রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে সাতটি কক্ষে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ১৮৪ নম্বর কক্ষে পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে ‘ডাক্তার দেখিয়ে’ বের হন সাদ্দাম হোসাইন ও রোমানা আক্তার দম্পতি। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে আরেকটি রঙিন স্টিকার দিয়েছেন; যাতে একটি কোম্পানির বয়সভেদে ফর্মুলা দুধের (কৌটাজাত গুঁড়া দুধ) নামের পাশে টিক চিহ্ন রয়েছে।
ঘটনাটি এ বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারির। শিশুটির বাবা সাদ্দাম হোসাইন জানান, মেয়ের ওজন কম, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন। শিশুটির মা বলেন, ‘বুকে দুধ আছে, ডাক্তার বলছে বাবুর ওজন কম, কৌটার দুধ খাওয়ালে ভালো হবে।’
দেশে শিশুদের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। সরকারি অনুদানপুষ্ট স্বায়ত্তশাসিত এই হাসপাতালটির সেই কক্ষে ওই দিন রোগী দেখেন দুজন চিকিৎসক। তাদের একজন আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সাইয়্যেদা মাহিনূর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিই না। তবে কর্মজীবী মা অথবা কোনো মা বেশি পীড়াপীড়ি করলে শুরুতে বুকের দুধের জন্য কাউন্সেলিং করি, না মানলে বাধ্য হয়ে ফর্মুলা দুধ দিতে হয়।’
বিদেশি একটি ফর্মুলা দুধের (রিপ্রেজেন্টেটিভ) প্রতিনিধির নির্ধারিত কর্ম-এলাকা এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর। গত পাঁচ বছর ধরে তার প্রাত্যহিক কাজ দুপুর ১২টার পর হাসপাতালটির চিকিৎসকদের ‘সালাম দেয়া’ এবং নার্সসহ অন্য স্টাফদের সঙ্গে ‘হাসি মুখে’ কুশল বিনিময়। তাদের জন্য নানান উপঢৌকনের ব্যবস্থাও করেন তিনি। প্রতিনিধির কাজের ফলাফল হিসেবে হাসপাতাল এলাকায় গত পাঁচ বছরে এই কোম্পানির ফর্মুলা দুধের বিক্রি অন্তত ছয়গুণ বেড়েছে বলে জানান এই প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী জন্মরে প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ার হার ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে তথ্য নিয়ে জরিপটি করা হয়। অথচ নগর স্বাস্থ্য জরপি বলছে, ২০২১ সালে শহর এলাকায় এ হার ৫২ শতাংশের কম।
শিশুর বিকাশের জন্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই।
নগর স্বাস্থ্য জরিপ ২০২১ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের তথ্য ও জরিপ বলছে, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানো গেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়, কমে মৃত্যুঝুঁকি। কিন্তু দেশে জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ছে না। বরং শহর এলাকায় এ হার কমছে। বুকের দুধ খাওয়াতে চান এমন মায়েরা পাচ্ছেন না সঠিক দিকনির্দেশনা। ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ আসে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে।
নিজস্ব অনুসন্ধান এবং জরিপেও ফর্মুলা দুধ ব্যবহারের একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। এতে দেখা যায়, কর্মজীবী মায়েরা বাধ্য হয়ে শিশুকে দেন ফরর্মুলা দুধ। ‘বাচ্চা শুকনা’ বলে আত্মীয়স্বজনের চাপেও দিতে হয়। কোনো কোনো মা অবশ্য ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবে দেন। অনলাইন প্রচারেও বাড়ছে ফর্মুলা দুধের ব্যবহার।
কর্মস্থলে ফিরতে হবে বলে দুই মাস বয়সে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো শুরু করেন রুবানা আহমেদ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত এই কর্মকর্তার কথা, ‘আগেভাগে অভ্যাস না করালে হুট করে ফর্মুলা খাবে না।’ মেয়ে প্রথম ছয় মাসে ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় ভুগেছে। আবার টাঙ্গাইলের মধুপুরের গৃহিণী চায়না আক্তার বলেন, ‘তোলা (গুঁড়া দুধ) খাওয়ালে শিশুর শরীর বাড়ে, তাই জন্মের পরেই দিয়েছি। বাচ্চা মোটাসোটা না হলে শ্বশুরবাড়িতে কথা শুনতে হতো।’ ইউটিউব চ্যানেলে চিকিৎসকদের ভিডিও দেখে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকে ফর্মুলা দিচ্ছেন বলে জানান সাভারের মোহাম্মদ রনি।
জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশু কী খেয়েছে, এ সময়ে শিশুর রোগে ভোগা, ফর্মুলা দুধের পরামর্শ কার কাছ থেকে এসেছেসহ সাতটি প্রশ্ন রেখে ৭০ জন মায়ের মধ্যে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে সরাসরি, অনলাইন, মুঠোফোনে। গ্রাম ও শহরের এই মায়েরা বিভিন্ন বয়সের, নানান পেশার।
সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে)-এর তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ। জরিপটি চালায় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। নিপোর্টের ২০১১ সালের একই জরিপে এ হার ছিল ৬৪ শতাংশ। দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নিপোর্টের ২০২১ সালের নগর স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, এ হার আরও কমে ৫২ শতাংশ হয়েছে।
বুকের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব, চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ আসা, ফর্মুলা দুধের বিপণনব্যবস্থার প্রভাব, কর্মজীবী নারীদের ছুটির ঘাটতি, স্বজনদের চাপ, অনলাইনে প্রচার, জনসমাগমস্থলে/পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণে মূলত মায়েরা ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না।
চিকিৎসকরা দিচ্ছেন ফর্মুলরা পরামর্শ
সকাল ৯টার পর থেকেই ঢাকা শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের ১১, ১২ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদক হাসপাতালটির বহির্বিভাগের সামনে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। এ সময় দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা অথবা মা হন্তদন্ত হয়ে ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত কক্ষে ছুটছেন। কেউ বের হন স্বস্তি নিয়ে, কেউ আরও উদ্বিগ্ন হয়ে। তারা বের হলেই ঘিরে ধরেন ওষুধ কিংবা ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। দেখেন চিকিৎসক তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখেছেন কি না, ফর্মুলা দিয়েছেন কি না। ছবি তোলেন।
এ সময় দেখা যায়, ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকরা আলাদাভাবে একটা রঙিন স্টিকার দেন। এতে বয়স অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পাশে টিক চিহ্ন দেয়া থাকে। ঘণ্টায় কমপক্ষে ১০ জন বাবা-মায়ের কাছে এমন স্টিকার দেখা যায়। তারা জানান, চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন। এতে সন্তানদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কামরাঙ্গীরচর থেকে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন নুরুন নাহার। তিনি বলেন, প্রতিবার ওষুধ খাওয়ানোর আগে চিকিৎসক এই দুধ খাওয়াতে বলেছেন।
