পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার বাস্তবায়নসহ নানা শর্তে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ঝুলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং জানিয়েছে, উভয়পক্ষই একমত হয়েছে যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং সংলাপের মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ শেষে গত শনিবার দেশে ফিরেছেন জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেছেন, আইএমএফের সব শর্ত মেনে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ঋণ নেবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। কারণ আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কটি কোনো চ্যারিটি নয়, বরং এটি একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। আরো ১৫ থেকে ২০ দিন চলতে পারে, এমনকি একমাসও চলতে পারে। আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনায় আমরা পুরোপুরি একমত হতে পারিনি। আইএমএফ কি চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বিশ্লেষণে জানা যায়- যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে এ অবস্থায় চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার যে আশা করছে বাংলাদেশ, তা জুনের মধ্যে ছাড় করা হবে না কি না- নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাবে, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।
আইএমএফ আমাদের বলেছে, ঋণচুক্তির আওতায় রাজস্ব খাত ও ব্যাংক খাত সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করাসহ যেসব শর্ত ছিল, বাংলাদেশ সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায়, চলমান ঋণচুক্তির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি রিভিউ (পর্যালোচনা) না করে ঋণের কিস্তি ছাড় করার ব্যাপারে তারা আগ্রহী নয়। বাংলাদেশ যদি সব শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চায়, তবুও কোনো অর্থ ছাড় বিলম্বিত হতে পারে।
তবে গত মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ-এর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল জুনে কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, তিনি সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরুর সঙ্গে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় থাকায় এখনই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময়।
আইএমএফ-এর ঋণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিষয় রয়েছে। সেসব নিয়ে আলোচনা হয়, এখানে অ্যামাউন্ট কোনো বিষয় নয়। অনেকে সেটি বুঝতে চায় না। আইএমএফ কী চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদেরও চাওয়া পাওয়া রয়েছে, আমরা একটি নির্বাচিত সরকার। কেউ কিছু চাইলেই আমরা সেটা মানব সেরকম না। বর্তমান সরকার জনগণের, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বর্তমানে যে ঋণ কর্মসূচিটি রয়েছে, সেটি আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া এবং সেখানে অনেক শর্ত রয়েছে। আর এর মেয়াদ রয়েছে মাত্র সাত মাস। আওয়ামী লীগ সরকার যেসব শর্তে এই ঋণ নিয়েছিল, তার সবকিছু বর্তমান সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। জনগণের অসুবিধা হতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বর্তমান নির্বাচিত সরকার নেবে না। আমরা সিদ্ধান্ত নেব পরবর্তী প্রোগ্রামে যাব কি না।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের স্প্রিং মিটিং-এর সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে। গত শুক্রবার গণমাধ্যমে আসা এ খবরকে নাকচ করে দিয়েছে সরকার। ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুটি বৈঠক করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে বলে গণমাধ্যমে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে, তা ‘সম্পূর্ণ অসত্য’।
এতে বলা হয়, বৈঠকগুলোতেও এ ধরনের কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং আলোচনাগুলো অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও প্রাণবন্ত’ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। রাজস্ব খাতে কোনো সংস্কার হয়নি এবং পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমানোরও কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। এ কারণেই আইএমএফ বর্তমান ঋণ কর্মসূচিতে অসন্তুষ্ট এবং এখন এটি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ কর্মসূচির শেষ কিস্তিগুলো পর্যালোচনার আগে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় সরকার আইএমএফের সব শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, অথবা শর্ত প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি থেকে সরে আসবে।
সৌদি আরব হজ মৌসুমকে কেন্দ্র করে নতুন কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো ধরনের ভিজিট ভিসা নিয়ে হজ পালন করা যাবে না। খবর গালফ নিউজ।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুধুমাত্র বৈধ হজ পারমিটধারীরাই মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন। জিলকদ মাসের শুরু থেকে জিলহজের ১৪ তারিখ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময় অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ বা অবস্থান করলে তা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির কথাও জানানো হয়েছে। ভিজিট ভিসাধারীরা হজ পালনের চেষ্টা করলে বা মক্কায় প্রবেশ করতে চাইলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানা গুনতে হবে। অন্যদিকে, অনুমতি ছাড়া হজ পালন করলে প্রবাসীদের গ্রেপ্তার করে নিজ দেশে পাঠানো হবে এবং তাদের ১০ বছরের জন্য সৌদি আরবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হজকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ‘পারমিট ছাড়া হজ নয়’ স্লোগানের আওতায় এই অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।