মানুষ কেন মানুষ, কোথা থেকে এল এই মানুষ- মানবজাতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এগুলো। আফ্রিকা থেকে এক সময় মানুষ সারা দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সে কথা এখন অনেকেরই জানা। তবে মানবজাতির যে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্য ছিল- তা অতি সম্প্রতি জানা গেছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির, বিশেষ করে নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের যোগসূত্র অনুসন্ধান করে এবং মানুষের উৎসের সন্ধান দিয়ে এবার চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন সুইডিশ বিজ্ঞানী সান্তে পাবো।
চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার ঘোষণাকারী কারোলিন্স্কা ইনস্টিটিউট আজ সোমবার এই পুরস্কার ঘোষণার সময় বলেছে, প্রাচীন মানবপ্রজাতিগুলোর জিন আজকের মানুষের মধ্যে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টি এখনো প্রাসঙ্গিক। যেমন সংক্রমণ হলে আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা জিনের এই প্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। শুধু তা-ই নয়, সান্তে পাবো একটি মানবপ্রজাতির সন্ধানও দিয়েছেন, পৃথিবীর বুকে প্রাচীন আমলে যাদের বিচরণ ছিল।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, সান্তে পাবোর গবেষণায় বিজ্ঞানের পুরোপুরি একটি নতুন শাখার জন্ম হয়েছে- প্যালিওজজিনোমিকস।
সুইডেনের স্টকহোমে ১৯৫৫ সালে জন্ম সান্তে পাবোর। সুইডেনের উপাসালা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পোস্ট ডক্টরাল ফেলো করেন সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জুরিখ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখে ১৯৯০ সালে অধ্যাপক নিযুক্ত হন সান্তে পাবো। ১৯৯৯ সালে জার্মানির লিপজিগে গড়ে তোলেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপলজি। এখনো সেখানেই কাজ করছেন সান্তে পাবো। পাশাপাশি জাপানের ওকিনাওয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
সান্তে পাবো তাঁর গবেষণায় আধুনিক মানুষের নিকটাত্মীয় মানবজাতিরই আরেক প্রজাতি নিয়ান্ডারথালদের জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন। মানবজাতির একটি মাত্র প্রজাতিই এখন টিকে আছে- হোমো সেপিয়েন্স, যাকে আমরা আধুনিক মানুষ হিসেবে জানি। পাবো তাঁর গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছেন যে মানুষের অন্য প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হলেও আধুনিক মানুষ তাদের জিন ঠিকই শরীরে বহন করে চলেছে। হোমো সেপিয়েন্সের শরীরে অন্য প্রজাতিগুলোর জিনের প্রবেশ ঘটেছে আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে, যখন তারা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, আধুনিক মানুষ হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব ঘটে আজ থেকে আনুমানিক ৩ লাখ বছর আগে আফ্রিকায়। মানুষের নিকটতম আত্মীয় নিয়ান্ডারথালদের আবির্ভাব ঘটে তারও আগে আফ্রিকার বাইরে এবং ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ৪ লাখ বছর আগে থেকে ৩০ বছর আগ পর্যন্ত তাদের বিচরণ ছিল। তবে ৩০ হাজার বছর আগে তারা এই পৃথিবী বিলুপ্ত হয়ে যায়। ৭০ হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়, তারপর তারা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে নিয়ান্ডারথাল ও হোমো সেপিয়েন্স একসঙ্গেই ছিল। তবে বিলুপ্ত এই নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের সম্পর্ক কী, তা নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত জানা যায়নি। ওই দশকে বিজ্ঞানীরা মানুষের পুরো জিন রহস্য উন্মোচনে সমর্থ হন। এতে নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের সম্পর্কের সূত্র অনুসন্ধানের পথ প্রসারিত হয়েছে।
নোবেল কমিটি বলেছে, সান্তে পাবো মানুষের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তিনি বহু বছর আগে থেকেই নিয়ান্ডারথালদের ডিএনএ নমূনা নিয়ে গবেষণার চেষ্টা করছিলেন। তবে খুব শিগগির তিনি অনুধাবন করেন, এই কাজ প্রায় অসাধ্য। কারণ নিয়ান্ডারথালরা বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ডিএনএতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং ডিএনএগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। যাও টিকে আছে, তা ব্যাপকভাবে দুষিত। এসব ডিএনএ নমূনার সঙ্গে মিশেছে ব্যাকটেরিয়া ও সমকালীন মানুষের ডিএনএও। ফলে নিয়ান্ডারথালদের ডিএনএ আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পোস্ট ডক্টোরাল শিক্ষার্থী হিসেবে জৈব রসায়নের অধ্যাপক অ্যালান উইলসনের সঙ্গে কাজ করার সময় নিয়ান্ডারথালদের ডিএনএ নমুনা নিয়ে কাজ করার পদ্ধতি উদ্ভাবনে সচেষ্ট হন। অ্যালান উইলসনকে বিবর্তন জীববিদ্যার দিকপাল বলা হয়।