চিকিৎসকদের সরবরাহ করা ফর্মুলা দুধের বেশ কিছু স্টিকারের ছবি তুলেছেন এই প্রতিবেদক। এতে দেখা যায়, বহির্বিভাগের ১৮৪ ও ১৮৫ নম্বর কক্ষ থেকেই এই স্টিকার এসেছে। এই দুটি কক্ষের টেবিলের ওপরওে প্রকাশ্যেই এই স্টিকার রাখা ছিল। হাসপাতালের নথি বলছে, প্রতিটি কক্ষে দুজন করে চিকিৎসক ছিলেন। তারা সবাই হাসপাতালটির আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
বহির্বিভাগের চিকিৎসক ও আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূর-উজ-জামান বলেন, রোগীর ডায়রিয়া হলে বা আগে থেকে ফর্মুলা দুধ খেলে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেয়া হয়। কিনতে যাতে ভুল না হয়, সে কারণে ব্যবস্থাপত্রে না লিখে স্টিকারে টিক দেয়া হয়। তবে এর বিনিময়ে দুধ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো উপহার বা আর্থিক লাভ নেননি বলে জানান তিনি।
এই হাসপাতালসহ শ্যামলী, মোহাম্মদপুর এলাকায় কাজ করেন- এমন তিনজন ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রতিনিধির (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে তুলনামূলক নতুন কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, ব্যবস্থাপত্রে ফর্মুলা দুধ লেখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই চিকিৎসককে তার কোম্পানি থেকে স্টিকার সরবরাহ করা হয়। অনেক চিকিৎসক আলাদা কাগজেও লিখে দেন। তবে বেশির ভাগ সময় এ পরামর্শ থাকে মৌখিক।
কেন তার কোম্পানির দুধ এই চিকিৎসকরা লিখছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সাড়ে ১২টার পর চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করি। খাওয়ার পানি, কলমসহ টুকটাক উপহারও দিতে হয়।’ এর বাইরে নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা আছে। আয়োজন করতে হয় বৈজ্ঞানিক সেমিনারের। সেখানে চিকিৎসকদের আলোচক হিসেবে রাখতে হয়, দিতে হয় সম্মানী।
ফর্মুলা দুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা দেখতে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি নমুনা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ আছে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও।
ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের যৌথভাবে করা ‘ফর্মুলা দুধের বিপণন কীভাবে শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে’ শীর্ষক জরিপ বলছে, মা হয়েছেন এমন ৯৮ শতাংশ নারীর প্রবল ইচ্ছা ছিল ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর। কিন্তু সঠিক পরামর্শের অভাবে তারা পারেননি। প্রসব-পরবর্তী অবস্থায় শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেয়ার ৬০ শতাংশ পরামর্শ দেন পেশাদার স্বাস্থ্যসেবাদাতারা।
বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ৮ হাজার ৫০০ মা-বাবা, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে জরপিটি করা হয়। জরিপের প্রকাশকাল ২০২২।
হাসপাতালে জন্ম নেয়ারা ফর্মুলা পায় বেশি
নিজস্ব জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশ মা ছয় মাসের আগেই শিশুকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন। সরকারি জরিপেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তথ্য বলছে, ঘরে জন্ম নেয়া শিশুদের তুলনায় হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুরা ফর্মুলা দুধ পায় ২০ শতাংশ বেশি।
স্কুলশিক্ষক সুমি আক্তার সন্তান জন্ম দেন মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতালে। শিশু জন্মের পর কান্নাকাটি করলে চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে বলেন। বাসায় ফিরে চেষ্টা করলেও শিশু আর মায়ের দুধ মুখে নেয়নি। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে শিশু জন্মদানের পর চিকিৎসক ও সেবিকাদের মাধ্যমে একই ধরনের পরামর্শ পেয়েছেন মা রোকেয়া রহমান। তবে এসব পরামর্শ ছিল মৌখিক।
শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশু জন্মের প্রথম তিন দিনে মায়ের বুকে খুব কম পরিমাণে (শাল) দুধ আসে, ২৪ ঘণ্টায় ১ থেকে ২ চা-চামচ। এই দুধকে অপর্যাপ্ত মনে করেন মাসহ স্বজনরা। এ সময়ে পেটব্যথা, গরমসহ নানা কারণে কান্নাকাটি করে শিশুরা। সিজারের মাধ্যমে সন্তান হলে প্রথম দিন অনেক সময় দুধ নামে না। তখন অনেক অভিভাবক ফর্মুলা দুধ দিয়ে দেন। আবার অনেক চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ কোম্পানির প্রলোভনের ফাঁদে আটকে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেন। হাসপাতালে বিনা মূল্যে দুধের নমুনাও পান মায়েরা।
হাসপাতাল বা বাড়িতে ডেলিভারির সঙ্গে বুকের দুধ পানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গর্ভবতী, প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ছাবিকুন নাহার। তিনি বলেন, সি-সেকশন হলে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে দুধ নামতে কিছুটা দেরি হতে পারে। এ সময় ধৈর্য ধরে সঠিক পজিশনে নিয়ে শিশুকে বারবার খাওয়াতে হবে। এতে দ্রুত অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ হয়ে শিশু দুধ পাবে। শিশু কান্না করলেই ক্ষুধা লাগছে, এ ধারণাও দূর করা জরুরি।
বাধ্য হন কর্মজীবী মায়েরা
গর্ভকালীন অবস্থায় অসুস্থ থাকায় সন্তান জন্মদানের বেশ আগেই ছুটি নিতে হয়েছিল সরকারি কর্মকর্তা সোহানা ইসলামকে। চাকরিতে যোগদান করতে ছেলেকে তিন মাস বয়স থেকেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। এ নিয়ে তার অনেক আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘অনেকবার মনে হয়েছে সন্তানকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করছি। কিন্তু চাকরি বাঁচাতে ফর্মুলা দুধ বেছে নিয়েছি।’ একটি স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফরিন শাহনাজও আড়াই মাস বয়স থেকে মেয়েকে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়ের বারবার ডায়রিয়া হচ্ছিল, গ্যাসের সমস্যায় ভুগেছে। তবুও ফর্মুলা চালিয়ে গিয়েছি।’ রাত জাগলে সকালে ঠিকভাবে অফিস করতে পারবেন না বলে রাতে ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন ব্যাংকার রুমানা সরকার। একই ধরনের কথা বলেন আর কয়েকজন মা।
নিজস্ব জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব মা ছয় মাসের আগেই ফর্মুলা দুধ দিয়েছেন, তাদের ৮০ শতাংশ কর্মজীবী। ফর্মুলা দেয়ার পর নানা ধরনের রোগে ভোগার হারও এসব শিশুর বেশি। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরার তাড়া থেকে দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেয়া শুরু করেন বলে জানান মায়েরা। সরকারি জরিপও বলছে, শিশু জন্মের প্রথম মাসে যেখানে ৮৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, শিশুর তিন-চার মাসে সেই হার হয়ে যায় ৪০ শতাংশ। সরকারিভাবে মায়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি দুবার ছয় মাস করে ভোগ করতে পারেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, বেসরকারিভাবে এই ছুটি চার মাস।