সাধারণ মানুষকে এসব নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে। মক্কা, মদিনা, রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলে জরুরি নম্বর ৯১১ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, নির্ধারিত নিয়ম না মেনে হজ পালন করা স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন। তারা সতর্ক করেছে, নিয়ম মেনে চলাই হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমানোর নেশা আরও একবার পরিণত হলো মৃত্যুফাঁদে। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জুয়ারা উপকূল থেকে গত কয়েক দিনে ১৭ জন অভিবাসীর নিথর দেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে স্থানীয় চিকিৎসকদের একটি দল নিশ্চিত করেছে। শনাক্ত হওয়ার পর ওই বাংলাদেশির মরদেহ ত্রিপোলিতে অবস্থানরত তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৭ জনের মধ্যে ১৪ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে ধর্মীয় ও আইনি নিয়ম মেনে দাফন করা হয়েছে। তবে এখনো ২জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি, যাদের শনাক্তে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
লিবিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইমার্জেন্সি মেডিসিন অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার এই উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে। উদ্ধারকারী দলের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে এই হতভাগ্য মানুষদের মরদেহগুলো অ্যাম্বুলেন্সে তুলছেন। ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া এই মানুষগুলো আজ শুধুই একেকটি লাশ।
২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়া অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর বেকারত্ব থেকে বাঁচতে এশিয়া ও আফ্রিকার হাজারো মানুষ দালালদের প্রলোভনে পড়ে এই ভয়ংকর পথ বেছে নেন। ঝুঁকিপূর্ণ প্লাস্টিক বা রাবারের নৌকায় উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অথবা সাহারা মরুভূমিতে তীব্র পানি ও খাদ্য সংকটে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু প্রায়ই ঘটছে।
উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত ১৭ জনের মধ্যে ১৪ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে যথাযথ ধর্মীয় ও আইনি নিয়মে দাফন করা হয়েছে। আর ২ জনের পরিচয় এখনো তদন্তাধীন রয়েছে, যাদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই জলপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় চালুর ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এটি এক নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তন।
ইরানের বার্তাসংস্থা গত শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই অবরোধ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের চলমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। বিবৃতিতে হুঁশিয়ার করে আরো বলা হয়, আমরা সতর্ক করছি, পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে নোঙর করা কোনো ধরনের জাহাজই যেন নিজের জায়গা থেকে না সরে।
হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়াকে শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং কোনো জাহাজ এই নির্দেশ অমান্য করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ইসলামাবাদে যুদ্ধ শেষ করার আলোচনায় জ্যেষ্ঠ ইরানি আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী কয়েক দিন ধরেই অবরোধ ঘোষণা করে আসছে। এটি একটি অদক্ষ ও অজ্ঞ সিদ্ধান্ত।’
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজ প্রণালি স্বল্প সময়ের জন্য খুলে দিয়েছিল ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার জলপথটি ‘সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ ঘোষণা করার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায়।
কিন্তু ওই ঘোষণার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।
আইআরজিসি অবস্থান পরিবর্তনের আগে এই কয়েক ঘণ্টায় এক ডজনের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ইরানি গানবোট দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর গুলি চালিয়েছে। হামলার শিকার জাহাজ দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজে ‘গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটার’ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ওই অঞ্চলে থাকা কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ আইআরজিসির নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে রেডিও বার্তা পেয়েছে। ওই বার্তায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোনো জাহাজকেই প্রণালি দিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র অস্ট্রেলিয়া ও জাপান ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীর বহরে ১১টি যুদ্ধজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটির চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। রোববার আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত শনিবার মেলবোর্নে এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লস এবং জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কইজুমি শিনজিরো এই চুক্তির ঘোষণা দেন। এদিন এক বৈঠকে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ‘মোগামি মেমোরান্ডাম’ নামে পরিচিত এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা খাতে ‘ঘনিষ্ঠ শিল্প সহযোগিতাসহ’ সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, জাপানের মিতসুবিসি হেভি কারখানা নাগাসাকি প্রিফেকচারের দক্ষিণাঞ্চলে তিনটি স্টেলথ ফ্রিগেট নির্মাণ করবে। আর অস্ট্রেলিয়ার বাকি আটটি জাহাজ তৈরি করা হবে। জাপানে নির্মিত প্রথম যুদ্ধজাহাজটি ২০২৯ সালে সরবরাহ করা হবে এবং ২০৩০ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সেবায় যুক্ত হবে।
