আপডেট : ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:১৬
পাতে ফিরেছে বিলুপ্তপ্রায় ৩৬ প্রজাতির মাছ
কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ

পাতে ফিরেছে বিলুপ্তপ্রায় ৩৬ প্রজাতির মাছ

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জলাশয়ে চাষ হচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় সুবর্ণ কই। ছবি: দৈনিক বাংলা

‘মাছে ভাতে বাঙালি’- কথাটা যেন ভুলতেই বসেছিল এই জাতি। দখল, দূষণে নদীগুলো যখন থেকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে, তখনই ধীরে ধীরে বাঙালির পাত থেকে উধাও হতে শুরু করল গুলশা, ভেদা, গুতুম, নারকেলি চেলা, মৌরালা, তপসের মতো সুস্বাদু সব মাছ। তবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সম্প্রতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছে ৩৬ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছ। এর মধ্যে ২০ প্রজাতির মাছ সারা দেশে চাষের আওতায় এসেছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে।

ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় ১০১ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ ইনস্টিটিউট। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাদু পানির মাছ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, দেশে স্বাদু পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংখ্যা ৬৪টি। পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মাগুর, দেশি সরপুঁটি, জাতপুঁটি, ভেদা, গুতুম, খলিশা, গজার, ফলি, চিতল, মহাশোল, নারকেলি চেলা, তিতপুঁটি ও দারকিনাসহ ইতিমধ্যে ৩৬ প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হয়েছে।

সরেজমিনে ময়মনসিংহ শহরের মেছুয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রজাতির বড়-ছোট দেশীয় মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দামাদামিতে সরগরম বাজারটি। এ সময় কথা হয় জালাল উদ্দিন নামের এক বিক্রেতার সঙ্গে।

দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ছোট মাছ চাষের আওতায় এসেছে। ফলে ক্রেতাদের হাতের নাগালে এসেছে দাম। মাঝখানে অনেক দিন তো এসব মাছ পাওয়াই যায়নি বাজারে।’

কাদের মিয়া নামের আরেকজন বলেন, পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মাগুরের দাম ছিল বেশি। বর্তমানে এসব মাছ চাষ করা হচ্ছে। ফলে এগুলোর দাম কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

গবেষণা প্রসঙ্গে বিএফআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুলফিকার আলী দৈনিক বাংলাকে বলেন, কৃত্রিম প্রজননের জন্য পুকুর, বিভিন্ন জলাশয়, হাওর-বাঁওড়, নদী থেকে সংগ্রহ করা হয় বিলুপ্তপ্রায় মাছ। এরপর দীর্ঘ গবেষণার ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ঝর্ণার মাধ্যমে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়। ইনজেকশন দেয়ার নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ছাড়ে মাছ। এরপর ডিম থেকে রেণু বের হয়ে আসে। সেই রেণু পোনাকে নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই প্রচুর পরিমাণ পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে।’

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী দৈনিক বাংলাকে বলেন, জলাশয় সংকোচন, পানি দূষণ এবং অতি মাত্রায় আহরণের ফলে এসব মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় বর্তমানে এগুলো বাংলাদেশে বিপন্নের তালিকায়। পুনরায় এগুলোকে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে গবেষণা চলছে।

তিনি বলেন, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণে সংরক্ষণের জন্য লাইভ জিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। যেসব মাছের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সেগুলো সংগ্রহ করে লাইভ জিন ব্যাংকে রাখা হয়। পরে গবেষণা করা হয়।

পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮-০৯ সালে চাষের মাধ্যমে দেশীয় মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার মেট্রিক টন। দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন হওয়ায় ২০২০-২১ সালে উৎপাদন ৪ গুণ বেড়ে আড়াই লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ আছে। এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড ও অন্ধত্বের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।’

তিনি বলেন, মাছের পোনা উৎপাদনে ব্যাপক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এতে এসব দেশীয় মাছ চাষাবাদে পোনা প্রাপ্তি সহজতর হবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।