আপডেট : ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ ১৫:৪৮
আখাউড়ায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছিল আজ
প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

আখাউড়ায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছিল আজ

ছবি: সংগৃহীত

আজ ৬ ডিসেম্বর, পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রণাঙ্গন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের আজকের এ দিনে আখাউড়া উপজেলায় উড়েছিল বাংলার স্বাধীন পতাকা। আর সেই পতাকা উড়াতে মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়ায় যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর আখাউড়া উপজেলার উত্তর সীমান্তবর্তী আজমপুর ও রাজাপুর এলাকায় পাক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ হয়। ৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী আজমপুরে শক্ত অবস্থান নিলে সেখানেও অবিরাম যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর ১১ সৈন্য নিহত ও মুক্তিবাহিনীর দুজন সিপাহী ও একজন নায়েক সুবেদার শহীদ হন। ৪ ডিসেম্বর আজমপুরে পাক বাহিনীর মর্টারশেলের আঘাতে শহীদ হন লেফটেন্যান্ট ইবনে ফজল বদিউজ্জামান। ওইদিন সন্ধ্যায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী সম্মিলিতভাবে আখাউড়া আক্রমণ করে। ৫ ডিসেম্বর তুমুল যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়। পরে আখাউড়া ডাকঘরের সামনে লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেন পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের প্রধান জহুর আহাম্মদ চৌধুরী।

আখাউড়ায় যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে প্রাণ হারান নারী, শিশুসহ শত শত মুক্তিকামী জনতা। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্মৃতিস্বরূপ আখাউড়ার দুরুইন গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধি রয়েছে। এ ছাড়া গঙ্গাসাগরের টানমান্দাইলে রয়েছে ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধার গণকবর।

শুধু তাই নয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন আখাউড়ার মাটিতে জন্ম নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলমগীর কবির। বাবা-মা ও পরিবারকে না জানিয়েই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে তিনি চলে গিয়েছিলেন আগরতলায়।

১৯৫২ সালের ২১ অক্টোবর তৎকালীন কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার আখাউড়া থানার সড়ক বাজারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাই আর ছয় বোনের মধ্যে আলমগীর করিম ছিলেন তৃতীয়। ১৯৭১ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে বি এ অধ্যয়নরত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর করিমের ভাগিনা রুহুল আমিন জানান, পরিবারকে না জানিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে সীমান্ত পাড়ি দেন মুক্তিপাগল আলমগীর কবির। সেখানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হাফানিয়া শরণার্থী শিবিরে অবস্থানকালে ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং টিমের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জেলার কসবা উপজেলার সালদানদী, কোল্লাপাথর ও কুটি রণাঙ্গনের যুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে খালের ধারে স্পিডবোট নিয়ে পাকস্তানি বাহিনী শক্ত অবস্থান নেয়। গ্রামবাসীকে বাঁচাতে তারা জীবনপণ করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সবাই নিহত হয়েছে ভেবে স্পিডবোট থেকে অস্ত্র আনতে খালে নেমে পড়েন আলমগীর করিম। হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন। তাকে বাঁচাতে গ্রামবাসী ব্যাকুল হয়ে পড়েন। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই বীর যোদ্ধা।

তিনি আরও জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর করিমকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়। তার নামে শুধু পৌর শহরের সড়ক বাজারের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আখাউড়া উপজেলায় তার আর কোনো স্মৃতি চিহ্ন নেই।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় স্বাধীনতা সংগ্রামে বীর শহীদদের স্মরণে আখাউড়া পৌরশহরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক মুক্তমঞ্চে প্রদীপ প্রজ্বলন। ৬ ডিসেম্বর সকালে আনন্দ শোভাযাত্রা, উপজেলা স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।