ঢাকা মহানগরীর পর দেশে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুরোগী চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজারে। কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত বছরের মতো চলতি বছরেও বছরের প্রথম মাসে রোগীর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তাতে কক্সবাজার জেলা হতে চলেছে ডেঙ্গুর হটস্পট। আর কক্সবাজারে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থাপনা কঠিন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে সচেতনতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাদের কালচার আলাদা হওয়ায় এ ব্যাপারে কাজও সেভাবে করা যায় না। আর কক্সবাজারে বাংলাদেশিদের মধ্যে ডেঙ্গুতে শনাক্ত হয়েছেন ৪২৬ জন। অর্থাৎ কক্সবাজারে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ঢাকার চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে সাধারণত জুন থেকে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হয়, কারণ এ সময়ে শুরু হয় বর্ষাকাল। এই প্রাদুর্ভাব চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ বছর মৌসুম শুরুর আগেই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৭০৪ জন। তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রোগীর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনকার তথ্যে অর্ন্তভুক্ত হয় না। প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত বা মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়, সেখানেও রোহিঙ্গাদের তথ্য থাকে না। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নাজমুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রোহিঙ্গা কমিউনিটি যেহেতু আমাদের নাগরিক নয়, তাদের তথ্য আমরা একসঙ্গে আনি না। তবে যেহেতু তারা আমাদের সঙ্গেই থাকে, জাতিসংঘও তাদের তথ্যটা চায়, সেহেতু গুরুত্ব দিয়েই আমরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করি এবং আলাদাভাবে হিসাব করি।
অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যা পরিস্থিতি, তাতে সেখানে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ‘কঠিন’ । সেইসঙ্গে কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। সেখানকার স্থানীয় মানুষদের মধ্যে ছড়ানো এই সংখ্যাটাও উপেক্ষা করার মত নয়।
নাজমুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় ওয়াসার পানি সঠিক ব্যবস্থাপনায় ধরে রাখা গেলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পানি সরবরাহের ব্যবস্থা খুব কম। ফলে তারা বিভিন্ন গর্ত থেকে পানি সংগ্রহ এবং অনেক সময় পানি খোলা পাত্রে রেখে দেয়। এ ছাড়া তাদের সচেতনতার বিষয়টি আরও কম। যার কারণে সেখানে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি।
‘ঢাকায় জনগোষ্ঠী বেশি হলেও সেখানে জায়গা রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জায়গা কম মানুষ বেশি। ফলে সেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত সেখানে এক হাজার ৬৬ জনের দেহে জ্বরটি শনাক্ত হয়েছে’, যোগ করেন নাজমুল ইসলাম।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় যেখানে ঘনবসতি বেশি সেখানে মশার উপদ্রব বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে কোন এলাকায় সবচেয়ে বেশি সেটি বলা এই মুহূর্তে কঠিন। রোগীদের তথ্য যাচাই করে তারপর বলা যাবে। আমরা পুরো ঢাকা শহরকেই বিবেচনায় নিচ্ছি। আমাদের কাজ রোগী ব্যবস্থাপনা। ডেঙ্গু কোথায় বেশি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের।
মৌসুমের আগেই ডেঙ্গু রোগী বাড়ার কারণে ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংবাদ সম্মেলনে ফের তার পুনরাবৃত্তি হয়। ডেঙ্গু বাড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জনঘনত্বের মত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় সেখানে।
সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, বাংলাদেশ অনেক জনবহুল, তার ওপর এখানে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। ফলে এখানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। এরই মাঝে অপ্রত্যাশিত কিছু মৃত্যু হয়েছে। মে মাসে যেটুকু হয়েছে, তা অন্যান্য সময়ে হয়নি।
সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এরই মাঝে সিটি করপোরেশনগুলোকে জানিয়েছি, খুব দ্রুত যদি মশার স্থানান্তর নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ হয়। আমরা তাদের ম্যাপিং করে জানিয়ে দেই, কোথায় বেশি ছড়াচ্ছে।
‘তাদের জায়গা থেকে আরেকটু বেশি অ্যাক্টিভ হতে হবে। যেহেতু আমরা জানিয়ে দিচ্ছি, কোথায় কী হচ্ছে, তাই তাদের উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ, লার্ভা ধ্বংসসহ তারা যেসব ব্যবস্থা নেন, সেগুলোর মাধ্যমে যেন আমরা ভেক্টরটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি’, বলেন আহমেদুল কবির।
ডেঙ্গু চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরির সঙ্গে যুক্ত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কাজী তারিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রশাসনের কেন্দ্র থেকে শুরু করে সবার অংশগ্রহণ জরুরি। ২০০০ সালে এটা বাংলাদেশে আসার পর মাঝে পরিস্থিতি ভালো গেছে, কোভিডের আগের বছর আমরা একটা বড় সংক্রমণ দেখেছি, গত বছর দেখলাম, আর এবার আমরা অনুমান করছি, এবারও হয়তো এমন কিছু একটা হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ছাড়া মে মাসে এখন পর্যন্ত ৭৬৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। এ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে দুইজনের।
রোগী জটিলতার ব্যাপারে অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরী গড়ে উঠছে। ঠিক ব্রাজিলের মতই। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই আমরা প্লাটিলেটকে সামনে আনি। অথচ এটি সেভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের উচিত সচেতনতায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া।
ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, জানুয়ারি মাসের পর থেকে আমাদের অনেক গরম পড়েছে। বিজ্ঞান বলে, কোনো জিওগ্রাফিতে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে তার ডাবল পরিমাণ ডেঙ্গু কেইস চলে আসে। তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেল যখন তখন বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি কত ছিল তা দেখে কিন্তু অনুমান করা হয়েছে, প্রাক-মৌসুমেই ডেঙ্গু কেইস বেশি হবে।
সরকারি হাসপাতালে ১০০, বেসরকারিতে ৫০০ টাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষা
এদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষায় ৫০০ টাকার বেশি নেয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির। আর সরকারি হাসপাতালে নিতে হবে ১০০ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরীক্ষাসহ ডেঙ্গু চিকিৎসায় আমরা সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন করে দিয়েছি। এ গাইডলাইন অনুযায়ীই সবাইকে চিকিৎসা দিতে হবে। প্লাটিলেট ব্যবহার নিয়েও গাইডলাইনে নির্দেশনা রয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালে শনাক্ত ডেঙ্গু রোগীদের হিসাবের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যাপারে ‘অগ্রগতি হয়েছে’ বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ডা. আহমেদুল কবির বলেন, সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি বেড়ে গেলে করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে প্রতিটি হাসপাতালকে নির্দেশনা দেয়া আছে। রোগী বাড়লে অতিরিক্ত আবাসিক চিকিৎসক এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দিতে হবে, যেন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত না হয়।
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত মশারির ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ঢাকার কোন অংশে রোগী বেশি জানতে চাইলে অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বেশিরভাগ হাসপাতাল দক্ষিণে, উত্তর থেকে যদি কোনো রোগী দক্ষিণের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন, তাহলে সঠিক উপাত্ত নিয়ে আসা কঠিন। তবে আমরা বিষয়টি নিয়ে আরও কাজ করবো। কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে আপনাদের জানানো হবে।
প্লাটিলেটের চেয়ে ডেঙ্গু রোগীর জন্য বেশি দরকার ফ্লুইড
অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন ডেঙ্গুর একটি ভুল ধারণা নিয়ে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের একটি ভুল ধারণা রয়েছে। ডেঙ্গু হলেই আমরা প্লাটিলেটের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে যাই। কিন্তু ডেঙ্গু আসলে প্লাটিলেট ডিজঅর্ডার নয়, এক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হতে পারে প্লাজমা লিকেজ। এককথায় বলতে গেলে ডেঙ্গুতে প্লাটিলেটের কোনো ভূমিকা নেই। প্লাটিলেটের চেয়ে ডেঙ্গু রোগীর জন্য বেশি দরকার ফ্লুইড।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। ডেঙ্গুতে শট হতে পারে, ডেঙ্গুতে হেমারেজ হতে পারে। এমনকি অর্গান ইনভলমেন্টও হতে পারে, যা শরীরের বিভিন্ন অর্গানকে ইনভলব করে ফেলে। এটি হলো সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায়। এই অবস্থায় আসা রোগীদের বাঁচানো অনেক কঠিন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৫০ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৫৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১ জন, খুলনা বিভাগে ৭০ জন, বরিশালে বিভাগে ৯৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪ জন রয়েছেন।
এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৩২৩ জন। ৭ হাজার ৫৭০ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৭২৮ জন চিকিৎসাধীন আছেন।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হাম ও এর উপসর্গজনিত প্রাদুর্ভাবে গত ১১৭ দিনে সারা দেশে মোট ৭৫০ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন থেকে শুক্রবার এই আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়া কারও মৃত্যু না হলেও ৩ জন মারা গেছে হামের উপসর্গে।
একই সময়ে নতুন করে ১২৮ জনের শরীরে রোগটি নিশ্চিতভাবে ধরা পড়েছে এবং হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে আরও ৯০১ জনের। প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৯৯ জন শিশু হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা হচ্ছে।
দেশে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৪১টি শিশু মারা গেছে। সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১০৬টি শিশু।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬৪৮টি শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৭৪১টি শিশু মারা গেছে।
বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৯টি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৯৪৭। এই সময়ে ৮৯০টি শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯৪০টি শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৭৯১। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৮৯ হাজার ৭৩৪ রোগী, যাদের মধ্যে ৮৬ হাজার ৬২ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
