পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত আকার ধারণ করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তেলবাহী জাহাজ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে ইরানে নিহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৩২ জনে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে পেন্টাগন। এ যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে—এমনটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের বরাতে এমনটি জানিয়েছে আল জাজিরা ও রয়টার্স।
এদিকে, ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র (আইআরজিসি) আলি মোহাম্মদ নাঈনি বলেছেন, ইরান ‘দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের’ জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তেহরান এমন উন্নত অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যা এখনো এই সংঘাতে ব্যবহার করা হয়নি। শুক্রবার (৬ মার্চ) আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
এক বিবৃতিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাঈনি বলেন, ইরানের শত্রুদের ভয়াবহ হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, কারণ শিগগিরই হামলার নতুন ধরনের ঢেউ শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, ইরানের নতুন উদ্যোগ ও নতুন অস্ত্র আসছে। এই প্রযুক্তিগুলো এখনো বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়নি।
নাঈনি আরও বলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরান এখন অনেক বেশি প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ হামলা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই সময়ের মধ্যে তারা ইরানের বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে চায়। এমন তথ্য জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল। ইসরায়েলের লক্ষ্য হচ্ছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এবং তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমা হামলার কয়েক দিন পর এই পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনার ফলে মার্কিন অর্থনীতির ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করে ইরানে। শুক্রবারও (৬ মার্চ) রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশে হামলার খবর এসেছে গণমাধ্যমে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, শহরের জিবাসহর অঞ্চলের একটি আবাসিক এলাকায় চালানো হয়েছে এবং এতে নিরপরাধ নাগরিকরা প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানে বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট পির হোসেইন কোলিভান্দ বলেন, হামলায় তিন হাজার ৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে বাড়ি তিন হাজার ৯০টি। এ ছাড়া ৫২৮টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও সেবাকেন্দ্র, ১৪টি চিকিৎসা স্থাপনা এবং রেড ক্রিসেন্টের ৯টি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার বেশিরভাগ লক্ষ্য ছিল ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অব্যাহতভাবে রাজধানী তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানের ড্রোন। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার কথা জানিয়েছে তেহরান।
ইরানে হামলা চালানো ও তেহরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তারা ফ্লোরিডার টাম্পায় নিজেদের সদর দপ্তরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে অনুরোধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করবেন ওই কর্মকর্তারা।
যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইরান সংকট আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে এ সংকট কয়েক দিন নয়; বরং কয়েক সপ্তাহ এবং সম্ভবত কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
যুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কাতারভিত্তিক জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। সে কারণেই এমনটা হয়েছে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এমন একটি ধারণা কাজ করছিল যে এটি সম্ভবত গাদ্দাফির লিবিয়া বা সাদ্দামের ইরাকের মতো, যেখানে আপনি মূল নেতাকে সরিয়ে দেবেন এবং হঠাৎ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে অথবা বিরোধীরা একজোট হয়ে মার্কিন বিমান হামলাকে সমর্থন জানাবে। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই ঘটেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অবিশ্বাস্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।’
ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে লেবাননে প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। হাজার হাজার সিরীয় শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে নিজ দেশে ফিরে গেছেন বলেও জানিয়েছে তারা।
শুক্রবার (৬ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। মধ্যপ্রাচ্যের এ পরিস্থিতিকে ‘বড় মানবিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এ আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
গত সোমবার ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবাননে বিমান হামলা শুরু করে।
দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের কিছু অংশ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দাবি করে, হিজবুল্লাহ সম্পর্কিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে তারা।
এদিকে, আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা গত এক ঘণ্টা বা তার কাছাকাছি সময়ে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি লক্ষ্য করে দুটি হামলা হতে দেখেছে। এটি ছিল একটি সহিংস রাত, যেখানে ওই এলাকার পাড়া-মহল্লা লক্ষ্য করে ১২টিরও বেশি হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের নজিরবিহীন উচ্ছেদ হুমকির পর এই এলাকাগুলো এখন বাসিন্দা শূন্য।
কিছুক্ষণ আগে দক্ষিণ দিকের সিডন শহরে একটি হামলা হয়েছে, যা হিজবুল্লাহর শক্তঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত নয়। সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় হামাসের একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়ে বলেছেন, লেবানন এখন এক বিপজ্জনক মুহূর্তের মুখোমুখি এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর, যেখানে একটি মানবিক বিপর্যয় আসন্ন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে। তারা লেবাননের সীমান্ত বরাবর ভেতরে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এই সংঘাত কেবল বৃদ্ধি পেতেই দেখা যাচ্ছে।
