রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে সাতটি কক্ষে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ১৮৪ নম্বর কক্ষে পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে ‘ডাক্তার দেখিয়ে’ বের হন সাদ্দাম হোসাইন ও রোমানা আক্তার দম্পতি। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে আরেকটি রঙিন স্টিকার দিয়েছেন; যাতে একটি কোম্পানির বয়সভেদে ফর্মুলা দুধের (কৌটাজাত গুঁড়া দুধ) নামের পাশে টিক চিহ্ন রয়েছে।
ঘটনাটি এ বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারির। শিশুটির বাবা সাদ্দাম হোসাইন জানান, মেয়ের ওজন কম, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন। শিশুটির মা বলেন, ‘বুকে দুধ আছে, ডাক্তার বলছে বাবুর ওজন কম, কৌটার দুধ খাওয়ালে ভালো হবে।’
দেশে শিশুদের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। সরকারি অনুদানপুষ্ট স্বায়ত্তশাসিত এই হাসপাতালটির সেই কক্ষে ওই দিন রোগী দেখেন দুজন চিকিৎসক। তাদের একজন আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সাইয়্যেদা মাহিনূর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিই না। তবে কর্মজীবী মা অথবা কোনো মা বেশি পীড়াপীড়ি করলে শুরুতে বুকের দুধের জন্য কাউন্সেলিং করি, না মানলে বাধ্য হয়ে ফর্মুলা দুধ দিতে হয়।’
বিদেশি একটি ফর্মুলা দুধের (রিপ্রেজেন্টেটিভ) প্রতিনিধির নির্ধারিত কর্ম-এলাকা এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর। গত পাঁচ বছর ধরে তার প্রাত্যহিক কাজ দুপুর ১২টার পর হাসপাতালটির চিকিৎসকদের ‘সালাম দেয়া’ এবং নার্সসহ অন্য স্টাফদের সঙ্গে ‘হাসি মুখে’ কুশল বিনিময়। তাদের জন্য নানান উপঢৌকনের ব্যবস্থাও করেন তিনি। প্রতিনিধির কাজের ফলাফল হিসেবে হাসপাতাল এলাকায় গত পাঁচ বছরে এই কোম্পানির ফর্মুলা দুধের বিক্রি অন্তত ছয়গুণ বেড়েছে বলে জানান এই প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী জন্মরে প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ার হার ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে তথ্য নিয়ে জরিপটি করা হয়। অথচ নগর স্বাস্থ্য জরপি বলছে, ২০২১ সালে শহর এলাকায় এ হার ৫২ শতাংশের কম।
শিশুর বিকাশের জন্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই।
নগর স্বাস্থ্য জরিপ ২০২১ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের তথ্য ও জরিপ বলছে, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানো গেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়, কমে মৃত্যুঝুঁকি। কিন্তু দেশে জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ছে না। বরং শহর এলাকায় এ হার কমছে। বুকের দুধ খাওয়াতে চান এমন মায়েরা পাচ্ছেন না সঠিক দিকনির্দেশনা। ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ আসে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে।
নিজস্ব অনুসন্ধান এবং জরিপেও ফর্মুলা দুধ ব্যবহারের একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। এতে দেখা যায়, কর্মজীবী মায়েরা বাধ্য হয়ে শিশুকে দেন ফরর্মুলা দুধ। ‘বাচ্চা শুকনা’ বলে আত্মীয়স্বজনের চাপেও দিতে হয়। কোনো কোনো মা অবশ্য ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবে দেন। অনলাইন প্রচারেও বাড়ছে ফর্মুলা দুধের ব্যবহার।
কর্মস্থলে ফিরতে হবে বলে দুই মাস বয়সে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো শুরু করেন রুবানা আহমেদ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত এই কর্মকর্তার কথা, ‘আগেভাগে অভ্যাস না করালে হুট করে ফর্মুলা খাবে না।’ মেয়ে প্রথম ছয় মাসে ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় ভুগেছে। আবার টাঙ্গাইলের মধুপুরের গৃহিণী চায়না আক্তার বলেন, ‘তোলা (গুঁড়া দুধ) খাওয়ালে শিশুর শরীর বাড়ে, তাই জন্মের পরেই দিয়েছি। বাচ্চা মোটাসোটা না হলে শ্বশুরবাড়িতে কথা শুনতে হতো।’ ইউটিউব চ্যানেলে চিকিৎসকদের ভিডিও দেখে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকে ফর্মুলা দিচ্ছেন বলে জানান সাভারের মোহাম্মদ রনি।
জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশু কী খেয়েছে, এ সময়ে শিশুর রোগে ভোগা, ফর্মুলা দুধের পরামর্শ কার কাছ থেকে এসেছেসহ সাতটি প্রশ্ন রেখে ৭০ জন মায়ের মধ্যে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে সরাসরি, অনলাইন, মুঠোফোনে। গ্রাম ও শহরের এই মায়েরা বিভিন্ন বয়সের, নানান পেশার।
সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে)-এর তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ। জরিপটি চালায় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। নিপোর্টের ২০১১ সালের একই জরিপে এ হার ছিল ৬৪ শতাংশ। দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নিপোর্টের ২০২১ সালের নগর স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, এ হার আরও কমে ৫২ শতাংশ হয়েছে।
বুকের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব, চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ আসা, ফর্মুলা দুধের বিপণনব্যবস্থার প্রভাব, কর্মজীবী নারীদের ছুটির ঘাটতি, স্বজনদের চাপ, অনলাইনে প্রচার, জনসমাগমস্থলে/পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণে মূলত মায়েরা ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না।
চিকিৎসকরা দিচ্ছেন ফর্মুলরা পরামর্শ
