রাশিয়ার সঙ্গে গত দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেনের ৩১ হাজার সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকীর পরের দিন রোববার কিয়েভে ‘ইউক্রেন. ইয়ার ২০২৪’ ফোরামে দেয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। খবর আল জাজিরার।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করেন রুশ সেনারা। এ যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই অনেক প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, প্রতিটি মৃত্যুই ইউক্রেনের জন্য মহান আত্মত্যাগ।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ডগুলোতে হাজারো বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা পাওয়া যাবে না।’
ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটিতে পূর্ণমাত্রায় রুশ হামলা শুরুর পর প্রথমবারের মতো নিহত সেনার সংখ্যা জানাল ইউক্রেন।
যুদ্ধে নিহত সেনার সংখ্যা নিয়ে রাশিয়াও আনুষ্ঠানিকভাবে খুব কম তথ্য দিয়েছে।
দেশটির স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনা শনিবার জানায়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন ৭৫ হাজার রুশ নাগরিক।
ইরানের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করতে নৌ-অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তার মাঝেই পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দরগুলোতে গত কয়েক দিনে পাঁচটি খালি ট্যাংকার ভিড়েছে। সেগুলোতে লাখ লাখ ব্যারেল তেল ভরার কাজও শুরু হয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর রিভিউ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালির অন্য প্রান্তে, ওমান উপসাগরে ঘুরঘুর করছিল পাঁচটি ট্যাংকার। ইরানের একেবারে পূর্ব প্রান্তের বন্দরের বাইরে থাকা ওই জাহাজগুলোকে চলতি সপ্তাহের শেষের দিক থেকে স্যাটেলাইট চিত্রে আর দেখা যাচ্ছে না। মোট ৯০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে ওই ট্যাংকারগুলো এখন ঠিক কোথায় রয়েছে, তা অজানা। যদিও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত সোমবার (২০ এপ্রিল) অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো জাহাজই সেই বেড়াজাল ভাঙতে পারেনি।
স্যাটেলাইট চিত্র, জাহাজ চলাচলের তথ্য ও একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ থেকে মার্কিন অবরোধের ভেতরে চলা সামুদ্রিক কার্যকলাপের একটি আংশিক চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে মোট ১০টি জাহাজকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর গতিবিধি অবরোধের আওতাভুক্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে, জাহাজগুলো অবরোধের ঘেরাটোপে থাকলেও ইরানের স্থাপনাগুলো থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। শুক্রবার তারা ঘোষণা দিয়েছে, নৌপথটি ফের খুলে দেওয়া হচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরেই সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও ইরানের সঙ্গে ‘লেনদেন শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার আগপর্যন্ত’ অবরোধ বহাল থাকবে।
ইউএস সেন্ট্রাল কম্যান্ড জানিয়েছে, এই অবরোধে ১০ হাজার মার্কিন সেনা, ডজনখানেকের বেশি নৌবাহিনীর জাহাজ এবং একগুচ্ছ যুদ্ধবিমান ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। অবরোধ ঘোষণার সময় মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরানের বন্দর বা উপকূল থেকে আসা-যাওয়া করা যেকোনো দেশের জাহাজের ওপরেই এই কড়াকড়ি বলবৎ হবে। তবে যেসব জাহাজের গন্তব্য বা উৎস ইরানের কোনো বন্দর নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই অবরোধ কার্যকর হবে না।
বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফ-এর চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন একটি মানচিত্র তুলে ধরেন। তাতে ওমান উপসাগরজুড়ে বিস্তৃত একটি ‘অবরোধ রেখা’ দেখানো হয়। উত্তরে ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে দক্ষিণে ওমানের রাস আল হাদ্দ উপদ্বীপ পর্যন্ত ওই রেখা বিস্তৃত।
তবে অবরোধ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইরানের বন্দরগুলোর আশেপাশে এখনো যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে একাধিক ট্যাংকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, অবরোধ-সীমানার মধ্যে থাকা সন্দেহভাজন বহু জাহাজের—সংখ্যায় যা দুই অঙ্কের—ওপর নজর রাখছে মার্কিন বাহিনী। উপসাগরে ইতোমধ্যেই আমেরিকার বেশ কয়েকটি ‘ডেস্ট্রয়ার’ মোতায়েন করা হয়েছে। তার দাবি, প্রয়োজন বুঝলেই সন্দেহভাজন জাহাজগুলোর পথ আটকাবে সেগুলো।
ওমান উপসাগর অবরোধ করে রাখলে পারস্য উপসাগরের তুলনামূলক অগভীর ও সঙ্কীর্ণ জলপথ এড়িয়ে যেতে পারবে মার্কিন বাহিনী। পাশাপাশি ডেস্ট্রয়ারগুলোর গতিরও পুরো সুবিধা তোলা যাবে। কারণ, এই যুদ্ধজাহাজগুলো ঘণ্টায় ৩০-৩৫ মাইল বেগে ছুটতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ তেলের ট্যাংকারগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫ মাইলের কাছাকাছি বা তার থেকে সামান্য বেশি।
বৃহস্পতিবার কেইন দাবি করেছেন, ইরানের জলসীমা ও আন্তর্জাতিক জলপথ—সর্বত্রই এই অবরোধ বহাল থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে ভারত মহাসাগর বা অন্যত্র পাড়ি দেওয়া যেকোনো ইরানি জাহাজ অথবা তেহরানকে সাহায্যকারী যেকোনো জাহাজেরই পিছু ধাওয়া করবে মার্কিন বাহিনী।
কেইন বলেন, অবরোধের শর্ত ভেঙে কোনো জাহাজ ওই এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করলেই সতর্কবার্তা দেবে পাহারায় থাকা আমেরিকার প্রধান জাহাজটি। আর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে বিমান সহযোগিতাও আসবে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ‘হিলডা ১’, ‘সিলভিয়া ১’ ও ‘আম্বার’—এই তিনটি ইরানি ট্যাংকার খারগ দ্বীপে নোঙর করেছে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই হয় এই দ্বীপ থেকে। তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ট্যাংকার ট্র্যাকার্স-এর তথ্যমতে, ওই তিনটি জাহাজে মোট ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ভরা হয়েছে।
