পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। দেশটির চিকিৎসকরা বলছেন, বিক্ষোভ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করার পর হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করলেও বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় দুটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।
এক চিকিৎসক বলেন, ‘তেহরানের একটি চক্ষু হাসপাতাল সংকটের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিবিসি অন্য একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন যে, রোগীদের ভিড় সামলাতে পর্যাপ্ত সার্জন নেই।’
গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান ‘বড় সমস্যায়’ পড়েছে’ এবং সতর্ক করে বলেন, ‘আপনাদের গুলি চালানো উচিত নয়; কারণ আমরাও গুলি চালানো শুরু করব।’
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে লেখা এক চিঠিতে ইরান এই বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুরের’ রূপ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে।’
এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানী তেহরানসহ ইরানে বড় বড় শহরগুলো বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে।
দুটি মানবাধিকার গোষ্ঠীর কাছ থেকে কমপক্ষে ৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিবিসি এবং অন্যান্য বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে ইরানের অভ্যন্তরে খবর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে দেশটিতে ইন্টারনেটসেবা বন্ধ। ফলে তথ্য পাওয়া এবং যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার রাতে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা ইরানের এক চিকিৎসক বলেন, ‘তেহরানের প্রধান চক্ষু বিশেষজ্ঞ কেন্দ্র ফারাবি হাসপাতাল সংকটের মুখে পড়েছে, জরুরি পরিষেবাগুলোও বিপর্যস্ত।’
জরুরি নয় এমন ভর্তি এবং অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মীদের ডাকা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শিরাজের একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে বিবিসি একটি ভিডিও এবং অডিও বার্তাও পেয়েছে। ওই চিকিৎসক জানিয়েছেন, আহত অনেক রোগীকে আনা হচ্ছে এবং হাসপাতালে ভিড় সামলাতে পর্যাপ্ত সার্জন নেই। তিনি দাবি করেন, ‘আহতদের অনেকের মাথা এবং চোখে গুলি লেগেছে।’
২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ৪৭ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংগঠন জানিয়েছে। এ ছাড়া আরও দুই হাজার ৩১১ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নয় শিশুসহ কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান নিহতদের ২২ জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, ‘এসব প্রাণহানির ঘটনায় জাতিসংঘ খুবই উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের সরকারের সেই অধিকার রক্ষা করার এবং সেই অধিকারকে সম্মান করার দায়িত্ব রয়েছে।’
ইরানে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ইরানে ‘ভেনিজুয়েলা-ধাঁচের’ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ভূমিকা ছিল, যা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে।
বৈরুতে সফরকালে লেবানিজ টিভি আলমানারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাকচি বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি ভেনিজুয়েলা-ধাঁচের ষড়যন্ত্র’ ব্যর্থ হয়েছে।’
তার দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষ ভেবেছিল, তিন দিনের মধ্যেই তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইরানকে লক্ষ্য করে যে ‘ভেনিজুয়েলা-ধাঁচের’ ষড়যন্ত্র ছিল, তা ‘সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ’ ও ভেস্তে গেছে। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে।’
এ সময় তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘নেতানিয়াহু উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশকে হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু লেবানন ও ইরানের মতো দেশগুলো শক্ত প্রতিরোধ দেখিয়েছে।’
আরাগচি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাজনিত নানা সমস্যার পরও ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তেহরান পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি মর্যাদাপূর্ণ চুক্তির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছা নিয়ে ইরান এখনো নিশ্চিত নয়।’
ইরানে হস্তক্ষেপের জন্য ট্রাম্পকে আহ্বান জানালেন রেজা পাহলভি
ইরানের প্রয়াত শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তিনি এই আবেদন জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াশিংটন এলাকায় বসবাসকারী রেজা পাহলভি লেখেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এটি আপনার দৃষ্টি, সমর্থন ও পদক্ষেপের জন্য একটি জরুরি ও তাৎক্ষণিক আহ্বান। অনুগ্রহ করে ইরানের জনগণকে সহায়তা করতে হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’ তিনি কী ধরনের হস্তক্ষেপ চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।
পাহলভি লেখেন, ‘আমি জনগণকে তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে এবং সংখ্যার জোরে নিরাপত্তা বাহিনীকে চাপে ফেলতে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছি। গত রাতে তারা সেটাই করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অপরাধী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপনার হুমকি তাদের সন্ত্রাসীদেরও কিছুটা দমিয়ে রেখেছে। কিন্তু সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষ আবার রাস্তায় নামবে। আমি আপনাকে সহায়তার জন্য অনুরোধ করছি।’
