বিশ্বজুড়ে চলছে ভূরাজনৈতিক ছায়া উত্তেজনা। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উন্নয়নশীল দেশে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের প্রতিযোগিতা এই উত্তেজনাকে উসকে দিয়েছে বহুগুণ। যার জের দেখা যাচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে জ্বালানি, স্বাস্থ্য ব্যয়সহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। কোনো কোনো দেশ এই প্রতিযোগিতার মাশুল দিচ্ছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কবলে পিষ্ট হয়ে।
এমনই এক অবস্থার মধ্যে আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘে মিলিত হচ্ছেন বিশ্বনেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সংস্থার সদর দপ্তরে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। স্বভাবতই সবার নজরে থাকছে জাতিসংঘের এ আয়োজন। বিশ্বনেতাদের এ সম্মিলন কি বিশ্ববাসীর জন্য কোনো স্বস্তির খবর আনবে?
বিশ্বনেতাদের এই বাৎসরিক মিলনমেলা ও তার সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নানা খবর প্রচার ও প্রকাশ করছে। রয়টার্সের এমনই এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ দ্বিতীয় বছরে গড়িয়েছে। জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে আলোচনার অন্যতম মূল বিষয় হবে এই যুদ্ধ। অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। সংঘাত শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম সশরীরে জাতিসংঘ অধিবেশনে থাকছেন ইউক্রেনিয়ান প্রেসিডেন্ট।
অধিবেশনের মূল বিষয়ের মধ্যে থাকবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ও। ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলতে জাতিসংঘের অন্তর্গত উন্নয়নশীল দেশগুলো। এতে অন্তর্ভুক্ত আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন এবং বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় ধনী দেশ। রাশিয়াকে ‘এক ঘরে’ করতে এই ‘গ্লোবাল সাউথ’ ধারণা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।
অধিবেশনে কিছু উচ্চপর্যায়ের সভা হবে, যেখানে প্রাধান্য পাবে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু, স্বাস্থ্য, উন্নয়নে অর্থায়নের বিষয়াদি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০১৫ সালে প্রণীত বৈশ্বিক ‘করণীয় তালিকা’র অগ্রগতিরও পর্যালোচনা হবে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর জাতিসংঘ পরিচালক রিচার্ড গওন বলেন, ‘এ বছরই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এক্ষেত্রে অ-পশ্চিমা দেশগুলো কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আমি মনে করি, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে রাশিয়া তাদের সমর্থন চায়, এটা বুঝেই এ মুহূর্তে সুযোগটি নিয়েছে গ্লোবাল সাউথ।’
গত দশকে চীন তাদের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়নে অপরিহার্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কোটি কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। যে কারণে অনেক দেশ ঋণের ফাঁদে খাবি খাচ্ছে। যার ফলে বেইজিংকেও পড়তে হয়েছে সমালোচনার সাগরে।
চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররাও প্রতিশ্রুত উন্নয়ন ও জলবায়ু সহায়তা দিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে।
জাতিসংঘ অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বলছেন, তাদের মূল আলোচনায় থাকবে উন্নয়নশীল দেশের বিষয়গুলো। অধিবেশনে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও জিইয়ে থাকবে বলে যে আলাপ চলছে, সেটা নাকচ করে দিচ্ছেন তারা।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড এ বিষয়ে বলেন, ‘জাতিসংঘের এই সমাগম আমাদের কাছে ছোট বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাধান্যে থাকা বিষয়গুলো উপস্থাপনের সুযোগ। এটাকে আমি পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বলে দেখি না।’
এ বিষয়ে জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত জ্যাং জুন বলেন, ‘কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার ইচ্ছা বেইজিংয়ের নেই। চীনের অবস্থার উন্নতির ফলে এ দেশ এখন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য আরও কিছু করতে চায়। কিন্তু আমরা প্রতিযোগিতা করছি না।’
একইভাবে জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেভেনজিয়া বলেন, ‘মস্কো কাউকে বাগে বা বশে আনতে চায় না। আমরা যা তা-ই আছি। নিজেরা যা করতে চাই সেটার পক্ষে আনতে আমরা কখনোই আমাদের বন্ধুত্বকে শর্ত বানাব না, যেটা আমাদের অন্য সহকর্মীরা করছেন।’
এবারের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অধিকারী পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনই অধিবেশনে অংশ নেবেন।
অধিবেশন উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এটা বছরের অন্যতম একটি কল্যাণকর মুহূর্ত, যখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের নেতা এখানে জড়ো হন। তারা কেবল বিশ্ব পরিস্থিতির পর্যালোচনাই করেন না, এখানে সবার অভিন্ন মঙ্গলের জন্য কাজ করারও সুযোগ মেলে।’
জলবায়ু সংকট, ছড়াতে থাকা সংঘাত, বৈশ্বিক জীবনযাপনে ব্যয়ের সংকট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, আকস্মিক প্রাযুক্তিক বিপর্যয়সহ বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান অস্থিরতা তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, ‘এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনগণ তাদের নেতাদের দিকে তাকিয়ে আছে।’
দ্য ‘বিগ শো’
করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরবর্তীকালে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন সেই চেষ্টাকে থমকে দিয়েছে বলা যায়। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন, গ্যাসসহ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং খাদ্যসহ পণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বমুখিতার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধকেই দোষারোপ করে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতারা। এজন্য বারবার যুদ্ধ থামানোয় জোর দেওয়া হচ্ছে বৈশ্বিক সভা-সমাগমগুলোতে।