ইরানের তেল রপ্তানি অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ খারগ। মূল ভূখণ্ড থেকে অপরিশোধিত তেল এই টার্মিনালের মজুতাগারে এসে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুল খরচের ধাক্কা এড়াতে স্টোরেজে মজুত হওয়া তেল খালাস অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
লন্ডনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক রয়্যল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট-এর গবেষক পেট্রাস কাটিনাস বলেন, এই জাহাজগুলো আদতে ভাসমান স্টোরেজ হিসেবেই কাজ করে। তেলের জোগান যাতে এক জায়গায় আটকে না থাকে, জাহাজগুলো তা নিশ্চিত করে। এতে মজুতাগারে অতিরিক্ত তেল জমে গিয়ে গোটা অবকাঠামো বা উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
ট্যাংকার ট্র্যাকার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে, পারস্য উপসাগরে ইরানের সর্বউত্তরের বন্দর মাহশাহরেও একটি ট্যাংকারে জ্বালানি তেল ভরা হয়েছে। বৃহস্পতিবারের স্যাটেলাইট-চিত্রে ‘আর্নিকা’ নামে ওই চতুর্থ ইরানি ট্যাংকারটিকে দেখা গেছে। এছাড়াও বুধবার বন্দর মাহশাহরের দক্ষিণ-পুবে আসালুয়েহ বন্দরের স্যাটেলাইট চিত্রে চীনের মালিকানাধীন আরও একটি জাহাজকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পানামার পতাকাবাহী ওই জাহাজটির নাম ‘ইয়ং তাই’। ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ওই জাহাজে ক্রুড বিভিন্ন পণ্য বোঝাই করা হচ্ছিল।
অতীতে ইরানের তেল পরিবহন করেছে, এমন বেশ কিছু ট্যাংকার গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢুকেছে। যদিও সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার-এর জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যান বলছে, সেগুলো এখনো কোনো বন্দরে নোঙর করেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজগুলোর অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য বিকৃত করাও সম্ভব। এর ফলে ভুয়া কোঅর্ডিনেটস সম্প্রচার করে জাহাজগুলো অনায়াসে নিজেদের আসল অবস্থান গোপন করতে পারে।
পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এবার ক্ষোভ উগরে দিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগের আগে যে নিরাপত্তা যাচাইয়ে (সিকিউরিটি ভেটিং) ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই তথ্য খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই জানানো হয়নি বলে দাবি তার। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তিনি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টিকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিলেও স্টারমারের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। আগামী মাসেই ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক এসব বিতর্কের জেরে এই নির্বাচনে তার দলকে চরম মাশুল গুনতে হবে।
প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সখ্যের জেরে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের পদ ছাড়তে বাধ্য হন লেবার পার্টির প্রবীণ নেতা পিটার ম্যান্ডেলসন। এই কেলেঙ্কারির পর তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন স্টারমার। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা সীমিত করার ঘোষণা দিয়ে সেই চাপ কিছুটা হলেও সামলে উঠেছিলেন তিনি।
কিন্তু বৃহস্পতিবার নতুন এক তথ্য সামনে আসায় পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। জানা যায়, রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে হওয়া নিরাপত্তা যাচাইয়ে বাদ পড়েছিলেন ম্যান্ডেলসন। স্টারমারের কার্যালয় বলছে, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানতেন না। কিন্তু বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য প্রধানমন্ত্রী কীভাবে না জেনে থাকতে পারেন? তাই তারা স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
ইরান সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য শুক্রবার ফ্রান্সে ছিলেন স্টারমার। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি পার্লামেন্টে বলেছিলাম যে নিয়োগে যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছে। অথচ ম্যান্ডেলসন যে নিরাপত্তা যাচাইয়ে বাদ পড়েছিলেন, সেটাই আমাকে জানানো হয়নি। এটি ক্ষমার অযোগ্য।’
পদত্যাগ করবেন কি না—এমন প্রশ্নে স্টারমার জানান, সোমবার পার্লামেন্টে তিনি ‘প্রাসঙ্গিক সব তথ্য’ তুলে ধরবেন। এদিকে তার এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই।
তবে এই কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে বৃহস্পতিবার রাতেই তড়িঘড়ি করে পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা অলি রবিন্সকে বরখাস্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
২০২৪ সালে ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত করার সিদ্ধান্তকে স্টারমার নিজেই একটি দারুণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অথচ তার কার্যালয় এখন বলছে, চলতি সপ্তাহের আগে প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা যাচাইয়ের এই ব্যর্থতার কথা জানতেনই না। ফলে সরকারের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আদৌ কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেবার পার্টির এক এমপি বলেন, দল এখনই স্টারমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে না ঠিকই, তবে ম্যান্ডেলসন-কাণ্ড বিরোধীদের জন্য এক ‘অফুরন্ত উপহার’। আগামী ৭ মের স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে; তার আগে এই কেলেঙ্কারি প্রধানমন্ত্রীকে বেশ ভোগাবে।
আরেক লেবার এমপির দাবি, বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির পদত্যাগ করা উচিত। কারণ, ম্যান্ডেলসনের নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় তিনিই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ওই এমপির ভাষায়, ‘প্রতারণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি অনেক বড় অযোগ্যতা।’
পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের লেবার সদস্য জর্জ ফুকস অবশ্য রয়টার্সকে বলেন, স্টারমার আরও অনেকগুলো বিষয় খুব ভালোভাবে সামলাচ্ছেন। তাই এখনই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়াটা হঠকারিতা হবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সমুদ্র নিরাপত্তা ও শিপিং সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। এর মধ্যে অন্তত একটি ট্যাংকারে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গানবোট থেকে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংস্থা ইউকেএমটিও।
এই ঘটনার মাধ্যমে ইরান জানিয়ে দিল, হরমুজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করতে পারবে না।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স কয়েকটি শিপিং সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালি এলাকায় অবস্থানরত বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে রেডিও বার্তা পায়। ওই বার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো জাহাজকেই এই পথ অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলিহরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি
ব্রিটিশ সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, রেডিও বার্তার পরপরই একটি তেলের ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গানবোট থেকে গুলি চালানো হয়। ওমান উপকূল থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে এই হামলার ঘটনা ঘটে। তবে ট্যাংকার ও এর ক্রু সদস্যরা নিরাপদ আছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে আজ সকালে মেরিটাইম ট্র্যাকারগুলোতে দেখা যায়, আটটি তেলের ট্যাংকারের একটি বিশাল বহর হরমুজ অতিক্রম করছে। সাত সপ্তাহ আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল বড় কোনো নৌযানের প্রথম প্রকাশ্য চলাচল। কিন্তু এই স্বস্তির রেশ বেশিক্ষণ টেকেনি।
হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ ঘোষণা করল ইরানহরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ ঘোষণা করল ইরান
যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখায় ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজের ওপর পুনরায় কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অবরোধের কারণে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এক বিবৃতিতে বাহিনীটির যৌথ সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, এই কৌশলগত জলপথের পরিস্থিতি এখন ‘আগের অবস্থায়’ ফিরে গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি এ খবর জানিয়েছে।
আইআরআইবি’র বরাতে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে আইআরজিসি অভিযোগ করে, তথাকথিত অবরোধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ‘দস্যুতা ও সামুদ্রিক চুরি’ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই কৌশলগত জলপথটি এখন সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
আইআরজিসির থেকে জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালিতে এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতদিন জারি থাকবে তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের আচরণের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়া নিয়ে এক কঠোর ও সতর্কবার্তা প্রদান করেছে ইরান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে এই জলপথটি শুধুমাত্র চলমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে এবং বিশেষ কিছু শর্তসাপেক্ষে খোলা রাখা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়ে-নিক বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার অর্থ এই নয় যে যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারবে। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, শত্রুপক্ষের কোনো সামরিক জাহাজ বা যুদ্ধ সরঞ্জাম বহনকারী কোনো বাহন এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের ন্যূনতম অধিকার রাখে না। ইরানের এই অবস্থানের মূল লক্ষ্য হলো অঞ্চলটিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। তালায়ে-নিক আরও সতর্ক করে বলেন যে, বর্তমান এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ‘অস্থায়ী’। বিশেষ করে লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর এই জলপথের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। লেবাননের পরিস্থিতির কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে ইরান যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিতে দ্বিধা করবে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে এমন টানটান উত্তেজনার মাঝেই কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী সোমবার (২০ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রথম দফার আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই শেষ হলেও, উভয় পক্ষই পুনরায় টেবিল বৈঠকে বসার বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নিতে মার্কিন এবং ইরানি প্রতিনিধিদলগুলো আগামীকাল রোববার (১৯ এপ্রিল) ইসলামাবাদে এসে পৌঁছাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে শর্তসাপেক্ষে খোলা রাখা মূলত ইরানের একটি কৌশলগত চাল। এর মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে, যাতে আসন্ন ইসলামাবাদ আলোচনায় নিজেদের পাল্লা ভারি রাখা যায়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম এই লাইফলাইনটি যেহেতু সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাই সোমবারের বৈঠকের ফলাফলই নির্ধারণ করবে বিশ্ব তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ইসলামাবাদ এবং লেবানন সীমান্তের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংঘাতের অবসানে শেষ পর্যন্ত দুই বৈরী দেশ কোনো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান কৌতূহলের বিষয়।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলাকালে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার আগের ঘোষণা অনুযায়ী এই রুট সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্ট দিয়ে এ ঘোষণা দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ইরান এই নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