মার্লস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের নৌবহর গত কয়েক দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সাধারণ উদ্দেশ্যের ফ্রিগেটগুলো আমাদের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিনজিরো বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের জন্য প্রতিরক্ষা সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছে।’
গত বছর অস্ট্রেলিয়া সরকার জানায়, পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য মিতসুবিসি হেভি কারখানাকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ জন্য এ জন্য টোকিওভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জার্মানির থাইসেনক্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়া আগামী এক দশকে সামরিক খাতে রেকর্ড ৩০৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের অংশ। এর লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নৌ-শক্তি বৃদ্ধি করা। এই পরিকল্পনার অধীনে ২০৩৩ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এটি প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়া ও জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন, বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। টোকিও ও ক্যানবেরা উভয়ই যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ নিরাপত্তা জোটের সদস্য।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, শান্তি চুক্তি না হলে ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই হুমকি দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব ন্যায্য এবং যৌক্তিক একটি চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছি। আমি আশা করি তারা (ইরান) এটি গ্রহণ করবে। কারণ যদি তারা তা না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং প্রতিটি সেতু গুঁড়িয়ে দেবে।’
ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন করেছে বলেও অভিযোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালিতে গুলি চালিয়েছে—যা আমাদের যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন!’
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান একটি ফরাসি জাহাজ এবং যুক্তরাজ্যের একটি মালবাহী জাহাজে গুলি চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের ঘোষণার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ইরান সম্প্রতি প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা বেশ অদ্ভুত। কারণ আমাদের অবরোধ এমনিতেই সেটি বন্ধ করে রেখেছে। তারা না বুঝেই আসলে আমাদের সাহায্য করছে।’
ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, তবে শান্তি চুক্তি হবেই: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ করেছে। তবে এরপরেও একটি শান্তি চুক্তি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এবিসি নিউজের সাংবাদিক জনাথন কার্ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে এ কথা বলেছেন।’ জনাথন কার্ল বলেন, ‘ট্রাম্প তাকে বলেছেন, ‘এটি (শান্তি চুক্তি) হবেই। কোনো না কোনোভাবে এটি হবে। হয় সহজভাবে, না হয় কঠিনভাবে; কিন্তু এটি ঘটবে। আপনি আমার উদ্ধৃতি দিতে পারেন।’
ট্রাম্পের ভোল বদল
মাত্র একদিনে কত কিছুই না ঘটে গেল! অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি সচল হলো, তার জন্য ইরানকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; কিছুক্ষণ পরেই আবার জানালেন, ইরানি বন্দরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলবে; এর জবাবে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তার এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে পোস্ট করেন। মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে যায়।
কিন্তু ভোল বদলাতে দেরি করেননি ট্রাম্প। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে।
ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের জেরে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আবারও প্রণালিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, মার্কিন অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় হরমুজ প্রণালির দিকে আসা যেকোনো জাহাজকে শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।
গত শনিবার ইরানি সামরিক বাহিনীও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলমান থাকলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। একই দিনে ওমান উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে দুটি জাহাজে গুলির ঘটনা ঘটে, যেখানে ইরানি গানবোট জড়িত ছিল বলে জাহাজের ক্যাপ্টেন দাবি করেছেন।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত এক বিরল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটির নৌবাহিনী ‘শত্রুকে নতুন পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ দিতে প্রস্তুত’। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে জনসমক্ষে না আসা খামেনির এই বার্তা উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে’। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে, তবে এখনো কোনো জবাব দেয়নি।
দুই পক্ষের মধ্যে প্রধান মতবিরোধ রয়ে গেছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর এবং চলমান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন দিন বাকি থাকলেও, এটি বাড়ানো হবে কি না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসরায়েলের তেল আবিব শহরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে হাজারো মানুষ। শনিবার রাতে ইরান ও লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধের ইস্যুতে এ বিক্ষোভ হয়।