সেই ধারাবাহিকতায় এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনেও ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর আহ্বান বেশি উচ্চারিত হবে বলা যায়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের সংকটে খাদে না ফেলতে এই যুদ্ধের অবসানেরই ডাক দেবে বলে কূটনীতিকরা আভাস দিচ্ছেন।
যদিও যুদ্ধের মূল ভূমিকায় থাকা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। তবে তার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিনিধি থাকছেন বিশ্বনেতাদের এই সমাগমে।
অধিবেশন চলাকালে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ক্যামেরার ফোকাসে থাকছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি আগামী মঙ্গলবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন। পরদিন বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) ইউক্রেন ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভায়ও কথা বলবেন তিনি। ওই সভায় একই টেবিলে দেখা যেতে পারে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে।
জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত নেভেনজিয়া মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের নির্ধারিত এ সভাই হবে জাতিসংঘের এবারের আয়োজনের ‘বিগ শো’।
পশ্চিমা কূটনীতিকরা বলছেন, তারা এ বছর ইউক্রেন ইস্যুতে কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে ‘টার্গেট’ করার প্রচেষ্টা চালাবেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাদবাকি বিশ্বের সংকট ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো তাৎপর্য হারাবে।
এ বিষয়ে জাতিসংঘে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত বারবারা উডওয়ার্ড বলেন, “এটা ‘হয়তো/অথবা’ এমন কোনো বিষয় নয়। আমাদের দুটোই করতে হবে।”
ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ৬৮ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল আব্দুল নাসের আল হুমাইদি।
সংবাদ সম্মেলনে আল হুমাইদি বলেন, গত কয়েক দিনে ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৮৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮১২টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ইরান থেকে ছোড়া এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বেশিরভাগই লক্ষ্যে আঘাত হানার আগে আকাশে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ছোড়া ১৭২টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, এরমধ্যে ১৩টি সমুদ্রে পড়েছে এবং মাত্র একটি আমিরাতের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী যেসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, তার মধ্যে আটটি ড্রোন এবং আটটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।
আল হুমাইদি বলেন, ইরানের এই হামলায় দেশটিতে ৬৮ জন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মাঝারি ও সামান্য পর্যায়ে সীমিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আল হুমাইদি বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাত ‘কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না’। আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আমিরাতের রয়েছে বলে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক উত্তেজনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশে না দাঁড়াতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে তেহরান। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি ইউরোপের কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে শরিক হয়, তবে তেহরান তাকে সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করবে। বাঘাইয়ের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে নিয়ে গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘ইরানের ওপর আক্রমণকারী দেশগুলোর সঙ্গে যেকোনো ধরণের সহযোগিতা মানেই হলো আগ্রাসীদের সমর্থন দেওয়া। ইউরোপীয় দেশগুলো যদি এ ধরণের কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে ইরান তা পাল্টাপাল্টি যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং উপযুক্ত জবাব দিতে দ্বিধা করবে না।’ মূলত জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক অবস্থানের প্রেক্ষিতেই ইরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে।
উল্লেখ্য, গত রবিবার (১ মার্চ) ইউরোপের এই তিন প্রভাবশালী দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের কঠোর সমালোচনা করেছিল। সেখানে তারা জানিয়েছিল যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে তারা প্রয়োজনে ‘প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ নিতে প্রস্তুত। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরান যেভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নির্বিচারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে সংঘাতের বাইরে থাকা দেশগুলোও ইরানি হামলার শিকার হওয়ায় ইউরোপীয় শক্তিগুলো তেহরানের ওপর ক্ষুব্ধ।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বর্তমানে চরম উত্তপ্ত। ইরানের এই পাল্টা হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই বরং এতে পশ্চিমা বিশ্বও জড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অনড় অবস্থান এবং ইউরোপের পাল্টাপাল্টি হুংকার বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাতের বীজ বপন করছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সংকট নিরসনে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে এবার বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে বড় ধরনের হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের নিখুঁত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাহরাইনের শেখ ইসা অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং এর বেশ কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি ইতিমধ্যে হামলার কিছু ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যেখানে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে দেখা গেছে।
আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকালে চালানো এই বিশেষ অভিযানে তারা মোট ২০টি আত্মঘাতী ড্রোন এবং ৩টি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ওই বিমানঘাঁটির প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (কমান্ড সেন্টার) এবং সদর দপ্তর ভবন। তেহরানের দাবি, তাদের হামলায় এই ভবনগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ঘাঁটির ভেতরে থাকা জ্বালানি ট্যাংকগুলোতে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাহরাইনের একটি মার্কিন নৌঘাঁটি এলাকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওড়ার খবর পাওয়া গেলেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক জরুরি সতর্কবার্তায় বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত এক ডজন দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও তাদের মিত্র দেশগুলো উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, হামলার বিষয়ে বাহরাইন সরকারের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাহরাইনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে আইআরজিসির কমান্ড সেন্টার ধ্বংসের দাবি যদি সত্য হয়, তবে তা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম ও নজরদারি প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান প্রমাণ করে যে তারা শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে যেকোনো ধরণের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। সব মিলিয়ে শেখ ইসা বিমানঘাঁটির এই ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পাকিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ করাচি ও লাহোরের কনস্যুলেটগুলোতে সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই স্থগিতাদেশ আগামী শুক্রবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে খামেনি হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানের বড় বড় শহরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে করাচিতে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটে একদল বিক্ষোভকারী হামলার চেষ্টা চালালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার হাত থেকে নিজেদের কর্মীদের রক্ষা করতেই যুক্তরাষ্ট্র এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমান অস্থিতিশীল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও কনস্যুলেট কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই স্থগিতাদেশের ফলে হাজার হাজার ভিসা প্রত্যাশী বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও ইরানি নেতার শাহাদাতের রেশ ধরে পাকিস্তানে মার্কিন বিরোধী সেন্টিমেন্ট যে তীব্র আকার ধারণ করেছে, এই ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত তারই বাস্তব প্রতিফলন।
ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে। এই হামলার পর সৌদি আরামকো রাস তানুরা রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
হামলার পর স্থাপনায় আগুন লাগে। তবে আগুন সীমিত ছিল। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এর আগে ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বিমান হামলা হয়েছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরবের রাস তানুরা রিফাইনারিতে ড্রোন হামলা হলো।
রাস তানুরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। এটি সৌদি আরামকো পরিচালনা করে। এটি বিশ্বের বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে প্রতিদিন ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল শোধন করা যায়। পাশের রপ্তানি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়।
এই স্থাপনায় শোধন ইউনিট রয়েছে। বড় বড় সংরক্ষণ ট্যাংক রয়েছে। পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের জন্য বড় বন্দরও আছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে এই স্থানের বড় ভূমিকা আছে। তাই এখানে কড়া নিরাপত্তা ও উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে।
এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তেল রপ্তানিতে রাস তানুরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো সমস্যা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৫-এ দাঁড়িয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কেবল দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশেই এই হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে চলা এই ভয়াবহ আকাশপথে আক্রমণে ইরানের একের পর এক জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক পরিস্থিতিকে চরম সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত দেশটির অন্তত ১৩১টি শহর এই বিধ্বংসী হামলার শিকার হয়েছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি অনেক জায়গায় আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। রেড ক্রিসেন্টের মানবিক মিশনের নেতৃত্বে আক্রান্ত শহরগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা বিরতিহীনভাবে চলছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে ১ লাখেরও বেশি উদ্ধারকর্মী এবং জরুরি সাড়াদানকারী দল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় কাজ করছে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৪০ লাখ স্বেচ্ছাসেবীর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক মানবিক সেবা, চিকিৎসায় সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
আক্রান্ত ফার্স প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হতাহতদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেহর নিউজ জানিয়েছে, অনেক জায়গায় যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ইরান রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় তারা পূর্ণ শক্তিতে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়ায় জরুরি রক্তদান ও ওষুধের সংকটের কথাও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্বেচ্ছাসেবীদের এই বিশাল বাহিনী উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি গৃহহীন হয়ে পড়া নাগরিকদের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