সকাল ৯টার পর থেকেই ঢাকা শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের ১১, ১২ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদক হাসপাতালটির বহির্বিভাগের সামনে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। এ সময় দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা অথবা মা হন্তদন্ত হয়ে ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত কক্ষে ছুটছেন। কেউ বের হন স্বস্তি নিয়ে, কেউ আরও উদ্বিগ্ন হয়ে। তারা বের হলেই ঘিরে ধরেন ওষুধ কিংবা ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। দেখেন চিকিৎসক তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখেছেন কি না, ফর্মুলা দিয়েছেন কি না। ছবি তোলেন।
এ সময় দেখা যায়, ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকরা আলাদাভাবে একটা রঙিন স্টিকার দেন। এতে বয়স অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পাশে টিক চিহ্ন দেয়া থাকে। ঘণ্টায় কমপক্ষে ১০ জন বাবা-মায়ের কাছে এমন স্টিকার দেখা যায়। তারা জানান, চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন। এতে সন্তানদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কামরাঙ্গীরচর থেকে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন নুরুন নাহার। তিনি বলেন, প্রতিবার ওষুধ খাওয়ানোর আগে চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন।
চিকিৎসকদের সরবরাহ করা ফর্মুলা দুধের বেশ কিছু স্টিকারের ছবি তুলেছেন এই প্রতিবেদক। এতে দেখা যায়, বহির্বিভাগের ১৮৪ ও ১৮৫ নম্বর কক্ষ থেকেই এই স্টিকার এসেছে। এই দুটি কক্ষের টেবিলের ওপরওে প্রকাশ্যেই এই স্টিকার রাখা ছিল। হাসপাতালের নথি বলছে, প্রতিটি কক্ষে দুজন করে চিকিৎসক ছিলেন। তারা সবাই হাসপাতালটির আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
বহির্বিভাগের চিকিৎসক ও আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূর-উজ-জামান বলেন, রোগীর ডায়রিয়া হলে বা আগে থেকে ফর্মুলা দুধ খেলে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেয়া হয়। কিনতে যাতে ভুল না হয়, সে কারণে ব্যবস্থাপত্রে না লিখে স্টিকারে টিক দেয়া হয়। তবে এর বিনিময়ে দুধ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো উপহার বা আর্থিক লাভ নেননি বলে জানান তিনি।
এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর এলাকায় কাজ করেন- এমন তিনজন ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধির (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে তুলনামূলক নতুন কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, ব্যবস্থাপত্রে ফর্মুলা দুধ লেখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই চিকিৎসককে তার কোম্পানি থেকে স্টিকার সরবরাহ করা হয়। অনেক চিকিৎসক আলাদা কাগজেও লিখে দেন। তবে বেশির ভাগ সময় এ পরামর্শ থাকে মৌখিক।
কেন তার কোম্পানির দুধ এই চিকিৎসকরা লিখছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সাড়ে ১২টার পর চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করি। খাওয়ার পানি, কলমসহ টুকটাক উপহারও দিতে হয়।’ এর বাইরে নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা আছে। আয়োজন করতে হয় বৈজ্ঞানিক সেমিনারের। সেখানে চিকিৎসকদের আলোচক হিসেবে রাখতে হয়, দিতে হয় সম্মানী।
ফর্মুলা দুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা দেখতে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি নমুনা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ আছে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও।
ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের যৌথভাবে করা ‘ফর্মুলা দুধের বিপণন কীভাবে শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে’ শীর্ষক জরিপ বলছে, মা হয়েছেন এমন ৯৮ শতাংশ নারীর প্রবল ইচ্ছা ছিল ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর। কিন্তু সঠিক পরামর্শের অভাবে তারা পারেননি। প্রসব-পরবর্তী অবস্থায় শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেয়ার ৬০ শতাংশ পরামর্শ দেন পেশাদার স্বাস্থ্যসেবাদাতারা।
বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ৮ হাজার ৫০০ মা-বাবা, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে জরপিটি করা হয়। জরিপের প্রকাশকাল ২০২২।
হাসপাতালে জন্ম নেয়ারা ফর্মুলা পায় বেশি
নিজস্ব জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশ মা ছয় মাসের আগেই শিশুকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন। সরকারি জরিপেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তথ্য বলছে, ঘরে জন্ম নেয়া শিশুদের তুলনায় হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুরা ফর্মুলা দুধ পায় ২০ শতাংশ বেশি।
স্কুলশিক্ষক সুমি আক্তার সন্তান জন্ম দেন মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতালে। শিশু জন্মের পর কান্নাকাটি করলে চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে বলেন। বাসায় ফিরে চেষ্টা করলেও শিশু আর মায়ের দুধ মুখে নেয়নি। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে শিশু জন্মদানের পর চিকিৎসক ও সেবিকাদের মাধ্যমে একই ধরনের পরামর্শ পেয়েছেন মা রোকেয়া রহমান। তবে এসব পরামর্শ ছিল মৌখিক।
শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশু জন্মের প্রথম তিন দিনে মায়ের বুকে খুব কম পরিমাণে (শাল) দুধ আসে, ২৪ ঘণ্টায় ১ থেকে ২ চা-চামচ। এই দুধকে অপর্যাপ্ত মনে করেন মাসহ স্বজনরা। এ সময়ে পেটব্যথা, গরমসহ নানা কারণে কান্নাকাটি করে শিশুরা। সিজারের মাধ্যমে সন্তান হলে প্রথম দিন অনেক সময় দুধ নামে না। তখন অনেক অভিভাবক ফর্মুলা দুধ দিয়ে দেন। আবার অনেক চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রলোভনের ফাঁদে আটকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেন। হাসপাতালে বিনা মূল্যে দুধের নমুনাও পান মায়েরা।
হাসপাতাল বা বাড়িতে ডেলিভারির সঙ্গে বুকের দুধ পানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গর্ভবতী, প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ছাবিকুন নাহার। তিনি বলেন, সি-সেকশন হলে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে দুধ নামতে কিছুটা দেরি হতে পারে। এ সময় ধৈর্য ধরে সঠিক পজিশনে নিয়ে শিশুকে বারবার খাওয়াতে হবে। এতে দ্রুত অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ হয়ে শিশু দুধ পাবে। শিশু কান্না করলেই ক্ষুধা লাগছে, এ ধারণাও দূর করা জরুরি।
বাধ্য হন কর্মজীবী মায়েরা
গর্ভকালীন অবস্থায় অসুস্থ থাকায় সন্তান জন্মদানের বেশ আগেই ছুটি নিতে হয়েছিল সরকারি কর্মকর্তা সোহানা ইসলামকে। চাকরিতে যোগদান করতে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এ নিয়ে তার অনেক আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘অনেকবার মনে হয়েছে সন্তানকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করছি। কিন্তু চাকরি বাঁচাতে ফর্মুলা দুধ বেছে নিয়েছি।’ একটি স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফরিন শাহনাজও আড়াই মাস বয়স থেকে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়ের বারবার ডায়রিয়া হচ্ছিল, গ্যাসের সমস্যায় ভুগেছে। তবুও ফর্মুলা চালিয়ে গিয়েছি।’ রাত জাগলে সকালে ঠিকভাবে অফিস করতে পারবেন না বলে রাতে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন ব্যাংকার রুমানা সরকার। একই ধরনের কথা বলেন আর কয়েকজন মা।
নিজস্ব জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব মা ছয় মাসের আগেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন, তাদের ৮০ শতাংশ কর্মজীবী। ফর্মুলা দেয়ার পর নানা ধরনের রোগে ভোগার হারও এসব শিশুর বেশি। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরার তাড়া থেকে দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেয়া শুরু করেন বলে জানান মায়েরা। সরকারি জরিপও বলছে, শিশু জন্মের প্রথম মাসে যেখানে ৮৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, শিশুর তিন-চার মাসে সেই হার হয়ে যায় ৪০ শতাংশ। সরকারিভাবে মায়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি দুবার ছয় মাস করে ভোগ করতে পারেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, বেসরকারিভাবে এই ছুটি চার মাস।
মায়েরা আরও বলছেন, এর পাশাপাশি শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য যে যত্ন ও খাবার দরকার, সে ব্যবস্থা নেই অনেক চাকরিজীবী মায়ের। তবে কোনো কোনো মা ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবেও দেন। কর্মস্থলে এবং পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণেও অনেক মা শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেন।
অনলাইন ফর্মুলা দুধের প্রচার
মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে ফর্মুলা দুধের প্রচার জোরেশোরে এখন চলছে অনলাইনে। ফর্মুলা দুধ কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ রয়েছে। চিকিৎসকরাও ইউটিউবে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করেন। মায়েদের বিভিন্ন গ্রুপে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়। এমন গুণগান শুনে অনেক মা-ই ফর্মুলা দুধ দেন। এমন একজন মা হচ্ছেন তাসলিমা আক্তার। তিনি ছেলের বয়স দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেন। দুধ শুরু করার কয়েক দিনের মাথায় হজমের সমস্যা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। পরে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। তাসলিমা বলেন, ‘মনে হয়েছে ছেলের ওজন কম। গুঁড়া দুধ খাওয়ালে ছেলের স্বাস্থ্য ভালো হবে। গ্রুপে পোস্ট করে সবার পরামর্শ নিয়ে দুধ দিয়েছি।’ এ রকম দুটি গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেল ঘেঁটে দেখা যায়, তারা ফর্মুলা দুধসহ শিশুখাদ্য বিক্রি করেন। বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়।
মায়ের দুধ খাওয়ানো নিয়ে কাজ করে জাতিসংঘের এমন একটি সংস্থার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ (নাম না প্রকাশের শর্তে) বলেন, প্রকাশ্য বা অনলাইনে ফর্মুলা দুধের প্রচার নিষিদ্ধ কিন্তু চলছে। শাস্তিযোগ্য এসব ফৌজদারি অপরাধ প্রকাশ্যেই ঘটছে। পর্যবেক্ষণ নেই। শাস্তি হয় না বলেই দিন দিন ফর্মুলা দুধের আগ্রাসন বাড়ছে বলে মন্তব্য এই জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদের।
করণীয় কী
