পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
আগ্নেয়গিরি থেকে বছরে ছড়াচ্ছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবেই এমন তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার গভীরে অবস্থিত মাউন্ট এরেবাস পৃথিবীর অন্য যেকোনো আগ্নেয়গিরির তুলনায় ব্যতিক্রমী। এই আগ্নেয়গিরি থেকেই প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার সমমূল্যের স্বর্ণ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দক্ষিণতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরিটি বায়ুমণ্ডলে বিশুদ্ধ স্বর্ণের ক্ষুদ্র স্ফটিক নির্গত করে। জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্সে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মাউন্ট এরেবাস থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ গ্রাম আণুবীক্ষণিক স্বর্ণের স্ফটিক নির্গত হয়।
বর্তমান স্বর্ণের দাম অনুযায়ী, এর মূল্য দৈনিক প্রায় ৬ হাজার ডলার। বছরে এর মূল্য দাঁড়ায় ২০ লাখ ডলারেরও বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৪ কোটি টাকার বেশি। ভৌগোলিকভাবে মাউন্ট এরেবাস দক্ষিণ মেরু থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার দূরে রস সাগরের রস দ্বীপে অবস্থিত। আগ্নেয়গিরিটির লাভা থেকে অবিরাম আগ্নেয় গ্যাস নির্গত হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব গ্যাস বিশুদ্ধ সোনার আণুবীক্ষণিক কণা বহন করে, যা অ্যান্টার্কটিকার বরফে জমা হওয়ার আগে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে।
ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখেছেন, আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত স্বর্ণ সাধারণ ধূলিকণা নয়। কণাগুলো ক্ষুদ্র হলেও সুগঠিত স্ফটিকের আকার ধারণ করে। এর কোনো কোনোটির ব্যাস ৬০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরির গ্যাসে স্বর্ণের উপস্থিতি পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। হাওয়াইয়ের কিলাউয়া, ইতালির মাউন্ট এটনা, আলাস্কার অগাস্টিন আগ্নেয়গিরি এবং মেক্সিকোর এল চিচনসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি আগ্নেয়গিরিতেও অল্প পরিমাণে স্বর্ণের সন্ধান পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্লোরিন বা সালফারসমৃদ্ধ যৌগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গরম আগ্নেয় গ্যাসের মাধ্যমে স্বর্ণ ওপরের দিকে উঠে আসে। গ্যাস ঠাণ্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণ আলাদা হয়ে স্ফটিকে পরিণত হয়।
তবে মাউন্ট এরেবাস অন্য সব আগ্নেয়গিরির তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রম। এর এই বৈশিষ্ট্যের রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। গবেষকরা এ বিষয়ে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্লোরিনসমৃদ্ধ আগ্নেয় গ্যাস বাতাসে ঠাণ্ডা হওয়ার সময় সেখান থেকেই সরাসরি স্বর্ণের স্ফটিক তৈরি হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। কারণ এসব গ্যাসে স্বর্ণের পরিমাণ অত্যন্ত কম।
আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী, স্বর্ণের স্ফটিক প্রথমে আগ্নেয়গিরির লাভার হ্রদের উপরিভাগে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। পরে আগ্নেয় গ্যাসের সঙ্গে তা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আবিষ্কারের তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিতভাবে এর ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ফলে বিষয়টি এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে চীনের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে নীরবে রাজ্যের ভূখণ্ড দখলের অভিযোগ করেছে আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (এনডব্লিউএস)। তাদের দাবি, অরুণাচলের আপার সুবানসিরি জেলার প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ২৬ জুন আপার সুবানসিরির ডেপুটি কমিশনারের কাছে এ সংক্রান্ত স্মারকলিপি জমা দিয়েছে এনডব্লিউএস। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় মানুষ আগে যেসব জায়গা গবাদিপশু চরানো, শিকার করা ও বন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করতেন, চীনা বাহিনী সেখানে এখন রাস্তা, সেতু এবং সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে।
এনডব্লিউএস পাঁচটি এলাকার তালিকা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওইং, পানিয়ার (চুজারতা এলাকা), মারপান (মারনাফে), পোত্রাং লেক ও টিনডিংটাং (টিজি)। ২০২০ সাল পর্যন্ত স্থানীয়রা এসব এলাকা ব্যবহার করতেন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে চীনা কার্যকলাপ বৃদ্ধির পাওয়ায় পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে ওই এলাকায় রাস্তা ও সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করে চীন তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা থাকলেও ধীরে ধীরে জমি হারানোর ঘটনায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
