পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করে আসছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কিন্তু ছয় মাসের যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরান ও তার মিত্রদের হামলায় কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিলাসবহুল হোটেলে আগুন লাগার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইনও বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতিতে ইরান ও তার মিত্রদের হামলা এড়াতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজছেন উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা।
তবে সেই উদ্যোগও বাধার মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় সোমবারের নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়। উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ফলে এসব দেশের সামনে নতুন নিরাপত্তা বিকল্প খোঁজা ছাড়া উপায় নেই। কুয়েত ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বাদর আল-সাইফ বলেন, পুরোনো ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন কিছু গড়ে তুলতে হবে এবং বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাহরাইনসহ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা ইরানের তুলনায় কম। গত কয়েক দশকে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে উন্নত অস্ত্র কিনলেও তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো কোনও একক শক্তি নেই। চীন ও রাশিয়াও এসব দেশকে রক্ষায় এখন পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।
আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান উঠলেও সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো উদ্যোগগুলো এখনো পরীক্ষিত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো মার্কিন নিরাপত্তার ছায়াকে সরিয়ে না দিয়ে তার পাশাপাশি নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিমানবন্দর, বন্দর ও পানি শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় মার্কিন সহায়তা ও অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে এসব হামলা দেশগেুলোকে অস্থিতিশীল অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তাদের ভাবমূর্তি নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে তারা। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আল-বুসাইদি উপসাগরীয় দেশগুলো, ইরান ও ইরাককে নিয়ে বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারও ধীরে ধীরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
এক সম্মেলনে আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনোয়ার গার্গাশ বলেন, ইরান তাদের প্রতিবেশী এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ খুঁজতেই হবে। ভৌগোলিক বাস্তবতা তাদের সামনে এ ছাড়া আর কোনও বিকল্প রাখে না।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সূচি এখনো চূড়ান্ত নয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আগামী বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাই ওই সভা পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি এখতিয়ার অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন একটি বড় আয়োজন। এ ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবদের অংশগ্রহণে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হবে। সেখানে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসির সম্ভাব্য সূচি প্রকাশ এবং তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলের মন্তব্যের পর নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ইসি সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরের মাঝামাঝি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সংবাদ ব্রিফিংয়ের মূল বিষয় ছিল ঢাকা মহানগরীতে চলমান ও নির্ধারিত মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য নগরবাসীকে সর্বোচ্চ স্বস্তি দেওয়া, জনদুর্ভোগ কমানো এবং জনস্বার্থে সময় ও অর্থের অপচয় রোধ করা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন সড়কে একাধিক সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে দুর্ভোগ বাড়ে। তাই আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে একই সময়ে ইউটিলিটি শিফটিংসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত ও সুচারুভাবে তদারকির জন্য এমআরটি, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, সড়ক বিভাগ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডেসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য নির্দিষ্ট ‘ফোকাল পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রতি ১৫ দিন পরপর উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনে কর্মকর্তা পর্যায়ের সাব-কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতের নয়াদিল্লিতে সদ্য অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে একটি ছিল দ্বিপক্ষীয় সফরের, আর অন্যটি বঙ্গোপসাগরীয় বহু-খাতভিত্তিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগের (বিমসটেক) সভাপতি হিসেবে। মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