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (ফিল্ড) মাহবুব আরেফীন রেজানুর বলেন, ‘ফর্মুলা দুধের আধিপত্য কমাতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিদ্যমান আইনটি সম্পর্কে অংশীদারদের সচেতনতার কাজ জোরেশোরে চলছে। লোকবলের অভাবে তদারকি করা যাচ্ছে না। তবে কোনো চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ দিচ্ছেন, প্রমাণ পেলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’ এখন পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধে কেউ শাস্তি পেয়েছেন বলে এই কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। যদিও একদল চিকিৎসকের বিদেশ সফর বন্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, গুঁড়া দুধ কোম্পানি অবাধে প্রচার করছে, মায়েরা প্রভাবিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি আইন লঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা সহজ ও সহজলভ্য করতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে ছয়টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ১১টি মেশিন স্থাপন করা হবে। প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবল প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
দেশের ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য ক্যান্সারের চিকিৎসা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির যন্ত্র নষ্ট থাকায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সংকট মোকাবিলায় ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু অর্থের অভাব এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে দরিদ্র মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে এবং আগামী দিনে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা খাতকে শক্তিশালী করতে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে দেশব্যাপী এক বছরব্যাপী জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী নিয়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান শুরু করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এ ক্যাম্পেইন চলবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
কর্মসূচির আওতায় র্যালি, মেলা ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ও পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘দু’টির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালানো হবে। শুধু প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সামগ্রীও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে নানা ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণ করেই দেশে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন এবং ডেঙ্গু পরবর্তী কার্ডিয়াক জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসকদের সজাগ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৫৬ জন। এর মধ্যে ৮৮ হাজার ২৯৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সুস্থ হওয়ার হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সারাদেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে নতুন করে সংক্রমিত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬০ জন রোগী। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বুলেটিনে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির এই হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন মৃত্যুসহ চলতি বছর দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৮১ জনে। মাসভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, একক মাস হিসেবে কেবল সেপ্টেম্বরেই সর্বাধিক ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চলতি অক্টোবরের প্রথম ছয় দিনে ৪২ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে রোগী প্রাণ হারিয়েছেন।
বুলেটিনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগীরা হাসপাতালে আসায় চলতি বছরে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ২১৬ জনে। তবে একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন এবং এ পর্যন্ত সর্বমোট সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ৮৬ হাজার ১৫২ জন। গত এক দিনে বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ৭৩০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি খুলনা বিভাগে ৩৭৬ জন, চট্টগ্রামে ২১৬, বরিশালে ২০০, রাজশাহীতে ১৭৬, ময়মনসিংহে ১১০ এবং রংপুর বিভাগে ৩৮ জন রোগী নতুন করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম এবং এর বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন নিশ্চিতভাবে এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৯০ জন রোগী। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের সার্বিক হাম পরিস্থিতির এই হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারী রোগীদের মধ্যে চারজনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। আলোচ্য সময়ে বিভাগভিত্তিক নতুন রোগী ভর্তির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামে ২৭৩ জন, সিলেটে ১৫২, বরিশালে ১৩৯, খুলনায় ১৩২, ময়মনসিংহে ৮২, রংপুরে ৪৭ এবং রাজশাহী বিভাগে ৩৩ জন রোগী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছেন।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯৩ জনে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২ হাজার ২০ জনের দেহে। এই সময়ে মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৭৩ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং এর উপসর্গ নিয়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে দেশের সব হাসপাতালকে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালটি চালুর বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সোমবার (৬ অক্টোবর) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এসব তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছর ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯০ হাজার ৩৫৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮১ জনের। মৃতদের মধ্যে ১৩২ জন পুরুষ এবং ১৪৫ জন নারী। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
