পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার কড়া জবাব দিতে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বুধবার তেহরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত শক্তি ব্যবহার করে আশিটিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে এই বিধ্বংসী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই খবরটি নিশ্চিত করেছে।
আইআরজিসি এক জরুরি সামরিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, “এই বিধ্বংসী হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর বা ফিফথ ফ্লিটের প্রধান ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটিকে সরাসরি নিশানা করা হয়েছে।” তেহরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোর মোট ৮৫টি সুনির্দিষ্ট স্পটে এই নিখুঁত আক্রমণ চালানো হয়েছে। ইরানি সামরিক নীতিনির্ধারকেরা এই যৌথ অভিযানটিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদ চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মূলত বুধবার ভোরের দিকে মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের হরমুজগান ও মাহশাহর এলাকার বেশ কয়েকটি উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি এবং বেসামরিক স্টেশনের ওপর বিমান হামলা চালালে তার প্রেক্ষাপটেই তেহরান এই পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর আগে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছিল যে, তাদের নিখুঁত যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে ইরানের আশিটির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে বিমান হামলা সম্পন্ন করা হয়েছে। মার্কিন সেন্টকমের সেই হামলার পরপরই ইরান তাদের পাল্টা জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে আমেরিকার ৮৫টি সামরিক অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করল।
এদিকে আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে আমেরিকার এই আকস্মিক বিমান হামলাকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার চলমান রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে অভিযোগ করেছে। ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষের মতে, ওয়াশিংটন মূলত এই ধরনের উগ্র সামরিক হামলা চালিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে ইরানের ওই ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ বা শোকমিছিলের গুরুত্বকে আড়াল করার একটি ব্যর্থ অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি চলাকালীন পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে তেহরানের তেল বিক্রির বিশেষ সুবিধাও বাতিল করেছে ওয়াশিংটন, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার মার্কিন প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তাদের অভিযানে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অন্তত ৬০টি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়াও ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং তারা মনে করে যে, ইরানকে ‘উচ্চ মূল্য’ দিতে বাধ্য করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে মার্কিন এই আক্রমণকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স। তারা পাল্টা প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, “হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।” দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ ছাড়াও কেশম, সিরিক ও বন্দর আব্বাস এলাকায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সিরিক এলাকায় একটি বাণিজ্যিক জেটিতে প্রক্ষেপণের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়া ছাড়াও মাছ ধরার নৌকা ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয় এই খার্গ দ্বীপ থেকে।
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও ইরানকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২২ জুন দেওয়া বিশেষ ছাড় বা সাধারণ লাইসেন্স বাতিল করায় তেহরান এখন আর আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোকেমিক্যাল বা জ্বালানি পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। ওয়াশিংটনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরণের বাণিজ্যিক লেনদেন গুটিয়ে ফেলতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং এর পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী থাকার কথা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা। কাতার অভিযোগ করেছে যে, তাদের একটি গ্যাসুবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যা তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, “হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো কাজ শেষ করে দেব।” বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মার্কিন হুমকি অব্যাহত থাকলে স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। দুই দেশের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে ওই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে পুনরায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তারা এই আক্রমণ চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সেন্টকম উল্লেখ করে যে, তাদের বাহিনী ধারাবাহিক ও শক্তিশালী হামলা শুরু করেছে।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “একটি আন্তর্জাতিক জলপথে নিরীহ বেসামরিক নাবিকবোঝাই বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানকে কঠোর মূল্য দিতে হামলা চালানো হচ্ছে।” মার্কিন বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা আরও জানায় যে, ইরানের এই আগ্রাসন ছিল “অযৌক্তিক, বিপজ্জনক এবং যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন”।
হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থল নিয়ে সেন্টকম সরাসরি কিছু না বললেও ইরানি সংবাদমাধ্যম ফারস ও আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক ও কেশম এলাকার কাছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, ওমান উপকূলের কাছে গত সোমবার তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাত লাগার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে এমন উত্তেজনা এমন এক সময়ে তৈরি হলো, যখন দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে গত ১৮ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে ইরান জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসন ওই সমঝোতার ১০ নম্বর শর্ত ভঙ্গ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, দেশটির জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় “অস্থায়ী ছাড়” বাতিল করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার চরম বরখেলাপ করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “সমঝোতা স্মারক সইয়ের ২০ দিনের কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করল। এতে প্রমাণিত হয়, মার্কিন প্রশাসনকে কখনোই বিশ্বাস করা যায় না।”
টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় এবং এর ফলে সৃষ্ট বন্যায় চীনের একাধিক অঞ্চল ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাণহানির পাশাপাশি বহু এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেশটির মধ্যাঞ্চলের হুবেই প্রদেশে। সেখানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। টানা বৃষ্টি ও ঝোড়ো আবহাওয়ার কারণে বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের গুয়ানজি প্রদেশেও দুর্যোগের প্রভাব ছিল ব্যাপক। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, সেখানে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আটজনের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। প্রবল বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান চালাতে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। প্রবল বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনজীবনের পাশাপাশি অবকাঠামো, কৃষি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের উদ্ধারে অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
পর্যটকদের ভ্রমণ প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে একটি পাইলট (পরীক্ষামূলক) ‘প্যাকেজ ভিসা’ প্রকল্প চালু করেছে সৌদি আরব। এর আওতায় যোগ্য পর্যটক বিমান টিকিট, আবাসন ও অন্যান্য ভ্রমণ সুবিধাসহ সমন্বিত প্যাকেজের অংশ হিসেবে সরাসর ট্যুরিস্ট ভিসা পাবেন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষামূলক বাজারে অনুমোদিত ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশেষ সুবিধা চালু করা হচ্ছে।
প্যাকেজ ভিসার প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে যোগ্য ভ্রমণকারীরা একটি মাত্র সমন্বিত প্যাকেজের মাধ্যমেই ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই প্যাকেজের মধ্যে যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া, লাইসেন্সপ্রাপ্ত আতিথেয়তা কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক ভিসা আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পর্যটকরা চাইলে তাদের মূল ভ্রমণ পরিকল্পনার সঙ্গে বিভিন্ন আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান, বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড ও দর্শনীয় স্থান দেখার অভিজ্ঞতাও যুক্ত করে নিতে পারবেন। এই ব্যবস্থা চালুর ফলে পর্যটকদের আলাদাভাবে ফ্লাইট, হোটেল বুকিং কিংবা ভিসার ব্যবস্থা করার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে না। শুধুমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ২৪ ঘণ্টা গ্রাহক সহায়তা দিতে সক্ষম এমন অনুমোদিত ভ্রমণ সংস্থাগুলোই এই সেবা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০-এর আওতায় পর্যটন খাতের পরিধি ও সুযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এই প্যাকেজ ভিসা চালু করা হয়েছে। দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিমা কর্তৃপক্ষের যৌথ সহযোগিতায় এই সমন্বিত উদ্যোগটি রূপ নিয়েছে।