সদ্য অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, এ নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। পরবর্তীতে তিনি বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও আমন্ত্রিত হন। ফলে তিনি দুটি পৃথক আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন; একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের এবং অন্যটি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের জন্য।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের একটি ব্রিফিং অনুযায়ী, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশকে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে এই শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, শীর্ষ সম্মেলনে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এককভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এই বক্তব্যের পরই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন যে, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেক প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে রণধীর জয়সওয়ালের মন্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে, দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণটি এখনো বহাল রয়েছে। ভারত গত ফেব্রুয়ারি মাসেই তাকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের বিভক্তির দাবিতে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী ফার্স্ট মিনিস্টাররা আনুষ্ঠানিকভাবে একজোট হওয়ায় নিজের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম।
এই চরমপত্রটি (আল্টিমেটাম) বার্নহাম এবং তার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এজেন্ডার জন্য এক বড় ধাক্কা। তার এই নীতি তিনটি দেশে স্বশাসনের দাবিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, যেখানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশেই স্বাধীনতাকামী ফার্স্ট মিনিস্টাররা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
গত সোমবার সকালে কার্ডিফে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টাররা—এসএনপি নেতা জন সুইনি, প্লেইড কাইম্রু নেতা রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং সিন ফেইন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল ও’নিল—একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই তিন নেতা ঘোষণা দেন, বার্নহামই হবেন যুক্তরাজ্যে শেষ প্রধানমন্ত্রী। তিন ফার্স্ট মিনিস্টারের মধ্যকার এই যৌথ চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে’ এবং ঘোষণা করা হয়েছে, ‘সাংবিধানিক পরিবর্তন আসছে’। এর মাধ্যমে স্বাধীনতার গণভোটের অনুমতি দেওয়ার জন্য ডাউনিং স্ট্রিটের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হলো।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার সুইনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অবশ্যই একটি স্বাধীনতা গণভোট আয়োজন করতে হবে।’ তিনি দাবি করেন, আবারও ভোটগ্রহণ হলে স্কটল্যান্ডের জনগণ ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষেই রায় দেবে। তিনি ঘোষণা করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বার্নহামই হবেন সমগ্র যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বদানকারী চূড়ান্ত প্রধানমন্ত্রী। কারণ স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে কেবল ‘বাধার’ মুখেই পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এসএনপি নেতা বলেন, ‘স্কটল্যান্ডের মানুষকে যদি গণভোটে স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা সেই পথই বেছে নেবে। কারণ জনমত জরিপের সব তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এটিই স্কটল্যান্ডের মানুষের পছন্দ।’ এই দলীয় নেতারা নিজ নিজ সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং স্ব স্ব দলীয় প্রধান হিসেবে বৈঠকে মিলিত হয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্বের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।
আইরিশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও সিন ফেইন প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডের সাথে একাত্ম হয়ে দলটি সরকারকে ‘সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেওয়া, পরিকল্পনা করা এবং তা সহজতর করার’ আহ্বান জানিয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই দ্বীপজুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো অঞ্চলজুড়ে মানুষ এমন সব প্রথম মন্ত্রী পাচ্ছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে, যারা প্রত্যেকেই যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এতে আরও বলা হয়, পুরো অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে যারা দেখছেন, তাদের জন্য এর চেয়ে স্পষ্ট সংকেত আর হতে পারে না যে, ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষ হয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, এর চেয়েও ভালো একটি পথ আছে, সমান মর্যাদায় জাতিগুলো একসাথে কাজ করবে, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাধারণ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আমাদের আন্দোলনের পেছনে জনসমর্থন রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, সাংবিধানিক পরিবর্তন আসছেই।
তাই আমরা আমাদের দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে একসাথে কাজ করলে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। নেতারা আরও বলেন, ‘আমাদের জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। কোনো ওয়েস্টমিনস্টার সরকারের এই অধিকার নেই যে, তারা গণতন্ত্রকে আটকে দেবে কিংবা জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে—এই মূলনীতিকে ক্ষুণ্ণ করবে।
