ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেছে বিরোধী দলগুলো। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য গৌরব গগৈ অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের সূচনা করেন। ২৬ জুলাই বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে তিনিই প্রস্তাবটি এনেছিলেন। খবর বিবিসির।
বৃহস্পতিবার বিতর্ক শেষে লোকসভার সদস্যরা প্রস্তাবটির ওপর ভোট দেবেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অবশ্য এই অনাস্থা ভোট নিয়ে মোদি সরকারের তেমন আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে বিবিসি জানিয়েছে। কারণ সংসদে মোদির নেতৃত্বাধীন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই অনাস্থা ভোটে মোদির গদি হারানোর আশঙ্কা একেবারেই নেই।
বিরোধী দলও ভালো করেই বিষয়টি জানে। কিন্তু তার পরও তারা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে। তাদের দাবি, এই বিতর্ক মণিপুর রাজ্যে চলমান জাতিগত দাঙ্গা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে মুখ খুলতে বাধ্য করবে।
লোকসভায় গগৈ বলেন, মণিপুরের বিষয়ে ‘মোদির নীরবতা ভাঙতে’ বিরোধীরা এ অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন। মোদি এখনো দাঙ্গাকবলিত রাজ্যটি পরিদর্শন করতে যাননি কেন, সে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ভারতীয় পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশন ২০ জুলাই শুরু হয়েছে। অধিবেশন শুরুর পর থেকেই বিরোধীরা মণিপুরের সহিংসতা নিয়ে মোদির বিবৃতির দাবি করতে থাকেন। এ নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে বারবার অধিবেশন বিঘ্নিত হয়।
মে মাসের প্রথম দিক থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে শুরু হওয়া জাতিগত দাঙ্গায় এ পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশি নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। রাজ্যটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি মেইতেইদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ কুকিদের সংঘর্ষ চলছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, তাদের সরকার এই ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য তৈরি আছে।
বিঘ্নিত অধিবেশনের মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়, যেগুলো নিয়ে সামান্য বিতর্ক ও কিছু প্রতিবাদ দেখা গেছে।
মোদি পদবি নিয়ে মানহানির মামলায় সুরাটের আদালতের রায়ে দুই বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর। এ কারণে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে লোকসভার সদস্যপদ হারিয়েছিলেন রাহুল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ওই রায় স্থগিত করায় রোববার সদস্যপদ ফিরে পেয়েছেন তিনি। তারপর সোমবারই লোকসভার অধিবেশনে যোগ দেন তিনি।
অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কে বিরোধীদের পক্ষ থেকে রাহুলই প্রথম বক্তৃতা শুরু করবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কৌশল বদল করলেন বিরোধীরা। রাহুলের বদলে তার দলের গৌরব গগৈ বক্তৃতা শুরু করেন। এই নিয়ে কিছুটা হইচই করেছিলেন লোকসভার বিজেপির সদস্যরা।
আগামী বৃহস্পতিবার বিতর্কের শেষ দিনে জবাবি বক্তৃতা দেবেন মোদি। ওই দিন রাহুলেরও বক্তৃতা দেয়ার কথা রয়েছে।
২০১৪ সালে ভারতের শাসনক্ষমতায় আসার পর ২০১৮ সালে মাত্র একবারই অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়েছিল মোদি সরকার। ২০১৮ সালে মোদির বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবে ১৯৯ ভোটে জয়ী হয় তার দল।
ভারতের সংসদে এর আগে মোট ২৭ বার অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। নেহেরু থেকে মোদি- সবার বিরুদ্ধেই এসেছে এই প্রস্তাব। সবচেয়ে বেশি ১৫ বার অনাস্থা প্রস্তাব এসেছে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে। প্রতিবারই তিনি জয়ী হয়েছেন। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, নরসিমা রাওয়ের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এসেছে তিনবার করে। তারাও জয়ী হয়েছেন। তবে অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে সরকার খোয়ানোর ইতিহাসও আছে। মোরারজি দেশাই, চরণ সিং, ভিপি সিংদের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় আস্থা ভোটে হেরেই। ১৯৯৯ সালে মাত্র ১ ভোটে অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে পদত্যাগ করতে হয় অটল বিহারি বাজপেয়িকে।
ইসরায়েলের কাছে অতিমাত্রায় সংহারক ও একেকটি প্রায় ২ হাজার পাউন্ড বা ৯০৭ কেজি ওজনের মোট ৬০ হাজার শক্তিশালী বোমা বিক্রির চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। কয়েক শ কোটি ডলারের এ সম্ভাব্য সামরিক চুক্তি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৮০ কোটি ডলার মূল্যের এ বিশাল অস্ত্র চুক্তির ব্যয়ের সিংহভাগই মেটানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ কর্মসূচির মাধ্যমে, যার মূল জোগানদাতা দেশটির সাধারণ করদাতারা। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ধারাবাহিক সহিংসতা এবং দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযানের তীব্রতার মধ্যেই এত বিপুলসংখ্যক প্রাণঘাতী বোমার চালান পাঠানোর এই বিতর্কিত উদ্যোগ সামনে এলো।
প্রস্তাবিত এ চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন মূলত তিন ধরনের ভারী যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার এমকে-৮৪ বোমা, ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা এবং ভূগর্ভস্থ শক্ত অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ২০ হাজার আই-২০০০ পেনিট্রেটর বোমা, যা সাধারণত ‘বাংকার বাস্টার’ নামে পরিচিত। এর মধ্যে এমকে-৮৪ বোমাটি লক্ষ্যস্থলের শত শত মিটার দূর পর্যন্ত যেকোনো মজবুত স্থাপনা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। বিএলইউ-১১৭ বোমাটি নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানার উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এবং সমুদ্রবাহী জাহাজে নিরাপদে সংরক্ষণে বিশেষ তাপপ্রতিরোধী প্রলেপযুক্ত। অপরদিকে আই-২০০০ বোমাটির পুরু ধাতব আবরণ ভূগর্ভস্থ সুদৃঢ় কংক্রিট ভেদ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারদর্শী। প্রাতিষ্ঠানিক নীতির কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবিত এ অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
