পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
ভেনিজুয়েলার বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পের পর চার দিনে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, এবং লা গুয়াইরাসহ বিভিন্ন শহরের ধ্বংস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেই দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
‘ধ্বংসস্তূপগুলোতে আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত আছে। গত রোববার (২৮ জুন) ধ্বংস্তূপে আটকে পড়া মরদেহগুলো যেমন উদ্ধার করা হয়েছে, তেমনি জীবিতদেরও উদ্ধার কর হচ্ছে। আমাদের অভিযান শিগগিরই শেষ হচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপের তলায় আমাদের স্বজনার জীবিত আছেন— এমন আশনিয়ে আমাদের এগোতে হবে’, বিবৃতিতে বলেছেন দেলসি।
বুধবার (২৪ জুন) ভেনিজুয়েলার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনিজুয়েলায়। দুই ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড ছিল বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)।
বুধবারের (২৪ জুন) ভূমিকম্পকে ভেনিজুয়েলার এ যাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে সবচাইতে ভয়াবহ, বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটির অজস্র ভবন, বাসাবাড়ি আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এই জোড়া ভূমিকম্পে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মোট নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে বাড়িঘর ও ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের উদ্ধারের জন্য দিশেহারা অবস্থায় আছে উত্তর ভেনিজুয়েলার হাজার হাজার পরিবার।
ভূমিকম্পের পর ভেনিজুয়েলার বহু এলাকা বিদুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেলসি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ পরিষেবা বিভাগের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের অন্তত ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
এর আগে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্টের স্পিকার জর্জ রদ্রিগুয়েজ বলেছিলেন, বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫০ জনের মরদেহ এবং আহত অবস্থায় ৩ হাজার ১৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলায় এ পর্যন্ত ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন জর্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলায় নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনিজুয়েলার সরকারের পক্ষ থেকে এখনও নিখোঁজদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি; তবে দেশটির বিরোধী দলের দাবি, এখনও নিখোঁজ আছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।
উত্তর জার্মানির শহর স্টাডেতে একটি যুব কল্যাণ কেন্দ্রে বন্দুক হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও বেশ কয়েক জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন বন্দুকধারীসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বন্দরনগরী হামবুর্গের কাছে অবস্থিত যুব কল্যাণ কেন্দ্রে হামলার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি পলাতক নেই। তিনি বলেন, ঠিক কতজন আহত হয়েছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিহতরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামবুর্গের পশ্চিমে অবস্থিত স্টাডেতে প্রায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। বন্দুক হামলার পর পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের ওই এলাকা থেকে এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ভেনিজুয়েলায় উদ্ধারকারীরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এদিকে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে দেশটির বাতাস। এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫১ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বুধবার (২৪ জুন) রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প লা গুয়াইরার আশেপাশের উপকূলীয় এলাকাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এলাকাটিতে প্রবেশ সীমিত করার পদক্ষেপ নেয় কারণ যানজটের বিশৃঙ্খলা উদ্ধারকাজকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
সরকারি উদ্ধারকারী দলের অপ্রতুলতার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং তারা হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছে। সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, লা গুয়াইরার আশেপাশের এলাকায় প্রবেশ করতে চাইলে এখন থেকে যে কাউকে সরকারি অনুমতি নিতে হবে। তবে কাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
কর্তৃপক্ষ একটি শক্তিশালী সরকারি প্রতিক্রিয়ার চিত্র তুলে ধরলেও, মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খুব কম সংখ্যক সরকারি উদ্ধারকারী দল দেখেছে বলে জানিয়েছে। সরকারি বাহিনী লা গুয়াইরায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে খাদ্য ও পানি বিতরণ করছে এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, জীবিত মানুষ উদ্ধারের এই সংকটময় মুহূর্তে তার সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী ও মানবিক সহায়তার আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। রদ্রিগেজ বলেছেন, লা গুয়াইরাকে সামরিকীকরণ করা হয়েছে এবং আরও সাহায্য আসছে। যদিও বাসিন্দারা বলেছেন, এটি তাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।
ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ দিন পর জীবিত উদ্ধার ১১ বছরের শিশু
ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার রাতে দেশটির লা গুয়াইরা অঞ্চলে এ উদ্ধার অভিযান সফল হয়, যা চলমান দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমে আশার নতুন আলো এনে দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, কারাবায়েদা এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুটি জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের ভিডিওতে দেখা যায়, হেলমেট ও বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরা উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের স্তূপ বেয়ে একজনকে নিচে নামিয়ে আনছেন। পরে তাকে স্ট্রেচারে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের অন্ধকারে ফ্লাডলাইট ও টর্চের আলোয় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
রদ্রিগেজ বলেন, কিছুক্ষণ আগে কারাবায়েদায় ১১ বছর বয়সি একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই মুহূর্তে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি জীবনই ভেনিজুয়েলার জন্য আশার প্রতীক। এর আগে শনিবার একই অঞ্চলে মোইসেস নামের আরেক ১১ বছর বয়সি শিশুকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকাজে সহায়তাকারী কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট (UNGRD) জানায়, শিশুটি উদ্ধারে প্রায় ছয় ঘণ্টার অত্যন্ত সতর্ক ও নিখুঁত অভিযান চালানো হয়।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলে, মোইসেসকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং সে এখন নিরাপদে রয়েছে। ছয় ঘণ্টার সূক্ষ্ম উদ্ধার অভিযানের পর আমাদের উদ্ধারকর্মীরা মাটির প্রায় তিন মিটার নিচে আটকে থাকা শিশুটির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং তাকে নিরাপদে বের করে আনেন।
বুধবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া শিশুদের ঘটনা স্বজনহারাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলীয় শহর টম্বলেনে একটি বেসামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা সবাই নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ।
রোববার (২৮ জুন) স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন যাত্রী ও ১ জন পাইলট।
এএফপির প্রকাশিত প্রতিবেদনে, ফ্রান্সের মেউর্থ-এ-মোজেল বিভাগের প্রিফেক্ট ইভ সেগি জানান, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি প্লেনটি কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে ও ঘটনার পেছনে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বিএফএম জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর মুর্ত-এ-মোজেল বিভাগের বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রোববার (২৮ জুন) টম্বলেন শহরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি একটি প্যারাশুট প্রশিক্ষণ স্কুলের ছিল। দুর্ঘটনায় পাইলটসহ বিমানে থাকা ১০ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন প্রশিক্ষণার্থী এবং পাঁচজন প্রশিক্ষক ছিলেন বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফুটন্ত কড়াইয়ে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘এল নিনো’র বিধ্বংসী জ্বালানি। বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেই এক ভয়ংকর এই জলবায়ু দানব ধেয়ে আসার খবর দিচ্ছেন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। ইতোমধ্যে এশিয়া থেকে ইউরোপ প্রকৃতির এই চরম রূপের আঁচ এখনই পেতে শুরু করেছে বিশ্ববাসী। এশিয়া ও ইউরোপের বিশাল অংশজুড়ে চলছে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ, বাড়ছে মৃত্যুও। জাতিসংঘও এটিকে ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর এই প্রত্যাবর্তন একদিকে যেমন পারদ চড়াবে অস্বাভাবিক মাত্রায়, অন্যদিকে ডেকে আনবে রেকর্ডভাঙা বন্যা ও খরার মহাবিপর্যয়।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের ৮৫০টি বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপীয় চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বাতাসে আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বা ঠাণ্ডা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এই তাপপ্রবাহ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ইউরোপে দাবদাহের মধ্যে স্পেন ও ফ্রান্সে মৃত্যু সংখ্যা বাড়ছে; আর জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে গত শুক্রবারের (২৬ জুন) তাপমাত্রা জুনের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কনসার্ট, ম্যারাথন ও বড় বড় গণজমায়েত বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।
স্পেনের মোমো মনিটরিং সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী, দাবদাহের কারণে দেশটিতে অন্তত ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বার্সেলোনার একটি বনে ভয়াবহ আগুন লাগার কারণে ১৬ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতর আটকে থাকতে হয়েছে।