পর্যটকদের জন্য ই-ভিসা কর্মসূচি চালু করার পর থেকে সৌদি আরব অন-অ্যারাইভাল ভিসা ও স্টপওভার ট্রানজিট ভিসাসহ বেশ কিছু নমনীয় প্রবেশ ব্যবস্থা চালু করেছে। এসব কার্যকর পদক্ষেপের ফলে দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে দেশটি রেকর্ড ২৯ মিলিয়নেরও বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছে।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের জিয়ারাত জেলার একটি বাঁধ প্রকল্পের কাছে অবস্থিত পুলিশের চেকপোস্টে জঙ্গি হামলায় ৯ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৫ জন জঙ্গি সদস্য নিহত হয় বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন। বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্ড নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করে জানান, নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকটি থানার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আছেন।
মুখপাত্র শাহিদ রিন্ড বিবৃতিতে বলেন, ‘হামলার পর যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ফিতনা আল খাওয়ারিজের ১৫ সদস্য নিহত হয়।’ এই যৌথ অভিযানে আধা-সামরিক, পুলিশ ও জঙ্গি দমন বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন বলে জানান তিনি।
পাকিস্তানে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান সংগঠনের সদস্যদের কথা উল্লেখ করার সময় সরকারি পরিভাষায় ‘ফিতনা আল খাওয়ারিজ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
সূত্ররা জানান, গভীর রাতে সশস্ত্র ব্যক্তিরা পুলিশের চেকপোস্টে হামলা চালায়। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বেশ কিছুক্ষণ লড়াই চালিয়ে যায় পুলিশের সদস্যরা। তবে এক পর্যায়ে তারা চেকপোস্টের ভেতর ঢুকে পড়তে সক্ষম হন।
জিয়ারাত-এর উপকমিশনার (ডিসি) আবদুল কুদুস আচাকজাই নিহতদের সংখ্যা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাটি মানজি বাঁধের কাছাকাছি জায়গায় ঘটেছে।
তিনি জানান, এখনো পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তা নিখোঁজ আছেন।
বেশ কয়েক বছর ধরে একের পর এক জঙ্গি হামলায় জর্জরিত হচ্ছে বেলুচিস্তান প্রদেশ। জঙ্গিরা মূলত সরকারি বাহিনীর সদস্য ও বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে থাকে।
আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তবর্তী এই প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ এলাকার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত।
পাশাপাশি, পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকেও নিয়মিত জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে। ইসলামাবাদের দাবি, ওইসব হামলার উৎপত্তি আফগানিস্তান থেকে। কাবুল এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
এ কারণে গত কয়েক মাসে আফগান ভূখণ্ডে বেশ কয়েক দফা বিমানহামলাও চালিয়েছে পাকিস্তান। তাদের দাবি, জঙ্গিদের বিরুদ্ধেই এসব হামলা পরিচালিত হচ্ছে।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ও জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অসংখ্য নিরীহ, বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য দুই দিনব্যাপী ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন এবং সেখানে তিনি দেশটির কাছে পুনরায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন বলে জানা গেছে।
সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে তিনি তার প্রথম মেয়াদে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাটি প্রত্যাহার করবেন, যা পরবর্তীতে আইনে পরিণত হয়েছিল।
যুদ্ধবিমান বিক্রির ওপর কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প ঠিক কীভাবে এড়াবেন, তা স্পষ্ট ছিল না। তবে সফরের আগে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্য এমন একটি ‘উপহার’ নিয়ে তিনি তুরস্কে পৌঁছানোর ইচ্ছা রাখেন, যা তাকে খুব খুশি করবে।’
২০১৯ সালে তুরস্ক রাশিয়ার এস-৪০০ নামের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ট্রাম্প দেশটির ওপর মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এবং এই পরিস্থিতির জন্য ওবামা প্রশাসনকে দায়ী করেন ও এরদোয়ানের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা এক অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হয়েছেন।’
২০২০ সালে কংগ্রেস এই নিষেধাজ্ঞাটিকে আইনে পরিণত করে এবং বলে যে, তুরস্কের কাছে যদি আর এস-৪০০ না থাকে, তবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো হস্তান্তর করা যেতে পারে।
এদিকে, কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকান তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান হস্তান্তরের বিষয়ে সন্দিহান, যেমনটা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। তিনি এই সপ্তাহে ফক্স নিউজে বলেছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ ‘মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করবে, যা চূড়ান্তভাবে ইসরায়েলি আকাশ শ্রেষ্ঠত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থানের দ্বারা নিশ্চিত।’
