পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল। তার মতে, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ইরানকে সরাসরি সহায়তা করছে রাশিয়া। ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ জোটের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই অভিযোগ তোলেন। আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, ওয়াডেফুলের এই মন্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেন আগ্রাসন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। পুতিন আশা করছেন যে বিশ্বের নজর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ থাকলে ইউক্রেনে তার সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা ও বাধা কমে আসবে। তবে ওয়াডেফুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুতিনের এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না।
এই সংকট নিরসনে জার্মানি সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াডেফুল জানিয়েছেন যে, তিনি ইতিমধেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিওর সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং জার্মানির অনড় অবস্থান তুলে ধরেছেন। জার্মানি কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং সংঘাত পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যেকোনো কার্যকর ভূমিকা পালনে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
পরিশেষে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউক্রেন সংকট এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। একটির সমাধান ছাড়া অন্যটির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করে দেশটির কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি জনমনে 'বালেন শাহ' নামেই সমধিক পরিচিত। শুক্রবার (২৭ মার্চ) নেপালের প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে জানা গেছে, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত তার দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' (আরএসপি) গত ৫ মার্চের নির্বাচনে পার্লামেন্টের ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বালেন শাহ তার চিরচেনা নিজস্ব শৈলী বজায় রেখেছিলেন। প্রথাগত নেপালি টুপি ও সানগ্লাস পরে তিনি যখন শপথ নিতে আসেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কাঠমান্ডুর সাবেক এই মেয়র নেপালের দক্ষিণ সমতলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে প্রথম 'মাধেসি' প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক একদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের গাওয়া 'জয় মহাকালী' শিরোনামের একটি র্যাপ গান প্রকাশের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীকে ঐক্যের বার্তা দেন। ইউটিউবে মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়া সেই গানে তিনি নেপালের প্রতিটি ঘরে হাসি ও সুখ পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
বালেন শাহের এই বিজয় নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯০ সাল থেকে দেশটিতে ৩২টি সরকার দায়িত্ব নিলেও কোনোটিই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো তরুণ নেতৃত্বের জোয়ারে ধরাশায়ী হয়েছে। তবে নতুন এই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও পাহাড়সম। দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রতিদিন কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়া দেড় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে বালেন শাহের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। বালেন্দ্র শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীন তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা নেপালের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় নতুন সরকারের পাশে থাকবে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বালেন শাহ নেপালকে উন্নয়নের পথে কতটা এগিয়ে নিতে পারেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক পর্যায়ে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনই নির্ধারণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি করোনা মহামারীর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মস্কোতে ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।
পুতিনের মতে, বর্তমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি (হাইড্রোকার্বন), ধাতু এবং সার উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে, যা বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বৈঠকে তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতিকে করোনা মহামারীর সঙ্গে তুলনা করছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মহামারী যেমন বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের গতি মন্থর করে দিয়েছিল, তেমনি চলমান সংঘাতও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একই ধরনের স্থবিরতা তৈরি করতে পারে।
সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘এই মুহূর্তে এর সঠিক পরিণতি অনুমান করা খুবই কঠিন। এমনকি যারা সরাসরি এই সংঘাতের সাথে জড়িত, তারাও সম্ভবত বুঝতে পারছেন না শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে।’
চলমান সংঘাতের মধ্যেই জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে অতিরিক্ত শত শত কোটি ডলার আয় করছে ইরান। হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে সক্ষম একমাত্র বড় রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে ইরানি তেলের চাহিদা ও দাম—দুটোই বেড়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান দুইভাবে লাভবান হচ্ছে। একদিকে প্রধান ক্রেতা চীনের কাছে খুব কম ছাড়ে তেল বিক্রি করছে তারা, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হলেও ইরানের তেল রপ্তানি আগের মতোই প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলে স্থির রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খারগ দ্বীপের টার্মিনালে নিয়মিত বিশাল ট্যাংকার নোঙর করছে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগর পেরিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম আরও জোরদার হয়েছে।
অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি যেখানে কার্যত বাধাগ্রস্ত, সেখানে ইরান ঠিক বিপরীত পরিস্থিতিতে রয়েছে। এমনকি বাজার স্থিতিশীল রাখতে ওয়াশিংটন সমুদ্রপথে থাকা ইরানি তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যা তেহরানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করেছে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক রিচার্ড নেফিউ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ইরানকে তেল বিক্রির জন্য তোয়াজ করছে। অথচ ইরানি তেল বিক্রি বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল।
ট্যাংকারট্র্যাকারস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইরান দৈনিক গড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের তেল বিক্রি করছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এ আয় ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় ইরানি তেলের মূল্য ব্যবধান এখন মাত্র ২ ডলার ১০ সেন্টে নেমে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই ব্যবধান ১০ ডলারেরও বেশি ছিল। বাড়তি এই আয় ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সামরিক সক্ষমতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যখন উৎপাদন কমানো বা বিকল্প রুট খুঁজতে ব্যস্ত, তখন ইরান নির্বিঘ্নে খারগ দ্বীপ ও জাস্ক টার্মিনাল ব্যবহার করে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে। জাস্ক টার্মিনালটি হরমুজ প্রণালির বাইরে হওয়ায় অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি প্রণালি অতিক্রম করা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আদায় করছে তেহরান।
এদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো বড় ধরনের হামলা থেকে রক্ষা পেলেও কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাতের তেল-গ্যাসক্ষেত্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালায় ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ইরানের জ্বালানি খাতে হামলার হুমকি দিলেও পরে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে অবস্থান কিছুটা নরম করেন। তবে ইরান কোনো আলোচনার বিষয় অস্বীকার করে আক্রমণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
সুত্র- এনডিটিভি
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাধারণ নাগরিকদের মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আশপাশের এলাকা দ্রুত ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ বলেছে, ‘আমরা আপনাদের জোরাল পরামর্শ দিচ্ছি যে যেখানে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেসব এলাকা আপনারা অবিলম্বে ত্যাগ করুন, যাতে আপনাদের কোনো ক্ষতি না হয়।’ একই বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মার্কিন সেনাদের ‘যেখানেই পাওয়া যাবে’, সেখানেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা আইআরজিসির ‘পবিত্র দায়িত্ব।’
এদিকে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতজুড়ে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। শুক্রবার সকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তেহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে তারা আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি ইয়াজদে সামুদ্রিক মাইন তৈরির একটি স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের দিকেও পাল্টা হামলা চলতে থাকে। উপকূলীয় শহর নেতানিয়ার আকাশে রকেটের ধোঁয়ার রেখা দেখা গেছে বিভিন্ন ছবিতে। লেবাননের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতেও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘শত্রুপক্ষের’ ড্রোন হামলায় ‘জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতি’ হলেও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরবও একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সূত্র: আলজাজিরা
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) নেতা বালেন্দ্র শাহ। প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল শুক্রবার শীতল নিবাসে প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাধেসি সম্প্রদায়ের কোনো নেতা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
পেশাগতভাবে র্যাপার ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন্দ্র শাহ ২০২২ সালে কাঠমান্ডু সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করে আলোচনায় আসেন। সে নির্বাচনে তিনি প্রচলিত বড় দলগুলোর প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে হারিয়ে চমক দেখান।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মেয়রের পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি আরএসপিতে যোগ দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে ঝাপা-৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করেন, যা ওই আসনে তাঁর শক্ত অবস্থান ভেঙে দেয়।
শপথ নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ জন মন্ত্রীকে দায়িত্বভার অর্পণ করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আরএসপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. স্বর্নিম ওয়াগলে। সুদান গুরুংকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি পান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন শিশির কানাল।
সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় পেয়েছেন খড়কা রাজ (গণেশ) পৌডেল এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দীপক সাহকে। শিক্ষা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন শস্মিত পোখরেল। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিক্রম তিমিলসিনা। কেন্দ্রীয় ও ভূমি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সাবেক সাংবাদিক প্রতিভা রাওয়াল। শক্তি ও সেচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ।
কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন গীতা চৌধুরী। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সবিতা গৌতম। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সিতা বদি এবং গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সুনীল লামসাল। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিশা মেহতাকে।
উল্লেখ্য, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি গত বছরের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে ফেসবুকসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেন। এতে করে ক্ষিপ হন দেশটির তরুণরা। তারা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ওলির সরকারের পতন ঘটান। নেপালের তরুণরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং এলিট শ্রেনির শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যার ফলাফল দেখা যায় সর্বশেষ নির্বাচনে। যেখানে পুরোনো রাজনীতিবিদদের বেশিরভাগ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে প্রায় ১০ হাজার স্থলসেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আরও দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পাবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে এই মোতায়েনের মধ্যে পদাতিক ইউনিটের পাশাপাশি সাঁজোয়া যানও থাকতে পারে। নতুন সেনারা যুক্ত হবে ইতোমধ্যে মোতায়েনের নির্দেশ পাওয়া ৫ হাজার মেরিন সদস্য এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার প্যারাট্রুপারের সঙ্গে, যা পুরো অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি তৈরি করবে। তাদের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের মূল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ-এর অপারেশনাল রেঞ্জের মধ্যে তাদের রাখা হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, মিত্রদের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, তিনি ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত’ করবেনই।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি অ্যানা কেলি বলেন, সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত সব ঘোষণা প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকেই আসবে।
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব সময় সব ধরনের সামরিক বিকল্প খোলা থাকে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। টহল ও সম্ভাব্য হামলার উদ্দেশ্যে চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ ব্যবহার শুরু করেছে তারা, যা যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির আরও বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এই মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এটি প্রথমবার, যখন সক্রিয় কোনো সংঘাতে এ ধরনের নৌযান ব্যবহারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল ওয়াশিংটন।
ড্রোন বোটগুলো কেবল নজরদারির জন্য নয়, প্রয়োজন হলে আত্মঘাতী হামলার মতো আক্রমণাত্মক কাজেও ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলে জানা গেছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, চালকবিহীন নৌবহর গঠনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল মার্কিন নৌবাহিনী। তবে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এখন এসব নৌযান সরাসরি অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিস্ফোরকবাহী স্পিডবোট দিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরে আঘাত হানার পর থেকেই এই প্রযুক্তি আলোচনায় আসে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানও পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য সমুদ্র-ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এসব ড্রোন নৌযান ব্যবহার করে সরাসরি কোনো আক্রমণ চালিয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, মেরিল্যান্ডভিত্তিক ‘ব্ল্যাক-সি’ প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই নৌযানগুলো ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো ‘গ্লোবাল অটোনোমাস রিকনেসান্স ক্রাফট’ বা ‘জিএআরসি’ নামে পরিচিত।
এক বিবৃতিতে হকিন্স বলেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে জিএআরসির মতো ড্রোন নৌযান ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। এ বিশেষ প্ল্যাটফর্মটি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমর্থনে টহল দেওয়ার সময় সফলভাবে ৪৫০ ঘণ্টারও বেশি পানিতে ভেসে থেকে ২ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ অতিক্রম করেছে।
বর্তমানে ব্যবহৃত অন্য কোনো ড্রোন ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি। একইভাবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাক-সি’ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে চলমান শোক ও উত্তেজনার মধ্যেই তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তের একটি ছবি জনসমক্ষে এসেছে। তেহরান থেকে প্রকাশিত এই চিত্রটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম দ্য ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার জীবনের শেষ এই ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল মায়াদিন ইংলিশ দাবি করেছে, খামেনির মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে এটিই ছিল তাঁর শেষ ছবি।
প্রকাশিত এই ছবিতে তাঁকে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে অবস্থানরত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের ঠিক আগমুহূর্তে ছবিটি ধারণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, অভিযানের প্রথম দিনেই সকালে নিজ দপ্তরে অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিহত হন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি সেই সময় জানিয়েছিল যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক হামলায় সকালের দিকেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রাণ হারান। সে সময় তিনি তাঁর কার্যালয়ে দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পন্ন করছিলেন।
তেহরানের সাথে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই মালয়েশীয় জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মালয়েশিয়ার জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে “দ্রুত ছাড়পত্র” দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এ জন্য তিনি ইরানের প্রেসিডেন্টকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে সাধারণ জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁদের তেলবাহী ট্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও বর্তমানে কাজ চলছে। তবে ঠিক কতটি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ পেয়েছে বা এর পেছনে কোনো বিশেষ শর্ত ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাধারণত নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণকারী মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় মালয়েশিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দেশটি অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় “ভালো অবস্থায়” আছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের অন্যতম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালয়েশিয়াকে তাদের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে মালয়েশিয়া সরকার ভর্তুকিযুক্ত পেট্রলের ব্যক্তিগত বরাদ্দ হ্রাস এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যায়ক্রমে বাসা থেকে কাজ করার পদ্ধতি চালুর মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। আনোয়ার ইব্রাহিম আরও বলেন, “খাদ্য সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে, দাম বাড়বে সার ও জ্বালানিরও। তাই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এমন অনেক দেশ আছে, যাদের ওপর এর প্রভাব মালয়েশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। তবে তার অর্থ এই নয়, মালযেশিয়া পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত।”
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন জাহাজগুলোর জন্য এই পথ খোলা রাখা হয়েছে, যদিও জলপথটিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে তেহরান। এদিকে ইরানের পার্লামেন্টে হরমুজ প্রণালিতে টোল ব্যবস্থা চালুর একটি প্রস্তাবিত আইনও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে কোনো কোনো জাহাজের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবির অভিযোগও উঠেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের পরিসংখ্যান বলছে, সংঘাত শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত, বর্তমানে সেই সংখ্যাটি আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত হামলার প্রেক্ষাপটে ইরান ও লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাতে দুই দেশে ব্যাপক হারে মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। একই সময়ে লেবাননে ইসরাইলি স্থল অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ, ফলে দুই দেশ মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লাখে।