পোস্টে আব্বাস আরাগচি লেখেছেন, ‘লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সংগতি রেখে এই যুদ্ধবিরতির (ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি) বাকি সময়টুকুতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে। ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার পূর্বঘোষিত সমন্বিত রুটে নৌযান চলাচল করবে।’
কিন্তু আরাগচির এ ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও প্রস্তুত। তবে ইরানের ক্ষেত্রে নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল ও কার্যকর থাকবে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকবে, যতক্ষণ না ইরানের সঙ্গে আমাদের লেনদেন ১০০ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। গত ২ মার্চ থেকে থেকে লেবাননেও তীব্র হামলা শুরু করে ইসরায়েল। উভয় দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ৮ মার্চ ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২১ এপ্রিল এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের দেওয়া এক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধবিরতির চুক্তি চূড়ান্ত করতে গত শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা প্রায় ২১ ঘণ্টা সরাসরি আলোচনা করেন। ইসলামাবাদে অনেক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয় সামনে চলে আসে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। যুদ্ধের আগে এ পথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানির দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এটা বিশ্বের অন্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়, যা ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করে। এসব কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের সব বন্দরে অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের বন্দর অবরোধের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার ভোরে লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
এদিকে হরমুজ খোলার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১১ শতাংশের বেশি কমে গেছে। পাশাপাশি ইউরোপের প্রধান শেয়ার বাজারগুলোও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সূচকগুলো ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল।
আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মূল্যের দিক থেকে ৭০ শতাংশ এই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশই একটি পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সেটি হলো হরমুজ প্রণালি।
পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশের ভোক্তা দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। এ ছাড়া বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাও সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের প্রভাবের প্রতিক্রিয়া এসব দেশের জ্বালানি তেলের বাজারেও পড়েছে।
গতকাল শুক্রবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, হরমুজ প্রণালি খোলা ঘোষণার পরপরই বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০ দশমিক ৫৯ ডলার বা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৮ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১০ দশমিক ৮০ ডলার বা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেলের দাম ৮৩ ডলারে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
ডাও জোন্স সূচক ৭৪৫ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ০ দশমিক ৯ শতাংশ ও নাসডাক সূচক ১ শতাংশ বেড়েছে।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ মার্চের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১১ শতাংশের এর বেশি বেড়েছে।
যুদ্ধের আগেই নেওয়া সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির কারণে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ইরান। পাশাপাশি পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। খবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন মতে, ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ইরানের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং শীর্ষ নেতারা নিহত হয়েছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যক্তিগত প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা বলছেন, সংঘাতের আশঙ্কায় নেওয়া কার্যকর পরিকল্পনার কারণে ইরান তাদের মিসাইল এবং ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। একই সঙ্গে তারা তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রভাবকেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। এই তথ্যগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের চেয়ে ভিন্ন ও অনেক বেশি সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরে। ইরানের আগে থেকে করা সামরিক পরিকল্পনার কার্যকারিতা এমন সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে যে তারা বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
গত সোমবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান সামরিক এবং অন্য সব দিক দিয়ে সম্পূর্ণভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।’ গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং তার চেয়েও বেশি কিছু করেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শীর্ষ সামরিক নেতারা নিহত হলে তাদের স্থলাভিষিক্ত কারা হবে—ইরানের এমন আগাম পরিকল্পনার কারণে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে বড় নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা হলেও তাদের কমান্ড কাঠামোতে খুব একটা বিঘ্ন ঘটেনি। ইউরোপীয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন বলছে, ইরানের কাছে এখনো দূরপাল্লার মিসাইলের বিশাল মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, তাদের অস্ত্রাগারে এখনো হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে।
