পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবুজ সংকেতে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম তৈরি করতে চেয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। তবে ট্রাম্প এতে এখন আর সম্মত নন।
জুলাই মাসের প্রথম দিকে তুরস্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির। সেই বৈঠকে জেলেনস্কি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে সম্মত হয়েছেন। তবে গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ফের যখন জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের, সে সময় সেই প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেন তিনি।
বৃহস্পতিবার মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি অবকাশযাপন কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকে প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহারের কারণ ব্যাখ্যা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এটা একটা বড় পদক্ষেপ, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ক্ষেত্রে। তিনি কিছু প্যাট্রিয়ট পেতে চান, কিছু টমাহকও পেতে চান। একটি রক্ষণাত্মত, অপরটি আক্রমণাত্মক।’
‘মাঝে মাঝে আমাদের সবাইকেই বিচক্ষণতা ও সতর্কতার মাত্রা অনেক বেশি বাড়াতে হয়। এটাও সে রকমই একটি ব্যাপার। আমরা যদিও (ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে) এই নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু (ইউক্রেনকে) এ ধরনের প্রযুক্তি হস্তান্তর করা খুব কঠিন একটি কাজ। যদি আমি কারো সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু ভাবতে চাই না, কিন্তু আপনারা সবাই জানেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন বহু মানুষ রয়েছে, যাদের হাতে এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তি তুলে দিলে একসময় তারা আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে।’
সম্প্রতি ইউক্রেনে দূর, মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার বাড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া; আর রাশিয়ার এসব ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার আগেই আটকে দিয়ে ধ্বংস করার কাজটি সবচেয়ে দক্ষভাবে করতে সক্ষম প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম। অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সিস্টেমগুলো এখনো এত দক্ষ হয়ে ওঠেনি।
রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমই ব্যবহার করে, তবে হামলাকারী ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের জন্য যে পিএসি-৩ নামের বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন, সেগুলোর সংকট দেখা দেয় প্রায়েই। এ কারণে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণভাবে প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম এবং পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কাছে অনুমতি চাইছে।
গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের জন্য ১৫ দফার একটি খসড়া প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এতে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ’ শিরোনামে ১৫ দফা খসড়া নথি প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম কুদস নিউজ।
সংবাদমাধ্যমটি মতে, এই খসড়া গৃহীত হলে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা রূপান্তরের ক্ষেত্রে এটাই হবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনা।
প্রস্তাবিত ১৫টি দফায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার, গাজার প্রশাসন, পুলিশ ব্যবস্থা, পুনর্গঠন, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সংস্কার, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ব্যবস্থাপনা, সামাজিক শান্তি, আর্থিক প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক তদারকির জন্য বিস্তারিত কাঠামোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রতিটি ধাপে অগ্রসর হওয়ার আগে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কমিটি যাচাই করবে যে, আগের ধাপের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে কি না।
নথিতে গাজার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর, ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং পিস কাউন্সিল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের যৌথ তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়ার ১৫টি মূল প্রস্তাব
১. রাজনৈতিক ভিত্তি: ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে এর শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে । এর লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
২. পূর্ববর্তী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন: শার্ম আল-শেখ প্রোটোকলসহ আগের চুক্তিগুলোর অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করে ১৪ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে।
৩. ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন: প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কমিটির যাচাইয়ের পর পরবর্তী ধাপে যাবে।
৪. প্রশাসন হস্তান্তর:
হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন বেসামরিক ও নিরাপত্তা প্রশাসনের সব দায়িত্ব স্বাধীন ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে।
৫. সরকারি প্রতিষ্ঠান: সরকারি প্রতিষ্ঠান চালু থাকবে। আর্থিক ও প্রশাসনিক নিরীক্ষা হবে এবং প্রায় ৪০ কোটি ডলার আর্থিক দায় তিন বছরের মধ্যে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।
৬. এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন, এক অস্ত্র: গাজা পরিচালনায় জাতীয় কমিটিই হবে একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ।
৭. পুলিশ সংস্কার: পুলিশ সদস্যদের যাচাই-বাছাই করে নতুন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পুলিশের অস্ত্র জাতীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণে যাবে।
৮. ভারী অস্ত্র ও সুড়ঙ্গ: ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও সুড়ঙ্গ চিহ্নিত করে নিরাপদ সংরক্ষণে রাখা হবে। এ প্রক্রিয়া ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন হবে। খসড়ায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ফিলিস্তিনি অস্ত্র ইসরায়েল বা অন্য কোনো অ-ফিলিস্তিনি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে না।
৯. ব্যক্তিগত অস্ত্র: ব্যক্তিগত অস্ত্র নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান ও নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা থাকবে জাতীয় কমিটির হাতে।
১০. ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর অস্ত্র: সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অস্ত্র নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জাতীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হবে। এসব সংগঠনের সদস্যদের ভবিষ্যৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
১১. সামাজিক শান্তি চুক্তি: অভ্যন্তরীণ সহিংসতা, প্রতিশোধমূলক হামলা, সশস্ত্র মহড়া ও অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো সামাজিক শান্তি চুক্তিতে সই করবে।
১২. আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী: ইসরায়েলি বাহিনী ও ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝখানে একটি অস্থায়ী বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। তবে এই বাহিনী ফিলিস্তিনি সমাজে পুলিশি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে না।
১৩. ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার: নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে গাজার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত না করার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
১৪. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: গাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির ওপর।
১৫. পুনর্গঠন: ফিলিস্তিনি আইন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সম্মত অর্থায়ন কাঠামোর ভিত্তিতে পিস কাউন্সিল ও ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির যৌথ তত্ত্বাবধানে গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটিতে দেশটির বিমানবাহিনীর একটি এফ-৩৫বি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তবে বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক আগেই জরুরি প্যারাস্যুট নিয়ে পাইলট সফলভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টার কিছুক্ষণ আগে সান দিয়েগোতে অবস্থিত ‘মেরিন ক্রপস এয়ার স্টেশন মিরামার’-এ এই দুর্ঘটনা ঘটে।
মেরিন এয়ারক্রাফট উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এক আসনবিশিষ্ট এফ-৩৫বি লাইটনিং-টু মডেলের যুদ্ধবিমানটি ঘাঁটির রানওয়েতে অবতরণের ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে আগুন ধরে গেলে দ্রুত ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা বেশ কয়েক মাইল দূর থেকেও দেখা যায়।
সামরিক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, পাইলট বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার মুহূর্তেই ইজেক্ট করতে সক্ষম হন। পরে উদ্ধারকারী দল তাকে স্থানীয় একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আঘাতের মাত্রা আশঙ্কাজনক নয় এবং পাইলট বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত ও স্থিতিশীল অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার সময় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের রেকর্ড করা অডিও বার্তায় জরুরি সেবা দলকে জানানো হয়, ‘রানওয়ের কাছাকাছি এফ-৩৫ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। পাইলট সফলভাবে ইজেক্ট করেছেন এবং প্যারাস্যুট সক্রিয় হতে দেখা গেছে।’
দুর্ঘটনার পরপরই বিমানবন্দরে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের ফেনা (ফোম) ও স্প্রে ব্যবহার করে বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সঙ্গে বিমানের আশপাশের ঘাসে ছড়িয়ে পড়া আগুনও দ্রুত নিভিয়ে ফেলা হয়।
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সাধারণত ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড তদন্ত পরিচালনা করলেও, এই সামরিক বিমান দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, ৫০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ এই এফ-৩৫বি লাইটনিং-টু যুদ্ধবিমানকে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধুনিক ও শক্তিশালী ‘স্টেলথ’ (রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম) যুদ্ধবিমান হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিমানটি সাধারণ বিমানের মতো স্বাভাবিক রানওয়ে ব্যবহারের পাশাপাশি হেলিকপ্টারের মতো উল্লম্বভাবে (ভার্টিক্যালি) উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।