১৯৯০ সালে সান্তে পাবো ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখে অধ্যাপনা শুরু করার পর নিয়ান্ডারথালদের মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করায় মনোনিবেশ করেন। মাইটোকন্ড্রিয়াকে বলা হয় কোষের ‘শক্তির ঘর’। এর থেকে জীবকোষ তার শক্তি পায়। তবে মাইটোকন্ড্রিয়া কেবল নিজের ডিএনএ ধারণ করে। কাজেই তুলনামূলক অত্যন্ত ক্ষুদ্র এই ডিএনএ কেবল বংশগতির খুব সামান্য তথ্য ধারণ করে রাখে। অবশ্য হাজার হাজার এমন ডিএনএ বিশ্লেষণ করলে তুলনামূলক বেশি তথ্য পাওয়া সম্ভব। সান্তে পাবো ৪০ হাজার বছর আগের এক নিয়ান্ডারথালের হাড়ের একটি অংশের কোষে টিকে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে কাজ শুরু করেন। আর এভাবে বিলুপ্ত এক মানবপ্রজাতির জীবনরহস্য উন্মোচনের পথ খোলে। দশকের পর দশক কাজ করে অসম্ভবকে সম্ভব করে ২০১০ সালে সান্তে পাবো প্রথমবারের মতো নিয়ান্ডারথালদের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করতে সমর্থ হন। এরপর তুলনামূলক বিশ্লেষণে জানা যায়, নিয়ান্ডারথাল ও হোমো সেপিয়েন্সের পূর্বপুরুষ ছিল একই এবং সেই পূর্বপুরুষেরা ৮ লাখ বছর আগে বিচরণ করতো।
বিলুপ্ত নতুন এক মানবপ্রজাতির সন্ধান
২০০৮ সালে সাইবেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ডেনিসোভা গুহায় ৪০ হাজার বছর আগের একটি আঙুলের হাড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। ওই হাড়ে অবিশ্বাস্যভাবে ডিএনএ অটুট ছিল, যা পরে সান্তে পাবো ও তাঁর দল জিনোম সিকোয়েন্স করেন। ফলাফল ছিল চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। একেবারেই অন্য রকম কোনো মানুষের ছিল সেই হাড়, যার সঙ্গে নিয়ান্ডারথাল কিংবা আধুনিক মানুষের ডিএনএর খুব কমই মিল রয়েছে। নতুন এই প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয় ডেনিসোভা। গবেষণায় আধুনিক মানুষের শরীরে ডেনিসোভাদের জিনের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। এই সম্পর্কটা প্রথম দেখা গেছে মেলানেশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশে, যেখানকার মানুষের ডিএনএতে ৬ শতাংশ ডেনিসোভাদের ডিএনএর অস্তিত্ব রয়েছে। সান্তে পাবোর এই আবিষ্কার মানবজাতির বিবর্তনের বিষয়ে নতুন ধারণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ট্রানজিট ভিসা নেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে মিশর। সম্প্রতি ঢাকাস্থ মিশর আরব প্রজাতন্ত্রের দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে মিশরের ওপর দিয়ে অন্য কোনো দেশে ভ্রমণের আগে যাত্রীদের অবশ্যই দূতাবাসের মাধ্যমে অগ্রিম ট্রানজিট ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।
দূতাবাস স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই ট্রানজিট ভিসা ভ্রমণের পূর্বেই ঢাকাস্থ মিশর দূতাবাস থেকে সংগ্রহ করা আবশ্যক। ভিসা আবেদনের জন্য ভ্রমণকারীর একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকতে হবে। এর পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যাত্রী যে চূড়ান্ত গন্তব্যে যাচ্ছেন, সেই দেশের বৈধ ভিসা কিংবা রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতিপত্র সাথে থাকা বাধ্যতামূলক।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যাত্রীদের ভ্রমণপথের তালিকায় মিশরকে অন্য একটি গন্তব্যে যাওয়ার ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে ভিসা থাকলেই মিশরে প্রবেশ নিশ্চিত নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে দেশটির অভিবাসন নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে ভ্রমণকারী ব্যক্তি মিশরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছেন কি না, সেটিও অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ভ্রমণকালীন যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি ও জটিলতা এড়াতে যাত্রীদের বিমান টিকিট কাটার আগেই প্রয়োজনীয় ট্রানজিট ভিসা সংগ্রহ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে দূতাবাস। এই ভিসা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং আবেদন প্রক্রিয়ার নিয়মাবলী জানতে আগ্রহীদের সরাসরি দূতাবাসের কনস্যুলার শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও তীব্র করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই ঘোষণার পরপরই লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বিশেষ করে পূর্ব লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেকা উপত্যকাসহ বেশ কিছু এলাকায় এই জোরালো অভিযান চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। নতুন করে এই সামরিক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেন যে, তার দেশ বর্তমানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে লিপ্ত এবং সামরিক বাহিনীকে শত্রুর শক্তি গুড়িয়ে দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ পর্যন্ত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযানে ৬০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তু বা প্রতিরোধক সফলভাবে নির্মূল করেছে ইসরায়েল। চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
