পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর একটি সাম্প্রতিক পোস্টের কড়া জবাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে আলোচনা ও বার্তা বিনিময় চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা বা চুক্তি অর্জিত হয়নি।
ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকতে হবে—ট্রাম্পের এমন একপেশে ও বাধ্যতামূলক বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বাঘাই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে লক্ষ্য করে কথা বলার সময় কোনো পশ্চিমা পক্ষই ‘অবশ্যই’ বা ‘বাধ্যতামূলক’ কোনো শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। ইরান যা কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, তা সম্পূর্ণভাবে দেশের জনগণের স্বার্থ এবং অধিকারের ওপর ভিত্তি করেই নিয়ে থাকে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, সে বিষয়েও তেহরানের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এই মুখপাত্র।
তিনি বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার করে, তবে তা হবে শুরু থেকেই তাদের চালিয়ে আসা একটি অবৈধ কর্মকাণ্ডের অবসান মাত্র। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে এখনই চূড়ান্ত বলে ধরে নিচ্ছে না তেহরান। বাঘাইয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে তাদের কথার প্রতিফলন ঘটায় কি না, নাকি এটি কেবলই একটি প্রচারণামূলক দাবি—তা দেখার পরই ইরান সিদ্ধান্ত নেবে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়ে ইরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মুখপাত্র বাঘাই আরও যোগ করেন, যেহেতু এই জলপথটি মূলত ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত, তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় এই দুই দেশকেই একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার তীব্র উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি উভয় দিক থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার কথাও জানান।
শুক্রবার (২৯ মে) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির রূপরেখা হিসেবে বেশ কয়েকটি কঠোর শর্তের কথা প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
তার শর্ত অনুযায়ী, শান্তিচুক্তি কার্যকর করতে হলে ইরানকে কখনই পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার স্থায়ী অঙ্গীকার করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল বা অতিরিক্ত মাশুল ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তরীর অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া নৌপথের সামুদ্রিক মাইন দ্রুত অপসারণ এবং ১১ মাস আগে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ভূগর্ভস্থ খনি থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতায় তা ধ্বংস করার দাবিও করেন ট্রাম্প।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দীর্ঘ শর্তের তালিকা প্রকাশের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এক প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘সত্য ও মিথ্যার এক অদ্ভুত মিশ্রণ’ বলে অভিহিত করেছে।
ইরানি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক মহলে নিজের একটি ‘ভুয়া বিজয়’ জাহির করার জন্য ট্রাম্প খসড়া চুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারা সম্পূর্ণ বিকৃত ও ভিত্তিহীনভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছেন। ইরানের নিজস্ব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করা এবং হরমুজ প্রণালিতে টোল ছাড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের মতো কোনো বিষয় মূল খসড়া চুক্তির কোথাও উল্লেখ নেই।
তেহরানের মূল অভিযোগ হলো, ট্রাম্প অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের কাছে অন্যায়ভাবে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ দ্রুত মুক্ত করা এবং লেবাননে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো তার বক্তব্যে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংঘাতের কালো মেঘ কেটে যাওয়ার আভাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির জোরালো আশাবাদ তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বাজার শান্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বড় বড় শেয়ারবাজারগুলোতেও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক নতুন আশার আলো ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
শুক্রবার (২৯ মে) বৈশ্বিক তেলের দামের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গিয়ে প্রতি ব্যারেল ৯১ দশমিক ৫৪ ডলারে নেমে এসেছে। চলতি মে মাসের শুরুর দিক থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় দরপতন হিসেবে বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজারের বেঞ্চমার্ক ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৬৪ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে, অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও এই তেলের দাম সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৭০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ পদক্ষেপের পরই মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে এই ইতিবাচক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির খসড়া তৈরি করে তা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর কাছে পাঠিয়েছেন। এরপর থেকেই বাজার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান নিজেদের মধ্যে চলমান সংঘাত সাময়িকভাবে থামাতে আগামী ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে একটি প্রাথমিক পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই খসড়া সমঝোতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো তার চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেননি। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই পরিস্থিতির অগ্রগতি সম্পর্কে জানিয়েছেন, চুক্তিটি এখনো সম্পূর্ণ চূড়ান্ত রূপ না পেলেও দুই দেশই সমঝোতার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে।