কিন্তু ট্রাম্প এরদোয়ানকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেন এবং আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি সমাধান খুঁজে বের করার জন্য বিষয়টি পর্যালোচনা করতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ৩৬তম ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি তুরস্কের আঙ্কারায় ৭ থেকে ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেও থেমে থাকেনি ইরান। তেহরানের কড়া বার্তার মাঝে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। গত সোমবার মধ্যরাতে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে এই আকস্মিক হামলা চালানো হয়। দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জাহাজে থাকা কোনো ক্রু বা কর্মকর্তা এই ঘটনায় হতাহত হননি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনাবিষয়ক সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) মঙ্গলবার ভোরে জানায় অন্য একটি ঘটনার কথা। ওমানের লিমা অঞ্চল থেকে প্রায় ৮ নটিক্যাল মাইল (১৫ কিলোমিটার) পূর্ব দিকে সমুদ্রসীমায় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা দূরপাল্লার বস্তু আঘাত হেনেছে। দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়া ওই ট্যাংকারটির বাম দিকে (পোর্ট সাইড) আঘাত লাগার পরপরই সেখানে আগুন ধরে যায়। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে কোনো হতাহত কিংবা সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা নিরসনে এবং কূটনীতির সুযোগ দিতে দুই মাসের (৬০ দিন) একটি যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার পর গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা কোনো স্থায়ী শান্তির আলো না দেখে শেষ হয়। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং খামেনির দাফন শেষ হওয়ার পরপর সমুদ্রে নতুন করে এই হামলার ঘটনা ঘটল।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে আসবে, অন্যথায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এ কাজ শেষ হবে।’
সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের হাতে পাওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষদিকে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে ওই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শত্রুদের আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে একটির পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। সেটি হলো কাতারের এলএনজি শিল্পের রাষ্ট্রীয় নৌপরিবহন সংস্থা ‘নাকিলাত’-এর মালিকানাধীন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী ট্যাংকার আল রেখায়াত। ওমান উপসাগরের প্রণালীর মুখে থাকা অবস্থায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুমের ওপরের অংশে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে।
জাহাজ থেকে পাঠানো একটি জরুরি বার্তার রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে গেছে এবং পুরো জায়গা ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ অনুমান করা যাচ্ছে না। তবে সব ক্রু সুরক্ষিত আছেন এবং তারা জাহাজের ডান দিকে আশ্রয় নিয়েছেন।
কোম শহরে পৌঁছেছে খামেনির মরদেহ
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ পবিত্র নগরী কোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সেখানে তার স্মরণে একটি বিশাল শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভি মঙ্গলবার সকালে খামেনির মরদেহ বহনকারী একটি হেলিকপ্টার রাজধানী তেহরানের দক্ষিণের শহর কোমে অবতরণের দৃশ্য সম্প্রচার করে।
এর আগে, টানা তৃতীয় দিনের মতো তেহরানের রাজপথ ছিল শোকার্ত মানুষের দখলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন খামেনি ও তার পরিবারের চার সদস্য। তাদের মরদেহ বহনকারী একটি ট্রাক তেহরানের প্রধান প্রধান সড়ক হয়ে আজাদি স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, এই শোকযাত্রায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল, যা ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঐতিহাসিক জানাজা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কালো পোশাক পরা লাখ লাখ মানুষ তাদের নেতার কফিনের ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এই কফিনগুলোর মধ্যে খামেনির মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনির একটি ছোট্ট কফিনও ছিল, শিশুটিও খামেনির সঙ্গে হামলায় নিহত হয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া হামিদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানকে টুকরো টুকরো করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের নেতা তা হতে দেননি। তার অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে আমরা এসেছি।’ মারজিয়া নামের এক নারী বলেন, ‘আমরা শহীদ নেতাকে বলতে এসেছি, আপনার রক্ত বৃথা যাবে না। আমরা আপনার প্রতি আবারও আনুগত্যের শপথ নিচ্ছি।’
তবে বাবার জানাজা ও শোকযাত্রায় এখনও দেখা মেলেনি খামেনির ছেলে তথা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির। বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি পুরোপুরি আড়ালে আছেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ ইসলামি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে এখন অত্যন্ত ভঙ্গুর এক যুদ্ধবিরতি চলছে। এই মুহূর্তে জটিল সব বিষয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। তীব্র নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নতুন সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে এভাবে জনসমক্ষে আসা সম্ভব নয়।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকযাত্রায় জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। গত সোমবার রাজধানী তেহরানে কালো জ্যাকেট পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে শোকাহত মানুষের ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে দেখা যায় তাকে।
