জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘করোনার ধাক্কায় কোটি মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চার বছরের বেশি সময় ধরে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান হারানো, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মন্দার কারণে জাতীয় ও পরিবার পর্যায়ের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।’
আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো মহাসচিবের বাণীতে এ কথা বলা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা যেমন দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস পালন করছি, একই সঙ্গে একটি তিক্ত সত্যের মুখোমুখি হচ্ছি। যা শিকার করতেই হবে। আর সেটা হলো, বিশ্ব পিছিয়ে যাচ্ছে।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের মতে, সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী দরিদ্রতম মানুষেরাই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে, পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগের জন্য সম্পদে প্রবেশাধিকার ও ঋণমুক্তি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনও কঠিন করে তুলেছে।
বাণীতে বলা হয়, বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিক দারিদ্র বিমোচন দিবস সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘কাজেকর্মে সবার জন্য মর্যাদা’। এই প্রতিপাদ্য জরুরিভিত্তিতে বৈশ্বিক পদক্ষেপের এক উদাত্ত আহ্বান।
গুতেরেস বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা এই ধরিত্রীকে ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সবুজ অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে, তাদের সহযোগিতা দিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
বাণীতে সংঘাত বন্ধে, ভূরাজনৈতিক বিভক্তি দূরীকরণে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণেও জোর দেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ ও শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে অন্তত ৫৮৯ জনে পৌঁছেছে। স্মরণকালের ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত গুরুতর আহত হয়েছেন আরও প্রায় ২ হাজার ৯৮০ জন মানুষ।
শুক্রবার (২৬ জুন) ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভূমিকম্পের পর থেকে ধসে পড়া শত শত বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার বিশেষ সময়সীমা বা ‘গোল্ডেন উইন্ডো’র মধ্যে অলৌকিকভাবে হলেও জীবিতদের খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে বড় বড় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যত এগোবে, নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং নিখোঁজদের উদ্ধার করতে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নেয়নি।
এ সময় তিনি বৈশ্বিক এই দুর্যোগ মুহূর্তে জরুরি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিদেশি দক্ষ উদ্ধারকারী দলগুলোর দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন এবং তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি আরও জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যৌথ উদ্ধার অভিযানে ইতোমধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বহু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ভিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে বর্তমানে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাপক আকারে জোরদার করা হয়েছে।
পাশাপাশি দুর্গত ও গৃহহীন হাজার হাজার মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার জন্য রাজধানী কারাকাসে অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের বিশাল জরুরি মজুতকেন্দ্র স্থাপন করেছে দেশটির সরকার।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের পরিচালিত সর্বশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’ সমাপ্তির এক বছরেরও বেশি সময় পর সেই যুদ্ধে প্রাণ হারানো ভারতীয় সেনাদের তালিকা প্রকাশ করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘আর্মি ওয়্যার মেমোরিয়াল’-এর আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর মোট ৬ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন— সুবেদার মেজর পবন কুমার, রাইফেলম্যান সুনীল কুমার, ল্যান্স নায়েক দীনেশ কুমার, অগ্নিবীর মুদমুরলি নায়েক, হাবিলদার সুনীল কুমার সিং এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট সুরেন্দ্র কুমার। এই শহীদ বীরদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁদের নাম এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত করা হলো।
এই সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। গত বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পেহেলগামে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন হিন্দু পর্যটককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস ঘটনার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা বাতিলসহ কঠোর কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিপরীতে পাকিস্তানও ভারতের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়।
তীব্র উত্তেজনার একপর্যায়ে গত ১০ মে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে সংক্ষিপ্ত ও ঝটিকা অভিযান চালায় ভারত। নয়াদিল্লির দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে পাকিস্তানের ৭০ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে হতাহতের সংখ্যা ৩১ জন বলে দাবি করা হয় এবং তাঁরা সন্ত্রাসী ছিল না বলেও প্রচার করা হয়। দীর্ঘ গোপনীয়তা রক্ষার পর অবশেষে এই অভিযানে প্রাণ হারানো নিজস্ব সেনাদের পরিচয় প্রকাশ করল ভারত সরকার।
ডেনমার্কে মসজিদের লাউডস্পিকারে আজান বা ইসলামিক ‘কল টু প্রেয়ার’ প্রচার নিষিদ্ধ করার একটি নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন দেশটির অভিবাসন মন্ত্রী মর্টেন বডসকভ। ডেনমার্কের কিছু এলাকার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ইসলামাবাদের কোনো শহরতলী’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি এই কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান। দেশটির বর্তমান কেন্দ্র-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টির এই প্রভাবশালী নেতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নতুন সরকার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনি বৈধতা পুনরায় খতিয়ে দেখার জন্য নতুন করে তদন্ত শুরু করবে। বার্তা সংস্থা ‘রিটজৌ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী বডসকভ সাফ জানিয়ে দেন, ‘ডেনমার্কের ছাদগুলোর ওপর দিয়ে আজানের সুর ভেসে আসা উচিত নয়। ডেনমার্কে এর কোনো স্থান নেই। ডেনমার্কের রাস্তায় হাঁটার সময় কারো মনে এমন সন্দেহের উদ্রেক হওয়া উচিত নয় যে তিনি ইসলামাবাদের কোনো শহরতলীতে চলে এসেছেন।’
ইতোমধ্যেই ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনসহ বেশ কিছু বড় শহরে কঠোর শব্দদূষণ নীতি কার্যকর থাকায় মিনারের লাউডস্পিকারে আজান দেওয়ার ওপর স্থানীয় আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে মন্ত্রী বডসকভের দাবি, ডেনমার্কে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ‘ইসলামীকরণ’ সাধারণ মানুষের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে সংকুচিত করে ফেলছে। উল্লেখ্য যে, ডেনমার্কে আজান নিষিদ্ধ করার জন্য আইনি কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে কোনো অভিবাসন মন্ত্রীর এটি তৃতীয় দফার প্রচেষ্টা; এর আগে ২০২০ এবং ২০২৫ সালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যা ফলপ্রসূ হয়নি।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের নেতৃত্বে বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম কঠোর অভিবাসন নীতি বজায় রাখা হয়েছে। দেশটির বিতর্কিত ‘ঘেটো’ আইনের মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা নির্দিষ্ট সীমার ওপর চলে গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁদের অন্য এলাকায় সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ব্যয় মেটাতে তাঁদের ব্যক্তিগত অলঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী জমা রাখার মতো কঠোর নিয়মও দেশটিতে প্রচলিত রয়েছে। তবে আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার এই প্রচেষ্টা বড় ধরনের আইনি ও সাংবিধানিক বাধার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেনমার্কের সংবিধানে জনসমক্ষে ধর্মীয় উপাসনার অধিকার নিশ্চিত করা থাকলেও গণতন্ত্রবিরোধী প্রচারণা বা নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমী নিয়ম রয়েছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন জার্মানি এবং ব্রিটেনে আজান প্রচারের ক্ষেত্রে শব্দ ও সময়ের ওপর সুনির্দিষ্ট কঠোর নিয়ম রয়েছে যাতে প্রতিবেশীদের অসুবিধা না হয়। বর্তমানে ডেনমার্কের প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে আনুমানিক ২ লক্ষ ৭০ হাজার মুসলিম নাগরিক বসবাস করছেন এবং দেশটিতে প্রায় ১০০টি মসজিদ রয়েছে। গত মার্চ মাসে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নেওয়ার বিষয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে জাতীয় ম্যান্ডেট শক্তিশালী করতে আগাম নির্বাচন ডেকেছিলেন ফ্রেডেরিকসেন। দীর্ঘ আলোচনার পর বর্তমানে তিনি একটি চারদলীয় জোট সরকার পরিচালনা করছেন যা রাজনৈতিক মহলে ‘ফোর-লিফ ক্লোভার’ জোট নামে পরিচিত।
প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রুখতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদান—এই তিন দেশের ওপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সৌদি আরব। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি নাগরিকদের এই দেশগুলোতে ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং এই তিন দেশ থেকে আগত পর্যটকদের ভিসা প্রদানসহ সৌদিতে প্রবেশ সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র সরাসরি আসা যাত্রীদের জন্য নয়; বরং যারা সৌদি আরবে প্রবেশের ২১ দিন আগে এই তিনটি দেশের যেকোনো একটিতে অবস্থান করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে সৌদিতে আসতে চাইলে তাঁদের ক্ষেত্রেও এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। সৌদি আরবের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ‘ওয়েকায়া’ জানিয়েছে, সংক্রামক রোগের আন্তঃসীমান্ত বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে তারা এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতিবেশী রাষ্ট্র রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, তানজানিয়া এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে আগত যাত্রীদের জন্যও বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। সৌদি আরবের সকল প্রবেশপথে এই দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের নিবিড় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগ পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। ওয়েকায়া আশ্বস্ত করেছে যে, এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে ইবোলার কোনো নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়নি এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মহামারি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির ওপর ভিত্তি করে আগামীতে এই সুপারিশমালা সংশোধন বা হালনাগাদ করা হতে পারে। জননিরাপত্তা রক্ষায় এমন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বিদ্যমান অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধার পরিধি আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের আরও ৬টি দেশের নাগরিকরা এখন থেকে দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে ভিসার সুবিধা পাবেন। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন দেশগুলো হলো— ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কেনিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। গত বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে ‘গালফ নিউজ’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ছয়টি দেশের পর্যটক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য দুই ধরনের মেয়াদী অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রকল্প চালু করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী ১৪ দিন অথবা ৬০ দিনের যেকোনো একটি ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করতে পারবেন। ফি’র বিষয়ে জানানো হয়েছে যে, ১৪ দিনের ভিসার জন্য ১০০ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ৩৪১ টাকা) এবং ৬০ দিনের ভিসার জন্য ২৫০ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার ৩৫১ টাকা) পরিশোধ করতে হবে।
এর আগে পর্যন্ত বিশ্বের মোট ৩৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য আমিরাতে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ বিদ্যমান ছিল। এই তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন নতুন করে এশিয়া ও আফ্রিকার আরও ছয়টি দেশ যুক্ত হওয়ায় এই বিশেষ সুবিধাভোগী দেশের সংখ্যা দাঁড়ালো ৪১টিতে।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ছয় দেশের দর্শনার্থীরা যাতে “আমিরাতের সংস্কৃতি, বিশ্বমানের পর্যটন, গতিশীল অর্থনীতি, আকর্ষনীয় বাণিজ্য পরিবেশ এবং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অবকাঠামো সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন— সেজন্যই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।” আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই আমিরাত সরকার এই কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বাড়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে উদ্ধারকর্মীরা সেখানে আটকা পড়া জীবিতদের খুঁজে বের করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ‘ইউএসজিএস’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথমে ৭.২ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। এর মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই ৭.৫ মাত্রার আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূ-পৃষ্ঠের অগভীরে এই কম্পনগুলো উৎপন্ন হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়েছে। একটি জাতীয় ছুটির দিন হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ বাসগৃহে অবস্থান করছিলেন, যা হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজধানীর বাইরে ত্রুজিলো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো এবং মিরান্ডা অঙ্গরাজ্যেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মুখে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন যে, রাজধানী কারাকাস ও উপকূলীয় লা গুইরা শহরের অন্তত ২৫০টি ভবন ধসে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আসা মানুষের আর্তনাদ পরিস্থিতিকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলেছে। রাজধানীর প্রধান মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে এর সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানিয়েছেন যে, মূল ভূকম্পনের পর অন্তত ৩০টি ‘আফটারশক’ অনুভূত হয়েছে।
ইউএসজিএস সতর্ক করে জানিয়েছে যে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। সংস্থাটির প্রাথমিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই দুর্যোগে "১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ এবং এক লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা ৩৩ শতাংশ"। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৯০০ সালের পর এটিই ভেনেজুয়েলায় অনুভূত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং ১৯৬৭ সালের পর রাজধানী কারাকাসের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং প্লেট দুটির অভ্যন্তরীণ চাপ হঠাৎ মুক্ত হওয়ার ফলেই এই মহাবিপর্যয় ঘটেছে।