বিগত প্রায় ৯০ দিন ধরে চলা এই বিধ্বংসী ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ও চরম অস্থিরতা তৈরি করেছিল। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট ও চাপ তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পারদকে উসকে দিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডয়চে ব্যাংকের প্রধান বিশ্লেষক হেনরি অ্যালেন অভিমত ব্যক্ত করেছেন, বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে এখন সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটার ব্যাপারে জোরালো বিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। তেলের দামের এই ধারাবাহিক পতনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা স্থবিরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির যে বড় ঝুঁকি ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জ্বালানি তেলের বাজার শান্ত হওয়ার এই ইতিবাচক প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে স্মরণকালের বড় ধরনের উত্থান লক্ষ করা গেছে। শুক্রবার (২৯ মে) জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘নিক্কেই’ একলাফে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক ‘কসপি’ রেকর্ড ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনা এক নতুন মোড় নিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চল বুশেহরে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ড্রোনটি মাটিতে নামিয়ে আনা হয়। এই ঘটনার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা ও সংঘাতের আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
বুশেহরের জাম কাউন্টির গভর্নর মাসুদ তাঙ্গেসতানি আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজকে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাতে আকাশপথে আসা শত্রুপক্ষের একটি যান সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ড্রোনটি ভূপাতিত করার পর স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বুশেহর অঞ্চলটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এই এলাকায় এর আগেও একাধিকবার বিদেশি ড্রোন বা আকাশযান ধ্বংস করার ঘটনা ঘটেছে। এবারের ড্রোনটি ঠিক কী উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় প্রবেশ করেছিল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ইরানি বাহিনীর এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তারা তাদের আকাশসীমা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ড্রোন ভূপাতিত করার আগে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা থেকে বেশ কিছু মিসাইল নিক্ষেপ করার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তাসনিম নিউজ সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করেই সেই মিসাইলগুলো ছোড়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোন ধ্বংস এবং মিসাইল উৎক্ষেপণ—এই দুটি ঘটনাই বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনারই অংশ। ইরানের এই জোরালো সামরিক অবস্থান মার্কিন সামরিক শক্তির প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ড্রোন ভূপাতিত করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ড্রোন ধ্বংসের এই ঘটনা ওই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (২৯ মে) হঠাৎ করেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করে আকস্মিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। দেশটির একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপের ফলে পুরো অঞ্চলে নতুন করে আতঙ্ক ও তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানি বাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা থেকে এই মিসাইলগুলো উৎক্ষেপণ করেছে। তবে নিক্ষেপ করা এই মিসাইলগুলোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু কী ছিল কিংবা এর মাধ্যমে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও লক্ষ্যবস্তুর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এলাকা থেকে অবিরাম গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই গোলাগুলি মূলত ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজকে সতর্কতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানি বাহিনী এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আকস্মিক এই মিসাইল নিক্ষেপ ও গোলাগুলির ঘটনার পর ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ বা ক্ষয়ক্ষতির আনুষ্ঠানিক সংবাদ পাওয়া যায়নি। এই সামরিক তৎপরতা ওই অঞ্চলের চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বৃদ্ধি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার লক্ষ্যে ৬০ দিন মেয়াদী একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই চুক্তিতে তাঁর চূড়ান্ত সম্মতি প্রদান করেননি বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দুজন মার্কিন কর্মকর্তা ও মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আঞ্চলিক সূত্র। ইরানও এখন পর্যন্ত এই সমঝোতা চুক্তিটি গ্রহণ করার বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করেনি। এই সমঝোতা স্মারকটি যদি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। অবশ্য ট্রাম্পের পারমাণবিক সংক্রান্ত শর্তগুলোর স্থায়ী সমাধান করে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ‘এটি মূলত সবাইকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার একটি চুক্তি। মূল আলোচনার টেবিলেই আমরা বাকি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সমাধান করব।’
