পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনালাপে এ আহ্বান জানান তিনি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এর আগে, ইরানে বিক্ষোভের পেছনে কার আছে, সে বিষয়টিও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন ফিদান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির প্রেক্ষাপটে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে হাকান ফিদান বলেন, ইরানের বিক্ষোভগুলো ‘বিদেশ থেকে দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা প্রভাবিত এবং তারাই উসকানি দিচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে তিনি ইসরায়েলের একটি গোয়েন্দা সংস্থার নাম উল্লেখ করেন।
ফিদান বলেন, ‘মোসাদ এটি গোপনও করছে না। তারা নিজেদের ইন্টারনেট ও টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কার্যক্রমকে দেশটির ক্রমশ অবনতিশীল প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) তিনি বলেছেন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়াকে ইরানের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
কোনো তৃতীয় পক্ষ মস্কো ও তেহরানের সম্পর্কের প্রকৃতি বদলাতে পারবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। খবর ইরান ইন্টারন্যাশনালের।
লাভরভ আরও বলেন, তেল ও অন্য সম্পদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কর্মকাণ্ড দেশটিকে ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ করে তুলেছে।
মিসরের সেনাবাহিনীর গোপন রিজার্ভে মিসরের মোট বৈদেশিক ঋণের চেয়েও বেশি পরিমাণ অর্থ রয়েছে, এমন দাবি করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ ব্যাংকিং ও সরকারি কর্মকর্তারা। তবে দেশের ঋণ-সংকট সামাল দিতে সরকার সহায়তা চাইলেও বাহিনী সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। খবর মিডল ইস্ট আইর।
এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন মিসর তীব্র আর্থিক চাপে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, অভ্যন্তরীণ তারল্য সংকুচিত হচ্ছে, আর সরকার হিমশিম খাচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধে। এই প্রেক্ষাপটে মিসরের অর্থনীতিতে সেনাবাহিনীর অস্বচ্ছ ও প্রভাবশালী ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার কথা ছিল মিসরের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় সরকার। শেষ পর্যন্ত ‘নীতিগতভাবে’ সিদ্ধান্ত হয়, আসন্ন আইএমএফ কিস্তি থেকে ওই অর্থ কেটে নেওয়া হবে এবং তার ওপর সুদ যোগ করা হবে।
তবে এই ব্যবস্থার শর্তাবলি কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মিসর সরকার ও আইএমএফ—উভয় পক্ষই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেনি। এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার তিন ট্রিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড (প্রায় ৬৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) ঋণ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারল্যসংকটের কথা বলে দেশীয় ব্যাংকগুলো তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।’
ওই জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকায় সরকার শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর কাছে সাহায্য চায়।’ ওই কর্মকর্তা জানান, সামরিক বাহিনীর ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অথরিটির প্রধান সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। বিষয়টি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছেও তোলা হলেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী মোস্তাফা মাদবুলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল-মেজিদ সাকারকে ফোন করে আইএমএফের সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধে সহায়তার অনুরোধ জানান। কিন্তু সেই আবেদনও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ডিসেম্বরের শেষ দিকে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ওই কর্মকর্তা।
কেন প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির কাছে একই অনুরোধ করেননি, তা স্পষ্ট নয়। সিসি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং ধারণা করা হয়, এসব রিজার্ভের ওপর তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ মিসরের মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় দাঁড়ায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
ওই ব্যাংক কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, মিসরের সেনাবাহিনীর কাছে বিপুল পরিমাণ ডলার রিজার্ভ রয়েছে, যা বেসামরিক সরকারের নাগালের বাইরে। তাঁর দেওয়া হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ মিসরের মোট বৈদেশিক ঋণ—১৬১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যদিও মিডল ইস্ট আই এই অঙ্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি, তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করছে না।
সরকারি হিসাবের ওপর সরাসরি নজরদারি থাকা ওই কর্মকর্তা বলেন, এই সামরিক তহবিল ‘বাস্তব এবং আক্ষরিক অর্থেই বিদ্যমান’ এবং তা দেশের দুই প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক—ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইজিপ্ট ও বান্ক মিসরে রাখা আছে। তবে এই অর্থ পুরোপুরি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেন, ‘এই অর্থ মিসরের ব্যাংকেই আছে, কিন্তু তা ব্যবহার করা বা ঋণ পরিশোধে লাগানো একেবারেই অসম্ভব।’
ওই কর্মকর্তা যুক্তি দেন, তাত্ত্বিকভাবে সেনাবাহিনী চাইলে মিসরের সব বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধ করতে পারে এবং ডলার-সংকটের সমাধান করতে পারে। কিন্তু তারা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায় না। তার ভাষায়, সামরিক প্রকল্পের প্রকৃত পরিমাণ ও তহবিলের বিস্তারিত তথ্য সম্পূর্ণ গোপন। এসব বিষয়ে কোনো ধরনের নজরদারি নেই। শুধু প্রেসিডেন্ট সিসি ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাই এসব জানেন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের একটি সূত্রও একই ধরনের অঙ্কের কথা উল্লেখ করেছে এবং দুই ব্যাংকে সেনাবাহিনীর আমানতের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে, তবে বিস্তারিত জানায়নি। এই গুরুতর অভিযোগ মিসরের সেনাবাহিনীর আর্থিক শক্তির অস্বচ্ছ দিকটি সামনে এনেছে। মিসরের ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের তথ্য গণমাধ্যমকে দেয় না। সেনাবাহিনীও তাদের আর্থিক হিসাব প্রকাশ করে না, যা পুরোপুরি বেসামরিক নজরদারির বাইরে।