ইরানের সামরিক কমান্ড এই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তারা কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশাল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক শহর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে উদ্ধার কার্যক্রমই ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও আকাশপথে আরও হামলার শঙ্কা কাটেনি। রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, তারা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রেখেছে।
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী ও মেসাঈদ শিল্পনগরীতে হামলার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম কোম্পানি কাতারএনার্জি গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধের ফলে ইউরোপের দেশগুলোয় এলএনজির দাম গতকাল সোমবার এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
কাতারএনার্জির বিবৃতিতে বলা হয়, কাতারএনার্জি সব অংশীদারদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মূল্যায়ন করে এবং তাদের সঙ্গে হালনাগাদ তথ্যের বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। বিবৃতিতে এর বেশি কিছু বলেনি কোম্পানিটি। কবে নাগাদ উৎপাদন শুরু হবে, তাও জানায়নি কাতারএনার্জি।
ইরানের পাল্টা জবাবের জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরাকের কুর্দিস্তানে তেল উৎপাদন এবং ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার বলেছে, দেশটির রাস লাফান শিল্পনগরী ও মেসাঈদ শিল্পনগরী লক্ষ্য করে ইরান দুটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি ড্রোন মেসাঈদে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংকে আঘাত হেনেছে। আরেকটি রাস লাফান শিল্পনগরে একটি জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এসব হামলায় উৎপাদন বন্ধ হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে সোমবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, কাতারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে। এ ধরনের হামলার অবশ্যই জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তবে এই মুহূর্তে কাতার ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে কাতার। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোয় গ্যাসের দাম গতকাল সোমবার এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, ইউরোপের বড় বাজার যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসে গ্যাসের দাম এক লাফে অনেক খানি বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেনজির গ্যাস ও এলএনজি গবেষণা ইউনিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসিমো ডি অডোয়ার্ডো বলেন, এলএনজি সরবরাহ বিপর্যস্ত হওয়ায় খুব শিগগির এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে গ্যাস আমদানি নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইসিই তথ্যমতে, নেদারল্যান্ডসের বেঞ্চমার্কে প্রতি ১০ লাখ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাসের দাম বেড়ে ১৫ দশমিক ৯২ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৮ টাকা) হয়েছে। প্রায় অর্ধেক লিটারের পানির তাপমাত্রা এক ডিগ্রি ফারেনহাইট বৃদ্ধি করতে যে পরিমাণ তাপ লাগে, সেটাই এক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট। বাজারে ন্যায্যতা ধরে রাখতে এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের লেনদেন হয় এই পদ্ধতিতে।
এদিকে সোমবার দিনের শুরুতে এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ১০ লাখ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাসের দাম দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক শূন্য ৬৮ ডলার।
আল জাজিরা জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সপ্তাহের প্রথম দিন সোমবার লেনদেন শুরু হতেই গ্যাসের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। তারপর তা আরও বেড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করতে ৩০টি বোমা ফেলা হয়েছিল তার কম্পাউন্ডে। ইকোনমিক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো খামেনির কম্পাউন্ড বা বাসভবনে ৩০টি বোমা ফেলে শনিবার। এতে কম্পাউন্ডটি জ্বলেপুড়ে যায়। তারপর বিধ্বস্ত হয় ওই ভবন। খবরে বলা হয়, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ইসরায়েলি বিমানগুলো ওই কম্পাউন্ডে প্রায় ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে। ধারণা করা হয়, খামেনি যে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ব্যবহার করতেন, সেটি ধ্বংস করতে একাধিক শক্তিশালী বোমা প্রয়োজন। শনিবার স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে অভিযানটি পরিচালিত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই যৌথ অভিযানটি কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খামেনির চলাফেরা নজরদারি করে এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার সকালে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের তথ্য ইসরায়েলি গোয়েন্দারা শনাক্ত করে ফেলে। দুই ইরানি সূত্র জানায়, হামলার কিছুক্ষণ আগে আলি শামখানি ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানির সঙ্গে একটি সুরক্ষিত স্থানে বৈঠক করেন খামেনি। মার্কিন সূত্রের মতে, খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই যৌথ বিমান ও নৌ অভিযান শুরু হয়। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, এই গোয়েন্দা তথ্য আসে সিআইএ থেকে এবং তা ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করা হয় হামলা পরিচালনার জন্য। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হামলার পরিকল্পনায় প্রথম লক্ষ্য ছিল খামেনি, যাতে আকস্মিকতার সুবিধা বজায় থাকে এবং তিনি লুকিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পান।
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে তেহরানের শাসকবর্গ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় উত্তরসূরি নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের নতুন নেতৃত্বের জন্য তার কাছে তিনজনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তার কাছে তিনটি চমৎকার বিকল্প রয়েছে, তবে এখনই তিনি তাদের নাম প্রকাশ করবেন না। মূলত তেহরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং এর পরেই তিনি নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করতে চান।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভূ-মধ্যসাগরীয় কৌশলগত গবেষণা ফাউন্ডেশনের পরিচালক পিয়েরে রাজক্স জানিয়েছেন, বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং শহরজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনসহ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
