মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
১ বৈশাখ ১৪৩৩

পাকিস্তানে সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা, ইমরান সমর্থিতদের কি সুযোগ আছে?

এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই
আপডেটেড
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ২৩:১৮
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
প্রকাশিত
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ২৩:১৮

পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।

জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।

এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।

ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।

প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।

জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।

পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’

বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।

বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’

পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।

ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।

পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’

পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।

তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।

গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।


ফিলিস্তিন-লেবাননে হামলা, সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেন এরদোয়ান

রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। ছবি: সগৃহীত
আপডেটেড ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:১৩
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘অত্যাচার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে এরদোয়ান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে দ্য জেরুজালেম পোস্ট।

ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এশিয়া-পলিটিক্যাল পার্টিস কনফারেন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, ‘কোনো নিয়ম বা নীতির তোয়াক্কা না করে রক্তে রঞ্জিত এই গণহত্যার নেটওয়ার্ক নিরীহ শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষদের হত্যা করছে।’

এরদোয়ান দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের হামলায় ১২ লাখ লেবানিজ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করে বলেন, ‘তুরস্ক প্রয়োজন হলে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।’

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘যেভাবে আমরা নাগার্নো কারাবাখে গিয়েছিলাম, যেভাবে লিবিয়ায় গিয়েছিলাম তেমনি তাদের ক্ষেত্রেও আমরা তা করতে পারি।’

এরদোয়ানের বক্তব্যের জবাবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচেয় এলিয়াহু এরদোয়ানকে ‘ভণ্ড’ এবং ‘স্বৈরাচারী’ বলে আখ্যা দেন এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘তুরস্ক নিজেই অতীতে কুর্দি অঞ্চল দখল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর দমননীতি চালিয়েছে, তাই তাদের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ।’

এই ঘটনার সূত্রপাত হয় গাজা ফ্লোটিলায় সামরিক অভিযান ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ আটকানোকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনায় তুরস্কে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় তুরস্কের একটি আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ৩৫ জন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

ফিলিস্তিন ইস্যু ঘিরে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কঠোর বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ফিলিস্তিনে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার যাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় লেবাননে ২,০৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।


এক বছরে ১৬৩৯ জনকে ফাঁসি দিয়েছে ইরান

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হারে এক উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। গত ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ৬৩৯ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, যা ১৯৮৯ সালের পর গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সোমবার (১৩ এপ্রিল) নরওয়ে-ভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ এবং প্যারিস-ভিত্তিক ‘টুগেদার অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি’ প্রকাশিত এক যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই স্পর্শকাতর প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানে মোট ৯৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির বিচারিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কঠোরতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। মৃতদের তালিকায় সাধারণ পুরুষদের পাশাপাশি অন্তত ৪৮ জন নারীও ছিলেন, যাদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অস্থিতিশীলতারই একটি প্রতিফলন।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক জনবিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দমনের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরান সরকার মূলত জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এনজিওগুলোর প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ইরান যদি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধের ধাক্কা সামলে টিকে যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই দমন-পীড়নের মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারে। মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে একটি প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষাকারী বিভিন্ন সংগঠন ও দেশসমূহ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার মাঝে ইরানের এই বিচারিক ব্যবস্থার কঠোরতা বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ, কোন পথে বিশ্ব

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
    #সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি কোনো পক্ষ #পরস্পরকে দোষারোপ যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের #আলোচনায় কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি #উভয় দেশই কঠোর অবস্থান নেয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ বৈঠক শেষে গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমনটাই বলেছেন। এদিকে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে এর প্রভাব পুরো বিশ্বে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

জেডি ভ্যান্স জানান, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়ার পর তিনি আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছেন। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিকে দায়ী করা হয়েছে। পরস্পরকে দোষারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি’চাইছে ওয়াশিংটন। তবে এ আলোচনায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভ্যান্স। এর আগে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আলোচনার সুযোগ দিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখবে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই কঠোর অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানো হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানি গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘অতিরিক্ত দাবি’করছে বলে অভিযোগ করার পরপরই বোঝা গিয়েছিল যে আলোচনায় টানাপড়েন চলছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরআইবি বলেছে, ‘ইরানি প্রতিনিধিদল ইরানি জনগণের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য টানা ২১ ঘণ্টা নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে গেছে। ইরানি পক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এভাবে আলোচনা থেমে গেছে।’

আলোচনা ভেস্তে গেল কেন?

একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যর্থতা হঠাৎ করে নয় বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা বলছে, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে ‘অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে এবং তা সীমিত করতে অনীহা দেখায়। এই ইস্যুতেই আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়।

একইসঙ্গে অর্থনৈতিক প্রশ্নও আলোচনাকে জটিল করে তোলে। ইরান চেয়েছিল বিদেশে জব্দ থাকা তাদের বিপুল সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কথা বললেও তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান আরও দূরে সরে যায় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও রয়টার্স।

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে ইরান তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবাধ থাকুক। এই দ্বন্দ্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত, ফলে সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

দুই পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগও আলোচনাকে ব্যাহত করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান ‘মূল প্রতিশ্রুতি’ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত ও অবাস্তব শর্ত’ চাপিয়ে দিয়েছে। এই দোষারোপের রাজনীতি আলোচনার পরিবেশকে আরও নেতিবাচক করে তোলে বলে উল্লেখ করেছে অ্যাক্সিওস ও আল জাজিরা।

আবার তাহলে কী ভয়াবহ যুদ্ধ?

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিল যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছে- এমন দাবি নিয়ে। তাই এত অল্প সময়ে কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো দেশ দুইটির পক্ষে স্বাভাবিক বিচারেই কঠিন ছিল। ইতোমধ্যে ব্যর্থতার জন্য উভয় পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করে ফিরে গেছে। গত বুধবার দেশ দুইটির মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘অ্যাপোক্যালিপটিক’ বা ধ্বংসাত্মক হুমকির মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

কিন্তু এখন তাহলে কী হবে? যুদ্ধবিরতি কি বহাল থাকবে? বিবিসি সংবাদদাতা জো ইনউড বলেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে হামলার সম্ভাবনা যে নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

হরমুজ প্রণালি, যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যা ইরান আংশিকভাবে কিন্তু কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আপাতত আলোচনার টেবিলের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু, পারস্য উপসাগরে কয়েকদিন আগে মোতায়েন করা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অন্য কোনো পথের কথা ভাবছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না- এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়াটাই ছিল আলোচনা সফল হওয়ার পথে প্রধান বাধা।

ইরান সবসময়ই দাবি করে এসেছে যে তারা মারণাস্ত্র উৎপাদন করতে চায় না, কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হওয়ায় তাদের দেশে পারমাণবিক অস্ত্রের সমর্থকদের এখন পারমাণবিক শক্তি অর্জনে আরও উৎসাহিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সরাসরি আলোচনা ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু এটি হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ বন্ধ করছেন ট্রাম্প

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশে বিদেশ থেকে যাওয়া—যা ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নামে পরিচিত—এখন কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইল থেকে জানা গেছে, সংস্থাটি ‘বার্থ ট্যুরিজম ইনিশিয়েটিভ’ নামে নতুন একটি উদ্যোগ চালু করেছে। এর আওতায় দেশজুড়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এমন সব সংগঠিত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে, যারা গর্ভবতী নারীদের ভিসা আবেদনে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে সাহায্য করে।

এই নারীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নবজাতকের জন্য স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা। ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়টিকে সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, এই ধরনের জন্ম পর্যটন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তার দাবি, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না।

অন্যদিকে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজেই বেআইনি নয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় যদি ভিসা জালিয়াতি বা প্রতারণা ঘটে, সেসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা হবে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চালু হওয়া একটি নীতিমালায় বলা হয়েছিল—শুধুমাত্র সন্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশে পর্যটক ভিসা ব্যবহার করা যাবে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হতে পারে।

পরিসংখ্যানের দিক থেকে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ কতটা বড় সমস্যা, তা স্পষ্ট নয়। সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী এই উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তবে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় ৩৬ লাখ শিশুর তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সামান্য।

তবুও রিপাবলিকান নেতারা এই ইস্যু সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই নাগরিকত্ব পায়—যা দীর্ঘদিনের আইনি নজির।

ক্ষমতায় ফিরে প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেখানে বলা হয়—যদি বাবা-মায়ের কেউ মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তাহলে তাদের সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও নাগরিকত্ব পাবে না। এই সিদ্ধান্তটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে কয়েকজন ফেডারেল বিচারক তা স্থগিত করেন, এবং বিষয়টি এখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান নিয়ম ‘বার্থ ট্যুরিজম’-কে উৎসাহিত করছে এবং এর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব সংযোগ কম।

এই নতুন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)। সংস্থাটি বিশেষভাবে জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো ভেঙে দিতে কাজ করবে।

