রোগ সারাতে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধপথ্য সেবন করেন রোগীরা। অসুখ সারবে বলে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু সেই ওষুধ এখন রোগ সারানোর বদলে উল্টো যেন চেপে ধরছে রোগীদের। ওষুধের বাড়তি খরচই তুলছে তাদের নাভিশ্বাস। বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের মাত্র একটি ওষুধেই রোগীদের পকেট থেকে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে বছরে ৩ হাজার ৪৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর ডায়াবেটিসের একটি ওষুধে বছরে রোগীদের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৮২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। দুটি ওষুধে রোগীদের মোট বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ২০২২ সালের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ। এ অসুস্থতায় ভোগা একজনকে দিনে একটি করে এনজিলক খেতে হয়। গত বছরে দাম বাড়ার আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের জুনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দাম বাড়ানোর আগে এর দাম ছিল ৮ টাকা (১০টির এক পাতা ৮০ টাকা)। এখন প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম ১০ টাকা। মানে এক পাতা ১০০ টাকা। মাসে একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীর খরচ বেড়েছে ৬০ টাকা। এই হিসাবে ৪ কোটি ৮২ লাখ রোগীর মাসে বাড়তি খরচ ২৮৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। বছরে ৩ হাজার ৪৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২১ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী ১ কোটি ৩১ লাখ। যদিও ২০২২ সালে বারডেম জানায়, দেশের জনসংখ্যার ২৫ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ চার কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। চিকিৎসকদের ভাষ্যে, ডায়াবেটিস রোগীদের ৬১ শতাংশই জানেন না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ফলে ধরে নেয়া যায়, ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত জেনে ওষুধ খাচ্ছেন।
ডায়াবেটিসের রোগীরা লিনাগ্লিপ নামে একটি ওষুধ সেবন করেন। ২০২২ সালের জুনের আগে এর একটির দাম ছিল ৬০ টাকা (এক পাতা বা ১০টি ট্যাবলেট ৬০০ টাকা)। এখন একটি ট্যাবলেটের দাম ৬৬ টাকা; এক পাতা ওষুধ ৬৬০ টাকা। মাসে এই একটি ওষুধের জন্য রোগীর খরচ বেড়েছে ১৮০ টাকা। বছরে ২ হাজার ১৬০ টাকা। অর্থাৎ বছরে দেশের ডায়াবেটিস রোগীদের মাত্র একটি ওষুধের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে ২ হাজার ৮২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমীন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘ওষুধের দাম বাড়ার কারণে সব রোগীই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ক্রনিক ডিজিজ অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগের মতো অসুখে আক্রান্ত রোগীর খরচ অনেক বেশি বেড়ে গেছে। তাদের সারা জীবন এসব ওষুধ কিনে খেতে হবে।’
যদিও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজার মতে, সংকট এবং কাঁচামালের দাম বাড়া সত্ত্বেও ওষুধের দাম সেভাবে বাড়েনি। তিনি বলেন, ‘ডলারের সংকট, ওষুধের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেভাবে ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি। বরং অনেক ওষুধের দাম কমেছে, সেসব নিয়ে কথা হচ্ছে না।’
চিকিৎসা খরচের ৬৪ শতাংশই ওষুধে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বলছে, দেশে একজন মানুষের মোট চিকিৎসা খরচ যত হয়, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে ওষুধ কেনার পেছনে। গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যে রোগীর সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ওষুধের পেছনে; ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ। যার কারণে মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্র হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জনগণের এই ওষুধের খরচের পেছনে বিভিন্ন দেশে সরকারের প্রচুর ভর্তুকি থাকলেও এ দেশে তা তুলনামূলক খুবই কম। ৩০ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজারে সরকার খরচ করে ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই খরচ করতে হয় ব্যক্তিকে নিজের পকেট থেকে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর অন্যতম লক্ষ্য পয়সার অভাবে যেন কেউ চিকিৎসাবঞ্চিত না হয়। কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে, তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘২০১৬ সালে করা স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে বছরে ৮৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এখন এই সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে হচ্ছে। এসব মানুষকে সংসারের অন্যান্য খাতের খরচ কমিয়ে চিকিৎসায় সে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।’
সাধারণ ওষুধের হালচাল
দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধের অন্যতম নাপা সিরাপ। জ্বর, সর্দি, শরীর ও মাথাব্যথায় শিশুদের জন্য এর বিকল্প কম। ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত এই নাপা সিরাপের দাম ছিল ১৮ টাকা। ২০২২ সালের ৩০ জুন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এ সিরাপের দাম নির্ধারণ করে ২০ টাকা। কিন্তু বছর শেষে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে দাম হয় ২৫ টাকা। আর চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি নাগাদ এক বোতল নাপা সিরাপের দাম দাঁড়ায় ৩৫ টাকা। অর্থাৎ এক সিরাপের দাম বেড়েছে ১৭ টাকা।
একই অবস্থা বহুল বিক্রীত ওষুধ নাপা ট্যাবলেটের। এক পাতায় থাকে ১০টি ট্যাবলেট। ২০২২ সালের জুনের আগে নাপার প্রতি পাতার দাম ছিল ৮ টাকা। ওই বছরের ৩০ জুন ঔষধ প্রশাসনের দাম বাড়ানোর পর হয় ১০ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে ওই এক পাতার দাম হয়ে যায় ১২ টাকা। অর্থাৎ নাপা ট্যাবলেটের দামও বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
বিভিন্ন দূষণের কারণে দেশে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি যে ওষুধ চিকিৎসকরা খাওয়ার পরামর্শ দেন তার অন্যতম অ্যাভোলাক সিরাপ। ওষুধ বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, পুরো দেশে প্রতিদিন কয়েক লাখ অ্যাভোলাক সিরাপ বিক্রি হয়। সরকার দাম বাড়ানোর আগে অ্যাভোলাকের দাম ছিল ১৪০ টাকা। গত মে মাসের শেষ থেকে সেটি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়।
ওষুধ বিক্রেতারা বলছেন, দফায় দফায় দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলো। তাই নির্দিষ্ট করে বাড়ানোর দিন-তারিখ বলা কঠিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিক্রেতা জানান, কোম্পানিগুলো প্রথমে বাজারে ওষুধের সংকট দেখায়। তারপর বিক্রেতাদের মুঠোফোনে সংকটের কথা জানিয়ে খুদেবার্তা পাঠায়। এরপর দাম বাড়ানোর কথা জানায়।
শুধু নাপা অথবা অ্যাভোলাকই নয়, গত বছরের জুলাই মাসের পর থেকে সরকার-নির্ধারিত দাম উপেক্ষা করে বহুল ব্যবহৃত, বিক্রেতাদের ভাষায় ‘ফাস্ট মুভিং’ ওষুধগুলোর দাম বাড়ানো হচ্ছে দফায় দফায়।
দেশে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় ওষুধ আছে ২১৯টি। এর মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে অধিদপ্তর। এই ১১৭টির মধ্যে ২০টি জেনেরিকের ৫৩টি ওষুধের খুচরা মূল্য বাড়ানোর অনুমোদন দেয়া হয়।
এতে দেখা গেছে, কোনো কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বৃদ্ধির হার ছিল ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত। এর বাইরে বাকি সব ওষুধের দাম নির্ধারিত হয় প্রস্তুতকারী কোম্পানির প্রস্তাব এবং সুপারিশের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশে এমন কোনো ওষুধ নেই যার দাম বাড়েনি। কেবল একবার নয়, দফায় দফায় দাম বেড়ে ওষুধ এখন সাধারণ মানুষের এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
সরেজমিন ওষুধের দোকান
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের দাম বেড়েছে ১৩ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত। কোনো কোনো কোম্পানির জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ।
শাহবাগ এলাকা এবং ঢাকা, মুগদা ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানের একাধিক বিক্রেতা দৈনিক বাংলাকে জানান, সরকারিভাবে দাম বেড়েছে একবার। কিন্তু কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে কয়েকবার। দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে ওষুধের সংকটও তৈরি করা হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, ভিটামিন বি১, বি৬, বি১২-এর মধ্যে বেশি চলে নিউরো বি, ভিটাবিয়ন, নিওবিয়ন, রেনেটার নিউরোবেস্ট, মায়োলিন। এগুলোর প্রতিটির আগে দাম ছিল ৮০ টাকা পাতা। এখন কোনো কোম্পানি করেছে ৯০ টাকা, কেউ করেছে ১০০ টাকা।
অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত অ্যাজিথ্রোমাইসিন। যার মধ্যে জিম্যাক্স অন্যতম। জিম্যাক্স ৩৫ টাকা থেকে হয়েছে ৪০ টাকা। তবে কোনো কোনো কোম্পানি করেছে ৪৫ টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রি হয় সেফিক্সিম। এই জেনেরিকের পিস হিসেবে সেফথ্রি ২০০ এমজি আগে বিক্রি হতো ৩৫ টাকায়, এখন ৪৫ টাকা। সেফথ্রি ডিএস ৪০০ এমজি ছিল ৫০ টাকা, হয়েছে ৬০ টাকা প্রতি পিস।
কেমন আছেন রোগীরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহেনুর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ভুগছেন উচ্চ রক্তচাপেও। প্রতি মাসে তার ১ হাজার ৭০০ টাকার ওষুধ লাগত। এখন একই ওষুধের জন্য মাসে তার খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
রাজধানীর নিকেতন ১ নম্বর গেটের পরের ছোট্ট ব্রিজ পার হয়ে গুলশানে ঢোকার মুখে লেকপাড়ে টং দোকান চালান দ্বীন মোহাম্মদ। ৪৫ বছরের দ্বীন মোহাম্মদ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। সঙ্গে আড়াই বছর আগে যোগ হয়েছে কিডনি রোগ। দ্বীন মোহাম্মদ জানালেন, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বাদ দিয়েছেন। আর ডায়াবেটিস ও কিডনির ওষুধ খাওয়া কমিয়েছেন। কারণ কেনার সামর্থ্য নেই।
বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন লিটন মুন্সী। জানালেন, ১৩ বছর ধরে স্ট্রোকের কারণে তার মায়ের শরীরের বাম পাশ প্যারালাইজড। সঙ্গে রয়েছে ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি সমস্যা। সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করতে হয়।
লিটন মুন্সী বলেন, ‘এখন মাসের শেষ দিকে পরিকল্পনা করতে হয় সামনের মাসে কোন খরচ বাদ দিয়ে সেই টাকায় মায়ের পুরো ওষুধ কিনব। ওষুধের দাম যদি এত বাড়ে, তাহলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে?’
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উল্টো দিকে ওষুধের দোকানমালিক গোলাম মেহেদী হাসান আকন্দ বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশে প্রতিদিন কয়েক লাখ অ্যাভোলাক সিরাপ বিক্রি হয়। কয়েক মাস আগে ১৪০ টাকার অ্যাভোলাক-১০০ এমএল ছিল ১৬০ টাকা, এখন সেটি ১৭০ টাকা। বড়টির দাম ছিল ২৫০ টাকা, এখন হয়েছে ২৯০ টাকা।’
নিকেতনের মেসার্স হাসান ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতা সাগর জানান, তার দোকানে দিনে অন্তত পাঁচটি অ্যাভোলাক সিরাপ বিক্রি হয়। সে হিসাবে মাসে বিক্রি হয় ১৫০ বোতল।
এই হিসাবে এক অ্যাভোলাক সিরাপেই এই দোকানের ক্রেতাদের পকেট থেকে ৩০ টাকা বাড়তি ধরে মাসে চলে যাচ্ছে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ, বছরে যা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
রাজধানীর মগবাজারে মেসার্স রমনা ফার্মেসিতে ওষুধ ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। এখানে অ্যাভোলাক ২০০ এমজির দাম ২৫০ টাকা থেকে হয়েছে ২৯০ টাকা। মানুষ বেশি কেনে বড় বোতলটিই। দোকানটি মাঝারি মানের জানিয়ে রমনা ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী এজাজ উদ্দিন বলেন, মাসে ৩০টির মতো অ্যাভোলাকের বড় বোতল বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির তথ্যমতে, পুরো দেশে আড়াই থেকে তিন লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশে কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির পরিচালক জাকির হোসেন রনি বলেন, দেশে তাদের নিবন্ধিত ওষুধের দোকান রয়েছে আড়াই থেকে তিন লাখ। তবে অনিবন্ধিত রয়েছে এর প্রায় দেড় গুণ।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিয়ে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘আগে ওষুধের যে কাঁচামাল কেনা হতো ৮০ টাকায়, সেটির দাম এখন ১১১ টাকা। তার মানে এখানে দাম বেড়েছে ২৬ টাকা, অর্থাৎ ৩০ শতাংশ। কিন্তু আমাদের ১১১ টাকায় কাঁচামাল কিনে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে ১০০ টাকায়। আমাদের আসলে লোকসান হচ্ছে। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দাম আপাতত আর বাড়াব না। অর্থনৈতিক অবস্থা একটু স্থিতিশীল হোক, এরপর সরকারের সঙ্গে আমরা কথা বলব।’
যা বলছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর
ওষুধের দাম বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলোর চাপের কথা জানিয়েছেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি মনে করেন, কোম্পানিগুলো আগ্রাসী বিপণন নীতি পরিহার করলে, দামি মোড়ক ব্যবহার না করলে এবং উপহার দেয়া বন্ধ করলে ওষুধের দাম কমবে।
মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘ক্যানসার, কিডনি রোগ বা পক্ষাঘাতের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে শেষ সম্বল ভিটা বা জমি বিক্রি করেন। এসব রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন।’
তার মতে, ডলারের দাম যেভাবে বেড়েছে, ওষুধের দাম সেভাবে বাড়েনি। তিনি বলেন, ‘যখন ক্রাইসিস (ডলার ক্রাইসিস) শুরু হলো, তখন ওরা (কোম্পানি) এসে আমাদের বলল দাম না বাড়ালে তারা চালাতে পারবে না, কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।’
সবকিছু মিলিয়ে ৫০ শতাংশের বেশি খরচ বেড়েছে জানিয়ে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কাঁচামাল তো তাদের আনতে হবে, দেশে তো আর কাঁচামাল তৈরি হয় না। আমরা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি, কারণ আমাদের দেশীয় কোম্পানির লোকসান যাচ্ছিল। কিন্তু যেভাবে বাড়ার কথা ছিল, সেভাবে আসলে বাড়েনি।’
তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপের উদ্যোগে বোরহানউদ্দিন উপজেলায় হলো দিনব্যাপী মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ‘৫৬ হাজার স্কয়ার মাইল জুড়ে’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আওতায় সোমবার (৪ মে) উপজেলার মনিরাম এলাকার হাফিজ ইব্রাহিম কলেজ প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়।
স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ. চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নেওয়া এই বিশেষ উদ্যোগে একদিনেই ২ হাজার ৫৬৭ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
সকালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’ তিনি স্কয়ার গ্রুপকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষকমণ্ডলী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভিড়ে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। অনেকেই দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নিয়ে এসে এখানে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এই মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে অংশ নেন অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসকদের একটি দল। তারা সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ পরীক্ষা করেন এবং রোগীদের স্বাস্থ্য সচেতনতাবিষয়ক পরামর্শ দেন। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ সহজেই প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা লাভ করেন, যা তাদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্কয়ার গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৫ মে) দৌলতখান উপজেলার বাংলাবাজার হালিমা খাতুন মহিলা ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একই ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। এ ছাড়া কর্মসূচির শেষ দিন ৬ মে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা বাসটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। একই সময়ে এ ভাইরাস ও উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৫৬ জন। তাদের মধ্যে ১৪৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
গাজীপুরে হাম আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (৪ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত গাজীপুর তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিহত দুই শিশু গাজীপুরের বাসন চৌরাস্তা এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে রাইহান (৯) এবং শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার খোকন মিয়ার ছেলে সিফাত (৫)।
হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, হাসপাতালে হামে আক্রান্ত দুই শিশুর চিকিৎসা চলছিল। রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে চিকিৎসাধীন দুই শিশুর মৃত্যু হয়। পরে তাদের পরীক্ষা শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। সম্প্রতি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। তবে বর্তমানে কতজন রোগী ভর্তি রয়েছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম উপসর্গে নয় শিশু ও নিশ্চিত হামে এক শিশু মারা গেছে। এই সময়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এমন শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ২৬১।
রোববার (৩ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গত দেড় মাসে সারা দেশে ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৫০ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৪৪ শিশু।
একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে (পরীক্ষায় প্রমাণিত) ৫ হাজার ৩১৩ শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৪০ হাজার ৪৯১ শিশু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে ১৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার ৯৭৬ শিশু।
এই হিসাব গত ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ৩ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।
চুয়াডাঙ্গায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২ মে) দুপুর ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুটির মৃত্যু হয়।
মৃত শিশুটির নাম আমির হামজা (৮ মাস)। সে দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ালগাছি গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহীমের ছেলে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে আমির হামজাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৭৪ রোগী। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ১৪ জন। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ জনে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) নাজমুস সাকিব জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এ পর্যন্ত ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ২২ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭০ শিশু।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এসব শিশু ভর্তি হয়। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ২৫ শিশু। এ সময়ে নতুন করে কোনো মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেনি।
এদিকে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৯৭২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮৮২ শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।
জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এক-দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু রোগী ভর্তি হতে শুরু করলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে।
হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য ৬৪ শয্যাবিশিষ্ট একটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে, যেখানে তিনটি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২২ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৩ শিশু।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এসব শিশু ভর্তি হয়। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ২৪ শিশু। গুরুতর অবস্থায় ২ শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। এ সময়ে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৯৫০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮৫৭ শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।
জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এক-দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু রোগী ভর্তি হতে শুরু করলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে।
হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য ৬৪ শয্যাবিশিষ্ট একটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে, যেখানে তিনটি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে গুরুতর অবস্থায় দুই শিশুকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে।
দেশে হাম সংক্রমণে শিশুদের ব্যাপকহারে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানিয়েছে এ মানবাধিকার সংস্থাটি।
হামের টিকাদানের ক্ষেত্রে অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে বিবৃতিতে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিদিনই নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং দুঃখজনকভাবেভাবে প্রাণ হারাচ্ছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এভাবে শিশুদের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা মেনে নেওয়ার মতো ঘটনা নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, নীতি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে কার্যকর, নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ী টিকা বিদ্যমান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যথাসময়ে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কেন নিশ্চিত করা গেল না? কেন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজ মহামারিসদৃশ আকার ধারণ করে শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?
আসক বলে, গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামপ্রতিরোধী টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, ঘাটতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। যদি তা সত্য হয়ে থাকে, তবে বিষয়টিকে নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খতিয়ে দেখা জরুরি যে টিকা ক্রয় কেন আটকে ছিল, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত থেমে গিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের শীর্ষ পদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন কি না, কিংবা অবহেলা, অদক্ষতা বা সমন্বয়হীনতার কারণে জনস্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা।
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও জাতির জানা প্রয়োজন, যদি পূর্ববর্তী সরকার টিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তবে বর্তমান সরকার কীভাবে একই বা অনুরূপ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই টিকা সংগ্রহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করতে সক্ষম হলো? এ পার্থক্যের কারণ কী? কোথায় ছিল বাধা, কারা ছিলেন দায়ী এবং কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিলম্বিত হয়েছিল? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং টিকার দুই ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কাভারেজ নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতালগুলোয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছে। আসক বলে, আন্তর্জাতিক সংস্থার এই সতর্কতা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি কেবল স্বাস্থ্য খাতের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে চিকিৎসা ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বিশেষত শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে রক্ষা করার রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। সনদের ২৪ অনুচ্ছেদে শিশুদের সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু তাই শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থতারও প্রশ্ন।
আসকের বিবৃতিতে কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা; ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বস্তি, পাহাড় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া; আক্রান্ত শিশুদের বিনা মূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; টিকা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশে আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ (পেনফিল) স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও নভো নরডিস্ক বাংলাদেশ। ডেনমার্ক থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এই চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন বাস্তবায়িত হয়েছে।
এই উপলক্ষে সম্প্রতি আয়োজিত “সাবাশ বাংলাদেশ: ডেনমার্ক থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে আধুনিক ইনসুলিনের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি” শীর্ষক অনুষ্ঠানটি দেশের উচ্চমানের ডায়াবেটিস চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং বায়োলজিক ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইনসুলিন সরবরাহে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নভো নরডিস্ক নভোমিক্স ও নভোর্যাপিডসহ আধুনিক ইনসুলিন ডেনমার্ক থেকে আমদানি করে আসছে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় এখন একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ইনসুলিন কার্ট্রিজ বাংলাদেশেই উৎপাদন করা হবে। এতে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিনের প্রাপ্যতা বাড়বে এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া যাবে।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে প্রিমিক্স ও দ্রুত কার্যকর আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রযুক্তি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তৈরি করা হবে। দেশে উৎপাদিত প্রতিটি ব্যাচের গুণগত মান ডেনমার্কে যাচাই করা হবে, যাতে নভো নরডিস্কের বৈশ্বিক মান বজায় থাকে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “এই উদ্যোগ আমাদের উন্নত বায়োফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর অগ্রগতিকে তুলে ধরে। এটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে, উচ্চমানের ইনসুলিন সরবরাহ সহজ করবে এবং স্বাস্থ্যখাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করবে।”
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার বলেন, “এই অংশীদারিত্ব স্বাস্থ্যখাতে আমাদের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করে- জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে গুণমান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ইনসুলিনের মতো জটিল বায়োলজিক ওষুধের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক মান বজায় রেখে জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, এমন উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।”
বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, “স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে ডেনমার্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব রয়েছে। এসকেএফ-এর সঙ্গে নভো নরডিস্কের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় উৎপাদনের এই উদ্যোগ দেখায়, কীভাবে ডেনিশ উদ্ভাবন মানসম্মত ডায়াবেটিস চিকিৎসা সহজলভ্য করতে পারে, পাশাপাশি দেশের বায়োম্যানুফ্যাকচারিং সক্ষমতাও বাড়াতে সহায়তা করে।”
নোভো নরডিস্ক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রিয়াদ মামুন প্রধানি বলেন, “এই স্থানীয় উৎপাদন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে আধুনিক ইনসুলিনের প্রাপ্যতা বাড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছি। এ উপলক্ষে নভোমিক্স ও নভোর্যাপিড ইনসুলিনের দাম ১৮% কমানো হচ্ছে, তবে গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।”
ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, “আজ আমরা একটি গর্বের মুহূর্তের সাক্ষী। এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে ডেনমার্ক থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ভিত্তিতে বাংলাদেশে নভো নরডিস্কের প্রথম আধুনিক পেনফিল ইনসুলিন কার্ট্রিজ উৎপাদন শুরু হলো। এই অর্জন প্রমাণ করে, বাংলাদেশ উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে প্রস্তুত এবং উচ্চমানের বায়োফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনের একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে।”
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছাবে। ফলে নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত চিকিৎসার প্রয়োজন আরও বাড়ছে।
নভো নরডিস্ক ১৯৫৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ইনসুলিন সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যসেবা অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ডায়াবেটিস চিকিৎসার উন্নয়ন এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ২০১২ সাল থেকে তারা দেশে হিউম্যান ইনসুলিন ভায়াল উৎপাদন করছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
ট্রান্সকম গ্রুপের মালিকানাধীন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ১৯৯০ সাল থেকে উচ্চমানের ওষুধ উৎপাদন করে আসছে।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে হামে তিনজন ও হামের উপসর্গে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত হামের উপসর্গে ২২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৭৬ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত এর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৬৬২ জন। নিশ্চিত হামরোগী ১৬৩ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হামরোগী চার হাজার ৮৫৬ জন।
১৫ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৩৪৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৯ হাজার ৯৯১ জন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আজ সোমবার ২৭ এপ্রিল ২০২৬ইং তারিখে বি ব্লকের সামানে থেকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘আইপি এ্যান্ড স্পোর্টস: রেডি সেট, ইনোভেট’। এই আয়োজন জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং গুরুত্ব সম্পর্কে বিএমইউ এর শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এ্যাসুরেন্স সেল এর উদ্যোগে আয়োজিত র্যালির প্রধান অতিথি হিসেবে শুভ উদ্বোধন করেন বিএমইউর মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। মাননীয় উপাচার্য তাঁর বক্তব্যে বলেন, জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিরাট অবদান রাখছে। উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনভেনশন হাব চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিএমইউতে উচ্চতর মেডিক্যাল শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যখাতে উদ্ভাবনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার উদ্ভাবিত বিষয়ের মেধাস্বত্ব অধিকার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বর্তমান জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নিত্য নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের এই যুগে বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের পেটেন্ট, কপিরাইটসহ স্বত্ত্বাধিকার অর্জনের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। সেই দিক থেকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস উদযাপন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ এই আয়োজনে বিএমইউর সম্মানিত সম্মানিত উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ মোস্তফা কামাল, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের একান্ত সচিব উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ লুৎফর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এ্যাসুরেন্স সেলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নুরুন নাহার বেগম। সঞ্চালনা করেন আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক ডা. দীনে মোজাহিদ মোঃ ফারুক ওসমানী। অনুষ্ঠানে বিএমইউ এর সম্মানিত শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আরও ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে ১৭ শিশুর মৃত্যু হলো। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন মোট ৮৪ শিশু।
রোববার (২৬ এপ্রিল) সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, গত ২১ এপ্রিল সাড়ে ৩ বছরের শিশু মেয়েটিকে হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়া নিয়ে জেলার ত্রিশাল থেকে এসে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল। এরমধ্যে গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।
তিনি বলেন, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৫৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ৩৩ শিশু। এ নিয়ে হাসপাতাল থেকে মোট ছাড়া পেয়েছে ৭৫৫ শিশু।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতালের নতুন ভবনের ৮তলায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
দেশের ৪৯৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক নিরাপত্তা এবং মূল্যবান চিকিৎসাসামগ্রী রক্ষায় ৪ হাজার ৯৫০ জন সশস্ত্র আনসার সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বছরে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। মূলত হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সুরক্ষা প্রদান এবং মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতির চুরির ঝুঁকি রোধ করতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি হাসপাতালে ১০ জন করে আনসার সদস্য তিন শিফটে ভাগ হয়ে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নিরাপত্তা দলে একজন প্লাটুন কমান্ডার (পিসি), একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) এবং আটজন সাধারণ আনসার সদস্য থাকবেন। তাঁদের বেতন, উৎসব ভাতা, রেশন ও চিকিৎসা সুবিধাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য বার্ষিক ১৫০ কোটি টাকার একটি বাজেট প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। হাসপাতালে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এই সশস্ত্র পাহারা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সম্মেলনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান। সে সময় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত এলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনেক হাসপাতালে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছিল, যা এখন এই নিয়মিত পাহারার মাধ্যমে সমাধান হবে।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসকদের ওপর হামলার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতেই এই সশস্ত্র আনসার মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও জানান, শুধু নিরাপত্তা বৃদ্ধিই নয়, স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান জনবল সংকট দূর করতে খুব শিগগির আরও এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। সরকারের এই পদক্ষেপ চিকিৎসকদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেবার মান বৃদ্ধি করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো চিকিৎসাসেবার বড় বাধা ছিল। সশস্ত্র আনসার মোতায়েন করার ফলে চিকিৎসকদের মনোবল চাঙ্গা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা আরও মানবিক করার এবং সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট দূর করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। জনবল বৃদ্ধির ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন হলে চিকিৎসকদের ওপর কাজের চাপ কমবে এবং পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে।