আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:৪৩
হাবিবার হাত ধরে স্বাবলম্বী দুই শতাধিক নারী-পুরুষ
রাব্বিউল হাসান, জয়পুরহাট 

হাবিবার হাত ধরে স্বাবলম্বী দুই শতাধিক নারী-পুরুষ

নকশিকাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত এলাকার বিভিন্ন বয়সী নারীরা। গতকাল সকালে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার জিন্দারপুরের আতাহার গ্রামে। ছবি: দৈনিক বাংলা

দুই শতাধিক নারী-পুরুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন যে নারীর হাতে ধরে তার নাম হাবিবা জাহান। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এ নারী একটি সমিতি গড়ে তুলেছেন। এর আওতায় অন্যদের নকশিকাঁথা ও গরু পালনের প্রশিক্ষণ দেন।

হাবিবার সমিতির নাম ‘আতাহার যুথী মহিলা উন্নয়ন সমিতি’। এ ছাড়া তিনি যৌথভাবে একটি ফাস্টফুডের দোকান চালান। তা থেকে মাসে তার আয় ৩০-৪০ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে পান শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার।

তবে হাবিবার সফল হওয়ার পেছনের গল্পটা সরল নয়। ১৩ বছর বয়সে বিবাহ হয়। অল্প বয়সেই মা হন দুই সন্তানের। সংসারে তেমন আয়-রোজগার নেই। শ্বশুর বাড়িতেও নানাভাবে নির্যাতিত হতে থাকেন। তখন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।

ক্ষেতলাল উপজেলার গোলাহার গ্রামের মমতাজুর রহমান ও প্রয়াত জামিলা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট হাবিবা। স্বামীর বাড়ি কালাই উপজেলার জিন্দারপুরের আতাহার গ্রামে। শ্বশুর বাড়িতে থেকে এসএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি।

সম্প্রতি আতাহার গ্রামে হাবিবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে নকশিকাঁথার কাজ করছেন নারীরা। কেউ সেলাই করছেন, কেউ কাঁথার ওপরে বাহারি নকশার ফুল তুলছেন।

সেখানে কাজ করা নারগিস আক্তার বলেন, হাবিবার কাছে থেকে বিনা মূল্যে নকশিকাঁথা ও নারীদের পোশাক সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এখন তিনি প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করছেন।

আরেক নারী মোফেলা বিবি বলেন, একটা সময় বাড়িতে দুই বেলা ভাত জুটত না। স্বামী দিনমজুরের কাজ করতেন আর তিনি বাড়ির কাজ করতেন। হাবিবার কাছ থেকে বিনা মূল্যে গাভী পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। একটি গাভী দিয়ে পালন শুরু করলেও এখন তার খামারে পাঁচটি গাভী আছে।

বাড়িতে বসে কথা হয় হাবিবার সঙ্গে। বলেন, এক দিন আতাহার গ্রামের একটি উঠান বৈঠকে তৎকালীন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হয়। কর্মকর্তার পরামর্শে ২০০৭ সালে ‘আতাহার যুথী মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ গড়ে তোলেন। ওই বছরই তার সমিতি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন পায়। এরপর মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সহযোগিতায় নকশিকাঁথা ও নারীদের পোশাক তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ নেন। পরে গ্রামের অসহায় ও দুস্থ নারীদের নকশিকাঁথা ও পোশাক তৈরির কাজ শেখান।

হাবিবা বলেন, ২০১৮ সালে তৎকালীন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রওশন আলমের পরামর্শে জয়পুরহাট জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে গাভী পালনের ওপর তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ নেয়ার পর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে বেকার যুব নারী ও পুরুষের মাঝে গাভী পালনের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ২০২২ সালে আতাহার গ্রামে ‘আতাহার যুব মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ গড়ে তোলেন।

এর মাঝেই চলে আসে করোনাকাল। হাবিবা বলেন, ওই সময় কীভাবে টাকা উপার্জন করা যায় সে ভাবনা থেকে তিনি ও মুশফিকা খাতুন নামে এক নারী মিলে জয়পুরহাটে গড়ে তোলেন অনলাইন ফাস্টফুড ব্যবসা। এখন প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন।

কালাই উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মাহফুজা খাতুন বলেন, হাবিবা একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী ও সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য তিনি পুরস্কারও পেয়েছেন।