যুদ্ধের প্রথম দিনই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই নিহত হন। সে সময় ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গণমাধ্যমে ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা আহমাদিনেজাদও ‘নিহত’ হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করা হয়েছিল।
ধারণা করা হয়েছিল, তার বাড়ির কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় তিনি মারা গেছেন। এরপর কয়েক মাস তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার ভাগ্য নিয়ে সরকারিভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্যও দেওয়া হয়নি। ফলে যুদ্ধের শুরুর দিককার বিশৃঙ্খলার মধ্যে তাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
খামেনির শোকযাত্রায় ইরানের জীবিত অন্য দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানি অনুপস্থিত ছিলেন— এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর অবশেষে জনসমক্ষে আহমাদিনেজাদের দেখা মিলল। সমালোচকদের দাবি, তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি।
শোকযাত্রায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অনেকেই অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য।
তবে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবারও জনসমক্ষে আসেননি। বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
গত রোববার খামেনির জানাজার নামাজে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন তার তিন ছেলে—মোস্তাফা, মাসউদ ও মেইসাম। বাবার নিহত হওয়ার পর এই প্রথম তারা জনসমক্ষে উপস্থিত হন। এ সময় তাদের আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত দেখা যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিওতে রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রজুড়ে মানুষের ঢল দেখা যায়। কর্তৃপক্ষের ধারণা, জানাজা ও শোকযাত্রায় প্রায় দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
এ সময় শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষজন স্লোগান দেন, ‘আমার শহীদ নেতা, আপনার পথচলা অব্যাহত থাকবে। আমার শহীদ পিতা, আপনার পথচলা অব্যাহত থাকবে।’
শোকযাত্রায় খামেনির কফিনটি ছিল ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও একই ট্রাকে রাখা হয়।
গত শনিবার শুরু হওয়া রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। এরপর খামেনির মরদেহ তার জন্মস্থান মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে। এর আগে, ইরানের কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও পৃথক শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। মঙ্গলবার ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আরাগচি বলেন, ‘হুমকি অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে না।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় লাখ লাখ ইরানি সমবেত হচ্ছেন। কোনো হুমকিতে তারা বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনী—কেউই পিছু হটবে না। আপনারা আপনাদের স্বাক্ষরকে সম্মান করুন।’ এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, অথবা ‘তাদের শেষ করে দেবে’।”
গত সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের সেতুগুলো ভেঙে ফেলতে পারি। আমরা তাদের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারি। তাদের কাছে এখন কোনো টাকা নেই। আমরা তাদের কোনো টাকা দিইনি।’
এদিকে খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে হামলা চালিয়েছে ইরান। গত সোমবার মধ্যরাতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এ হামলা চালিয়েছে। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে মঙ্গলবার এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি।
গত সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, ‘নির্দেশনা অমান্য করলে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আপনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে প্রস্তুত।’
আক্রমণের শিকার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে একটি হলো নাকিলাতের মালিকানাধীন ও পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার আল রেকায়াত। এটি কাতারের এলএনজি শিল্পের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। প্রজেক্টাইলটি জাহাজটির বাম পাশে ইঞ্জিন রুমের ওপরের অংশে আঘাত হেনেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামলার ফলে ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগেছে এবং চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে জাহাজের ডান পাশে একত্রিত হয়েছেন।
ডব্লিউএসজে জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থানকালে জাহাজটি হামলার শিকার হয়।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এরই মধ্যে উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত পথ ব্যবহার না করা জাহাজগুলোকে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে তেহরান।
