যুক্তরাষ্ট্রে পতন ঘটা সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক (এসভিবি) কিনে নিয়েছে ফার্স্ট সিটিজেন্স ব্যাংক অ্যান্ড ট্রাস্ট। সোমবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি) এ ঘোষণা দিয়েছে। খবর রয়টার্সের।
এফডিআইসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এসভিবির সব ডিপোজিট ও ঋণের দায়িত্বগ্রহণ সংক্রান্ত পারচেজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশন চুক্তিতে সই করেছে ফার্স্ট সিটিজেন্স। ফলে ২৭ মার্চ (সোমবার) থেকে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ১৭টি শাখার সবক’টিই চালু হচ্ছে ফার্স্ট সিটিজেন্স ব্যাংকের নামে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে মারাত্মক অস্থিরতার মধ্যে গত ১০ মার্চ স্টার্টআপ ব্যবসায় শীর্ষ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়। সেসময় ব্যাংকটির মোট সম্পদ ছিল ১৬৭ বিলিয়ন ডলারের এবং মোট ডিপোজিট বা আমানত ছিল ১১৯ বিলিয়ন ডলারের মতো।
এফডিআইসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্রয় চুক্তির আওতায় ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ৭২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অধিগ্রহণ করা হবে। নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাতের ৯০ বিলিয়ন ডলার সম্পদ থাকবে এফডিআইসির হাতে। এই চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
এফডিআইসি জানিয়েছে, পতিত সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ডিপোজিটর বা আমানতদাররা এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফার্স্ট সিটিজেন্স ব্যাংকের আমানতদার হয়ে যাবেন। তাদের আমানত জমা বা গ্রহণ প্রক্রিয়া দেখভাল করবে এফডিআইসি।
রয়টার্স জানিয়েছে, বিপর্যস্ত সিলিকন ভ্যালি ব্যাংককে কিনে নেয়া ফার্স্ট সিটিজেন্স ব্যাংকের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ১০৯ বিলিয়ন ডলার এবং তাদের মোট আমানত আছে ৮৯ বিলিয়ন ডলারের মতো।
সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতনের দুদিন পর নিউইয়র্কভিত্তিক সিগনেচার ব্যাংকও বন্ধ করে দেয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। ক্রিপ্টো ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম শীর্ষ ঋণদাতা সিগনেচার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এখন এফডিআইসির হাতে। নিউইয়র্কের আর্থিক সেবা দপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের শেষান্তে সিগনেচার ব্যাংকের ১১০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ এবং ৮৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার আমানত (ডিপোজিট) ছিল। তবে এই ব্যাংকটির বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য জানা যায়নি।
প্রকাশিত খবর অনুসারে, ২০০৮ সালের পর এই মার্চেই সবচেয়ে বড় ধসের কবলে পড়ল মার্কিন ব্যাংকিং খাত। এর আগে ২০০৮ সালে কয়েকটি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের ২৫ অক্টোবর ব্যাংকিং কোম্পানি ওয়াশিংটন মিউচুয়াল বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন এর সম্পদমূল্য ছিল ৩০৭ বিলিয়ন ডলার। তার আগে ওই বছরের আগস্টে ইন্ডি ম্যাক নামে আরও একটি ব্যাংকিং কোম্পানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পড়ুন আগের খবর
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা
বন্ধ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ব্যাংক
কানাডা হতে ধেয়ে আসা দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর আকাশসীমা ও বায়ুমান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিবেশী দেশটির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই পরিস্থিতির জন্য কানাডা সরকারের ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’কে দায়ী করে বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে নোংরা, দূষিত এবং অস্বাস্থ্যকর বাতাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হচ্ছে।’
কানাডার ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্যমতে, দেশটিতে বর্তমানে ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে যার অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি ইতিমধ্যে ভস্মীভূত হয়েছে। ঘন ধোঁয়ার মেঘ মিনেসোটা, মিশিগান ও নিউ ইয়র্কসহ বেশ কিছু মার্কিন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে জারি করা হয়েছে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা। সুইস বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আইকিউএয়ার’ জানিয়েছে, শুক্রবার ডেট্রয়েট, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসির বায়ুমান ছিল বিশ্বের মধ্যে নিকৃষ্টতম। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ট্রাম্প কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ফোন করে বনভূমি ও ঝোপঝাড় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে কৈফিয়ত চাইবেন বলে জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে কানাডা সরকার আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানিয়েছে যে তাঁরা দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড মার্কিন আইনপ্রণেতাদের পাল্টা জবাব দিয়ে বলেন, “অভিযোগ না করে আপনাদের উচিত সহায়তা পাঠানো, কারণ আমরাও আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল ও হারিকেন মোকাবিলায় সাহায্য করেছি।” কানাডার দাবি অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং এটি কেবল একটি দেশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
এদিকে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছায়া পড়েছে আগামী রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালের ওপরেও। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও ধোঁয়ার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট টাস্কফোর্স বর্তমানে ফিফা কর্মকর্তাদের সাথে পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করছে।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফাটলকে আরও প্রশস্ত করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর আগে গত বছর কানাডার ওপর শুল্ক আরোপ করায় দীর্ঘদিনের মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কানাডীয়দের মধ্যে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং তাঁরা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ হ্রাস করার পাশাপাশি নির্মাণাধীন ‘গর্ডি হাও ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ’ উদ্বোধনে বিলম্বের প্রস্তাব তুলেছেন।
ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান জোরদার করে টানা সপ্তম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা ইরানের বিভিন্ন স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এই ধারাবাহিক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা শুক্রবার এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ সরবরাহের অবকাঠামো, মাটির নিচে অবস্থিত গোপন অস্ত্রভাণ্ডার এবং দেশটির সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই অভিযানটি ১৭ জুলাই স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৩০ মিনিটে সফলভাবে শেষ হয়।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি নির্দেশনায় ইরানকে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতেই এই সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করছে মার্কিন বাহিনী। তেহরানকে চাপে রাখতে এবং ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে। সেন্টকম জানিয়েছে যে, সমগ্র অঞ্চলে বর্তমানে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরণের পাল্টা আক্রমণ বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। দুই দেশের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক বড় ধরণের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের মূল ভূখণ্ড ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর টানা ষষ্ঠ দিনের মতো শুক্রবার (১৭ জুলাই) ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অধীনে গত এক সপ্তাহে করা কয়েকশ বিমান হামলায় বন্দর আব্বাস, আহভাজ, কোনারাক এবং কেশম দ্বীপের মতো উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তেহরানের দাবি, এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও একাধিক সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে আহতদের মধ্যে ২২ জন নারী এবং ৯ জন ১৮ বছরের কম বয়সি।
ইরানের পাল্টা আঘাত: যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক আক্রমণের জবাবে ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিয়ার আল-তানফে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান কমান্ড সেন্টারেও হামলা চালানো হয়েছে, যা সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওমানের ঘান্নেম এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার এবং সালামেহ রকস এলাকায় একটি নৌ-রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে আইআরজিসি (IRGC)। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। একই সঙ্গে ওমান সাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ট্যাংকারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও নৌ-অবরোধ: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করে কোনো জাহাজ ইরানকে সাহায্য করলে তা ধ্বংস বা অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে হামলা বা নৌচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির ঘটনায় চুপ করে বসে থাকবেন না। তবে একইসঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চান।
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ: সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল আবারও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তেহরান পুনরায় প্রণালীতে অবরোধ আরোপ করেছে এবং রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ০.৮৩ শতাংশ বেড়ে ৮৪.৯৩ ডলারে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইএএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তান চরম সংকটে পড়েছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান যেকোনো সময় এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তেলের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে। তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা চাই কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক।’
আলোচনায় ফেরার আহ্বান চীন-পাকিস্তানের: চীনের সাংহাইয়ে বৈঠক শেষে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানান। ওয়াং ই বলেন, ‘গত জুনে হওয়া সমঝোতা যুদ্ধ অবসানের পথে একটি কঠিন অর্জন ছিল। শান্তি এখন হাতের নাগালে, তাই শেষ মুহূর্তে সেই সুযোগ হারানো উচিত নয়।’
বাড়ছে তেলের দাম, উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতিতে: সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
এদিকে তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। তার ভাষায়, এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা চাই কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন। শুক্রবার (১৭ জুলাই) দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন জয়সওয়াল।
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আমরা জানতে পারছি, শেখ হাসিনা ও অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ আবারও ভারতকে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না। তা ছাড়া শেখ হাসিনা নিজেই আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না।’
এ প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা প্রত্যর্পণের জন্য একটা অনুরোধ পেয়েছি। যেমনটি আমরা আগে বলেছিলাম, অনুরোধটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে অনুরোধটি বিবেচনা করা হবে।’
আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন বাংলাদেশের করা আরেকটি প্রত্যর্পণের অনুরোধ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারা এক ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সব কাগজপত্র পাঠিয়েছেন। ওই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়ে ভারতীয় পুলিশের হেফাজতে আছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রাক্কালে একজন রাজনীতিবিদকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আপনাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে সেটার বর্তমান অবস্থা কী?’