মায়েরা আরও বলছেন, এর পাশাপাশি শিশুকে কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য যে যত্ন ও খাবার দরকার, সে ব্যবস্থা নেই অনেক চাকরিজীবী মায়ের। তবে কোনো কোনো মা ফর্মুলা দুধকে পুষ্টিকর ভেবেও দেন। কর্মস্থলে এবং পাবলিক প্লেসে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণেও অনেক মা শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেন।
অনলাইন ফর্মুলা দুধের প্রচার
মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে ফর্মুলা দুধের প্রচার জোরেশোরে এখন চলছে অনলাইনে। ফর্মুলা দুধ কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ রয়েছে। চিকিৎসকরাও ইউটিউবে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করেন। মায়েদের বিভিন্ন গ্রুপে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়। এমন গুণগান শুনে অনেক মা-ই ফর্মুলা দুধ দেন। এমন একজন মা হচ্ছেন তাসলিমা আক্তার। তিনি ছেলের বয়স দুই মাস পার হতেই ফর্মুলা দুধ দেন। দুধ শুরু করার কয়েক দিনের মাথায় হজমের সমস্যা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। পরে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। তাসলিমা বলেন, ‘মনে হয়েছে ছেলের ওজন কম। গুঁড়া দুধ খাওয়ালে ছেলের স্বাস্থ্য ভালো হবে। গ্রুপে পোস্ট করে সবার পরামর্শ নিয়ে দুধ দিয়েছি।’ এ রকম দুটি গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেল ঘেঁটে দেখা যায়, তারা ফর্মুলা দুধসহ শিশুখাদ্য বিক্রি করেন। বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে ফর্মুলা দুধের গুণগান করা হয়।
মায়ের দুধ খাওয়ানো নিয়ে কাজ করে জাতিসংঘের এমন একটি সংস্থার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ (নাম না প্রকাশের শর্তে) বলেন, প্রকাশ্য বা অনলাইনে ফর্মুলা দুধের প্রচার নিষিদ্ধ কিন্তু চলছে। শাস্তিযোগ্য এসব ফৌজদারি অপরাধ প্রকাশ্যেই ঘটছে। পর্যবেক্ষণ নেই। শাস্তি হয় না বলেই দিন দিন ফর্মুলা দুধের আগ্রাসন বাড়ছে বলে মন্তব্য এই জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদের।
করণীয় কী
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (ফিল্ড) মাহবুব আরেফীন রেজানুর বলেন, ‘ফর্মুলা দুধের আধিপত্য কমাতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিদ্যমান আইনটি সম্পর্কে অংশীদারদের সচেতনতার কাজ জোরেশোরে চলছে। লোকবলের অভাবে তদারকি করা যাচ্ছে না। তবে কোনো চিকিৎসক ফর্মুলা দুধ দিচ্ছেন, প্রমাণ পেলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’ এখন পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধে কেউ শাস্তি পেয়েছেন বলে এই কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। যদিও একদল চিকিৎসকের বিদেশ সফর বন্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, গুঁড়া দুধ কোম্পানি অবাধে প্রচার করছে, মায়েরা প্রভাবিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি আইন লঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
মীরসরাই উপজেলায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যক্ষ্মা রোগী। সচেতনতা না বাড়ার কারণে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। গত ৮ বছরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ হাজার ৪২৪ রোগীর যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৬৪ জন। চলতি বছর মারা গেছেন ৭ জন।
মীরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, পুরো বছরকে ৪টি ফেজে ভাগ করে রোগীদের কপ পরীক্ষা করা হয়। জানুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত প্রথম ফেজ, এপ্রিল-জুন মাস পর্যন্ত দ্বিতীয় ফেজ, জুলাই-সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তৃতীয় ফেজ, অক্টোবর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চতুর্থ ফেজ ধরা হয়। ২০১৮ সালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারটি ফেজে প্রায় ১৫ হাজার ব্যক্তির কফ পরীক্ষা করে ৭৮২ রোগীর যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। ওই বছর মারা যায় ৭ জন। ২০১৯ সালে শনাক্ত হয় ৮৫১ জন। মারা যায় ১২ জন। ২০২০ সালে কোভিড করোনা ভাইরাস থাকায় অনেকে ভয়ে ঘর থেকে বের হয়নি। তবুও ওই বছর ৫৬৩ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। মারা যায় ৭ জন। ২০২১ সালে চারটি ফেজে কপ পরীক্ষা করা হয় ৮ হাজার ৬৪১ জনের। রোগী সনাক্ত হয় ৭১৯ জন। এছাড়া ইপি (এস্ট্রা পারমোনালি) রোগী পাওয়া যায় ২৭৪ জন। মারা যায় ৮ জন। ২০২২ সালে প্রায় ১৩ হাজার রোগীকে চারটি ফেজে পরীক্ষা করে ৭১০ জনের শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। ওই বছর মারা যান ২ জন।
২০২৩ সালে চারটি ফেজে কপ পরীক্ষা করা হয় ৯ হাজার ৩’শ ১২ জনের। মাইক্রোস্কোপি জিনএক্সপার্ট পরীক্ষা করা হয় ১ হাজার ২৮২ জনের। রোগী সনাক্ত হয় ৮৫৮ জন। মারা যায় ৮ জন। ২০২৪ সালে চারটি ফেজে কপ পরীক্ষা করা হয় ৪ হাজার ১২ জনের। মাইক্রোস্কোপি জিনএক্সপার্ট পরীক্ষা করা হয় ৩ হাজার ৫৯৮ জনের। রোগী সনাক্ত হয় ৮৬৩ জন। মারা যায় ১৩ জন। ২০২৫ সালে চারটি ফেজে কপ পরীক্ষা করা হয় ৪ হাজার ৮১৫ জনের। মাইক্রোস্কোপি জিনএক্সপার্ট পরীক্ষা করা হয় ২ হাজার ৬৮৪ জনের। রোগী সনাক্ত হয় ৮৪ জন। মারা যায় জন ৭।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, মাইক্রোস্কোপি জিনএক্সপার্ট পরীক্ষার জন্য বেলজিয়াম থেকে একটি মূল্যবান মেশিন আনা হয়েছে। যাতে কোনো প্রকার ত্রুটি ছাড়াই যক্ষ্মা পরীক্ষা করা হয় বিনামূল্যে। অন্যান্য দেশে এ পরীক্ষাটি করতে ৫০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এছাড়া সরকার নির্ধারিত মূল্য দিয়ে উন্নতমানের এক্সরে মেশিনের সাহায্যে এক্সরে সহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে রক্তের সকল ধরণের পরীক্ষা করানো হচ্ছে বর্তমানে। ফলে দ্রুত সময়ে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। যক্ষ্মা ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় একজন থেকে কমপক্ষে ১০ জনের কাছে এ রোগ ছড়াতে পারে।
উপজেলা টিএলসিএ মো. হুমায়ুন কবির জানান, যক্ষ্মা রোগীকে দুই মাস, তিন মাস ও পাঁচ মাস পর পরীক্ষা করা হয়। বেশি জটিল রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা ফৌজদারহাট হাসপাতালে পাঠানো হয়। যক্ষ্মা ধরা পড়ার পর নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে মৃত্যুহার এড়ানো সম্ভব। যক্ষ্মা রোগী যখন ডায়াবেটিক, হৃদরোগ সহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হন তখন মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মো. মিনহাজ উদ্দিন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেয়া হয়। সঠিকভাবে যক্ষ্মা নিরূপন করার জন্য রোগীদের কপ পরীক্ষার পাশাপাশি মাইক্রোস্কোপি জিনএক্সপার্ট পরীক্ষা করা হয়। যেখানে শতভাগ রোগ নির্ণয় সম্ভব। একটানা দুসপ্তাহের বেশী কাশী হলে, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর জর আসা, খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া যক্ষ্মা রোগের অন্যতম লক্ষণ।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এছাড়া এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নিয়মিত সভা, সেমিনার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে আয়োজন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় শীতকালীন ডায়রিয়া রোগের প্রকোপ বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৫-৬জন শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেওয়া তথ্য মতে ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪৪জন শিশু ডায়রিয়ার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের ইনডোরে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এছাড়া বহির্বিভাগে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসা।