প্রায় এক মাসের সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা অন্তত এক হাজার ৫০০ জনে পৌঁছেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়ে দেশটির ৮৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল এবং হাজার হাজার বসতবাড়ি। রাজধানী তেহরানেও বিপুলসংখ্যক আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানায়, হামলার পর থেকে ইরানের মানুষ নিরাপত্তার খোঁজে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, তুরস্ক ও আজারবাইজানের সীমান্ত এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেশত্যাগী মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে লেবাননের পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনীর নির্দেশে দক্ষিণাঞ্চলের লিটানি নদী থেকে জাহরানি নদী পর্যন্ত এলাকা খালি হয়ে পড়েছে, যার ফলে দেশের প্রায় ১৪ শতাংশ ভূখণ্ড জনশূন্য হয়ে গেছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতি পাঁচজনের একজন এখন বাস্তুচ্যুত। আশ্রয় সংকটে বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায় কিংবা যানবাহনে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ লেবানন ছেড়ে সিরিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে, যাদের অর্ধেকই শিশু।
যুদ্ধের অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। কাসমিয়েহ, আল-কানতারা ও খর্দালিসহ একাধিক প্রধান সেতুতে হামলা চালানো হয়েছে, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরির চেষ্টা। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদে সরে যাওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা জোরদার না হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই পথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আর নির্ভরশীল নয়। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকার নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রচুর তেল মজুত থাকায় এই সংকটে দেশটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।
যদিও পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এবং অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম মাঝে মাঝে ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, তবুও ট্রাম্পের মতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন তাদের এক শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক মাসে জ্বালানির দাম গ্যালন প্রতি এক ডলারের বেশি বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে তিনি অঙ্গরাজ্যগুলোকে তেলের ওপর কর স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর স্থগিত করার বিষয়ে তিনি এখনই প্রস্তুত নন, তবে প্রয়োজনে এটি একটি বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানকে জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার ‘বিপজ্জনক ভুল’ বলে অভিহিত করলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বিষয়টিকে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে তুলনা করে নিজের ভূমিকার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে ইরান একটি ‘উপহার’ দিয়েছে বলে রহস্যময় মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প, তার ব্যাখ্যায় তিনি জানান, পাকিস্তান পতাকাবাহী আটটি তেলের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।
ট্রাম্পের মতে, এটি আলোচনার জন্য ইরানের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত এবং তিনি দাবি করেন যে ইরান পর্দার আড়ালে চুক্তির জন্য যোগাযোগ করছে। ইরান আলোচনার কথা অস্বীকার করলেও ট্রাম্প তাদের ‘চতুর দরকষাকষাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজের অবস্থানে অটল রয়েছেন।
এদিকে ইরান সংকটের প্রভাবে সার ও চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ নীতিমালার পরিকল্পনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত বছর বাণিজ্য যুদ্ধের সময় কৃষকদের ১২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি এবারও সংকটের মুখে থাকা কৃষকদের পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন। সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আমেরিকার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ কৌশলের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর ওপর প্রশাসনের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার লাহোর থেকে পিটিআইয়ের পাঞ্জাব প্রদেশের প্রধান সংগঠক আলিয়া হামজা মালিককে গ্রেফতার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতারের পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁর বর্তমান অবস্থান বা তাঁকে ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
আলিয়া হামজা মালিক পিটিআইয়ের রাজনীতির ময়দানে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নারী নেত্রী এবং পাঞ্জাব প্রদেশে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু আইনি জটিলতায় জর্জরিত। এর আগে বিভিন্ন মামলায় তাঁকে ১০ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং মানবাধিকার মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৯ মে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
পিটিআইয়ের এই প্রভাবশালী নেত্রীর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে লাহোরসহ পুরো পাকিস্তানে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দণ্ডাদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ৯ মে-র সেই সহিংস ঘটনার পর থেকে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআইয়ের অসংখ্য শীর্ষ ও স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেককেই ইতোমধ্যে কারাবরণ করতে হয়েছে অথবা তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলিয়া হামজা মালিকের মতো একজন সক্রিয় সংগঠককে গ্রেফতার করার ফলে পাঞ্জাব প্রদেশে পিটিআইয়ের সাংগঠনিক শক্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে দলের প্রধান ইমরান খানের কারাবাসের মধ্যে যখন দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের ধরপাকড় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় পিটিআই সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তবে প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, দেশের আইন ও শান্তি বজায় রাখতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আলিয়া হামজাকে ঠিক কোন অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে এবং তাঁর আইনজীবীরা পরবর্তীকালে কী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।