এর আগে বেসামরিক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে জো বাইডেন প্রশাসন ২ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখলেও হোয়াইট হাউসে ফিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন এবং কংগ্রেসের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ছাড়াই শত শত কোটি ডলারের ধারাবাহিক অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে ইরাকে ‘অপারেশন অপেরা’ অভিযানে এই ভারী বোমা প্রথম ব্যবহারের পর লেবানন, সিরিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ঘন ঘন এ মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইসরায়েল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণী সংস্থাগুলোর মতে, একটি ২ হাজার পাউন্ডের বোমা বিস্ফোরিত হলে তার ১১৫ ফুটের ভেতরের সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং মাটির গভীরে বিশাল গহ্বর তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, থার্মাল ও রাসায়নিক সংমিশ্রণে প্রস্তুত এসব বোমা বিস্ফোরণের সময় আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করে, যার প্রভাবে গাজায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ বোমার তাপে মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন।
প্রস্তাবিত ৬০ হাজার বোমার সম্মিলিত ওজন প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন, যা নিউইয়র্কের সুবিশাল এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের কাঠামোগত মোট ইস্পাতের সমান কিংবা আইফেল টাওয়ারের মূল কাঠামোর চেয়ে প্রায় সাত গুণ ভারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টোকিওতে চালানো হামলায় ব্যবহৃত মোট বোমার তুলনায় এটি প্রায় ৩৫ গুণ বেশি এবং এটি বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়ে জার্মানির বার্লিনের ওপর ফেলা সব বোমার মোট ওজনের সমপরিমাণ। এমন এক সময়ে ওয়াশিংটন এই বিপুল সমরাস্ত্র সরবরাহ করছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতে টান পড়েছে বলে পেন্টাগনের সাম্প্রতিক নজরদারি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও মার্কিন অস্ত্রের পর্যাপ্ততা নিয়ে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তাদের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে চমৎকার ও উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র তৈরি করছে। এ আধুনিক অস্ত্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলে থাকা আমাদের সামরিক বাহিনীর কাছে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে।’
এদিকে করদাতাদের অর্থে ইসরায়েলকে এই বিপুল পরিমাণ বিধ্বংসী বোমা সরবরাহের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসন একে নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের হাতিয়ার বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন প্রস্তাবিত অস্ত্র চালানটি কংগ্রেসে আটকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মার্কিন তহবিলের এমন ব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাবেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মার্জোরি টেলর গ্রিনও এই সিদ্ধান্তের সরাসরি বিরোধিতা করে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারে এমন মারণাস্ত্রে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে আনুষ্ঠানিক আলোচনার লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দফা শর্ত পাঠিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটন যদি তেহরানের এসব প্রস্তাব গ্রহণ না করে, তবে সরাসরি ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ মুখোমুখি হওয়ার কড়া হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছে দেশটি। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই জানান, তাদের দেওয়া শর্তগুলো কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে পৌঁছানো হয়েছে এবং তেহরান এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। মূল প্রস্তাবগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা অর্থ ছেড়ে দেওয়া এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রেজাই উল্লেখ করেন যে, আলোচনা শুরুর বিষয়ে ইরানের বার্তা সুস্পষ্ট ও অনড়; নিজ সৃষ্ট জটিল সংকট থেকে ওয়াশিংটন যদি নিষ্কৃতি পেতে চায়, তবে ইরানের ন্যায্য অধিকার ও দেওয়া শর্তগুলো মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প নেই।
আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে মহসিন রেজাই আরও সতর্ক করে বলেন, ‘এই শর্তগুলো মেনে নেওয়াই ওয়াশিংটনের স্বার্থে ভালো হবে। ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো কাজ হবে না, আমরা যে কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য শতভাগ প্রস্তুত।’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পূর্ববর্তী সমঝোতার মেয়াদ সমাপ্তির পর থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পুনরায় সংলাপ শুরুর জন্য কাতার ও পাকিস্তান জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে যে বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তা নিরসনে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোও সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে রেজাই জানান, নতুন করে মার্কিন বিমান হামলার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তবে অতীতের সংঘাতগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে ইরান তাদের সামরিক কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরজুড়ে মোতায়েন থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যস্থল করে এই নতুন প্রতিরোধ কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি মার্কিন রণতরীর সন্নিকটে একাধিক ওয়ারহেডবাহী দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ভবিষ্যতে কোনো আক্রমণ হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও তাদের বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করে ধ্বংসাত্মক জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সংঘাতের স্থায়ী সমাপ্তি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে যুদ্ধ এখনো চলছে।’ তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে তেহরান কৌশলগত নীতি অনুসরণ করছে। অপরদিকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, পরমাণু অস্ত্র অপ্রসারণ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি; যদিও ওয়াশিংটনের বৈরী আচরণ তাদের এমন পথ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরানের পরমাণু নীতি এখনও আগের জায়গায় বহাল রয়েছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধের বিষয়ে তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ফতোয়ার বিধান তারা কঠোরভাবে মেনে চলছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং লোহিত সাগর উপকূলবর্তী বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। রোববার (১৯ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাতে জানা গেছে, শনিবার রাজধানী রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি রিয়াদ। এর আগে শনিবার সৌদি রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী একটি জ্বালানি ট্যাংকে অগ্নিকাণ্ডের পর কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়, যার ফলে সাময়িকভাবে বিমান ওঠানামা ব্যাহত হয়। গত জুলাই থেকে হুথিদের তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শনিবার প্রথমবারের মতো রিয়াদজুড়ে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকান নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল ও ভ্রমণের বিঘ্ন নিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করে, ইরান-সমর্থিত হুথিরা বেসামরিক বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালাচ্ছে এবং এই সামরিক সংঘাত যেকোনো সময় আরও বড় পরিসরে রূপ নিতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিকদের তা গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো ‘শত্রুতামূলক হামলার চেষ্টা’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নস্যাৎ করা হয়েছে।
এদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া অনলাইনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, রিয়াদের ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ এবং উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে অবস্থিত সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা নিশানা করে বহুসংখ্যক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছোঁড়া হয়েছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় সৌদি হামলার চেষ্টার জবাবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া গেল এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনজুড়ে অন্তত তিনশত আক্রমণ চালিয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন।
সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের যুদ্ধ চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হুথিদের আক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং চলতি সপ্তাহেই ইয়েমেনের আকাশসীমায় একটি সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্বটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। দেশটির সেনাপ্রধান সেখানে ছিলেন সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হতে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে এই চুক্তির আয়োজন করেছিলেন তিনি।
আসিম মুনিরের কাছে বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত একটি সাফল্য। নগদ অর্থের সংকটে থাকা পাকিস্তানকে সৌদি কয়েক বিলিয়ন ডলারের জরুরি বিনিয়োগ ও ঋণ দেবে। বিনিময়ে পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়। পাশাপাশি সৌদির ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী দেশটির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তখন পাকিস্তান ধরে নিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক শিগগিরই আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম থাকবে। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত যুদ্ধের আগুনে জ্বলতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা শুরু করে। পাল্টা জবাবে ইরান সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এরপর সৌদির সঙ্গে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের সংঘাতও দ্রুত আবার জ্বলে ওঠে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়ে। চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা ইয়েমেনে নজিরবিহীনভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা বাড়ায় এবং সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানে। এর জবাবে সৌদিও ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন পাকিস্তান, বিশেষ করে জেনারেল আসিম মুনিরের ওপর চাপ বাড়ছে।
এর মধ্যে গত আগস্টে সৌদির সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে তুরস্ককেও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর নাম দেয়া হয় ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। তিন দেশই সম্মত হয়, তাদের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সিনিয়র ফেলো আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, আমি মনে করি না, আসিম মুনির ওই অঞ্চলের মুখোমুখি হওয়া হুমকিগুলো যথাযথভাবে হিসাব করেছিলেন।
সৌদির হাতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। অন্যদিকে, হুতিরা কঠিন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি যদি হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘মক্কা চুক্তি’ সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প থাকবে না। সৌদিতে প্রশিক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে মোতায়েন থাকা হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাও এর আওতায় পড়তে পারেন।
