পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
আন্দামান সাগরে একটি শরণার্থী বোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ হওয়ার মর্মান্তিক তথ্য নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থা দুটি এই ঘটনার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করে জানায়, নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটি বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। সাগরে প্রচণ্ড বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায়, তবে নিখোঁজদের উদ্ধারে এখন পর্যন্ত কোনো আশাব্যঞ্জক সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিকে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং টেকসই সমাধানের অভাবের একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সহিংসতা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে এবং শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে চরম হতাশায় ঠেলে দিচ্ছে। পাচারকারীদের প্রলোভন ও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ বারবার এমন বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সংস্থা দুটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি তহবিল ও সংহতি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমার সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান না করলে এমন প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব নয় বলে বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তজনা ও গাজায় সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ছিন্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় দুই দেশ দীর্ঘকাল ধরে একে-অপরের নিকট সমরাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এবং উন্নত প্রযুক্তিগত গবেষণার তথ্য আদান-প্রদান করে আসছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে এই দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার অবসান ঘটল। ইতালির স্থানীয় সংবাদ সংস্থা আনসা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মেলোনি এই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি বাতিল করেছে।”
গাজা উপত্যকায় অব্যাহত প্রাণহানি এবং ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এর আগে স্পেনও ইসরায়েলের কাছে কোনো ধরনের যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ না করার কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। মূলত সেই একই পথ অনুসরণ করে এবার ইতালিও তেল আবিবের সঙ্গে তাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই পদক্ষেপকে ইসরায়েলের ওপর ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছে।
সূত্র: এএফপি।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। বেইজিং এই কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এক সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন।
গুয়ো জিয়াকুন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অবস্থান কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনাকেই উসকে দেবে না, বরং পূর্বের নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকেও আরও হুমকির মুখে ফেলবে। মার্কিন নীতির সমালোচনা করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।” মার্কিন প্রশাসনের এমন ভূমিকাকে তিনি পুনরায় ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে এই বিশেষ সামরিক অবরোধ কার্যকর করা শুরু করে। তবে এই বিধিনিষেধ সত্ত্বেও মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) একটি চীনা তেলের ট্যাংকার সফলভাবে ওই জলপথ অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। জাহাজ চলাচলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’ ও ‘কেপলার’ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই খবরটি উঠে এসেছে।
সূত্র: আল জাজিরা।
ওয়াশিংটনের কঠোর অবরোধ তোয়াক্কা না করেই একটি চীনা তেলের জাহাজ হরমুজ প্রণালি সফলভাবে পাড়ি দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) মার্কিন বিধিনিষেধের আওতায় থাকা এই ট্যাংকারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ অতিক্রম করে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই খবর নিশ্চিত করেছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজি, মেরিনট্রাফিক এবং কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ‘রিচ স্টারি’ নামক এই জাহাজটিই প্রথম কোনো নিষিদ্ধ ট্যাংকার যা হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করল। রয়টার্সের একই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ‘মুরলিকিশান’ নামের আরও একটি ট্যাংকার বর্তমানে হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসরমান রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১৬ এপ্রিল এটি ইরাকের বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করার লক্ষ্যে সেখানে নোঙর করবে।
উল্লেখ্য যে, ‘এমকেএ’ নামে অধিক পরিচিত এই তেলের জাহাজটির রাশিয়ার পাশাপাশি ইরানের জ্বালানি তেল পরিবহনেরও পূর্ব ইতিহাস রয়েছে।
ইরানের মজুতকৃত ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার একটি বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সোমবার মস্কোর ক্রেমলিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি দিমিত্রি পেসকভ এই তথ্য প্রকাশ করেন।
পেসকভ ব্রিফিংকালে উল্লেখ করেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার পরই এই প্রস্তাব দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। আগেও আমরা এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম।” তিনি আরও জানান, গত রবিবার টেলিফোনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে আলাপচারিতা হয়েছে। ওই আলোচনায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠকের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন পেজেশকিয়ান। সেই আলোচনার সূত্র ধরে পেসকভ বলেন, “প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগে সহযোগিতা করার জন্য তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বর্তমানে তেহরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, এই বিশুদ্ধতার মাত্রা ৯০ শতাংশে পৌঁছালে তা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। যদিও ইরান দীর্ঘকাল ধরে তাদের পারমাণবিক প্রকল্পের সামরিক উদ্দেশ্য থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। দীর্ঘ দুই দশকের বিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। এর আগে গত মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাবনা পাঠান, যার একটি প্রধান শর্ত ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম ধ্বংস অথবা দেশটি থেকে অপসারণ করা। মূলত সেই সংকট সমাধানের পথ হিসেবেই রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই নতুন প্রস্তাবনা সামনে এসেছে।
সূত্র: এএফপি।
দীর্ঘ দেড় মাসের সংঘাত নিরসনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যদিও ইসলামাবাদে আয়োজিত প্রথম দফার শান্তি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছিল, তবে খুব শীঘ্রই দেশ দুটি দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে পারে বলে জোরালো আভাস পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবারের মধ্যেই উভয় পক্ষ পুনরায় সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে পারে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমন এবং চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের সেতুবন্ধন তৈরি করছে। যদিও বর্তমানে সরাসরি বৈঠক স্থগিত রয়েছে, তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উভয় দেশ একে অপরের শর্ত ও প্রস্তাবনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন, "Iran is eager to reach a deal and they have reached out।" একই সাথে মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, সমঝোতার লক্ষ্যে দুই পক্ষের মধ্যে বর্তমানে এক ধরনের ইতিবাচক গতিশীলতা কাজ করছে। আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে সরাসরি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ অথবা সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী বৈঠকে ইরান তাদের ১০ দফা দাবিনামায় মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা বিলোপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছিল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন এই দ্বিতীয় দফার আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান ঘটতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা।
মাদক পাচারের দায়ে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ একদিনে দোষী সাব্যস্ত সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। সৌদি প্রেস এজেন্সি জানায়, পাঁচজন সৌদি নাগরিক এবং দু’জন জর্ডানির বিরুদ্ধে রাজ্যে অ্যামফেটামিন ট্যাবলেট পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
সংস্থাটি জানায়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিবেচনামূলক শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গত রোববার (১২ এপ্রিল) রিয়াদে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রিয়াদ মাদক সম্পর্কিত মামলায় ৩৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাব অনুযায়ী যা মোট ৬১টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এ বছর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকরাই বেশি। তাদের মোট সংখ্যা ৩৩। ২০২৫ সালে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা টানা দ্বিতীয় বছরের মতো রেকর্ড ছুঁয়েছিল। ওই বছর ৩৫৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে ২৪৩ জনই মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৯৯০ সাল থেকে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য সংরক্ষণ শুরু করার পর এটিই ছিল এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যা।
এর আগের রেকর্ড ছিল ২০২৪ সালে ৩৩৮টি মৃত্যুদণ্ড। প্রায় তিন বছর বিরতির পর ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরব আবার মাদক সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু করে। আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটি একই সঙ্গে ক্যাপটাগন নামের অবৈধ উত্তেজক মাদকের অন্যতম বড় বাজার। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা বাশার আল-আসাদ-এর আমলে এই মাদক ছিল দেশটির সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য।
মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, এটি বিশ্বে নিজেদের আধুনিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার সৌদি প্রচেষ্টার সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতিহাসের প্রথম মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ লিও চতুর্দশের মধ্যে নজিরবিহীন এক বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরান যুদ্ধ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে পোপের সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প তাকে ‘উগ্র বামপন্থীদের অনুসারী’ এবং ‘অযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, পোপ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভয় পান না এবং শান্তির বাণী প্রচার করা তার ধর্মীয় দায়িত্ব।
সোমবার আলজেরিয়া সফরের পথে বিমানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পোপ লিও চতুর্দশ বলেন, ভ্যাটিকানের শান্তির আহ্বান মূলত বাইবেলের সুসমাচার বা ‘গসপেল’-এর ওপর ভিত্তি করে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যা করার চেষ্টা করছেন এবং আমার বার্তাকে একই পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। সুসমাচারের বার্তা খুব স্পষ্ট- ‘শান্তি স্থাপনকারীরা ধন্য’।’ ট্রাম্পের কড়া সমালোচনার মুখেও পোপ অবিচল থেকে জানান, যুদ্ধের বদলে শান্তির সেতু তৈরি করাই তার মিশন।
গত রোববার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পোপের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন আক্রমণাত্মক কথা বলতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি পোপকে ‘অত্যন্ত উদারপন্থী’ এবং ‘দুর্বল’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পোপ লিওর ভক্ত নই। তিনি অপরাধের বিষয়ে নমনীয় এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভয়াবহ।’ ট্রাম্প আরও দাবি করেন, পোপ কেবল মার্কিন বংশোদ্ভূত বলেই এই পদ পেয়েছেন এবং তিনি ‘র্যাডিক্যাল লেফট’ বা চরম বামপন্থীদের তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের অভিযোগের মূল কারণ হলো পোপের সাম্প্রতিক মন্তব্য, যেখানে তিনি ইরান যুদ্ধের নেপথ্যে ‘সর্বশক্তিমান হওয়ার বিভ্রম’ কাজ করছে বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এমন একজন পোপ চাই না যিনি ভাবেন যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে।’
বাগ্যুদ্ধের মাঝেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিতর্কিত ছবি পোস্ট করেন। যেখানে তাকে যিশু খ্রিস্টের মতো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের আঙুল থেকে আলো নির্গত হচ্ছে এবং তিনি একজন অসুস্থ ব্যক্তির ওপর হাত রেখে তাকে সুস্থ করছেন। এই ছবি এবং ট্রাম্পের যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের কর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টি মার্কিন ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ইউএস কনফারেন্স অব ক্যাথলিক বিশপস-এর প্রেসিডেন্ট আর্চবিশপ পল এস কোকলি ট্রাম্পের মন্তব্যে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পোপ কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন; তিনি খ্রিস্টের প্রতিনিধি যিনি আত্মার শান্তির জন্য কথা বলেন।’
এদিকে, সিআইএ-র সাবেক পরিচালক জন ব্রেনান ট্রাম্পকে ‘মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ’ আখ্যা দিয়ে তাকে অপসারণের দাবিতে সরব হয়েছেন। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকা এখন সারা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। ২৫তম সংশোধনী কার্যকরের মাধ্যমে তাকে সরাতে ইতোমধ্যে ৭০ জনেরও বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পাকিস্তানে চলা শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। একদিকে পোপের শান্তির আহ্বান আর অন্যদিকে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী অবস্থান—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন এবং ভ্যাটিকানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি পোপকে আক্রমণ করার ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে বিরল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের দাবিতে এবার সরব হয়েছেন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাবেক পরিচালক জন ব্রেনান। ট্রাম্পকে ‘মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ’ আখ্যা দিয়ে ব্রেনান বলেছেন, মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই প্রণয়ন করা হয়েছিল।
স্থানীয় সময় গত শনিবার সংবাদমাধ্যম ‘এমএস নাউ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওবামা আমলের এই গোয়েন্দা প্রধান বলেন, ‘ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ এবং ইরান ইস্যুতে তার ভয়াবহ হুমকি তাকে কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য করে তুলেছে।’
জন ব্রেনানের মতে, ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের প্রেসিডেন্টের কাজ হতে পারে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ট্রাম্পের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ থাকা এখন সারা বিশ্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ব্রেনান বলেন, ‘এই ব্যক্তি স্পষ্টতই অপ্রকৃতিস্থ। যারা ২৫তম সংশোধনী লেখেছিলেন, তারা ট্রাম্পের মতো কোনো অস্থির নেতার কথাই হয়তো চিন্তা করেছিলেন।’
১৯৬৭ সালে মার্কিন সংবিধানে যুক্ত করা এই সংশোধনী অনুযায়ী, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য মনে করেন যে প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম, তবে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে কংগ্রেসে অন্তত ৭০ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য এই সংশোধনী কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের অনুগত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বর্তমান মন্ত্রিসভার সমর্থন ছাড়া এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জন ব্রেনানের এই কড়া মন্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়াও দেখছেন কেউ কেউ। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ ব্রেনান এবং এফবিআইয়ের সাবেক প্রধান জেমস কোমির বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্ত চালাচ্ছে। গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই তদন্তকে ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ’ হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা। তবে ব্রেনান স্পষ্ট করেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণের ভয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে চুপ থাকবেন না।
ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক রূপ এবং ঘরের ভেতরে খোদ গোয়েন্দা প্রধানের এমন হুঁশিয়ারি ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউসের মিত্ররা ব্রেনানের মন্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিলেও, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘অত্যাচার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে এরদোয়ান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে দ্য জেরুজালেম পোস্ট।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এশিয়া-পলিটিক্যাল পার্টিস কনফারেন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, ‘কোনো নিয়ম বা নীতির তোয়াক্কা না করে রক্তে রঞ্জিত এই গণহত্যার নেটওয়ার্ক নিরীহ শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষদের হত্যা করছে।’
এরদোয়ান দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের হামলায় ১২ লাখ লেবানিজ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করে বলেন, ‘তুরস্ক প্রয়োজন হলে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।’
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘যেভাবে আমরা নাগার্নো কারাবাখে গিয়েছিলাম, যেভাবে লিবিয়ায় গিয়েছিলাম তেমনি তাদের ক্ষেত্রেও আমরা তা করতে পারি।’
এরদোয়ানের বক্তব্যের জবাবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচেয় এলিয়াহু এরদোয়ানকে ‘ভণ্ড’ এবং ‘স্বৈরাচারী’ বলে আখ্যা দেন এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘তুরস্ক নিজেই অতীতে কুর্দি অঞ্চল দখল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর দমননীতি চালিয়েছে, তাই তাদের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ।’
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় গাজা ফ্লোটিলায় সামরিক অভিযান ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ আটকানোকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনায় তুরস্কে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় তুরস্কের একটি আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ৩৫ জন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ফিলিস্তিন ইস্যু ঘিরে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কঠোর বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ফিলিস্তিনে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার যাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় লেবাননে ২,০৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হারে এক উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। গত ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ৬৩৯ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, যা ১৯৮৯ সালের পর গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সোমবার (১৩ এপ্রিল) নরওয়ে-ভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ এবং প্যারিস-ভিত্তিক ‘টুগেদার অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি’ প্রকাশিত এক যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই স্পর্শকাতর প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে মোট ৯৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির বিচারিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কঠোরতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। মৃতদের তালিকায় সাধারণ পুরুষদের পাশাপাশি অন্তত ৪৮ জন নারীও ছিলেন, যাদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অস্থিতিশীলতারই একটি প্রতিফলন।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক জনবিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দমনের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরান সরকার মূলত জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এনজিওগুলোর প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ইরান যদি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধের ধাক্কা সামলে টিকে যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই দমন-পীড়নের মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারে। মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে একটি প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষাকারী বিভিন্ন সংগঠন ও দেশসমূহ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার মাঝে ইরানের এই বিচারিক ব্যবস্থার কঠোরতা বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ বৈঠক শেষে গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমনটাই বলেছেন। এদিকে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে এর প্রভাব পুরো বিশ্বে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জেডি ভ্যান্স জানান, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়ার পর তিনি আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছেন। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিকে দায়ী করা হয়েছে। পরস্পরকে দোষারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি’চাইছে ওয়াশিংটন। তবে এ আলোচনায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভ্যান্স। এর আগে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আলোচনার সুযোগ দিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই কঠোর অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানো হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানি গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘অতিরিক্ত দাবি’করছে বলে অভিযোগ করার পরপরই বোঝা গিয়েছিল যে আলোচনায় টানাপড়েন চলছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরআইবি বলেছে, ‘ইরানি প্রতিনিধিদল ইরানি জনগণের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য টানা ২১ ঘণ্টা নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে গেছে। ইরানি পক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এভাবে আলোচনা থেমে গেছে।’
আলোচনা ভেস্তে গেল কেন?
একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যর্থতা হঠাৎ করে নয় বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা বলছে, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে ‘অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে এবং তা সীমিত করতে অনীহা দেখায়। এই ইস্যুতেই আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়।
একইসঙ্গে অর্থনৈতিক প্রশ্নও আলোচনাকে জটিল করে তোলে। ইরান চেয়েছিল বিদেশে জব্দ থাকা তাদের বিপুল সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কথা বললেও তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান আরও দূরে সরে যায় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও রয়টার্স।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে ইরান তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবাধ থাকুক। এই দ্বন্দ্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত, ফলে সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
দুই পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগও আলোচনাকে ব্যাহত করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান ‘মূল প্রতিশ্রুতি’ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত ও অবাস্তব শর্ত’ চাপিয়ে দিয়েছে। এই দোষারোপের রাজনীতি আলোচনার পরিবেশকে আরও নেতিবাচক করে তোলে বলে উল্লেখ করেছে অ্যাক্সিওস ও আল জাজিরা।
আবার তাহলে কী ভয়াবহ যুদ্ধ?
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিল যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছে- এমন দাবি নিয়ে। তাই এত অল্প সময়ে কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো দেশ দুইটির পক্ষে স্বাভাবিক বিচারেই কঠিন ছিল। ইতোমধ্যে ব্যর্থতার জন্য উভয় পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করে ফিরে গেছে। গত বুধবার দেশ দুইটির মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘অ্যাপোক্যালিপটিক’ বা ধ্বংসাত্মক হুমকির মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু এখন তাহলে কী হবে? যুদ্ধবিরতি কি বহাল থাকবে? বিবিসি সংবাদদাতা জো ইনউড বলেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে হামলার সম্ভাবনা যে নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
হরমুজ প্রণালি, যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যা ইরান আংশিকভাবে কিন্তু কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আপাতত আলোচনার টেবিলের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু, পারস্য উপসাগরে কয়েকদিন আগে মোতায়েন করা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অন্য কোনো পথের কথা ভাবছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না- এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়াটাই ছিল আলোচনা সফল হওয়ার পথে প্রধান বাধা।
ইরান সবসময়ই দাবি করে এসেছে যে তারা মারণাস্ত্র উৎপাদন করতে চায় না, কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হওয়ায় তাদের দেশে পারমাণবিক অস্ত্রের সমর্থকদের এখন পারমাণবিক শক্তি অর্জনে আরও উৎসাহিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সরাসরি আলোচনা ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু এটি হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশে বিদেশ থেকে যাওয়া—যা ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নামে পরিচিত—এখন কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইল থেকে জানা গেছে, সংস্থাটি ‘বার্থ ট্যুরিজম ইনিশিয়েটিভ’ নামে নতুন একটি উদ্যোগ চালু করেছে। এর আওতায় দেশজুড়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এমন সব সংগঠিত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে, যারা গর্ভবতী নারীদের ভিসা আবেদনে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে সাহায্য করে।
এই নারীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নবজাতকের জন্য স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা। ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়টিকে সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, এই ধরনের জন্ম পর্যটন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তার দাবি, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না।
অন্যদিকে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজেই বেআইনি নয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় যদি ভিসা জালিয়াতি বা প্রতারণা ঘটে, সেসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চালু হওয়া একটি নীতিমালায় বলা হয়েছিল—শুধুমাত্র সন্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশে পর্যটক ভিসা ব্যবহার করা যাবে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হতে পারে।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ কতটা বড় সমস্যা, তা স্পষ্ট নয়। সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী এই উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তবে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় ৩৬ লাখ শিশুর তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সামান্য।
তবুও রিপাবলিকান নেতারা এই ইস্যু সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই নাগরিকত্ব পায়—যা দীর্ঘদিনের আইনি নজির।
ক্ষমতায় ফিরে প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেখানে বলা হয়—যদি বাবা-মায়ের কেউ মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তাহলে তাদের সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও নাগরিকত্ব পাবে না। এই সিদ্ধান্তটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে কয়েকজন ফেডারেল বিচারক তা স্থগিত করেন, এবং বিষয়টি এখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান নিয়ম ‘বার্থ ট্যুরিজম’-কে উৎসাহিত করছে এবং এর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব সংযোগ কম।
এই নতুন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)। সংস্থাটি বিশেষভাবে জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো ভেঙে দিতে কাজ করবে।
এর আগে ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘বার্থ হাউস’ পরিচালনার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যেখানে বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। সেই ঘটনাকে জন্ম পর্যটনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এখনো বহাল থাকলেও, এই সুযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জালিয়াতি চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।