ইরানের মিসাইল মজুত একটি গোপন বিষয়। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন, ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ হামলার প্রয়োজন ছিল। তবে অন্যরা বলছেন, এটি একটি অতি আশাবাদী ধারণা হতে পারে। কারণ, এতে আরও অনেক বেশি সময় লাগতে পারে এবং ইরানের শিল্প ও পারমাণবিক সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি শেষ নাও হতে পারে।
ইরান তাদের মিসাইল লাঞ্চার এবং ড্রোন অবকাঠামো সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে লাঞ্চারগুলোর জায়গা পরিবর্তন করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেগুলো দ্রুত ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই চিত্র ৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ইরানে মার্কিন হামলার অপারেশনাল নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘যেকোনো বিচারে এপিক ফিউরি ইরানের সামরিক বাহিনীকে তছনছ করে দিয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য তাদের লড়াই করার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে।’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। পেন্টাগন গত বৃহস্পতিবার আগের দেওয়া হেগসেথের মন্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। সেখানে ইরানি নেতৃত্বের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘আপনারা কোন সামরিক সরঞ্জাম কোথায় সরাচ্ছেন, তা আমরা জানি। আপনারা যখন আপনাদের বিধ্বস্ত স্থাপনাগুলো পরিষ্কার করতে ব্যস্ত, আমরা তখন দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছি।’
ট্রাম্প গত বছর জুন মাসে বলেছিলেন, ওই মাসের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। হেগসেথ তার ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ‘ধুলিকণা’ এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘তাদের কমান্ড এবং কন্ট্রোল ব্যবস্থা এতটা ধ্বংস হয়ে গেছে যে তারা নিজেরা কথা বলা বা সমন্বয় করতে পারছে না।’
তবে বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের কাছে দেওয়া এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) জানিয়েছে, ‘যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের কাছে এখনো হাজার হাজার মিসাইল এবং ড্রোন রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন এবং মিত্র বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
পশ্চিমা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল এবং ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানির মতো শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে দেশটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের, যেটিতে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিয়েছিল, তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ইরানের নেতারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিকে সারাদেশে প্রাদেশিক পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করার পরিকল্পনা করেন। একে বলা হয় ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা কৌশল।’ এটি সামরিক কমান্ডারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও বেশি ক্ষমতা দেয়। গত বছর ইরানে ইসরায়েলের হামলার পর দেশটি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা গঠন করে এবং তাদের নেতৃত্ব কৌশলে পরিবর্তন আনে। এর মধ্যে ছিল শীর্ষ কমান্ডার এবং সাবেক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা হলে দ্রুত লোকবল পরিবর্তনের প্রস্তুতি।
এসব জরুরি পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ইরান হামলার কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু উপসাগরীয় এবং ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে এই গ্রীষ্মে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাতে পারে।
ইসরায়েলের হিসাব বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল ছিল। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রতিরক্ষা প্রধান বেকা ওয়াসারের মতে, উপসাগরীয় দেশ এবং ইসরায়েলের সরকারি রিপোর্ট বলছে, ইরান এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৮৫০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ৪ হাজার ৭০০টির বেশি শাহেদ ড্রোন এবং প্রায় ৮০টি প্রচলিত ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা হয়েছে ১৩ এপ্রিল বাহরাইনে, তবে সেটি সরাসরি ইরান থেকে নাকি ইরাকে থাকা ইরানের প্রক্সিদের কাছ থেকে করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ৬ এপ্রিল এক কার্যনির্বাহী আপডেটে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, ১৫৫টির বেশি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনী ইরানের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইটসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে।
স্পেনের বামপন্থী সরকারের নেওয়া গণ-বৈধকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছাতে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের মধ্যে একধারে আশা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন তারা।
মাদ্রিদের পেরুভিয়ান কনস্যুলেটের সামনে অপেক্ষমান ২৮ বছর বয়সী ম্যাডেলিন কাস্তিলো আক্ষেপ করে এএফপিকে বলেন, ‘সবকিছুতেই কেবল সমস্যা’। তিন সন্তানের এই জননী নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কনস্যুলার নথি সংগ্রহ করতে এসেছেন।
ম্যাডেলিন কাস্তিলো বলেন, ‘বলা হচ্ছে সবকিছুই বিনামূল্যে হবে, কিন্তু কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া পথ চলা কঠিন।’
তবে এর উল্টো চিত্রও দেখা গেছে। মাদ্রিদ আঞ্চলিক সরকারের অফিস থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছিলেন ৩০ বছর বয়সী কলম্বিয়ান নারী ক্যারোলিনা (ছদ্মনাম)। তিনি তার গণপরিবহণ সাবস্ক্রিপশন ও কার্ড নবায়ন করার নথি সংগ্রহ করেছেন। এই প্রকল্পে আবেদনের অন্যতম শর্ত হলো স্পেনে অন্তত টানা পাঁচ মাস অবস্থানের প্রমাণ দেওয়া, যা যাতায়াতের নথির মাধ্যমে সহজেই নিশ্চিত করা যায়।
দেড় বছর ধরে স্পেনে থাকা ক্যারোলিনা বলেন, ‘এটি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সাধারণ নিয়মে আবাসনের অনুমতি পেতে আমাকে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু জানুয়ারিতে যখন এই বিশেষ প্রকল্পের কথা শুনি, তখনই আমার আইনজীবী আমাকে সব নথি গোছাতে বলেন।’
ইউরোপের অন্য দেশ যখন অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তখন স্পেন তাদের অভিবাসন নীতি শিথিল করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বৈধ হওয়ার সুযোগ পাবেন, যাদের বেশিরভাগই লাতিন আমেরিকার নাগরিক।
স্পেনের বড় শহরগুলোতে লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর দূতাবাসের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
ক্যারোলিনা জানান, অনেকে তাদের অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে সুপারমার্কেটের লয়্যালটি কার্ড বা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর রসিদ ব্যবহার করছেন। স্পেনে নথিহীনদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা চালু থাকায় সরকারি হাসপাতালের পুরোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্যও বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ সপ্তাহের শুরু থেকে আইনে পরিণত হওয়া এক আদেশ অনুযায়ী, আবেদনকারীদের স্পেন বা নিজ দেশে কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকা চলবে না এবং তাদের দ্বারা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারবে না। এ ছাড়া, আবেদনকারীর প্রোফাইল ভেদে আগের কাজের অভিজ্ঞতা বা পারিবারিক অবস্থার প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে।
তবে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী আলেজান্দ্রার জন্য এই আনন্দ কিছুটা ম্লান। নতুন কলম্বিয়ান পাসপোর্ট হাতে পেলেও তার স্বামী এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
আলেজান্দ্রা বলেন, ‘আমার কাছে সব কাগজ আছে কারণ আমি আশ্রয়প্রার্থী। কিন্তু আমার স্বামীর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র না থাকায় সে কাজও পাচ্ছে না, আবার সার্টিফিকেট পাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই আবেদন প্রক্রিয়া চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। আবেদন জমা দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে। বিশাল এই প্রশাসনিক কাজ সামলাতে সরকার একটি বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইস।
অভিবাসনমন্ত্রী বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা, ডাক সেবা ও অভিবাসন দপ্তরের প্রায় ৪৫০টি শাখা এখন বাড়তি সময় খোলা রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া শুধু এই কাজের জন্য অতিরিক্ত ৫৫০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সট্রানজারিয়া ক্লারা ডটকম’-এর পরিচালক গুইলার্মো ভালদেরাবানো জানান, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মানুষ সাহায্যের জন্য তাদের কাছে ফোন করছেন।
গুইলার্মো ভালদেরাবানো সতর্ক করে বলেন, সাধারণ সময়েও এই প্রক্রিয়া বেশ ধীরগতির হয়। এখন নতুন জনবল এই চাপ কতটা সামলাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
ভালদেরাবানোর মতে, কেবল বিপুল সংখ্যক আবেদনই চ্যালেঞ্জ নয়; বরং নথিপত্রগুলোর সঠিক মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা বড় বিষয়। অতীতে এসব জায়গাতেই মূলত দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছিল।
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ শুরুর পর এই প্রথম পাকিস্তানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হয়ে এসেছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কতটা সীমিত হয়ে পড়েছে, ঘটনাটি তারই একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
মেরিন ট্রাফিকের জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ‘শালামার’ নামের ওই জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ওমান উপসাগরের দিকে রওনা হয়। জাহাজটির গন্তব্য করাচি বলে জানা গেছে।
গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে মার্কিন অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল নিয়ে বের হওয়া এটিই প্রথম কোনো ট্যাংকার। ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় মালিকেরা যখন দুশ্চিন্তায় আছেন, তখনই ঘটনাটি ঘটল। এর আগেও অবশ্য অবরোধ এড়িয়ে আরও কিছু ট্যাংকার প্রবেশ করেছে বা বের হয়েছে। তবে সেগুলোতে তেল ছিল কি না নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
অন্যদিকে এশিয়ার আমদানিকারকেরা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার যে চেষ্টা করছেন, তার একটি লক্ষণ দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে তাদের একটি ট্যাংকার লোহিত সাগর পার হয়েছে। হরমুজ অবরোধের পর এটিই তাদের প্রথম তেলের চালান।
এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার মৎস্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বিকল্প পথে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জাহাজটি নিরাপদভাবে লোহিত সাগর ত্যাগ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর ওই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সামান্য বাড়লেও প্রতিদিন হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ যাতায়াত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নৌ অবরোধের আওতায় পারস্য উপসাগর থেকে তেল বা অন্যান্য পণ্য বের করতে জাহাজ মালিকদের এখন ইরান এবং আমেরিকা—উভয় পক্ষের অনুমতি নিতে হচ্ছে। এর ফলে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত সপ্তাহে তিনটি সুপার ট্যাংকার ইরানি নয়, এমন তেল নিয়ে বের হতে পারলেও গত সাত সপ্তাহে খুব সামান্য পরিমাণ পণ্য এই জলপথ পাড়ি দিয়েছে। এমনকি অবরোধ আরোপের আগেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ‘শালামার’ নামের জাহাজটি প্রথমে গত রোববার উপসাগরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সেটি ফিরে আসে। পরে জাহাজটি আবার রওনা দিয়ে দাস দ্বীপে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে তেল নিয়ে গত বৃহস্পতিবার পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গত তিন দিনে অন্তত ১৪টি জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে। এতে বোঝা যায় যে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জাহাজের মালিক এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। জানা গেছে, এই অবরোধ ওমান উপকূলের রাস আল হাদ্দ থেকে শুরু করে ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত ঘোষণা করেছে ইরান। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে বর্তমানে যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে, সেই অবশিষ্ট সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারবে।
ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ইরান এই নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
আরাঘচি তার পোস্টে আরও বলেন, জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ‘পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশন’ কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত ও সমন্বিত রুট বা পথটি অনুসরণ করতে হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনব্যাপী একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে তিনি জানান, আজ ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম বিকেল ৫টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা) থেকে এই যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সংক্ষিপ্ত পোস্টে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ইরান এইমাত্র ঘোষণা করেছে যে হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং চলাচলের জন্য প্রস্তুত। ধন্যবাদ!’
উল্লেখ্য, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে কার্যকর হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল।
আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মূল্যের দিক থেকে ৭০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশই একটি পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর সেটি হলো ‘হরমুজ প্রণালি’।
পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশের ভোক্তা দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের প্রভাবের প্রতিক্রিয়া এসব দেশের জ্বালানি তেলের বাজারেও পড়েছে।
পারস্য উপসাগরের আকাশে এক বড় ধরণের সামরিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। তাদের বহরে থাকা অত্যন্ত বিরল এবং আকাশচুম্বী মূল্যের একটি ‘এমকিউ-৪সি ট্রাইটন’ ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। মার্কিন নৌবাহিনীর সেফটি কমান্ড গত মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে ড্রোনের এই ক্ষয়ক্ষতির কথা নিশ্চিত করলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লষণে এই ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব দিক উঠে এসেছে।
বিধ্বস্ত হওয়া এই ড্রোনটি মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নর্থরপ গ্রুমান জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে এই মডেলের মাত্র ২০টি ড্রোন তৈরি করা হয়েছে। ড্রোনটির নির্মাণ ব্যয় এতটাই অবিশ্বাস্য যে, এক একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোনের দাম প্রায় ২৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমানের অত্যাধুনিক এফ-৩৫সি স্টেলথ যুদ্ধবিমানের দামের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। ফলে এই একটি ড্রোন হারানো মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য কেবল কৌশলগত নয়, বরং বড় ধরণের আর্থিক ধাক্কা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্লাইট রাডার’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৯ এপ্রিল ইতালির সিগোনেলা নৌঘাঁটি থেকে ড্রোনটি তার মিশন শুরু করেছিল। ড্রোনটি যখন পারস্য উপসাগরের আকাশে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ছিল, তখন থেকেই এটি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। ফ্লাইট ডেটা অনুযায়ী, আকাশসীমা ছেড়ে যাওয়ার সময় ড্রোনটির উচ্চতা হঠাৎ করেই ৫০ হাজার ফুট থেকে নাটকীয়ভাবে ৯ হাজার ফুটে নেমে আসে। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে ড্রোনটি প্রথমে ‘৭৪০০’ কোড প্রেরণ করে, যা মূলত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংকেত। এর প্রায় ৭০ মিনিট পর এটি ‘৭৭০০’ কোড পাঠাতে শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় চরম জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। সর্বশেষ ইউটিসি সময় ১০টা ১২ মিনিটে ৯ হাজার ২৫০ ফুট উচ্চতায় ড্রোনটির সংকেত পাওয়ার পর এটি রাডার থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাইটন ড্রোনটি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণে সক্ষম আকাশযান। জেট ইঞ্জিনচালিত এই ড্রোনটি বিরতিহীনভাবে টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি আকাশে থাকতে পারে এবং প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মাইল পর্যন্ত এলাকা নজরদারির আওতায় আনতে সক্ষম। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এমন একটি উন্নত নজরদারি যন্ত্রের পতন মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতায় বড় ধরণের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। পেন্টাগন বর্তমানে এই বিধ্বস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গভীর তদন্ত চালাচ্ছে, তবে শত্রুদেশের কোনো হামলা নাকি কারিগরি ত্রুটির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে তা এখনও রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা রয়েছে।