যৌন নিপীড়নের বৈশ্বিক চক্র পরিচালনার অভিযোগে জোবাইদুল আমিন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশি নাগরিক।
মালয়েশিয়া থেকে গ্রেপ্তারের পর গত বুধবার জোবাইদুলকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় নেওয়া হয়। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার তাকে অঙ্গরাজ্যটির আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি শিশু যৌন নিপীড়নের একটি বৈশ্বিক চক্র পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদালতের নথির বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০২২ সালের জুলাইয়ে ২৮ বছর বয়সী জোবাইদুলের বিরুদ্ধে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি অভিযোগ গঠন করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আলাস্কাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং বিদেশে থাকা কয়েকশ অপ্রাপ্তবয়স্ককে নিপীড়নের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের খুঁজে বের করতেন এবং চাপ দিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তৈরি করাতেন। এর মধ্যে ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ গঠনের আগে জোবাইদুল মালয়েশিয়ার একটি মেডিকেল স্কুলে অধ্যয়ন করতেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে শিশু পর্নোগ্রাফি সংরক্ষণ ও তৈরি সংক্রান্ত ১৩টি অভিযোগ আনা হয়।
জোবাইদুলকে ধরতে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এফবিআই ও মার্কিন বিচার বিভাগ যৌথভাবে কাজ করে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বজুড়ে শত শত অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগে এক বাংলাদেশি নাগরিককে মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিদেশে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের খুঁজে বের করতে প্রশাসনের জোরদার প্রচেষ্টার এটি আরেকটি সফল উদাহরণ।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হলে জোবাইদুলের সর্বনিম্ন ২০ বছর থেকে সর্বোচ্চ আজীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এ লক্ষ্যে নতুন কিছু অস্ত্র আগে থেকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এজন্য নতুন অস্ত্রও আমরা আলাদাভাবে তুলে রেখেছি। সেসব এখনও বড় মাত্রায় ব্যবহার করা হয়নি। নতুন অস্ত্রগুলো শত্রুদের গুরুতর এবং যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাঘাত করবে। বর্তমানে সেগুলো পাইপলাইনে আছে, যথাসময়ে ব্যবহার করা হবে।”
বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে নিজেদের ক্লাস্টার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খাইবার’ নিক্ষেপ করে ইরান। ওই ঘটনার পরই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাইনি এ বিবৃতি দেন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ২১ দিন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। তবে ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো সমঝোতা ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়।
এর পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। একই সময়ে ইসরায়েলও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে।
গত সাত দিন ধরে সংঘাত চলমান রয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একাধিক দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত হয়েছিল। নাইনি দাবি করেছেন, সেই সময়ের তুলনায় এবারের যুদ্ধে ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ।
সূত্র : আলজাজিরা
ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
ইসরায়েলি বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর এ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একই সময়ে তেল আবিবকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
লাইভ ফুটেজে তেল আবিবের আকাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যেতে দেখা গেছে। তবে সেগুলো ঠেকাতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোর দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানে সামরিক অভিযানের সময়সীমা নিয়ে আগের বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে চান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পরদিন ১ মার্চ সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, চার সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযান শেষ হওয়ার আশা করছেন তিনি।
এর পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগেসেথ বলেন, যুদ্ধ আট সপ্তাহ পর্যন্তও গড়াতে পারে।
তবে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সাময়িকী টাইমকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমার কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই। ইরানে আমি শুধু আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে চাই। আমাদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় লক্ষ্য হলো; ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। চতুর্থ লক্ষ্য হলো, তাদের কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও থাকতে পারবে না।”
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাজ্যে ইরানি গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী এ অভিযান চালায়।
লন্ডনে পরিচালিত ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তের অংশ হিসেবে ওই চারজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার সন্দেহে একজন ইরানি নাগরিক এবং ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কার্যক্রম লন্ডনের ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্থানের ওপর সম্ভাব্য নজরদারির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এ ঘটনায় ওয়াটফোর্ড, বার্নেট ও ওয়েম্বলির কয়েকটি ঠিকানায় এখনও তল্লাশি অভিযান চলছে।
