আপডেট : ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:২৭
হাত ধোয় না ৭০ শতাংশ মানুষ
রাসেল আহমেদ, রূপগঞ্জ

হাত ধোয় না ৭০ শতাংশ মানুষ

করোনাকালীন দেশে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে হাত ধোয়ার ওপর জোর দেয়া হয়। তবে সম্প্রতি দুটি প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জের চার উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হাত ধোয়ার অভ্যাস ভুলে গেছেন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, বন্দর ও সোনারগাঁ উপজেলার ৬ হাজার ৩০০ জনের ওপর এ জরিপ চালায়। ফলাফলে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেয়া ৭০ শতাংশ পুরুষ-নারী নিয়মিত হাত ধোয় না। আর গত মে-আগস্ট মাসে আশা-এর জরিপে অংশ নেন ১ হাজার ৬২০ জন। এখানের ৬৫ শতাংশ মানুষ হাত ধোয়ায় অভ্যস্ত নয় বলে জানায় আশা।

ব্র্যাকের জরিপের তথ্য অনুযায়ী হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা এগিয়ে আছেন। করোনার সংক্রমণের সময় ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৫ শতাংশ নারী নিয়মিত হাত ধুয়েছেন।

বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ব্র্যাকের চালানো জরিপে দেখা গেছে, বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ দিলেও অনেক স্বাস্থ্যকর্মীই এই একটি প্রাথমিক করণীয়কে অবহেলা করেন। কিন্তু এর ফলে অনেক মারাত্মক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে। রোগী দেখার পরে হাত ধুয়ে থাকেন মাত্র ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী।

শিক্ষানবিশ নার্সদের মধ্যে হাত পরিষ্কার রাখা নিয়ে অতি আত্মবিশ্বাসী প্রবণতা দেখা যায়। যাদের পেশাগত কারণে খাদ্যদ্রব্যে হাত দিতে হয়, তারা অনেক সময়ই ভুলে যান যে, তাদের স্পর্শ থেকে অন্য কেউ ‘ফুড পয়জনিং’-এ আক্রান্ত হতে পারেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক নার্স বলেন, ‘এটা কখনো ভেবে দেখিনি। আর এ কারণেই হাত ধোয়া হয় না।’

ব্র্যাকের জরিপ-সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা সংক্রমণের পটভূমিতে হাত ধোয়া ও এর সঠিক নিয়মের অনেক প্রচারাভিযান চলেছে। ঘৃণার উদ্রেক হয়, এমন ভিডিও যারা দেখেছেন, তাদের হাত ধোয়ার প্রবণতা অনেক বেশি ছিল। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজনকে হাত ধোয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। এ উদ্বুদ্ধকরণ চালিয়ে গেলে একটা আচরণ অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।

রূপগঞ্জ উপজেলা ব্র্যাকের শাখা ব্যবস্থাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাত না ধোয়ার কারণ শুধুই আলস্য নয়। এর অনেক মানসিক কারণ আছে। এর সঙ্গে মানুষের নিজস্ব চিন্তাধারা, ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা বা তাদের ঘৃণাবোধের মাত্রা- এমন অনেক কিছুই সম্পর্কিত।’

আশার জরিপের বরাত দিয়ে রূপগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ফারুক শেখ বলেন, ‘ধূমপান বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মতো কাজে এর (হাত না ধোয়া) দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এ ধরনের লোকেরা সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা আসলে কতটা, তা আন্দাজ করতে পারেন না।’

রূপগঞ্জের নগরপাড়া এলাকার আনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘সিগারেট খেলে হাত ধুইতে হবে কেন? এটাতো ধোঁয়া, কোনো সমস্যা হয় না।’

সম্প্রতি রূপগঞ্জের অজপাড়াগা কায়েতপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হাত না ধুয়েই তিন বছর বয়সী রক্তিম নাশতা খাচ্ছে। একটু পর বাড়ির উঠানে গিয়ে মলত্যাগ করার সময় এ হাতে কলা খেতেও দেখা যায় তাকে।

রক্তিমের মা দুর্গা রানী বলেন, ‘পোলাপান কী হাত ধুবো। আমরাও দরকার মনে করি না।’ আর রক্তিমের দাদা নারায়ণ চন্দ্র বলেন, ‘কামের চাপে আমরা বড়রাই হাত ধুই না। আর গুড়াগাড়ার (ছোটরা) কতা তো বাদই দিলাম। করোনা আছিলো তহন ডরে হাত ধুইছিলাম।’

গত এক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের ৪ উপজেলার ১০ গ্রামের ১২টি পরিবারের অন্তত ৫৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনায় ছোট-বড় সবাই হাত ধুতেন। এখন কারো মাঝে এ অভ্যাস আর নেই। হাত ধোয়ার গুরুত্ব জানার পরও অবহেলার কারণে অনেকেই এ কাজটি করতে চান না।

আড়াই হাজারের সলমান্দি এলাকার নরেন বিশ্বাস বলেন, ‘এত্ত কিছু বুঝি না। আমাগো জীবন কাইডা গেলোগা হাত না ধুইয়া।’

এদিকে করোনাকালে হাত ধোয়ার জন্য বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে ব্যবস্থা ছিল। তবে এখন সেগুলোর ব্যবহারের পাশাপাশি অস্তিত্বও নেই।

রূপগঞ্জ থানার দ্বিতীয় ফটকের সামনে হাত ধোয়ার একটি স্থাপনা তৈরি করা হয় করোনাকালে। গত শুক্রবার সেখানে তা আর দেখা যায়নি। গত ৮-৯ মাস আগেই তা তুলে ফেলা হয়েছে জানিয়ে থানার ওসি এ এফ এম সায়েদ বলেন, ‘এখন তো করোনা নেই। তা ছাড়া কেউ হাত ধুতে চায় না।’

হাত না ধোয়ার ফলে ডায়রিয়াসহ নানা অসুখ হয়। এখনো দেশের পাঁচ বছর বয়সী এক হাজার শিশুর মধ্যে সর্বোচ্চ ছয়জনের মৃত্যু হয় ডায়রিয়ায়। এমন তথ্য দিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌসী।

এ নিয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল হক বলেন, ‘হাত ধোয়া দিবস (১৫ অক্টোবর) ছাড়া তাদের আর কোনো সচেতনতা কর্মসূচি তৈরি করা হয়নি।’