চলতি মাসের শুরুর দিকে দুই দেশ ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। গত ১৬ এপ্রিলের পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা মূলত দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও সোমবার রাতের হামলাটির পরিধি বেড়েছে। সিরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকায় আক্রমণ চালানোর বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংঘাতের পরিধি এখন বিস্তৃতির পথে। ইসরায়েলের দাবি, ওই অঞ্চল থেকে ড্রোন ও রকেট হামলা চালানো হচ্ছিল, যা প্রতিহত করতেই এই অভিযান।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে এ পর্যন্ত লেবাননের প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক ইসরায়েলি অভিযানে ৪ শতাধিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে জরুরি সেবা কর্মীরাও রয়েছেন। অন্যদিকে, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে অনবরত সরে যাওয়ার নির্দেশের কারণে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান সরকার সব পক্ষকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানালেও ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধে নারাজ। লেবানন সরকার বর্তমানে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি ছাড়া এই জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট নিরসন করা সম্ভব নয়। বর্তমান সংঘাতের যে ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে পুরো অঞ্চলটিতে একটি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে ১২২ কোটি ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের চার দিনের সরকারি সফরকালে এই ঐতিহাসিক চুক্তি ও একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পন্ন হয়। মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ওষুধ শিল্প এবং স্মার্ট প্রযুক্তির মতো আধুনিক ও সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে কেন্দ্র করেই এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের উপস্থিতিতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এই দলিলে স্বাক্ষর করেন।
বিনিয়োগের এই বড় অংকের পাশাপাশি বাণিজ্য, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা, এবং প্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের মধ্যে গভীর সহযোগিতার পথ প্রশস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন, যা আগামী দিনে পাকিস্তানের বিভিন্ন শিল্প খাতে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তির ফলে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এর বাইরেও নতুন নতুন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায়িক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। পাকিস্তান সরকার মনে করছে, এই বিনিয়োগ দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে বড় ধরনের সহায়তা করবে।
এই সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বৈশ্বিক রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। তিনি পাকিস্তানকে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন। চীনের এই ইতিবাচক মনোভাবের জবাবে শেহবাজ শরীফ দুই দেশের সম্পর্ককে ‘আয়রন ব্রাদার’ বা অটুট ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই গভীর সম্পর্কের কোনো তুলনা হয় না।
বৈঠকটি কেবল অর্থনৈতিক বিষয়বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি নিয়েও বিশেষ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের উপস্থিতি আলোচনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বৈঠকে ইরান সংকট নিরসনে পাকিস্তানের নেওয়া বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট। চীন ও পাকিস্তান উভয় দেশই মনে করে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত ঐক্য অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, এই ১২২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি ও বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, তাতে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এই সফর এবং চুক্তিসমূহ কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীন ও পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দীর্ঘ ৮৭ দিন ধরে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর ইরানে পুনরায় ইন্টারনেট সেবা চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে এই দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইন্টারনেট সংযোগ দ্রুত আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থার কারণে দেশটির সাধারণ নাগরিক জীবন ও জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় তিন মাস ধরে ইরানের সাধারণ মানুষ বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এই সময়ে সাধারণ নাগরিকরা কেবলমাত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল উপায়ে এবং উন্নত মানের ভিপিএন ব্যবহার করে কোনোমতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতেন, যা দেশের সিংহভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। বর্তমানে প্রেসিডেন্টের আদেশের পর যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তিগত কাজ শুরু করেছে এবং রয়টার্স ও আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই ইতিবাচক পরিবর্তনের খবর নিশ্চিত করেছে।
সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে মোবাইল ডাটা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেবা পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে এখনো বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ও জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৮৭ দিন পর সংযোগ ফিরে পেতে শুরু করলেও ইন্টারনেটের গতি এখন পর্যন্ত বেশ ধীর এবং অনেক এলাকায় এটি অনিয়মিতভাবে কাজ করছে। পুরোপুরি স্বাভাবিক গতি ফিরতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের এই ইন্টারনেট শাটডাউনের ফলে ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও অনলাইনভিত্তিক সেবা খাতগুলো ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির ফ্রিল্যান্সার, প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনলাইন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে যে, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনের উদ্দেশ্যেই এই ব্ল্যাকআউট কার্যকর করা হয়েছিল। তারা অবিলম্বে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং সকল ধরনের ডিজিটাল সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ইন্টারনেট চালুর এই ঘোষণায় দেশটির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকেই আশা করছেন, এর মাধ্যমে মুখ থুবড়ে পড়া অনলাইন ব্যবসাগুলো পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে এমন দীর্ঘমেয়াদী বিচ্ছিন্নতা একটি দেশের উন্নয়নের গতিকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। ফলে সরকারের এই সিদ্ধান্ত কেবল যোগাযোগের জন্যই নয়, বরং ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার জন্যও একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা চলমান থাকা অবস্থাতেই দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই অভিযানকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, নিজেদের বাহিনীকে সুরক্ষা দিতেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন পেতে রাখার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকা নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সোমবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বিষয়টি নিশ্চিত করলেও হামলার বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য দেননি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সাম্প্রতিক এই হামলা সেই প্রক্রিয়াকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কিছুক্ষণ আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সমুদ্রে একটি জাহাজে আক্রমণ চালিয়েছিল। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ ধরনের ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এবারের হামলা চলমান শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও তিনি কড়া আলটিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন যে, এই আলোচনা হয় সবার জন্য একটি ‘বড় চুক্তিতে’ পরিণত হবে, নয়তো কোনো চুক্তিই হবে না। বড় চুক্তি না হলে তিনি পুনরায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সাথে তিনি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর অথবা আন্তর্জাতিক তদারকিতে ধ্বংস করার প্রস্তাবও দিয়েছেন এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে নতুন মুসলিম দেশগুলোকে যুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এই দলে রয়েছেন, যারা মূলত স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে থাকা জটিলতাগুলো নিরসনে কাজ করছেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনায় কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দেওয়ার সময় আসেনি। বর্তমানে পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়ে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিই দুই পক্ষের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য দোহায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলছে, অন্যদিকে দক্ষিণ ইরানে সামরিক হামলা এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি টেকসই ও বড় মাপের চুক্তির ওপর জোর দিলেও মাঠপর্যায়ের সংঘাত এবং উভয় পক্ষের অনমনীয় অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে। ইরান আলোচনার অগ্রগতি স্বীকার করলেও চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে দোহা আলোচনার ফলাফলের দিকে, যা নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে ৬.৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৩টা ৫২ মিনিটে এই ভূকম্পনটি আঘাত হানে। চিলির উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় কম্পনটি বেশ জোরালোভাবে অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির কালামা শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার পূর্ব উত্তর-পূর্বে। ইউএসজিএস-এর দেওয়া তথ্যমতে, ভূপৃষ্ঠ থেকে এই কম্পনের গভীরতা ছিল ১০৯ কিলোমিটার। সাধারণত ভূমিকম্পের গভীরতা বেশি হলে ভূপৃষ্ঠে সরাসরি ধ্বংসলীলার আশঙ্কা কিছুটা কম থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর তাৎক্ষণিকভাবে উপকূলীয় এলাকায় কোনো ধরনের সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি। এছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাসিন্দাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চিলি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রায়ই মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। টেকটোনিক প্লেটের নিয়মিত চলনের ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটির অবকাঠামো ও জনসচেতনতা বেশ উন্নত হওয়ায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ভূমিকম্পটির তীব্রতা যথেষ্ট থাকলেও গভীরতা এবং জনবসতি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে হওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিপদের খবর আসেনি। তবে সম্ভাব্য আফটারশক বা পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে), পবিত্র ৯ জিলহজ। ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন সারা বিশ্ব থেকে আসা ১৫ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মক্কা, মিনা ও আরাফাতের আকাশ-বাতাস এখন আল্লাহর মেহমানদের ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির) ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
