থাইরয়েড টাস্কফোর্স এর কো-অর্ডিনেটর ডা. শাহজাদা সেলিম, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. এম সাইফুদ্দিন। প্যানেল অব এক্সপার্টস ছিলেন নিনমাস এর পরিচালক ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী, বিএমইউ এর এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ হাসনাত, জেড এইচ সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শেখ জিনাত আরা নাসরীন, কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মোঃ হাফিজুর রহমান। সঞ্চালক ছিলেন থাইরয়েড টাস্কফোর্স ও বিইএস এর সদস্য সচিব ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ।
নিনমাস এর পরিচালক ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী গ্রন্থিটি মানব শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে চারটি সময়ে জন্মের পর-পরই, বয়ঃসন্ধিকালে, মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং বয়স ৫০ হওয়ার পর-পরই অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। অধ্যাপক ডা. বারী আরো বলেন, থাইরয়েড চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতি রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ এর মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা যায়। এক্ষেত্রে কোন কাঁটা ছেড়া ছাড়া শুধু সুইয়ের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা যায়; তাতে রোগীকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন পড়ে না, কিংবা রোগীকে হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন পড়ে না এবং এই পদ্ধতির কোন বড় ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই, খরচও কম হবে । টিউমার অ্যাবলেশনের পদ্ধতি দেশের মানুষের থাইরয়েড সমস্যা ও লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসায় অবদান রাখবে।
সেমিনারে বলা হয়, গলার নিচের অংশে শ্বাসনালীর সামনে অবস্থিত প্রজাপতির আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। এটি প্রধানত দুটি হরমোন নিঃসরণ করে: থাইরক্সিন এফটি৪ এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন এফটি৩। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম), হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথাইরয়েডিজম: গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করলে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, অবসাদ, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। হাইপারথাইরয়েডিজম: বেশি হরমোন তৈরি করলে ধড়ফড়, ওজন কমা, হাত কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম হয়।
থাইরয়েড গ্রন্থিকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যার সঠিক জ্বালানি হলো পুষ্টি। নির্দিষ্ট কিছু খনিজ ও ভিটামিন ছাড়া থাইরয়েড হরমোন তৈরি অসম্ভব। যে উপাদানগুলো জরুরি তা হলো আয়োডিন যেমন আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম। সেলেনিয়াম যেমন ব্রাজিল নাট, টুনা মাছ, মুরগির মাংস, সূর্যমুখীর বীজ। জিঙ্ক যেমন গরুর মাংস, কুমড়ার বীজ, ছোলা, ডাল। আয়রন ও ভিটামিন ডি। আয়রনের অভাবে থাইরয়েড এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাব প্রকট থাকে।
গয়ট্রোজেনিক খাবার নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও সয়াবিনে গয়ট্রোজেন থাকে যা আয়োডিন শোষণে বাধা দেয়। তবে রান্না করলে এসব যাবারের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। খাইরয়েড রোগীরা পরিমিত পরিমাণে রান্না করা এসব সবজি খেতে পারেন। যা এড়িয়ে চলবেন তা হলো ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার (সাদা ময়দা, চিনিযুক্ত পানীয়)। জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম, নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা মৃদু ব্যায়াম ইত্যাদি করা প্রয়োজন।
সেমিনারে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে থাইরয়েড রোগ নিয়ে আরও গবেষণায় উদ্যোগী হওয়ার, রোগীর সঠিক চিকিৎসা প্রদান এবং রোগ প্রতিরোধে ব্যাপকভিত্তিক কর্মযজ্ঞে লিপ্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।