এ প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’ এই প্রশ্নের উত্তরেও তিনি জানান, প্রত্যাবর্তনের যেকোনো অনুরোধ আইনগত বিষয় ও বিচারপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।
ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সের্গেই কোরেতস্কিকে নিয়োগ দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। দেশটির পার্লামেন্ট ভেরখোভনা রাদা’র সরাসরি সম্প্রচারিত এক শুনানি থেকে এই তথ্য জানা যায়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা তাস। এই নিয়োগের অনুমোদনের জন্য ২২৬টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। তবে সিদ্ধান্তটির পক্ষে মোট ২৮৯ জন আইনপ্রণেতা সমর্থন জানান।
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) পার্লামেন্ট প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে পদচ্যুত করে। নতুন ক্যাবিনেটে মিখাইল ফিওদোরভকে প্রতিরক্ষাপ্রধান হিসেবে বহাল না রাখার কিয়েভের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইউক্রেনজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেই এই নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ভোটটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পর ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়ে পার্লামেন্টে ভোটাভুটির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিক্ষোভের কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইগোর ক্লিমেনকোকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট সংগ্রহ করতে ভেরখোভনা রাদা বেশ জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। কোরেতস্কির পক্ষে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ক্যাবিনেটের মনোনয়নগুলো নিয়ে আইনপ্রণেতাদের আলোচনার সুযোগ দিতে সংসদীয় শুনানিতে দুই ঘণ্টার একটি বিরতি ঘোষণা করা হয়।
কে এই সের্গেই কোরেতস্কি: ১৯৭৮ সালে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ভোলিন অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী সের্গেই কোরেতস্কি মূলত দেশটির ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ২০০০-এর দশকে লুৎস্ক ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রকল্পের সাথে যুক্ত হন। ২০২২ সালে তিনি রাষ্ট্রচালিত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইউক্রনাফতা এবং ইউক্রতাতনাফতার নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইউক্রেনীয় গণমাধ্যমগুলোর মতে, কোরেতস্কির জনপ্রশাসনে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং তার পুরোনো বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার তিমুর মিন্দিকের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণেই তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মিন্দিকের সাথে সম্পৃক্ত কোনো দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে কোরেতস্কির জড়িত থাকার কোনো অফিসিয়াল তথ্য নেই। কোরেতস্কি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে দ্রুঝবা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল ট্রানজিট স্থগিত করার পরিস্থিতিতে কিয়েভের অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং এই স্থগিতাদেশের ফলে কিয়েভের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে। এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইউনিসেফ ‘দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সংকট বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতিকে ম্লান করে দিতে পারে। পাশাপাশি লাখ লাখ শিশুকে আরও গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে এবং বৈষম্য বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে দেশটিতে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বহু দূরবর্তী অঞ্চলের শিশুদেরও এর মূল্য দিতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা যত দিন চলতে থাকবে, এর প্রভাব ততটা ভয়াবহ হবে। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা এখন সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর যেসব শিশু আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, তাদের জন্য এ সংকট বঞ্চনাকে আরও গভীর করছে। এর প্রভাবে তাদের এমন ক্ষতি হতে পারে যার প্রভাব থাকবে সারা জীবন।’
ইউনিসেফ তাদের প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেছে—বিরূপ ও তীব্র দারিদ্র্য। বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়ে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু তীব্র অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে শিশুদের অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হওয়ার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, অর্থনৈতিক দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক দারিদ্র্যর প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এ দুই অঞ্চলে।
সোমালিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা দিয়েছে। সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মোগাদিসুতে জ্বালানির দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ফলে খাবার, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার খরচও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটি আরও তীব্র অপুষ্টিজনিত সংকটের মধ্যে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম ৩১ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। আর মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বেড়েছে ৫০-৭০ শতাংশ। ফলে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আফ্রিকার আরেক দেশ নাইজেরিয়ায়ও দারিদ্র্য বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০-৭০ শতাংশই খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের ক্রয়ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ সংকট শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচন-নিরাপত্তাবিষয়ক নিজের ভাষণ সম্প্রচার না করায় এবিসি, এনবিসি ও সিএনএনের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি ওই ভাষণ দিয়েছেন।