গতকাল সোমবার (৮ জিলহজ) তাঁবুর শহর মিনায় ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকার পর, আজ মঙ্গলবার ফজরের নামাজ আদায় করেই হাজিরা ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা হন। হাজিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রায় ২৪ হাজার বাসের ব্যবস্থা করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে আজ হজের মূল খুতবা পাঠ করবেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ আলি আল হুদাইফি। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সুবিধার্থে এই খুতবা বাংলাসহ ৩৫টি ভাষায় সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে।
খুতবা শেষে এক আজান ও দুই ইকামতে জোহর এবং আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন হাজিরা। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ময়দানে অবস্থান করে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও রহমত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করবেন তারা। সূর্যাস্তের পর হাজিরা মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন এবং সেখানে গিয়ে মাগরিব ও এশা একসঙ্গে আদায় করে খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করবেন। মিনায় শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় কঙ্কর হাজিরা এই মুজদালিফা থেকেই সংগ্রহ করবেন।
পরদিন বুধবার (১০ জিলহজ) সকালে পুনরায় মিনায় ফিরে হাজিরা ধারাবাহিকভাবে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং কাবা শরিফ তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করবেন। পরবর্তী দিনগুলোতেও পাথর নিক্ষেপ শেষে বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে শেষ হবে হজের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া।
সৌদি আরবে বর্তমানে তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে, যার গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই বৈরী আবহাওয়ায় হাজিদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে আড়াই লাখ সরকারি কর্মকর্তা এবং ৪০টিরও বেশি সংস্থা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এবার হজ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ড্রোন ক্যামেরা এবং বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা। এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজারের বেশি হজযাত্রী এই পবিত্র মহাসম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশি হাজিদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও আবাসন সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বাংলাদেশ হজ মিশন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতির মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে নতুন করে আকাশপথে আক্রমণ চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপনের চেষ্টায় নিয়োজিত স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে এই আত্মরক্ষামূলক হামলা চালানো হয়েছে।” যুক্তরাষ্ট্রের এই ঝটিকা আক্রমণটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো যখন কাতারর দোহায় দুই দেশের বৈরিতার অবসানে কূটনৈতিক সংলাপ চলছিল বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও বন্দর নগরী আব্বাসের সংলগ্ন এলাকায় এই সুনির্দিষ্ট অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথ হওয়ার কারণে ভৌগোলিকভাবে এই এলাকাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এর আগে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমে ওই এলাকায় জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর প্রচার করা হয়েছিল। মার্কিন মুখপাত্রের দাবি, “চলমান যুদ্ধবিরতির সময়ে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী তাদের সৈন্যদের নিরাপত্তা রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে।” যদিও এই হামলার বিষয়ে তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে এই পদক্ষেপ দোহা আলোচনার গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবারের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন যে, “অনেক বিষয়ে অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষর এখনই আসন্ন—এমন দাবি কেউ করতে পারে না।” বর্তমানে দুই পক্ষ মূলত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করা এবং পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি আক্রমণে আহত ইরানের শীর্ষ নেতা মোজতবা খামেনেই বর্তমানে অজ্ঞাত স্থানে থাকায় প্রতিনিধিদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা আলোচনার প্রক্রিয়াকে মন্থর করছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ অবমুক্ত করার পাশাপাশি পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিষ্পত্তির পথে বড় অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর প্রসঙ্গে সোমবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, “এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, অথবা ইরানের মাটিতেই তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে।” উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলে যৌথ হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এবং এর জেরে তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি পালন করে আসছিল, যা নতুন এই হামলার ফলে এখন বড় ধরনের শঙ্কার মুখে পড়েছে।