নভেম্বরে স্থানীয় ব্যাংকগুলো সরকারকে দেড় লাখ কোটি মিসরীয় পাউন্ড ঋণ দেয়, যাতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ কিস্তি পরিশোধ করা যায়। এর ফলে নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো জায়গা প্রায় শেষ হয়ে যায়। ডিসেম্বরের শেষ দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মাদবুলি বলেন, বছরের শেষ নাগাদ সরকার ‘অভূতপূর্বভাবে ঋণ কমাবে।’
রাষ্ট্রক্ষমতার ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো তখন প্রচার করে, ঋণ কমানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কয়েক দিনের মধ্যেই ‘চমকপ্রদ’ ও ‘বিস্ফোরক’ ঘোষণা দেবেন। কিন্তু বছরের শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে বড় কোনো ঘোষণা আসেনি।
ওই ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালে তীব্র ডলার-সংকটের সময় সেনাবাহিনী আর্থিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল। তখন আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় ডলার না পাওয়ায় বন্দরে পণ্য আটকে যায়। তিনি বলেন, ‘সে সময় সেনাবাহিনী ১০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে সংকট সামাল দেয়। প্রধানমন্ত্রী তখন এটিকে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যদিও তিনি সরাসরি সেনাবাহিনীর কথা বলেননি।’
তিনি বলেন, ‘পরে সেনাবাহিনীকে মিসরের বৈদেশিক ঋণের পুরোটা বা অন্তত একটি অংশ পরিশোধে অবদান রাখার প্রস্তাব বারবার দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবারই তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়, এ বিষয়ে আর কথা তোলা যাবে না।’ এই অবস্থান এখনো বহাল, যদিও মিসরের বড় অংশের ঋণ অস্ত্র কেনা বা এমন বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত, যেখান থেকে সেনাবাহিনী আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে।
এমনকি সেনাবাহিনীর নিজের নামে নেওয়া ঋণ পরিশোধের প্রস্তাবও নাকচ করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংকের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘সেনাবাহিনী বারবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে—এমনকি নিজের নামে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেও রাজি হয়নি।’ নিয়ন্ত্রণে।
একটি সূত্র বলেছে, ‘স্বর্ণখনি থেকে উৎপাদনের ৫০ শতাংশ সেনাবাহিনী পায়। এতে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। এর বাইরে কাঁচা সোনা আমদানি, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও পুনঃরপ্তানি থেকে বছরে বিলিয়ন ডলার আয় হয়।’
জুলাইয়ে আইএমএফ এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানায়, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেল মিসরের বেসরকারি খাতকে ধ্বংস করছে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং দেশকে ঋণের চক্রে আটকে রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন সামরিক বাহিনী পরিচালনার মতো বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমনটি জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইরানি বিক্ষোভকারীদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন সাহায্য আসছে। এমন মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের অবস্থান জানতে চাইলে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, জাতিসংঘ অবশ্যই, ইরানের পরিস্থিতি ঘিরে সামরিক বাহিনীর মতো বক্তৃতা বৃদ্ধির বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সামরিক বক্তব্যের পরিবর্তে সকল সদস্য রাষ্ট্রের কূটনীতির উপর জোর দেওয়া অপরিহার্য।’
ডুজারিক উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের বর্তমানে ইরান থেকে তার কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। পরবর্তীতে লিখিত জবাবে তিনি আরো জানান যে ইরানে ৪৬ জন আন্তর্জাতিক কর্মী এবং ৪৪৮ জন স্থানীয় নাগরিক কাজ করছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে ইরানের অর্থনীতির অবনতি এবং ইরানি রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে।
বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর ঘটনাসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যেখানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে নিজেদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা ও কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে এই জনবল স্থানান্তরের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি এবং দোহায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কাতারের আল উদেইদে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সৈন্য অবস্থান করছে। ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ দমনে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারির মধ্যেই এই সেনা সরানোর খবরটি প্রকাশ্যে এলো। এর আগেও গত বছর মার্কিন বিমান হামলার কয়েকদিন আগে কয়েকটি ঘাঁটি থেকে সেনা ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টায় কাতারের এই ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।” মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি ও সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা থেকেই ওয়াশিংটন তাদের এই কৌশলগত স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরানের ওপর যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেখানেও পাল্টা আক্রমণ করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোকে এই কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে ওই দেশগুলোকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের ভূমি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন তৎপরতা চালাতে না দেয় এবং সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ভূমিকা রাখে।
গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে আন্দোলন বর্তমানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা করবে না।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরানি জনগণকে তাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর যারা নির্যাতন চালাচ্ছে তাদের চিহ্নিত করতে বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন, ইরানে এই ‘নির্বোধ হত্যা’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দেশটির কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো ধরনের বৈঠকে বসবেন না। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি আশাপ্রদ বার্তা দিয়ে বলেন, ‘সহায়তা আসছে’ এবং তিনি ইরানকে পুনরায় একটি মহান রাষ্ট্রে পরিণত করার (মিগা) অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সূত্র: আলজাজিরা ও রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি সেখানে আটককৃত বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়া শুরু হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মঙ্গলবার তিনি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র চুপ করে থাকবে না। এর আগে তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন যে তাদের জন্য সাহায্য আসছে।
অন্যদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এই সতর্কবার্তাকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সামরিক অভিযানের অজুহাত হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের জাতিসংঘ মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের এই কৌশল আবারও ব্যর্থ হবে। তারা অভিযোগ করেছে যে, ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মূল ভিত্তি হলো শাসন পরিবর্তন। এ জন্য তারা নিষেধাজ্ঞা, হুমকি এবং পরিকল্পিত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে দমন-পীড়নের ফলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যা দেশটির বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করেছে এবং গত পাঁচ দিনেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখে দমন-পীড়নের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করছে। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া টানা বিক্ষোভের পর তারা বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে তেহরানের প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে আটক হওয়া সন্দেহভাজনদের অনেককে আল্লাহর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরানের আইনে এই অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়ে মামলা দায়ের করা হবে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার ক্রমাগত হুমকি ও আগ্রহের মুখে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে দ্বীপরাষ্ট্রটির সরকার। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডরিক নিলসেন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না এবং ডেনমার্কের সঙ্গেই থাকবেন। মঙ্গলবার ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে যে কোনো একটি দেশকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে তারা নিঃসন্দেহে ডেনমার্ককেই বেছে নেবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করাই তাদের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনও বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি নিকটতম মিত্র দেশের কাছ থেকে এ ধরনের চাপ মোকাবিলা করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর আগে গত সোমবারও গ্রিনল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এমন আকাঙ্ক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময়ও গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি বিষয়টি নিয়ে পুনরায় সরব হয়েছেন। তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবেই হোক এই দ্বীপটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। ট্রাম্পের এমন অনড় অবস্থান এবং সাম্প্রতিক হুমকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের এমন আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং ঐক্য নিয়েও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ জনগণ তাদের নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবে ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির মুখেও স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড সরকার যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তাকে ওয়াশিংটনের প্রতি একটি শক্তিশালী প্রত্যাখ্যান ও নিজেদের সার্বভৌমত্বের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মিসর, লেবানন ও জর্ডানের মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বৈশ্বিক চাপ জোরদার করার কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, এই সংগঠনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের এসব শাখা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং তা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সব ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করা হবে। তিনি এই ঘোষণাকে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চলমান প্রচেষ্টার সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। মার্কিন প্রশাসন অভিযোগ করেছে যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের এই শাখাগুলো নিজেদের বৈধ নাগরিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও পর্দার আড়ালে তারা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে সমর্থন জোগায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় বা ট্রেজারি বিভাগ জর্ডান ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে, লেবাননের শাখাটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর লেবাননের শাখাটিকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ বা এফটিও হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই ঘোষণার ফলে সংগঠনগুলোকে যেকোনো ধরনের বস্তুগত সহায়তা প্রদান করা এখন থেকে অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। তাদের আয়ের উৎস বন্ধ করতে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং এফটিও তালিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে লেবাননের এই গোষ্ঠীর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