এর আগে ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘বার্থ হাউস’ পরিচালনার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যেখানে বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। সেই ঘটনাকে জন্ম পর্যটনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এখনো বহাল থাকলেও, এই সুযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জালিয়াতি চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।


ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল ইসরায়েল

তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে  হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

ইসরায়েলের তেল আবিবে সরকারবিরোধী এবং ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে আদালতের বেঁধে দেওয়া জনসমাগমের সীমা অতিক্রম করেছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। শনিবার তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে অন্তত ২ হাজার মানুষ অংশ নেয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যা আদালতের নির্ধারিত ১ হাজার জনের সীমার দ্বিগুণ।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তার অজুহাতে সুপ্রিম কোর্ট এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। তবে বিশাল জনসমাগম সত্ত্বেও পুলিশ গত সপ্তাহগুলোর মতো কঠোর হস্তক্ষেপ করেনি, যদিও পুরো এলাকায় ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি।

টানা ষষ্ঠ সপ্তাহের মতো চলা এই বিক্ষোভে বামপন্থী বিভিন্ন দল ও সরকারবিরোধী সংগঠনগুলো অংশ নেয়। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির বিচার এবং অতি-অর্থোডক্স শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা।

সমাবেশের অন্যতম আয়োজক অ্যালন লি গ্রিন দাবি করেছেন যে, তেল আবিবের রাস্তায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল। গ্রিন তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ‘সরকার একটি চিরস্থায়ী জরুরি অবস্থা তৈরি করে জনগণকে আশ্রয়ের আড়ালে আটকে রাখছে এবং এই সুযোগে তারা বিচার বিভাগীয় অভ্যুত্থানের মতো বিতর্কিত আইন পাস করছে।’

সমাবেশে উপস্থিত হয়ে আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হাদাশ-এর প্রধান আয়মান ওদেহ বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা করে বলেন যে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ‘নৈতিক বিকল্প’ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধের জন্য ইহুদি-আরব অংশীদারিত্বের প্রয়োজন না থাকলেও শান্তির জন্য এই দুই সম্প্রদায়ের ঐক্য অপরিহার্য।

বিক্ষোভকারীরা এ সময় ‘শান্তি, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তোলে। তেল আবিব ছাড়াও জেরুজালেমের প্যারিস স্কয়ার এবং হাইফাতেও শত শত মানুষ একই দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। জেরুজালেমে পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে জরিমানা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের শুক্রবারের রায়ে তেল আবিবে জমায়েতের সীমা ১ হাজার এবং হাইফাতে মাত্র ১৫০ জন নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে গত সপ্তাহে পুলিশ অবৈধ জমায়েতের অজুহাতে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার ও কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করলেও এবার তারা কিছুটা নমনীয় ছিল।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করলেই পুলিশ বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পারে না, বিশেষ করে হাবিমা স্কয়ারের নিচে বিশাল বোমা আশ্রয়কেন্দ্র থাকায় নিরাপত্তার ঝুঁকি কম। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর স্কুল ও কর্মক্ষেত্রের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে, তবে লেবানন সীমান্ত দিয়ে হিজবুল্লাহর সাথে সংঘাত চলমান থাকায় উত্তর ইসরায়েলের হাইফাসহ অন্যান্য অঞ্চলে এখনো কঠোর বিধিনিষেধ বলবৎ রয়েছে।


হরমুজ থেকে মাইন অপসারণে তৎপরতা শুরু মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম)। এ জন্য প্রাথমিক ভাবে দুটি রণতরীও মোতায়েন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাইন অপসারণ করতে দুই মার্কিন রণতরী ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক পিটারসন এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় জানিয়েছে সেন্টকোম। গত শনিবার সেই বার্তায় আরও বলা হয়েছে, ‘ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পেতে রাখা মাইন থেকে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করতে বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে জাহাজ দুটি পাঠানো হয়েছে।’

একই দিন পৃথক এক বিবৃতিতে সেন্টকোমের শীর্ষ নির্বাহী কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, “আমরা একটি নতুন পথ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছি এবং বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহকে উৎসাহিত করতে শিগগিরই এই পথকে বেসামরিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল খাতের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।’

উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারির অংশ হিসেবে সেখানে জলমাইন পেতেছিল আইআরজিসি। কিন্তু প্রণালির কোনো কোনো জায়গায় মাইন স্থাপন করা হয়েছিল, তা এখন শনাক্ত করতে পারছে না ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

এর প্রথম কারণ, প্রণালির যেসব জায়গায় মাইন পাতা হয়েছে, সেসবের রেকর্ড যথাযথভাবে রাখেনি আইআরজিসি এবং দ্বিতীয় কারণ, আইআরজিসির নথিতে যেসব জায়গায় মাইন পাতার রেকর্ড রয়েছে, সেসবের বেশির ভাগই সরে গেছে কিংবা ভেসে গেছে; অর্থাৎ আগের জায়গায় নেই। এ কারণে এসব মাইন শনাক্ত করা এখন বেশ কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অবশ্য নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে কাজ শুরু করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী।

‘আমরা এখন হরমুজ থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছি। শিগগিরই হরমুজের তলদেশে মাইন বিধ্বংসী যন্ত্রচালিত নৌযান পাঠানো হবে’, ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলেছেন ট্রাম্প।

হরমুজকে বাইপাস করা তেলের পাইপ ঠিক করল সৌদি

ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ঠিক করেছে সৌদি আরব। গত সপ্তাহে এ পাইপের ওপর হামলা চালায় ইরান। রোববার সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।

১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পাইপ লাইনটি মধ্যপ্রাচ্যের দুটি লাইনের একটি যেটি হরমুজ প্রণালিকে বাইপাস করে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তেল সরবরাহ করে।

ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলো বহির্বিশ্বে তাদের তেল ও গ্যাস পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু সৌদি এ পাইপ লাইনের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে তাদের তেল পাঠাচ্ছিল।

সৌদির বার্তাসংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি গত সপ্তাহে বলেছিল, পাইপ লাইনে হামলার কারণে দিনপ্রতি তাদের ৭ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। লাইনটি ঠিক করায় এখন পূর্ব-পশ্চিম পাইপ লাইনের তেল পাম্পের সক্ষমতা ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাবে। অপরদিকে মানিফা তেলক্ষেত্রের উৎপাদন দিনপ্রতি ৩ লাখ ব্যারেল হবে।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খুরাইস তেলক্ষেত্রে উৎপাদন শুরু করতে এখনো কাজ চলছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলার সময় সৌদির বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা চালায় ইরান। তবে এসব হামলার জবাবে সরাসরি কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি রিয়াদ। যদিও ইরানের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখতে মার্কিনিদের চাপ দিয়েছিলেন সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান।


হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং এখান দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানি মুদ্রা রিয়ালে টোল পরিশোধ করতে হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি এ কথা জানিয়েছেন। মেহের নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পাকিস্তানে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে সেখানে তিনি হরমুজ প্রণালির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অথচ এই জলপথটি আলোচনার অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত বিষয় ছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি চলছে, তার একটি অন্যতম শর্ত হলো এই প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথের ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা বাধা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের কারণ হতে পারে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি 'শীঘ্রই উন্মুক্ত’ হবে।

অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ মাইন অপসারণ অভিযানের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি-এর মাধ্যমে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো সামরিক জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মার্কিন নৌবাহিনীর ২টি জাহাজের হরমুজ অতিক্রমের দাবি নাকচ করল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে এ দাবি নাকচ করেছে ইরান।

সেন্টকমের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ডেস্ট্রয়ার—ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আরব উপসাগরে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

সেন্টকমের ভাষ্য, এটি তাদের একটি বৃহত্তর মিশনের অংশ। এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে যে মাইন স্থাপন করেছিল, তা সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা।

এক বিবৃতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোর উপস্থিতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘আজ আমরা একটি নতুন পথ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছি এবং বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ উৎসাহিত করতে শিগগির এই নিরাপদ নৌপথ নৌপরিবহন খাতের সঙ্গে ভাগ করে নেব।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই সংকীর্ণ প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বাণিজ্যিক ও সামরিক—উভয় ধরনের জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার বিষয়ে মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতির পরপরই ইরানের সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র মার্কিন দাবি নাকচ করেন।

এই মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালির দিকে মার্কিন জাহাজগুলোর অগ্রসর হওয়া ও প্রবেশের বিষয়ে সেন্টকম কমান্ডারের দাবি নাকচ করা হলো। এই পথ দিয়ে যেকোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো সামরিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে আইআরজিসি ‘কঠোর জবাব’ দেবে বলে হুঁশিয়ার করেন ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা।

হরমুজ প্রণালি থেকে বিপুল আয় ইরানের

গত এক মাসে অন্তত ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স। শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

জানা গেছে, এই টোলের পরিমাণ একটি জাহাজের জন্যই ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঠেকছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রোকার ও জাহাজ মালিকদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ইরানি নয় এমন জাহাজগুলোকে ওই পথ দিয়ে চলাচলের জন্য ইরান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টোল নিয়ে দরকষাকষি করতে হচ্ছে।

হরমুজ নিয়ে ১৮০ ডিগ্রি উল্টে গেলেন ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালি ইসলামাবাদ আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি। কিন্তু এই প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আসল অবস্থান কী, সেটাই এখন পরিষ্কার নয়। ওয়াশিংটন থেকে সাংবাদিক মাইক হান্না এই মন্তব্য করেছেন।

মাত্র দশ দিনের মধ্যে ট্রাম্প এই প্রণালি নিয়ে পুরোপুরি বিপরীত দুটি কথা বলেছেন। একবার তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কাজে আসে না। সেখান দিয়ে যে তেল যায় তা ওয়াশিংটনের দরকার নেই। অন্য দেশগুলোই এই প্রণালি পাহারা দিক এবং ইরানের সাথে সমস্যা মেটাক।

কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি ১৮০ ডিগ্রি উল্টে গেলেন। তিনি বললেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখাটাই মার্কিন দাবির কেন্দ্রে আছে। প্রণালি না খুললে কোনো আলোচনাই হবে না। এই দুটি অবস্থান একসাথে মেলানো সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার। ইরান মনে করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় না করে তারা এই কার্ড ছাড়বে না। আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যখন প্রশ্নভেদে ও সময়ভেদে বদলে যায়, তখন পরের দফা আলোচনায় এই বিষয়ে কোনো সমাধান হবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।


সংলাপের ফলাফল যাই হোক, এই যুদ্ধে আমেরিকা জয়ী: ডোনাল্ড ট্রাম্প

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে ও একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা এক ম্যারাথন সংলাপে লিপ্ত রয়েছেন, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে চলমান এই আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল যাই আসুক না কেন, রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জয়ী হয়েছে। গত শনিবার ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন ত্যাগের প্রাক্কালে বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে কোণঠাসা করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটন সফল হয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, ইসলামাবাদ থেকে কী বার্তা আসছে বা শেষ পর্যন্ত ইরান কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে সই করছে কি না, তা নিয়ে তিনি খুব একটা বিচলিত নন। তাঁর ভাষায়, সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পরাজিত করেছে এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের জয় সুনিশ্চিত। ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে আসে তবে ভালো, আর যদি না আসে তাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্জিত বিজয়ের কোনো হেরফের হবে না।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে এই হাই-প্রোফাইল সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই সংলাপে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের শক্তিশালী স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই শান্তি প্রক্রিয়াকে সফল করতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা গত ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নিবিড় ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এমন অনমনীয় মন্তব্য মূলত আলোচনার টেবিলে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদের ওপর বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি অংশ হতে পারে। যখন পুরো বিশ্ব একটি টেকসই শান্তি চুক্তির আশায় ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন ট্রাম্পের এই ‘চুক্তি হোক বা না হোক’ নীতি আলোচনার ভবিষ্যৎকে কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার বিষয়ে কতটা অনড়। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ এই সংলাপ শেষ পর্যন্ত কোনো ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে নাকি ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী পরিস্থিতি একতরফা বিজয়ের দিকেই ধাবিত হয়।


পরমাণু প্রকল্প নিয়ে সমঝোতায় আসতে চায়নি ইরান: ভ্যান্স

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকের পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স দাবি করেছেন যে, ইরান তার বিতর্কিত পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে কোনো ধরণের অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী নয়। রোববারের এই ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স সরাসরি অভিযোগ করেন যে, তেহরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে যে ধরণের দীর্ঘমেয়াদী ও জোরালো অঙ্গীকারের প্রয়োজন ছিল, তার অভাব এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ।

জে ডি ভ্যান্স তাঁর বক্তব্যে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরে জানান, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের কাছে একটি ইতিবাচক এবং পরিষ্কার অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান যেন ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না হাঁটে এবং এমন কোনো উপকরণ বা প্রযুক্তি অনুসন্ধান না করে, যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সক্ষমতা জোগাবে। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে এ ধরণের কোনো মৌলিক ইচ্ছাশক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। ভ্যান্স আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান কেবল স্বল্পমেয়াদী সুবিধার কথা ভাবছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তেহরানের এই বৈরিতা গত দুই দশকের এক জটিল সংকট। এই সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের সর্বশেষ বড় প্রচেষ্টাটি শুরু হয়েছিল গত ৬ ফেব্রুয়ারি। টানা ২১ দিন ধরে চলা সেই সংলাপ কোনো সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। সংলাপের সেই ব্যর্থতার ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে এক বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী। একই সময়ে ওয়াশিংটনের সাথে সমন্বয় করে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েলও।

টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পর পুনরায় কূটনীতির পথ প্রশস্ত করতে গত ৭ এপ্রিল দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। সেই বিরতিকালের মধ্যেই গতকাল ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে পুনরায় সংলাপে বসেছিল দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল। কিন্তু দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনার শেষে জে ডি ভ্যান্সের এই নিরাশাজনক বক্তব্য মূলত প্রমাণ করে যে, দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট এখনো চরম পর্যায়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদের এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা পুনরায় বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়ল। পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের অনড় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও, স্থায়ী শান্তি চুক্তির কোনো লক্ষণ না থাকায় পুরো বিশ্ব এখন গভীর উদ্বেগের সাথে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে। ভ্যান্স তাঁর ব্রিফিংয়ের শেষে ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তনের আশা রাখলেও, বর্তমান বাস্তবতা যুদ্ধের দামামাকেই পুনরায় ইঙ্গিত করছে।


আফগানিস্তানের হেরাতে পিকনিক স্পটে বন্দুকধারীদের নির্বিচার গুলি: নিহত ১১

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত প্রদেশে এক ভয়াবহ বন্দুক হামলায় অন্তত ১১ জন শিয়া মুসলিম নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার বিকেলে প্রদেশের এনজিল জেলার একটি জনপ্রিয় বিনোদন ও পিকনিক স্পটে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটে। শুরুতে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও সাতজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে এগারোতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া ও তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

প্রাদেশিক কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় ওই বিনোদনস্থলে স্থানীয় বাসিন্দাদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা একদল অজ্ঞাত সশস্ত্র দুর্বৃত্ত এনজিল জেলার দেহ মেহরি গ্রামের কাছে অবস্থানরত মানুষের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। মূলত ওই গ্রামটি শিয়া অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে একটি প্রাচীন শিয়া মাজার রয়েছে। মাজার সংলগ্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষের ওপর দুর্বৃত্তরা কোনো প্রকার উস্কানি ছাড়াই গুলি চালায়।

হেরাতে তালেবান সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান আহমাদুল্লাহ মুত্তাকি এই ঘটনাকে একটি সুপরিকল্পিত ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিয়িকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বিনোদনকেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়া নিরপরাধ স্থানীয় বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র ব্যক্তিরা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। অন্যদিকে, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল মতিন কানি জানিয়েছেন, যে স্থানটিতে হামলা হয়েছে সেখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ নামাজ ও জিয়ারতের জন্য সমবেত হন। শিয়া ধর্মাবলম্বীদের ওপর এই আঘাত মূলত ধর্মীয় বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

আফগানিস্তানের শিয়া মুসলিমরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং অতীতেও তারা বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছেন। হেরাতের স্থানীয় একজন চিকিৎসক নিশ্চিত করেছেন যে, নিহতদের সবাই শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং তাঁরা ছুটির দিনে মাজারে সময় কাটাতে গিয়েছিলেন। আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন।

এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা জঙ্গি সংগঠন এই বর্বরোচিত হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে তালেবান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকাটি ঘিরে রেখেছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এই হামলার ফলে আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।


২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও সমঝোতা হয়নি: ভ্যান্স

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত সরাসরি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা দুই দিনে মোট ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার ম্যারাথন বৈঠকের পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন যে, কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। রোববার (১২ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ঘোষণা দেন এবং জানান যে মার্কিন প্রতিনিধিদল এখন পাকিস্তান ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ব্যর্থতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আলোচনার এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্পষ্টভাবে বলেন যে, আলোচনার কোনো ত্রুটি বা ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানিরা কোনোভাবেই দায়ী নয়। বরং তারা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বৈঠক সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে অসাধারণ পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা দেখিয়েছে। ভ্যান্সের মতে, পাকিস্তান তাদের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করলেও দুই বৈরী দেশের মধ্যকার মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

জে ডি ভ্যান্স তাঁর বক্তব্যে আলোচনার ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইতিবাচক দিক হলো দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে দুই দেশের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কথা বলেছেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। তবে নেতিবাচক বাস্তবতা হলো, এত দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টার পরেও কোনো কার্যকরী চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ‘সৎ উদ্দেশ্য’ এবং যথেষ্ট নমনীয় মনোভাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেছিল। সব পক্ষকে মানিয়ে চলার মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারাকে তিনি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করেন।

তবে আলোচনা একদম বিফলে যায়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, পাকিস্তান ছাড়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জন্য একটি ‘চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম’ প্রস্তাব (Final and Best Offer) রেখে যাচ্ছে। এটি মূলত একটি সহজ সমঝোতার পদ্ধতি বা ‘বোঝাপড়ার পদ্ধতি’, যা গ্রহণ করা বা না করার সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণভাবে তেহরানের ওপর নির্ভর করছে। মার্কিন প্রশাসন এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে ইরানি নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করে যুদ্ধের পথ পরিহার করে কি না।

সংবাদ সম্মেলনে জে ডি ভ্যান্স আরও জানান যে, এই দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অগ্রগতির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়মিত অবহিত করা হয়েছে। আলোচনার এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ভ্যান্স অন্তত ছয় থেকে বারোবার সরাসরি প্রেসিডেন্টের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয় যে, হোয়াইট হাউস এই বৈঠকটিকে তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছিল।

সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছিলেন ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের অন্যতম জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তাঁরা দুজনেই এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে সরাসরি ইরানের প্রতিনিধিদের সাথে তর্কে অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে মার্কিন প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান ছাড়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলেও, তাঁদের ফেলে যাওয়া ‘সর্বোত্তম প্রস্তাবটি’ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও ভূ-রাজনীতিতে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সারা বিশ্ব। আপাতত আলোচনার টেবিলে পাওয়া এই শূন্যতা সংঘাতের ঝুঁকিকে পুনরায় বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


পৃথিবীতে ফিরলেন ৪ নভোচারী

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণের ঐতিহাসিক অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরলেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। স্প্ল্যাশ ডাউন করে নামানো হয় তাদের। শনিবার (১১ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিট) তাদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।

এর মাধ্যমে ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবার মানুষের চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার ঐতিহাসিক মিশন সম্পন্ন হলো। সমুদ্রে অবতরণের (স্প্ল্যাশ ডাউন) পর আর্টেমিস-২-এর কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা নভোচারীদের অবস্থা সম্পর্কে একটি ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছেন।

ওয়াইজম্যান বলেন, ‘কী অসাধারণ এক যাত্রা ছিল। আমরা স্থিতিশীল আছি। চার নভোচারীই সম্পূর্ণ সুস্থ (গ্রিন) আছেন।’ এর মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করলেন যে, চারজন নভোচারীই শারীরিকভাবে ভালো আছেন।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আর্টেমিস-২ ল্যান্ডিং অ্যান্ড রিকভারি ডিরেক্টর লিলিয়ানা ভিয়ারিয়াল বলেছেন, সমুদ্রে অবতরণের দুই ঘণ্টার মধ্যে নভোচারীদের ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে উদ্ধার করা হবে। এরপর তাদের মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ইউএসএস জন পি মুরথা’র মেডিকেল বে-তে পৌঁছে দেওয়া হবে।

কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নভোচারীদের প্রথমে ওরিয়ন ক্যাপসুলের সঙ্গে যুক্ত একটি ভেলায় (রাফট) আনা হবে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ফ্রন্ট পোর্চ’। এরপর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজে নেওয়া হবে।

নাসার ফ্লাইট কন্ট্রোলার জেফ রাডিগান বলেছেন, সমুদ্র শান্ত থাকলে ক্যাপসুল থেকে এই উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগতে পারে। জাহাজে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বিমানে করে তাদের হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে নেওয়া হবে।

এর মধ্য দিয়ে সফলভাবে সমাপ্ত হলো ১০ দিনের এই রোমাঞ্চকর চন্দ্রাভিযান। ১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল এই মহাকাশযাত্রা।

মিশনটি একাধিক নতুন ইতিহাস গড়েছে। চাঁদের দূরবর্তী অংশে অবস্থানের সময় পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ড (২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল) ভেঙে দিয়েছে।

এ ছাড়া ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণের অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। নভোচারীরা এই চন্দ্রাভিযানে বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন। তারা চন্দ্রপৃষ্ঠে অন্তত ছয়টি উজ্জ্বল উল্কাপাতের ঝলক সরাসরি দেখেছেন।