ভাষণ সম্প্রচার না করায় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তাদের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। খবর রয়টার্সের।
রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনের চার মাস আগে দেওয়া এ ভাষণে ট্রাম্প মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন-নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য দেন।
ভাষণের সময় তিনি বলেন, ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যম এবিসি ও এনবিসি আমার এই ভাষণ সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের প্রতারণার শাস্তি হওয়া উচিত তাদের লাইসেন্স বাতিল।’
তবে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী সম্প্রচারমাধ্যমগুলো কী প্রচার করবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের রয়েছে।
যদিও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হওয়ায় অতীতে এ ধরনের প্রেসিডেন্সিয়াল ভাষণ সাধারণত প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলো সরাসরি প্রচার করেছে।
এবিসি নিউজের একজন মুখপাত্র জানান, ট্রাম্পের ভাষণটি তাদের মূল টেলিভিশন চ্যানেলে নয়, এবিসি নিউজ লাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং এবিসি নিউজ রেডিওতে সম্প্রচার করা হয়েছে।
এনবিসিও ভাষণটি তাদের মূল সম্প্রচার চ্যানেলের পরিবর্তে বিনামূল্যের স্ট্রিমিং সেবা এনবিসি নিউজ নাও-তে প্রচার করে।
অন্যদিকে সিএনএন জানায়, ভাষণটি তাদের ওয়েবসাইট ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং সেবা সিএনএন অল এক্সেসে সরাসরি দেখানো হয়েছে। তবে কেবল টেলিভিশনের মূল চ্যানেলে তা প্রচার করা হয়নি।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর দর্শকসংখ্যা ঐতিহ্যবাহী সম্প্রচারমাধ্যমের তুলনায় অনেক কম।
চীনের হস্তক্ষেপের দাবি পুনরায় তুললেন ট্রাম্প: ভাষণে ট্রাম্প এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য অবমুক্ত করার ঘোষণা দেন, যা তার দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ বহন করে।
এর মাধ্যমে তিনি আবারও ২০২০ সালের নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বেইজিং ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হন।
ভাষণের আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছিলেন, ট্রাম্প নির্বাচন ছাড়াও ইরান পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন। তার মতে, এ কারণেই ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করা উচিত ছিল।
তবে ভাষণে ট্রাম্প সংক্ষেপে ইরান যুদ্ধ ও অর্থনীতির কথা উল্লেখ করলেও মূল জোর দেন নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগের ওপর।
ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি: ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন নেতা, যার মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজও রয়েছেন, ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের দাবি, ট্রাম্প আবারও ভিত্তিহীন নির্বাচন জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারেন।
ট্রাম্প বহু বছর ধরেই দাবি করে আসছেন, ২০২০ সালের নির্বাচন তার কাছ থেকে ‘ছিনিয়ে নেওয়া’ হয়েছিল। তিনি ডাকযোগে ভোট, ভোটিং মেশিন এবং অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া নিয়ে বারবার অভিযোগ তুললেও এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিবিএস ও ফক্স নিউজের ভিন্ন অবস্থান: সিবিএস তাদের নিয়মিত অনুষ্ঠানসূচি স্থগিত করে ট্রাম্পের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করে। তবে সম্প্রচারের আগে উপস্থাপক টনি ডকুপিল দর্শকদের সতর্ক করে বলেন, ‘সৎভাবে বলতে গেলে, এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন, তার অনেকটাই ভুল।’
তিনি বলেন, ‘তবু ভাষণটি সম্প্রচার করা হচ্ছে, কারণ এটি সংবাদ এবং সংবাদ পরিবেশন করাই তাদের দায়িত্ব।’
প্রায় ১৫ মিনিট পর সিবিএস সম্প্রচার থেকে সরে গিয়ে ট্রাম্পের নির্বাচন জালিয়াতিসংক্রান্ত দাবিগুলোর তথ্য যাচাই শুরু করে।
অন্যদিকে ফক্স নিউজ পুরো ভাষণই সরাসরি সম্প্রচার করে। তাদের কিছু স্থানীয় সম্প্রচার সহযোগীও কেবল নেটওয়ার্কটির সম্প্রচার প্রচার করে।
সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়ছে: ট্রাম্পের এ ভাষণ এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) বাড়তি নজরদারির মুখে রয়েছে।
ডিজনির মালিকানাধীন এবিসির বিরুদ্ধে বর্তমানে এফসিসির দুটি তদন্ত চলছে। এর একটি টেক্সাসের এক ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থীকে নিয়ে ‘দ্য ভিউ’ অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের মাধ্যমে সমান সম্প্রচার-সময়ের নীতিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিয়ে।