সরেজমিনে নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (বিজরুল) গিয়ে দেখা যায়, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালটিতে ডায়রিয়ার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। শীতের শীতল আবহাওয়ায় ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ, দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
১৩ মাস বয়সের শিশু বিভাগে নিয়ে ৪ দিন ধরে নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন বাবা বিপুল। তিনি জানান, দুদিন বার বার পায়খানা করছিলো মেয়ে। প্রথমদিন বাসায় থেকে চিকিৎসা করিয়েছেন মেয়েকে। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ইকবাল মাহমুদ লিটন বলেন, শীতের সময় রোটা ভাইরাসের সংক্রমণে শিশুর ডায়রিয়া বেশি হচ্ছে। এ সময় শিশুদের ঠান্ডা লাগানো যাবে না। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, শীতের সময় খেজুর রস পান করলে নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে। তাই কাঁচা খেজুর রস না খেতে তিনি জনসাধারণকে পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যাললের (বিএমইউ) বহির্বিভাগে আগামী রোববার থেকে চালু হচ্ছে অনলাইনে টিকিটের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা। নতুন ব্যবস্থার ফলে সেবাগ্রহীতা বা শিক্ষার্থীদের আর ব্যাংকে লাইনে দাঁড়িয়ে বিল পরিশোধ করতে হবে না। ঘরে বসেই নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা সম্ভব। এতে বাঁচবে সময়; আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে হাসপাতালের আর্থিক লেনদেন। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন বিএমইউর জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার মজুমদার।
এ বিষয়ে বিএমইউর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, রোগীদের উন্নত ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এটুআই’র সহায়তায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক হবে।
এটুআই প্রকল্প পরিচালক মোহা. আব্দুর রফিক বলেন, একপে গেটওয়ে ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবাসমূহ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। এটি নগদবিহীন ও জনবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এটুআই’র হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম বলেন, নতুন ব্যবস্থার ফলে সেবাগ্রহীতা বা শিক্ষার্থী আর ব্যাংকে লাইনে দাঁড়িয়ে বিল পরিশোধ করতে হবে না। ঘরে বসেই নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা সম্ভব। এতে সময় সাশ্রয় হবে এবং হাসপাতালের আর্থিক লেনদেন আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাসেবা, উচ্চতর মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণায় একটি আস্থার নাম। এই উদ্যোগ দেশের জন্য একটি মাইলফলক। এর মাধ্যমে মূলত রোগীরাই সবচাইতে বেশি উপকৃত হবেন। আগামী দিনে সেবার সকলক্ষেত্রেই এটা চালু করতে পারলে রোগীরা স্বাছন্দ্যে টিকিট কাটা থেকে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।
যেভাবে টিকিট সংগ্রহ ও সেবাগ্রহণ: সংশ্লিষ্টরা জানান, রোগীরা বিএমইউর ওয়েবসাইটে (https://bmu.ac.bd) গিয়ে অনলাইনে পেমেন্ট সম্পন্ন করে ব্যবস্থাপত্রটি (টিকিট) প্রিন্ট করে টিকিটে উল্লেখিত বিভাগ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ নিতে পারবেন।
দেশের বৃহত্তম টার্শিয়ারি কেয়ার সরকারি সংবিধিবদ্ধ বিশেষায়িত শিশু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান 'বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট'-এর বর্তমান পরিচালনা বোর্ডের সফল এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য ‘বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ‘শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষাই আমাদের অঙ্গীকার’—এই মূলনীতিকে সামনে রেখে গত এক বছরে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সংস্কারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি যখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও রোগী সেবা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়, ঠিক তখনই সঠিক দিক নির্দেশনার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বর্তমান পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়। আজ এক বছর পূর্ণ করে এই বোর্ড দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করল। পরিচালনা বোর্ডের সদস্য-সচিব ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ মাহবুবুল হক গত এক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরে জানান, ২০২৪ সালের এপ্রিলে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কার্ডিয়াক আইসিইউ পুনর্নির্মাণ করে তা পুনরায় চালু করা হয়েছে। এছাড়া বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে নতুন কিছু পরীক্ষা যেমন— টর্চ প্যানেল ও ভিটামিন বি-১২ চালুসহ অত্যাধুনিক ডিএনএ ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এই ল্যাবে এখন থ্যালাসেমিয়া ও স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির মতো জটিল রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
বিগত এক বছরে হাসপাতালটিতে জাপানি দূতাবাস, তুর্কি কো-অপারেশন এজেন্সি, রোটারি ক্লাব ও মিতুলী ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ও আধুনিক চিকিৎসাসরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, প্লাজমা স্টোরেজ ফ্রিজার, এ্যাফোরেসিস মেশিন, সিআরআরটি মেশিন এবং আধুনিক ফিজিওথেরাপি যন্ত্রপাতি। এছাড়া ওএসইসিসি (OSECC) এর ইমারজেন্সি, অবজারভেশন ও রেফারেল ইউনিট এবং সার্জিক্যাল আইসিইউ (SICU) সচল করা হয়েছে। রোগীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে বৈকালিক শিফট এবং ছুটির দিনেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে বর্তমান পরিচালনা বোর্ড। প্রথমবারের মতো হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হয়েছে।
বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছেন পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ. কে. এম. আজিজুল হক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন বিশিষ্ট শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ.কে.এম আফজাল মনির। অনুষ্ঠানে পরিচালনা বোর্ডের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ছাড়াও হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি ও সেবার মান বৃদ্ধির সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। মূলত দক্ষ পরিচালনা এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিশু চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করাই এই পরিচালনা বোর্ডের মূল লক্ষ্য।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ছয় দিন এই বিশেষ সতর্কতা বলবৎ থাকবে। নির্বাচনকালীন এই সময়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে জরুরি প্রস্তুতির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক জরুরি নির্দেশনায় সারা দেশের হাসপাতালগুলোকে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন চলাকালীন সম্ভাব্য যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই সময়ে প্রতিটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬টি, বিভাগীয় পর্যায়ে ৪টি, জেলা পর্যায়ে ৩টি, উপজেলা পর্যায়ে ২টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে অন্তত ১টি করে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা স্বাস্থ্য প্রশাসক জনবলের প্রাপ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এসব টিমের সদস্য নির্ধারণ করবেন। একই সঙ্গে সব হাসপাতালে জরুরি বিভাগ ও ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রাখার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগী পরিবহন ও চিকিৎসা সেবা প্রদান সম্ভব হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১০ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা প্রদানে কোনো প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ বাড়লে প্রয়োজনে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বাধ্যতামূলকভাবে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। বিশেষ কোনো কারণে প্রতিষ্ঠান প্রধান ছুটিতে থাকলে যোগ্য কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাঁর নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর অধিদপ্তরকে অবহিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় ও সিভিল সার্জন অফিসগুলোতেও ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম চালু রাখতে বলা হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্যও বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে অধিদপ্তর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনে লজিস্টিক, অ্যাম্বুলেন্স ও জনবল সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো রোগীকে রেফার করার প্রয়োজন হলে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে এবং যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেই কেবল রেফার করা যাবে। নির্দেশনায় আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্বাচনকালীন সময়ে কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান টানা ৭২ ঘণ্টার বেশি বন্ধ রাখা যাবে না। ল্যাব, ক্যাথল্যাব, ডায়ালাইসিস সেন্টার, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই সেন্টারের মতো জরুরি বিভাগগুলো যথারীতি চালু রাখতে হবে। মূলত নির্বাচনের সময় জনসমাগম ও মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন রাখতেই সরকার এই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
শীতকালের সবজি বাজারে ভোজনরসিকদের বিশেষ নজর কাড়ে পুষ্টিগুণে ভরপুর সিমের বিচি। প্রোটিনসমৃদ্ধ এই শস্যটি খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি হজমেও বেশ সহজ। সঠিকভাবে রান্না করতে পারলে সিমের বিচি গরম ভাতের পাতে এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। ভোজনরসিকদের জন্য সিমের বিচি দিয়ে তৈরি চারটি সহজ ও জনপ্রিয় পদের প্রস্তুত প্রণালি এবং রান্নার টিপস তুলে ধরা হলো, যা সহজেই বাড়িতে তৈরি করা সম্ভব।
প্রথমেই আসা যাক সিমের বিচির ঝোলের কথায়। এই পদটি রান্নার জন্য প্রথমে এক কাপ সিমের বিচি সেদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর প্যানে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি ও রসুন ভেজে নিতে হবে। ভাজা মসলার সঙ্গে আদা বাটা, হলুদ, মরিচ ও জিরা গুঁড়া দিয়ে ভালো করে কষাতে হবে। কষানোর সময় একটি টমেটো দিলে ঝোলের স্বাদ ও রং দুটোই বাড়ে। টমেটো নরম হয়ে এলে সেদ্ধ করা সিমের বিচিগুলো মসলায় ছেড়ে দিয়ে অল্প পানি যোগ করে ঢাকনা দিয়ে ৮ থেকে ১০ মিনিট রান্না করতে হবে। নামানোর ঠিক আগে কয়েকটি কাঁচা মরিচ ছড়িয়ে দিলে তরকারিতে চমৎকার ঘ্রাণ যুক্ত হয়।
ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য সিমের বিচির ভর্তা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পদ। এই ভর্তা তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। এক কাপ সেদ্ধ সিমের বিচির সঙ্গে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ, রসুন, খাঁটি সরিষার তেল ও স্বাদমতো লবণ একসঙ্গে ভালো করে মেখে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু ভর্তা। যারা একটু ঝাল পছন্দ করেন, তারা কাঁচা মরিচের বদলে হালকা পোড়া শুকনা মরিচ ব্যবহার করতে পারেন। গরম ভাতের সঙ্গে এই ভর্তার স্বাদ অতুলনীয়।
যাঁরা ডাল খেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য রয়েছে সিমের বিচির ডালের রেসিপি। এটি তৈরির জন্য আধা কাপ মসুর ডালের সঙ্গে আধা কাপ সিমের বিচি মিশিয়ে একসঙ্গে সেদ্ধ করে নিতে হবে। ডাল ও বিচি সেদ্ধ হয়ে গেলে অন্য একটি প্যানে তেল বা ঘি গরম করে তাতে পেঁয়াজ ও রসুন ভেজে বাদামি করতে হবে। এরপর এই ভাজা পেঁয়াজ-রসুন সেদ্ধ করা ডালের মধ্যে ঢেলে বাগার দিতে হবে। সবশেষে লবণ চেখে নামিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে পুষ্টিকর সিমের বিচির ডাল।
চতুর্থ পদটি হলো সিমের বিচি ভাজি। এটি তৈরির জন্য প্যানে তেল গরম করে শুকনা মরিচ ও পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিতে হবে। এরপর এতে এক কাপ সিমের বিচি দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাজতে হবে। ভাজার সময় জিরা গুঁড়া ও লবণ ছিটিয়ে দিতে হবে। বিচিগুলো ভাজা ভাজা হয়ে হালকা খসখসে ভাব এলে চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশন করা যাবে।