ফ্রান্সে চরম তাপমাত্রার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কায় প্যারিসের সব হাসপাতালে জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে। সেখানে তপ্ত গাড়ির ভেতর আটকে বেশ কয়েকজন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। তা ছাড়া দাবদাহ শুরু হওয়ার পর থেকে ফ্রান্সে অনিরাপদ এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে ডুবে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সের সীমান্তঘেঁষা জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারব্রুকেনে রেকর্ড ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
তবে ফ্রান্সে টানা তিন দিন ধরে নজিরবিহীন গরম অনুভূত হওয়ার পর বর্তমানে তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, হাসপাতালে রোগীর ভিড়ের চেয়ে এখন বাড়িতে মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই চরম পরিস্থিতির সঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এখন মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ইউরোপের এই মারাত্মক দাবদাহ ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওলন্দাজ সীমান্তের কাছে ক্লাইন ব্রোগেলে বেলজিয়ামের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে।
পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ লিমবার্গে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশে রেকর্ড ৩৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) ইউরোপ মহাদেশের অন্তত ১৫ কোটি মানুষকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এই গরমের তীব্রতা আগামী দিনগুলোতে আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে চেক আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন, ২০১২ সালের ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রার রেকর্ড শনিবার (গতকাল) ভেঙে যেতে পারে। আর অস্ট্রিয়ার আবহাওয়াবিদরা বলছে, রোববার (২৮ জুন) দেশটির তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙতে পারে।
বলকান অঞ্চলের দেশগুলোতেও চরম গরম দেখা যাচ্ছে। সার্বিয়ায় সপ্তাহান্তে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পারদ চড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এদিকে তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও। সুইজারল্যান্ডের বেজনউ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টরই গত শুক্রবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ আর নদীর পানি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা রিয়্যাক্টর ঠাণ্ডা করার জন্য উপযোগী নয়।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, একটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের চেয়ে ৫-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি চড়ছে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই তাপমাত্রা বাড়ছে। তবে ইউরোপের গতি সবচেয়ে বেশি, এটি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে।
তীব্র দাবদাহে কোলন থেকে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন ব্রাসেলসের আগে প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া তিন যাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ফ্রান্সে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে প্যারিসের হাসপাতালব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের চাপে সপ্তাহ শেষে অনুষ্ঠেয় প্যারিস প্রাইড মার্চ, মিউজিক ফেস্টিভালসহ বেশ কিছু বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
একই কারণে জার্মানিতেও ম্যারাথনসহ বহু আয়োজন বাতিল হয়েছে। তবে শার্লেটি স্টেডিয়ামের ডায়মন্ড লিগ অ্যাথলেটিকস মিট বাতিল না করে বিকালে রোদের তীব্রতা কমলে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ গবেষণা দল সতর্ক করেছে, তীব্র গরমের কারণে সোমবার (২৯ জুন) থেকেই হিমবাহগুলো গলতে শুরু করবে, যা সাধারণত আগস্টে ঘটে থাকে। ২০২২ সালের পর এবারই হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
একদিকে যখন খরায় পুড়ছে কিছু দেশ, ঠিক তখনই জাপানে আঘাত হেনেছে প্রলয়ঙ্করী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাত। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল এখন কাঁপছে ভয়াবহ বন্যা ও প্লাবনের আশঙ্কায়।
ডব্লিউএমওর আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এল নিনো নিয়ে অত্যন্ত উদ্বেগজনক কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
আগামী আগস্টের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। নভেম্বরের মধ্যে এটি পূর্ণ শক্তি সঞ্চয় করার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ। এর ফলে আগামী তিন মাস পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এল নিনো আসলে কী? সহজ কথায়, মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন সেই প্রক্রিয়াকে ‘এল নিনো’ বলা হয়।
প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পরপর এই চক্র ফিরে আসে এবং এটি প্রায় ৯-১২ মাস স্থায়ী হয়। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের চেনা ছক সম্পূর্ণ উল্টে যায়।
এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী, যার কারণে ২০২৪ সালটি বৈশ্বিক তাপমাত্রার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল এবং ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল।
আঞ্চলিক প্রভাব: ‘কোথাও খরা, কোথাও বন্যা’- ডব্লিউএমওর মডেল অনুযায়ী, এবারের এল নিনোর প্রভাব বিশ্বকে দুটি চরম ভাগে ভাগ করে ফেলবে।
পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাওলো সতর্ক করে বলেছেন, এই চরম আবহাওয়া সরাসরি আঘাত হানবে মানুষের স্বাস্থ্য, বৈশ্বিক বাস্তুতন্ত্র, কৃষি এবং জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সংকটকে আরও জোরালো ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, এল নিনো মূলত উষ্ণায়নশীল বিশ্বের আগুনে ঘি ঢালবে। এর বিধ্বংসী গতি হবে কল্পনাতীত।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো জীবাশ্ম জ্বালানির অবসানে উদ্যোগ নেওয়া। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
সবুজ রূপান্তর: নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে যাত্রা দ্রুততর করা। আসন্ন এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশ্বনেতৃত্বকে কেবল আলোচনার টেবিলে না থেকে, এখনই মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
হরমুজ প্রণালীতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালীতে একটি ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত নিক্ষিপ্ত বস্তু (প্রজেক্টাইল)’ আঘাত হেনেছে। চার মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানে দুই সপ্তাহ আগে হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের পর দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে শনিবার (২৭ জুন) এই ঘটনা ঘটল।
ইউকেএমটিও জানিয়েছে, অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ট্যাংকারটির ব্রিজ (জাহাজের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্রু দলের সকল সদস্য নিরাপদে আছেন এবং আপাতত পরিবেশগত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি এই ঘটনার তদন্ত করছে।
চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য যুদ্ধরত পক্ষগুলো একে অপরকে দুষছে। গত শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে ওয়াশিংটন ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে। ‘এভার লাভলি’ নামক একটি মালবাহী জাহাজে (কার্গো ভেসেল) ইরানি ড্রোন আঘাত হানার ঘটনার জবাবে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার (২৬ জুন) মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান তদারকিকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে, তারা বৃহস্পতিবারের ওই ড্রোন হামলার ‘শক্তিশালী জবাব’ দিয়েছে।
জবাবে ইরান শনিবার মার্কিন বাহিনীর সাথে যুক্ত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর অবস্থিত বাহরাইনেও একটি ইরানি ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
জ্বালানি পরিবহনের এই রুটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ইরান নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস অননুমোদিত জাহাজ লক্ষ্য করে ‘সতর্কতামূলক গুলি’ ছুঁড়ছে, ফলে অন্য জাহাজগুলোকে প্রণালী পার হওয়ার আগে ইরানের কাছ থেকে অনুমতি নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মালবাহী (কার্গো) জাহাজে ড্রোন হামলার পর শনিবার ট্যাংকারে আঘাতের জেরে নৌচলাচল সুরক্ষায় নিয়োজিত জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার তাদের নিরাপত্তা হুমকির মাত্রা বাড়িয়েছে।
ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
এএফপি জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো যোগ দিলেও উদ্ধারকাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
গত বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বহু ভবন ধসে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের কাছে উপকূলীয় শহর লা গুইরা। সেখানে একের পর এক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার এএফপিকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত জটিল একটি জরুরি পরিস্থিতি। মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।’
শুক্রবার (২৬ জুন) রাত ৮টা থেকে দুর্গত এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে বলে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো।
লা গুইরার একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে চিলির উদ্ধারকারী দল পৌঁছেছে। চারটি বহুতল ভবনের ওই কমপ্লেক্সে শত শত পরিবার বাস করত, যার অধিকাংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
উদ্ধারকারী দলের প্রধান নাদিওমার পোলাঙ্কো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভবনগুলো সম্পূর্ণ ধসে গেছে। জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এখন আমাদের চেষ্টা মূলত মরদেহ উদ্ধার করা।’
অন্যদিকে বহু এলাকায় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি ও সরকারি সহায়তার অভাব নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
