আপডেট : ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:১৬
সোনালী ব্যাংকে অনিয়ম: ‘ভুল স্বীকার’ করলেই মাফ
রাকিবুল হাসান, কিশোরগঞ্জ

সোনালী ব্যাংকে অনিয়ম: ‘ভুল স্বীকার’ করলেই মাফ

বয়স্ক ভাতার টাকা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর, ভুয়া ওভারটাইম বিল, ঘুষ দাবিসহ সামগ্রী কেনা নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখার এসব অনিয়মের বিচার না করে ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখাটির উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) বিরুদ্ধে।

ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী দাবি করেছেন, সব বিষয়ই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি বিষয়ের অভিযোগ ‘হুইসেল ব্লোয়ারের’ মাধ্যমে ন্যায়পাল সচিবালয় বরাবর যায়। পরে স্থানীয়ভাবে এর মীমাংসা করায় কেন্দ্র থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

সম্প্রতি ওঠা চারটি অভিযোগের মীমাংসা করা হয়েছে ‘ভুল স্বীকার’ ও অর্থ ফেরত নেয়ার মাধ্যমে। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২২ জুলাই একজন হুইসেল ব্লোয়ার প্রধান কার্যালয়ে ভুয়া ওভারটাইম বিল নিয়ে অভিযোগ করেন। এতে কিশোরগঞ্জ শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ওভারটাইম পান শুধু কর্মচারীরা (গাড়িচালক ও অফিস সহকারী)।

২০২১ সালের অক্টোবরে ৮ দিনের ওভারটাইম হিসেবে মাহফুজুর রহমান ২ হাজার ৩৬৮ টাকা বিল নেন। বিল অনুমোদনের কপিতে স্বাক্ষরের নিচে ২৭ অক্টোবরের কথা উল্লেখ রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েক মাসের ভুয়া ওভারটাইম বিল তোলার অভিযোগ উঠলে অর্ধলক্ষাধিক টাকা ফেরত দেন মাহফুজুর রহমান। এরপর আর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ওভারটাইম নেয়ার বিষয়ে মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমার অ্যাকাউন্টে ভুলবশত টাকা চলে এসেছিল। পরে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।’

ওভারটাইম বিল ভুলে কীভাবে এসেছে, তা জানতে চাইলে মাহফুজুর ব্যাংকের ডিজিএমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

বয়স্ক ভাতা বেহাত

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ২০২১ সালের ১০ আগস্ট কুলিয়ারচর শাখায় বয়স্ক ভাতার ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮৬ টাকা বেহাত হয়। ওই টাকা শাখার তৎকালীন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক তুহিন মিয়ার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। পরে বিভিন্ন তারিখে সেই টাকা উত্তোলন করে দুজন আত্মসাৎ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে একই বছরের ২১ অক্টোবর টাকা পুনরায় ব্যাংকে জমা রাখেন।

এ বিষয়ে কম্পিউটার অপারেটর তুহিন মিয়া বলেন, ঋণ ওঠানোর জন্য সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করেছিলেন। কিন্তু চেক বই ছিল আতিকুর রহমানের কাছে। এ সুযোগে টাকা তুলে খরচ করেন আতিকুর। পরে তাকে (আতিকুর) চাপ দিলে পুনরায় টাকা জমা দেন।

আতিকুর রহমান বলেন, ‘ভুলবশত এমনটা হয়েছিল। পরে সেই টাকা আবার জমা দিয়েছি। আমি ক্ষমাও চেয়েছি।’

বিষয়টি জানার পর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি ডিজিএম। আতিকুরকে বদলি করা হয় পার্শ্ববর্তী কটিয়াদী শাখায়।

ঘুষ দাবি

সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের কটিয়াদী শাখার ঋণ কর্মকর্তা সজিব মিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও ঘুষ নেয়ার অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর এ নিয়ে ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলমের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন স্থানীয় পাইকসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদ কামাল।

অভিযোগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত ঋণ পাইয়ে দেয়ার নাম করে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করার কথা জানান বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সেই অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন না করে এক অভিযোগকারীকে ফোন করে ভীতি প্রদর্শন করেন ডিজিএম। একপর্যায়ে ওই শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে অভিযোগটি নিষ্পত্তি করেন ডিজিএম।

সামগ্রী কেনা

২০১৯-২০ অর্থবছরে কিশোরগঞ্জ শাখার মনিহারি দ্রব্য, কাগজ ও কম্পিউটারসামগ্রী কেনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন যুগ্ম জিম্মাদার মো. সোলায়মান ও শওকতুল ইসলাম। তাদের মধ্যে শওকতুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ শাখায় এবং সোলায়মান প্রিন্সিপাল অফিসে কর্মরত আছেন।

সূত্র জানায়, সোলায়মান ও শওকতুল সেগুলো কিশোরগঞ্জ থেকে না নিয়ে পাকুন্দিয়া থেকে কেনেন। মূলত সেখান থেকে ফাঁকা ক্যাশ মেমো এনে ১৮০ টাকার কাগজ ৩০০ টাকা এবং ৫০০ টাকা মূল্যের টোনার ৯০০ টাকা দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেন। তখন জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এজিএম। অভিযুক্ত দুজন জাহাঙ্গীরের পছন্দের লোক হিসেবে পরিচিত। অভিযুক্ত দুজনকে ফাঁকা ক্যাশ মেমো দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন পাকুন্দিয়ার মনির কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন।

অভিযোগুলো নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ উঠলেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সে যে-ই হোক না কেন। আতিকুর রহমানকে এই স্টেশন থেকে বদলি করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়েই আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেই কাজ করছি। কোনো কিছুই গোপন বা ধামাচাপা দেয়া হয়নি।’