প্রতিটি এফ-৩৫বি বিমানের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১০২ মিলিয়ন ডলার)। মার্কিন মেরিন ক্রপস ছাড়াও যুক্তরাজ্য এবং ইতালির বিমানবাহিনী এই বিশেষ মডেলটি পরিচালনা করে থাকে।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনাটি যে মিরামার ঘাঁটিতে ঘটেছে, সেখানে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১৫ হাজার সামরিক কর্মী কর্মরত রয়েছেন।
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করার অভিযোগ তুলেছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার পিয়ংইয়ং দাবি করেছে, ইউরোপজুড়ে সামরিক বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা ন্যাটো হাতে নিয়েছে, তা মূলত জোটটির এক আগ্রাসী সামরিক জোটে পরিণত হওয়ার বাস্তব চিত্র।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিতে (কেসিএনএ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অভিযোগ আনা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটোর পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় নতুন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সংযোগ আরও মজবুত করতে একটি বিস্তৃত জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে নতুন পাইপলাইন তৈরি ও জ্বালানি সংরক্ষণাগার আধুনিকায়ন করা হবে।
পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ন্যাটো তাদের কৌশলগত সামরিক রিজার্ভ নিশ্চিত করতে চায়। মূলত ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও আগ্রাসী যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ।
প্রতিবেদনে কেসিএনএ জানায়, ন্যাটো দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে একই সূত্রে গাঁথার অজুহাত দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নিয়মিতভাবে এই অঞ্চলে সদস্য দেশগুলোর অত্যাধুনিক সামরিক সম্পদ মোতায়েন করছে এবং সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার ওপর শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে কোরিয়া উপদ্বীপের কাছে বিপজ্জনক সামরিক মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।
এছাড়া রিম অব দ্য প্যাসিফিকের (রিমপ্যাক) মতো বৃহৎ বহুজাতিক সামরিক মহড়াগুলোতে ন্যাটো সদস্যদের অংশগ্রহণকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছে পিয়ংইয়ং।
দেশটি সতর্ক করেছে, সামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিশ্বজুড়ে দ্রুত সামরিক অভিযান সহজ করার জন্য নেওয়া এসব পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
তবে ন্যাটোর পক্ষ থেকে সবসময় উত্তর কোরিয়ার এই অভিযোগ খণ্ডন করা হয়েছে। সামরিক জোটটির দাবি, তাদের সব কার্যক্রম এবং সামরিক অবস্থান সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য সব ধরনের বহিরাগত হুমকি প্রতিহত করাই ন্যাটোর মূল লক্ষ্য।
কেসিএনএর ভাষ্য, ন্যাটো শুধু ইউরোপেই নয়, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। জোটটি ইউরোপ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের নিরাপত্তাকে একসূত্রে দেখছে এবং এ অঞ্চলে নিয়মিত কৌশলগত সামরিক সম্পদ মোতায়েন করছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
কোরীয় উপদ্বীপের আশপাশে সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং ‘রিম অব দ্য প্যাসিফিক’ বা রিমপ্যাক মহড়ায় ন্যাটো সদস্যদের অংশগ্রহণকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার ইঙ্গিত বলে দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া।
ইরানে বড় হামলার ছক কষেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে পাল্টা আঘাতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নতুন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়াচ্ছে ইসরায়েল, অন্যদিকে সৌদি আরব সংঘাত দ্রুত কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সময়ে ইরান সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নতুন হামলা চালায়, তবে তারা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। প্রথমে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে এসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্তা পৌঁছে দেন।
তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে জানান, সৌদি আরব মনে করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তাই উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনায় ফেরাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
এর আগের দিনই ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় কার্যকর ফল আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
বৈঠকে ইরানের ওপর সামরিক হামলা আরও জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির বিভিন্ন বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। তবে তিনি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই নেবেন।