প্রতিরক্ষা অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে সৌদির ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সম্প্রতি সৌদি দেশটিকে জরুরি সহায়তা হিসেবে ৮০০ কোটি ডলারের তহবিল ও বিনিয়োগ দিয়েছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সরকারি মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ক্রমেই কঠোর ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিতে থাকেন। তারা চুক্তির প্রতি নিজেদের ‘নিঃশর্ত’ অঙ্গীকারের কথা নিশ্চিত করেন এবং সৌদিকে রক্ষায় ইসলামাবাদ ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলেও জানান।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অন্তহীন যুদ্ধে দেশটি জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত। আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জঙ্গিবাদও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি।
অনেকের আশঙ্কা, ‘মক্কা চুক্তি’ সক্রিয় হলে ইসলামাবাদ ইরানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে- এমন বার্তা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তেহরানে হামলার আগে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক ছিল। যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় আসিম মুনির তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতেও এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়েছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, পাকিস্তান ততই ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। একই সময়ে ইসলামাবাদের ওপর তেহরানের আস্থাও অনেকটাই কমে গেছে। আয়েশা সিদ্দিকা জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিলে এর ‘বড় ধরনের পরিণতি’ হতে পারে।
ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে বসবাস করে। ফলে হুতিদের ওপর হামলায় পাকিস্তান জড়িয়ে পড়লে দেশটির শিয়া জনগোষ্ঠী প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে পারে।
এদিকে আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গেও ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি আরও উসকে যেতে পারে। এতে ইরান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের অস্থিতিশীল অঞ্চল বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিও আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি বিদ্রোহ চলছে।
পাকিস্তানের সিনেটে বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস বলেন, ‘মক্কা চুক্তি’তে কী কী শর্ত ও সমঝোতা হয়েছে, তা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের খুব অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ জানেন না।
আব্বাস বলেন, পাকিস্তান যদি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে তা দেশের জন্য বিপর্যয় হবে। আমরা যদি এই সংঘাতে সৌদির পক্ষ নিই, তাহলে দেশ বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় বিভাজনের মুখে পড়বে।
পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বলেন, তার মনে হয় না সৌদি যুবরাজ এখনই চুক্তিটি সক্রিয় করতে চান। তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি না, সৌদি যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া হুতিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে কী হবে, তা আপনি অনুমান করতে পারবেন না।
ইউক্রেন যুদ্ধ আরও জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধের জন্য নতুন করে সেনা নিয়োগের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘হাইব্রিড’ হামলা বাড়াতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর ‘গোপন সেনা সমাবেশ’ বা স্টেলথ মোবিলাইজেশনের প্রস্তুতি চলছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এর আগে দাবি করেছিলেন, সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের পর রাশিয়া আরও তিন লাখ সেনা নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। তবে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো নতুন গণনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন বলছে, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়োগের পরিবর্তে ধাপে ধাপে নিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে মস্কো।
ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপীয় নেতারা। হাইব্রিড যুদ্ধের মধ্যে সাইবার হামলা, ড্রোন হামলা, নাশকতা, তথ্যযুদ্ধ ও অন্যান্য গোপন তৎপরতা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাক্রোঁ গত শুক্রবার বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপ ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে সম্ভাব্য নাশকতা থেকে রক্ষার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ম্যাক্রোঁর ভাষ্যমতে, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন কমাতে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে রাশিয়া। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সম্প্রতি রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর পরিকল্পনা থাকতে পারে রাশিয়ার।
এর মধ্যে পোল্যান্ডও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। টাস্কের আশঙ্কা, রাশিয়া কোনো হামলাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করতে পারে।
তিন লাখ সেনা নিয়োগের প্রস্তুতি
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই রাশিয়ার নতুন সেনা নিয়োগের প্রস্তুতির কথা বলে আসছে। গত আগস্টে জেলেনস্কি বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর রাশিয়া অতিরিক্ত তিন লাখ সেনা নিয়োগ করতে পারে।
ইউক্রেনের গোয়েন্দা ও বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা পরে দাবি করে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে মোট ছয় লাখ সেনা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে মস্কোর। পশ্চিমা কর্মকর্তারা অবশ্য মনে করছেন, তিন লাখ নতুন সেনাকে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়ার হাতে আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের মতে, প্রকাশ্য ও বড় আকারের গণনিয়োগের বদলে ‘গোপন সেনা নিয়োগ’ বা স্টেলথ মোবিলাইজেশনের মাধ্যমে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। এর মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ইউরোপ থেকে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ খবর অস্বীকার করেছে। এরপর ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধেও আরও প্রকাশ্য পদক্ষেপের দিকে যেতে পারে।
ব্রিটিশ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুর হুমকি