আর্টেমিস-২ অভিযানটি ছিল ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের পদচিহ্ন ফেলার নাসা-পরিকল্পনার একটি পরীক্ষামূলক ধাপ। নাসা প্লাস, অ্যামাজন প্রাইম, নেটফ্লিক্স ও অ্যাপল টিভিতে ঐতিহাসিক এই প্রত্যাবর্তন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।


সংঘাত বন্ধে ঐতিহাসিক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

* যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে আলোচনা * ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি * ১৯৭৯-এর পর প্রথম সরাসরি সংলাপ * মুখোমুখি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতিনিধিরা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈঠক চলছিল। ইসলামাবাদের এ আলোচনা নিয়ে নানা শঙ্কা থাকলেও নির্ধারিত সময়েই দুই দেশ বৈঠকে বসেছে। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিদেশীয় আলোচনা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হয়।

গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরপর তাদের মধ্যে আলোচনার চেষ্টা শুরু করে পাকিস্তান। তারই ফলশ্রুতিতে বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ আলোচনাকে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে প্রথম ধাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে পৌঁছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, এই আলোচনায় দুই পক্ষের গঠনমূলক অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন- এ সংলাপ আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইলকফ এবং সাবেক উপদেষ্টা জারেড কুশনার। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রেজা নকভি উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে যা জানা গেল:

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটাকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে অনেকগুলি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা বলছে, লেবাননে যা ঘটছে তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিছু সূত্র ইঙ্গিত দেয়, [ইসরায়েলের] অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বৈরুতে আর কোনও হামলা হবে না। ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির সম্পদ ছাড় হতে যাচ্ছে, এমন কিছু পরিবর্তনও হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে আলোচনা

এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি

গতকাল শনিবার সকালে ইসলামাবাদে পৌঁছান মার্কিন প্রতিনিধি দল। নূর খান এয়ারবেসে তাদের স্বাগত জানান ইসহাক দার, মহসিন রেজা এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির। অন্যদিকে ইরানি প্রতিনিধি দলও আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

১৯৭৯-এর পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি সংলাপ

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জটিল এজেন্ডা, বড় চ্যালেঞ্জ

আলোচনার পথ মোটেও সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের অধিকার এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করা। এছাড়া লেবাননে হামলা বন্ধ, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—এসব বিষয়েও মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ আবারও শুরু হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে আলোচনাকে সফল করতে।

সতর্ক আশাবাদ

কূটনৈতিক মহলের ধারণা, দুই দিনের এই প্রাথমিক বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তি নাও আসতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে এবং উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও এর সাফল্য এখনো অনিশ্চিত।

মুখোমুখি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতিনিধিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলমান আলোচনায় বড় পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। এর আগে আলোচনা পরোক্ষভাবে চলছিল। সে সময় দুই পক্ষ আলাদা কক্ষে অবস্থান করছিল এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা বার্তা আদান-প্রদান করছিলেন।

তবে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিষয়টিতে নতুন মোড় নেয়। মধ্যস্থতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে আল-জাজিরা জানায়, এবার দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরাও উপস্থিত রয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটাই প্রথমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি নিউজও জানিয়েছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা এটিকে ‘ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবারের মতো দুই দেশের প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসে সরাসরি আলোচনা করছেন। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি, পাকিস্তানের সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা এবং বৈশ্বিক নেতাদের ইতিবাচক বার্তা—সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা আরও জোরাল হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

যে বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় এখনো বেশ কিছু অমীমাংসিত এবং জটিল বিষয় বা ‘স্টিকিং পয়েন্ট’ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার কূটনৈতিক সম্পাদক জেমস বেস। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে একমত হলেও বেশ কিছু মৌলিক ইস্যুতে এখনো মতবিরোধ কাটেনি।

আলোচনার মূল বাধাগুলো:

১. নিরাপত্তা গ্যারান্টি: ইরান তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কঠোর শর্তারোপ করছে।

২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করছে।

৩. আঞ্চলিক স্বার্থ: ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে দেশ দুটির বিপরীতমুখী অবস্থান আলোচনার টেবিলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষই নিজ নিজ প্রভাববলয় বজায় রাখতে মরিয়া। আল জাজিরার জেমস বেস বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, যদিও দুই দেশ টেবিলে বসেছে, যা একটি বড় অগ্রগতি; কিন্তু কয়েক দশকের অবিশ্বাস রাতারাতি দূর হওয়া কঠিন। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুই দেশের সরকারই প্রবল চাপের মুখে রয়েছে, যা সমঝোতার পথকে পিচ্ছিল করে তুলছে।


banner close