ইরানের দমনমূলক যন্ত্র হিসেবে পরিচিত ৬ লাখ বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক এবং ২ লাখ ৫০ হাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর বিশাল বহর সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষের রাজপথে নামার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু মানেই এই ব্যবস্থার অবসান নয়, কারণ ইরানের শাসনকাঠামো অনেকগুলো শক্তি কেন্দ্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক থিও নেনচিনি মনে করেন, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বা পাসদারান এই সুযোগে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। যদিও তাদের শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর সাম্প্রতিক হামলায় নিহত হয়েছেন, তবুও এই বাহিনীটি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
এছাড়া ৩ লাখ ৫০ হাজার সদস্যের নিয়মিত সেনাবাহিনীও ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদি সেনাবাহিনী গার্ডসদের থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, তবে ক্ষমতার সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসী বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐক্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। কারাবন্দি নোবেল বিজয়ী নার্গিস মোহাম্মদী বা নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভির মতো ব্যক্তিত্বরা আলোচনায় থাকলেও ইরানের ভেতরে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী আজাদেহ কিয়ান মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো বর্তমান শাসনের কোনো মধ্যপন্থি অংশের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছেন। তবে শেষ পর্যন্ত পাসদারান বাহিনী একটি সম্পূর্ণ সামরিক জান্তা গঠন করবে নাকি কোনো ধর্মীয় প্রলেপ বজায় রেখে নতুন কেউ ক্ষমতায় আসবে, তা আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর মোড় নিয়েছে। খামেনির নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance)-এর শরিক গোষ্ঠীগুলো একযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এই ঘোষণার ফলে পুরো অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মিত্র গোষ্ঠীগুলোর এই শক্ত অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য নতুন এক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য যেকোনো মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা মোকাবিলায় বর্তমানে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, খামেনির অনুপস্থিতিতে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ও সচল রাখতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন সরাসরি তদারকি শুরু করেছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘জঘন্য অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে এর জন্য সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে দায়ী করেছে। হামাস নেতাদের আশঙ্কা, এই বর্বরোচিত ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং শান্তি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেন পর্যন্ত। দেশটির হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছে, তারা যেকোনো মাত্রার সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত। তারা লোহিত সাগরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা আরও জোরদার করার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। হুথিদের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, খামেনি হত্যার প্রতিশোধ কেবল ইরানের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর প্রভাব পুরো সমুদ্রপথেও অনুভূত হবে।
এদিকে খামেনির আকস্মিক প্রস্থানে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা ও জল্পনা চলছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় বর্তমানে সবার শীর্ষে আলোচনায় উঠে এসেছে খামেনির পুত্র মোজতাবা খামেনি এবং ইরানের সাবেক প্রভাবশালী আইআরজিসি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলি লারিজানির নাম। পরবর্তী এক-দুই দিনের মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক বিশাল অনিশ্চয়তা আর প্রতিশোধের আগুনের মাঝেই ইরান এখন তার নতুন অভিভাবক খোঁজার চেষ্টায় লিপ্ত।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার দিবাগত গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে মোদি এই ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আলাপকালে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নরেন্দ্র মোদি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখনই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
ফোনালাপে মোদি সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। তিনি শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ভারত শুরু থেকেই এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান চায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের আলোচনার পক্ষে। আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ও তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির এই আলাপচারিতা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে সরাসরি এই আহ্বান জানানোকে বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট নিরসনে একটি সক্রিয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মোদি আবারও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি এড়াতে দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং সংলাপের পথে হাঁটা এখন সময়ের দাবি। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারত তার অবস্থান অটল রেখে আবারও এই সংঘাতের আশু সমাপ্তি কামনা করেছে। সব মিলিয়ে মোদি-নেতানিয়াহুর এই ফোনালাপ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমাতে নতুন কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শোকাতুর ইরান আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের সংবিধান অনুযায়ী নতুন উত্তরাধিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রের স্থায়ী নেতৃত্ব না থাকা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচারবিভাগের প্রধান এবং অভিভাবক পরিষদের একজন ফকিহকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল সাময়িকভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন যে, ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে খামেনির একটি স্থায়ী উত্তরসূরি বেছে নিতে সক্ষম হবে।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে উত্তরাধিকার কাউন্সিলের কাজ শুরুর বিষয়টি দেশবাসীকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি খামেনির এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘বিশাল ও জঘন্য অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করে দেশে সাত দিনের সরকারি ছুটি এবং ৪০ দিনের শোককাল ঘোষণা করেছেন। ৮৬ বছর বয়সি খামেনি গত শনিবার মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ এক বিমান হামলায় নিহত হন, যে হামলায় তাঁর পরিবারের সদস্যসহ অন্তত ২০১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর যেভাবে আলী খামেনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, ঠিক তেমনি এবারও বিশেষজ্ঞ পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নতুন নেতা নির্বাচনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের নজিরবিহীন লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন যে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক ও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, খামেনি কেবল ইরানের রাজনৈতিক অভিভাবক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতা। মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক অভিযানের লক্ষ্য সফল হয়নি দাবি করে তিনি আরও বলেন, ইরান কোনোভাবেই চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করবে না। অতীতেও দীর্ঘ যুদ্ধের পর প্রতিপক্ষকে যেভাবে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করতে হয়েছিল, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এই হামলাকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা হিসেবে বর্ণনা করে ইহুদিবাদী শক্তি ও আমেরিকার বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ওমান, দুবাই ও দোহার মতো অঞ্চলে ইরানের পালটা হামলার খবর পাওয়া গেলেও আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান তাঁর মুসলিম প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু করতে চায় না। এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে বরং হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার জন্য আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে এক বিশাল অনিশ্চয়তা ও শোকের আবহে ইরান এখন নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার পর বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। শিপিং ডেটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের দুই প্রবেশমুখে বর্তমানে শত শত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ১৫০টি বিশালাকার ট্যাংকার এখন হরমুজ প্রণালির বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর ফেলে অবস্থান করছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজি বাহী জাহাজের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া প্রণালির অপর প্রান্তেও কয়েক ডজন জাহাজ স্থির দাঁড়িয়ে আছে।
শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, শনিবার সকালে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর পুরো অঞ্চল নতুন করে যুদ্ধের কবলে পড়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ জাহাজ এখন ইরাক, সৌদি আরব এবং কাতার উপকূলের কাছে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণহরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ: বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোট এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালির এই ‘চোকপয়েন্ট’ বা সরু মোড়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজগুলো এমনভাবে অবস্থান করছে যেগুলোকে ‘ভাসমান তেলের পাহাড়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ইতোমধ্যে বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউস নিরাপত্তার স্বার্থে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। শিপিং তথ্য বলছে, কাতারের মতো এলএনজি জায়ান্ট এবং সৌদি আরবের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি কার্যক্রম এখন পুরোপুরি থমকে যাওয়ার পথে। এই অচলাবস্থার ফলে কেবল জ্বালানি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজ সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিন বিশ্ববাজারে লেনদেন শুরু হতেই তেলের দাম ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, ইরানে হামলার আগে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, হামলা যদি সীমিত পরিসরে হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ মার্কিন ডলার করে বাড়তে পারে। তবে খামেনি নিহত হওয়ার পর এই পূর্বাভাস থেকে সরে এসেছেন বিশ্লেষকেরা। তারা এখন বলছেন, সোমবার দিনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে হয়তো তেলের দাম ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জি বলেছে, সোমবার সপ্তাহের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসাবে ব্যারেলপ্রতি তেলের বেড়ে ৯০ ডলারে ঠেকতে পারে। অবশ্য আজ রোববার যদি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, তাহলে এতটা নাও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আবার তেলসমৃদ্ধ ওপেক জোট এবং রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী বড় দেশগুলো যদি উৎপাদন বাড়াতে সম্মত হয়, তাহলেও দরবৃদ্ধি খুব একটা হবে না।
রাইস্টাড বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহন যদি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম হয়তো ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।