ইউক্রেনকে দূরপাল্লার হামলায় সহায়তা করা হলে ইউক্রেনে থাকা ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে মস্কো। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোয় ব্রিটিশ দূতাবাসের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে তলব করে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য এই পদক্ষেপকে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। এর আগে, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ১০ কোটি পাউন্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অর্থবহ শান্তি আলোচনার বদলে সামরিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে মস্কো।
এক দশকের বেশি সময় পর আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিরল খনিজসহ দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
আগামী বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটনের বাইরে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি জিনপিংয়ের বিমান অবতরণের সময় তাকে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের বিদেশি কোনো নেতাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর ঘটনা বিরল। সফরকে ঘিরে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
এর পরদিন বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসে শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের স্টেট ফ্লোরে তাদের জন্য অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এরপর রোজ গার্ডেনে সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন দুই নেতা। পরে তারা বৈঠকে বসবেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে শি জিনপিং ও পেং লিয়ুয়ানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করবেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া। দুই নেতাই সেখানে বক্তব্য দেবেন। নৈশভোজে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, গুগলের সুন্দর পিচাই, ডেল টেকনোলজিসের প্রধান মাইকেল ডেল, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, সিটিগ্রুপের প্রধান জেন ফ্রেজার এবং অ্যাপলের সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাহী টিম কুকসহ প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এরপর আগামী শুক্রবার শি জিনপিং ও পেং লিয়ুয়ান আবার হোয়াইট হাউসে যাবেন। সেখানে ট্রাম্প দম্পতির সঙ্গে ব্যক্তিগত চা-আড্ডার পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন করবেন। এরপর শি জিনপিং জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে বাণিজ্য, শুল্ক, কৃষিপণ্য, বিরল খনিজ ও এআই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তাইওয়ান ও দেশটির জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজও আলোচনায় আসতে পারে। ইরান ও দেশটির তেল রপ্তানি নিয়েও কথা হতে পারে। শির সঙ্গে বিওয়াইডি, শাওমি, সিএটিএলসহ বড় চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। ২০১৫ সালের পর প্রায় ১১ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন শি।
ইয়েমেনে সৌদি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়ে গেছে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ছে। হুতিরা অভিযোগ করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সৌদি আরব ২৬টি হামলা চালিয়েছে। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) হুতিরা আরও দাবি করেছে, গত এক সপ্তাহে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব ৩০০টি হামলা চালিয়েছে।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার জানিয়েছে, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ জেলায় সংঘর্ষে তাদের বাহিনীর হামলায় ৩০ হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহে সংঘাত তীব্র হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
সংঘাতের মধ্যে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানী সানায় হাজার হাজার মানুষ ইরান-সমর্থিত হুতিদের সমর্থনে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। হুতিরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিসহ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
উভয় পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষ ও হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর তায়েফ অঞ্চলে একজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, হুথি-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো তাইজ ও আবস শহরে সৌদি হামলায় প্রাণহানির খবর দিয়েছে।
সংঘাতের তীব্রতা বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হুতিদের দ্রুত এলাকা দখলের প্রেক্ষাপটে সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে মার্কিন কর্মকর্তারা হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে হুতিরা ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করেছে, সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু করবে না।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর আহ্বান জানানো হলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত তা থেকে বিরত রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস শুক্রবার বলেছেন, ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতির কারণে লোহিত সাগরে জোটের নৌ-অভিযান ‘অপারেশন অ্যাসপিডিস’-এর সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ক্যালাস বলেন, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং তা বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি করছে। তিনি আরও জানান, ইয়েমেনে সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেছেন।
সৌদির রাজধানীতে বিমান হামলার সতর্কতা জারি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করার পর দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ঘটনা ঘটছে।
এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, ভোর তিনটার কিছু আগে রিয়াদের বাসিন্দাদের মোবাইলে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, ‘এলাকাটি শত্রুপক্ষের আকাশপথের হুমকির মধ্যে রয়েছে।’ বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর কিছুক্ষণ পর এএফপির সাংবাদিকেরা দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়। ইয়েমেনে চলমান সংঘাত গত জুলাইয়ে তীব্র হওয়ার পর এই প্রথম সৌদি রাজধানী রিয়াদ সরাসরি এমন সতর্কতার আওতায় পড়ল।