দেশের প্রতিটি প্রসূতি মায়ের নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে দেশের সকল বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালকে আগামী ১১ জুলাইয়ের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর বিজয়নগরে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। মন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেবার রুম স্থাপনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। নরমাল ডেলিভারি উৎসাহিত করতে এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ের ক্লিনিকগুলোর জন্য এটি একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে মিডওয়াইফারি কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই স্বাস্থ্য খাতে আসন্ন ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের মধ্যে ৮০ হাজারই হবে নারী এবং তাঁদের অধিকাংশই হবেন মিডওয়াইফারি কর্মী। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, গত দুই মাস ধরে উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে মশার লার্ভা ধ্বংস করার প্রয়োজনীয় ট্যাবলেট সরবরাহ করা হবে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও মোবাইল সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ওষুধের সরবরাহ নিয়ে মন্ত্রী বলেন, "কিছুদিন স্যালাইনের ঘাটতি থাকলেও এখন পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।" চিকিৎসকদের প্রতি বিশেষ নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, রোগীর জ্বর কমে গেলেও চিকিৎসকের চূড়ান্ত সন্তুষ্টি ছাড়া কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতা মোকাবিলায় নিবিড় নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো এবং সরকার হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে দ্রুত এই সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সারাদেশে গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে নতুন করে ১ হাজার ১০৭ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৯৬৮ জন সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত এই সম্ভাব্য রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬১ জনে। এর মধ্যে শেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১২ হাজার ৪২৫ জনে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত সময়কালে সন্দেহজনক হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৭ হাজার ২৬২ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৩ হাজার ৫৪৩ জন।
মৃত্যুর হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ৬৩৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, তবে ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৩ জন।
সারাদেশে গত সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত সন্দেহে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১১৪ জন। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, বর্ণিত গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হিসেবে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮৬৬ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হিসেবে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ৭৭ জন। নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১৪ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৯৬৫ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাম আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৪ হাজার ৬২৭ জন। একই সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৮০ হাজার ৯৭৪ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত সন্দেহে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ৬২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারো মৃত্যু হয়নি এবং গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগে বাড়ছে এইডস (এইচআইভি) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ৬ বছরে বিভাগের আট জেলায় ৭৯৪ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই শনাক্ত হয়েছে ১৩৯ জন, যাদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বিষয়টি নিয়ে তাদের কার্যক্রম চলছে।
২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১৩৯ জন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৯২ জন সমকামী, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৬ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৪। জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে সিরাজগঞ্জ, এরপরই রাজশাহীর অবস্থান। আর সবচেয়ে কম আক্রান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
রামেকে কর্মরত এইডস সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইব্রাহিম মোহাম্মদ শারৎ বলেন, ‘প্রতিদিন এই সংখ্যা বাড়ছে। এখানে দুটি বিষয় কাজ করছে। একটা হলো, এরা আগে থেকেই পজিটিভ (আক্রান্ত) ছিল কিন্তু পরীক্ষা করতে আসত না। মনে করত, পরীক্ষা করার পর চিকিৎসা নেই। এর ফলে সংক্রমণটা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) চিকিৎসক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘অবাধে মেলামেশা, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন বা সিরিঞ্জের মাধ্যমে এবং মাদকসেবীদের মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। রাজশাহী বিভাগেও সারা দেশের মতো আমাদের এইডস স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু আছে।’
সারা দেশে হামের উপস্বর্গ নিয়ে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরও ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই সময়ের মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে কারো মৃত্যু হয়নি। শুক্রবার (২৬ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জারি করা এক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়েছে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দিনে সারা দেশে নতুন করে ৮৬৯ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০৭ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত মোট ৮১ হাজার ২৮৩ জন মানুষ সন্দেহজনক হাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা শেষে ৭৭ হাজার ৬১৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