বার্তাসংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিক্ষোভকারী ছাইম ত্রিভ্যাক্স বলেন, ইরান ও লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল ভুল করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু দেশের জন্য নয়, বরং নিজের আইনি জটিলতা এড়াতে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, এ বিক্ষোভে উপস্থিত সবাই বর্তমান সরকার ও আগামী সরকারের কাছে ৭ অক্টোবর এবং এরপরের ঘটনাগুলোর তদন্ত দাবি করছে। ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে আমাদের এর উত্তর পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সমাজকর্মী লি হফম্যান আগিভ বলেন, আমি আজ এখানে এসেছি ৭ অক্টোবর থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চালানো যুদ্ধে যারা নিজেদের স্বজন হারিয়েছে তাদের পাশে দাঁড়াতে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাফায়েল প্লেইনা বলেন, তিনি প্রতি সপ্তাহে এ বিক্ষোভে যোগ দেন কারণ নেতানিয়াহু তাদের সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইউরোপ এবং আমেরিকার সঙ্গেও ইসরায়েলের সম্পর্ক নষ্ট করছে।
এদিকে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এ সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায়ও। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান ও লেবাননের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় চলমান এ সংঘাত নিরসন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ইরান যুদ্ধই কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে যাচ্ছে
ইরানি সভ্যতাকে মুছে ফেলার মার্কিন হুমকির মধ্যে ৭ এপ্রিল রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলেন ইসরায়েলিরা। তবে মধ্যরাতেই তারা এক অভাবনীয় খবর পান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো ১০টি শর্ত প্রকাশ করেছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা এই শর্তগুলোর ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ যেসব বিষয়ে আলোচনায় রাজি হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—শত্রুতা পুরোপুরি বন্ধ করা, তেহরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে দেওয়া এবং ইরানের মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া হামলায় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের দাবিও রয়েছে এই তালিকায়।
যদি এসব শর্ত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী চুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে, তাহলে তা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটাতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, নেতানিয়াহু একাই এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এতে টেনে এনেছিলেন। যুদ্ধের এমন পরিণতি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সোজা কথায়, শর্তগুলো মেনে নিলে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে। অথচ নেতানিয়াহু যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে এই যুদ্ধ শুরু করেন, তার লক্ষ্য ছিল এর ঠিক উল্টো।
যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মার্কিন চাপের মুখে ইরান নতি স্বীকার না করে হামলা মোকাবিলা করতে থাকলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন।
তবে সংঘাতের পরেও ইরানি শাসকদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এমন অবস্থায় নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ইরানকে চূর্ণ করে মধ্যপ্রাচ্যের বড় শক্তি হিসেবে তার মর্যাদা কেড়ে নিতে। নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিনিধি হবে ইসরায়েল। কিন্তু তার সেই স্বপ্নও পূরণ হয়নি।
ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে এবং তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং যেকোনো সময় নতুন করে পরমাণু কর্মসূচি শুরু করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধের পর এই প্রণালি নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। তবে চলমান অচলাবস্থার মধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এটি সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া যার অবস্থান সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপস চ্যানেল এলাকায়।
মালাক্কা প্রণালি আবারো আলোচনায় আসে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমার ওপর দিয়ে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য বিস্তৃত অনুমতি চেয়ে একটি প্রস্তাব দেয়। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার পর এই প্রস্তাব আসে, তবে বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক গুরুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষক ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ আজিফাহ আস্ত্রিনা বলেন, মালাক্কা প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ভারত মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা সবচেয়ে ছোট ও কার্যকর সমুদ্রপথ। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য এটি অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে নেওয়া হয়েছে- যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২৯ শতাংশ। এই একই সময়ে প্রতিদিন ২৬ কোটি ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও পরিবহন হয়েছে এই পথ দিয়ে।
যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ গোকি বালসি বলেন, এই পথ দিয়ে শুধু জ্বালানি নয়, ইলেকট্রনিকস, ভোগ্যপণ্য, শিল্পপণ্য, যন্ত্রপাতি ও গাড়িও পরিবহন হয়ে থাকে। তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ গাড়ির বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। এছাড়া শস্য ও সয়াবিনের মতো শুকনো পণ্যও পরিবহন হয় এই প্রণালির মধ্য দিয়ে। বালসি আরও বলেন, ভৌগলিক, জ্বালানি পরিবহন, নানা ধরনের পণ্য পরিবহনের দিক থেকে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হলেও মালাক্কার ভূমিকা আরও বিস্তৃত।
হরমুজ মূলত জ্বালানি রুট। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি শুধু জ্বালানি নয় বরং বহুবিধ পণ্যের ট্রান্স-শিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আস্ত্রিনা বলেন, এটা বলা যেতেই পারে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পথগুলোর একটি হলো মালাক্কা প্রণালি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক রিক্যাপ তথ্য আদান-প্রদান কেন্দ্রের মতে, মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে ২০২৫ সালে ১০৮টি জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। তাই এই প্রণালিতে জলদস্যুতা একটি চিরস্থায়ী উদ্বেগের বিষয়। এছাড়াও এই এলাকাটি সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে। ২০০৪ সালের সুনামিতে এর দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেন এখন উদ্বেগ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালাক্কার গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। বালসি বলেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে সমুদ্র আধিপত্য নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে এই পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
আস্ত্রিনা বলেন, ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পেলে তা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তার গবেষণা মতে, মালাক্কা প্রণালির বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়ার জন্য তৈরি নয়। এটি মূলত জলদস্যুতা, চোরাচালান ও সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বড় শক্তি যখন এই অঞ্চলে নিজেদের কার্যক্রম ও উপস্থিতি বাড়ায়, তখন এমন একটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা সামাল দেওয়ার জন্য বর্তমান ব্যবস্থাটি তৈরি নয়।
তবে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা কম বলেও তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, এখনই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবেনা, কারণ বাণিজ্য সচল রাখার স্বার্থ শক্তিশালী হওয়ায় সবাই সেটি বজায় রাখতে চায়। তার মতে, বড় ঝুঁকিটি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি চীন এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি বৃদ্ধির অবস্থান হিসেবে দেখে, তাহলে তারা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে সেটি সরাসরি বাণিজ্য বন্ধ করে নয় বরং এই অঞ্চলজুড়ে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে তা করতে পারে। ঝুঁকিটা সেখানেই। ধীরে ধীরে এমন এক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যেখানে সহযোগিতামূলক ও আইনশৃঙ্খলাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিবেশ বদলে গিয়ে তা রুপ নিতে পারে আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরাসরি সংঘাত না হলেও এমন পরিবর্তনের বাস্তবিক প্রভাব থাকতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরোক্ষ হলেও শক্তিশালী হবে যেমন বিমা খরচ বাড়বে, ঝুঁকির ধারণা বাড়বে এবং এমন একটি জলপথে অস্থিরতা তৈরি হবে যার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা সরলভাবে দেখাকে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, এটাকে এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই যেন ইন্দোনেশিয়া কোনো এক পক্ষের সঙ্গে জোট বাঁধছে। ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, চীনের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং অন্যদিকে রাশিয়ার মতো অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ভারসাম্য বজায় রাখছে।
বাস্তবতা হলো মহাজোটগুলোর প্রতিযোগিতা এখন এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করছে, যা এতদিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য যৌথ ও কার্যকর করিডোর হিসেবে পরিচালিত হয়ে এসেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধ চাইছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের বিরুদ্ধে কেবল আত্মরক্ষার জন্য কাজ করছে। তিনি শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি তার দেশের অঙ্গীকারের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে দ্বৈত নীতির প্রমাণ বলে অভিহিত করেছেন।
আইএসএনএ সংবাদ সংস্থা পেজেশকিয়ানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, আমরা কোনো দেশকে আক্রমণ করিনি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কোনো পক্ষকে আক্রমণ করতে চাই না, আমরা কেবল আইনসম্মতভাবে আত্মরক্ষা করছি।
তিনি বলেন, এটা ভাবা উচিত নয় যে ইরান যুদ্ধ চাইছে। বরং আমরা শান্তিপ্রিয় এবং আমরা যা করছি তা আইনসম্মত আত্মরক্ষা। যেমন প্রত্যেক মানুষ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তেমনি একটি জাতিও আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করে।
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াইয়ের ঘোষণা ইরানি সেনাপ্রধানের
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানি বাহিনী শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, স্থল, আকাশ ও সমুদ্র- সব ক্ষেত্রেই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