স্মারকলিপির অন্যতম জোরালো একটি অংশে এনডব্লিউএসের প্রেসিডেন্ট কেরু চাদের লিখেছেন, আমাদের পৈতৃক ভূমি, যা ছিল আমাদের শিকারের এলাকা যেখানে আমরা অবাধে বিচরণ করতাম ও বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতাম, এবং আমাদের গবাদি পশুর চারণভূমি, এখন চীনা পিএলএ-র দখলে।
স্মারকলিপিতে এনডব্লিউএসের সভাপতি কেরু চাদের দাবি করেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের জমি, শিকারের এলাকা, বনজ সম্পদ সংগ্রহের স্থান ও গবাদিপশুর চারণভূমি এখন চীনা বাহিনীর দখলে। স্থানীয় বিধায়ক নাকাপ নালো বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে সরকারি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সাবেক বিধায়ক পাকঙ্গা বাগেও রাজ্য সরকারকে বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযোগ নাকচ ভারতীয় সেনাবাহিনীর
চীনা বাহিনী দ্বারা অরুণাচল প্রদেশে ভূখণ্ড দখলের আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির করা অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। তারা এই দাবিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘আমরা কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন দেখেছি যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, চীনা পিএলএ অরুণাচল প্রদেশে অনুপ্রবেশ করে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এই প্রতিবেদনগুলো মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।’
তদন্তের আশ্বাস রাজ্য সরকারের
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সোমবার অরুণাচলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মামা নাটুং জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যে অভিযোগ তোলা হয়েছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। জেলা প্রশাসন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগণ এবং পঞ্চায়েত কমিটিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তিতে যাবতীয় পদক্ষেপ করা হবে।
মামা নাটুং আরও বলেন, যদি সত্যিই কোনও অবৈধ দখল হয়ে থাকে, তবে তা খুবই অন্যায় হবে। এলাকায় আসলে কী ঘটছে তা খুঁজে বের করতে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করব। অরুণাচল প্রদেশকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। ভারত ম্যাকমোহন লাইনকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) হিসেবে মানলেও চীন তা স্বীকৃতি দেয় না।
বেইজিং অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে ভারতের দাবি, অরুণাচল প্রদেশ দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ বিরোধকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বিলিয়ন ডলার আত্মসাত ও প্রতারণার মামলায় চীনা এক ধনকুবেরকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ওই ব্যবসায়ীর নাম গুও ওয়েনগুই, যাকে একসময় চীনের সেরা ধনীদের একজন বলে বিবেচনা করা হতো।
চীনে বসবাসকালে গুও রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৭ সালে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। অভিযোগগুলো মিথ্যা বলে দাবি করে আসছিলেন গুও। একই সঙ্গে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি নিজেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, তথা চীনের সরকারের একজন কড়া সমালোচক হিসেবে নিজেকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেন।
অনলাইনে একনিষ্ঠ কিছু অনুসারীও পেয়ে যান এই ধরকুবের। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাত এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। চীনে যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, ব্যবসায়ী গুও তাদের শোষণ করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাত করেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালতের বিচারক অ্যানালিসা টরেস।
আত্মসাৎ করা অর্থ তিনি নিজের বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য ব্যয় করেছেন বলেও জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ী গুও তার সমর্থকদের কাছে মাইলস গুও এবং হো ওয়ান কোয়োকসহ আরও অনেক নামে পরিচিত। রায় ঘোষণার তাদের অনেকেই আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী শন এস বাকলি বলেন, ‘লোভে পড়ে গুও হাজার হাজার মানুষের বিশ্বাসের অপব্যবহার করেছেন।’ বাকলি আরও বলেন, ‘আজকের এই রায় দেখিয়ে দিয়েছে যে, খ্যাতি ও সম্পদ আপনাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না এবং যারা নিজের সুখ-সমৃদ্ধির স্বার্থে পরিবারকেই শিকার বানাতে দ্বিধা করেন না, সেই প্রতারকদের কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।’