হুতিরা ইয়েমেনের জনবহুল বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। চলতি মাসে তারা দেশটির পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখলের লক্ষ্যে দ্রুত অভিযান শুরু করেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বন্ধ থাকায় সৌদি আরব তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এই নৌপথ ব্যবহার করে আসছিল।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। তবে তারা দাবি করেছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি উন্মুক্ত ও নিরাপদ।
সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি কমেছে। তবে গত এক সপ্তাহে পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করেছে।
সৌদি আরবকে রক্ষায় যে কোনো পর্যায় পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান
সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় ‘যে কোনো পর্যায়’ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান। দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র বলেছেন, রিয়াদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুরোপুরি ‘শর্তহীন’। মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তাও এই প্রতিশ্রুতির আওতাভুক্ত বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরি এসব কথা বলেন। আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, ‘পাকিস্তান যেকোনো দিক থেকেই সৌদি আরবের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।’
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরে মসজিদে বিস্ফোরণ ও বন্দুক হামলার ঘটনায় ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন দায় স্বীকার করেছে। এদিকে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
এএফপি ও দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, শুক্রবার (১৮ ) বিকেলে কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইনস কমপ্লেক্সে এ হামলা হয়। সেখানে জেলা পর্যায়ের পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি) ও স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কার্যালয় রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের বেশিরভাগই পুলিশ সদস্য এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে চলা অভিযান শেষে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, হামলায় জড়িত আট সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। অভিযানও শেষ হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) একটি বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইনসের একটি মসজিদের কাছে বিস্ফোরিত হয়। এরপর হামলাকারীরা কমপ্লেক্সে ঢুকে পুলিশ স্থাপনায় হামলা চালায়। পুলিশের পাল্টা অভিযানের সময় হামলাকারীদের কয়েকজন স্পেশাল ব্রাঞ্চের ভবনে অবস্থান নেয়। পরে সেখানে রাতভর অভিযান চালানো হয়।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ জানিয়েছে, চারজন হামলাকারী পুলিশ লাইনসের ভেতরে ঢুকেছিল। এর মধ্যে দুজন ভবনের প্রথম তলায় অবস্থান নিয়েছিল। শনিবার ভোর ৫টার দিকে অভিযান ফের শুরু হলে তাদের হত্যা করা হয়। একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আরেকজন গুরুতর আহত অবস্থায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয়।
পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এলিট ফোর্স, সিটিডি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সিটিডি জানিয়েছে, অভিযানের সময় হামলাকারীদের ছোড়া গ্রেনেডে সিটিডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবার ঘটনাস্থলে ফিরে গিয়ে অভিযান তদারকি করেন।
স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন পাকিস্তান এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটি নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকার টিটিপিকে ‘ফিতনা-আল-খারিজ’ বা সংঘাত সৃষ্টিকারী নামে অভিহিত করে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি হামলার বিষয়ে প্রতিবেদনও চেয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সন্ত্রাসী ও টিটিপিকে পুরোপুরি নির্মূল করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি।’
খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি আহতদের দ্রুত চিকিৎসার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির মনোবল ভেঙে দেওয়া যাবে না।’
হামলায় নিহতদের মধ্যে কোহাটের ট্রাফিক পুলিশ সুপার আকবর শিনওয়ারি, জেলা সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ডা. ইসরায়েল ওরাকজাই এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সিটিডির কর্মকর্তারা রয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের জানাজা কোহাটে অনুষ্ঠিত হয়। পরে রেসকিউ ১১২২-এর অ্যাম্বুলেন্সে তাদের মরদেহ কোহাট, কারাক, লাক্কি মারওয়াত, বান্নু ও মারদানের নিজ নিজ এলাকায় পাঠানো হয়।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে শনিবার ভোরের দিকে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এর সামান্য আগেই দেশটির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আকাশ হামলার বিষয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক নিশানায় পরিণত হয়েছে সৌদি আরব। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ইয়েমেনে গত জুলাই মাসে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করার পর এই প্রথম সীমান্তবর্তী সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ল সৌদি রাজধানী রিয়াদে। স্থানীয় সময় রাত তিনটা বাজার কিছুক্ষণ পূর্বে রাজধানীর নাগরিকদের কাছে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘এলাকাটিকে শত্রুপক্ষের আকাশপথে হামলার হুমকির মধ্যে রয়েছে।’ একই সঙ্গে জনসাধারণকে নিজ নিজ গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
উক্ত বার্তা প্রেরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই এএফপির সংবাদকর্মীরা দুটি বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ শুনতে পান। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ বিমান হামলার সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়।