দুটি বৈঠকের বিপরীত বার্তা ট্রাম্পের সামনে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক ও সামরিক দ্বিধাকেই স্পষ্ট করেছে। একদিকে যুদ্ধ থামানোর জন্য রিপাবলিকান দলীয় নেতাদের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সংঘাত নতুন নতুন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এখন খুবই কম। তাদের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে ইরান একটি সমঝোতা চুক্তির জন্য ‘অনুরোধ করছে’, বাস্তবে তেহরান তার শর্তে নতি স্বীকারে রাজি হয়নি। এতে ট্রাম্প ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ব্যক্তিগত বৈঠক ও ফোনালাপেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলার হুমকিকে তারা ‘উন্মাদের কাজ’ হিসেবে দেখছেন।
তবে এমন হামলা হলে তার জবাবে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আঘাত হানার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এমন সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে চলাচলকারী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে তারা হামলা চালিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, জাহাজ দুটি ঘোষিত নৌপথ ব্যবহার না করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসুরক্ষার অধীনে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। হামলার পর দুটি ট্যাংকার থেমে যায় এবং আরও চারটি জাহাজ আগের অবস্থানে ফিরে যায়। তবে এই দাবির স্বাধীন যাচাইয়ের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে।
এতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সময়ে এক্সনমোবিল ও শেভরনের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো রেকর্ড মুনাফা করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে যুদ্ধের পরবর্তী কৌশল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা এবং সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসে এক থেকে দুই সপ্তাহব্যাপী ব্যাপক বিমান হামলার একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে।
তবে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করে বলেছেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এ ছাড়া, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমছে। সিএনএনের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনায় সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। অন্যদিকে রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধের পক্ষে রয়েছেন প্রতি তিনজনের মাত্র একজন। সিনেটেও যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে নাকচ হয়েছে।
এদিকে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও পড়ছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সময়ে লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননের কর্মকর্তারা একে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন, চলমান সংঘাতে ইরান বিজয় অর্জন করেছে। তবে এই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, পার্লামেন্ট কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিলে দেওয়া এক বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতির সামনে একটি ইতিবাচক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এ জন্য দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘চলমান সংঘাতে ইরান বিজয়ী হলেও সেই অর্জনকে স্থায়ী ও আরও শক্তিশালী করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি জনগণকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকার আহ্বান জানান।
গালিবাফ আরও বলেন, ‘দেশের দায়িত্বশীলদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে শক্তিশালী করা।’ তার মতে, একটি শক্তিশালী ইরান গঠনের যেকোনো উদ্যোগ এ ভিত্তির ওপরই দাঁড়ানো উচিত।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গালিবাফের এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে তার বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো সামরিক অভিযানের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। তথ্যসূত্র: দ্য ডন
‘যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই মূল্য চুকাতে হবে’
ইরানের দক্ষিণে কেশম দ্বীপে সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই মূল্য চুকাতে হবে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গালিবাফ তার ভার্চুয়াল পেজে লেখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন নতুন নতুন আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজেদের হাত আরও রক্তাক্ত করছে। কেশম দ্বীপের আবাসিক বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা মিনাব ও লামার্দের অপরাধেরই ধারাবাহিকতা।’
ইরানের সংসদের স্পিকার আরও বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে যে চপেটাঘাত তারা খাচ্ছে, তার প্রতিশোধ হিসেবে তারা অপরাধ সংঘটন এবং নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে।’
গালিবাফ জোর দিয়ে বলেছেন, ‘তবে এর জন্য তাদের অবশ্যই মূল্য চুকাতে হবে।’
আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সৌদি আরবে এক সপ্তাহের যৌথ অভিযানে ১৪ হাজার ১৫৪ জন প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২৩ জুলাই থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলা এই অভিযানে আবাসন আইন লঙ্ঘনে ৭ হাজার ১০৩ জন, সীমান্ত নিরাপত্তায় ৩ হাজার ৬৫৪ জন এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনে ৩ হাজার ৩৯৭ জনকে আটক করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেট।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশের চেষ্টাকালে আরও ১ হাজার ৪১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি ইয়েমেন ও ইথিওপিয়ার নাগরিক। একই সাথে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়, পরিবহন বা কাজের সুযোগ দেওয়ার অপরাধে ১৭ জনকেও আটক করা হয়। বর্তমানে ৩০ হাজারেরও বেশি আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে, যার মধ্যে অনেককে কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি ও ডিপোর্ট করার কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করেছে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা, বাসস্থান বা পরিবহন সেবা দিলে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ রিয়াল জরিমানা এবং ব্যবহৃত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে এটি গুরুতর অপরাধ বলে চিহ্নিত করে যেকোনো আইন লঙ্ঘনের তথ্য নিকটস্থ জরুরি নম্বরে দ্রুত জানানোর জন্য দেশটির সাধারণ জনগণকে অনুরোধ করা হয়েছে।
আলজেরিয়ায় যাত্রীবাহী একটি বাস সড়ক থেকে ছিটকে খাদে পড়ে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ সিদ্দিক আইত মেসাউদেন জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে রাজধানী আলজিয়ার্সের পূর্বদিকের উপকূলীয় শহর বুমেরদেসের সন্নিকটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বিদেশী গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে দ্রুতগামী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। সংবাদ পাওয়ার পরপরই বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে জোরদার উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলজেরিয়ায় ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, বাসটি দুমড়েমুচড়ে খাদে পড়ে আছে।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বিলাল বেনসালেম জানান, উদ্ধারকারী দল আসার আগেই তিনি বেশ কয়েকজন আহত যাত্রীকে খাদ থেকে তুলে আনতে সাহায্য করেন। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত বিভীষিকাময়; সেখানে অনেকের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং অনেকে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন। অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী রিয়াদ ফেরকিউই মনে করেন, রাস্তার একটি বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করতে গিয়েই সম্ভবত চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। আলজেরিয়া প্রশাসন দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।
ভারতের দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থী আন্দোলন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার প্রয়াত মায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত অবমাননাকর স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত এক তরুণীর ক্ষমা প্রার্থনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভিডিওটিতে ওই তরুণীকে অত্যন্ত অনুতপ্ত অবস্থায় হাতজোড় করে নিজের ভুলের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। তিনি জানান, পরিস্থিতির চাপে এবং অন্যের প্ররোচনায় পড়ে তিনি ওই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করেছিলেন।
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিও বার্তায় ডোরাকাটা পোশাক পরিহিত ওই তরুণী দাবি করেন যে তিনি আসলে নাবালিকা। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। আমি যা করেছি তা ক্ষমার যোগ্য নয়। এটি আমার প্রথম ও শেষ ভুল। আমি পুরো দেশের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’ তবে পুলিশের দায়ের করা এজাহারে তার বয়স ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রচারমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে যে, এই ভিডিওটির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই ভিডিওটি প্রকাশের কিছু সময় আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি তরুণ প্রজন্মকে শাস্তির বদলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি তার বক্তব্যে উদারতা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, শৈশব বা কৈশোরে ভুল হওয়া স্বাভাবিক এবং সমাজকে উচিত এই সন্তানদের সঠিক পথ দেখানো। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ওদের ক্ষমা করে দিতে চাই এবং সমাজকেও এটি মেনে নেওয়ার অনুরোধ করছি। গালিগালাজ কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’ প্রধানমন্ত্রীর এমন মহানুভব বার্তার পরই ওই তরুণীর ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি সামনে এলো।
উল্লেখ্য, গত ২৩ জুলাই যন্তর মন্তরে ছাত্র বিক্ষোভের সময় বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ওই তরুণীর বিরুদ্ধে সামাজিক শান্তি বিনষ্ট ও মানহানির অভিযোগে প্রথমে নয়ডা এবং পরে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় একটি মামলা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি এবং অভিযুক্তের পক্ষ থেকে অনুশোচনা প্রকাশের পর বিষয়টি এখন নতুন মোড় নিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় নতুন করে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই দুই দেশের অর্থনীতির সুরক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের নতুন ধাক্কা খুব দ্রুতই খাদ্য, পরিবহন ও বিদ্যুতের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
দুই দেশই জ্বালানি তেলের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইএসএসইসি বিজনেস স্কুল এশিয়া-প্যাসিফিকের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক জামুস লিম বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।’
তার ভাষায়, এই দুই দেশের জ্বালানি মজুত সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব খুব দ্রুতই অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়বে।
ইতোমধ্যে তেলের বাজারে সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত জুলাই মাস শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মার্চের পর সবচেয়ে বড় মাসিক উল্লম্ফনের পথে রয়েছে।
গত ১ জুলাই যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ছিল ৭০ দশমিক ১৮ ডলার, শুক্রবার (৩১ জুলাই) এশিয়ার লেনদেনে তা বেড়ে ৮৪ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে অর্থাৎ প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি।
একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় একই হারে বেড়ে ৮১ দশমিক ৮৪ ডলার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের কারণে ঝুঁকি এখন শুধু হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই।
গত বুধবার (২৯ জুলাই) মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার পর সুয়েজ খালসংলগ্ন নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। এই পথটি সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
ঋণের বোঝা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সমর্থিত সংস্কার কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সরকারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আগেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে দুই দেশের মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, ভর্তুকি দেয়া কঠিন হবে এবং সরকারি অর্থনীতিও আরও সংকুচিত হবে।
যদি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পঞ্চম মাসে গড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার বিষয়েও বিবেচনা করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, পাকিস্তান, মিসর, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং উচ্চ ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক উদীয়মান বাজার বিভাগের প্রধান গ্যাব্রিয়েল স্টার্ন এবং জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ইভজেনিয়া স্লেপসোভা বলেন, ‘২০১৯ সালের পর থেকে এসব দেশের ঋণ পরিশোধ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
তার মতে, মোজাম্বিক, পাকিস্তান, কেনিয়া, ঘানা ও তিউনিসিয়া- যাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক কম- সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
স্লেপসোভা বলেন, ‘যদি হরমুজ প্রণালী ২০২৭ সাল পর্যন্ত আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ঋণ গ্রহণের ব্যয় আরও বাড়বে।’
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি।
অধ্যাপক জামুস লিম বলেন, ‘সাধারণত দেশগুলো আইএমএফের ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাংলাদেশকে আইএমএফের সঙ্গে অতিরিক্ত ছাড় বা পুনঃআলোচনায় যেতে হতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে যদি হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছেন, প্রণালীটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি পাকিস্তানকে এখন কূটনৈতিকভাবেও জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
একদিকে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করছে।
সম্প্রতি কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ ইসলামাবাদ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে দুই দেশ পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকরের বিষয়েও আলোচনা করে।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছিল।
ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, ‘পাকিস্তান তুলনামূলক কম খরচে সামরিক প্রশিক্ষণ, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সহায়তা দিতে পারে।’
তবে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বিকল্প হতে পারবে না। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়াতে বা দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তাই তাদের ভূমিকা সীমিত ও বাস্তবমুখীই থাকবে।’
ইন্ডিক রিসার্চার্স ফোরামের কৌশলগত সম্পৃক্ততা ও অংশীদারিত্ব বিভাগের পরিচালক শ্রীনিবাসন বালাকৃষ্ণন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পাকিস্তানের স্বার্থে নয়।’
তার মতে, এতে ইসলামাবাদকে একযোগে ওয়াশিংটন, তেহরান, বেইজিং এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজধানীর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘দেশীয় জ্বালানি সংকট এবং ইরান সীমান্ত ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি পাকিস্তানের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।’