চীন থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে গুও আবাসন ব্যবসা করতেন এবং এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। চীনা সরকারের সঙ্গেও তখন তার সুসম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু পরে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন চীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এরপর শাস্তি এড়াতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর থেকে গুও চীনের কমিউনিস্ট শাসনের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন। এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমেই তার পরিচিতি বাড়তে থাকে এবং অনলাইনে একনিষ্ঠ অনেক অনুসারীও তৈরি হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন ছাড়াও চীন সরকারের অন্যান্য সমালোচকদের সঙ্গেও একপর্যায়ে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং নিজের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে গুও ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তার ভক্ত ও অনুসারীদের কাছ থেকে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন।
কথা ছিল চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ওইসব অর্থ ব্যবহৃত হবে। কিন্তু তা না করে গুও সেই অর্থ নিজের বিলাসী জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেন। ভক্ত ও সমর্থকদের দেওয়া অর্থে তিনি ৫০ হাজার বর্গফুটের বিশাল একটি প্রাসাদ কিনেছেন। সেইসঙ্গে, ১০ লাখ ডলার দিয়ে একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি এবং তিন দশমিক সাত কোটি ডলার ব্যয় করে একটি বিলাসবহুল ইয়টেরও মালিক হয়েছেন।
তবে রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হলেও গুও অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভক্ত ও সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলেও দাবি করে আসছেন তিনি।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড (১৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। সামরিক বাহিনী ও জাতীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।
যদিও দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব ছিল এই বরাদ্দের পরিমাণ ২৮ বিলিয়ন করার। সেই তুলনায় এই বরাদ্দ অপ্রতুল। ঘোষিত অতিরিক্ত বরাদ্দের ৫ বিলিয়ন পাউন্ড শুধুমাত্র ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের পেছনে খরচ করা হবে।
ব্রিটিশ সরকারের লক্ষ্য, ২০২৯ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ৮০ বিলিয়ন পাউন্ডে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অন্যান্য বেসামরিক খাত ও সরকারি পরিচালন ব্যয় থেকে সমপরিমাণ অর্থ সমন্বয় বা কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, সরকার ইতোমধ্যেই ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে প্রতিরক্ষা খাতে ‘সবচেয়ে বড় ও ধারাবাহিক বৃদ্ধি’ সাধন করছে। এই ব্যয় মেটাতে বেসামরিক খাতের বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে সরকারি কর্মী নিয়োগসহ পরিচালন ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হবে।
এরপর তিনি ঘোষণা করেন যে, প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনার অধীনে সরকার প্রতিরক্ষা খাতে অর্থায়ন আরও ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড বৃদ্ধি করে একটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করছে। বিগত সরকার প্রতিরক্ষা খাতে বছরে ৫৪ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করত, যা ২০২৯ সালের মধ্যে বাড়িয়ে বছরে ‘প্রায় ৮০ বিলিয়ন পাউন্ড’ করা হচ্ছে। এটি প্রকৃত অর্থে ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ‘অতল গহ্বর’ হিসেবে দেখা হতো। তবে এবার সেই ধারণা বদলাতে হবে। তার মতে, শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করলেই হবে না, সেই অর্থ আরও কার্যকর ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে।
তিনি বলেন, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীতে প্রজন্মগত পরিবর্তন আনা হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে। ড্রোন প্রযুক্তিতে ৫ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করা হবে, যা এ খাতে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
বিদায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্য একটি ‘হাইব্রিড নৌবাহিনী’ গড়ে তুলবে। এতে যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি পানির ওপর ও নিচে চলাচলকারী চালকবিহীন (আনক্রুড) নৌযানও ব্যবহার করা হবে। ব্রিটিশ ফ্রিগেট যখন রাশিয়ার কোনো হুমকিস্বরূপ জাহাজ মোকাবিলা করবে, তখন এসব চালকবিহীন নৌযানও অভিযানে সহায়তা করবে।
তিনি আরও বলেন, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধ সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। স্বয়ংক্রিয় ‘উইংম্যান’ ড্রোনের সঙ্গে টাইফুন যুদ্ধবিমান পরিচালনা করা হবে, যা শত্রুর নজর এড়িয়ে অভিযান চালাতে সহায়তা করবে।
এছাড়া সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান এবং ড্রোন প্রতিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও জানান স্টারমার। তার দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে সেনাবাহিনীর আক্রমণক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় ১০ গুণ বাড়বে।