এই সংকটকালীন সময়ে উদ্ধার অভিযানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কাতার, মেক্সিকো, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও এল সালভাদর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১৫ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা ও অনুসন্ধান কাজের জন্য সামরিক পরিবহন বিমান ও জাহাজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বার্তায় শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাঁর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলসহ জরুরি চিকিৎসা ও মানবিক ত্রাণ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ভেনিজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে ১৬৪ জনের নিহতের খবর মিলেছে। এ ছাড়া আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এ তথ্য জানিয়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনিজুয়েলায় বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে, বহু মানুষ আটকা পড়েছেন এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যাস সরবরাহও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে আরও হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় গত বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে পুরো অঞ্চল কেঁপে ওঠে। বিভিন্ন শহর ও এলাকায় ভবন খালি করা হয়। এমনকি প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চল পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়।
গত বুধবার (২৪ জুন) গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ‘ভূমিকম্পে প্রধান বিমানবন্দর সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’ পাশাপাশি কয়েক দিনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বাতিল করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) প্রথমে জানায়, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ১। পরে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ২ বলা হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির ক্যারিবীয় উপকূলের মোরন এলাকার পশ্চিমে, কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার।
ইউএসজিএস জানায়, এর মাত্র এক মিনিট পর আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল মোরন থেকে ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে গত বুধবারের ভূমিকম্প অন্যতম। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার কিছু সময় পর ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানে।
এ সময় রাজধানী কারাকাসে দুলতে থাকা ভবনগুলো থেকে আতঙ্কিত হয়ে মানুষ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। কোথাও কোথাও ভবন ও পুরো দেওয়াল ধসে পড়ায় রাস্তা থেকেই ভবনের ভেতরের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছিল। রাজধানীর দুই এলাকায় ধুলার কুণ্ডলীও দেখা যায়। এসব এলাকায় সাধারণত রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকায় মানুষের ভিড়ও কিছুটা বেশি ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী এবং মানবিক সহায়তা পাঠাবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈদেশিক সহায়তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেরেমি লিউইন।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন ভেনিজুয়েলা সরকারের অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এমন একটি দুর্যোগ সহায়তা দল রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।’
এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে জানিয়েছেন, তার দেশ ৫০ টন সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত করেছে। পাশাপাশি ৩০০ উদ্ধারকর্মীও প্রস্তুত রয়েছেন, যারা ‘কারাকাসের উদ্দেশে রওনা হতে প্রস্তুত’। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া আজিনও জানিয়েছেন, তার দেশ ভেনিজুয়েলায় তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
এদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছেন, ‘ভেনিজুয়েলাকে সহায়তা করতে তার দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা মূল্যায়ন করা হবে।’ তিনি ভেনিজুয়েলাকে ব্রাজিলের ‘বন্ধুপ্রতিম দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রবার্তো ভেলাস্কো আলভারেজও ভেনিজুয়েলাকে ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংহতি ও সহায়তা’ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত আটকা বহু
ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানার পর সেখানকার কাতিয়া লা মার শহর বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানকার বহু ঘরবাড়ি ও উঁচু ভবন ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শহরটি।
এর মধ্যে অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। তাদের সারারাত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন আত্মীয়-স্বজনরা। আটকে পড়াদের অনেকে জীবিত থাকলেও তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি কেউ।