ইয়েমেনের জনবহুল অধিকাংশ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা চলতি মাসে আকস্মিক সামরিক অভিযান জোরালো করেছে। সমগ্র লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের কবজায় নিয়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনের বিকল্প রুট হিসেবে বাব আল-মান্দাব ব্যবহার করে আসছিল সৌদি আরব। তবে বর্তমানে হুতিরা সৌদির বিরুদ্ধে এই সমুদ্রপথে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে, জুলাইয়ের পর বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে সৌদির তেল রফতানি হ্রাস পেলেও গত এক সপ্তাহে পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ পথটি অতিক্রম করেছে। হুতিদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরবের জাহাজ ব্যতীত অন্য যেকোনো দেশের নৌযানের অবাধ চলাচলের জন্য প্রণালীটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে।
এদিকে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।
আফগান সীমানায় যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত থাকতে ইসলামাবাদকে কড়া বার্তা দিয়েছে তালেবান প্রশাসন। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানোর যে অভিযোগ পাকিস্তান তুলেছে, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।
আল আরাবিয়া ইংলিশে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই অবস্থান তুলে ধরেন। মুজাহিদ স্পষ্টভাবে জানান, পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আঘাত হানে, তবে আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে এবং এমন পদক্ষেপের ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।
এর আগে আল আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া অপর এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র অভিযোগ করেছিলেন, আফগান ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে উগ্রবাদীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এই অভিযোগের জবাবে তালেবান মুখপাত্র বলেন, কাবুল নিজেদের ভূখণ্ডে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপিসহ কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অন্য দেশকে লক্ষ্য করে তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, টিটিপি ও বালুচ গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ড তালেবান ক্ষমতায় আসার বহু আগে থেকেই চলছে; ফলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের দায় কাবুলের ওপর না চাপিয়ে পাকিস্তানের উচিত তা নিজস্ব উদ্যোগে সমাধান করা।
সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করলেও ইসলামাবাদের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। একই সঙ্গে কাবুল ও ইসলামাবাদের পারস্পরিক সংকট নিরসনে বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবকে ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কোহাত জেলায় অবস্থিত পুলিশ সদর দপ্তরে ঘটা ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলা ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৩১ জনে ঠেকেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৬ জনই পুলিশ সদস্য।
আজ শনিবার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই জঙ্গি হামলা ও আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ১৬ জন পুলিশ সদস্যসহ মোট ৩১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এ ঘটনায় অংশ নেওয়া বাকি হামলাকারীদের খতম করতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিরোধ লড়াই ও তল্লাশি অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত কাল জুমার নামাজের সময় বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে কোহাত পুলিশ লাইন্সসংলগ্ন মসজিদে আত্মঘাতী আঘাত হানা হয়। প্রধান বিস্ফোরণের পরপরই বেশ কয়েকজন সশস্ত্র বন্দুকধারী পুলিশ কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায় এবং নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে। এর ফলে মসজিদের ছাদ ধসে পড়ে ভেতরে অবস্থানরত বহু সাধারণ মানুষ ও পুলিশ সদস্য হতাহত হন।
এই বর্বরোচিত হামলার তীব্রতায় পুলিশ সদর দপ্তরের মূল সীমানাপ্রাচীর ও অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। জখম ব্যক্তিদের স্থানীয় ও নিকটবর্তী সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ ও তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক জঙ্গি হামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোহাটের এই মর্মান্তিক হামলায় জড়িত অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী তৎপরতার মুখে স্বদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সংহতি প্রকাশের প্রত্যয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ (জানফাদা-ই-ইরান) শীর্ষক এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন বলে জানিয়েছে মেহের নিউজ এজেন্সি।
শুক্রবার সকাল থেকেই তেহরানের ঐতিহাসিক ইমাম হোসেইন চত্বর থেকে এঞ্জেল্যাব চত্বর পর্যন্ত এ শোভাযাত্রা বিস্তৃত হয়। আয়োজকদের প্রদত্ত তথ্যমতে, প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার নাগরিক সরাসরি এই কর্মসূচিতে সমবেত হন।
‘জানফাদা-ই-ইরান’ প্রচারণার মুখপাত্র সাসান জারে জানান, দেশব্যাপী এই উদ্যোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘জানফাদা প্রচারণায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষের নিবন্ধন প্রমাণ করে যে জনগণই জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘৩ কোটি মানুষের একটি বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি ঘোষণা ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই ব্যাপক জনসমর্থন দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।’