আগামী মাসেই ডিজনির মালিকানাধীন আটটি এবিসি স্টেশনের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে এনবিসি ও এর মূল প্রতিষ্ঠান কমকাস্টের সমালোচনা করে আসছেন। গত মাসে এনবিসির এক সাক্ষাৎকারের মাঝপথে ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে তিনি নেটওয়ার্কটিকে ‘একপেশে ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেন।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানে। ইসলামাবাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে দেশটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতের আবর্তে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে পাকিস্তানের যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে, তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছে রয়টার্স।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তবে একই সময়ে দেশটির সাথে সৌদি আরবের একটি শক্তিশালী পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বিদ্যমান এবং বর্তমানে কয়েক হাজার পাকিস্তানি সেনা ও একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। এর আগেও সৌদি আরবের ওপর হামলার ঘটনায় ইসলামাবাদ অসন্তোষ প্রকাশ করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের দুশ্চিন্তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চার বছরের দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি ভেঙে সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়াকে পাকিস্তান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষায়, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইসলামাবাদ এই বিষয়টিকে একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে গণ্য করছে। নিরাপত্তাবিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা মনে করেন, পরিস্থিতি এত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠবে তা ইসলামাবাদের ধারণার বাইরে ছিল। বিশেষ করে সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় হুথিদের ক্রমাগত হামলা তাদের জীবনকেও সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্য পথ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও পাকিস্তানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশ এই বাণিজ্যিক রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গুলাম মুস্তফার মতে, পাকিস্তানের বর্তমান নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও হুথিদের হামলা বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যেতে পারে এবং ইসলামাবাদ সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের চাপে পড়তে পারে। এ ছাড়া ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে, তা-ও ইসলামাবাদের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রভাবে চলতি সপ্তাহে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর পিছিয়ে গেলেও গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে তারা পাকিস্তানে পৌঁছান। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এ বিষয়ে সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, টেকসই সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।
জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মুখে রয়েছে। এ কারণে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এই সরবরাহ পথ সচল রাখা ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে সংঘাত যদি আরও চরম আকার ধারণ করে, তবে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষকে বেছে নেবে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু সৌদি আরব যদি আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াব। এতে কোনো সন্দেহ নেই। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছেন যে, ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সরকারের কিছু সদস্য গোপনে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন। গত বুধবার মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েলের এমন কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন। ভ্যান্সের দাবি, ইসরায়েল সরকারের কিছু অংশ চায় সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকুক, যার ফলে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তি চুক্তির পথ থেকে বিচ্যুত করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি বলেন, “ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য চান সামরিক অভিযান চলুক। তাই তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তির পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”
এই কূটনৈতিক তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করতে বিপুল অর্থায়নে পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করা হচ্ছে বলে মনে করেন ভ্যান্স। তাঁর ভাষায়, “আমি যে চুক্তির জন্য কাজ করছিলাম, সেটি ভেস্তে দিতে বিদেশি অর্থায়নে প্রচার চালানো হচ্ছে, যাতে জনমত চুক্তির বিরুদ্ধে যায়।” টাইম সাময়িকীর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে তিনি জানান, ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে মার্কিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ডিজিটাল প্রচারণার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার শিবিরের সাবেক এক ব্যবস্থাপককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ভ্যান্সের মতে, আলোচনা ও শান্তি প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত গোপনে এই বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, যাতে অনির্দিষ্টকাল ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, ভ্যান্সের নির্দেশিত এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের প্রভাবিত করা। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল-সম্পৃক্ত একটি গোষ্ঠী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের জন্য প্রেসিডেন্ট যে আলোচনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন, আমি সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আর সে কারণেই আমার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালানো হচ্ছে।” ভ্যান্স আরও যোগ করেন, “মিত্র হোক বা প্রতিপক্ষ—সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ইসরায়েলও এমন চেষ্টা করে থাকে, এতে আমার আপত্তি নেই। তবে আমার উদ্বেগ তখনই, যখন এ ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।”