পাকিস্তানের সঙ্গে হওয়া সামরিক সংঘাতে ভারতীয় বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যের নিহতের তথ্য গোপন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। প্রায় তেরো মাস আগে সংঘটিত ওই লড়াইয়ে ভারতের ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার খবর সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর এই নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনব্যাপী চলা এক রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের সময় ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাঁচজন এবং বিমানবাহিনীর একজনসহ মোট ছয়জন সদস্য নিহত হন।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এতদিন এই তথ্য দেশের সংসদ ও জনগণের কাছে সম্পূর্ণ গোপন করে রেখেছিল। বিরোধী দলটির মতে, নিহতদের নাম দীর্ঘ তেরো মাস পর প্রকাশ করে সরকার কেবল দেশের সংসদকে বিভ্রান্ত করেনি, বরং জীবন উৎসর্গকারী বীর জওয়ানদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি থেকেও বঞ্চিত করেছে।
নয়া দিল্লিতে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের প্রাক্তন সেনাবিষয়ক বিভাগের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রোহিত চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার অনুমা আচার্য সরকারের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।
অনুমা আচার্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পূর্ববর্তী সব সরকার দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া প্রতিটা সেনাকে প্রকাশ্যে বীরের সম্মান জানিয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতার স্বার্থে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে এবং সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল রোহিত চৌধুরী ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সমালোচনা করে বলেন, ‘ভোটের রাজনীতিতে জওয়ানদের ব্যবহার করা হলেও তাদের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং যখন সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো সেনা সদস্য নিহত হননি বলে অসত্য বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সরকারি দলের এমপিরা হাততালি দিচ্ছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য ভারতের সেনাবাহিনী এবং শহীদদের জন্য চরম অপমানজনক দাবি করে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদে বিশেষ অধিকার ভঙ্গের প্রস্তাব আনারও ঘোষণা দেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ গত সোমবার বলেছেন, পৃথিবীর ওপরের মহাকাশে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েল মহাকাশভিত্তিক লেজার প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে। সামরিক প্রতিবেদকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং আমি যে প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি নির্ধারণ করেছি, তা হলো আমরা সেরা মেধাবীদের নিয়োগ দিচ্ছি। আজ পর্যন্ত কোনো দেশেরই মহাকাশে হামলা চালানোর সক্ষমতা নেই। এই সক্ষমতায় বিশ্বের শীর্ষ দেশ আমাদেরই হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি আমরা এটি অর্জন করতে পারি, তবে এটি আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে—যাদের বিপুল সম্পদ রয়েছে—প্রতিরোধ, আঘাত হানা, ধ্বংস করা এবং অন্যান্য সব বিষয়ে আমাদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করবে।
গত বৃহস্পতিবার কাটজ বলেছিলেন, মহাকাশ থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতায় শীর্ষ শক্তি হয়ে উঠতে ইসরায়েল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তার সবশেষ বক্তব্যে প্রথমবারের মতো তিনি নির্দিষ্টভাবে মহাকাশভিত্তিক লেজারের কথা উল্লেখ করলেন।
ইসরায়েল ইতোমধ্যেই এই ক্ষেত্রে একটি অগ্রণী দেশ। তারা আয়রন বিম নামে স্থলভিত্তিক লেজার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সম্প্রতি এলবিট সফরের সময় দ্য জেরুজালেম পোস্ট একটি প্রকল্প প্রত্যক্ষ করেছে এবং সে সম্পর্কে অবহিত হয়েছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে যুদ্ধবিমান থেকে লেজার নিক্ষেপের সক্ষমতা তৈরি করা।
ব্রিফিংয়ের সময় কাটজের বক্তব্য থেকে মনে হয়েছে, তিনি ইরানের কথাই উল্লেখ করছিলেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ বছর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল মহাকাশযুদ্ধ-সম্পর্কিত ইরানের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যার মধ্যে মহাকাশে স্যাটেলাইটে হামলার সক্ষমতা উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ছিল।
তবে এখনো স্পষ্ট নয়, কাটজ রাশিয়া ও চীনকে ইরানের মহাকাশ প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য বিষয়ে সহায়তা করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছেন কি না।
তবে অন্য কোনো দেশের এ ধরনের সক্ষমতা নেই—কাটজের এই বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ রাশিয়া ও চীন উভয়ই নিজেদের স্যাটেলাইটে হামলা চালিয়ে পরীক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
বিদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনের মতে, লেজার প্রযুক্তি সম্ভাব্যভাবে শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে পারে এবং মহাকাশে হামলার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষও পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হতে পারে।
এ নিয়ে জল্পনা রয়েছে যে, বর্তমানে মহাকাশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাত হানতে সক্ষম অ্যারো–৩ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসরায়েলের শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করার সক্ষমতাও থাকতে পারে।
তবে রাশিয়া ও চীনের যেহেতু মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই অনেক দেশই বর্তমানে স্যাটেলাইটের বিরুদ্ধে অচল করে দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত করা, জ্যামিং করা, টেনে সরিয়ে নেওয়া অথবা লেজার ব্যবহারের মতো অন্যান্য কৌশল নিয়ে কাজ করছে।
বর্তমানে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছেন মার্কিন প্রতিনিধিরা। ইরান ইস্যুতে আলোচনা করতে তারা সেখানে গেছেন বলে জানা গেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ বর্তমানে দোহায় রয়েছেন। তবে তারা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈঠকে অংশ নেবেন না।
তিনি বলেন, কুশনার ও উইটকফ মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং চলমান আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করবেন। এছাড়া ইরানের জব্দ থাকা ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ এখনো তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি বলেও জানান ওই মুখপাত্র।
জব্দ অর্থ ছাড়ের দাবিতে দোহা যাচ্ছেন কর্মকর্তারা: ইরান
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনার জন্য কাতারের রাজধানী দোহায় প্রতিনিধি পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান দাবি করেছে, আমেরিকার সাথে এমন কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা তাদের নেই; দোহা সফরে ইরানি দল দেশটির অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি উত্থাপন করবে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দোহা যাচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান একটি বৈঠকের অনুরোধ করেছে। দোহায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।’
তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আলোচনার সূচি নির্ধারিত নেই।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল এ সপ্তাহে কাতার সফর করবে ঠিকই, তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দোহা সফরের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
ইরানের ভাষ্য, এই প্রতিনিধি দলের সফরের উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা নয়। বরং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
ইরানের অভিযোগ, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের নানা আপত্তি, সমালোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে।
এছাড়া সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন নিয়েও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ৬০ দিনের আলোচনাকালে হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। ওয়াশিংটনের মতে, ইরানকে নৌচলাচলে কোনো বাধা না দিয়ে প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালীর ওমান-সংলগ্ন জলসীমা দিয়ে নতুন নৌপথ চালু করা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তেহরান। তাদের দাবি, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধি দল প্রথম ধাপে কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ের ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে বলে জানিয়েছে ইরান।
চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সই হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে সেই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নতুন করে হামলা শুরু করেছে।
ইরান জানায়, তাদের নৌ ও বিমানবাহিনী কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পুনরায় চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে আরও ‘বিধ্বংসী জবাব’ দেওয়া হবে।
কাতারে বৈঠকের ঘোষণা ট্রাম্পের, অস্বীকার ইরানের
কাতারের দোহায় ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা শান্তিবৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ ঘোষণা অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরান বলছে, এমন কোনো কিছুর পরিকল্পনা আপাতত তাদের নেই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান একটি বৈঠকের অনুরোধ করেছে। দোহায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে!
ইরান সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এ দাবি অস্বীকার করেছেন। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির উদ্ধৃতি দিয়ে সোমবার আলজাজিরা জানিয়েছে, কাতারে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা ইরান করছে না।
তাসনিম বার্তা সংস্থাকে তিনি বলেন, অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলোআপসহ কাতারের সঙ্গে যথারীতি পরামর্শ চলমান থাকলেও দোহায় ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোর কারিগরি আলোচনা অনুষ্ঠানের বিষয়টি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে আসা এই দুটি বক্তব্য আপাতদৃষ্টে সাংঘর্ষিক মনে হলেও, গরিবাবাদীর মন্তব্যের পর বৈঠকটি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, দোহায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলমান থাকর এই সময়ে বিশেষ দূত উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার চলতি সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে দোহা যাচ্ছেন। উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার পাশাপাশি মূল বৈঠকের ফাঁকে কারিগরি আলোচনাও অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান লেভিট।
প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুর দিকে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছায়, যার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল বিষয়, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব শুরু হয়। তবে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবির মুখে এই চুক্তিটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
ইতালি, ফ্রান্স ও বলকান অঞ্চলসহ সমগ্র ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া রেকর্ড-ভাঙা তীব্র দাবদাহে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। একই সঙ্গে পুরো মহাদেশজুড়ে তীব্র দাবানল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই চরম আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ফ্রান্সে।
ফরাসি জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মাত্র তিন দিনে দেশটিতে প্রায় ১ হাজার জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বেশিরভাগই বয়স্ক নাগরিক, পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে হ্রদ ও নদীতে গোসল করতে নেমে অন্তত ৭৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ইতালি, স্পেন ও জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। এই দেশগুলো থেকেও তাপপ্রবাহ-জনিত কারণে বহু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
মাত্রাতিরিক্ত গরমের কারণে ইতালির রাজধানী রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স এবং পালেরমোসহ ২২টি শহরে রেড অ্যালার্ট বা সর্বোচ্চ তাপ-সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত লোডের কারণে ইতোমধ্যেই ফ্লোরেন্স ও বারগামো শহরের কিছু অংশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে, যা জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইতালীয় বিমান বাহিনীর আবহাওয়াবিদ দানিয়েলে মোসিও বলেছেন, দেশটিতে আগামী আরও বেশ কয়েকদিন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বলকান অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশও তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে ছিল এবং ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির কিছু অংশে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এর উপরে রয়েছে।
তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আলবেনিয়া এবং বুলগেরিয়ার বনাঞ্চলগুলোতে বিশাল আকারের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের হাজার হাজার কর্মী হিমশিম খাচ্ছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলবেনিয়া ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা গরম বাতাস এবং শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় বা ‘হিট ডোম’-এর কারণে ইউরোপজুড়ে এই তীব্র গরম আটকে রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই তীব্র দাবদাহ হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। গত ২০ বছরের তুলনায় ইউরোপে রাতের তাপমাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর ঝুঁকি এখন ১০০ গুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে ইতালীয় আবহাওয়া সমিতির সভাপতি লুকা মেরকালি রয়টার্সকে বলেছেন, আগামী ৫ বা ৬ জুলাই থেকে তাপপ্রবাহের আরেকটি ঢেউ আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের কিছু অংশকে প্রভাবিত করবে।
ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে উঠতে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। সময় বয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও স্থানীয় বাসিন্দারা এখনও হাল ছাড়েননি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি মঙ্গলবার (৩০ জুন) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির অনেক দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি সহায়তা না পৌঁছানোয় সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষের ফিরে আসা এখন অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে।
সবচেয়ে বিপর্যস্ত লা গুয়াইরা বন্দরের বাসিন্দারা তাদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের খুঁজে বের করতে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাবে শাবল, হাতুড়ি ও কোদাল ব্যবহার করছেন। এদিকে কারাকাসের পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা এল জুনকুইতোর বাসিন্দারা রয়টার্সকে বলেছেন, উদ্ধার অভিযানে খুব কম সরকারি কর্মকর্তাকে দেখা গেছে। কৃষক ও অন্যান্য বাসিন্দাদের সরবরাহ করা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীই এখন দুর্গত মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এটিকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের শুরু গত বুধবার, যখন দেশটির উত্তরাঞ্চলের লা গুয়াইরা রাজ্যে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০টি ভবন মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭১৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো জানান, মূল ভূমিকম্পের পর অন্তত ৫০০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে, যাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জাতিসংঘ উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে ১০ হাজার মৃতদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সংগ্রহ করছে, যা নির্দেশ করে যে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।
সর্বশেষ সোমবার ভোরবেলা কারাকাস ও লা গুয়াইরায় ৪.৬ মাত্রার আরও একটি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে, তবে এতে নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট জানান, ২৫ হাজারেরও বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য বর্তমানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার মাত্রা নির্ধারণে রঙভিত্তিক সংকেত পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এর ভিত্তিতেই ঠিক করা হবে কারা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবেন।” তিনি আরও বলেন, “এখন প্রতিটি জীবন বাঁচানোই আমাদের জন্য বড় অর্জন।”
ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য পৌঁছালেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর উদ্ধার তৎপরতায় তাদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবির স্থাপনের কাজ চলছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় ৩৬ বেসামরিক নিহত ও আরও ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। দেশটির তালেবান সরকার এ তথ্য জানিয়েছে।
তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত সামাজিক মাধ্যম এক্স এ এক পোস্টে বলেছেন, ‘গত রোববার রাতে (২৮ জুন) চালানো এই হামলার ফলে ৩৬ বেসামরিক শহীদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। আর আরও ১৬৩ জন আহত হয়েছেন।
আল জাজিরা পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, করাচিতে সিন্ধু রেঞ্জার্সের শিবিরে বোমা ও বন্দুক হামলায় আধাসামরিক বাহিনীটির তিন সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত বরাবর স্থল অভিযান ও আকাশ হামলা চালিয়ে ২৯ জনকে হত্যা করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, দেশজুড়ে সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর অনেকগুলো হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। এক্স এ করা পোস্টে তারার বলেন, ‘আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনারে তিনটি লক্ষ্যস্থল নির্ভুল আঘাত ধ্বংস করা হয়েছে।’
কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এসব হামলার অধিকাংশের জন্য পাকিস্তান তালেবান নামে পরিচিত তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায় দিচ্ছে।
শনিবার রাতে পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচিতে আধাসামরিক বাহিনী সিন্ধু রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে বোমা ও বন্দুক হামলায় বাহিনীটির তিন সদস্য নিহত ও আরও তিনজন আহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা হামলায় তিন আক্রমণকারী নিহত ও আরেকজন গ্রেপ্তার হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আফগান নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
এক বিবৃতিতে এ হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তান তালেবানের উপদল জঙ্গি গোষ্ঠী জামাত-উল-আহরার।পাকিস্তান এই হামলার দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযান চালাবে,’ তখনই বলেছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনী।
তারার দাবি করেন, আফগান সীমান্তের এই প্রদেশগুলোতে পাকিস্তান তালেবানের গোপন ও সুরক্ষিত আস্তানাগুলোকে লক্ষ্যস্থল করা হয়। পাকিস্তান তালেবান আফগান তালেবান থেকে পৃথক একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। তবে এই দুই তালেবানের মধ্যে মিত্রতা আছে।
জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আফগানিস্তানের নিরাপদ আস্তানায় থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রাণঘাতী হামলা চালাতে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ ইসলামাবাদের। কাবুল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তারা কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে না বলে পাল্টা দাবি করেছে।
ভেনিজুয়েলার বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পের পর চার দিনে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, এবং লা গুয়াইরাসহ বিভিন্ন শহরের ধ্বংস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেই দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
‘ধ্বংসস্তূপগুলোতে আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত আছে। গত রোববার (২৮ জুন) ধ্বংস্তূপে আটকে পড়া মরদেহগুলো যেমন উদ্ধার করা হয়েছে, তেমনি জীবিতদেরও উদ্ধার কর হচ্ছে। আমাদের অভিযান শিগগিরই শেষ হচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপের তলায় আমাদের স্বজনার জীবিত আছেন— এমন আশনিয়ে আমাদের এগোতে হবে’, বিবৃতিতে বলেছেন দেলসি।
বুধবার (২৪ জুন) ভেনিজুয়েলার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনিজুয়েলায়। দুই ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড ছিল বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)।
বুধবারের (২৪ জুন) ভূমিকম্পকে ভেনিজুয়েলার এ যাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে সবচাইতে ভয়াবহ, বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটির অজস্র ভবন, বাসাবাড়ি আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এই জোড়া ভূমিকম্পে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মোট নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে বাড়িঘর ও ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের উদ্ধারের জন্য দিশেহারা অবস্থায় আছে উত্তর ভেনিজুয়েলার হাজার হাজার পরিবার।