পুলিশ জানায়, ৪০ ও ৫৫ বছর বয়সী দুইজনকে বার্নেটের দুটি ঠিকানা থেকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৫২ বছর বয়সী একজনকে ওয়াটফোর্ড থেকে এবং ২২ বছর বয়সী আরেকজনকে হ্যারো এলাকার একটি ঠিকানা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
একই ঘটনায় হ্যারোর ওই স্থান থেকে একজন অপরাধীকে সহায়তার সন্দেহে আরও আটজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের বয়স ২৯, ৩৯, ৪২ ও ৪৯ বছর এবং বাকি দুইজনের বয়স ২০ বছর।
সূত্র: বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তারও ভূমিকা থাকা উচিত।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) তিনি এই মন্তব্য করেন এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপির।
এদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণের উপশহরগুলোতে ইরান-সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। হামলার আগে ওই এলাকা খালি করার সতর্কতা জারি করা হলে আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে চলে যান।
সংঘাতের প্রভাব দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে একটি মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো নিক্ষেপ করে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার পর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প একই দিনে খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনিকে তার নিহত পিতার স্থলাভিষিক্ত করার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তিনি তাকে ‘দুর্বল ও অযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে অবশ্যই অংশ নিতে চাই, যেমনটি ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ক্ষেত্রে করেছি।’
তিনি ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পর সেখানে ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতায় এসেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘খামেনির ছেলে আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য। আমরা এমন একজন নেতাকে চাই, যিনি ইরানে সম্প্রীতি ও শান্তি আনতে পারবেন।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বেছে নেওয়ার মতো উপযুক্ত নেতা না পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পুরো সরকার উৎখাতের পরিবর্তে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভেতরের কোনো ব্যক্তিকে নিয়েই কাজ করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন। যদিও তিনি এর আগেও সাধারণ ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে অতীতে চীনের ক্ষেত্রে দেওয়া অর্থনৈতিক সুবিধা নয়াদিল্লিকে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বৃহস্পতিবার রাইসিনা ডায়ালগে বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এ মন্তব্য করেন।
ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক এক অধিবেশনে তিনি বলেন, প্রায় দুই দশক আগে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে নীতিগত ভুল করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হবে না।
ল্যান্ডাউ বলেন, ‘ভারতকে বুঝতে হবে—২০ বছর আগে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে ভুলগুলো করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তা করা হবে না।’
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ‘অসীম সম্ভাবনা’কে কাজে লাগিয়ে যৌথভাবে কাজ করতে চায়। তবে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ওয়াশিংটন অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রস্তাব দেন ল্যান্ডাউ। তিনি বলেন, ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র নয়াদিল্লির সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
এদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতকে সাময়িক ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জানা গেছে, আগামী ৩০ দিন পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর থাকবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। কয়েক দফা আলোচনার পর গত মাসে ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ল্যান্ডাউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র শুল্ককে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমঝোতার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সময়ে ভারতও কৌশলী অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বিস্তৃত করছে।
আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বহুমুখী কৌশল অনুসরণ করছে ভারত।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
ইসরাইলের একটি ‘অত্যাধুনিক’ হেরন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের আকাশে উড়তে থাকা ইসরাইলি ড্রোনটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় এবং সেটি ভূপাতিত করা হয়।
হেরন ড্রোন ইসরাইলের সবচেয়ে বড় ধরনের মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) হিসেবে পরিচিত। ২০০৭ সালে প্রথম সামরিক ব্যবহারে আনা এই ড্রোন দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারে এবং মূলত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে শুক্রবারের জুমার নামাজ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজান শুরুর পর ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম এই স্থানে আরোপিত বিধিনিষেধের ধারাবাহিকতায় নতুন এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মুসলিমদের পবিত্র রমজান মাস চলাকালীন এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ইসরাইলের সিভিল প্রশাসনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম ইব্রাহিম বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) এক বার্তায় জানান, ইসরাইল ও পুরো অঞ্চলের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এদিকে গত শনিবার ইসরাইল ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। যদিও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছিল, তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার বিষয়ে সম্মত হওয়ায় একটি সমঝোতা প্রায় হাতের নাগালেই ছিল।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেরুজালেমের ওল্ড সিটির সমস্ত পবিত্র স্থান শুক্রবার বন্ধ থাকবে। ফলে কোনো ধর্মের কাউকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে না।
ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত ইসরেইলে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে অন্তত এক হাজার ২৩০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জেরুজালেমের পুরোনো শহরে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরাইল। বর্তমানে সেখানে শুধু স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকান মালিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে।
আল-আকসা মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম ইকরিমা সাবরি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, দখলদার কর্তৃপক্ষ যে কোনো অজুহাতে আল-আকসা বন্ধ করে দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
যদিও ইসরায়েল বর্তমান যুদ্ধের দোহাই দিচ্ছে, তবে রমজান মাসের শুরু থেকেই আল-আকসায় নামাজ আদায়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছিল তারা।
উল্লেখ্য, জেরুজালেমের পুরোনো শহর অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে এই অঞ্চল দখল করার পর ইসরাইল পরে একতরফাভাবে এটি নিজের সঙ্গে যুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডানপন্থী ইসরাইলি রাজনীতিক ও বসতি স্থাপনকারীদের নিয়মিত সফরের কারণে আল-আকসা প্রাঙ্গণ ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও সেখানে ইহুদিদের নামাজের অধিকার দেয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং একসময় সেখানে একটি উপাসনালয় নির্মাণের কথাও বলেছেন।
সূত্র : আল-জাজিরা।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ইসরায়েলি দূতাবাস লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দিবাগত রাতে মানামার ‘ফাইন্যান্সিয়াল হারবার টাওয়ারস’ নামের ওই বাণিজ্যিক ভবনে এই আক্রমণ চালানো হয়।
শুক্রবার (৬ মার্চ) ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সটিতে ইসরায়েলি দূতাবাস অবস্থিত হওয়ার কারণেই সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরান এই হামলাকে সরাসরি ইসরায়েলি স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সটির কাছাকাছি এলাকায় একটি ইরানি ড্রোন শনাক্তের পর সেটি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই ভূপাতিত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই হামলায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র : আল-জাজিরা।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে ইরান আশপাশে প্রায় দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে টার্গেট করেছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই সংঘাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ অভিযানে ইরানে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে।
তেহরানসহ ইরানের পবিত্র শহর কোম, ইসফাহান এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন নিরাপত্তা স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। জবাবে ইরানও পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আবাসিক ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস-এর (IRGC) আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর ভবন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কমান্ডের কার্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ১,০৫৫ জন নিহত হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। তেহরান থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি জানান, পুরো দেশ এখন সব দিক থেকে আক্রান্ত। অন্তত ৩০০ শিশু ও কিশোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং আহত মানুষের সংখ্যা ৬,০০০ ছাড়িয়েছে।
মার্কিন তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালাল ইরান
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। এবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার দাবি করল ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ইরান বলেছে, তারা পারস্য উপসাগরে আমেরিকার একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ইরানি নৌবাহিনী ‘সফলভাবে একটি আমেরিকান তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর ১৯তম দফার হামলা
ইরানের প্রেস টিভি এবং আইআরজিসি (IRGC) সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে তাদের ১৯তম দফার হামলা শুরু করেছে।
তাসনিম নিউজ আইআরজিসি-র উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই সর্বশেষ হামলায় ইসরায়েল এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত ‘আমেরিকান সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলো’ লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘ট্রু প্রমিজ-৪’।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, ইসফাহানের পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছের দুটি ভবনে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। তবে মূল পারমাণবিক স্থাপনা বা তেজস্ক্রিয় পদার্থের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং বিকিরণের কোনো ঝুঁকি নেই।
খামেনির জানাজা ও উত্তরসূরি নির্বাচন
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছে, যা বিশাল জনসমাবেশে রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খামেনি গত শনিবার নিহত হন। তার সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহসহ আরও কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হন।
এদিকে, খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের কাজ চলছে। প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামি জানিয়েছেন, তারা খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন। ইসরায়েলি ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘ইরানের পরবর্তী নেতা যেই হোন না কেন, তিনি যদি ইসরায়েল ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন, তবে তাকেও নির্মূল করা হবে।’
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের নেতৃত্ব এখন বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন খুব শক্তিশালী অবস্থানে আছি। যারা নেতা হতে চাচ্ছে, তারাই শেষ পর্যন্ত মারা যাচ্ছে।’
আজারবাইজানে ইরানের ড্রোন হামলা
নিজেদের ছিটমহল নাখচিভানে ড্রোন হামলা চালানোর জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছে আজারবাইজান। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ করা হয়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নাখচিভানের একটি বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং অন্যটি একটি স্কুলের কাছে পড়েছে। এই ঘটনায় দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। আজারবাইজান এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা প্রয়োজনীয় প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে আজারবাইজান সরকার ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থি এবং এটি এই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরান এখন পর্যন্ত আজারবাইজানকে লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবে আঞ্চলিক দেশগুলোকে জড়িয়ে যুদ্ধ চলতে থাকায় ইরানের হামলাগুলো অনিয়মিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইরানের ৭৫টি ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর দাবি বাহরাইনের
বাহরাইনের দিকে ধেয়ে আসা ইরানের ৭৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৫টি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার আগেই ধ্বংস করে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বাহরাইনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জেনারেল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে এ তথ্য।
বিবৃতিতে জেনারেল কমান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমাদের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত সক্রিয় আছে এবং ইরান থেকে আসা মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করছে। নাগরিক এবং বাসিন্দাদের অনুরোধ করা হচ্ছে যে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যেন তারা বাড়ির বাইরে বের না হন।’
কতগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো সম্ভব হয়নি এবং সেসবের আঘাতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে— সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য জেনারেল কমান্ডের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের ঘাঁটি আছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে ইরান।
ইরাকে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা
ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় খোর আল-জুবায়ের বন্দরের কাছে নোঙর করা বাহামাসের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এই হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন ইরাকি নৌবাহিনীর একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় সময় রাত ১টা ২০ মিনিটে একটি ছোট অজ্ঞাত নৌকা ট্যাঙ্কারটির কাছাকাছি আসে। এর কিছুক্ষণ পরই জাহাজটির বাম পাশে একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে বিস্ফোরণের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবারই ইরাকের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরাকি নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বসরা প্রদেশ থেকে প্রতিবেশী একটি দেশকে লক্ষ্য করে চালানো একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযানকালে নিরাপত্তা বাহিনী একটি মোবাইল লঞ্চ প্ল্যাটফর্ম জব্দ করেছে। এতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা উৎক্ষেপণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
ইরানের আকাশজুড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গর্জন আর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আকস্মিক হত্যাকাণ্ডে পুরো মধ্যপ্রাচ্য যখন খাদের কিনারে, তখন সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের মস্কোয় বসে এক ভিন্ন সমীকরণ মেলাচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন। আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের এই বিপর্যয় রাশিয়ার জন্য অস্বস্তির মনে হলেও, ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়- পুতিনের জন্য এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসের এক চূড়ান্ত প্রতিফলন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির নৃশংস পরিণতি পুতিনকে যে শিক্ষা দিয়েছিল, ইরানের বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ যেন সেই আশঙ্কারই এক জীবন্ত দলিল।
ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার আগ্রাসনকে যারা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আসছিলেন, পুতিনের কাছে ইরানের এই পরিস্থিতি তাদের জন্য এক মোক্ষম জবাব। তিনি একে দেখছেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের ‘উচ্ছৃঙ্খল ও অযৌক্তিক’ আচরণের প্রমাণ হিসেবে। একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম রাশিয়ার কোষাগারকে সমৃদ্ধ করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন চোরাবালিতে আমেরিকার ব্যস্ততা ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে দিচ্ছে এক অভাবনীয় কৌশলগত সুবিধা।
লিওনিদ রাগো জিনের এই বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে ইরানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে নিজের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে পুতিন বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার দাপট এবং নিজের ‘ত্রাতা’ ইমেজকে আরও সুসংহত করছেন। পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড মস্কোর জন্য কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার কিছু কট্টরপন্থি বিশ্লেষক দাবি করছেন যে, বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও রাশিয়াও একইভাবে আক্রান্ত হতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বেপরোয়া বক্তব্যগুলোকে তারা এই অশুভ ইচ্ছার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
যদিও ইরানের ওপর এই হামলা মস্কোর জন্য উদ্বেগের কারণ, তবে এটি তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক কৌশল- এমনকি ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের বিষয়টিকেও সঠিক বলে প্রমাণ করছে। এটি ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকেই নিশ্চিত করছে যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব একটি ‘উচ্ছৃঙ্খল ও অযৌক্তিক’ শক্তি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ সম্ভবত ২০১১ সালের লিবিয়া সংকটেরই এক প্রতিচ্ছবি, যা তার নিজস্ব নিরাপত্তাঝুঁকির ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই বছর ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
লিবিয়ায় ন্যাটোর সেই হামলাকে পুতিনের অনুগত এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে রাশিয়ার ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত ছিল মেদভেদেভের, যা পুতিনকে আবারও প্রেসিডেন্সিতে।
২০১১ সালের অক্টোবরে, পুতিন যখন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার মনোনয়ন গ্রহণ করেন তার ঠিক এক মাস পর, বিদ্রোহীদের হাতে লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নৃশংসভাবে খুন হন এবং তার মৃত্যুর সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা নেতারা তখন গাদ্দাফি শাসনের পতনকে উদযাপন করলেও, তা লিবিয়ায় গণতন্ত্র বা সমৃদ্ধি- কোনোটাই আনতে পারেনি। উল্টো দেশটি গৃহযুদ্ধ এবং চরম বিভক্তির দিকে ধাবিত হয়।
পুতিনের কাছে এটি ছিল এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা- ক্রমবর্ধমান বেপরোয়া এবং অতি-আত্মবিশ্বাসী পশ্চিমা বিশ্বের নব্য-উদারবাদী ‘গণতন্ত্রায়ন’ অভিযানকে যদি তিনি প্রশ্রয় দেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে তার এবং রাশিয়ার ভাগ্যেও এমন কিছু ঘটতে পারে। ওই বছরের ডিসেম্বরেই মস্কোতে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে পশ্চিমাঘেঁষা শহরবাসীরা বিক্ষোভ শুরু করে। এটি ক্রেমলিনের জন্য ছিল আরও একটি ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপদ সংকেত।
২০১২ সালের মে মাসে নিজের শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার আগে পুতিন কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় ছিল, যা পরবর্তী দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের ‘ময়দান বিপ্লবে’ রাশিয়ার হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করেছিল।
ইরানের বর্তমান নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে পুতিন সম্ভবত আজ আত্মতৃপ্তি বোধ করছেন যে, ইউক্রেনে তার পদক্ষেপগুলো সঠিক ছিল। একই সঙ্গে তিনি তার সোভিয়েত পূর্বসূরিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন যে, তারা বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করে গিয়েছিলেন- যা রাশিয়ার প্রকৃত সার্বভৌমত্ব এবং তার নিজস্ব শাসনব্যবস্থার অভেদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
ইউরোপে রাশিয়ার নিকটতম প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে নিজে একটি নৃশংস ও আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করা সত্ত্বেও, পুতিন নিজেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার একজন একনিষ্ঠ রক্ষক মনে করেন। তার মতে, এই বিশ্বব্যবস্থার পতনের মূল কারণ হলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের অতি-আত্মবিশ্বাস, অসহনীয় ঔদ্ধত্য এবং বেপরোয়া আচরণ।
ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন চালানোর ধারণার শিকড় নিহিত রয়েছে ১৯৩০-এর দশকের সোভিয়েত তত্ত্বে, যার মূল কথা ছিল- যুদ্ধকে শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া। ২০০৭ সালে যখন ন্যাটো ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই দেশ দুটি ক্রেমলিনের চোখে ‘শত্রু ভূখণ্ডে’ পরিণত হয়। ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এই তত্ত্বটি প্রথমবারের মতো সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার অভিযানকে ক্রেমলিন একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের মতে, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া যে ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে এবং বর্তমানে ইরান যা মোকাবিলা করছে, তা থেকে রক্ষা পেতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমের সঙ্গে এই লড়াইয়ে ইউক্রেনকে চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার মাধ্যমে ক্রেমলিন রাশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীকে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে আড়াল করতে পেরেছে। আর রুশ সমাজের কাছে এই যুদ্ধকে একটি ‘অনিবার্য’ পরিস্থিতি হিসেবে সফলভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, দুদেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বৈরী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান রাশিয়ার এক অপ্রত্যাশিত মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল- যখন পশ্চিমের অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে তুর্কি ‘বায়রাক্তার’ ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে ইউক্রেন রাশিয়ার ওপর প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তার করবে। তবে ইরানের এই সমর্থন কোনো নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের নিদর্শন ছিল না; বরং এর বিনিময়ে তেহরানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল, যা তাদের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে।
তবে রাশিয়া ও ইরানের এই সম্পর্ক এখন এতটাই গভীর নয় যে মস্কো ইরানের পক্ষ হয়ে এই যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। এর বাইরেও, ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রেমলিনের একটি অলিখিত ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ রয়েছে। ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করতে অস্বীকার করেছে এবং রাশিয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞাতেও যোগ দেয়নি। যেহেতু ইসরায়েল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মানে না, তাই এটি এখন রাশিয়ার সেই সব ধনী অভিজাত বা অলিগার্চদের জন্য একটি ‘নিরাপদ স্বর্গ’ হয়ে উঠেছে, যাদের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
রাশিয়ার নিরপেক্ষ থাকার আরও একটি বড় কারণ হলো- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আলোচনার মাধ্যমে এটি শেষ করার চেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে, মস্কো চায় না ইউরোপীয় নেতারা কোনোভাবে তাতে বিঘ্ন ঘটাক বা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পাক।