তবে মৃত্যুর হার নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সারা দেশে সন্দেহজনক হামে মোট ৬০৯ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৯৩ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরাসরি হামকে দায়ী করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের এই বিস্তার রোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।
সারাদেশে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ২৮ জুন। এবারের ক্যাম্পেইনে দেশের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত এ তথ্য জানান।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে একযোগে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন চলবে। কোনো শিশু যদি ওইদিন বাদ পড়ে, পরদিনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে ক্যাপসুল খাওয়ানো যাবে। এ ছাড়া ১২টি জেলার ৫৮টি দুর্গম উপজেলায় ক্যাম্পেইনের পরের চার দিন এই ক্যাপসুল বিতরণ করা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাতকানা রোগসহ শিশু অন্ধত্বের বড় কারণ ভিটামিন ‘এ’-র অভাব। এই অভাব দূর করতে ক্যাম্পেইনে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সি শিশুদের একটি করে নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের একটি করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি তুলে ধরে ড. মুহিত বলেন, ‘শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানোর জন্য দেশজুড়ে ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী কেন্দ্রের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে ৫০০টি অস্থায়ী কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রাতকানা রোগ থেকে শুরু করে শিশু অন্ধত্বের একটা প্রধান কারণ হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’-র অভাব। বাংলাদেশে দুই দশক আগেও অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুদের অন্ধ হয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা যেত। তবে নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ চালু হওয়ার পর এই হার অত্যন্ত দ্রুত কমে এসেছে।’
তীব্র বা জটিল অসুস্থতা ছাড়া সব শিশুই এই ক্যাপসুল খেতে পারবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খালি পেটে শিশুকে ক্যাপসুল না খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দেশে মঙ্গলবার হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৫টি শিশু। মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৫৯৩টি শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৬৮৬টি শিশু মারা গেছে।
এছাড়া, ২৪ ঘণ্টায় ১২৬টি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১,০০৯ জন। এসময়ে ৯৭৩টি শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯৮৬টি শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবারপর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৭৬৪, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ২৯৭। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৭৮ হাজার ৭১৬ রোগী, যাদের মধ্যে ৭৪ হাজার ৯৭১ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভা মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন।
সভায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সভায় বক্তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এখন থেকেই সমন্বিত ও জোরালো প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি। জাতীয় কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াসা, এলজিইডি, ডিপিএইচই, রাজউক এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করতে সম্প্রতি জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি অর্জনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
দেশজুড়ে গত শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৩ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগেই আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৬৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১ হাজার একজনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত মোট ৯২ হাজার ৭৯০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১১ হাজার ১১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৬ হাজার ৮৫৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৭২ হাজার ৮৪৯ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।
সারাদেশে এডিস মশাবাহী রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত মশাবাহিত রোগটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ২২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ডেঙ্গুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুরোগী (৫৪ জন) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এছাড়াও গত একদিনে খুলনা বিভাগে ৫২ জন ছাড়াও ঢাকা বিভাগে ৪৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৯ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ জন, সিলেট বিভাগে ৪ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে রোববার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৯ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু (৩ জন) হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ছাড়াও বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে মোট ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।