চলতি বছর এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ২৪, চট্টগ্রামে ২৫, খুলনায় ৫৫, ময়মনসিংহে ২৩, রাজশাহীতে ১৯, রংপুরে ছয় এবং সিলেট বিভাগে দুজন মারা গেছেন।
গত রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় রোগীর সংখ্যা ও হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়। সভা শেষে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে কিছু রোগী জাতীয় বার্ন ইউনিটে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালটি চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা আরও বাড়াতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিবর্তে কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ঢাকাতেই বেশি। এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদের শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, সংকটের সময় সরকারি হাসপাতাল রোগী ফিরিয়ে দেয় না। তবে রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের শয্যা সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এই ভোগান্তি কমাতেই ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। তাই আগেভাগেই অতিরিক্ত শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত
অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে হৃদরোগেই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটছে উল্লেখ করে হৃদযন্ত্রের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ বা সতর্কবার্তাকে অবহেলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে "বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬" উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও বাস্তব জীবনে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটান না, যা হৃদরোগের মতো জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। তাই হৃদযন্ত্রের সামান্যতম অস্বস্তি বা সংকেত দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, শুধু হৃদরোগ নয়, সংক্রামক ও অসংক্রামক সব ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সর্বস্তরে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসক সমাজকে অনন্য মানবিক মর্যাদার আসনে স্থান দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সৃষ্টিকর্তার পরেই চিকিৎসকেরা আর্তমানবতার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল এবং করোনা অতিমারি থেকে শুরু করে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে চিকিৎসকেরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হাসান এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আ ন ম মনোয়ারুল কাদির। অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডা. আ ফ খবির উদ্দিন আহমেদ। এর আগে মন্ত্রী সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল বিএমইউ চত্বরে বেলুন উড়িয়ে বিশ্ব হার্ট দিবসের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং বর্ণাঢ্য এক র্যালিতে নেতৃত্ব দেন।
দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট এখন শুধু শূন্য পদের পরিসংখ্যান নয়; এটি চিকিৎসাসেবার বিস্তার, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ৪০ শতাংশের বেশি পদ শূন্য থাকায় প্রায় ৩৫ হাজার পদে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ক্যাডারে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সরকারের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে দেশজুড়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শূন্য পদে নিয়োগের অনুমোদন ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি নিয়োগ সম্পন্ন, কর্মস্থলে পদায়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনবল ধরে রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকলে অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত অধিদপ্তরের অনুমোদিত ১ লাখ ২৭ হাজার ১০১টি পদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ শূন্য ছিল। এই চিত্র স্বাস্থ্য খাতে জনবল পরিকল্পনা ও নিয়োগ কার্যক্রমের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। একই সঙ্গে এটি দেখায়, চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার কারিগরি, সহায়ক ও মাঠপর্যায়ের পদগুলো পূরণেও সমান গুরুত্ব প্রয়োজন।