রান্নার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞরা কিছু বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। সিমের বিচি নরম রাখার জন্য সেদ্ধ করার সময় শুরুতে লবণ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রান্নার স্বাদ আরও বাড়াতে নামানোর আগে সামান্য সরিষার তেল বা ঘি ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। চাইলে এই সিমের বিচি মাছ বা চিংড়ির সঙ্গে মিশিয়েও রান্না করা যায়, যা খাবারের স্বাদকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক গবেষণায় পেটের পীড়া ও অন্ত্রের সুরক্ষায় ‘কারকুমা বায়োকমফোর্ট’ নামক প্রোবায়োটিক ফুড প্রোডাক্টের উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে। গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সেস-এর সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসাইন উদ্দিন শেখর এবং সভাপতিত্ব করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএসআইআর, বিএসটিআইসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গবেষক, চিকিৎসক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বর্তমান সময়ের কর্মব্যস্ত জীবনধারা ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন। অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক অরুন কুমার মন্ডল গবেষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার ও মানসিক চাপের কারণে মানুষের মধ্যে অ্যাসিডিটি, বদহজম, আইবিএস ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে সিনথেটিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের সতর্কবার্তায় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে ক্যান্সারের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। এই সংকট মোকাবিলায় জাপানি প্রযুক্তিতে আবিষ্কৃত তাপসহিষ্ণু প্রোবায়োটিক ব্যাসিলাস কোয়াগুল্যান্স সাঙ্ক ৭০২৫৮ ব্যবহার করে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে ওবায়দুল হক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, কারকুমা বায়োকমফোর্ট পণ্যটি প্রোবায়োটিক ব্যাসিলাস কোয়াগুল্যান্স এবং প্রিবায়োটিক ফূক্টো-অলিগোস্যাকারাইডের সমন্বয়ে তৈরি। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিষ্কৃত এই বিশেষ প্রোবায়োটিকটি পাকস্থলীর এসিড বা উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট না হয়ে পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত গ্যাস্ট্রিক, বুক জ্বালাপোড়া, পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় ভুগছিলেন, তারা এই পণ্যটি সেবনের ফলে উল্লেখযোগ্য সুফল পেয়েছেন। আইএফএসটি এবং এফটিএনএস বিভাগের পরীক্ষায় পণ্যটিতে কোনো ক্ষতিকর ভারী ধাতু বা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু পাওয়া যায়নি, যা একে সম্পূর্ণ নিরাপদ খাদ্য হিসেবে প্রমাণ করে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. হোসাইন উদ্দিন শেখর তার বক্তব্যে বলেন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলো এখন ওষুধের পরিবর্তে বিশেষায়িত খাদ্যের মাধ্যমে ক্রনিক রোগ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিশিষ্ট পুষ্টিবিজ্ঞানী ড. জেবা মাহমুদ শিশুদের পেটের সমস্যা সমাধানে প্রোবায়োটিকের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ বলেন, উন্নত বিশ্বের আদলে আমাদের দেশেও বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এমন স্বাস্থ্য সহায়ক পণ্য নিয়ে আরও গবেষণা ও কাজ হওয়া প্রয়োজন। গবেষকরা তাদের চূড়ান্ত মতামতে কারকুমা বায়োকমফোর্টকে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার সমাধানে একটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রোবায়োটিক পণ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-তে সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ইং তারিখে ‘থাইরয়েড নোডুল এন্ড ক্যান্সার: আপডেট এন্ড বিয়ন্ড (Thyroid Nodule and Cancer: Update and Beyond)’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সেন্ট্রাল সেমিনারে থাইরয়েড ক্যান্সারের বর্তমান পরিস্থিতি ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বিএমইউর অটোল্যারিংগোলজি হেড এন্ড নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কে এম এম আব্দুস সাত্তার তাঁর উপস্থাপিত ‘প্যারাডিজম শিফট ইন দ্যা সার্জিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অফ থাইরয়েড ক্যান্সার (Paradigm Shift in the Surgical Management of Thyroid Cancer)’ শীর্ষক প্রবন্ধে জানান যে, গত তিন দশকে থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়লেও সঠিক চিকিৎসায় এর অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারের আচরণ বুঝে শুধুমাত্র আক্রান্ত অংশের অপারেশন বা হেমিথাইরয়ডেক্টমি করলেই রোগী দীর্ঘ সময় ভালো থাকেন। তিনি চিকিৎসকদের এই রোগের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ বুঝে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রদানের আহ্বান জানান, যা রোগীর শারীরিক ঝুঁকি ও আর্থিক ব্যয় দুটোই কমিয়ে আনবে।
সেমিনারে থাইরয়েড ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার কথা উল্লেখ করে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানে নিনমাসের পরিচালক ও থাইরয়েড ডিভিশন প্রধান অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল বারী ‘দি থাইরয়েড মিস্ট্রি: ফাইডিংস এন্ড ফিক্সিং নোডুলস (The Thyroid Mystery: Findings and Fixings Nodules)’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার তাঁর বক্তব্যে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ। সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেসার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ মামুন। বর্তমানে জটিল ক্যান্সারেরও বহুমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকায় কোনো ধরনের আতঙ্ক না ছড়িয়ে সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় উক্ত আয়োজনে।
বাংলাদেশে থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নেহাত কম নয় এবং গত তিন দশকে বিশ্বব্যাপী এই রোগের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসার মাধ্যমে বেশিরভাগ থাইরয়েড ক্যান্সার সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব। সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এই তথ্য জানিয়েছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগের ধরন বুঝে চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