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গত মঙ্গলবার নাগাদ এই চুক্তির শর্তাবলি প্রায় চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, তবে উভয় পক্ষেরই শীর্ষ নেতৃত্বের গ্রিন সিগন্যালের প্রয়োজন ছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরানি প্রতিনিধিরা পরবর্তীতে ফিরে এসে জানান যে এতে তাঁদের সমর্থন রয়েছে এবং তাঁরা স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। যদিও ইরান এই দাবির যথার্থতা নিশ্চিত করেনি। এদিকে মার্কিন আলোচকেরা প্রস্তাবিত চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাতে সই করেননি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য তার আরো দু-এক দিন সময় প্রয়োজন। ইতিপূর্বেও যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা চুক্তির অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে মনে করলেও বারবার আলোচনা থমকে গিয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, এই ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হবে সম্পূর্ণ ‘অবাধ ও উন্মুক্ত’, যার অর্থ হলো কোনো ধরনের শুল্ক (টোল) আদায় করা যাবে না এবং কোনো জাহাজকে হয়রানি করা চলবে না। একই সঙ্গে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই প্রণালি থেকে সমস্ত সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে, তবে তা হবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিকতার সমান্তরালে। পাশাপাশি ইরান যাতে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে স্থানান্তর বা ধ্বংস করা যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তা নিয়ে। এর বিনিময়ে আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হবে। এছাড়া ইরান যাতে আন্তর্জাতিক পণ্য ও মানবিক সহায়তা পেতে পারে, সে জন্য একটি বিশেষ কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও উল্লেখ থাকবে।
এদিকে চুক্তিটি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, ঠিক তখনই গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুটি ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরানের সামনে এখন তাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা বোঝেন এখন তাদের ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ৬০ দিনের আলোচনার সময়ই আমরা বুঝতে পারব আসলে কী ঘটে। ইরান আলোচনায় যত বেশি ছাড় দিতে রাজি হবে, তারা তত বেশি সুবিধা পাবে। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, আলোচনার সময় যদি এটি প্রতীয়মান হয় যে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না, তবে ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক—সব পথই খোলা থাকবে। এই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি কেবল একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তির ওপরই নির্ভর করছে।
টানা চাপের মুখে পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বিগত প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৮০ দশমিক ৬২ ডলারে। লেনদেনের একপর্যায়ে এটি গত ২৬ মার্চের পর সবচেয়ে কম মূল্যের রেকর্ড স্পর্শ করে। একই দিনে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দামও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যেখানে প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৩৭৭ দশমিক ১০ ডলারে নেমে আসে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবেই স্বর্ণের বাজারে এই বড় ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ডলারের মান এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে অন্যান্য মুদ্রার ব্যবহারকারী দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমানে সোনা কেনা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যা এই পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
স্টোনএক্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসন এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানান, শান্তিচুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আশাবাদী বার্তা এলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এখনও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে স্বর্ণের বাজারে বিক্রির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে ইরানের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলা চালানোয় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্স, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসে হান্টাভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য পরীক্ষামূলক একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রথম ডোজ পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) এক বিবৃতিতে ইইউ এই তথ্য নিশ্চিত করে। হান্টাভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি এখন পর্যন্ত না থাকায় ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি 'ফাভিপিরাভির' নামের একটি অ্যান্টিভাইরালকে সম্ভাব্য কার্যকর ওষুধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওষুধটি মূলত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কিংবা জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আক্রান্তদের ওপর প্রয়োগ করা হতে পারে।
জাপানের ফুজিফিল্ম ফার্মাসিউটিক্যালস নামক একটি প্রতিষ্ঠান ফ্রান্স, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের বিশেষ অনুরোধে ফাভিপিরাভিরের ১ হাজার ৪০০টি ট্যাবলেট অনুদান হিসেবে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে যদি নতুন করে সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পায়, তবে অতিরিক্ত ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা ইতিমধ্যে একটি জরুরি ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
একটি নির্দিষ্ট ক্রুজ শিপ বা প্রমোদতরিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এই হান্টাভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১৩ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত এই রোগীদের নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশেষ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইঁদুরজাতীয় প্রাণী থেকে ছড়ানো এই ভাইরাসে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে। ভাইরাসের তীব্রতা এর নির্দিষ্ট স্ট্রেইনের ওপর নির্ভর করে এবং এটি কখনো কখনো প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তবে আশার কথা হলো, এই ভাইরাসটি সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে সহজে ছড়ায় না। চলমান এই সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে মার্কিন বিমান হামলার জবাবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আজ বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে আইআরজিসি এই শক্তিশালী হামলা পরিচালনা করে। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানি বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনী আকাশপথ ব্যবহার করে বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের উপকণ্ঠে যে আগ্রাসন চালিয়েছিল, তার উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত ঘাঁটিটিকে লক্ষ্য করেই তারা এই নিখুঁত নিশানা করেছে। তবে আক্রান্ত মার্কিন ঘাঁটিটি ঠিক কোন দেশে বা কোথায় অবস্থিত, সে বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