লেবাননের ‘প্রতিরোধ ও মুক্তি দিবস’ উপলক্ষে দেশটির সরকার, জনগণ এবং হিজবুল্লাহর প্রতি বিশেষ অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি এবং হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের কাছে পাঠানো পৃথক বার্তায় তিনি হিজবুল্লাহ ও লেবাননের প্রতি তেহরানের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ২০০০ সালে লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে আরাগচি জোর দিয়ে বলেন যে, ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেবাননের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ইরান সর্বদা পাশে থাকবে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে এলো, যার ঠিক আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যকার শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করার জন্য হিজবুল্লাহর তীব্র নিন্দা জানান এবং দেশটির সাধারণ জনগণকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনায় লেবানন যুদ্ধের অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা কাটেনি।
এদিকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে লেবাননের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন যে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননসহ সবকটি ফ্রন্ট থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার অধিকারের’ বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেছেন। তবে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের এই অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা লেবাননকে একা ফেলে যাবে না। যুদ্ধ অবসানের জন্য যেকোনো ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় লেবানন ও হিজবুল্লাহর হাত ইরান শক্ত করে ধরে রাখবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে।
মার্কিন-ইরান সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতার আবহে সৌদি আরবে আজ সোমবার (২৫ মে/৮ জিলহজ) থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র হজের মূল আচার-অনুষ্ঠানিকতা। গতকাল রবিবার রাত থেকেই হজযাত্রীরা মক্কা থেকে তাঁবুর শহর মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে সৌদির হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
পবিত্র কাবা শরীফ সাতবার তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ শেষে হজযাত্রীরা বাসে চেপে কিংবা পায়ে হেঁটে মিনার দিকে রওনা হন। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এবারের হজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ১৫ লাখ বিদেশি হজযাত্রীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সৌদি আরবের আরও কয়েক লাখ স্থানীয় নাগরিক। ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই হজ পালন সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার আবশ্যিক।
হজের এই আধ্যাত্মিক কার্যক্রম মোট ছয় দিনব্যাপী স্থায়ী হবে। সাধারণত ঈদুল আজহার তিন দিন আগে থেকে শুরু হয়ে ঈদের দুই দিন পর পর্যন্ত এই আনুষ্ঠানিকতা চলে। সৌদি আরবে আগামী ২৭ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার কথা রয়েছে, সেই অনুযায়ী ২৯ মে হবে এবারের হজের শেষ দিন।
হজযাত্রীদের যাত্রা ও অবস্থান নির্বিঘ্ন করতে সৌদি সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আবাসন, আতিথেয়তা এবং যাতায়াত ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জিলকদ মাস থেকে এ পর্যন্ত হাজিদের তাঁবু ও সেবাকেন্দ্রগুলোতে ৮৩ হাজারেরও বেশি মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। মিনার ক্যাম্পে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা, খাদ্য ও পরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধানের জন্য বিশেষ তদারকি দল মোতায়েন রাখা হয়েছে বলে সৌদি গেজেট সূত্রে জানা গেছে।
পাকিস্তানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
সোমবার (২৫ মে) স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, সোয়াত থেকে পেশোয়ারগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে চালক সেটি রাস্তার পাশে থামিয়ে দেন। বাসের মেরামতের অপেক্ষায় যাত্রীরা যখন নিচে অবস্থান করছিলেন, ঠিক সেই সময় একটি দ্রুতগামী মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাস ও যাত্রীদের সজোরে ধাক্কা দেয়।