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ইরানি কর্তৃপক্ষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষদের হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে বর্তমানে এক প্রলয়ংকরী দাবানল বিরাজ করছে, যা শতাধিক বাড়িঘর তছনছ করার পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শনিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ইতিমধ্যে অন্তত ১৩০টিরও বেশি স্থাপনা সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে এবং প্রায় ৩৮ হাজার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে এই আগুনের সূত্রপাত হয় এবং দ্রুতই তা বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৩ লাখ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি বড় ধরণের আগুন এখনো সক্রিয় রয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে কয়েক হাজার দমকলকর্মী দিনরাত আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। ২০১৯-২০২০ সালের সেই কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক সামার’ দাবানলের পর ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে এটিই সবচেয়ে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ ক্যানবেরা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে চরম ও বিপজ্জনক অগ্নিঝুঁকির মোকাবিলা করছে এবং ভিক্টোরিয়ার একটি বড় অংশকে ইতিমধ্যে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজে সরকারের পূর্ণ সমর্থনের নিশ্চয়তা দেন। দাবানলের ঝুঁকিতে থাকা অসংখ্য জনপদ থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পর্যটকদের সুরক্ষায় রাজ্যের প্রধান পার্ক ও ক্যাম্পগ্রাউন্ডগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভিক্টোরিয়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নিউ সাউথ ওয়েলস এবং অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরিতেও উচ্চ তাপপ্রবাহ ও অগ্নিঝুঁকির সতর্কতা বজায় রয়েছে। প্রতিকূল বাতাসের কারণে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় পুরো অঞ্চলজুড়ে এখন এক থমথমে ও আতঙ্কিত পরিবেশ বিরাজ করছে।
ইরানের বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে এক বড় ধরণের রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি। শনিবার এক বিশেষ বার্তায় তিনি বিক্ষোভকারীদের আগামী দুই রাত রাজপথে থেকে বড় বড় শহরগুলোর নগরকেন্দ্রগুলো নিজেদের দখলে নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে আন্দোলনের ধার আরও বৃদ্ধি করতে তিনি দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও পরিবহন খাতের কর্মীদের প্রতি দেশব্যাপী সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করার ডাক দিয়েছেন। পাহলভি মনে করেন, বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আর্থিক জীবনরেখা যদি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়, তবে সরকারের সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। এই উত্তাল আন্দোলনের মধ্যেই তিনি নিজে ইরানে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও নিশ্চিত করেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বার্তায় রেজা পাহলভি তাঁদের সাহস ও অদম্য দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দাবি করেন যে, গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে যে ঐক্য প্রদর্শন করেছে, তা বর্তমান সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাঁদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নড়বড়ে রূপ বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে। আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে তিনি কেবল প্রতীকী প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোনোর পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, বড় শহরগুলোর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলো দখল করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এখন সময়ের প্রধান দাবি। এজন্য তিনি বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন দিক থেকে নগরকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে এবং আলাদা মিছিলগুলোকে একীভূত করে একটি বিশাল জনস্রোত তৈরি করার নির্দেশ দেন।
আন্দোলনকারীদের দীর্ঘ সময় রাজপথে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও সামগ্রী আগেভাগেই প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাসিত এই নেতা। এছাড়া তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র ইউনিটের সেই সকল সদস্যদের প্রতি বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছেন যারা পরোক্ষভাবে বিরোধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি তাঁদেরকে অনুরোধ করেন যেন তাঁরা সরকারের ‘দমনযন্ত্র’কে ধীর করে দেন অথবা এর কার্যক্রম ব্যাহত করেন যাতে সেটি পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। পাহলভি বিশ্বাস করেন যে, জনগণের সম্মিলিত শক্তির সামনে কোনো স্বৈরাচারী শক্তিই বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না এবং বর্তমানে ইরান সেই সন্ধিক্ষণেই দাঁড়িয়ে আছে।
সবচাইতে আলোচিত বিষয় হলো, রেজা পাহলভি তাঁর এই বার্তায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি সশরীরে ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়াতে স্বদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বর্তমান আন্দোলনকে ‘জাতীয় বিপ্লবের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, খুব শীঘ্রই ইরান এক নতুন ভোরে পদার্পণ করবে এবং সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি জনগণের সাথে রাজপথে শামিল হতে চান। তাঁর এই ফেরার ঘোষণা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাহলভির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইকে আরও জটিল ও সংঘাতপূর্ণ করে তুলতে পারে। বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর এখন তেহরানের রাজপথের দিকে, যেখানে সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের এক বুক আশা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি বাসভবনে ড্রোন হামলার জবাবে ইউক্রেনে শব্দের চেয়েও দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেশনিক’ নিক্ষেপ করেছে রুশ প্রতিরক্ষা বাহিনী।
শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) সকালে এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।খবর রয়টার্স।
বিবৃতিতে জানানো হয়, শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) গভীর রাতে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভ লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে গত রাতে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।’
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনের সামরিক ড্রোন নির্মাণ কারখানা এবং দেশটির মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে এবং তা সফল হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ওরেশনিক নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনের দুর্বৃত্ত সরকারের প্রতিটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর রাশিয়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় নভগোরোদ প্রদেশে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট পুতিনের একটি সরকারি বাসভবন লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় বাহিনী ৯১টি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করে। তবে রুশ সেনাবাহিনী দাবি করে, মূল লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সব ড্রোন প্রতিহত করা হয়।
এদিকে লভিভের মেয়র আন্দ্রিয়ে সাদোভয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শহরের একটি ‘জটিল অবকাঠামো’ রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তিনি জানাননি।
রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের আলোচিত ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেশনিক’ নামটি রুশ ভাষায় ‘হ্যাজেল গাছ’ বোঝায়। মাঝারি আকারের ঝোপালো এই গাছের গঠন ও বিস্ফোরণের ধরন ক্ষেপণাস্ত্রটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিক সর্বোচ্চ ৫ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও এটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নয়, তবে এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গতি। শব্দের গতি যেখানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৩১ মিটার, সেখানে ওরেশনিকের গতি শব্দের চেয়ে ১১ গুণ বেশি বলে দাবি করছে রাশিয়া। তাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের কোনো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমই এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম নয়।
এছাড়া ওরেশনিক সাধারণ বিস্ফোরকের পাশাপাশি পারমাণবিক বিস্ফোরক বহন করতেও সক্ষম। ফলে প্রয়োজনে এটিকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ইউক্রেনে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল রাশিয়া। এর আগে ২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর প্রথমবার এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ প্রতিহত করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার। আর তাতেই বিশ্ব থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটি। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশটির টেলিযোগাযোগও, বাতিল করা হয়েছে বহু ফ্লাইট। এর আগ পর্যন্ত ইরানের কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যম স্বল্প পরিসরে আপডেট তথ্য দিতে পারছিল।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতেই ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিদেশ থেকে ইরানে ফোন করার চেষ্টা করেও সফল হননি রয়টার্সের সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে দুবাই বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট জানায়, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দুবাই ও ইরানের বিভিন্ন শহরের মধ্যে নির্ধারিত অন্তত ছয়টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
এদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। খামেনি সতর্ক করে বলেন, বিদেশিদের ‘ভাড়াটে দালাল’ হিসেবে কাজ করা কাউকেই তেহরান সহ্য করবে না।
গত মাসের শেষ দিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দেশটির সব প্রদেশেই অস্থিরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এরই মধ্যে বহু মানুষের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে।
দেশটির বিভিন্ন শহরে আগুন জ্বলতে থাকার দৃশ্যও সামনে এসেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ছবিতে দাবি করা হয়, বাস, গাড়ি ও মোটরবাইক পোড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশন ও ব্যাংকেও আগুন দেওয়া হয়েছে। এসব সহিংসতার পেছনে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ভেঙে যাওয়া বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমকেও) জড়িত বলে অভিযোগ করেছে রাষ্ট্রীয় টিভি।