মূলত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টাকালে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে প্রথম দফায় তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়। একটি সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইআরজিসি নেভি একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর সরাসরি গুলি চালায়, যা রাডার সিস্টেম বা এআইএস বন্ধ করে বেআইনিভাবে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং বন্দর আব্বাসের একটি নির্দিষ্ট পরিত্যক্ত এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মার্কিন হামলায় কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের সম্পদের ক্ষতি হয়নি, তবে বিকট বিস্ফোরণে স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, বুধবার রাতে চালানো তাদের এই বিমান হামলা ছিল সম্পূর্ণ ‘আত্মরক্ষামূলক’। মার্কিন দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবহর ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করায় তারা ইরানের ৪টি ড্রোন মাঝ আকাশে ভূপাতিত করেছে। এছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে আঘাত হেনে তারা পঞ্চম আরেকটি আক্রমণাত্মক ড্রোন ধ্বংস করেছে, যেটি উৎক্ষেপণের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই সামরিক পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত পরিমাপিত এবং এটি মূলত দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে সমুদ্রসীমায় আরও একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন ৪টি রহস্যময় নৌযান কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই পারস্য উপসাগরে প্রবেশের চেষ্টা করে। ইরানি নৌবাহিনী প্রথমে তাদের চলে যাওয়ার জন্য সতর্কবার্তা দেয়, কিন্তু জাহাজগুলো সেই নির্দেশ উপেক্ষা করায় আইআরজিসি নেভি সরাসরি সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ করে। শেষ পর্যন্ত নৌযানগুলো দিক পরিবর্তন করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই পাল্টাপাল্টি সংঘাতের চিত্রটি যখন দোহায় চলমান শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলছে, তখন ওয়াশিংটনে এক ক্যাবিনেট বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও লাভজনক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত না হয়ে তিনি একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না এবং হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলপথ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। ট্রাম্পের মতে, এই শর্তগুলো কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয় এবং এটিই হবে যেকোনো ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তির প্রধান ভিত্তি। দোহায় আলোচনার টেবিলে সমঝোতার চেষ্টা চললেও মাঠপর্যায়ের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক আক্রমণ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে শুরু করেছে। গত শনিবার কিউবা সরকার ‘পারিবারিক নির্দেশিকা’ নামে একটি বিশেষ আদেশ জারি করেছে, যার লক্ষ্য হলো যে কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। মূলত ‘সব মানুষের যুদ্ধ’ (War of all the people) নামক একটি প্রাচীন কিন্তু কার্যকর প্রতিরক্ষা মতবাদের ওপর ভিত্তি করে এই নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে।
কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ওপর কঠোর বাণিজ্যিক ও জ্বালানি অবরোধ আরোপ করেছেন। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কিউবার গভীর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। এই অজুহাতে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার চারপাশের জলসীমায় সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে, যা কিউবার অর্থনীতিকে পঙ্গু করার পাশাপাশি দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
কিউবা সরকার যে ‘সব মানুষের যুদ্ধ’ মতবাদ অনুসরণ করছে, তা মূলত গত শতাব্দীর শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গৃহীত হয়েছিল। এই প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল বিষয় হলো গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া গঠন এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করা। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যালেন ইয়াফে জানিয়েছেন, কিউবার সাধারণ নাগরিকরা ঐতিহাসিকভাবেই সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত এবং তারা জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে কোনো বিদেশি আগ্রাসন হলে কেবল সেনাবাহিনী নয়, পুরো জাতি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ কিউবার ক্ষেত্রে সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনী এক সংক্ষিপ্ত অভিযানে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করলেও কিউবার পরিস্থিতি ভিন্ন। লাতিন আমেরিকা বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার সেনাবাহিনী অধিক প্রশিক্ষিত এবং উন্নত সমরাস্ত্রে সজ্জিত। ফলে কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