ভূমিকম্পের পর ভেনিজুয়েলার বহু এলাকা বিদুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেলসি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ পরিষেবা বিভাগের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের অন্তত ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
এর আগে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্টের স্পিকার জর্জ রদ্রিগুয়েজ বলেছিলেন, বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫০ জনের মরদেহ এবং আহত অবস্থায় ৩ হাজার ১৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলায় এ পর্যন্ত ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন জর্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলায় নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনিজুয়েলার সরকারের পক্ষ থেকে এখনও নিখোঁজদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি; তবে দেশটির বিরোধী দলের দাবি, এখনও নিখোঁজ আছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।
উত্তর জার্মানির শহর স্টাডেতে একটি যুব কল্যাণ কেন্দ্রে বন্দুক হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও বেশ কয়েক জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন বন্দুকধারীসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বন্দরনগরী হামবুর্গের কাছে অবস্থিত যুব কল্যাণ কেন্দ্রে হামলার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি পলাতক নেই। তিনি বলেন, ঠিক কতজন আহত হয়েছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিহতরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামবুর্গের পশ্চিমে অবস্থিত স্টাডেতে প্রায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। বন্দুক হামলার পর পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের ওই এলাকা থেকে এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ভেনিজুয়েলায় উদ্ধারকারীরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এদিকে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে দেশটির বাতাস। এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫১ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বুধবার (২৪ জুন) রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প লা গুয়াইরার আশেপাশের উপকূলীয় এলাকাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এলাকাটিতে প্রবেশ সীমিত করার পদক্ষেপ নেয় কারণ যানজটের বিশৃঙ্খলা উদ্ধারকাজকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
সরকারি উদ্ধারকারী দলের অপ্রতুলতার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং তারা হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছে। সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, লা গুয়াইরার আশেপাশের এলাকায় প্রবেশ করতে চাইলে এখন থেকে যে কাউকে সরকারি অনুমতি নিতে হবে। তবে কাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
কর্তৃপক্ষ একটি শক্তিশালী সরকারি প্রতিক্রিয়ার চিত্র তুলে ধরলেও, মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খুব কম সংখ্যক সরকারি উদ্ধারকারী দল দেখেছে বলে জানিয়েছে। সরকারি বাহিনী লা গুয়াইরায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে খাদ্য ও পানি বিতরণ করছে এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, জীবিত মানুষ উদ্ধারের এই সংকটময় মুহূর্তে তার সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী ও মানবিক সহায়তার আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। রদ্রিগেজ বলেছেন, লা গুয়াইরাকে সামরিকীকরণ করা হয়েছে এবং আরও সাহায্য আসছে। যদিও বাসিন্দারা বলেছেন, এটি তাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।
ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ দিন পর জীবিত উদ্ধার ১১ বছরের শিশু
ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার রাতে দেশটির লা গুয়াইরা অঞ্চলে এ উদ্ধার অভিযান সফল হয়, যা চলমান দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমে আশার নতুন আলো এনে দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, কারাবায়েদা এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুটি জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের ভিডিওতে দেখা যায়, হেলমেট ও বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরা উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের স্তূপ বেয়ে একজনকে নিচে নামিয়ে আনছেন। পরে তাকে স্ট্রেচারে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের অন্ধকারে ফ্লাডলাইট ও টর্চের আলোয় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
রদ্রিগেজ বলেন, কিছুক্ষণ আগে কারাবায়েদায় ১১ বছর বয়সি একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই মুহূর্তে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি জীবনই ভেনিজুয়েলার জন্য আশার প্রতীক। এর আগে শনিবার একই অঞ্চলে মোইসেস নামের আরেক ১১ বছর বয়সি শিশুকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকাজে সহায়তাকারী কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট (UNGRD) জানায়, শিশুটি উদ্ধারে প্রায় ছয় ঘণ্টার অত্যন্ত সতর্ক ও নিখুঁত অভিযান চালানো হয়।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলে, মোইসেসকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং সে এখন নিরাপদে রয়েছে। ছয় ঘণ্টার সূক্ষ্ম উদ্ধার অভিযানের পর আমাদের উদ্ধারকর্মীরা মাটির প্রায় তিন মিটার নিচে আটকে থাকা শিশুটির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং তাকে নিরাপদে বের করে আনেন।
বুধবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া শিশুদের ঘটনা স্বজনহারাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।