সমাবেশ চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একাংশ প্রদর্শন করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক বহর কুচকাওয়াজ পরিচালনার মাধ্যমে যেকোনো বিদেশি হুমকি কিংবা আগ্রাসন প্রতিহত করতে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির বার্তা দেয়। অনুষ্ঠানে বাসিজ বাহিনীর প্রধান বক্তব্য প্রদানকালে উল্লেখ করেন যে, এই সুবিশাল সমাবেশ প্রমাণ করে ইরানি জাতি নিজেদের ও দেশের জাতীয় শক্তি রক্ষায় সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে এক বাসিজ আলেম দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া না পর্যন্ত আমি আমার ইউনিফর্ম খুলব না।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্বয়ং এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ধর্ম, জাতি কিংবা ভাষা নির্বিশেষে ইরান প্রতিটি ইরানি নাগরিকের দেশ। বর্তমান উদ্ভূত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার জন্য তিনি সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
উক্ত শোভাযাত্রায় বিশেষ মোটরসাইকেল মহড়ার পাশাপাশি নারী, তরুণ দম্পতি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং এমনকি একজন ইহুদি রাব্বিও অংশ নেন। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত একটি ইয়েমেনি প্রতিনিধিদল এই সংহতি কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন, পলিটিকো এবং এমএস নাও-কে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ, তারা তাঁর প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিনিয়ত ‘কাল্পনিক বা মিথ্যা’ খবর পরিবেশন করছে। পোস্টে তিনি দাবি করেন, এই সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে "ক্রমাগত কাল্পনিক বা মিথ্যা তথ্য লেখে বা প্রচার করে"; তবে এমন অভিযোগের সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদন বা প্রমাণের উল্লেখ তিনি করেননি। পরবর্তীতে বিষয়টিকে একটি "খুবই সাধারণ নিষেধাজ্ঞা" হিসেবে আখ্যা দিলেও এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেননি ট্রাম্প। ফলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সিএনএন বিষয়টিকে মার্কিন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটি "বেআইনি আঘাত" বলে উল্লেখ করেছে। ঘোষণার সময় সিএনএন-এর একটি দল ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আইওয়া সফরে কর্মরত ছিল।
এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা "হোয়াইট হাউসে কর্মরত আমাদের দল এবং তাদের নিরপেক্ষ ও নির্ভুল সাংবাদিকতার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।" সিএনএন স্পষ্ট করে যে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী সরকারি কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশনের অধিকার তাদের রয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষিত এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়িত হলে তা সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত বলে গণ্য হবে।
এদিকে পলিটিকো-ও তাদের অবস্থান তুলে ধরে এক বিবৃতিতে জানায়, তারা "বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হোয়াইট হাউস প্রশাসন নিয়ে নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখবে।" একই সঙ্গে সংস্থাটি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানায়, "আমাদের 'ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট' বা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রাপ্ত অধিকার সীমিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা জোরালোভাবে রুখে দাঁড়াব।" তবে এমএস নাও—যা পূর্বে এমএসএনবিসি (MSNBC) নামে পরিচিত ছিল—এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাকি হেইনরিখ জানিয়েছেন, যে সাংবাদিকদের "নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে", সংগঠনটি সর্বাত্মকভাবে তাঁদের পাশে রয়েছে। ফক্স নিউজের এই প্রতিনিধি আরও যোগ করেন, "বিষয়টি কেবল সাংবাদিকদের অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তির কার্যকলাপ, নীতি ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকান জনগণের অধিকারের বিষয়।"
পরবর্তীতে ওভাল অফিসে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, শুক্রবার বিকেলে আকস্মিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কারণে তিনি এ পদক্ষেপ নেননি; বরং বিগত কয়েক বছরের ক্রমাগত সংবাদ পরিবেশনের বিরক্তি থেকেই এ সিদ্ধান্তের সূত্রপাত। তিনি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে অন্যান্য গণমাধ্যমও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে। পাশাপাশি এই পদক্ষেপ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে স্বীকার করে তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি আইনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোক বা না হোক, তা সামনে আনাটাই সমীচীন ছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউসের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় বিতর্কে জড়াচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প রক্ষণশীল বিভিন্ন ব্লগার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রেস রুমে সুযোগ করে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, মার্কিন জনগণের সামনে বিবিধ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের জন্যই এ পদক্ষেপ। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনায় থাকা 'প্রেস পুল'-এর কর্তৃত্ব হোয়াইট হাউস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
একই মাসে "গালফ অফ আমেরিকা"-র বদলে "গালফ অফ মেক্সিকো" পরিভাষা ব্যবহারের কারণে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ওভাল অফিস বা এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ সীমিত করা হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তাৎক্ষণিকভাবে মামলা করে, যা এখনও আদালতে চলমান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়মিতভাবেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাঁদের "ভুয়া খবর" প্রচারকারী এবং "অশোভন" আচরণের অধিকারী বলে আক্রমণ করেন। উল্লেখ্য, নিজের প্রথম মেয়াদেও ট্রাম্প প্রশাসন সিএনএন প্রতিনিধি জিম অ্যাকোস্টাকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করেছিল; পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে সিএনএন তাঁর সাংবাদিক পাস ফিরে পায়। হোয়াইট হাউসে যৌথভাবে বা 'পুল' ব্যবস্থার অধীনে ভিডিও ধারণের দায়িত্বে থাকা পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের অন্যতম একটি হলো সিএনএন। এছাড়া রেডিও পুলের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে থাকে বিবিসি।