হাতামি বলেন, ইরানি বাহিনী দৃঢ়ভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রস্তুত রয়েছে ও একই সঙ্গে তাদের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সেনারা যে কোনো ‘শত্রুর’ মোকাবিলায় প্রস্তুত।
তার ভাষ্য, ইরানি সেনারা আত্মত্যাগের চেতনা ও ‘জিহাদের’ আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং নিজেদের দায়িত্ব পালনে তারা অটল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের বাহিনী ট্রিগারে আঙুল রেখে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শত্রুর মোকাবিলা করবে- প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে আলোচনা করতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান।
পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, তার প্রতিনিধিরা পাকিস্তানে পৌঁছাবেন এবং সেখানে আলোচনায় অংশ নেবেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘ন্যায্য ও যুক্তিসংগত’ চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছে এবং ইরান তা গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন।
তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, “আর ‘ভদ্র আচরণ’ থাকবে না।”
ট্রাম্পের এ বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ করেছে। তবে এরপরেও একটি শান্তি চুক্তি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এবিসি নিউজের সাংবাদিক জনাথন কার্ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে এ কথা বলেছেন।
জনাথন কার্ল বলেন, ট্রাম্প তাকে বলেছেন, ‘শান্তি চুক্তি হবেই। কোনো না কোনোভাবে এটি হবে। হয় সহজভাবে, না হয় কঠিনভাবে- কিন্তু এটি ঘটবে। আপনি আমার উদ্ধৃতি দিতে পারেন।’
এদিকে ইসলামাবাদে প্রথম বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা আলোচনা রয়েছে অনিশ্চয়তায়। মার্কিন প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তেহরানের একের পর এক অপরিপক্ব ও অগোছালো বক্তব্য এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
যুদ্ধ থামানোর জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এতটাই মরিয়া যে তিনি সবকিছু খুব দ্রুত শেষ করতে চাইছেন। কিন্তু পরিস্থিতি আসলে পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। কারণ, এর জন্য ইরানের রাজি হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে ইরান এখনো বিশ্বাস করে, হরমুজ প্রণালি তাদের প্রধান শক্তির জায়গা। পরিস্থিতি তাদের পক্ষেই আছে। তাই আলোচনায় ফেরার জন্য ইরানের কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
সূত্র: বিবিসি ও আল-জাজিরা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা কিউবার ওপর দীর্ঘদিনের মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ দ্রুত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। ব্রাসিলিয়ায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি কিউবার সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়ে অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।
লুলা বলেন, একটি দেশের জনগণকে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, এই অবরোধ কিউবার সাধারণ মানুষের জন্য ‘অবর্ণনীয় দুর্ভোগ’ সৃষ্টি করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এ ধরনের পরিস্থিতিতে নীরব না থাকা।
কিউবার জনগণের মৌলিক অধিকার প্রসঙ্গে লুলা উল্লেখ করেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার কিউবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে এই ‘অভিশপ্ত অবরোধ’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কিউবার মানুষ যেন নিজেদের মতো করে উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করতে পারে।
কিউবা ইস্যুর পাশাপাশি লুলা হাইতির মানবিক সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হাইতি বর্তমানে চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে এবং বহু মানুষ অনাহারের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলের সীমিত প্রতিক্রিয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, হাইতির জনগণেরও সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলো বহু বছর ধরেই কিউবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। সম্প্রতি ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং স্পেন যৌথভাবে এই অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা কিউবার অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমানে কিউবা জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের কঠিন সময় পার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধের প্রভাব স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহসহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে দেশটির উন্নয়ন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতি বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-এ এই অবরোধের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হলেও যুক্তরাষ্ট্র তা বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়নি। লুলার সাম্প্রতিক বক্তব্য এই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিতর্কে নতুন করে গুরুত্ব যোগ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তথ্যসূত্র : তাসনিম নিজ
সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট যেন কিছুতেই কাটছে না। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘিরে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংকট সমাধানে আশার আলো দেখা গেলেও তা মুহূর্তেই ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খোলা আর বন্ধ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রশি টানাটানির অবসান কিছুতেই ঘটছে না।