পরিশেষে, কিউবার ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন। তারা মনে করেন, কিউবায় কোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের ঢল নামতে পারে, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে কিউবার প্রতিটি পরিবার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দেশটির সরকার জনগণের মনোবল বাড়াতে নানা সুরক্ষা প্রণালী তালিকাভুক্ত করছে। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক স্থাপনায় আবারও শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, ওই কেন্দ্রটি থেকে একটি ড্রোন উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, যা প্রতিহত করতেই এই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় দুই দেশের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেন্টকমের বিস্তারিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বন্দর আব্বাসের ওই কেন্দ্র থেকে পঞ্চম ড্রোনটি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির সময় হামলাটি চালানো হয়। এর আগে হরমুজ প্রণালির আশেপাশে টহলরত মার্কিন বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে ওঠা আরও চারটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে তারা। অন্যদিকে, ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বন্দর আব্বাসের পূর্বাঞ্চলে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা নিশ্চিত করেছে, যা ওই এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তবে এই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি হয়েছে, সে বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, এটি গত তিন দিনের মধ্যে ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফার বড় ধরনের হামলা। এর আগে গত মঙ্গলবারও দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা সংঘাত নিরসনে যখন দুই দেশ একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই ধরনের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের এই সংঘাত আলোচনার টেবিলে উভয় পক্ষের অবস্থানকে আরও অনমনীয় করে তুলতে পারে।
এদিকে ওয়াশিংটনে বুধবার এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ইরান বর্তমানে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রায় নিঃশেষিত অবস্থায় রয়েছে এবং তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই আলোচনায় বসেছে। ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন তার বর্তমান যুদ্ধকৌশল বা সামরিক সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। অর্থাৎ রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি ইরানের ওপর থেকে সামরিক চাপ কমাতে রাজি নন।
বর্তমানে দোহায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘আত্মরক্ষার’ অজুহাতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও তাদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাতের দ্রুত অবসান প্রত্যাশা করলেও ট্রাম্পের ‘বিগ ডিল’ বা বড় চুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের লড়াই পরিস্থিতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এই ধারাবাহিক হামলার প্রভাব শান্তি আলোচনার ওপর কতটা পড়ে, সেদিকেই এখন নজর রাখছে বিশ্ববাসী।
ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর বা সম্পূর্ণ ত্যাগ করার বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (২৭ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম পিবিএস নিউজ-কে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান সমঝোতার প্রাথমিক খসড়া বা রূপরেখায় ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত রয়েছে কি না? জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেন, না, একেবারেই নয়। কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না, কখনোই নয়। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, তারা (ইরান) তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করবে ঠিকই, তবে এর বদলে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড় তারা পাবে না। এটি একেবারেই অসম্ভব।
ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের পরোক্ষ মধ্যস্থতায় যখন একটি খসড়া চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অনমনীয় ও কঠোর মন্তব্য সামনে এলো।
বিশ্লেষকদের মতে, পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের পাশাপাশি ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার যে নীতি ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই অনুসরণ করে আসছে, এই মন্তব্য তারই প্রতিফলন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের কারণে ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রাথমিক ও অনানুষ্ঠানিক খসড়া তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। এই খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইরানের আশপাশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি (IRIB)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন পদক্ষেপের জবাবে ইরানও আগামী এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতা থেকে সামরিক জাহাজগুলোকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। ওমানের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতার ভিত্তিতে এই প্রণালির নৌ-যান চলাচল ও রুট নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান।
উল্লেখ্য, আইআরআইবি সংবাদমাধ্যমটি ইরানি প্রশাসনের কট্টরপন্থী মনোভাবের প্রতিনিধি হিসেবেই পরিচিত।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, চুক্তির এই রূপরেখাটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি এবং কোনো ধরনের ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান যাচাইকরণ’ ছাড়া তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। বর্তমানে খসড়া লেখার শব্দবিন্যাস সংশোধন ও পরিমার্জনের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও নথির আদান-প্রদান চলছে। খসড়া অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যদি একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে এই সমঝোতা স্মারকটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদিত হবে।
ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসা এই সমঝোতা স্মারকটিকে মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি পথনকশা বা রোডম্যাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যমের এমন চাঞ্চল্যকর দাবির বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
সূত্র: সিএনএন