ল্যারি রোজাস নামে ৪৯ বছর বয়সি এক নারী বলেছেন, ‘আমাদের আর কিছুই নেই। একটু শক্তিও নেই ধসে পড়া ভবনের কাছে যাওয়ার।’ তিনি তার ধসে পড়া বাড়ির সামনে বসে আছেন। এর ভেতর তার বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন আটকা পড়ে আছেন।
আরেক নারীর এক মেয়ে ১২ তলা উঁচু একটি ভবনের নিচে আটকা পড়ে আছে। কিন্তু ভূমিকম্পের পর ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো তার মেয়েকে কেউ উদ্ধার করতে আসেনি। তিনি বলেছেন, ‘ধসে পড়া ভবনের নিচে জীবিত মানুষ আছেন। কিন্তু তাদের বাঁচাতে কেউ আসছেন না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তিন বিচারক মামলা দায়ের করেছেন। গত বছর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে তারা ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কানাডার বিচারক কিম্বারলি প্রোস্ট, উগান্ডার সলোমি বালুঙ্গি বোসা এবং বেনিনের রেইন অ্যাডিলেড সোফি অ্যালাপিনি গানসু গত বুধবার ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে দায়ের করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, বিচারবহির্ভূত চাপ প্রয়োগের জন্য তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো তাদের শাস্তি দেওয়া এবং নতি স্বীকারে বাধ্য করা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্তের জন্য গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বেশ কয়েকজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা তাদের সব সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছিল। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে লেনদেনও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
আইসিসি ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ১২৫টি সদস্য দেশে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি সুপারিশ করলে সে ক্ষেত্রেও আদালত বিচার করতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইসরায়েলের মতো কিছু দেশ আইসিসিরি কর্তৃত্ব স্বীকার করে না।
বিচারকরা অভিযোগ করেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আইনের পরিপন্থি। কারণ এটি আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের লঙ্ঘন। কোনো ধরনের প্রকৃত জাতীয় জরুরি অবস্থা বা অস্বাভাবিক হুমকির ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিচারকদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করে তাদেরসহ আইসিসির অন্য বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বিচারকরা বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার কারণে বিচারকরা এখন ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, ব্যাংকিংসেবা গ্রহণ, আমাজন ও গুগলের মতো সাধারণ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, ভ্রমণের টিকিট বুকিং এবং এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমাও পাচ্ছেন না।’
বিচারকরা আরও বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের কাছে বিচারাধীন বা ভবিষ্যতের কোনো মামলায় তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
ব্রিটেনে পোর্টসমাউথ ক্রাউন কোর্টে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক যুবককে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০ বছর বয়সি দণ্ডপ্রাপ্ত ওই যুবকের নাম তারেক মিয়া। তিনি ১২ বছর বয়সি প্রতিবন্ধী এক মেয়েশিশুকে ধর্ষণ ও ৯ বছর বয়সি আরেক শিশুকে অনলাইনে গ্রুমিং করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, তারেক এখনো মেয়েশিশুদের জন্য ‘অত্যন্ত উচ্চঝুঁকি’ তৈরি করছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ডেইলি মেইল জানিয়েছে, তারেক মিয়া তিন বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তিনি ওয়েস্ট সাসেক্সের ওয়ার্থিংয়ে বাস করতেন। ২০২৩ সালের আগস্টে স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের মাধ্যমে ১২ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েটির সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। মেয়েটি নিজের বয়স জানালেও তারেক বারবার তাকে চাপ দিয়ে দেখা করতে রাজি করান। তারেকের বয়স সে সময় ১৭ বছর ছিল।
প্রসিকিউশনের আইনজীবী স্টিভেন মলয় জানান, প্রথম দেখাতেই তারেক গাড়িতে করে মেয়েটিকে এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে ঘরের দরজা বন্ধ করে তাকে নির্যাতন করেন। বাড়িটির ভেতরে, গাড়ির পেছনে ও অন্যান্য স্থানে মেয়েটিকে তিনি একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ওই সময়ে তারেক কোনো সুরক্ষাসামগ্রীও ব্যবহার করেননি। অন্যদিকে মেয়েটির কোনো যৌন অভিজ্ঞতা ছিল না। ঘটনার পর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আদালতে ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। স্কুলে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ওই ঘটনা মনে পড়ে যায়। স্কুলে যেতে ভয় লাগে। ছয় মাস ধরে মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে হয়েছে। দরজায় মাথা ঠেকিয়ে মেঝেতে শুয়েছি। আমি এখনো সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এটা আমার শৈশব, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়েছে।’
মেয়েটির মা বলেন, ‘আমার মেয়ের মানসিক ক্ষতি হয়েছে। সে এখন ভুল জিনিস দেখে ও শোনে। আগের চেয়ে অনেক বেশি অন্তর্মুখী হয়ে গেছে।’ প্রবেশন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেকের সাংস্কৃতিক পটভূমি মেয়েশিশুদের প্রতি তার মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সালের মে মাসে তারেক দ্বিতীয় ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন—যার বয়স ছিল তখন মাত্র ৯ বছর। তারেক ওই শিশুকে নিজের হস্তমৈথুনের ভিডিও পাঠান এবং ওই শিশুকেও যৌনকাজের ভিডিও পাঠাতে বাধ্য করেন। এই ঘটনার পর মেয়েটি খুব ‘উদ্বিগ্ন’ বোধ করতে শুরু করে।
দ্বিতীয় ভুক্তভোগীর বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমি নাচের ক্লাস ছেড়ে দিয়েছি। স্কুলে মন বসে না। মায়ের কাছে থাকতে চাই। তিনি আমার ইমোশনাল পার্টনার।’ তার মা বলেন, ‘ঘটনার পর খুব ছোট বয়সেই আমাদের মেয়েকে যৌনতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।’
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারেক ঘটনাগুলোকে ‘সিলি মিসটেক’ ও ‘বয়সের দোষ’ বলে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জামিনে থাকার সময়ও তিনি অন্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তার ডিভাইসে শিশু পর্নোগ্রাফিসংক্রান্ত উপাদানও পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে টহলরত অবস্থায় বজ্রপাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এক সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত ভিনীত কুমার দুবে (৪৬) বিএসএফের ৭১ ব্যাটালিয়নের একজন হেড কনস্টেবল ছিলেন। তিনি উত্তর প্রদেশের কানৌজ জেলার বাসিন্দা। মুর্শিদাবাদের বাবুরা ঘাট সীমান্ত ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন তিনি।
বিএসএফ সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) গভীর রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছিল। ওই সময় আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে মিঠিপুর এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন দুবে।
সীমান্তের ‘জিরো লাইন’ সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থানে নজরদারির সময় বজ্রপাতের শিকার হন তিনি। ঘটনাটি ঘটার পর সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মিঠিপুর ক্যাম্পে নিয়ে যান। পরে তাকে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে একই দিনে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান এলাকায় বজ্রপাতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গঙ্গা নদী পার হওয়ার সময় নৌকায় থাকা অবস্থায় তারা বজ্রাঘাতের শিকার হন। এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের প্রয়োজন ছাড়া খোলা স্থানে অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানায় যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে তেহরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন খামেনি। আগামী ৪ থেকে ৯ জুলাই ইরানের বিভিন্ন শহর এবং ইরাকে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ৪ ও ৫ জুলাই ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রয়াত এই নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য একটি বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এর পরদিন, অর্থাৎ ৬ জুলাই তেহরানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে ৭ জুলাই কোয়ম শহরে আরেকটি জানাজা হবে।
কোয়মের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে ৯ জুলাই আরেকটি জানাজা শেষে বিখ্যাত ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে তেহরানের এই আমন্ত্রণ নয়াদিল্লিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।
ভারত ও ইরানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। জ্বালানি, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির পাশাপাশি ভারতের জন্য ইরানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে পাকিস্তানের ভূখণ্ড এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্যের একমাত্র পথ হচ্ছে ইরানের চাবাহার বন্দর—যেখানে ভারত বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও সামরিক অংশীদারত্ব এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। খামেনি যেহেতু সরাসরি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানে (অপারেশন এপিক ফিউরি) নিহত হয়েছেন, তাই এই জানাজায় মোদি বা ভারতের উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধিত্ব ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবকে ক্ষুব্ধ করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ ও নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ব্রহ্ম চেলানি বলেছেন, ‘খামেনির জানাজা নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের নীরবতা তেহরানের চোখে এক ধরনের কূটনৈতিক ঋণ তৈরি করেছে। তবে জানাজায় ভারতের বেশি হাই-প্রোফাইল উপস্থিতি আবার ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।’
ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ দিক হলো শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়। ইরানের পর বিশ্বজুড়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শিয়া ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস। আয়াতুল্লাহ খামেনি বিশ্বব্যাপী শিয়া মুসলিমদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হওয়ায় ভারতের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আবেগ তার জানাজার সঙ্গে যুক্ত। খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের বহু জায়গায় বড় ধরনের শোক মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই দিক থেকেই ভারসাম্য রক্ষা করা ভারতের জন্য জরুরি।
মোদি কি ইরান যাবেন
কূটনৈতিক সূত্র ও বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই জানাজায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ ছাড়া ওই সময়ে মোদির আগে থেকে নির্ধারিত বহুপক্ষীয় বিদেশ সফর রয়েছে।
তবে এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে যখন ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন ভারত একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল এবং তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে তেহরানে পাঠিয়েছিল। এবারও খামেনির জানাজায় কোনো সিনিয়র মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল পাঠানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।
ভারত বরাবরই যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটে নিজস্ব ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’বজায় রাখার নীতিতে বিশ্বাসী। এখন দেখার বিষয়, কোনো পক্ষকে অসন্তুষ্ট না করে নয়াদিল্লি এই কূটনৈতিক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলায় কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরে খাবার, জ্বালানি ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। এএফপি, বিবিসি উর্দু, এবং পাকিস্তানি দৈনিক ডনের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।
আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজার, মুদি কিংবা ওষুধের দোকান এবং পেট্রোল স্টেশনগুলোতে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এক প্রতিবেদনে দৈনিক ডন জানিয়েছে, রাজধানী মুজাফফরাবাদের বাসিন্দারা খাবার, ওষুধ ও জ্বালানি কিনতে পার্শ্ববর্তী খাইবার পাখতুনখোয়ায় যাচ্ছেন; আর পুঞ্চ, রাওয়ালাকোট, বাঘ এবং নীলম উপত্যকার বাসিন্দারা এসব পণ্য কিনে আনছেন রাওয়ালপিন্ডি এবং ইসলামাবাদ থেকে।
ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে সাংবাদিকদের প্রবেশ এবং ইন্টারনেটও। আজাদ কাশ্মীরের বেশিরভাগ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ মিলছে না। যেসব জায়গায় মিলছে, সেখানেও গতি খুব ধীর।
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতালাভের পর জম্মু- কাশ্মীরের দুটি অঞ্চল দখল করে পাকিস্তান— আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট-বাল্টিস্তান। বর্তমানে উভয়েই পাকিস্তানের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং দুটিতেই প্রাদেশিক আইনসভা বা বিধানসভা রয়েছে। আজাদ কাশ্মীরের বিধানসভায় আসনসংখ্যা ৪৫টি। সেই ৪২টি আসনের মধ্যে আবার ১২টি আসন ভারতের জম্মু- কাশ্মীর থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত।
বিধানসভায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দাবিতে গত ৫ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করে আজাদ কাশ্মীরভিত্তিক রাজনৈতিক দল জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএকে)। আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ৯ জুন হরতালও ডাকে জেএএকে। মূলত সেই হরতাল থেকেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত শুরু হয় জেএএকে’র।
গত শনিাবর এএফপির বরাতে জানা গিয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গত প্রায় দু’সপ্তাহে নিহত হয়েছেন ২৪ জন, আহত হয়েছেন আরও বহুসংখ্যক। সেইসঙ্গে বিক্ষোভে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত জেএএকের ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার সংবাদমাধ্যম এবং ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করায় তারপর থেকে এ সংক্রান্ত হালনাগাদ কোনো তথ্য এখনও আসেনি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সরকারের নির্বিচার গ্রেপ্তারের কারণে বর্তমানে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও পরিস্থিতি এখনও থমথমে। নীলম জেলার বাসিন্দা আলিফ দীন বিবিসি উর্দুকে বলেছেন, ‘স্থানীয় রেশনের দোকানে আমার টাকা জমা দেওয়া আছে। আমি গত ১৫ দিন ধরে দোকানে যাচ্ছি, কিন্তু আটা পাচ্ছি না। খোলাবাজারে যে আটা পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম অস্বাভাবিক বেশি।’
অনেকে খাইবার পাখতুনখোয়া বা রাওয়ালপিন্ডি থেকে পণ্য কিনে আনছেন, কিন্তু সেখানেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। পুঞ্চ জেলার বাসিন্দা নাভিদ নামের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তিনি রাওয়ালপিন্ডি থেকে বাসার জন্য প্রয়োজনীয় আটা, ডাল, চিনি, লবণ ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে ফিরছিলেন, কিন্তু আজাদ কাশ্মীরে প্রবেশের পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সেসব খাদ্যসামগ্রী জব্দ করে নিয়ে গেছে।