তাদের মতে, আমরা স্বীকার করি যে, আমাদের দলগুলোর বিভিন্ন সাংবিধানিক অবস্থান রয়েছে এবং প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব উপায়ে এবং নিজস্ব সময়ে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। গ্রীষ্মের আগে স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে বার্নহাম তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার করে তুলেছিলেন, যার মধ্যে একটি পর্যটন কর চালু করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘হুমকি ও পদক্ষেপের’ কারণে বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে, গণতান্ত্রিক সূচকে বাংলাদেশ ও নেপালসহ কিছু দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টকহোমভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স (ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া) জানিয়েছে—বিশ্বজুড়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ অন্তত গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তঃসরকারি এই সংস্থার বার্ষিক ‘গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি’ প্রতিবেদনকে এ ধরনের সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে ১৭৪টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ১৯৭৫ সাল থেকে দেশগুলোর গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক অবনতির মাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এটি একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে চলমান একটি বড় প্রবণতার অংশ। ২০২৫ সাল ছিল টানা ১১তম বছর, যখন গণতান্ত্রিক অগ্রগতির চেয়ে অবনতি হওয়া দেশের সংখ্যা বেশি ছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড শুরু হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক অবনতির ধারা।
প্রতিবেদনের লেখকরা বলেন, ‘২০২৫ সালে গণতন্ত্রের জন্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং এর অবক্ষয় ঠেকানোর কঠিন বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং একই সঙ্গে তা আরও জটিল হয়েছে।’ তারা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত নির্বাহী শাখায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন এবং ব্যক্তিগত কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ ও তার কথিত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার কাজে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। এতে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।’
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার মহাসচিব কেভিন কাসাস-জামোরা সতর্ক করে বলেছেন, গণতন্ত্রের অবনতি হলে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণার মূল বার্তা হলো, যেকোনো দেশের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে গণতন্ত্রে বিনিয়োগ থাকা উচিত। গণতন্ত্রের মানের অবনতি এবং সংঘাত বৃদ্ধির মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, নীতিনির্ধারণ কিংবা জনপরিসরের বিতর্কে তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।’
সুইডেনের আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পৃথক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের তথ্যেও সংঘাত বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের তথ্যভাণ্ডার ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু। সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংঘাতজনিত সহিংসতা ছিল সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের সংখ্যাও ছিল অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি।
তবে ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যেখানে বর্ণবাদবিরোধী কৌশল এবং শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে।
সিরিয়াতেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে দমনমূলক শাসক বাশার আল-আসাদের স্বৈরশাসনের পতন হয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া গণবিক্ষোভ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ও অর্থবহ সংস্কার করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।
কাসাস-জামোরা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাপ্রবাহ অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করেছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’ করা দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটি তখন বলেছিল, ২০১৯ সাল থেকেই দেশটিতে গণতন্ত্রের ‘দৃশ্যমান অবনতি’ শুরু হয়েছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গত ৫০ বছরের গণতান্ত্রিক সূচকের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর মূল্যায়ন করে। এরপর দেশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: গণতান্ত্রিক দেশ, ‘হাইব্রিড’ সরকার এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন। বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে গণতন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র হিসেবে আইনের শাসনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূল্যায়ন করা দেশগুলোর মধ্যে ৭১টি, অর্থাৎ ৪১ শতাংশ দেশ, আইনের শাসনের ক্ষেত্রে নিম্নমানের অবস্থানে ছিল। একই সঙ্গে এই ক্ষেত্রের অবনতির গতিও ছিল দ্রুত। মোট ২৯টি দেশে আইনের শাসনের সূচকে অবনতি হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) মহাপরিদর্শক কার্যালয়। গত সোমবার প্রকাশিত কংগ্রেসে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পর্যাপ্ত অস্ত্রভাণ্ডার’ থাকার দাবির সঙ্গে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র (ওইইএফ) আনুমানিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনেই খরচ হয়েছে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অপারেশন এপিক ফিউরিতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে কৌশলগত মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং পুনরায় সরবরাহ ব্যবস্থায় শিল্প খাতের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ‘ইরানের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা ধ্বংস করা’।