১৯৯৬ থেকে ২০২৬—তিন দশকের ব্যবধানে গঙ্গার জলপ্রবাহ যতটা না বদলেছে, তার চেয়েও আমূল পাল্টে গেছে দুই পাড়ের রাজনৈতিক মানচিত্র ও সম্পর্কের রসায়ন। চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়ন তাই কেবল দুটি রাষ্ট্রের হাইড্রোলজিক্যাল হিসাব-নিকাশে আটকে নেই; এটি রূপ নিয়েছে ঢাকা ও দিল্লির নতুন দিনের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষায়।
একদিকে দিল্লির সংসদীয় কমিটির চুক্তি দ্রুত নবায়নের তাগিদ, অন্যদিকে ঢাকায় পটপরিবর্তন-পরবর্তী বাস্তবতায় ‘জাতীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে’ রেখে কৌশল পুনর্নির্ধারণ। উজান-ভাটির চিরন্তন টানাপোড়েন, জলবায়ু সংকটের থাবা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের এই যুগসন্ধিক্ষণে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এখন আর কেবল একটি পানিবণ্টনের অঙ্ক নয়—এটি ঢাকা ও নয়াদিল্লির নতুন দিনের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হতে চলায়, ‘বিলম্ব না করে’ ঢাকার সঙ্গে আলোচনা শুরু করার জন্য সরকারকে তাগিদ দিয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেসের এমপি শশী থারুরে নেতৃত্বাধীন এই প্যানেল।
চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে এবং এর নবায়ন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এখনো শুরু হয়নি উল্লেখ করে কমিটি সুপারিশ করেছে, সাম্প্রতিক হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত এটি নবায়নের আলোচনা শুরু করা উচিত।
কমিটি আরও সুপারিশ করে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষাকে তাদের কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে যাওয়া।
এর আগে, গত মাসে বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত পানিবণ্টন-সম্পর্কিত বিদ্যমান চুক্তি বা সমঝোতাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ লক্ষ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টনসংক্রান্ত বর্তমান চুক্তি বা সমঝোতাগুলোর পর্যালোচনা করে নতুন চুক্তি সম্পাদনাসহ যৌথ নদী কমিশন, বাংলাদেশকে শক্তিশালীকরণ এবং অববাহিকাভুক্ত দেশগুলো যথা—ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সমন্বয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণে সরকার কাজ করছে।’
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘উজানের দেশগুলোতে আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর অবকাঠামো নির্মাণের ফলে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি অসত্য নয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উজানে পানির লভ্যতা কমে যাচ্ছে।’
শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হচ্ছে না: ভারতের সংসদীয় কমিটিকে মোদি সরকার এরও আগে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পরপরই বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কথা বলেন। ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। বিএনপি সরকার গঠনের পর চুক্তি নবায়নের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রথম দিকের একটি ইস্যু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে অতীতে বাংলাদেশকে প্রায়ই বলা হয়েছে, নদীসংক্রান্ত চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজ্যগুলোর স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমানের আসন্ন সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা এমনভাবে এগোবো, যাতে তা আমাদের জাতীয় স্বার্থ পূরণ করে।’
তবে তিনি নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, অতীত থেকে পরিষ্কারভাবে নতুন শুরু করতে পারব। ভারতকে বুঝতে হবে, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ আজকের বাংলাদেশে আর নেই। আমাদের জোরালো বিজয় সেটাই দেখিয়েছে।’
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে: গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনাটি হবে ঢাকা ও দিল্লির পরিবর্তিত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় ‘স্ট্রেস টেস্ট’। ভারতের জন্য এটি একাধারে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজেকে একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এটি নিজের ভূরাজনৈতিক মর্যাদা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার নতুন লড়াই।
আগামী মাসগুলোতে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন-সম্পর্কিত যৌথ নদী কমিশনের (JRC) বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুধু গঙ্গার পানিবণ্টনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না—বরং তা বার্তা দেবে, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে ঢাকা ও নয়াদিল্লি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় কীভাবে রচনা করতে যাচ্ছে।
লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। গালফ নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যের কৌশলগত এই নৌপথগুলোতে মুক্ত জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ নিয়ে এই জোটের সূচনা করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই জোটে প্রায় ৫০টি দেশকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে রিয়াদ। রুশ বার্তা সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মিসর, সুদান, জিবুতি ও সোমালিয়ার পাশাপাশি তুরস্ক, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বহু দেশকে এতে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানানো হয়। চূড়ান্তভাবে তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস জোটের সনদে স্বাক্ষর করেছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এ জোটে যোগ দেয়নি।
গালফ নিউজ ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোট গঠনের প্রাথমিক বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। উল্লেখ্য, লোহিত সাগরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসপিডেস’ নামের একটি নৌ-নিরাপত্তা মিশন আগেই সক্রিয় থাকায় নতুন এই জোট ঠিক কীভাবে তাদের সাথে সমন্বয় করবে তা এখনো পর্যালোচনাধীন।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। শুধু হুথি বিদ্রোহী প্রতিরোধই নয়, লোহিত সাগরে জলদস্যুতা, অস্ত্র ও পণ্য চোরাচালান দমনে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা হবে। জোটটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু করা এর উদ্দেশ্য নয়। যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, অভিযানগত পরিকল্পনা ও সমন্বিত নৌ-অভিযানের মাধ্যমে এই জোট কার্যক্রম পরিচালনা করবে। জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থিত হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে।
আল মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, জোটটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে এ জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হলে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০-১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা বাব এল-মান্দেব প্রণালী সুরক্ষায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল। উদ্ভূত সংকটের মুখে আন্তর্জাতিক বাজার ও নিজেদের তেল সরবরাহ সচল রাখতে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু টার্মিনাল ব্যবহারের পাশাপাশি এই বহুজাতিক নৌ-প্রতিরক্ষা বলয় গঠনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয় রিয়াদ।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দমনে সমুদ্র এবং স্থলপথ উভয় দিক থেকেই এক বিশাল সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ইয়েমেনি সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এই খবরটি প্রকাশ করেছে। মূলত লোহিত সাগর পথে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানি সচল রাখতে হুথিদের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিতেই রিয়াদ এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো থেকে সৌদি সেনাদের একটি অংশকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা সম্ভাব্য একটি স্থল অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদাব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রিয়াদ একটি বহুজাতিক নৌ-প্রতিরক্ষা জোট গঠনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই জোটে ইতোমধ্যে তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান ও জিবুতিসহ প্রায় ১৪টি দেশ তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্তমানে ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গত ২০ জুলাই তারা সৌদি মালিকানাধীন জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করে। তবে হুথিদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়, তবেই তারা এই পদক্ষেপ থেকে সরে আসবে। তাদের মতে, এই বিরোধ ইরানকেন্দ্রিক নয় বরং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ভবিষ্যতের সাথে সংশ্লিষ্ট। উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সহায়তার জন্য হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সৌদি আরব।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হতে রিয়াদ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়েছে। যদিও ওই অঞ্চলে আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসপিডেস’ নামক একটি নৌ-মিশন টহল দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি যদি লোহিত সাগর পথটিও সৌদি তেলের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়, তবে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদের জ্বালানি রপ্তানির জন্য ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগর পথের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে হুথি ও সৌদি বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়েছে। গত ২৫ জুলাই হুথিরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরগামী তেল পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার দাবি করে। এ ছাড়া সৌদি আরবের বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার জবাবে সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। সম্প্রতি লোহিত সাগরে একটি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব গত এক মাসে চরম উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।