আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩ ০৯:৩১
রাজার প্রত্যাবর্তন

রাজার প্রত্যাবর্তন

সিংহ ফেরায় ৬৭ হাজার একরের সামারার চেহারা বদলে গেছে। ছবি: সামারা

গ্রেট কারুতে একসময় সিংহ দাপিয়ে বেড়াত। আর ছিল চিতা। এরপর মানুষ গিয়েই বিপত্তিটা বাধাল। নিজেদের মতো সীমানা দেগে একের পর এক খামার গড়ে তোলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ মালভূমিতে। এতে যা হবার তা-ই হলো। ১৮৪০-এর দশক নাগাদ বিদায় নেয় সিংহ। পরের তিন দশকে চিতাও গেল।

বাঘ-সিংহ বিদায় নেয়ার পর গ্রেট কারু ও আশপাশের অঞ্চলে অনেকগুলো গবাদি পশুর খামার গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ইস্টার্ন কেপের যে অঞ্চল এখন ‘সামারা প্রাইভেট গেম রিজার্ভ’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৯৭ সালে গ্রেট কারুর আগের সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ সামারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তী ২৫ বছরের চেষ্টায় সিংহ আর চিতা এখন ফের দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার অঞ্চলটিতে। যে চেষ্টার পুরোধা মার্ক ও সারাহ টম্পকিন্স। মোট ৬৭ হাজার একরজুড়ে থাকা ১১টি খামার কিনে নেন টম্পকিন্স দম্পতি।

টম্পকিন্সদের বড় মেয়ে ইজাবেল এখন সামারার ব্যবসায় উন্নয়ন ব্যবস্থাপক। অঞ্চলটি আগেও বুনো ছিল না বলে সিএনএনকে জানান তিনি। উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছিল বলে কিছু প্রাণী সেখানে আশ্রয় নেয়। সেই অতিথি প্রাণীগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ায় খাদ্যের অভাবের সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় শিকারি প্রাণীও।

বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ছোট থেকে শুরু করে টম্পকিন্স পরিবার। আক্ষরিক অর্থেই তৃণমূল পর্যায় থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গুল্ম কিংবা বৃক্ষজাতীয় যে ৯ ধরনের উদ্ভিদ পাওয়া যায়, তার পাঁচটির অস্তিত্ব সামারায় মেলে। ইজাবেল বলেন, ‘শুষ্কপ্রায় অঞ্চল হলেও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে কিন্তু দারুণ, বিশেষ করে স্থানীয় উদ্ভিদের দিক থেকে।’

টম্পকিন্সদের চেষ্টায় একসময় অঞ্চলটি ফের উদ্ভিদে পূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে ছোট তৃণভোজী প্রাণী থেকে শুরু করে হাতির মতো বড় প্রাণীর উপযুক্ত আবাসে পরিণত হয় সামারা। ইজাবেলের ভাষায়, ‘অল্প অল্প করে আমরা পাজলের টুকরোগুলো জোড়া দিতে শুরু করি।’

পর্যাপ্ত শিকার থাকায় শিকারি প্রাণী ছাড়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে সামারা। ১৩০ বছর পর ২০০৩ সালে প্রথমবার অঞ্চলটিতে চিতা আনা হয়। সামারায় সব মিলিয়ে ৫০টির মতো চিতা শাবকের জন্ম হয়েছে। প্রাণীসংখ্যা পর্যাপ্ত হয়ে যাওয়ায় কতকগুলোকে অন্যান্য অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানে স্থানান্তর করতে হয়। আবার জিন বৈচিত্র্যের জন্য বাইরে থেকেও সামারায় কিছু চিতা আনা হয়েছিল।

রাজার ফেরা
চিতার আবাস ঠিকঠাক হলে ১৭০ বছর পর সিংহ ফেরানোর আয়োজন শুরু হলো। সামারা এবং গ্রেট কারুর জন্য দারুণ এক সময় বটে! ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ‘টাইটাস’ নামের সিংহ এবং ‘সিকেলেলে’ নামের সিংহী আনা হয় সামারায়। কাছাকাছি সময়ে ‘সেবা’ নামের আরেক সিংহীও আসে। এর মধ্যে সিকেলেলে দুটি এবং সেবা একটি শাবকের জন্ম দিয়েছে। অভয়ারণ্যের প্রথম সিংহশাবক এখন নিজেই শিকার করতে শিখে গেছে বলে জানান টম্পকিন্স।

সিংহ ফেরায় সামারার চেহারা বদলে গেছে। খাদ্যজালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামারা এতটাই সফল যে মেঘ না চাইতে বৃষ্টি মিলেছে। যেমন, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে অভয়ারণ্যের ভেতর বেশ কয়েকবার একটি পুরুষ লেপার্ড ধরা দেয় ক্যামেরায়। সেটি বেড়া টপকে ঢুকে পড়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। ইজাবেল বলেন, ‘এর অর্থ লেপার্ড টিকে থাকার মতো পরিবেশ এখানে রয়েছে।’

উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হয়ে উপায় নেই
মূলত পর্যটন থেকেই সামারার খরচ মেটানো হয়। দর্শনার্থী এসে লজে থাকতে পারেন, চাইলে খোলা আকাশের নিচে তারাও গুণতে পারেন। বিলাসবহুল সাফারি কিংবা পর্যটকদের জন্য চিতার পিছু নেয়ার ব্যবস্থাও আছে সেখানে। আয়ের পুরোটাই সামারায় নানা কর্মসূচিতে ফের বিনিয়োগ করা হয়।

সামারায় দীর্ঘমেয়াদে আরেকটি বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন টম্পকিন্সরা। কারুর ক্যামডেবু জাতীয় উদ্যান এবং মাউন্টেন জেবরা জাতীয় উদ্যানের সঙ্গে সংযোগপথ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটা সম্ভব হলে ১৩ লাখ একরের বিশাল এক অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সামারার চেষ্টা তো আছেই, জাতিসংঘের ‘বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের দশক’ উদ্যোগের দিকনির্দেশনাও আছে। অগ্রাধিকারভুক্ত অঞ্চলগুলোতে কেবল ১৫ শতাংশ ভূমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হলে বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা প্রাণীর ৬০ শতাংশ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। জলবায়ু এবং জীবিকা-সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা তো আছেই। ইজাবেল বলেন, ‘সময় চলে যাচ্ছে। আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হয়ে উপায় নেই।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। মানুষ নিজ নিজ উঠানে উদ্যোগী হলেই বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের উঠানটা কেবল ৬৭ হাজার একরের।’