গোলাবারুদের ঘাটতি মোকাবিলায় পেন্টাগন অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করা, উৎপাদনের সময় কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও নির্বাচিত গোলাবারুদের মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য সময় প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইউক্রেন ও তাইওয়ানের মতো যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের জরুরি ভিত্তিতে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন, অন্যদিকে চীনের চাপ মোকাবিলায় তাইওয়ান মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
যদিও ট্রাম্প বারবার অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘প্রায় সীমাহীন’ গোলাবারুদ রয়েছে। গত সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উন্নত ও আধুনিক অস্ত্র উৎপাদন করছে।
তবে এর আগে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দূরপাল্লার নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর সংকট ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলকে প্রভাবিত করেছে। এমনকি মার্কিন বাহিনী তাদের থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ মজুত ব্যবহার করে ফেলেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেন্টকম জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এত বড় পরিসরের অভিযান আর চালানো হয়নি।
প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতিরও তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সংঘাতে চারটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, একটি এফ-৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সাতটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সর্বোচ্চ ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান লজিস্টিকস ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না এবং ব্যয় কে বহন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত ৩০ জুন পর্যন্ত অপারেশন এপিক ফিউরিতে সাতজন মার্কিন সেনা সদস্য যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধবহির্ভূত ঘটনায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আহত হয়েছেন ৪১৭ জন সেনাসদস্য।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চালানোর অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোর সামনে থাকা ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একসঙ্গে কাজ করছে।
সোমবার তুরস্কের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সামসুনে তরুণদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
এরদোয়ান বলেন, গত মাসে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা মুসলিম বিশ্বের প্রতি একটি বার্তা দিতে চাই। ইতিবাচক কিছু অগ্রগতি হচ্ছে।
মুসলিম দেশগুলোর সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চুক্তিটিকে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা। এরদোয়ান বলেন, মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলোর দিকে বড় শক্তিগুলোরও জরুরি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। মুসলিম বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুরস্ক নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
এরদোয়ান বলেন, মুসলিম বিশ্বের সামনে থাকা সমস্যাগুলো যত দ্রুত সম্ভব কাটিয়ে উঠতে হবে—তুরস্ক এটাই বলছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় তুরস্ক এই অঞ্চলের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিতে পারি না। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে তুরস্ক।
বক্তব্যে গত জুলাইয়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে এরদোয়ান জানান, সম্মেলন উপলক্ষে আগত বিশ্বনেতাদের তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা শিল্প করপোরেশনের তৈরি আধুনিক অস্ত্র উপহার দেওয়া হয়েছিল, যা নেতারা বেশ পছন্দ করেছেন।
পাশাপাশি, তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আন্তালিয়ায় আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ৩১) আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ইরান। হামলার জন্য ইরানকে ‘সম্ভবত’ দায়ী বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পরই পাল্টা অবস্থান জানাল তেহরান।
তেহরানে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং উত্তেজনার মধ্যে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে মিথ্যা অভিযোগ করে চলেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাপ্রবাহে ইরানের সম্পৃক্ততা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের করা দাবির বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই এবং তা দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে।’
মূলত, গত শুক্রবার সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন একাধিক ড্রোন হামলার শিকার হয়। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূলে তেল পরিবহন করে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনগুলো ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। হামলায় কয়েকজন আহত হন এবং পাইপলাইনের অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় রিয়াদ।