৪০ বছর বয়সী মারহোসলি সালাজার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আমার ছোট্ট গায়েলকে খুঁজছি। তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস। আমার ১৬ বছরের মেয়েটিও ভূমিকম্পে মারা গেছে। আর এক আত্মীয় এখনও নিখোঁজ।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সহায়তা দরকার। ধ্বংসস্তূপ সরাতে যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দেখিনি।’
কারাকাসের একটি অভিজাত এলাকায় অন্তর্বর্তী নেতা দেলসি রদ্রিগেজ পরিদর্শনে গেলে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা তাকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের উদ্ধারে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন তারা।
বিক্ষোভকারীরা চিৎকার করে বলেন, ‘সরকার জনগণের জন্য কিছুই করছে না।’
শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প: ১৯০০ সালের পর এটিই ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। সেসময় উপকূলের কাছে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত ভেনিজুয়েলায় ১৯৯৭ সালের পর আর বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি।
দেশটির এক দশকেরও বেশি সময়ের অর্থনৈতিক সংকট হাসপাতাল ও জনসেবাকে দুর্বল করে দিয়েছে। লাখো মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
মার্কিন সমর্থিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পরও দেশটি নাজুক এক রূপান্তর পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাচ্ছে: জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, অন্তত ১৭টি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনিজুয়েলায় মোতায়েন করা হচ্ছে।
স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর দল ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী নেতা দেলসি রদ্রিগেজ জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং উদ্ধারকর্মী, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ২৫০ জনের বেশি সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল ভেনিজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষ শনাক্ত করতে প্রশিক্ষিত কুকুরসহ তিনটি বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার ইউনিট রয়েছে।
ওয়াশিংটনের ত্রাণ তৎপরতা তদারকির জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কারাকাসে পৌঁছেছেন।
জাতিসংঘ ও অন্য সহায়তা সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভূমিকম্পের আগেই ভেনিজুয়েলায় লাখো মানুষ খাদ্য সংকট, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সেবার অভাবে ভুগছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নয় এই সংকটকে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে দেওয়া।’
বিদেশি নাগরিকও নিহত: ভূমিকম্পে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ২৮ জন পর্তুগিজ, পাঁচজন স্প্যানিশ, দুইজন ব্রাজিলীয়, সাতজন চীনা, একজন চিলিয়ান এবং একজন ইতালীয়-ভেনিজুয়েলীয় নাগরিক।
এ ছাড়া, ৮৫ জন পর্তুগিজ ও ১১৯ জন স্প্যানিশ নাগরিক এখনো নিখোঁজ বা তাদের অবস্থান অজানা বলে নিজ নিজ সরকার জানিয়েছে।
এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুক্রবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অবশেষে একটি ‘রূপরেখা চুক্তিতে’ পৌঁছেছে ইসরায়েল ও লেবানন। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা যৌথভাবে এই চুক্তির ঘোষণা দেন। তবে এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহ সমর্থকদের তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
চুক্তির মূল লক্ষ্য ও শর্তাবলী
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই নতুন কাঠামোগত চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো লেবাননের ওপর দেশটির রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা, হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করা এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ ফর লেবানন’ নামে একটি সমন্বয়কারী সংস্থা গঠন করা হবে, যা দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সামরিক সমন্বয় নিশ্চিত করবে।
চুক্তির আওতায় জাতিসংঘ ও মার্কিন সহযোগিতায় লেবাননকে ১৩ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে মানবিক সহায়তা প্রকল্পে এবং ৩০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হবে লেবাননের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের দুটি নির্দিষ্ট এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব নিতে দেওয়া হবে। তবে হিজবুল্লাহ পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল সেখানে কঠোর নিরাপত্তা বলয় ও নিজেদের সেনা উপস্থিতি বজায় রাখবে।
রাষ্ট্রদূতদের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদাহ এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। নাদা হামাদাহ বলেন, ‘লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এই রূপরেখা চুক্তিটি একটি প্রথম পদক্ষেপ।’ অন্যদিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত লেইটার একে ‘প্রকৃত শান্তি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘উভয় দেশই নিরাপদে বসবাস করবে এবং পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান ও রক্ষা করবে।’
হিজবুল্লাহর প্রত্যাখ্যান ও গৃহযুদ্ধের হুঁশিয়ারি
এই চুক্তি ঘোষণার পরপরই হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করবে এবং নিজেদের অস্ত্র আরও দৃঢ়ভাবে ধরে রাখবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে এই চুক্তি জোরপূর্বক কার্যকর করার চেষ্টা করা হলে তা লেবাননে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে।’ ফাদলাল্লাহর দাবি, হিজবুল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
বৈরুতের রাজপথে সহিংস বিক্ষোভ
চুক্তির প্রতিবাদে শুক্রবার গভীর রাতে বৈরুতের রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হিজবুল্লাহ সমর্থকরা শত শত মোটরসাইকেল নিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থল ও বিমানবন্দর অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা টায়ার জ্বালিয়ে প্রধান সড়ক ও বিমানবন্দর সংযোগ সড়ক অবরোধ করে এবং চুক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে লেবাননের সেনাবাহিনী অস্থায়ী চেকপয়েন্ট বসিয়েছে। অনেক জায়গায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিমানবন্দর সড়ক পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ এবং বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ সমর্থকদের এই বিক্ষোভ পুরো শহরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে এই সংকটের সূত্রপাত হয়। গত মার্চ থেকে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে লেবাননে ৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত ৩৭ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চললেও মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে একটি ‘দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামনে এখনো অনেক কঠিন পথ ও চ্যালেঞ্জ বাকি রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহর অনড় অবস্থান এবং বৈরুতের রাজপথে বর্তমান উত্তজনা চুক্তির মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর বর্তমান সামরিক সরকার সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের অভিযোগ, ফ্রান্স নিরবচ্ছিন্নভাবে বুরকিনা ফাসোর জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরের নেতৃত্বাধীন সরকার শুরু থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রতি কঠোর ও বৈরী অবস্থান গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দেশটির বর্তমান প্রশাসন অভ্যন্তরীণ সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমনেও অত্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুরকিনা ফাসোর জাতীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয় যে, গত ২৬ জুন ২০২৬ তারিখ থেকে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবসান ঘটিয়েছে দেশটি। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, ফ্রান্স এখনও ‘নব্য-ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ লালন করছে, যা মূলত বুরকিনা ফাসোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সরকারের দাবি, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই বুরকিনা ফাসো এবং সমগ্র সাহেল অঞ্চলে নিরন্তর সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স বুরকিনা ফাসোর এই সিদ্ধান্তকে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও ভিত্তিহীন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের মতে, এটি বুরকিনা ফাসো প্রশাসনের ‘উদ্বেগজনক পরিবর্তনশীল আচরণ’ এরই একটি নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ। প্যারিস আরও জানিয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। উল্লেখ্য যে, গত এক দশক ধরে বুরকিনা ফাসো এবং এর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ভয়াবহ সহিংসতার মোকাবিলা করে আসছে।
বুরকিনা ফাসো সরকার অবশ্য স্পষ্ট করেছে যে, তাদের এই সিদ্ধান্ত মূলত দুই দেশের মধ্যেকার কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে এটি ‘বুরকিনা ফাসো ও ফ্রান্সের জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ককে অস্বীকার করে না।’ বর্তমান সময়ে আফ্রিকার অনেক সাবেক ফরাসি উপনিবেশেই ফ্রান্সবিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে। সেই সুযোগে এই মহাদেশে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আফ্রিকাকে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
একসময় উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী দেশ হিসেবে ফ্রান্স মহাদেশটির উপনিবেশ-পরবর্তী রাজনীতি ও ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছিল। এমনকি ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে তারা অসংখ্যবার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। তবে বুরকিনা ফাসোর এই নতুন ঘোষণা সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মূলে বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যক্রমের প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাহরাইনের ঘাঁটিতে ইরানের চালানো ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ থেকে জুন পর্যন্ত সংঘটিত এই হামলাগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ইরানি সমরাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। যদিও পেন্টাগন এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে, তবে স্যাটেলাইট চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মার্কিন গণমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এই ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ নামের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স বা প্রধান কার্যালয়সহ অন্তত এক ডজন ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে রিয়েল-টাইম সামরিক যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য দুটি অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন টার্মিনাল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার প্রতিটির বাজারমূল্য প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই হামলায় কোনো প্রাণহানির খবর অস্বীকার করলেও নিরাপত্তার স্বার্থে তারা অধিকাংশ কর্মীকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং বর্তমানে কেবল একটি ক্ষুদ্র দল সেখানে মোতায়েন রয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অবকাঠামোগুলো পুনরায় সচল করতে পেন্টাগনকে বিশাল অংকের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর এক সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটির সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ২.২ বিলিয়ন থেকে ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এর মধ্যে শুধুমাত্র বাহরাইনের এই বিশেষ ঘাঁটিটি পুনর্নির্মাণ করতেই প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেন্টাগন এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পেশ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক কৌশল ও অবস্থানের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে গভীর পর্যালোচনায় নেমেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ইরানের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক বিমান বাহিনীর সহকারী সেক্রেটারি ডক্টর রবি চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আমাদের স্থাপনাগুলো সাহসিকতার সঙ্গে রক্ষা করেছি, কিন্তু যেসব যুদ্ধাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে, তা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোকে আঘাত করেছে। এটি গত ১০ বছর ধরে ইরানের স্ট্রাইক টেকনোলজির পরিধি ও নির্ভুলতা বাড়ানোরই ফল।’
ভবিষ্যতে এমন আঘাত থেকে সুরক্ষায় মার্কিন বাহিনী এখন বেশ কিছু বিকল্প পদক্ষেপ নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতা থেকে দূরে থাকতে ঘাঁটিগুলো পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেওয়া কিংবা কমান্ড সেন্টারগুলোকে মাটির নিচে বাঙ্কারে স্থানান্তরিত করা। এমনকি ইসরায়েলকেও একটি সম্ভাব্য বিকল্প সামরিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করলেও সৌদি আরব সফর এড়িয়ে গেছেন, যা রিয়াদের সাথে ওয়াশিংটনের বর্তমান কূটনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাহরাইনে গড়ে ওঠা এই সুরক্ষিত মার্কিন দুর্গটি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ স্মারক পাসপোর্টের নকশা উন্মোচন করেছেন। এই নতুন পাসপোর্টে তার নিজের একটি গম্ভীর ও কঠোর মুখভঙ্গির ছবি এবং স্বাক্ষর সংযোজন করা হয়েছে। সীমিত সংস্করণের এই পাসপোর্টটি অত্যন্ত প্রতীক্ষিত এক জাতীয় অনুষ্ঠানের স্মারক হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পাসপোর্টটির একটি নমুনা ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাসপোর্ট।’ এই পাসপোর্টের পাতায় একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে লেখা রয়েছে— ‘স্বাগত, তবে ভদ্রভাবে থাকুন।’
পাসপোর্টের নতুন নকশায় দেশপ্রেমের আবহে ট্রাম্পের ছবিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, তিনি একটি ডেস্কে গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন এবং এর ঠিক পেছনেই যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল পাঠটি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউসের আলোকচিত্রী ড্যানিয়েল টোরোকের তোলা একটি ছবিকে ভিত্তি করেই এই নকশাটি করা হয়েছে। পাসপোর্টের অন্যান্য পাতায় ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের দৃশ্য এবং ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা ২৫০’ কথাটি উল্লেখ রয়েছে। হোয়াইট হাউস এই বিশেষ সংস্করণের পাসপোর্টটিকে ‘প্যাট্রিয়ট পাসপোর্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৬ জুলাই থেকে আগ্রহী নাগরিকরা এই বিশেষ নকশার পাসপোর্ট সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। তবে এটি শুধুমাত্র ওয়াশিংটনে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে এবং এর মজুত ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এটি বিতরণ করা হবে। যদিও হোয়াইট হাউস এই পাসপোর্ট সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি, তবে গত এপ্রিল মাস থেকেই এই ধরনের একটি উদ্যোগের পরিকল্পনা ছিল বলে দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা সরকারি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিতে নিজের ব্যক্তিগত উপস্থিতি জোরালো করার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ইতোপূর্বেও বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনে তার বিশালাকার ছবি সংবলিত ব্যানার টাঙানো হয়েছিল এবং শীঘ্রই এক ডলারের নোটেও তার স্বাক্ষর যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নতুন পাসপোর্ট কার্যকর হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট, যার মুখচ্ছবি সরাসরি নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের নথিতে স্থান পাবে।
ইতালির রাজধানী রোমে এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের ওপর নেমে এসেছে নৃশংসতার কালো ছায়া। অজ্ঞাতপরিচয় এক দুর্বৃত্তের এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাতে একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও একজন। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলীয় পিনেতা সাচেত্তি সংলগ্ন ভিয়া মন্তিগ্লো এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে পরিবারের প্রধান কামাল হোসেনের (৪৫) পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তার আদি নিবাস বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। তিনি দীর্ঘকাল ধরে সপরিবারে ইতালিতে বসবাস করে আসছিলেন। হামলায় নিহত অন্য দুজন হলেন কামাল হোসেনের স্ত্রী এবং তাদের মাত্র ৫ বছর বয়সী শিশুকন্যা।
এই নৃশংস ঘটনায় কামালের ১৮ বছর বয়সী বড় ছেলেও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে ওই ঘাতক অস্ত্র নিয়ে কামালের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। হামলাকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান কামাল, তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে। এ সময় বড় ছেলে বাধা দিতে গেলে তাকেও কুপিয়ে জখম করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলেটি সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে করতে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলে প্রতিবেশীরা দ্রুত পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়েই ইতালির বিশেষ পুলিশ বাহিনী ‘কারাবিনিয়েরি’ এবং অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সেখান থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে এবং আহত তরুণকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ছেলেটি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।
এদিকে, এই লোমহর্ষক ঘটনার পর পুরো পিনেতা সাচেত্তি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ঘাতককে শনাক্ত করতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করেছে রোম পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি নাকি ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে ঘটেছে—তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন।
এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘাতককে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। রোম পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং লোমহর্ষক একটি অপরাধ। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।”
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনই নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এবং মামলার বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। তবে তদন্তে অগ্রগতি হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী তথ্য জানানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে নতুন করে আবারও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সম্প্রতি দেশটিতে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন কম্পন জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আল জাজিরার শনিবারের (২৭ জুন) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে সর্বশেষ এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৯।
গত বুধবার আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যা বর্তমানে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ওই দুর্যোগে রাজধানী কারাকাসের বেশ কিছু এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সেই বিভীষিকা কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও কেঁপে উঠল ভেনেজুয়েলার মাটি।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইএমএসসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, নতুন এই কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর ভেনেজুয়েলার মারাকাই শহর থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সর্বশেষ এই কম্পনে নতুন করে কোনো ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে, শুক্রবারও কারাকাস ও মারাকাই শহরের বিভিন্ন স্থানে কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত বুধবার দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প আঘাত হানে। উদ্ধারকাজ চলার সাথে সাথে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর মতে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৩ হাজার ৩৬০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ১৭২ জন আটকা পড়ে আছেন এবং নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, লা গুয়াইরা রাজ্যের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জনসাধারণের যাতায়াত সীমিত করা হবে।