মেরিন ট্র্যাফিক জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালীটিতে অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতি ও শনিবার যথাক্রমে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজ এবং পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলাসহ এসব ঘটনার বেশিরভাগের জন্যই তেহরানকে দায়ী করা হয়েছে।
গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পর থেকে নৌপথে জাহাজ চলাচল বেড়েছে। তবে বর্তমানে এ সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের দৈনিক প্রায় ১৩০টি পারাপারের তুলনায় এখনও অনেক কম। মেরিন ট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার অন্তত ৪৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। আর মঙ্গলবার ৩৪টি জাহাজ পার হয়েছে।
সৌদি আরব লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর ফলে দেশটি এবং সম্ভব হলে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম না করেই আরও বেশি তেল পরিবহন করতে পারবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহন করতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গত মেতে বলেছিলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলোতে সরবরাহ করা হয় এবং প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহার করা হয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইনের সক্ষমতা প্রতিদিন আরও ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত সম্ভাব্য বৃদ্ধির বিষয়ে সৌদি আরব তার কিছু প্রতিবেশীর সাথে প্রাথমিক আলোচনা করছে।
আরামকোর পরিকল্পিত সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন নাকি একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, এই সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে পেট্রোলিয়াম বা তেলজাত পণ্যের জন্য একটি ছোট আকারের দ্বিতীয় পাইপলাইনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কুয়েত, বাহরাইন এবং কাতার—সবারই হরমুজ প্রণালী এড়ানোর মতো বিকল্প পথের অভাব রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধ এবং বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তুরস্কের সাথে ইরাকের পাইপলাইনটি তার সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম কার্যকর রয়েছে।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ নওয়াফ আল-সাবাহ গত মাসে আটলান্টিক কাউন্সিল গ্লোবাল এনার্জি ফোরামে বলেছিলেন, ‘কুয়েতের তেলের ব্যারেলগুলো সামঞ্জস্য করার জন্য আমাদের ভাই সৌদি আরব এবং আমিরাতের সাথে তাদের বিদ্যমান পাইপলাইন ব্যবস্থা কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায় তা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি।’
দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই সম্প্রসারণ প্রতিদিন ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ব্যারেলের জন্য হতে পারে, যেখানে পরিশোধিত তেলের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এটি সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগবে, শত শত কোটি ডলার খরচ হবে এবং সৌদি অপরিশোধিত তেলের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল, যার ফলে তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়। গত মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একটি প্রাথমিক চুক্তির পর তেল প্রবাহ আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হয়েছে, তবে তা যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে কম রয়েছে।
গত মেতে ইরাকের তেল উৎপাদন প্রতিদিন ৪৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ১৫ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে আসে, কুয়েত গত মার্চ মাসে চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের অক্ষমতা বা ‘ফোর্স ম্যুর’ ঘোষণা করে এবং বাহরাইনের সিত্রা শোধনাগার বেশ কয়েকবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়।
লন্ডনভিত্তিক হার্ডক্যাসল অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা অংশীদার জায়েদ বেলবাগী বলেন, ‘সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাইপলাইন করিডোর বা পথ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা একটি বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতা প্রতিফলিত করে। এই সংঘাত আঞ্চলিক দেশগুলোর মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করার বিপদের দিকে কেন্দ্রীভূত করেছে।’
আরামকো এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, অন্যদিকে সৌদি ও বাহরাইন সরকারের যোগাযোগ দপ্তর, ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় এবং কাতার এনার্জি মন্তব্যের অনুরোধে অবিলম্বে কোনো সাড়া দেয়নি।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, কাতার—যা মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করে, তারা আরও বড় প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে পথসহ বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আবাসিক ভবনে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো চালানো এই হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইউক্রেন। মাত্র কয়েকদিন আগে কিয়েভে রাশিয়ার আরেকটি বড় হামলায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই ঘটনাকে একটি ‘নৃশংস হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রুশ বাহিনীর পুরোনো কৌশল এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। তারা ইউক্রেন এবং এর সাধারণ মানুষের ওপর সর্বোচ্চ বেদনা ও ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিতে চায়।’