এদিকে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, এর পেছনে ইরানের হাত থাকার ‘সম্ভাবনা’ রয়েছে। গত শনিবার আয়ারল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরান হামলার জন্য দায়ী কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, সম্ভবত তারাই দায়ী।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ জানিয়েছে, তারা হামলা চালায়নি। একই সঙ্গে সংগঠনটি বলেছে, কোনো হামলা চালালে সেটি তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকার করতে দ্বিধা করত না।
এদিকে সৌদি আরবের দাবি অনুযায়ী ড্রোনগুলো ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় মায়সান প্রদেশ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এরপরই ইরাকি প্রধানমন্ত্রী ওই অঞ্চলের সামরিক কমান্ডের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন এবং তদন্তের নির্দেশ দেন। কয়েকটি সীমান্ত ক্রসিংও বন্ধ করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব আপাতত ইরাকের পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। রিয়াদ জানিয়েছে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে বাগদাদকে হামলার তদন্ত ও নিজেদের ভূখণ্ড থেকে এ ধরনের হামলা ঠেকানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা সীমিত রয়েছে। গত ৫ জুন থেকে অঞ্চলটিতে মোবাইল ডেটা ও ব্রডব্যান্ড সেবা বন্ধ। নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নেয়। বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর কয়েক দফায় নির্বাচন হলেও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি চালু হয়নি।
স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নেটব্লকস জানিয়েছে, ৫ জুন থেকে অঞ্চলটিতে আংশিক ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পরও এর প্রভাব কাটেনি।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অ্যাপেও প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও এর প্রভাব পড়েছে। এমনকি প্রবেশিকা পরীক্ষাও স্থগিত করেছে সরকার।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে উত্তেজনা শুরু হয়। ২৭ জুলাই সেখানে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। এর আগে ৫ জুন কর্তৃপক্ষ জাম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেকেজেএএসি) নিষিদ্ধ করে।
এই সংগঠনটি ছিল বিভিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠীর একটি জোট। আইনসভায় ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে পাকিস্তানে বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলসহ বিভিন্ন নির্বাচনী সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল তারা।
সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার দিনই ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। পরে ২৭ জুলাই তা প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই সংঘর্ষে ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত সদস্যও রয়েছেন। তবে এসব মৃত্যুর সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে নির্বাচন তিন দফায় অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ধাপের ভোট হয় ১০ আগস্ট।
নিরাপত্তাজনিত কারণে বিক্ষোভের কিছু প্রধান এলাকায় ভোট গ্রহণ করা যায়নি। তবে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটির অন্য এলাকাগুলোর নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আজ বুধবার চীন সফরে যাচ্ছেন। বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার রাজধানী বেইজিংয়ে ওয়াং ই ও আরাগচির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই এ সফর হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধ থামাতে চীন মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন বৈঠকে যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং সংঘাত বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর আগে গত জুলাইয়ে ওয়াং ই ও আরাগচির মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে তাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে দেখা যায়।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা চীন। ফলে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অচলাবস্থা এবং মার্কিন নৌঅবরোধের প্রভাবে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চীনা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই আরাগচির চীন সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও বিশ্ব অর্থনীতির সংকট নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
‘ইরানের শর্ত পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়’
ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা পরস্পরবিরোধী বার্তায় বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘‘আলোচনা হবে না’’ থেকে ‘‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত’’—এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তায় কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তেল ও প্রণালীগুলোকে ঘিরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সামনে যা আসছে, তা ঠেকাতে পারবে না।’ রেজাই জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা হবে না, এটাই চূড়ান্ত।’
তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে জল্পনা চলছে। তবে তেহরানের অবস্থান থেকে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে যে, নিজেদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী নয়।
হামলা অব্যাহত রেখেছে ইয়েমেনের হুতিরা। সৌদি আরবের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা হুতিরা গত সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন প্রায় বন্ধ বলা চলে। এ রকম প্রেক্ষাপটে বাব এল-মান্দেব এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব এল-মান্দেব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুতিরা রিয়াদের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করেছে।