বিএমইউর এ ব্লক অডিটোরিয়ামে ‘থাইরয়েড নোডুল এন্ড ক্যান্সার: আপডেট এন্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এই ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএমইউর অটোল্যারিংগোলজি হেড এন্ড নেক সার্জারি বিভাগের শিক্ষক ও হেড নেক সার্জারি ডিভিশনের প্রধান অধ্যাপক ডা. কে এম এম আব্দুস সাত্তার। ‘প্যারাডিজম শিফট ইন দ্যা সার্জিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অফ থাইরয়েড ক্যান্সার’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে, গবেষণায় দেখা গেছে অনেক থাইরয়েড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পুরো গ্ল্যান্ড ফেলে না দিয়ে শুধুমাত্র আক্রান্ত অংশের অপারেশন করলেই (হেমিথাইরয়ডেক্টমি) রোগী দীর্ঘ দিন সুস্থ থাকেন। এছাড়া বেশ কিছু থাইরয়েড ক্যান্সার দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতাবস্থায় থাকে এবং কোনো বড় ঝুঁকি তৈরি করে না। তাই চিকিৎসকদের রোগের আচরণ বা নেচার বুঝে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন, যার ফলে রোগীর শারীরিক ঝুঁকি ও আর্থিক ব্যয় উভয়ই কমানো সম্ভব হয়।
সেমিনারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)-এর পরিচালক ও থাইরয়েড ডিভিশন প্রধান অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল বারী। তার প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘দি থাইরয়েড মিস্ট্রি: ফাইন্ডিংস এন্ড ফিক্সিং নোডুলস’। তিনি থাইরয়েড নোডুল ও এর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে জটিল বা খারাপ প্রকৃতির থাইরয়েড ক্যান্সারের জন্যও দেশে নানা রকম আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে, তাই রোগীদের ভয়ের কিছু নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) তার বক্তব্যে থাইরয়েড ক্যান্সার নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরও গভীর গবেষণার ওপর বিশেষ জোর দেন। সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেসার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন কমিটির মেম্বার সেক্রেটারি ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ মামুন। সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
রক্তচাপ কমানোর প্রসঙ্গ এলেই সাধারণ মানুষ সাধারণত ওষুধ সেবন, লবণের ব্যবহার কমানো কিংবা কঠোর ডায়েট মেনে চলার কথাই ভাবেন। তবে অনেকেই মনে করেন যে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কলা রাখলে প্রাকৃতিকভাবেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। একটি মাত্র ফল শরীরের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটুকু, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা।
চিকিৎসকদের মতে, একটি মাঝারি আকারের কলা খেলে শরীরে প্রায় ৪২০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম প্রবেশ করে। এই খনিজ উপাদানটি রক্তনালির দেয়ালের পেশিকে শিথিল করতে সাহায্য করে, যার ফলে রক্তনালি কিছুটা প্রসারিত হয় এবং রক্ত চলাচল সহজ হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে ভ্যাসোডাইলেশন বলা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র একদিন বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রক্তচাপে বড় কোনো পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়। কলার প্রকৃত সুফল পেতে হলে এটি নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
টানা এক সপ্তাহ নিয়মিত কলা খাওয়ার ফলে শরীর ও কিডনি ধীরে ধীরে পটাশিয়ামের এই নিয়মিত সরবরাহের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এ সময় কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি বের করে দিতে শুরু করে। যেহেতু সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে, তাই এটি কমে গেলে রক্তের পরিমাণও কমে আসে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের ফোলাভাব কমে আসে এবং শরীর কিছুটা হালকা অনুভব হয়, যদিও প্রস্রাবের পরিমাণ সাময়িকভাবে কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে অর্থাৎ এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তচাপের ওপর স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ৩৩টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়মিত পটাশিয়াম গ্রহণের ফলে সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৩ থেকে ৫ পয়েন্ট এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ২ থেকে ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত কমতে পারে। যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সুফল আরও বেশি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া নিয়মিত পটাশিয়াম গ্রহণে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমে, রক্তনালি নমনীয় থাকে, মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
কলা খাওয়া নিয়ে জনমনে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন দিনে একটি কলা খেলেই উচ্চ রক্তচাপ সেরে যাবে অথবা ডায়াবেটিস থাকলে কলা খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। বাস্তবে একটি কলা দৈনিক প্রয়োজনীয় পটাশিয়ামের মাত্র ১০ শতাংশ জোগান দেয়, তাই শুধু কলা খেয়ে রক্তচাপ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত পরিমাণে কলা খেতে পারেন। প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর চর্বির সঙ্গে মিশিয়ে কলা খেলে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি অনেকটাই রোধ করা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক পটাশিয়ামের চাহিদা প্রায় ৩৫০০ থেকে ৪৭০০ মিলিগ্রাম। এই চাহিদা মেটাতে শুধু কলার ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এর জন্য দিনে ৮ থেকে ১০টি কলা খেতে হবে। তাই চিকিৎসকরা প্রতিদিন ১ থেকে ২টি কলা খাওয়ার পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি পালং শাক, মিষ্টি আলু, ডাল, অ্যাভোকাডো, নারকেল পানি ও টমেটোর মতো অন্যান্য পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সুষম খাদ্যই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত এক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ফিটনেস সচেতন মানুষদের মধ্যে প্রোটিন গ্রহণের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই আলোচনায় নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে ফাইবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এখন শরীরচর্চা বা শক্তির উৎসের চেয়ে ওটস, চিয়া সিড, রাজমা কিংবা ছোলার পুষ্টিগুণ নিয়ে চর্চা বেশি হচ্ছে। তবে ফাইবার নিয়ে এই তুমুল আলোচনার মধ্যেও উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত হলেও বাস্তবে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ এই সুপারিশকৃত মাত্রা পূরণ করতে পারছেন। যুক্তরাজ্যের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মানুষ গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১৬ থেকে ১৭ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করছেন, যেখানে নারীদের গ্রহণের হার পুরুষদের তুলনায় আরও কম।