মাঠপর্যায়ে শূন্য পদ, বাড়ছে কর্মরতদের দায়িত্বের চাপ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল কাঠামোয় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা মাঠপর্যায়ের কর্মীস্বল্পতা। ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডের মোট ৫৬ হাজার ৯০৮টি পদের মধ্যে ২০ হাজার ৯৯৫টি শূন্য। অর্থাৎ, এই গ্রেডগুলোতে প্রায় ৩৭ শতাংশ পদে জনবল নেই। এসব পদে স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা কাজ করেন। টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, রোগ প্রতিরোধ এবং পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ নির্ণয়ে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য সহকারী অখিল উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন স্বাস্থ্য সহকারীর একটি ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও কর্মীসংকটের কারণে অনেককে একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অখিল উদ্দিন এ মাসের শুরুতে বলেছিলেন, স্বাস্থ্য সহকারীরা শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যশিক্ষাসহ অন্য সেবা যথাযথভাবে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই সংকটের প্রভাব বহুমুখী। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সাধারণত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, নির্ধারিত জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে অংশ নেন। তাদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে বিদ্যমান কর্মীদের কাজের পরিধি বাড়ে। এতে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বাড়তি দায়িত্ব সামলানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে অনুমোদিত ২৬ হাজার ২৯৫টি পদের মধ্যে ১৩ হাজার ৯৪৫টি শূন্য। অর্থাৎ, এ স্তরে প্রায় ৫৩ শতাংশ পদেই কর্মী নেই। দুই গ্রেড-গুচ্ছের এই চিত্র দেখায়, জনবল ঘাটতি কেবল একটি নির্দিষ্ট পেশায় সীমাবদ্ধ নয়; স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরেই নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ: চিকিৎসকস্বল্পতা কমাতে সরকার পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এএনএম বজলুর রশীদ জানিয়েছেন, এ নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) গত ২৪ সেপ্টেম্বর ৫১তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৪ হাজার ৭০০ জন সহকারী সার্জন এবং ৩০০ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই নিয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসক মিলিয়ে পাঁচ হাজার পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে প্রায় ৩ হাজার ২০০ চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও সংশ্লিষ্ট গ্রেডগুলোতে ২৪ শতাংশ পদ শূন্য ছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন নিয়োগ চিকিৎসকস্বল্পতা কমানোর আরেকটি পদক্ষেপ হলেও সামগ্রিক ঘাটতি কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে নিয়োগের পরবর্তী অগ্রগতি এবং অন্যান্য শূন্য পদ পূরণের ওপর।
এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসক নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন; অন্যদিকে স্বাস্থ্য সহকারী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মী টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করেন। তাই স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন পেশার কর্মীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য থাকা জরুরি।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক পদায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল নিশ্চিত করা না গেলে নিয়োগের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে। একইভাবে, জনবল কোথায় কতটা প্রয়োজন, কোন প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের ঘাটতি বেশি এবং কোথায় সেবা সম্প্রসারণের চাপ রয়েছে—এসব বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন করা প্রয়োজন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা কাটিয়ে সেবাকেন্দ্রে কর্মী পৌঁছানোই লক্ষ্য: শূন্য পদ পূরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোকে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এএনএম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সভায় সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক (প্রশাসন), বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের কাছে নির্দেশনার অনুলিপি পাঠানো হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোকে শূন্য পদের বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বাজেট বরাদ্দের অভাবে যেসব কার্যালয়ে নিয়োগ আটকে আছে, সেগুলোকে চলতি অর্থবছরের প্রয়োজনীয় তথ্যসহ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। নিয়োগ শেষ হওয়ার পর নতুন করে পদ শূন্য হলে ছাড়পত্র নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। আর অনুমোদন বা ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নতুন করে অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
স্থানীয় ও আইনি জটিলতা, সীমানাসংক্রান্ত সমস্যা, কোটা, প্রবেশপত্রের ভুল কিংবা সিটি করপোরেশন-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কোথাও নিয়োগ আটকে থাকলে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোকে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বলেছেন, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘ফ্রি হার্ট ক্যাম্প’। মহাখালী রাওয়া’র বিপরীতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই ফ্রি হার্ট ক্যাম্পে বিনামূল্যে প্রায় তিন শতাধিক রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসা পরামর্শ দিয়েছেন ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. অমল কুমার চৌধুরী, সিনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিয়াক সার্জারি) ব্রিগে. জেনা. অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, মিনিমালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জন (MICS) ডা. আশরাফুল হক সিয়াম, ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. সানিয়া হক, ডা. এম এ হাসনাত, ডা. সামি নজরুল ইসলাম; কার্ডিওভাসকুলার সার্জন ডা. রোমেনা রহমান; পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট ডা. আব্দুল জাব্বার জীবন; কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সারাবান তাহুরা এবং ডায়াবেটিস, থাইরয়েড এবং হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাসরিন আক্তার তুলি।
একইদিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেডে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীদের জন্য অনুরূপ ‘ফ্রি হার্ট ক্যাম্প’ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিনামূল্যে শতাধিক রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসা পরামর্শ দিয়েছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস-এর কনসালটেন্ট ডা. মো. আশরাফুল আলম সিদ্দিক (হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ)।
এ বিষয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিছক কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের হাসপাতালের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য এবং আমি আশাবাদী সামনেও আমরা অনুরূপ ফ্রি ক্যাম্প এর আয়োজন করব।’
প্রসঙ্গত, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোগীদের জন্য এরকম ফ্রি হেলথ ক্যাম্পের আয়োজন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৫৮ জন। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ২২০ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ৪৩ জন। এছাড়া সেপ্টেম্বরে গত ২৬ দিনে ১২৮ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গুরোগীর মৃত্যু হয়েছে।
এতে জানানো হয়, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২ হাজার ১৫৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৬৯৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড় পেয়েছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৮ হাজার ৬ জন।
বুলেটিনে আরও জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে, ৬৬৪ জন। এর বাইরে খুলনা বিভাগে ৩২৯ জন, বরিশালে ২২৭ জন, চট্টগ্রামে ৩৪৫ জন, ময়মনসিংহে ১৩২ জন, রংপুরে ৭৩ জন এবং রাজশাহীতে ১৭৬ জন।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও নয়টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হামের উপসর্গ এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪১ জন। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ২২৮ জন হামের উপসর্গযুক্ত এবং ১১৩ জন ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামের রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত কোনো রোগীর মৃত্যু না হলেও মারা যাওয়া নয়জন শিশুই উপসর্গজনিত জটিলতার কারণে প্রাণ হারিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ২১২ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩১০ জন রোগী ভর্তি হন এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫১৯ জন। এছাড়া ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে সর্বমোট ৯৯৫ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০১ জন।
সারাদেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৩২ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৪ জনে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে; মাসের গত ২৬ দিনেই মারা গেছেন ১১৭ জন। এর আগে গত আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে রোগী মারা যান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের নিয়ে চলতি বছর দেশজুড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৩৬ জনে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৪২৯ জন, যা নিয়ে এ পর্যন্ত মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৬৬ হাজার ২৫৬ জনে।
বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এছাড়া খুলনা বিভাগে ২৪১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৯ জন, বরিশাল বিভাগে ২০৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১২ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন।
সারাদেশে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনতে আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় দফার বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এই কর্মসূচিতে নিয়মিত টিকাদানের তালিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শনিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর বনানীর কড়াইলে টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬’-এর উদ্বোধন করবেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিসেফ, গ্যাভি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ কারিগরি সহায়তায় গত এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত পরিচালিত প্রথম দফার কার্যক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, যা সফলভাবে শতভাগের বেশি অর্জিত হয়। পরবর্তীতে দুই কোটি ২৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ক্যাম্পেইন চলাকালে দেখা যায় প্রায় ৪৩ লাখ শিশু হামের টিকা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। এদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক বিশেষ মপ-আপ ক্যাম্পেইন চালিয়ে ১৯ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। অবশিষ্ট ২৪ লাখ শিশুর সঙ্গে বিগত তিন মাসে বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া আরও ১০ লাখ নতুন শিশু যুক্ত হয়ে এবারের মোট লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৩৪ লাখ।
টিকার মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের কাছ থেকে অতিরিক্ত আরও ৪৩ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে। এর আগে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে থাকা ১৫ লাখ ডোজসহ বর্তমানে দেশে মোট ৫৮ লাখ ডোজ টিকা প্রস্তুত রয়েছে। প্রচলিত ১০ শতাংশ অপচয় বা সিস্টেম লস বাদ দিলেও প্রায় ৫২ লাখ ডোজ কার্যকর টিকা হাতে থাকবে, যা বর্তমান ৩৪ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে পূরণের পরও সরকারের হাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত মজুত নিশ্চিত করবে।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সময়ে রোগটি ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া কোনো রোগীর মৃত্যুর তথ্য মেলেনি। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম পরিস্থিতি সংক্রান্ত নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুরা ঢাকা, হবিগঞ্জ এবং কুষ্টিয়া জেলার বাসিন্দা ছিল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর সারাদেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৯৮৩ জন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ২০১ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর ফলে দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ জনে।
এ ছাড়া একই সময়ে নতুন করে ৬৪ জনের দেহে সংক্রমণটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ২১ হাজার ১৫ জনে পৌঁছেছে।
দেশের মহাসড়কগুলোর পাশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃতভাবে পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
একই সাথে দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিকস নিশ্চিত করে ২৪টি কেন্দ্রেই পর্যায়ক্রমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে।
গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠকে এসব কেন্দ্র চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠকে, বিদ্যমান ২৪টি ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে নামকরণ করতে হবে এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সাথে আলোচনা করে সড়ক ও মহাসড়কের পাশে খালি জায়গায় প্রকল্পের মাধ্যমে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করা হয়।
এছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে মেশিন, এ্যাম্বুলেন্স ও যন্ত্রপাতির সংস্থান স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হবে বলেও বৈঠকে নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন সময়ে এই ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালু করা হয়।
এর উদ্দেশ্য ছিল আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রাণহানি কমানোই। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকায়, বছরের পর বছর ধরে এসব সেন্টার অব্যবহৃত পড়ে আছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি ও ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু রয়েছে। একটি সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ করে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীর দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
তিন তলা ভবনে ২০ শয্যার আইসিইউ ও ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এমনই একটি কেন্দ্র হলো সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ি ট্রমা সেন্টার। ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের তাৎক্ষণিক সেবা দিতে ২০২০ সালে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়।
ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর গত কোরবানির ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের সেবা দিতে ২১ মে থেকে ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছিল। পরে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব কেন্দ্র অবস্থিত।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল।
এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন নার্সের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও অন্যান্য টেকনিশিয়ান থাকার কথা ছিল।
তবে কোনো কেন্দ্রেই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘মহাসড়কগুলোকে কেন্দ্র করে আমরা চব্বিশটি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। খুব দ্রুতই এগুলোকে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’ হিসেবে রূপান্তর করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এটিকে আমাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার (হেলথ সিস্টেম) একটি টেকসই অংশ হিসেবে পরিচালনা করার লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’ সূত্র: বাসস