আপডেট : ১০ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:০০
প্রত্যন্তে আলো ছড়াচ্ছে মুজিবুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার
প্রতিনিধি, নওগাঁ

প্রত্যন্তে আলো ছড়াচ্ছে মুজিবুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার

পাঠাগারে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন উদ্যোক্তা আলমগীর কবির। ছবি: দৈনিক বাংলা

প্রত্যন্ত এলাকার একটি বাজারে গড়ে উঠেছে আধুনিক পাঠাগার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পাঠাগারে টেবিল, শেলফ ও আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই। চার হাজার বইয়ের পাশাপাশি পাঠাগারটিতে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে শিক্ষার ব্যবস্থা।

নওগাঁর সীমান্তবর্তী ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের আগ্রাদ্বিগুন বাজারের এই গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠা মাত্র দুই বছর আগে। এই দুই বছরের মধ্যেই পাঠাগারটি এলাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বইপ্রেমীরা এখন ভিড় জমাচ্ছেন এই পাঠাগারে।

পাঠাগারটির উদ্যোক্তা স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর কবির। নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পাঠাগার তৈরির কার্যক্রম শুরু করেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গফুট জায়গার ওপর গড়ে তুলেছেন এই পাঠাগার। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান টানা ১৭ বছর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মারা যান। বাবার নামেই পাঠাগারের নামকরণ করেছেন তিনি। ‘মুজিবুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার’এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও গ্রীন ভয়েস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পরিবেশবিদ হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছেন আলমগীর কবির।

কথা হয় পাঠাগারে বই পড়তে আসা স্থানীয় আগ্রাদ্বিগুন বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল হোসেনের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ইউনিয়ন পর্যায়ে এত সুন্দর পাঠাগার পাব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। অবসর সময়ে আমরা এখানে এসে জ্ঞান অর্জন করে থাকি। অনেক সুন্দর ও চমৎকার একটি পাঠাগার।

মুসফিকা আক্তার নামের শিক্ষার্থীর বক্তব্য, আমি সত্যিই মুগ্ধ এমন একটি পাঠাগার স্থাপন করায়। আমরা প্রতিদিনই কয়েকজন এখানে বই পড়তে আসি। এখানে এসে বই পড়তে আমাদের খুব ভালো লাগে।

স্থানীয় তরুণ জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘ইতিহাস, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, খেলাধুলাসহ সব ধরনের বই এই পাঠাগারে রয়েছে। প্রত্যন্ত একটি এলাকায় এমন পাঠাগার পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।’

পাঠাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রসঙ্গে আলমগীর কবির দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘জ্ঞান চর্চার অভাবে আমাদের সমাজে প্রগতিশীল মানুষের বড়ই অভাব। প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে এমন উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের পাঠাগারে প্রায় চার হাজারের মতো বই আছে। আমাদের ইউনিয়নে মোট ৪২টি গ্রাম আছে। প্রতিটি গ্রাম থেকে দুই-তিনজন নিয়ে টিম করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তারা পড়ার জন্য পাঠাগারে আসবে। কবি, সাহিত্যিকদের জীবনী, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে। পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত।’

আলমগীর কবির জানালেন, বাবা মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর চার ভাই মিলে বাবার নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। সেই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ২০১৫ সাল থেকে অসহায় শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি নানা ধরনের সামাজিক কাজ করছেন তারা। এবার সেই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেই তৈরি করা হয়েছে ‘মুজিবুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার। বই, ডেকোরেশনসহ এই পাঠাগার স্থাপনে প্রায় ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। একজন লাইব্রেরিয়ান ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পাঠাগারে একসঙ্গে ৪০-৫০ জন বসে বই পড়তে পারেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলমগীর কবির বলেন, ‘উপজেলায় ১৩৯টি প্রাথমিক ও ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১৪টি মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ২২-২৫ জন ছাত্রছাত্রী বাছাই করে দেবেন, যাদের সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজস্ব পরিবহন দিয়ে লাইব্রেরিতে নিয়ে আসা হবে। তারা পছন্দমতো বই পড়বে।’

এ উদ্যোগের প্রশংসা করে নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও গবেষক শরিফুল ইসলাম খান দৈনিক বাংলাকে বলেন, একটি পাঠাগারে যে ধরনের পরিবেশ থাকা দরকার তার মোটামুটি সবই সেখানে আছে।

ধামইরহাট উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় এমন একটি পাঠাগার সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে অবশ্যই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হবে।