এদিকে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা সালাহ আবদেল হক যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৯২৮ সালে হাসান আল-বান্নার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবি করে আসছে। মিসরে ২০১২ সালের নির্বাচনে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে জর্ডান ও লেবাননের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লেবাননে ‘আল-জামা আল-ইসলামিয়া’ নামে এই গোষ্ঠীটি পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করে এবং গাজা ইস্যুতে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে জর্ডানে তাদের রাজনৈতিক শাখা ‘ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩১টি আসন লাভ করেছিল। তবে মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়েছে। ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নররা এই সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় মুসলিম সিভিল রাইটস সংস্থা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন এবং তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও সিএআইআর মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে এবং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে।
থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। একটি চলন্ত ট্রেনের ওপর নির্মাণাধীন বিশাল একটি ক্রেন ভেঙে পড়লে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৬) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে নাখন রাতচাসিমা প্রদেশের সিখিও জেলার বান থানন খোট এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দুর্ঘটনার সময় ট্রেনটি ব্যাংকক থেকে উবন রাতচাথানুগামী ছিল। নাখন রাতচাসিমা প্রদেশের পুলিশ সুপার থাচাপোন চিন্নাওং জানান, লাওস সীমান্ত থেকে ব্যাংকক পর্যন্ত একটি উচ্চগতির রেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছিল। সেই কাজের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত একটি বিশাল ক্রেন হঠাৎ করে চলন্ত ট্রেনটির ওপর আছড়ে পড়ে। এতে ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে যায় এবং সংঘর্ষের তীব্রতায় কিছু সময়ের জন্য বগিটিতে আগুন ধরে যায়।
থাইল্যান্ড পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত ২২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এই ঘটনায় আরও ৭৯ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৮ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া বগিটিতে আরও যাত্রী আটকা পড়ে থাকতে পারেন এবং সেখানে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগিগুলো থেকে যাত্রীদের বের করে আনার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তাৎক্ষণিক তদন্ত শুরু করেছে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মিরে (পিওকে) সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে গত বছর শুরু হওয়া বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’ এখনও চলমান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। চলতি বছরের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। জেনারেল দ্বিবেদী ইসলামাবাদকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ভবিষ্যতে পাকিস্তান যদি কোনো ধরণের ‘দুঃসাহস’ দেখানোর চেষ্টা করে, তবে ভারত তা অত্যন্ত কার্যকর ও কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী এমন এক যুদ্ধংদেহি অবস্থায় মোতায়েন ছিল যে পাকিস্তান সামান্যতম কোনো ভুল করলেই সরাসরি স্থল অভিযান বা ইনভেশনের জন্য সৈন্যরা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
এই সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ২২ এপ্রিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের পেহেলগামে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়, যার দায় স্বীকার করে লস্কর-ই-তৈয়বার অনুসারী গোষ্ঠী ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। ওই হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতেই ৭ মে থেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে ভারত। জেনারেল দ্বিবেদী জানান, টানা ৮৮ ঘণ্টা ধরে পরিচালিত এই নিখুঁত অভিযানে পাকিস্তানের অনেক গভীরে আঘাত হানা হয়েছিল এবং এতে শতাধিক সন্ত্রাসীকে নির্মূল করার পাশাপাশি তাঁদের শক্তিশালী অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনী মূলত পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক হুমকির বাগাড়ম্বরকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় সেনাপ্রধান আরও উল্লেখ করেন যে, অপারেশন সিঁদুর ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনার ভিত্তিতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বা ‘ত্রি-সেবা’র এক অনন্য সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত। তাঁর মতে, প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের পরিসর সম্প্রসারণের মাধ্যমেই ভারত জম্মু ও কাশ্মিরের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও গত বছরের ১০ মে উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল, তবে পশ্চিম সীমান্ত এবং কাশ্মিরের বর্তমান পরিস্থিতি এখনও বেশ সংবেদনশীল রয়েছে। জেনারেল দ্বিবেদী তথ্য দেন যে, ২০২৫ সালে মোট ৩১ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই ছিল পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। এছাড়া ‘অপারেশন মহাদেব’-এর মাধ্যমে পেহেলগাম হামলায় সরাসরি জড়িত তিন ঘাতককেও নির্মূল করা হয়েছে বলে তিনি জানান। বর্তমানে কাশ্মিরে সক্রিয় স্থানীয় সন্ত্রাসীর সংখ্যা এক অংকের ঘরে নেমে এসেছে বলে ভারতীয় সেনাবাহিনী দাবি করছে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দিন দিন আরও জোরালো এবং সহিংস হয়ে ওঠার আশঙ্কায় নিজ দেশের নাগরিকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় সোমবার (১২ জানুয়ারি) তেহরানের জন্য নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাস থেকে এক জরুরি ভ্রমণ সতর্কবার্তা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরানের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং যেকোনো সময় ব্যাপক ধরপাকড়, সংঘর্ষ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিক্ষোভের কারণে দেশটির সড়ক যোগাযোগ ও গণপরিবহন ব্যবস্থা বড় ধরণের বাধার মুখে পড়ায় সাধারণ জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা বিদেশি নাগরিকদের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মার্কিন দূতাবাস বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে জানিয়েছে যে, বিদ্যমান অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক অনেক বিমান সংস্থা ইতিমধ্যে আগামী ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ইরানে তাঁদের সকল ফ্লাইট বাতিল অথবা স্থগিত ঘোষণা করেছে। এই অবস্থায় আকাশপথে দেশ ত্যাগের সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিকল্প উপায় বাতলে দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে নাগরিকরা দেরি না করে দ্রুত সড়কপথে প্রতিবেশী দেশ আর্মেনিয়া অথবা তুরস্কে চলে যান। নির্দেশনায় বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরানে যেকোনো সময় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হতে পারে, তাই যোগাযোগের জন্য যেন তাঁরা আগেভাগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে রাখেন।
সতর্কবার্তায় আরও একটি কঠোর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরাসরি কোনো সহায়তার ওপর যেন তাঁরা নির্ভর না করেন। অর্থাৎ, বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন সরাসরি কোনো উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারবে না, ফলে নাগরিকদের নিজ দায়িত্বেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা কোনো কারণে এই মুহূর্তে ইরান ছাড়তে সক্ষম নন, তাঁদের জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁদেরকে নিজ নিজ আবাসস্থলে বা নিরাপদ কোনো ভবনে অবস্থান করার এবং বাইরের কোলাহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আটকে পড়া নাগরিকদের প্রতি দূতাবাস থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে তাঁরা নিজেদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী জরুরিভিত্তিতে মজুত করে রাখেন। এছাড়া যেখানে গণজমায়েত বা আন্দোলন চলছে, সেই সকল এলাকা থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বর্তমানে তেহরানসহ ইরানের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং মার্কিন এই সিদ্ধান্তের পর অন্য দেশগুলোও তাঁদের নাগরিকদের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় আফগান সীমান্তের কাছে এক ভয়াবহ নাশকতার ঘটনায় ছয় পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) পৃথক দুটি স্থানে পুলিশের যানবাহন লক্ষ্য করে এই পৈশাচিক বোমা হামলা চালানো হয়। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম হামলাটি ঘটে ট্যাঙ্ক জেলার গোমাল বাজার সড়কে। সেখানে পুলিশের একটি শক্তিশালী সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে রিমোট কন্ট্রোল চালিত বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলে ঘটনাস্থলেই ছয়জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। একই দিনে লাকি মারওয়াত জেলায় পুলিশের একটি টহল ভ্যান লক্ষ্য করে অন্য একটি হামলা চালানো হলে আরও তিন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।
এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনার পরপরই পুরো প্রদেশে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাকিস্তানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রদেশের পেশোয়ার, বান্নু এবং খাইবার জেলায় বড় ধরণের অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিভাগ (সিটিডি)। এই বিশেষ অভিযানে কমপক্ষে আটজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ বেশ কিছু নাশকতার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দাবি করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।
এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট জঙ্গি সংগঠন এই হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তের দুই পাশে চরম উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত বছরের অক্টোবর থেকেই সীমান্ত রেখা নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে এ ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান আরও অভিযোগ করছে যে, এই বিদ্রোহী সংগঠনটিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত নিয়মিত অর্থ ও রসদ দিয়ে মদত দিচ্ছে। যদিও আফগান তালেবান সরকার এবং ভারত উভয় পক্ষই ইসলামাবাদের এই অভিযোগগুলো শুরু থেকেই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে হামলার শিকার হওয়া এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। লুণ্ঠিত বা ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি চেকপোস্টে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতি এবং অভ্যন্তরীণ জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরণের নৃশংস হামলা কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর মনোবল কমাতেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলে এক ধরণের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করার একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।