উদ্ধার কর্মকর্তা বিলাল আহমাদ ফাইজি হতাহতের তথ্য প্রদান করে বলেন, ‘অন্তত ১৭ জন নিহত হন এবং ১০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।’ এছাড়া চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসক মুহাম্মাদ আলিও নিহতের এই সংখ্যাটি নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, বাসের যাত্রীদের অধিকাংশই আসন্ন ঈদুল আজহা উদযাপনের উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন। সাধারণত পাকিস্তানে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের শিথিলতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং সড়ক নিরাপত্তার নিম্নমানের কারণে প্রায়ই এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ অবসানের পর আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শনিবার বেশ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক যৌথ ফোনালাপে তিনি এই বিশেষ অনুরোধ জানান। দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফোনালাপে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার পর তার পরবর্তী বড় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে ইসরায়েল ও বিভিন্ন মুসলিম দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা, যা মূলত ঐতিহাসিক আব্রাহাম চুক্তিরই একটি বর্ধিত রূপ। বিশেষ করে একটি সৌদি-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যদিও বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের কারণে এই পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান এবং বাহরাইনের নেতারা যুক্ত ছিলেন। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদসহ অন্য নেতারা এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের সংহতি প্রকাশ করেছেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে নেতারা ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘তারা সবাই বলেছেন, এই চুক্তিতে আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আর যদি এটি কাজ না-ও করে, তবুও আমরা আপনার সঙ্গেই থাকব।’ ফোনালাপ চলাকালীন ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন যে, ইরান সংকট মিটে যাওয়ার পর তিনি আশা করেন যারা এখনও ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেননি, তারা দ্রুতই এই প্রক্রিয়ায় শামিল হবেন। তবে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে এই অনুরোধটি এতটাই অভাবিত ছিল যে, আলোচনার মাঝে এক পর্যায়ে স্তব্ধতা নেমে আসে। ওই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে একজন কর্মকর্তা জানান, ‘অনুরোধের পর লাইনে সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এসেছিল এবং ট্রাম্প রসিকতা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তারা এখনও লাইনে আছেন কি না।’ এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী তদারকির দায়িত্ব জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
পরদিন রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে লিখেন, ‘আমি মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশকে এ পর্যন্ত তাদের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই, যা ঐতিহাসিক আব্রাহাম চুক্তিতে তাদের যোগদানের মাধ্যমে আরও বৃদ্ধি ও শক্তিশালী হবে।’ তিনি এমনকি সুদূর ভবিষ্যতে ইরানকেও এই শান্তি প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও তার পূর্বশর্ত হিসেবে তেহরানকে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এদিকে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে আরব নেতাদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ না করা হবে একটি ঐতিহাসিক ভুল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থি সরকারের নীতি নিয়ে সন্দিহান এবং তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে অনড় প্রতিশ্রুতি দাবি করে আসছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা একদম সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দেশটির শীর্ষ নেতাদের সাথে আয়োজিত এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
এই শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সাথে চীন সফরে রয়েছেন।
বেইজিংয়ে চীনা নেতৃত্বের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনার সময় সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে পাশে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন।
এই বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সমগ্র বিশ্ব একটি অত্যন্ত সংকটময়, সংবেদনশীল ও জটিল মুহূর্ত অতিক্রম করছে। তবে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে তিনি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন এবং ইরান তাদের ইউরেনিয়াম স্থানান্তরে রাজি হয়েছে বলেও জানা যায়।
চলমান এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আশার বাণী শুনিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ব ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান সমস্ত প্রক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো এখন সঠিক ট্র্যাকেই অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি তা আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চীন যেভাবে বরাবর সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে, সেজন্য তিনি চীনা নেতৃত্বের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।