হুতিরা সৌদি আরবের দিকে কয়েক ডজন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, এর জেরে সৌদি আরব নিজ দেশের খামিস মুশাইত ও আবহায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সতর্কতা জারি করে। খামিস মুশাইতের এক বাসিন্দা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, তিনি ‘তীব্র বিস্ফোরণের’ শব্দ শোনেছেন। বিস্ফোরণের পর আগুন অনেকক্ষণ ধরে জ্বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা একেবারেই ঘুমাতে পারিনি।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। তেহরান তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়েও সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের পেছনে ইরানের ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হুতিদের নতুন করে চালানো হামলার ফলে আবারও তেলের দাম বেড়ে গেছে। বর্তমানে সুয়েজ খাল হয়ে এবং আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াই সৌদি তেল এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে পৌঁছানোর একমাত্র নিরাপদ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ দিনে ৩০০ হামলা
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ প্রায় চার বছর স্থবির অবস্থায় ছিল। তবে জুলাইয়ে ইরানি একটি ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে রাজধানী সানায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর যুদ্ধ আবার শুরু হয়। ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সর্বশেষ সংঘাতে পরিণত হয়েছে ইয়েমেন।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গত সোমবার জানান, তাদের সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটির যুদ্ধবিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার, রানওয়ে এবং গোলাবারুদের গুদাম। রিয়াদের চালানো বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সারি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব গত পাঁচ দিনে ইয়েমেনজুড়ে ‘৩০০টিরও বেশি বিমান হামলা’ চালিয়েছে।
গত রোববার ইয়েমেন সরকারের বাহিনী জানায়, তারা দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুতি যোদ্ধাদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে এবং বিমান হামলাও চালিয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবাকে তারা জানায়, এসব অভিযানে অন্তত ১০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুদ্ধটিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
গত সোমবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জেদ্দায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, বৈঠকে ‘অঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, জরুরি সমন্বয় বৈঠকে অংশ নিতে মার্কিন এই অ্যাডমিরাল সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।
এদিকে গত রোববার জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের কারণে আরববিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র এক দিনের মধ্যে এই সংখ্যা ১০ হাজার বেড়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সমাপ্তির পর দেশটির তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে ওয়াশিংটন।’ সেই সঙ্গে বর্তমান সময়ের মতো ইরানের চারপাশে নিজেদের প্রহরা জারি রাখার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। রোববার আয়ারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক গলফ টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করেন ট্রাম্প।
সেখানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ভেনিজুয়েলার মতো ইরানের তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে শেষ পর্যন্ত (ইরান থেকে) বেরিয়ে আসব; কিন্তু যদি নিই তাহলে (ইরানে) আমাদের উপস্থিতি থাকবে।’
এদিকে ইরান ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে ওমানে যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করেছে তেহরান। এমন একটি সময় এ ঘটনা ঘটল, যখন ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। তবে আলোচনা স্থগিতের কারণ হিসেবে ইরান বলছে, সৌদি আরবের অনুরোধে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর আগে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তারা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেবে এবং সেখানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিয়ে ওমানের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছে, তা তুলে ধরবে। ইরান যুদ্ধের আগে ওই প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পারাপার হতো।
সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলের জাবাল সাইদ প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১১ কোটি (১১০ মিলিয়ন) মেট্রিক টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিক এবং উচ্চমূল্যের বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ) খনিজের বিশাল মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অস্ট্রিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনের ৭০তম নিয়মিত অধিবেশনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক গভীর ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া এই আকরিক খণ্ডে ভারী উপাদানের উচ্চ ঘনত্বের বিরল খনিজের পাশাপাশি আশাব্যঞ্জক মাত্রার ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