ক্যাস্পিয়ান সাগর উপকূলের বন্দর শহর রাশতের শরিয়াতি স্ট্রিটে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সাংবাদিক বলেন, এটা দেখতে পুরোপুরি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো লাগছে। সব দোকান ধ্বংস হয়ে গেছে।
ইরানের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো শুক্রবার আরও জোরালো বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। প্রয়াত শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্বের চোখ তোমাদের ওপর। রাস্তায় নেমে আসো।
গত সপ্তাহে তেহরানকে সতর্ক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। অবশ্য শুক্রবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, রেজা পাহলভির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি জানান, পাহলভিকে সমর্থন করা উপযুক্ত হবে কি না, সে বিষয়েও তিনি সন্দিহান।
ইরান এর আগেও আরও বড় আকারের বিক্ষোভ দমন করেছে। তবে বর্তমানে দেশটি আরও গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত সেপ্টেম্বর থেকে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার এক ফরাসি কূটনৈতিক সূত্র ইরানকে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
২০২২ সালের শেষ দিকে নারী অধিকার ইস্যুতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের আন্দোলন এখনো সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে সেটির পর থেকে এটিই কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ একদিকে অর্থনৈতিক ইস্যুতে হওয়া বিক্ষোভকে ‘যৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করছে, অন্যদিকে তথাকথিত সহিংস দাঙ্গাকারীদের নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কঠোর দমন অভিযান চালাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে খামেনি বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন জোগাতে গত রাতে তেহরানে একদল ভাঙচুরকারী ও দাঙ্গাকারী রাষ্ট্রের, অর্থাৎ জনগণের একটি ভবন ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, নিজের দেশ সামলান।
শুরুর দিকে বিক্ষোভ মূলত অর্থনীতিকেন্দ্রিক ছিল। গত বছর রিয়ালের বিপরীতে ডলারের মূল্য অর্ধেকে নেমে আসে এবং ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান যুক্ত হয়।
বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের মধ্যে ছিল ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক’ ও ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া সাবেক রাজতন্ত্রের প্রশংসা। তবে ইরানের ভেতরে রাজতন্ত্র বা এমকেওর প্রতি প্রকৃত সমর্থনের মাত্রা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, তাদের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী তরুণ পুরুষ। তবে ভিডিওগুলো যাচাই করতে পারেনি সংস্থাটি।
কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভেঙে ফেললো বিক্ষোভকারীরা
ইরানের ফার্স প্রদেশে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছেন বিক্ষোভকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চলমান বিক্ষোভের ১১তম দিন বুধবারে ফার্স প্রদেশে বিক্ষোভকারীরা সোলাইমানির ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিচ্ছেন।
২০২০ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের এক আকস্মিক হামলায় নিহত হন কাসেম সোলাইমানি। তার হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। ওই সময় একটি পৃথক ঘটনায় ভুলবশত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যরা একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা সব যাত্রী প্রাণ হারান।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে ইরানে বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকলেও বিক্ষোভ থামেনি। রাজধানী তেহরানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
বিক্ষোভের মধ্যে ইস্ফাহান শহরে সরকারি টেলিভিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অংশগ্রহণ করতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে গাজায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি চায় না ইসরায়েল।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার।
তিনি বলেন, গাজার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে প্রস্তাবিত সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী— ইন্টারন্যাশনাল স্টেবিলাইজেশন ফোর্সে (আইএসএফ) পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ করেছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না ইসেরায়েল।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘এখন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চলছে যেখানে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, কিন্তু তার জন্য হামাসকে ভেঙে ফেলতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোন উপায় নেই।’
তিনি বলেন, অনেক দেশ ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে তারা সেনা পাঠাতে অনিচ্ছুক কারণ তারা হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছা পোষণ করে না, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল বাহিনীর ধারণাকে অর্থহীন করে তুলেছে।
এনডিটিভি বলছে, উগ্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যোগসূত্রের কারণে গাজায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকায় ইসরায়েল কি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত দৃঢ়ভাবে ‘না’ উত্তর দেন, যা ইঙ্গিত দেয় গাজায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেকোনো ভূমিকার প্রতি ইসরায়েলের অসম্মতি।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যেকোনো দেশ সাধারণত কেবল তাদেরকেই সহযোগিতা করে যাদের তারা বিশ্বাস করে এবং যাদের সাথে তাদের যথাযথ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন নয়’।
এনডিটিভির দাবি, ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য করে স্পষ্ট করে যে, গাজা স্থিতিশীলকরণ ব্যবস্থায় ইসরায়েল পাকিস্তানকে বিশ্বাসযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখে না।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে গত অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ২০ দফা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান দিক হলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সেনা নিয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক বাহিনী।
ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সে (আইএসএফ) নামে বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা, হামাসকে নিরস্ত্র করা, সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ করা এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মানবিক ত্রাণ ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো বিষয়গুলো থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গাজায় মার্কিন সেনা না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, কাতার, তুরস্ক ও আজারবাইজানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যাতে তারা এই বহুজাতিক বাহিনীতে অংশ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাই না। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যমে নিউইয়র্ক টাইমসকে এসব কথা বলেন তিনি। খবর আলজাজিরার।
আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি তা মানছেন। তিনি আরও বলেন, এটি নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা আপনি কীভাবে দিচ্ছেন।
ট্রাম্প তার পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য অর্জনের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর নৃশংস শক্তি প্রয়োগের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করে। এদিন রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন জায়গায় এবং ভেনেজুয়েলার সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। মার্কিন সেনারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। সমালোচকরা এ ঘটনাকে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, এটি কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য হুমকি বা শক্তি প্রয়োগের ঘটনা।
ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধবাজ মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি গত মাসে প্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কার পান।
হামলার পরপরই ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে চালাবে এবং দেশটির বিশাল তেলের ভাণ্ডার কাজে লাগাবে। যদিও মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সহযোগিতা করবে।
এদিকে রদ্রিগেজ সম্পর্কে রোববার ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিককে বলেন, যদি সে সঠিক কাজ না করে, তাহলে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।
এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোর বিরুদ্ধেও হামলা চালাতে পারে। এ ছাড়া তিনি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণে প্রচেষ্টা আরও তীব্র করেছেন।
জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে যোগ দেন ট্রাম্প। দেশটির তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দেন তিনি।
ট্রাম্পের সহযোগী ও যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার স্টিফেন মিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেছেন, এখন থেকে পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘নিঃসন্দেহে’ সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
মিলার সোমবার সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা পরাশক্তি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরা নিজেদেরকে পরাশক্তি হিসেবেই পরিচালনা করব।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন হলো দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের নিয়ম ও আদর্শের সমষ্টি। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের কনভেনশন ও বহুপাক্ষিক চুক্তি।
বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্গারেট স্যাটার্থওয়েট আলজাজিরাকে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনকে উড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিশ্ব হয়তো সাম্রাজ্যবাদের যুগে ফিরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা ওয়াশিংটনের প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে তাদের আগ্রাসন শুরু করতে উৎসাহ দিতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন দেশগুলোকে ভয়াবহ কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারে না, যদি তারা সেটি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে আগামী সপ্তাহে একটি বৈঠক করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে ‘আগামী সপ্তাহ’ একটি বৈঠক করার প্রত্যাশা করছেন।
মাচাদো সম্প্রতি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে আত্মগোপনে ছিলেন।
ফক্স নিউজে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি যে তিনি আগামী সপ্তাহের কোনো এক সময় আসবেন। আমি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
এ সময় বিদেশি মদদপুষ্ট শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইরানকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলেন খামেনি।
তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের জানা উচিত যে রেজা শাহ, মোহাম্মদ রেজা শাহের মতো বিশ্ব স্বৈরশাসকরা তাদের অহংকারের চূড়ায় পৌঁছেই পতনের মুখে পড়েছিল। তাকেও (ট্রাম্প) একদিন পতন বরণ করতে হবে।’
অস্থিরতার মুখে ইরান পিছু হঁটবে না উল্লেখ করে খামেনি বলেন, ইরান হাজারো সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের সামনে এই দেশ কখনোই মাথা নত করবে না।
দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের প্রসঙ্গে খামেনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করতেই এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তারা তাকে (ট্রাম্প) সন্তুষ্ট করতে চায়। সে যদি সত্যিই জানত কীভাবে একটি দেশ চালাতে হয়, তাহলে নিজের দেশটাই ঠিকভাবে চালাত। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অসংখ্য সমস্যা রয়েছে।
তরুণদের উদ্দেশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, প্রিয় যুবসমাজ, তোমরা প্রস্তুতি ও ঐক্য ধরে রাখো। ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি যেকোনো শত্রুকে পরাস্ত করতে সক্ষম।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া আন্দোলন জোরদার হয়েছে। সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনাও ঘটেছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরান কর্তৃপক্ষ সারা দেশে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। শুক্রবার ভোরে সংস্থাটি জানায়, ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করতে টানা ১২ ঘণ্টা ধরে কার্যত অফলাইনে রয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির দাবি, এই অস্থিরতায় অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, ডন
ভেনেজুয়েলায় হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেয়ার পর এবার মেক্সিকোর ভূখণ্ডে হামলার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘পানিপথে আসা মাদকের ৯৭ শতাংশ আমরা বন্ধ করে দিয়েছি, এখন আমরা কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে স্থলভাগে আঘাত হানতে শুরু করব।’
ট্রাম্প দাবি করেন, ‘কার্টেলগুলোই মেক্সিকো চালাচ্ছে।’ তবে দেশটির ভূখণ্ডে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে মাদকের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ক্যারিবীয় সাগরে বহু নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নৌযানগুলো মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে মার্কিন প্রশাসন দাবি করলেও এখনো এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি তারা।
এদিকে ভেনেজুয়েলায় হামলা করে মাদুরোকে তুলে নেয়ার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। চীন, রাশিয়া এমনকি ইউরোপের কিছু দেশও এই অভিযোগ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বুক ফুলিয়ে বলেছেন, তিনি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করেন না।
ট্রাম্পের স্থল হামলার হুমকির পর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এমন কিছু হবে না।’ তিনি নিজ ভূখণ্ডে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মেক্সিকোর অধিকার জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত অপরাধী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যৌথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয় মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখন ট্রাম্প এককভাবে মেক্সিকোর ভূখণ্ডে হামলার ঘোষণা দিলেন।
সূত্র: গালফ নিউজ
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রমিক শহরের ‘কারেপেন্টার স্ট্রিট’ এখন থেকে ‘খালেদা জিয়া স্ট্রিট’ নামে পরিচত হবে। শহরটির সিটি কাউন্সিলে সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসনের সন্মানে এই নামকরণ করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপি মিডিয়া সেল।
মিডিয়া সেলের ফেসবুকে পেজে এই সংবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। হ্যামট্রমিক শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ‘কারপেন্টার স্ট্রিট’ এখন থেকে তার নামেই পরিচিত হবে। শহর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের ইতিহাস, নেতৃত্ব এবং গণতন্ত্রের প্রতি এক অনন্য স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
হ্যামট্রমিক সিটির জোসেফ ক্যাম্পাও এবং কোনাল্ট স্ট্রিটের মধ্যবর্তী অংশটি বেগম খালেদা জিয়ার নামে নামকরণের প্রস্তাবটি সম্প্রতি সিটি কাউন্সিল অনুমোদন দেয়। বর্তমানে এই কাউন্সিলে চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের সক্রিয় প্রচেষ্টায় এই নামকরণ সম্ভব হয়েছে।
প্রবাসীদের মতে, এটি কেবল একটি সড়কের নতুন পরিচয় নয়, বরং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক আন্তর্জাতিক দলিল।
বিএনপির মিডিয়া সেল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো নেতার নামে রাস্তার নামকরণ এবারই প্রথম নয়। এর আগে শিকাগো শহরে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল। এবার মিশিগানে খালেদা জিয়ার নামে সড়কটি যুক্ত হওয়ায় মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক অধ্যায় স্থায়ী রূপ নিল।