পুষ্টিবিদরা ফাইবারের প্রতি সাধারণ মানুষের এই নতুন আগ্রহকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে ফাইবারকে অনেকটা অবহেলিত পুষ্টি উপাদান হিসেবে গণ্য করা হতো। সাধারণত হজম ও পেটের সমস্যার সঙ্গেই ফাইবারের নাম জড়িয়ে থাকায় এর বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল সীমিত। অন্যদিকে প্রোটিনকে সবসময় শক্তি ও শরীরচর্চার প্রতীক হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতে উঠে এসেছে যে, ফাইবার কেবল অন্ত্রের জন্যই নয়, বরং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গেও ফাইবারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
ফাইবার হলো উদ্ভিদজাত এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট যা মানুষের শরীর পুরোপুরি হজম করতে পারে না। এটি মূলত ফল, সবজি, শস্য, ডাল, বাদাম ও বীজে পাওয়া যায়। একসময় ধারণা ছিল ফাইবার শুধু শরীর থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনে সহায়তা করে, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এর ভূমিকা আরও বিস্তৃত। ফারমেন্টেবল ফাইবার অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায় যা হজম ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য অপরিহার্য। এছাড়া অদ্রবণীয় ফাইবার মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখে এবং কিছু নির্দিষ্ট ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় অন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগের এক যোগসূত্র পাওয়া গেছে, যাকে ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ বলা হয়। ফাইবার অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রেখে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে এবং বয়স্কদের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করে।
বাস্তব জীবনে ফাইবারের উপকারিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ব্রিটেনের ২৪ বছর বয়সী ইয়েশে স্যান্ডার জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক ভালো অনুভব করছেন। কিশোর বয়সে স্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চললেও ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ কাটাতে তিনি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করেন এবং সুফল পান। একইভাবে ২৫ বছর বয়সী ভিকি ওউনস জানিয়েছেন, প্রসেসড খাবারের বদলে ফল, সবজি ও পূর্ণ শস্য বেছে নেওয়ার পর তার ত্বকের উজ্জ্বলতা বেড়েছে এবং তিনি আগের চেয়ে বেশি শক্তি পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন এনেই ফাইবারের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। যেমন সাদা পাউরুটির বদলে পূর্ণ শস্যের পাউরুটি, চিপস বা চকলেটের পরিবর্তে বাদাম ও ফল, সাদা ভাতের বদলে বাদামি চাল এবং নাশতায় হোল গ্রেইন সিরিয়াল বেছে নেওয়া যেতে পারে। প্রোটিনের পর এবার ফাইবার নিয়ে এই সচেতনতা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য পরিবর্তন এনে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মন উভয়ই সুস্থ রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তবে এই সময়ে মশাবাহিত এই রোগে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বছরের প্রথম ১৫ দিনে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১৫ জনে।
বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের তথ্যানুযায়ী, গত এক দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে, যার সংখ্যা আটজন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ছয়জন, ঢাকা বিভাগে পাঁচজন, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে চারজন করে এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আরও চারজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনায় দুজন ও ময়মনসিংহে একজন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ২৮ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫১১ জন।
আক্রান্তদের লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৬২.১ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৯ শতাংশ নারী। উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালে সারাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, যেখানে বছরজুড়ে মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪১৩ জন মানুষ। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস। প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। গ্রামবাংলায় শীতকালীন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত কাঁচা খেজুরের রস পান করাই এই সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ভাইরাসের কোনো কার্যকর টিকা বা ওষুধ না থাকায় আগাম সচেতনতা এবং সতর্কতাই জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নিপাহ একটি জুনোটিক ভাইরাস, যার অর্থ হলো এটি মূলত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা মূত্র দ্বারা দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমেই এই ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এছাড়া বাদুড়ের আধখাওয়া ফল ভক্ষণ থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। আতঙ্কের বিষয় হলো, কেবল প্রাণী থেকেই নয়, মানুষ থেকে মানুষেও এই ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক, বিছানা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে একজন সুস্থ মানুষও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।
নিপাহ ভাইরাসের ভয়াবহতা উল্লেখ করে চিকিৎসকরা জানান, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক, যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণত ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগীর শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও বমি বমি ভাব দেখা দিলেও দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে যদি রোগীর আচরণে অসংলগ্নতা, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা পরিচিতজনকে চিনতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফেলাইটিস দেখা দেয়, যার ফলে রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন বা শ্বাসকষ্টে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।
সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় এই ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এটি শনাক্তকরণের জন্য বায়োসেফটি লেভেল-থ্রি মানের বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের প্রয়োজন হয়, যেখানে রোগীর লালা, থুতু বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা করে রোগ নিশ্চিত করা হয়। এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঁচা খেজুরের রস বা তাড়ি পান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, কাঁচা রসে ভেজানো পিঠা পরিহার করা এবং রস খেতে হলে তা ভালোভাবে ফুটিয়ে বা গুড় বানিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মাটি স্পর্শ করা বা পাখির আধখাওয়া ফল না খাওয়া এবং নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।