মদিনার এই আবিষ্কারের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের বেসামরিক পারমাণবিক ও খনিজ কৌশলগত অংশীদারত্ব নতুন গতি পেয়েছে। বিশেষ করে গত ২২ জুলাই মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও সৌদি জ্বালানিমন্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিটি কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের পর দ্বিপক্ষীয় সংবেদনশীল খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান এমপি ম্যাটেরিয়ালসের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘মাআদেন’। এই কৌশলগত রূপরেখার আওতায় সৌদিতে একটি নতুন বিরল ধাতু প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপনে মোট ব্যয়ের ৪৯ শতাংশ অর্থায়নে সম্মতি দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন), যার নিয়ন্ত্রণমূলক ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকবে সৌদির মাআদেনের হাতে।
লোহিত সাগর তীরবর্তী জেদ্দা নগরী থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাবাল সাইদ প্রকল্পটি খনিজ মজুতের আয়তনের দিক থেকে বৈশ্বিকভাবে চতুর্থ বৃহত্তম স্থানে রয়েছে বলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে। সিএসআইএসের বিশদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই খনিতে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামের মতো প্রায় ৫ লাখ ৫২ হাজার টন ভারী বিরল খনিজ এবং নিওডিমিয়াম ও প্রেসিওডিমিয়ামের মতো ৩ লাখ ৫৫ হাজার টন হালকা বিরল ধাতুর মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে প্রায় ৩১ হাজার টন ইউরেনিয়ামের মজুত নিশ্চিত হওয়ায় সৌদি আরব যেমন নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি চক্র গড়ে তোলার পথে এগিয়ে গেছে, তেমনি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে এসব অতিগুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান রপ্তানিরও বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানিয়েছে, ধারাবাহিক অনুসন্ধানের ফলে সৌদি আরবে আবিষ্কৃত সামগ্রিক বিরল খনিজ সম্পদের বাজারমূল্য ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৮ সালের মূল্যায়নের চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি সৌদি ভূতাত্ত্বিক জরিপের প্রাথমিক গবেষণায় উন্নত অনুসন্ধান পর্যায়ে থাকা আরও দুটি এলাকায় প্রায় ৬৪৪ মিলিয়ন টন খনিজ সম্পদের উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তিন শহর খামিস মুশাইত, আভা এবং তায়েফে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী। সোমবার দিবাগত রাতের এই আকস্মিক আক্রমণে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি সাতটি বসতবাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামলার ঘটনার পরপরই মঙ্গলবার ভোর থেকে আভা, জেদ্দা, জাজান, তায়েফ, ইয়ানবু ও আলউলাসহ সৌদি আরবের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক শহরে সর্বোচ্চ ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা (রেড অ্যালার্ট) জারি করেছে দেশটির সরকার।
হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে সৌদি-ইয়েমেনি সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, হুথিরা সুপরিকল্পিতভাবে নিরীহ বেসামরিক নাগরিক ও লোকালয়ের অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব প্রাণঘাতী আক্রমণ পরিচালনা করছে, যা তাদের সহিংস চরিত্রের স্পষ্ট প্রমাণ। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সামরিক জোট সর্বোচ্চ দৃঢ়তার সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ড, সাধারণ মানুষ এবং বেসামরিক সম্পদ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হুথিদের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার না করা হলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, গত রবিবার ইয়েমেনের অভ্যন্তরে হুথি সামরিক স্থাপনায় সৌদি বিমানবাহিনীর ৭০টি বিমান অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবেই এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
বিগত আগস্টের শেষদিক থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে হুথি গোষ্ঠীর সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রায় রূপ নেয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে গত ১১ সেপ্টেম্বর লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী কৌশলগত বাব এল মান্দেব প্রণালি হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে রিয়াদ; কারণ এই জলপথ দিয়েই সৌদি আরব তাদের সিংহভাগ জ্বালানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাত। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে এক শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং ইয়েমেনি সেনাবাহিনীও রাজধানী সানামুখী অভিযান শুরু করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমান হামলাগুলো এখন পর্যন্ত মূলত সম্মুখসারিতে সরকারি বাহিনীর সহায়তায় সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং সানাসহ হুথিদের কেন্দ্রীয় দুর্গে সরাসরি কোনো আক্রমণ চালানো হয়নি।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং ২০১৫ সালে হুথিদের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সংঘাত চলে আসছে। তৎকালীন সরকারপ্রধানের নির্বাসনের পর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বাসনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে রিয়াদ। বর্তমানে ইয়েমেনের অর্ধেক ভূখণ্ড হুথি যোদ্ধাদের এবং বাকি অংশ আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা সাম্প্রতিক এই সংঘাতের জেরে আবারও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।