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি শহরে রুশ ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
তুরস্কের আংকারায় অনুষ্ঠিতব্য এই ন্যাটো সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে জেলেনস্কির। ঠিক এমন এক মুহূর্তে তিনি রাশিয়ার শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে ন্যাটোর কাছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সফল হলেও সহজে প্রতিরোধ করা যায় না এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের পর্যাপ্ত আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র নেই।’ হামলার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বেও ব্যালিস্টিক সন্ত্রাস থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম উৎপাদন করা যাচ্ছে না, এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক।’
ন্যাটো সম্মেলন থেকে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আশা করছে কিয়েভ। এর আগে আংকারায় ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুটে বলেন, ‘মিত্র দেশ এবং ন্যাটো অংশীদারদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন ইউক্রেন তার প্রয়োজনীয় সব সামরিক সহায়তা সময়মতো পায়।’
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, সোমবার সকালে কিয়েভের পদিলস্কি জেলার একটি বহুতল আবাসিক ভবনে আঘাত হানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র। এতে ভবনটিতে বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং এর মেঝেগুলো ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, রাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাইরেন বাজার সময় তারা ১০টিরও বেশি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনেছেন এবং আকাশে আলোর ঝলকানি দেখেছেন। এই হামলায় কিয়েভ রাজধানীতে ১৮ জন এবং শহরের ঠিক বাইরে ভিশনেভে এলাকায় আরও ৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া সব মিলিয়ে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে এটি রাশিয়ার দ্বিতীয় হামলা যেখানে তারা বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে মিত্রদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে কিয়েভ।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, এই হামলায় রাশিয়া মোট ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া শহরেও রুশ হামলায় আরও দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে কিয়েভের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ইরানের পবিত্র শহর কোমের আকাশ-বাতাস আজ শোকাতুর মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের দ্বিতীয় জানাজা মঙ্গলবার সকালে পবিত্র জামকারান মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জানাজায় অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ, যা কোমের রাজপথগুলোকে এক বিশাল শোকের জনসমুদ্রে পরিণত করেছে।
মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই কোমের জামকারান মসজিদ প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকাগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমোলির ইমামতিতে জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। এই শোকাবহ অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় আলেম, সামরিক বাহিনীর কমান্ডার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। জানাজা শেষে মরদেহবাহী শোকযাত্রাটি জামকারান মসজিদ থেকে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)–এর পবিত্র মাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
এই বিদায় যাত্রায় অংশ নিতে সোমবার বিকেল থেকেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কোমে সমবেত হতে শুরু করেন। শোকাতুর মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি বিশেষ 'লাল পতাকা', যা ইরানি সংস্কৃতিতে রক্ত ও প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অনেক ভক্ত পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই মিছিলে যোগ দেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এক বিতর্কিত যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। দীর্ঘ চার মাস পর গত শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য মরদেহ রাখা হয়। সেখানে তেহরানবাসী তাদের নেতাকে শেষ বিদায় জানানোর পর এবার ধর্মীয় শহর কোমে জানাজা ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হলো।
খামেনির এই বিদায়ী শোকযাত্রা কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কোমের অনুষ্ঠান শেষে মরদেহ ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেও বিভিন্ন শোকানুষ্ঠান ও জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে চূড়ান্ত জানাজা শেষে এই মহান নেতার দাফন সম্পন্ন হবে। নেতার বিদায়ে পুরো ইরান জুড়ে এখন চলছে শোকের মাতম এবং এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি।