পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দেশটিতে সরকার গঠন কারা করবে এ নিয়ে গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে ৭০টি নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত। সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে। তবে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ২৬৫টি আসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে। ভোট গণনা প্রায় শেষের দিকে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইসিপি এখনো সব আসনের ফলাফল জানায়নি। এককভাবে সরকার গঠন করতে কোনো দলকে জিততে হবে ১৩৪টি আসনে। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে নির্বাচনে কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সব আসনের ফল প্রকাশের পর তাই বেশ কয়েকটি চিত্র সামনে আসছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, এককভাবে কোনো দলের সরকার গঠনের আর সুযোগ নেই। পাকিস্তানি বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেছেন, সব আসনের ফল প্রাথমিকভাবে প্রকাশের পর দুটি চিত্র সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের দলের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বাকি দলগুলোর একটি জোট করে সরকার গঠন। এভাবে সরকার গঠন করলে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন ছাড়াও জোটে আসবে এমকিউএম, জামাত-ই-ইসলামী ও বাকিরা।
জাইঘাম খান বলেন, দ্বিতীয় আরেকটি চিত্র আছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ ক্ষেত্রে পিপিপিকে পিটিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত ঘোষিত আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে যেভাবেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানে অচিরেই আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষক জাইঘাম খান।
এদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, তারা সব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ভোটের ফল প্রকাশ শেষ হওয়ার আগেই দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও মেরুকরণ না করার তাগিদ দেন তিনি।
ডন বলছে, প্রকাশিত ২৫৩ আসনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৯২টি আসনে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন জিতেছে ৭১টিতে। ৫৪টি আসন পাওয়া পিপিপির সঙ্গে তারা জোটে রাজি হয়েছে বলে জানায়। এই জোট নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন (৭১) ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি (৫৪) জোটে রাজি হলেও এখনো তারা মিলে ১৩৪টি আসনে জিততে পারেনি। মোট জিতেছে ১২৫টিতে। আরও ১২টি আসনের ফল বাকি। একটিতে ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারে থেকে ইমরান বলেছেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তার দলও দাবি করছে, জোট বানিয়ে সরকার গঠন করবে পিটিআই। আবার পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ রীতিমতো জনসভা করে বিজয় ঘোষণা করেছেন। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন বলে জানান তিনি। তাকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে সংরক্ষিত আসন ছাড়াই অন্তত ১৩৪টি আসনে জয় পেতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনসহ পেতে হবে ১৬৯টি।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত দল হিসেবে অংশ নেওয়া নওয়াজ ও বিলওয়াল ভুট্টোর দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাই এরই মধ্যে জোট সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। দুই দল যদি জোট গঠনে একমত হতে পারে তাহলে সংরক্ষিত আসনসহ সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে তারা। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েও বিপাকে ইমরান সমর্থিত জয়ী প্রার্থীরা। কারণ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংরক্ষিত আসনও পাবে না তারা। ফলে তাদের পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরিক-ইনসাফ।
প্রশ্ন উঠছে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের করণীয় কী? পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে তারা অন্য কোনো দলে যোগ দিয়ে সরকার বা বিরোধী দল গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
জোট সরকার গঠন নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা হয়নি: বিলাওয়াল
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, পিপিপিকে ছাড়া কেন্দ্রীয় এবং পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার গঠন করা যাবে না। গতকাল শনিবার জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিলাওয়াল বলেন, পিপিপি প্রতিটি প্রদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে। কে সরকার গঠন করবে, সে বিষয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি।
পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো ভোটের পুরো ফল জানি না, বিজয়ী স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট সদস্যরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, সেটাও আমরা জানি না। পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্যদের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।’
বিলাওয়াল আরও বলেন, রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ কেন, সেটা চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সরকারই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পিপিপির চেয়ারম্যান জানান, তিনি মনে করেন, সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দেশের জন্য সেটা কল্যাণকর হবে।
বিলাওয়াল বলেন, ‘পিপিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। এখন আমাদের যদি সেটা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে আরেকটি বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে আমরা কীভাবে এগোব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
সরকার গঠন নিয়ে যা বললেন পিটিআই চেয়ারম্যান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের চেয়ারম্যান গহর আলী খান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাবো এবং সরকার গঠন করব।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোট গণনা করে ফরম-৪৫ পূরণ করেছেন।
ইমরান খানের দলের চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের কণ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করা হলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।
পূর্ণ ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা উচিত উল্লেখ করে গহর বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’
পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে দল-সমর্থিত বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা দলের প্রতি অনুগত এবং তা-ই থাকবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।
তিনি জানান, সংরক্ষিত আসন এবং কোন দলের সঙ্গে তাদের যোগ দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে খুব দ্রুত তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। যেসব আসনে ফলাফল এখনো স্থগিত হয়ে আছে, সেসব জায়গায় তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করবেন।
গহর বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, তবে সেটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ।
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ও চীনের উঝোউ ইউনিভার্সিটির মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার চীনের উঝোউ ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেসে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি দলের সফর উপলক্ষে এ কর্মসূচি হয়। সোমবার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত উঝোউ ইউনিভার্সিটির নর্থ ল্যাবরেটরি বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলার সভাকক্ষ-২০১-এ বৈঠক হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির, উঝোউ ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. কিন শিয়ংবিয়াও, ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ অফিসের পরিচালক মিস হি এন, কলেজ অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেসের ডিন মিস সং ইয়িনচিউ এবং স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের উপ-ডিন মি. ইয়াং শাংচিয়াও।
কর্মসূচির শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়পর্ব হয়। পরে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধিদল উঝোউ ইউনিভার্সিটির ট্রেনিং সেন্টার পরিদর্শন করে। এরপর কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করা হয় এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকেও বক্তব্য প্রদান করা হয়। আলোচনায় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় এবং পারস্পরিক একাডেমিক সহযোগিতার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সহযোগিতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণামুখী চিন্তাভাবনা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাডেমিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়েও মতবিনিময় করা হয়। পরবর্তীতে উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনা হয়। এ সময় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ একাডেমিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ও উঝোউ ইউনিভার্সিটির মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ব্রিটেন কি এবার ভেঙে যেতে পারে? তাদের অখণ্ডতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে শুরু করেছে। কারণ, ব্রিটেনের তিন স্বশাসিত রাষ্ট্র একযোগে সুর চড়াচ্ছে স্বাধীনতার জন্য গণভোটের দাবিতে। ওয়েস্ট মিনস্টারকে চাপে রাখতে নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে বৈঠকে বসতে চলেছেন ওই তিন স্বশাসিত রাষ্ট্রের নেতারা। ব্রিটেনের বিভাজনের সম্ভাবনা নিয়ে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড।
তিন স্বশাসিত রাষ্ট্রই সম্প্রতি ওয়েস্টমিনস্টারের (ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় প্রশাসন) বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেছে। গতকাল সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে বৈঠকে বসছেন তিন স্বশাসিত রাষ্ট্রের নেতারা।
কার্ডিফের এক পাঁচতারা হোটেলের ওই বৈঠকে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়, তার ভিত্তিতে পরবর্তী গতিবিধি স্থির করতে পারে এই তিন স্বশাসিত রাষ্ট্র।
‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য গণভোট আয়োজনের দাবিতে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করতে পারেন নেতারা। অনুমান করা হচ্ছে, ওয়েস্টমিনস্টারের উপর চাপ তৈরির জন্যই এই যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হতে পারে।
এখনও পর্যন্ত যা খবর তাতে কার্ডিফের ওই বৈঠকে থাকতে পারেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নেল।
তারা কোনো যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করলে, তাতে কী কী বিষয়ের উল্লেখ থাকবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে কৌতূহল বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সে দেশের হাউস অফ কমন্সে একটি মন্তব্য করেন। সেখান থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত বলে মনে করছেন অনেকে। বার্নহ্যাম সেখানে বলেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিতে কোনও ‘সুস্পষ্ট ঐকমত্য’ থাকলে তিনি সেখানে গণভোটের অনুমতি দেবেন।
কিন্তু পরে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন তিনি। জানিয়ে দেন, তিনি কোনও গণভোটে সায় দেবেন না। ব্রিটেনের বিভাজনের এই শঙ্কার মধ্যেই বিতর্ক আরও বৃদ্ধি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। গত শনিবার ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি আয়ারল্যান্ডকে আবার ঐক্যবদ্ধ হিসেবে দেখতে চান।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই মন্তব্যের জেরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর উপরে ঘরোয়া রাজনীতিতে আরও চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্রিটেনের অখণ্ডতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং টানাপড়েনের মধ্যে সোমবার মুখোমুখি বসছেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলাম নিজে ইউরোপের জন্য কোনো গুরুতর হুমকি নয়। ইউরোপে মুসলিম অভিবাসীদের সমাজে একীভূত হওয়া নিয়ে প্রচলিত নানা আশঙ্কাকে চ্যালেঞ্জ করতে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের শিক্ষাগত সাফল্যকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।
১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সাময়িকীটির প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম—‘ইউরোপে ইসলাম নিয়ে সত্য ও মিথ্যা’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলাম নিজে ইউরোপের জন্য কোনো গুরুতর হুমকি নয়। তবে ইসলামপন্থি মতাদর্শ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষকে আলাদা দুটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে সাময়িকীটি।
মুসলিম অভিবাসীরা ইউরোপীয় সমাজে ব্যাপকভাবে একীভূত হতে ব্যর্থ—এমন দাবির বিরোধিতা করতে গিয়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের শিক্ষাগত অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।
সাময়িকীটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্রিটেনে স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। একই ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, এই পরিসংখ্যান মুসলিম অভিবাসীদের সন্তানদের শিক্ষাগত অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাদের মতে, অধিকাংশ মুসলিম অভিবাসী যে দেশে বসতি গড়েছেন, সেখানে নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান; তারা সাধারণত নিজেদের পূর্বপুরুষের সমাজকে হুবহু পুনর্গঠন করতে চান না।
তবে শিক্ষাগত ও সামাজিক একীভবনের পাশাপাশি মুসলিমদের কিছু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সাময়িকীটি।
দ্য ইকোনমিস্টের জন্য পরিচালিত এক জরিপে ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিম সমকামিতাকে ভুল বলে মনে করার কথা জানিয়েছেন। ৩৫ বছরের কম বয়সি মুসলিমদের মধ্যে ৪১ শতাংশ বলেছেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অপমানের ঘটনায় সহিংসতা ন্যায্য হতে পারে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সি মুসলিমদের মধ্যে এই হার ২৫ শতাংশ।
তবে সাময়িকীটি সতর্ক করেছে, এসব সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগকে ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বৃহত্তর ‘জনমিতিক হুমকি’ হিসেবে দেখার দাবির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী ও ইসলামবিরোধী রাজনীতি জোরদার হওয়ার সময়েই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। দ্য ইকোনমিস্ট জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-র সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যের কথা উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি ফ্রান্সে জনসমক্ষে ইসলামি হেডস্কার্ফ নিষিদ্ধ করার মেরিন ল্য পেনের প্রস্তাবের প্রতি ৬০ শতাংশ ফরাসি ভোটারের সমর্থন রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সমাপ্তির পর দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে বর্তমান সময়ের মতো ইরানের চারপাশে নিজেদের প্রহরা জারি রাখার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
গত রোববার আয়ারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক গলফ টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ভেনিজুয়েলার মতো ইরানের তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে শেষ পর্যন্ত (ইরান থেকে) বেরিয়ে আসব; কিন্তু যদি নিই— তাহলে (ইরানে) আমাদের উপস্থিতি থাকবে।’
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে গত ডিসেম্বরে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন অ্যাবস্যালুট ডিজল্ভ’ চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে মার্কিন সেনারা। প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক পাচার, সন্ত্রাসী মাফিয়া গ্যাংগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে নিউইয়র্কের আদালতে। সেই মামলার বিচারকির কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দেন, এখন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনিজুয়েলার তেল উত্তোলন ও বিক্রয় সংক্রান্ত সার্বিক ব্যবস্থাপনা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চভবন সিনেটে এক ব্রিফিংয়ে মার্কো রুবিও বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার তেল খাত বিশৃঙ্খলার দিকে ঝুঁকে পড়ুক— এমনটা আমরা চাই না। এ কারণে দেশটির তেল উত্তোলন, বিপননসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা এখন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে।’
মার্কিন প্রশাসন ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল মজুত নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বা একশ বছরের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির সমস্ত আয় মার্কিন নিয়ন্ত্রাধীন অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং এর ব্যবহার বা বণ্টন কীভাবে হবে তা যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।
ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই পদক্ষেপ ও চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং এটি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে বলে মত দিয়েছেন।
আয়ারল্যান্ডে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের বেলাতেও একই নীতি অনুসরণ করতে পার যুক্তরাষ্ট্র।
চট্টগ্রাম নগরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, পাহাড় কাটা রোধ, পুকুর ভরাট ও খাল দখলমুক্ত করার পাশাপাশি স্মার্ট সেবা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি চালু করা হয়েছে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ। এই অ্যাপের কার্যকারিতা ও সামগ্রিক নগর পরিচালনার রূপরেখা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সাথে মুখোমুখি হয়েছেন দৈনিক বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জিয়াউল হক ইমন।
দৈনিক বাংলা: আপনারা সম্প্রতি ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামের একটি স্মার্ট অ্যাপ চালু করেছেন। নাগরিক সেবা সহজীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এটি কীভাবে কাজ করছে?
মেয়র: ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপটির মূল লক্ষ্যই হলো চসিকের সেবা শতভাগ ডিজিটালাইজড করা এবং নাগরিকের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এখন নগরের প্রতিটি নাগরিক ঘরে বসেই রাস্তাঘাট, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি ও নর্দমাসহ ১০টি ক্যাটাগরির যেকোনো সমস্যার তথ্য সরাসরি ছবি ও লোকেশনসহ সিটি করপোরেশনকে পাঠাতে পারছেন। শুধু অভিযোগ জানানোই নয়, অভিযোগ সমাধান প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে—তাও অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি লাইভ ট্র্যাকিং করা যায়। পাশাপাশি আমাদের অফিসার ড্যাশবোর্ড, ওয়ার্ডভিত্তিক হিটম্যাপ এবং স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে নাগরিকদের প্রতি আমাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি সেবা, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে। গুগল, প্লে-স্টোর ও অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে সেবা নিতে আমি চট্টগ্রামের প্রতিটি নাগরিককে অনুরোধ করছি। অ্যাপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে চসিকের ভ্রাম্যমাণ আদালত ইতোমধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও জরিমানা আদায়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
দৈনিক বাংলা: পাহাড় কাটা, পুকুর ভরাট বা খাল দখলের মতো বড় পরিবেশগত অপরাধ বন্ধে চসিক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয় কেমন?
মেয়র: এসব পরিবেশগত অপরাধ প্রতিরোধে একাধিক সংস্থার এখতিয়ার থাকে, তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমরা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিডিএকে সাথে নিয়ে একটি যৌথ তদারকি সেল গঠন করেছি। অ্যাপ বা হটলাইনে পরিবেশ ধ্বংসের কোনো খবর এলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে সমন্বয় করে আমরা যৌথ অভিযান পরিচালনা করি। এই আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ফলে এখন আইনিব্যবস্থা নেওয়া অনেক দ্রুত ও কার্যকর হচ্ছে।
দৈনিক বাংলা: নগরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে চসিকের মাঠপর্যায়ের বর্তমান কৌশল ঠিক কী?
মেয়র: ডেঙ্গু প্রতিরোধকে আমরা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। মশক নিয়ন্ত্রণে সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এবার আমরা বৈজ্ঞানিক কৌশল ও প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছি। হিটম্যাপের মাধ্যমে হটস্পট চিহ্নিত করে সফটওয়্যারভিত্তিক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ওয়ার্ডভিত্তিক ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালানো হচ্ছে। আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত লার্ভিসাইডিং ও ফগিং চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে চসিকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব স্থানে জমা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দৈনিক বাংলা: খাল উচ্ছেদের কিছুদিন পরই দেখা যায় তা পুনরায় দখল হয়ে যায়। খাল ও ড্রেন দখলকারীদের বিরুদ্ধে আপনাদের স্থায়ী প্রতিরোধ পরিকল্পনা কী?
মেয়র: সাময়িক উচ্ছেদই একমাত্র সমাধান নয়, স্থায়ী প্রতিরোধই আমাদের মূল লক্ষ্য। সিডিএ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেগা প্রকল্পের অধীনে খালের যেসব জায়গা উদ্ধার হচ্ছে, সেখানে আমরা স্থায়ী রিটার্নিং ওয়াল ও গাইড ওয়াল নির্মাণ করছি। পুনরায় দখল রোধে প্রতিরোধক বাউন্ডারির পাশাপাশি আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল সার্ভে ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। খাল ও নালা দখলদারদের বিরুদ্ধে আমাদের নীতি স্পষ্ট— ‘জিরো টলারেন্স’।
দৈনিক বাংলা: পাহাড় কাটা ও অবৈধভাবে পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে চসিকের কঠোর অবস্থান কতটা কার্যকর হচ্ছে?
মেয়র: পাহাড় ও প্রাকৃতিক জলাশয় চট্টগ্রামের অমূল্য সম্পদ। যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বা পুকুর ভরাট করে নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিনষ্ট করছে, তাদের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বা পরিচয়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত তদারকি করব। নগরবাসীদেরও অনুরোধ করব, যেকোনো স্থানে পরিবেশ ধ্বংসের চেষ্টা দেখলে সরাসরি তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করুন।
দৈনিক বাংলা: স্মার্ট, নিরাপদ ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গঠনে নগরবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার মূল বার্তা কী?
মেয়র: শহরটি আমাদের সবার। নগরবাসী সচেতন না হলে একা সিটি করপোরেশনের পক্ষে শহরকে সুন্দর রাখা সম্ভব নয়। পাহাড়, পুকুর ও খাল রক্ষা করা এবং নিজের আঙিনা পরিষ্কার রাখা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। আপনারা ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ ব্যবহার করে সেবা নিন, অভিযোগ জানান এবং চসিককে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখুন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা চট্টগ্রামকে একটি বিশ্বমানের বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।
দৈনিক বাংলা: নগরবাসীকে দিকনির্দেশনা ও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন: আপনাকে এবং দৈনিক বাংলার পাঠকদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।
ইউরোপের রাজনীতিতে আবারও বদলের আভাস দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ডানপন্থি ও কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়লেও কিছু দেশে বামপন্থিরাও ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। সে ধারাবাহিকতায় সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনেও দেখা যাচ্ছে টানটান লড়াই। প্রাথমিক ফলাফলে ক্ষমতাসীন ডানপন্থি জোটের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে মধ্য-বামপন্থি বিরোধী জোট।
গত রোববার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় সুইডেনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট গণনা হয়েছে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ৩৪৯ আসনের পার্লামেন্টে বিরোধী জোট ১৭৬টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন ডানপন্থি জোট পেতে পারে ১৭৩টি আসন। তবে, মাত্র তিনটি আসনের ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সুইডিশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ম্যাগদালেনা অ্যান্ডারসন গত রোববার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ভোট গণনায় বিরোধী জোট এগিয়ে রয়েছে। এ ফল শেষ পর্যন্ত বহাল থাকলে সুইডেনে নতুন সরকার গঠন হবে বলেও জানান তিনি।
তবে, বিরোধী জোট এগিয়ে থাকলেও অ্যান্ডারসনের দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবার ভালো ফল করতে পারেনি। দলটি প্রায় ২৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি দলটির সবচেয়ে খারাপ ফল হতে পারে। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার দলটির ভোট কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এদিকে, ক্ষমতাসীন জোটের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনও ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চূড়ান্ত ফল পাওয়ার পর অন্য দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এরপর সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়ে আলোচনা করা হবে।
তবে, এখনো ভোটগণনা শেষ হয়নি। সুইডেনে ডাকযোগে পাঠানো কিছু ভোট গণনা করা এখনো বাকি। বিদেশে দেশটির দূতাবাসগুলোতে দেওয়া ভোটও এখনো গণনা করা হয়নি। এসব ভোটের গণনা শুরু হবে আগামী বুধবার। ফলে, চূড়ান্ত ফল পেতে সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এবারের নির্বাচনের আগে বছরের শুরুতে বিরোধী জোট প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। তবে, ভোটের সময় যত ঘনিয়ে এসেছে, সে ব্যবধানও তত কমেছে। নির্বাচনের শেষদিকে দুই জোটের ব্যবধান নেমে আসে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশীয় পয়েন্টে। ফলে, শুরুতে এগিয়ে থাকা বিরোধী জোটের জন্য শেষ সময়ের লড়াই কঠিন হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, ডানপন্থি জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক সুইডেন ডেমোক্র্যাটস এবার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ এবার দলটির ভোট কমেছে প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। দলটির নেতা জিমি অ্যাকেসন বলেছেন, পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তবে, সুইডেন ডেমোক্র্যাটসকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে বিতর্কও রয়েছে। অতীতে নিও-নাৎসি আন্দোলনের সঙ্গে দলটির যোগসূত্র ছিল। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর দলটি ডানপন্থি শিবিরের সবচেয়ে বড় দল হয়ে ওঠে। এরপর প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনের সংখ্যালঘু সরকারকে পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছে দলটি। তবে, এখন পর্যন্ত সরকারে সরাসরি অংশ নেয়নি তারা।
হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। ‘সর্বসম্মত ঐকমত্যের স্বার্থে’ ওই বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল-বুসাইদি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পরিচালনার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে করা চুক্তি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে উপস্থাপনের লক্ষ্যে বৈঠকটি আয়োজন করা হয়েছিল। ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, তেহরান ও মাস্কাটের যৌথ সিদ্ধান্তে এবং অঞ্চলের কয়েকটি দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ নির্ধারণে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।
হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পরপরই বৈঠক স্থগিতের খবর এলো। শুক্রবার ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি পুরো সপ্তাহান্তে বন্ধ রাখা হয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়। ইরান জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাতের ঘটনায় একজন নিহত এবং চার নাবিক আহত হয়েছেন।
গতকাল সোমবার বাজার খোলার পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই এর অন্যতম কারণ। গত সপ্তাহে জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। রোববার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের খুচরা মূল্যও সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ব্যবসায়ী ও সৌদি তেলের ক্রেতারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলেও রিয়াদের লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবুতে রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে। তবে এই মজুত পাঁচ থেকে সাত দিন চলতে পারে। এরপর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
সৌদি আরব পাইপলাইনের ক্ষতির পরিমাণ বা এটি কতদিন বন্ধ থাকবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলোও মেরামতের সময় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা দিয়েছে। কারও মতে কয়েক দিন, আবার কারও মতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রে পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় আকারের ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলবে না। লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় মাস আগে শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বেড়েছে। এর আগে আগস্টে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল।
ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার সক্ষমতা রোধ করা এবং দেশটির জনগণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প আবারও বলেন, তিনি চলতি বছরেই, সম্ভবত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন। তখন জ্বালানি তেলের দামও ‘দ্রুত ও ব্যাপকভাবে’ কমে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলাও অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে হুথিদের আন্তঃসীমান্ত হামলায় বাড়িঘর ও একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভিডিও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। হুতিরা দাবি করেছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপ দখলের পর তারা পার্শ্ববর্তী একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ‘গেট অব টিয়ার্স’ বা ‘অশ্রুর প্রবেশদ্বার’ নামেও পরিচিত। এটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে। লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর হুতিদের এই অগ্রযাত্রা ইয়েমেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম তীব্র সংঘাতের অংশ।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ও সৌদি আরবে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন একদিকে সৌদি মিত্রদের সহায়তা ও নৌ-চলাচল নিরাপদ রাখতে চায়, অন্যদিকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তেও সতর্ক। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে—ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া, নাকি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসা, সেই সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হচ্ছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিসহ ১২ জনের বেশি বিশ্বনেতা অংশ নেন।
বিশ্বনেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নয়াদিল্লির প্রগতি ময়দানের ‘ভারত মণ্ডপমে’ গত শনিবার সন্ধ্যায় বসে এ আয়োজন। নৈশভোজের খাবারের তালিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। নৈশভোজের পুরো মেনুই ছিল নিরামিষ। মাছ-মাংসের কোনো পদ রাখা হয়নি। তবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা ধরনের খাবার ছিল তালিকায়।
শুরুতে অতিথিদের পরিবেশন করা হয় খান্ডভি মিলেফয় ও খুম্ব গালৌটি কাবাব। গুজরাটের জনপ্রিয় খাবার খান্ডভি বেসন দিয়ে তৈরি। এতে সর্ষে, নারকেল ও কারিপাতার ব্যবহার রয়েছে। কেসর আম, দই ও সবুজ পাতা দিয়ে সাজিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়।
মাশরুম দিয়ে তৈরি খুম্ব গালৌটি কাবাব পুদিনাপাতা দিয়ে গ্রিল করা হয়। পরে শিরমাল রুটির সঙ্গে এটি পরিবেশন করা হয়। মূল খাবারের তালিকায় ছিল পনির লাবাবদার, গুচ্চি মারমিক, ক্যারট বিন পোরিয়াল, থাক্কালি বেলে সারু ও মিলেট পোলাও।
উত্তর ভারতের জনপ্রিয় পদ পনির লাবাবদার তৈরি করা হয় ছোট পেঁয়াজ ও টমেটোর ঘন ঝোলে নরম পনির দিয়ে। আর হিমালয়ের বিশেষ গুচ্চি মাশরুমের সঙ্গে জাফরান, কিশমিশ ও কাঠবাদাম মিশিয়ে তৈরি করা হয় গুচ্চি মারমিক। ক্যারট বিন পোরিয়ালে গাজর ও বিভিন্ন ধরনের সবুজ বীজের সঙ্গে নারকেল তেল ও দক্ষিণ ভারতীয় মসলা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে থাক্কালি বেলে সারু হলো টমেটো, কারিপাতা ও ডাল দিয়ে তৈরি দক্ষিণ ভারতীয় একটি পদ।
সুগন্ধি বাসমতি চালের সঙ্গে বাজরা ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি করা হয় মিলেট পোলাও। এর সঙ্গে ছিল দই মেশানো বিটরুটের রায়তা ও বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় রুটি।
নৈশভোজের শেষ পাতে ছিল পুরোনো দিল্লির ঐতিহ্যবাহী ফ্রুটক্রিম ও জিলাপি। মৌসুমি ফলের সঙ্গে হালকা হুইপড ক্রিম মিশিয়ে তা জিলাপির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। ছিল শাহুতুত ফিরনিও। দুধ, চাল, মিষ্টি মালবেরি ও খাবার উপযোগী সোনার পাত দিয়ে তৈরি করা হয় এ মিষ্টান্ন।
নৈশভোজে খাবারের পাশাপাশি ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও। এতে অংশ নেন ১৬০ জন শিল্পী। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ও সংগীতের পাশাপাশি ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরাও এতে অংশ নেন। পরিবেশিত হয় ভরতনাট্যম, কুচিপুড়ি, ওডিশি ও কত্থক।
তবে মোদির আয়োজিত নৈশভোজে আমন্ত্রিত নেতাদের সবাই উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালিদ বিন মোহাম্মদকেও সেখানে দেখা যায়নি।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত সব রাজ্যে বিতর্কিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ক্ষমতাসীনদের এই উদ্যোগ ভারতে বসবাসকারী বিশাল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ভারতে বসবাসকারী ১৪০ কোটি মানুষের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন এক হলেও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকারের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই বৈচিত্র্যময় ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সর্বজনীন আইন বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। ভারতের অন্তত চারটি রাজ্য ইতোমধ্যেই এই নতুন আইন চালু করেছে।
গত রোববার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘আমরা কয়েকটি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করেছি এবং আমি আশাবাদী, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট শাসিত ২১টি রাজ্যের সবকটিতেই এটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।’
একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের এই পদক্ষেপ বিশেষ করে মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে এই আইনের সমর্থকরা দাবি করছেন, এটি বহুবিবাহ প্রথা বন্ধ করবে, সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়েদের সমানাধিকার নিশ্চিত করবে এবং আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ বাধ্যতামূলক করে মুসলিম নারীদের অধিকার সমপর্যায়ে নিয়ে আসবে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত মূলত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে দেশটিতে প্রায় ২২ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম গোষ্ঠী।
সৌদি আরবের অত্যন্ত কৌশলগত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইনটি দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরায় সচল করা সম্ভব না হলে দেশটির রপ্তানিযোগ্য তেলের মজুত সম্পূর্ণ নিঃশেষ হওয়ার তীব্র ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এক ধাক্কায় প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা সতর্ক করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ইতোমধ্যে চরম আকার ধারণ করেছে, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক সংকট চরম আকার নিতে পারে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হতো। তবে সাম্প্রতিক ক্ষতির মুখে পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরে বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের রপ্তানি কার্যক্রম চালানোর মতো জ্বালানি অবশিষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া মিসরের আইন সুখনা ও সিদি কেরির বন্দরে সৌদি আরবের যে আপৎকালীন মজুত রয়েছে, সঞ্চালন সচল না হলে তাও দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।
ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটির সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, মেরামতের পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ লেগে যেতে পারে, তবে বিকল্প সূত্রের মতে এর আগেই আংশিক সরবরাহ চালু করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুযায়ী, নৌপথের অস্থিরতা ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ে গত আগস্টে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সংঘাতের পূর্বে গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে দেশটির দৈনিক উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল, আগস্টে তা হ্রাস পেয়ে মাত্র ৬২ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। সংস্থাটির আশঙ্কা, সামগ্রিক এই অচলাবস্থার জেরে চলতি বছর বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল বা মোট জোগানের ৬ শতাংশ জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ মুসলমানরা কতটা ব্রিটিশ সমাজে একীভূত হতে পেরেছেন? এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জানিয়েছে—১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস (বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লস) পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৪৫ সালের পর থেকে সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তাদের জীবনযাত্রা দেখে চার্লস হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন—বাংলাদেশিদের বসবাস ও কর্মপরিবেশ ভারতীয় উপমহাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির মতোই খারাপ। পরে ব্রিটেনের ‘জাতিগত সমতাবিষয়ক কমিশন’-ও জানায়, বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দুর্বল এবং কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত কম।
১৯৮৫ সালে সরকারি এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষাগত অর্জনকে ‘খুবই নিম্নমানের’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাদের অনেকেই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে গিয়ে খুব সামান্য শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিল এবং ইংরেজিতেও দক্ষ ছিল না। অনেক শিক্ষকও তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করতেন না। বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পেতেন।
সেই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনো দরিদ্র। আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরও তাদের প্রতি দুজনের একজনের আয় জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশের মধ্যে। একটি মধ্যম সারির বাংলাদেশি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও কম; যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে গড় সম্পদ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড।
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে চিত্রটি দ্রুত বদলেছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। এখন তারা আরও অনেক এগিয়ে গেছে। ২০২১ সালে জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে, আর চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসায় বেড়েছে তিন গুণ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিলেন; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে হার ৭৯ শতাংশ। পেশাজীবী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতেও ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিরা পিছিয়ে নেই। একই বয়সী বাংলাদেশিদের ১৪ শতাংশ এমন চাকরিতে ছিলেন—যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের প্রায় সমান।
বাংলাদেশিদের অগ্রগতির পেছনে লন্ডনের মতো অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল শহরে বসবাসও ভূমিকা রাখছে। গবেষকদের মতে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীদের সামাজিক ও বৈবাহিক অবস্থানও ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। নতুন অভিবাসীদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক অগ্রগতি অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ব্রিটিশ সমাজে বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণ ধীরে হলেও স্পষ্টভাবেই এগিয়ে চলছে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল–মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বলয়ে হুতিরা নিজেদের এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে জানান দিল।
একসময় হুতিদের একটি বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ও সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরের বিশাল এলাকা এবং লোহিত সাগরের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে।
হুতিরা মূলত জায়েদি সম্প্রদায়ের অনুসারী। এটি শিয়া ইসলামের একটি শাখা। এই শাখা সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইয়েমেনে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে জায়েদিদের ওপর ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা আন্দোলন শুরু করে। জায়েদিরা মূলত দেশটির উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে বসবাস করে।
হুতি আন্দোলন ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর নামকরণ করা হয়েছে গোষ্ঠীটির প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা বদরুদ্দিন আল-হুতি ও তার ছেলে হোসেনের নামানুসারে। ২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হাতে হোসেন নিহত হন।
পরে বদরুদ্দিনের আরেক ছেলে আব্দুল মালিক আন্দোলনের দায়িত্ব নেন। তিনি তার অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে গোষ্ঠীটিকে উত্তর-পশ্চিমের একটি বিচ্ছিন্ন দল থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন। বর্তমানে আব্দুল মালিকের অধীনে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা রয়েছেন। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে তাদের।
ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই বাস করে, যদিও দেশটির ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হুতিদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো ইয়েমেনের প্রতিবেশী তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলের জন্যও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা শুরু করার পর তারা বারবার দখলদার দেশটিকে লক্ষ্য বানিয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে জড়ায়। এমনকি ২০০৯-১০ সালে তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ২০১২ সালে আরব বসন্তের সময় তারা বিক্ষোভে অংশ নেয়। এর ফলে তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে এই সালেহর সঙ্গেই হুতিরা জোট গড়েছিল। তবে সেই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০১৭ সালে হুতিরাই তাকে হত্যা করে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করার মাধ্যমে হুতিরা তাদের শক্তির জানান দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব তাদের ওপর হামলা শুরু করে। এতে যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাতে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়। দেশটিতে নেমে আসে চরম মানবিক বিপর্যয়।
২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও দেশের উত্তরের বড় একটি অংশ এখনো তাদের দখলেই রয়েছে।
গত জুলাই মাসে নতুন করে সংকট শুরু হয়। ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করতে দেয়। এর পাল্টা জবাব হিসেবে সরকারি বাহিনী হুতিদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
তেহরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হলো হুতিরা। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।
সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের ইরানের ‘হাতের পুতুল’ বলে মনে করে। তাদের অভিযোগ, ইরান এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে, যদিও ইরান বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
তবে হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত নেতা বলে মনে করে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করতেই তাদের এই হামলা।
হামলার কারণে অনেক কোম্পানির জাহাজ বাধ্য হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। গত মার্চ মাসে হুতিরা ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারা ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও হুতিরা নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখে। মূলত সামরিক সাহায্যের জন্যই তারা ইরানের ওপর নির্ভর করে।
ভারতের মাটিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে এক দিনের সফর শেষে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল রোববার বিকালে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পরপরই তড়িঘড়ি করে তিনি সরাসরি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। ২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষের দীর্ঘ অচলাবস্থা পেরিয়ে সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম ভারত সফর।
গত শনিবার ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে ভারতের রাজধানীতে পৌঁছান শি জিনপিং। সফরকালে তিনি কেবলমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেই একমাত্র আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। তবে সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত নৈশভোজে চীনা প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন।
সফর চলাকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়াদিল্লির অভিজাত হোটেল ‘তাজ প্যালেস’-এ অবস্থান করেন। তার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে হোটেলটিকে ‘নো-ফ্লাই জোন’ বা বিমান চলাচল নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি সেখানে মোতায়েন ছিল একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট এবং বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড। কড়া তল্লাশি ও কঠোর নিরাপত্তার অংশ হিসেবে হোটেলের সব কক্ষ আগেই সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।
চলতি বছর ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গত শনি ও গতকাল রোববারের এই ব্রিকস সম্মেলনটি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে কিছুটা মতভেদের সৃষ্টি করেছিল। এর আগে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হলেও ভারত একটি ‘চেয়ারস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করে। তবে দিল্লির মূল সম্মেলনে গভীর বিভেদ দূর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটি সামগ্রিক যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে মধ্যমণি করে যৌথ ছবি তোলার পর মূল অধিবেশনে অংশ নেন শি জিনপিং। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ স্বার্থের পক্ষে নয়। এই শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে ১১ সদস্যে সম্প্রসারিত ব্রিকস জোট বিশ্ব অর্থনীতি ও জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। নয়াদিল্লি সম্মেলন থেকে অপ্রচলিত নিরাপত্তা ঝুঁকি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনার পাশাপাশি বৈশ্বিক লেনদেনে ‘সুইফট’-এর বিকল্প এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে ভারতের আপত্তির কারণে জোটটিতে পাকিস্তানের সদস্যপদ পাওয়ার আবেদন স্থগিত রয়েছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পর গতকাল রোববার বিকালে নিজের কর্মসূচি সম্পন্ন করে চীন অভিমুখে রওনা হন শি জিনপিং, যা পরবর্তী বছর বেইজিংয়ের ব্রিকস প্রেসিডেন্সি গ্রহণের প্রস্তুতি ও ভারত-চীন কৌশলগত সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে।