পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
ভারতের মেঘালয়ের তাসখাই অঞ্চলের কয়লাখনিতে বিস্ফোরণের ফলে গতকাল বৃহস্পতিবার ভয়াবহ ধস নামে। আর সেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন শ্রমিক। এখনও নিখোঁজ বহু। শঙ্কা, মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ। মনে করা হচ্ছে, মৃতদের অধিকাংশই অসমের বাসিন্দা।
পুলিশ জানিয়েছে, অবৈধভাবে ‘র্যাট হোল’ খনন করে ওই এলাকায় কয়লা উত্তোলনের কাজ চলছিল। সেখানে কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটল, তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
মেঘালয়ের পূর্ব জয়ন্তিয়া পাহাড় জেলার থাংস্কু এলাকার একটি কয়লাখনিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিস্ফোরণ ঘটেছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি আই নোংরাং জানিয়েছেন, কয়লাখনিটি বেআইনি ভাবে চলছিল বলে মনে করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের ফলে খনির মুখে ধস নামে এবং সেখান থেকে বেরোনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। ডিজি বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত ১৬টি দেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গিয়েছে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে খনির ভিতর মোট কত জন শ্রমিক ছিলেন, তা এখনও জানা যায়নি। আরও কয়েক জন ভিতরে আটকে থাকতে পারেন। উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।’
‘র্যাট হোল মাইনিং’-এর ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে সরু তিন-চার ফুটের গর্ত খোঁড়া হয়। গর্তগুলি এতটাই সরু হয় যে, এক বারে এক জনের বেশি সেখান দিয়ে যাতায়াত করতে পারেন না। ওই গর্ত দিয়ে খনিতে নেমে কয়লা উত্তোলন করা হয়। সরু আনুভূমিক এই গর্তগুলিকেই ‘র্যাট হোল’ বলা হয়। ২০১৪ সালে মেঘালয়ে ‘র্যাট হোল মাইনিং’ বা ‘ইঁদুর গর্ত খনন’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল জাতীয় পরিবেশ আদালত। এই ধরনের খননকার্যকে ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। পরে সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য নিষেধাজ্ঞা তুলেছে।
ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘পূর্ব জয়ন্তিয়া পাহাড়ে কয়লাখনির ঘটনায় আমি আন্তরিক দুঃখিত। দুর্ভাগ্যজনক এই ঘটনায় যারা প্রিয়জনকে হারালেন, তাদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল। কী ভাবে এই ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে মেঘালয় সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছে রাজ্য সরকার।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের পূর্ব জয়ন্তী হিলসের তাসখাই অঞ্চলে বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) একটি অবৈধ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই আকস্মিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং খনির অভ্যন্তরে আরও অনেক শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই খনিটিতে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্রই স্থানীয় পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে, বিস্ফোরণের পরপরই খনির মুখ দিয়ে ঘন কালো ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে এবং বাইরে থাকা শ্রমিকদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে তীব্র আর্তনাদ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত শ্রমিকদের অধিকাংশই প্রতিবেশী রাজ্য আসামের বাসিন্দা বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। উদ্ধারকর্মীরা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে খনির ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন, তবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মেঘালয় পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, খনির ভেতরের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেখানে কোনো বিষাক্ত গ্যাস জমে আছে কি না কিংবা নতুন করে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, উদ্ধারকারী দলগুলো তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখছে।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে যে, খনির ভেতরে দাহ্য গ্যাস জমে আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে অথবা অবৈধভাবে বিস্ফোরক ব্যবহারের জেরেও এই বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অঞ্চলে অবৈধ খননকার্য ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে শঙ্কা ছিল, এই ঘটনা তাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ডিসেম্বরে একই জেলায় একটি অবৈধ খনিতে বিস্ফোরণে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে মেঘালয় মানবাধিকার কমিশন ও হাইকোর্ট কর্তৃক নিযুক্ত একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি তদন্ত পরিচালনা করেছিল। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতেও একই পাহাড়ের উমথে গ্রামে অনুরূপ একটি অবৈধ খনিতে পড়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়, যার ফলে স্থানীয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এলাকাটি সিল করে তদন্ত শুরু করেছিল। একের পর এক এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরেও অবৈধ খননকার্য বন্ধ না হওয়ায় এই অঞ্চলের জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাইজেরিয়ার পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে সশস্ত্র বন্দুকধারীদের দুটি পৃথক ও নৃশংস হামলায় অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ক্বোয়ারা ও কাটসিনা রাজ্যে এই রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালায় এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর পাশাপাশি ব্যাপক লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়।
হামলার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্বোয়ারা রাজ্যের ওরো গ্রামে। স্থানীয় আইনপ্রণেতা সাইদু বাবা আহমেদ এবং মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল এই গ্রামেই অন্তত ১৭০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে গ্রামবাসীদের হাত বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে পুরো গ্রামজুড়ে দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই বর্বরোচিত হামলার পর থেকে বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওরো গ্রামের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তরাঞ্চলীয় কাটসিনা রাজ্যে আরেকটি সশস্ত্র দল ঘরে ঘরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২১ জনকে হত্যা করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নাইজেরিয়ার সরকারি বাহিনীর কঠোর সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মাসে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী একটি সমন্বিত অভিযানে অন্তত ১৫০ জন জঙ্গিকে হত্যার দাবি করেছিল। ওরো গ্রামের বাসিন্দারা মনে করেন, হামলাটি বোকো হারামের সঙ্গে যুক্ত কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠীর কাজ হতে পারে। অন্যদিকে, কাটসিনা রাজ্যে দীর্ঘ ছয় মাসের শান্তিচুক্তি ভেঙে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অবাধে বিচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে নাইজেরিয়া এক জটিল ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম ও আইএসের মতো বৈশ্বিক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় রয়েছে, অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় নাইজেরিয়া সরকার এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করেছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে মার্কিন বাহিনী দেশটিতে কয়েকটি ‘সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে’ বিমান হামলা চালানোর পর বর্তমানে নতুন করে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা নাইজেরিয়ায় পৌঁছেছেন। অটোমেটিক অস্ত্রসজ্জিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান তৎপরতায় নাইজেরিয়ার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পর্যবেক্ষকরা।
পাকিস্তানের অস্থিতিশীল প্রদেশ বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সহিংসতাকে কেন্দ্র করে চিরবৈরী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ সরাসরি ভারতকে দায়ী করলেও নয়াদিল্লি সেই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত সপ্তাহে, যখন বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) একযোগে ব্যাংক, নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প, সরকারি ভবন ও স্কুলে ভয়াবহ হামলা চালায়। ওই সহিংসতায় অন্তত ৫০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পুলিশ বড় ধরনের অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা ১৭৭ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। এই অভিযানের পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, ওই অঞ্চলে সক্রিয় ভারতীয় এজেন্ট ও তাদের সহযোগীদের তারা নির্মূল করে দিয়েছেন। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে বিএলএ ভারত থেকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা পায়, যদিও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
পাকিস্তানের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামাবাদের এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরাতেই পাকিস্তান নিয়মিতভাবে ভারতের বিরুদ্ধে এ ধরনের পুরোনো কৌশল ব্যবহার করে থাকে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তোতাপাখির মতো অন্যকে দোষারোপ না করে পাকিস্তানের উচিত বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। রণধীর জয়সওয়াল আরও উল্লেখ করেন যে, বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বর্বরতা, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের ওপর দমননীতির বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মহলে কারও অজানা নয়।
দুই দেশের এই কূটনৈতিক লড়াই কেবল সরকারি বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আন্তর্জাতিক ফোরামেও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তান নিজের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে নিয়মিতভাবে ভারতকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে পাকিস্তান মনে করছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে বিএলএ-কে মদত দিচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তানের প্রকৃত অস্থিরতা ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ নিরসনের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। সামগ্রিকভাবে বেলুচিস্তানকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের এই নতুন দ্বৈরথ ওই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন বন্দিশালা থেকে মুক্ত করার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির রাজধানী কারাকাস। প্রাণঘাতী এক মার্কিন সামরিক অভিযানে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত ও আটক হওয়ার এক মাস পূর্তিতে মঙ্গলবার হাজার হাজার সমর্থক রাজপথে নেমে এই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বার্তাসংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কারাকাসের রাজপথ এদিন ‘ভেনেজুয়েলার প্রয়োজন নিকোলাস’— এমন স্লোগানে মুখরিত ছিল। বিক্ষোভকারীরা দ্রুত তাঁদের নেতাকে দেশে ফিরিয়ে আনার এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান।
এই বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়াদের একটি বড় অংশই ছিলেন সরকারি কর্মচারী। তাঁরা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর ছবি সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন বহন করেন। মিছিলের অনেককে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ প্রবর্তিত বামপন্থি পপুলিস্ট মতাদর্শ ‘চাভিস্তা’র প্রতীক হিসেবে লাল রঙের পোশাক পরে থাকতে দেখা যায়। রাজপথে ট্রাকে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে এবং ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকা নেড়ে এক আবেগঘন ও প্রতিবাদী পরিবেশ তৈরি করেন সমর্থকরা। উল্লেখ্য, এক মাস আগে নাটকীয়ভাবে মার্কিন সেনাদের হাতে আটক হওয়ার পর মাদুরোকে নিউইয়র্কের একটি আদালতে মাদক মামলার বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, যা তাঁর অনুসারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
মাদুরোর এই অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগজ বর্তমানে এক কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। একদিকে তাঁকে ওয়াশিংটনের সমর্থন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারে থাকা প্রবল মাদুরোপন্থী নেতা ও সাধারণ মানুষের অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন বড় ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন।
এদিকে মাদুরোর সমর্থকরা যখন রাজপথে তাঁর মুক্তির দাবি তুলছেন, ঠিক সেই সময়েই দেশটির বিরোধী দলগুলো নতুন করে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আন্দোলন জোরদার করছে। বিরোধী শিবিরের মতে, মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। সব মিলিয়ে মাদুরোর আটক হওয়ার এক মাস পর ভেনেজুয়েলা এখন একদিকে মাদুরোপন্থীদের আবেগ আর অন্যদিকে বিরোধীদের নতুন নির্বাচনের দাবির মধ্যে এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন বন্দিশালায় মাদুরোর বিচার প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হবে, ভেনেজুয়েলার রাজপথ তত বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মুখ খুলেছেন বিশ্বের অন্যতম ধনকুবের ও মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সময় কাটানোকে নিজের জীবনের বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করে তিনি এর প্রতিটি মিনিটের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন সংক্রান্ত কয়েক লাখ চাঞ্চল্যকর নথি প্রকাশ করার পর এই ইস্যুটি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। প্রকাশিত নথিতে বিল গেটসকে নিয়ে কিছু বিতর্কিত তথ্য উঠে আসায় তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
প্রকাশিত নথিপত্রগুলোর মধ্যে থাকা একটি খসড়া ইমেইল নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সেই ইমেইলে জেফরি এপস্টেইন দাবি করেছিলেন যে, বিল গেটস এক রুশ নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এমনকি সেই সম্পর্কের প্রভাবে গেটস অসুস্থ হয়ে পড়লে এপস্টেইন তাকে বিশেষ ওষুধ সরবরাহ করেছিলেন বলেও ইমেইলটিতে উল্লেখ করা হয়। সেখানে আরও অভিযোগ করা হয় যে, গেটস যেন অন্য বিবাহিত নারীদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, সেজন্য এপস্টেইন তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। মূলত এই ইমেইলের সূত্র ধরেই বিল গেটসের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
তবে এসব তথ্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন বিল গেটস। সংবাদমাধ্যম ৯নিউজ অস্ট্রেলিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওই খসড়া ইমেইলটি কখনও কোথাও পাঠানো হয়নি এবং এতে উল্লেখিত সব তথ্যই বানোয়াট। বিল গেটস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তিনি জানেন না কেন এপস্টেইন এমন ইমেইল লিখেছিলেন কিংবা তাকে আক্রমণ করার পেছনে কোনো বিশেষ মতলব ছিল কি না। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমি তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মিনিটের জন্য অনুতপ্ত এবং এর জন্য ক্ষমা চাই।" তাঁর মতে, এপস্টেইনের মতো একজন অপরাধীর সঙ্গে সামান্যতম যোগাযোগ রাখাও তাঁর জীবনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বিল গেটস জানান, ২০১১ সালে প্রথম তাঁর সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর পরবর্তী তিন বছরে তাঁরা কয়েকবার কেবল দাপ্তরিক বা সৌজন্যমূলক নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন। তবে তিনি জোর দিয়ে পুনরায় বলেন যে, এপস্টেইনের মালিকানাধীন বিতর্কিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপে তিনি কখনও যাননি এবং কোনো নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগটি পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত। বিল গেটসের এক মুখপাত্রও একই দাবি করে জানিয়েছেন যে, এ ধরনের কোনো অনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে বিল গেটসের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত বিচার বিভাগীয় নথিতে নাম আসায় নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই বিল গেটস এই জনসমক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা ও ব্যাখা প্রদান করেছেন।
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের যৌন পাচার মামলা সংক্রান্ত লক্ষ লক্ষ গোপন নথি প্রকাশের পর মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ তদন্তের পর মার্কিন বিচার বিভাগ এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশবাসীকে এই পুরোনো বিতর্ক পেছনে ফেলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিচার বিভাগের তদন্ত শেষ হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের বিশেষ তদন্ত কমিটি এবং ভুক্তভোগীদের কঠোর অবস্থানের কারণে বিষয়টি এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ গত রোববার স্পষ্ট করেছেন যে, কংগ্রেসের নির্দেশনায় পরিচালিত দীর্ঘ পর্যালোচনার পর কাউকে নতুন করে অভিযুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ মেলেনি। যদিও তদন্তকারীদের হাতে বিপুল পরিমাণ ইমেল, ছবি ও গোপন নথিপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো নতুন কোনো আইনি মামলা দায়েরের জন্য যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু বিচার বিভাগের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারছে না মার্কিন প্রতিনিধি সভা। বিশেষ করে রিপাবলিকান আইন প্রণেতারা এই ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করেছেন। এমনকি সশরীরে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, প্রকাশিত নথিপত্র তাঁর সপক্ষে কথা বলছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তিকর তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি মনে করেন, এখন সময় এসেছে এসব অভিযোগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই দাবি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কারণ প্রকাশিত নথিতে তাঁর নাম ছয় হাজারেরও বেশিবার পাওয়া গেছে। যদিও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে নব্বইয়ের দশকের পর এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল, তবে ২০১১ সালের একটি নতুন ইমেল তথ্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই ইমেলে এপস্টেইন লিখেছিলেন যে ট্রাম্পের বিষয়ে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি, যা নতুন করে রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির এই উত্তাপ কেবল রাজনীতিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঘাত হেনেছে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিত্বদের ওপরও। নথিতে নাম আসার কারণে বিল গেটস এবং ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদেরও এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর এবং ল্যারি সামারসের মতো ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে সামাজিক ও পেশাগতভাবে বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সব মিলিয়ে, বিচার বিভাগ তদন্ত শেষ করার ঘোষণা দিলেও ক্লিনটন দম্পতির সম্ভাব্য সাক্ষ্যদান এবং ট্রাম্পের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নতুন বিতর্ক মার্কিন রাজনীতিকে আরও দীর্ঘ সময় উত্তপ্ত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের দুই শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক ‘চমৎকার’ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় দুই নেতা বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, তাইওয়ান সংকট, ইরান পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ নানা বৈশ্বিক ও দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে বিস্তারিত কথা বলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ভিডিও বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্পের সঙ্গে এই ফোনালাপটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে এটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফোনালাপের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সবকিছুই খুব ফলপ্রসূ হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। ট্রাম্প আরও জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ উভয় দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিল মাসেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন সফরে যেতে পারেন। প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের লড়াই এবং ভূ-রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ট্রাম্প বারবারই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কথা সামনে এনেছেন, যা ভবিষ্যতে বড় কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আলোচনায় ইরানের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন দুই নেতা। ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করে জানান যে, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য ছাড় না দিলে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই ফোনালাপে স্পষ্ট করেছেন যে, তাইওয়ান ইস্যু চীনের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বেইজিং কোনো ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে চীনের সয়াবিন আমদানির প্রতিশ্রুতি। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানির পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি টনে উন্নীত করতে রাজি হয়েছে। এমনকি পরবর্তী মৌসুমে তারা ২ কোটি ৫০ লাখ টন সয়াবিন কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা মার্কিন কৃষকদের জন্য এক বিশাল সুখবর। যদিও চীনের সরকারি বিবৃতিতে এই ক্রয় সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি, তবে দুই নেওয়াই নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে মতপার্থক্য কমিয়ে আনার বিষয়ে একমত হয়েছেন। মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের এই শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় প্রাণ হারানো ৫৪ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ এবং দেহাবশেষ সম্বলিত ৬৬টি বাক্স গাজা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় বুধবার এই মরদেহগুলো অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এসে পৌঁছায়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, রেড ক্রসের বিশেষ যানবাহনে করে এই মরদেহ ও দেহাবশেষগুলো গাজার আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বজনদের মৃতদেহ ফিরে পাওয়ার এই ঘটনা গাজার সাধারণ মানুষের মাঝে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আল-শিফা হাসপাতালে মরদেহগুলো পৌঁছানোর পরপরই বিশেষায়িত চিকিৎসা দলগুলো অনুমোদিত মেডিকেল প্রটোকল অনুযায়ী ফরেনসিক পরীক্ষা ও নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফরেনসিক টিমের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে নিহতদের পরিবারগুলোকে তাদের স্বজনদের মরদেহ শনাক্ত করার সুযোগ দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিশেষায়িত কমিটির সমন্বয়ে মরদেহগুলোর পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের কাজও চলমান রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, এই মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মরদেহ হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত জানুয়ারি মাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই চুক্তির আওতায় গাজা থেকে ইসরাইলের অতিরিক্ত সেনা প্রত্যাহার এবং বিধ্বস্ত উপত্যকা পুনর্গঠনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গাজার অবকাঠামো ও জনজীবন পুনরায় সচল করতে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল তহবিলের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইসরাইল মাঝেমধ্যেই যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী লঙ্ঘন করে আক্রমণ অব্যাহত রাখছে, যা মানবিক সহায়তা ও শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মানবিক এই কার্যক্রমের সমান্তরালে গাজায় রক্তক্ষয়ী সহিংসতার খবরও পাওয়া গেছে। চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বুধবার ভোরে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর নতুন হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই আক্রমণগুলো মূলত বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু, বসতবাড়ি এবং বেসামরিক জনসমাবেশ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় ভয়াবহ গোলাবর্ষণে একজন প্যারামেডিকসহ দুজন নিহত এবং আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনার মাঝেও এমন প্রাণঘাতী হামলা গাজার সাধারণ মানুষের মনে গভীর অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। মূলত লাশের স্তূপের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন স্বজন ফেরার করুণ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে আকাশ থেকে ঝরে পড়া গোলা ও বোমা নতুন করে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার চলমান দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বুধবার ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল 'ফ্রান্স ২'-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেন। জেলেনস্কি জানান, নিহতদের এই তালিকায় পেশাদার সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বা কনস্ক্রিপ্ট করা সাধারণ নাগরিকরাও রয়েছেন। তবে এটি কেবল নিশ্চিত হওয়া লাশের সংখ্যা, কারণ এখনো বিপুল সংখ্যক সেনার কোনো হদিস মেলেনি এবং তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত রাখা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের দেওয়া এই তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে আরও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক-ট্যাংক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকে ২০২৬ সালের বসন্তকাল নাগাদ রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষ মিলিয়ে মোট সামরিক হতাহত, আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে। সিএসআইএস-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা। অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে মোট সামরিক হতাহতের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখের মধ্যে হতে পারে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
কেবল সামরিক বাহিনীই নয়, এই যুদ্ধ ইউক্রেনের বেসামরিক জনসাধারণের ওপরও চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৫ সালটি ছিল ইউক্রেনীয় সাধারণ নাগরিকদের জন্য ২০২২ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বছর। জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই অন্তত ২ হাজার ৫০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। তবে বৈশ্বিক এই সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে, দুর্গম এলাকা ও যুদ্ধের ময়দান থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হওয়ায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এই দাপ্তরিক হিসাবের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই সংঘাত কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এক চরম মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জেলেনস্কির এই স্বীকারোক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধের ময়দানে দুই দেশেরই এক বিশাল কর্মক্ষম প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রতি মাসে হাজার হাজার সেনার মৃত্যু এবং বেসামরিক জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি এই অঞ্চলটিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অপূরণীয় মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ে মৃত্যুর এই মিছিল থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সমরশক্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মাটির নিচে থাকা নিজেদের আরও একটি বিশাল মিসাইল ঘাঁটি উন্মোচন করেছে ইরান। বুধবার দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) এই শক্তিশালী ঘাঁটিটির তথ্য জনসমক্ষে আনে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুল রহমান মৌসাভি এবং বিপ্লবী গার্ডের এরোস্পেস বিভাগের উপ-প্রধান সায়েদ মাজেদ মৌসাভির উপস্থিতিতে এই উদ্বোধনী কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ এই দুই কর্মকর্তা সরেজমিনে ঘাঁটিটি পরিদর্শন করেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে মিসাইলগুলোর সক্ষমতা ও সামগ্রিক যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। একইসঙ্গে অন্যান্য পদস্থ কমান্ডারদেরও বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়।
ঘাঁটি উন্মোচনকালে এক বক্তব্যে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুল রহমান মৌসাভি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান এখন যেকোনো ধরণের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গত বছরের জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের তীব্র যুদ্ধের পর ইরান তাদের দীর্ঘদিনের রণকৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ইরান এখন আর কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা একটি সম্পূর্ণ ‘আক্রমণাত্মক’ অবস্থান গ্রহণ করেছে। এর ফলে শত্রুপক্ষের যে কোনো সামরিক কৌশলকে চূর্ণ করতে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুততম সময়ে এবং বৃহৎ পরিসরে পাল্টা অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। বিশেষ করে ‘অসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজসহ ব্যাপক সেনা সমাবেশ এবং সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও দুই দেশ শীঘ্রই একটি কূটনৈতিক আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে আলোচনার টেবিল থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না এলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক কড়া সতর্কবার্তায় বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে ইরানে হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে এর প্রভাবে পুরো অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। মূলত ওয়াশিংটনকে একটি কঠিন বার্তা দিতেই ইরান তাদের এই ভূগর্ভস্থ মিসাইল সক্ষমতা প্রদর্শন করল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত যুদ্ধের মেঘ আর পাল্টাপাল্টি চরম হুমকির মধ্যেই কূটনৈতিক পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আগামীকাল শুক্রবার ওমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে চিরবৈরী এই দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা। যদিও এই বৈঠকটি প্রথমে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা ছিল, তবে তেহরানের বিশেষ প্রস্তাব এবং কাতারসহ আরব নেতাদের জোরালো অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রস্থল পরিবর্তন করে ওমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন প্রথমে দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনার ফরম্যাটে কিছুটা অসম্মতি জানালেও শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়ানোর স্বার্থে তারা এই আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকের দিনক্ষণ ও স্থান চূড়ান্ত হলেও দুই দেশের আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডা নিয়ে এখনও গভীর জটিলতা বিদ্যমান রয়েছে। তেহরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কেবল তাদের পরমাণু কার্যক্রম এবং দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েই কথা বলতে আগ্রহী। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক কৌশলগত উপস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনায় তারা অংশ নেবে না। তবে মার্কিন প্রশাসনের সুর এ ক্ষেত্রে একেবারেই ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যেকোনো অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ইরানকে অবশ্যই তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সহায়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আলোচনার টেবিলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাতার, তুরস্ক ও মিশর একটি ত্রিদেশীয় খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছে, যা দুই পক্ষকে শান্ত করার একটি ফর্মুলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ইরানকে আগামী তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে এবং তাদের বর্তমান মজুতকৃত ইউরেনিয়াম কোনো নিরাপদ তৃতীয় দেশে সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণাত্মক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিশেষ সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা বলা হয়েছে। বিনিময়ে এই দেশগুলো একটি ‘অনাক্রমণ চুক্তি’র প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালাবে না বলে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি দেবে। যদিও তেহরান বা ওয়াশিংটন কেউই এখন পর্যন্ত এই মধ্যস্থতা প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে সায় দেয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি এবং ইরানের পাল্টা হুঙ্কারের মাঝে এই বৈঠকটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আশার আলো হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শুক্রবারের এই আলোচনার ফলাফলই মূলত নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য কি এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে নাকি দীর্ঘদিনের এই তিক্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। বর্তমানে ওমানের এই বৈঠককে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্বের নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির দিকে। মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে এই আলোচনার সফলতা এখন সময়ের দাবি।
ইরানে নারীরা এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মোটরসাইকেল চালানোর জন্য লাইসেন্স নিতে পারবেন। দেশটির সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে বুধবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, যার মাধ্যমে দুই চাকার যান চালানো নিয়ে দেশটিতে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের আইনি অস্পষ্টতার অবসান ঘটেছে। এর আগে আইনিভাবে নারীদের মোটরসাইকেল কিংবা স্কুটার চালানো স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না থাকলেও কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল, যার ফলে দুর্ঘটনার শিকার হলেও অনেক সময় নারীদেরই দায়ী করা হতো।
ইরানের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ মঙ্গলবার নারীদের লাইসেন্স প্রদান সংক্রান্ত এক প্রস্তাবে সই করেন, যা মূলত সড়ক আইন স্পষ্ট করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বার্তা সংস্থা ইলনা। গত জানুয়ারির শেষের দিকে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এই প্রস্তাব অনুযায়ী ট্রাফিক পুলিশকে নারী আবেদনকারীদের জন্য ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা গ্রহণ করে নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশটিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝেই কর্তৃপক্ষ নারীদের অধিকার সংক্রান্ত এই বড় সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালানো এবং এর ফলে ৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে ইরানি নারীরা অধিকতর স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বৃদ্ধিতেও।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানে নারীরা বিভিন্ন সামাজিক বিধিনিষেধ ও কঠোর পোশাকবিধির মুখে পড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক নারী তা অমান্য করছেন। জনসমক্ষে নারীদের স্কার্ফ ও ঢিলেঢালা পোশাক পরার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মোটরসাইকেলে নারীদের চলাচল এখন আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় সৃষ্ট দেশব্যাপী ক্ষোভ ও বিক্ষোভের পর নারীরা তাদের অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে আরও বেশি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
সূত্র: এএফপি।