স্থানীয়রা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে নতুন প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের ইতিহাস ও দেশনেত্রীর অবদান সম্পর্কে আরও সচেতন হবে। বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা এই অর্জনে ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, এটি প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সক্ষমতারও একটি বড় প্রমাণ। হ্যামট্রমিক শহরটি তার বৈচিত্র্যময় জনপদের জন্য পরিচিত এবং সেখানে বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নামে সড়কের নামকরণ দুই দেশের মধ্যকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনকে আরও মজবুত করবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। পরেরদিন তাকে শেরে বাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মরযাদায় সমাহিত করা হয়।
নতুন বছরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেমিট্যান্স, ভিসা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর দুই সিদ্ধান্ত অন্যান্য বেশ কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পাঁচ দিনের সফরে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) ওয়াশিংটন গেছেন।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার এই সফরে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূরক শুল্কের আলোচনায় যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে তার পর্যালোচনার প্রসঙ্গ এই সফরের আলোচনায় আসবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে পৌঁছান।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, খসড়া সূচি অনুযায়ী মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকারের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার একটি বৈঠকের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরও উপস্থিত থাকবেন। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের একটি বৈঠকের কথা রয়েছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের আজ শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে শপথ নেবেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিংবা মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যাঙ্গডাও শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। ওই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। আগামী ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূতের ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ৩ হাজার ৪০১টি নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) ফিলিস্তিনের সরকারি সংস্থা ‘ওয়াল অ্যান্ড সেটলমেন্ট কমিশন’ জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি সরকার ইতিমধ্যে এই নির্মাণকাজের জন্য টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বান করেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ই-ওয়ান’ এলাকায় এই বিশাল আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।
এই এলাকাটি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড থেকে পশ্চিম তীরের ‘মারে আদুমিম’ শহরের সংযোগ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে নতুন বসতি স্থাপিত হলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব আরও পাকাপোক্ত হবে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অখণ্ডতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের ওয়াল অ্যান্ড সেটলমেন্ট কমিশনের প্রধান মুআয়াদ শাবান তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজিন্সিকে জানিয়েছেন, এই প্রকল্পটি মূলত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র চাপের কারণে গত প্রায় তিন দশক ধরে পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের এই ধরনের সম্প্রসারণ কার্যক্রম বন্ধ ছিল, কিন্তু চলমান গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। ইসরায়েল এখন আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে দ্রুত গতিতে তাদের দখলদারিত্বের সীমানা বাড়িয়ে নিচ্ছে। মুআয়াদ শাবানের মতে, এই বসতি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিম জেরুজালেমের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ওই এলাকায় ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঠেকানো।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের সমন্বয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল এবং সেই থেকে শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
বর্তমানে গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল তাদের বসতি স্থাপনের কাজকে ব্যাপক ত্বরান্বিত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরেই পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ১০ হাজার ৯৮টি বাড়ি নির্মাণের টেন্ডার পাস করেছে ইসরায়েল সরকার, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই নতুন নির্মাণ প্রকল্পের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ নীতি কার্যত অচল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইসরায়েলের ভূমি কর্তৃপক্ষ যে টেন্ডার আহ্বান করেছে, তা ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূখণ্ডে অধিকার আরও সংকুচিত করে তুলবে।
বসতি স্থাপন কার্যক্রমের এই ব্যাপক উল্লম্ফন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।