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আলোচনা শুরুর আগে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও তাদের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতিতে অটল রয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনাও ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট সংকট নতুন করে ঘনীভূত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। ওয়াশিংটন তাদের অযৌক্তিক সব দাবি থেকে সরে আসতে চাইছে না। একটি যৌথ কাঠামোতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষের মুখোমুখি বসা সম্ভব নয়।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। ইরানি বন্দরে অবরোধ দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্ত একটি মূর্খতাসম্মত এবং অজ্ঞতাপূর্ণ পদক্ষেপ।
গত দুই দিনে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় পক্ষ থেকেই একের পর এক ঘোষণা আসতে থাকে। এসব ঘোষণা পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছে।
গত শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১টার দিকে (বাংলাদেশ সময় প্রায় সন্ধ্যা ৭টা), ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্স-এ লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালি যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে খোলা ঘোষণা করা হলো।’
এর কয়েক মিনিট পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ‘ধন্যবাদ’ লিখে পোস্ট করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ বহাল থাকবে, যতক্ষণ না ইরানের সঙ্গে আমাদের লেনদেন শতভাগ সম্পন্ন হয়।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকের পর জানান, পরিস্থিতি অনুকূল হওয়া মাত্রই তারা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবেন।
কয়েক ঘণ্টা পর, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০টা ১৪ মিনিটে, মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এক্স-এ লেখেন, ‘ট্রাম্প এক ঘণ্টার মধ্যে সাতটি দাবি করেছেন, যার সবকটিই মিথ্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘(যুক্তরাষ্ট্রের) অবরোধ অব্যাহত থাকলে প্রণালিটি খোলা থাকবে না।’ ট্র্যাকিং সাইট মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য বলছে, শনিবার কিছু জাহাজকে ওই জলপথ দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, গ্রিনিচ মান সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি জানায়, ইরানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তাদের দায়বদ্ধতা পূরণ করেনি এবং যাতায়াতের জন্য ইরানের অনুমতি প্রয়োজন।
এর কিছুক্ষণ পরই মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, একাধিক জাহাজ দিক পরিবর্তন করে নিজেদের যাত্রা শুরুর বন্দরের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাত নিরসনে এবং একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজার লক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আলোচনার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। রোববার পাকিস্তানের প্রভাবশালী একাধিক সূত্রের বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, আগামী শুক্রবারের আগেই এই দুই দেশের প্রতিনিধিরা আবারও মুখোমুখি হতে পারেন। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি, তবে ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ কিছু আলামত এই সম্ভাব্য আলোচনার পথকেই নির্দেশ করছে।
কূটনৈতিক ও সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার প্রথম শক্তিশালী ইঙ্গিত পাওয়া গেছে রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশাল সি-১৭ গ্লোবমাস্টার বিমানের অবতরণের মাধ্যমে। সাধারণত উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল বা প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্টের জন্যই এ ধরণের শক্তিশালী সামরিক পরিবহন বিমান ব্যবহার করা হয়। এর পরপরই ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর অত্যন্ত স্পর্শকাতর ‘রেড জোন’ এলাকায় যাওয়ার প্রধান সড়কগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তার এই বিশেষ প্রটোকল কেবল অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাতায়াতের সময়ই কার্যকর করা হয়।
এছাড়া ইসলামাবাদের অভিজাত হোটেল সেরেনা এবং ম্যারিয়ট-এর সাম্প্রতিক অবস্থা এই জল্পনাকে আরও জোরালো করেছে। জানা গেছে, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এই হোটেলগুলোতে নতুন কোনো বুকিং নেওয়া হচ্ছে না এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগে থেকে থাকা অতিথিদেরও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মূলত অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠকের শতভাগ গোপনীয়তা বজায় রাখতেই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ এই ধরণের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত ১১ এপ্রিল এই সেরেনা হোটেলেই দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফার ঐতিহাসিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, সোমবারই হয়তো এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ধরণ দেখে মনে হচ্ছে সোমবারের পরিবর্তে চলতি সপ্তাহের শেষভাগে অর্থাৎ শুক্রবারের আগে যেকোনো দিন এই ঐতিহাসিক সংলাপের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামানোর এই বিশ্বস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তান পুনরায় প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে। তেহরান ও ওয়াশিংটন প্রথম দফার ব্যর্থতা কাটিয়ে এবার কোনো কার্যকরী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে একই সাথে গভীর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।