এমন একটি সময় এই ড্রোন হারানোর খবরটি সামনে এল যখন লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র টানাপোড়েন চলছে। মার্কিন নৌবহরে এই ড্রোনের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় একটি ইউনিটের ক্ষতি হওয়া দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। আপাতত দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে পেন্টাগনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। তবে ২৪০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রযুক্তিগত বিপর্যয় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা এবং ব্যয়বহুল আকাশযানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বহুমুখী যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশীয় অর্থনীতিকে রক্ষা করতে বড় ধরনের উদ্ধার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। উদ্ভূত অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে দেশটির সরকার ৭.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা) একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চুল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই মেগা প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ এই খবরটি নিশ্চিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চুল সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বর্তমানে ‘বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবিকা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল যেন ভেঙে না পড়ে, সে জন্য সিউল সরকার অত্যন্ত ‘সক্রিয়’ ও ‘দ্রুত’ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য পণ্য ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার আগে থেকেই সতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও পরিবহন খাতে অপরিহার্য উপাদান ইউরিয়া এবং ইউরিয়া সলিউশনের কোনো সংকট যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে চলতি মাসের শেষ নাগাদ সরকারি জরুরি মজুত বাজারে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক এই চাপ মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার প্রশাসনিক তৎপরতাও বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন যেন অনুমোদিত সম্পূরক বাজেট অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া আগামী ২৭ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, ঘোষিত এই বিশাল বাজেটের অন্তত ৮৫ শতাংশ বা তারও বেশি অর্থ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ছাড় করা, যাতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চুল জানান, আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের মাধ্যমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হচ্ছে। অপরিশোধিত তেল এবং ন্যাফথার মতো জরুরি জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই আগাম ও বিশাল অংকের প্রণোদনা ঘোষণা প্রমাণ করে যে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্ভাব্য ভয়াবহতা সম্পর্কে কতটা সচেতন। এই পদক্ষেপ কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আপাতত সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির ব্যবসায়িক মহল ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং গতিপ্রকৃতির ওপর দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক গতিপথ অনেকাংশেই নির্ভর করবে।
মিয়ানমারে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশজুড়ে এক বিশাল সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জান্তা প্রধান থেকে নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট হওয়া সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ৪ হাজার ৩৩৫ জন কারাবন্দির সাজা মওকুফ ও কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দেশটির কারাবন্দি গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির সাজা প্রায় সাড়ে চার বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের এই বিশেষ ক্ষমার আওতায় ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে কারান্তরীণ থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকে শর্তসাপেক্ষে পূর্ণ সাধারণ ক্ষমা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা ও শর্ত মেনে চলার অঙ্গীকার সাপেক্ষে তাঁর অবশিষ্ট সাজা মওকুফ করা হয়েছে। তবে সু চির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। ৮০ বছর বয়সী এই নোবেলজয়ী নেত্রী বর্তমানে ২৭ বছরের দীর্ঘ সাজা ভোগ করছেন। প্রেসিডেন্টের বিশেষ আদেশে তাঁর সাজা থেকে সাড়ে চার বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সাজা কমলেও তাঁকে কারাগার থেকে সরিয়ে পুনরায় গৃহবন্দিত্বে রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সু চির আইনজীবী বা সরকারি পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমআরটিভি-র প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুক্তি পাওয়া ৪ হাজার ৩৩৫ জন বন্দির মধ্যে ১৭৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মানবিক সৌজন্য হিসেবে এই বিদেশি বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় সকল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে। এছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মেয়াদের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে ৪০ বছর করা এবং অন্যান্য সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে সাজার একটি নির্দিষ্ট অংশ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে স্বাধীনতা দিবস এবং এপ্রিল মাসে ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উপলক্ষে বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার একটি রীতি প্রচলিত আছে। তবে এবারের সাধারণ ক্ষমাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেওয়া প্রথম বড় ধরণের সরকারি আদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধের মাঝে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা নমনীয় করতেই জান্তা সরকার সু চি ও উইন মিন্টের বিষয়ে এমন কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই অং সান সু চি ও এনএলডি-র শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন অভিযোগে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর পর সু চির সাজা কমানোর এই ঘোষণাকে তাঁর অগনিত ভক্ত ও সমর্থকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, তাঁর পূর্ণ মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন এখনো অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান এই সাধারণ ক্ষমার ফলে মিয়ানমারের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।