আমি পুলিশের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করেছি, ভিক্ষে চেয়েছি যেন খাবারগুলো তারা ফিরিয়ে দেয়। আমি তাদের এও বলেছি যে, আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভাবা। তবু তারা খাবারগুলো ফেরত দেয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, আজাদ কাশ্মীরের প্রবেশপথগুলোতে দাঁড়িয়ে আছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাকের সারি, কিন্তু সেসবকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ডন। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডনকে জানিয়েছেন, তারা রক্তপাতহীনভাবে জেএএকের বিক্ষোভ দমন করতে চান। এ কারণে ইচ্ছাকৃতভাবেই এই কৌশল নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ, যদি খাদ্য ও জরুরি পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে এমনিতেই বিক্ষোভের তেজ স্তিমিত হয়ে যাবে।
এদিকে জেএএকে নেতারা জানিয়েছেন, তারা বিক্ষোভ থেকে পিছু হটবেন না; বরং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন কর্মসূচি হিসেবে ১ লাখ মানুষ নিয়ে বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র রাওয়ালকোট থেকে রাজধানী মুজাফফরাবাদ লংমার্চের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেএএএক। সেই কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার যে দাপুটে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এতকাল ধরে একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিলেন। তার মূল দাবি ছিল, তিনি একাই আমেরিকার প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্বার্থে চালিত করতে পারেন। মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি নিজেকে এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন যিনি যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
এক সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা তাকে রসিকতা করে ‘আমেরিকান হুইস্পারার’ বা যুক্তরাষ্ট্রের কানপড়া দাতা বলে ডাকতেন, কারণ তিনি একটি ফোন কলেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দিতে পারতেন। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে যে নতুন চুক্তি করেছেন, তা নেতানিয়াহুর এতকালের সাজানো গল্পকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।
বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা বলছেন, এখন ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণ করার পরিবর্তে নেতানিয়াহু আমেরিকার তৈরি করা শর্তগুলো মুখবুজে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের দেশের স্বার্থে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছেন যেখানে ইসরায়েলের আপত্তি বা ওজর-আপত্তিগুলোকে তিনি কেবল একটি সামান্য প্রতিবন্ধকতা ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুকে কোনো নির্দেশ দিলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তা করতে বাধ্য হন।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রস বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু এখন নিজের দেশেও এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। একদিকে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপ, অন্যদিকে লেবাননে কোনো ধরনের সামরিক ছাড় দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নিজের কট্টর রাজনৈতিক ভোটব্যাংক।
এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখন পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে দেশে তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে, আবার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে আগামী শরৎকালীন সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়েছেন।
নেতানিয়াহুর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিটি মূলত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি চূড়ান্ত ও মরণকামড়। তিনি কেবল ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধেই পরাজিত হননি, বরং নিজের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও হারিয়েছেন। তিনি এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গেও একটি বড় ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।’
অবশ্য এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর দাপ্তরিক কার্যালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে চলতি মাসের এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক মূলত দুই অংশীদারের মতো, যেখানে অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয়ে অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিশাল সাফল্যকে খাটো করে দেখানোর জন্য একটি পদ্ধতিগত প্রচারণ চালানো হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি এখনও আগের মতোই অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অটুট রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং দেশটির আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ থেকে নিজেদের পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।