গত মাসে সম্পাদিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ভ্যান্স জানান, ইসরায়েলের প্ররোচনা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সাম্প্রতিক এই ইরান যুদ্ধের সাথে জড়াতো না। এই বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমি তা–ই মনে করি।” যদিও বর্তমানে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রাবল্যে সেই শান্তি চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে, তবুও তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধে মার্কিন প্রশাসন অনড়। এ বিষয়ে ভ্যান্স স্পষ্ট করে বলেন, “ইসরায়েলের প্রভাবের বিষয়টি আলাদা। তবে প্রেসিডেন্ট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং আমিও একমত, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।” দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান এই আদর্শিক মতপার্থক্য এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনী নিরাপত্তা বিষয়ক নিজের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার না করায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তিন সংবাদমাধ্যম এবিসি, এনবিসি এবং সিএনএন-এর লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার মাস পর অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে আয়োজিত এই প্রাইম-টাইম ভাষণটি ওই নেটওয়ার্কগুলোর মূল চ্যানেলে না দেখানোয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তিনি। শুক্রবার (১৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর বক্তব্য প্রচার না করার এই সিদ্ধান্ত একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। এই বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “এনবিসি এবং এবিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা এই ভাষণ সম্প্রচার করবে না। এ ধরনের প্রতারণার শাস্তি হওয়া উচিত তাদের লাইসেন্স বাতিল।” যদিও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী যেকোনো সংবাদমাধ্যম তাদের বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। তবে প্রথাগতভাবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্টের ভাষণগুলো সাধারণত বড় নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি প্রচার করে থাকে।
এবিসি নিউজ জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের ভাষণটি মূল চ্যানেলে না দেখিয়ে তাদের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবিসি নিউজ লাইভ এবং এবিসি নিউজ রেডিওতে প্রচার করেছে। একইভাবে এনবিসি তাদের মূল চ্যানেলের পরিবর্তে বিনামূল্যের স্ট্রিমিং সেবা এনবিসি নিউজ নাও-তে ভাষণটি দেখিয়েছে। অন্যদিকে সিএনএন তাদের ওয়েবসাইট ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সরাসরি ভিডিও দেখালেও মূল কেবল চ্যানেলে ভাষণটি সম্প্রচার করেনি। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে দর্শকসংখ্যা মূল চ্যানেলের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে।
ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি এমন কিছু গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করেছেন যা মার্কিন নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ দেয়। যদিও ইতিপূর্বে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ২০২০ সালের নির্বাচনে বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ পায়নি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ভাষণের আগে জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচনী নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইরান পরিস্থিতি ও অর্থনীতি নিয়েও কথা বলবেন, যা জাতীয় গুরুত্বের দাবি রাখে। ভাষণে ট্রাম্প সংক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মার্কিন অর্থনীতির শক্তিমত্তার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি নির্বাচনী জালিয়াতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন।
ট্রাম্পের এই দাবির বিপক্ষে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজসহ অনেক রাজনীতিক এই ভাষণ সরাসরি প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, ট্রাম্প ভিত্তিহীন তথ্যের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন। তবে সিবিএস নিউজ ভাষণটি সরাসরি প্রচার করলেও প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর ট্রাম্পের দাবির সত্যতা যাচাই করে বিশ্লেষণ দেখিয়েছে। অন্যদিকে ফক্স নিউজ কোনো কর্তন ছাড়াই সম্পূর্ণ ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে এবিসি এবং এনবিসির মালিকানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) একাধিক তদন্ত পরিচালনা করছে। এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার এই বিতর্কের মাঝে মত দিয়েছেন যে, জনগণের জানার অধিকারের স্বার্থে প্রেসিডেন্টের এ ধরনের ভাষণ সম্প্রচার করা উচিত ছিল। সব মিলিয়ে গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্থাপিত হলো আজ ১৭ জুলাই শুক্রবার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনের শুভ উদ্বোধন করেছেন। এই যাত্রার মাধ্যমে ভারত বিশ্বজুড়ে গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের দৌড়ে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেল।
এর আগে গত ২২ মে এই বিশেষ ট্রেনে যাত্রী পরিবহণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল দেশটির রেল বিভাগের নীতি নির্ধারনী সংস্থা ইন্ডিয়ান রেল বোর্ড (আইআরবি)। বোর্ডের পক্ষ থেকে সেই সময়ে জানানো হয়েছিল যে, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন–চালিত ব্রডগেজ ট্রেন হতে চলেছে। সফল ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ার পর এখন থেকে এই ট্রেনটি নিয়মিত যাত্রী নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাতায়াত করবে। বিশেষজ্ঞরা হাইড্রোজেনকে বিশ্বের অন্যতম ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ট্রেন চালানো হয়, যেখানে কোনো ধোঁয়া বা ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস নির্গত হয় না। পরিবেশের ওপর নেতিবাচক কোনো প্রভাব ছাড়াই এই প্রক্রিয়া থেকে কেবল জলীয় বাষ্প বের হয়, যা কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও চিন ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং এখন সেই অভিজাত তালিকায় ভারতের নামও যুক্ত হলো।
‘Hydrogen for Heritage’ নামক এই প্রকল্পের অধীনে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে বিশেষ এই ট্রেনটি তৈরি করা হয়েছে। হরিয়ানা রাজ্যের জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত বিস্তৃত ৮৯ কিলোমিটার রেলপথে এই ট্রেনটি নিয়মিত চলাচল করবে। যাত্রাপথে ট্রেনটি পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্টসহ একাধিক স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেবে। ভারতীয় রেলওয়ে জানিয়েছে, প্রাথমিক এই রুটটি সফল হলে পরবর্তীতে হরিয়ানার কালকা শহর থেকে হিমাচল রাজ্যের রাজধানী শিমলা পর্যন্ত জনপ্রিয় পাহাড়ি পথেও এই ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কারিগরি দিক থেকে এই ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার ধরা হলেও এটি মূলত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৫ কিলোমিটার বেগে যাত্রা করবে। দুই হাজার ৬০০ জন যাত্রী পরিবহণ সক্ষম এই ট্রেনে দুটি হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার ও আটটি যাত্রিবাহী কোচ রয়েছে। প্রতিটি পাওয়ার কারে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য বিশেষ সিলিন্ডার সংযুক্ত করা হয়েছে। পাওয়ার কারগুলো ১,২০০ কিলোওয়াট শক্তি উৎপাদনে সক্ষম। ট্রেনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর ও আগুন শনাক্তকারী ফ্লেম ডিটেক্টরের মতো অত্যাধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ধোঁয়া ও তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪ ঘণ্টা নজরদারি মনিটরিং ব্যবস্থাও কাজ করবে। রিসার্চ ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (আরডিএসও)-এর নিপুণ নকশায় তৈরি এই ট্রেনটি ভারতের রেল ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রাশিয়ায় ‘ব্যাটল অব দ্য ড্রোনস’ নামক একটি পরিকল্পিত রিয়েলিটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই উদ্যোগের প্রচারণামূলক সম্ভাবনাকে তিনি "অত্যন্ত কার্যকর" বলে অভিহিত করেছেন। মস্কোতে আয়োজিত এক ফোরামে এই অনুষ্ঠানের রূপরেখা পেশ করা হয়, যেখানে মূলত সামরিক অভিজ্ঞ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং জনপ্রিয় ব্লগারদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানটির অন্যতম সঞ্চালক ও কৌতুক অভিনেতা মিখাইল গালুস্তিয়ান প্রেসিডেন্টকে জানান, এই আয়োজনটি "আমাদের মাতৃভূমির সবচেয়ে সুন্দর স্থানগুলোতে" ধারণ করা হবে এবং এটি হবে "যারা আগ্রহী, তাদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ এবং দক্ষতা প্রদর্শনের একটি দুর্দান্ত সুযোগ"। গালুস্তিয়ানের এই পরিকল্পনার জবাবে পুতিন তাঁর সম্মতির কথা জানিয়ে বলেন, "শুভকামনা। প্রচারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুতিন মূলত রাশিয়ার তরুণ প্রজন্মকে ড্রোন চালনা শিখতে এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করার কৌশল নিয়েছেন। ক্রেমলিন ইতিমধ্যে রাশিয়ার আড়াই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড্রোন অপারেটর নিয়োগের প্রচারণা শুরু করেছে। রাশিয়ার বাইরে থেকে পরিচালিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নোভায়া গেজেটা ইউরোপ-এর তথ্য অনুযায়ী, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ড্রোন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রসারে রুশ সরকার প্রায় ১৬ বিলিয়ন রুবল ব্যয় করছে। এছাড়া স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ফারিডেইলির উদ্ধৃত একটি সূত্র জানাচ্ছে, অন্তত ৪৪ হাজার শিক্ষার্থীকে সরাসরি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানটি মূলত তরুণ দর্শকদের পছন্দের টেলিভিশন চ্যানেল টিএনটিতে সম্প্রচারিত হবে।
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক মিখাইল গালুস্তিয়ান পুতিনের অত্যন্ত পছন্দের ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর অভিনীত পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানগুলোতে পুতিনকে প্রায়ই পশ্চিমা নেতাদের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান ও কৌশলী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তবে এই রিয়েলিটি শো নিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ভিন্ন মতও দেখা দিয়েছে। সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা কিছু সামরিক ব্লগার এই বিনোদনমূলক আয়োজনের সমালোচনা করেছেন। টেলিগ্রাম চ্যানেল 'হোয়েন দ্য ক্যানন বিগ্যান টু সিং'-এ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, "এই মুহূর্তে এসব ড্রোনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে: বেসামরিক মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, শহরগুলো ধ্বংস হচ্ছে এবং তেল শোধনাগারগুলোতে আগুন জ্বলছে।"
তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই রিয়েলিটি শো-এর নাম ‘ব্যাটল অব দ্য ড্রোনস: ইউক্রেন’ নামক একটি ভিডিও গেমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা কিশোরদের সামরিক মনস্তত্ত্বের দিকে ধাবিত করার একটি অন্যতম হাতিয়ার। রুশ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম টি-ইনভারিয়েন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাতারস্তানের আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত ড্রোন উৎপাদন কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের গেম ও প্রতিযোগিতার প্রচারণা চালায়। মূলত সম্ভাবনাময় ও দক্ষ ড্রোন অপারেটর খুঁজে বের করতেই এসব ড্রোন-কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যেখানে বিজয়ীদের জন্য কয়েক কোটি রুবল পর্যন্ত পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। সব মিলিয়ে এই বিনোদনমূলক শো-টিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি আধুনিক প্রচারণা হিসেবে দেখছে ক্রেমলিন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ ও সংঘাতের তীব্রতা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত মাসে সম্পাদিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে এখন সরাসরি ও নিয়মিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানের অভ্যন্তরে কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে শক্তিশালী হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর জবাবে আজ শুক্রবার ভোররাত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একযোগে নজিরবিহীন পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। দুই পরাশক্তির এই মরণপণ লড়াইয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ, যার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও নজরদারি ব্যবস্থা চিরতরে পঙ্গু করে দিতেই এই ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেন্টকমের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং রণতরি ব্যবহার করে ইরানের উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অবকাঠামোসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর হামলায় এবার সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান প্রধান বেসামরিক অবকাঠামো লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। দক্ষিণ ইরানের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সেতু, উপকূলীয় শহর বন্দর খামিরের রেলস্টেশন এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইরানশাহর বিমানবন্দরকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হয়েছে। রয়টার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, বন্দর খামিরের সেতুগুলোতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাবর্ষণের ফলে অন্তত সাতজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
নিজেদের ভূখণ্ডে এমন বিধ্বংসী হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একযোগে হামলা শুরু করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিসহ বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এবিসি নিউজ-এর এক বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিওর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিট সদর দপ্তর এবং কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার আল-তানফে মার্কিন স্পেশাল অপারেশন কমান্ড সেন্টার ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্রেও ইরানি বাহিনী আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, বিস্ফোরণে উড়ে আসা ধাতব টুকরোর আঘাতে এক শিশু আহত হয়েছে।
এই চরম উত্তেজনার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন সম্পূর্ণ অচল। তেহরান এই নৌপথে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে এবং ওয়াশিংটনও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে অবরোধ জোরদার করেছে। রয়টার্স-এর সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জাতীয় গ্রিড বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জাতীয় অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তেহরান ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
ইরানের জন্য ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি ও আলোচনার প্রস্তাব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরানের সাথে কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলা ও রণপ্রস্তুতি চললেও দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট এই তথ্য জানান। খবর আল আরাবিয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে লেভিট বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘ইরান যদি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করবেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের জন্যও প্রস্তুত।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তবে আলোচনার প্রস্তাবের পাশাপাশি তেহরানকে কঠোর সতর্কবার্তাও দিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটন। লেভিট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর হামলা চালিয়ে ইরান কোনো ধরনের পরিণতি এড়াতে পারবে না।’ মূলত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েকদিন ধরে ইরানের ওপর একাধিক দফায় হামলা চালিয়েছে, যার ফলে গত জুন মাসে কার্যকর হওয়া একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এই চরম কূটনৈতিক অচলাবস্থার মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখা গিয়েছিল সম্প্রতি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানে আটক থাকা একজন মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক একে দুই দেশের মধ্যকার বরফ গলার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছিলেন। তবে মাঠপর্যায়ের সামরিক বাস্তবতা এখন ভিন্ন সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, তেহরান যদি গঠনমূলক আলোচনায় ফিরে না আসে, তবে মার্কিন হামলার পরিধি ও ভয়াবহতা আরও বাড়ানো হবে। সেক্ষেত্রে ইরানের জাতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র, বড় বড় যোগাযোগ সেতুসহ দেশটির অতি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোগুলোও মার্কিন নিশানায় পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একদিকে আলোচনার প্রস্তাব এবং অন্যদিকে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের এক জটিল সমীকরণ নিয়ে এগোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।