ভারত মহাসাগরে জিম্মি একটি মাল্টিজ-পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর হেলিকপ্টারে গুলি চালিয়েছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। শুক্রবার এই ঘটনা ঘটে। শনিবার ভারতীয় নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ‘ইক্স-এমভি রুয়েন’ নামের মাল্টার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ ছিনতাই করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। এই জাহাজটিকেই আবার ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহকেও ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করেছে জলদস্যুরা। জাহাজটিকে আটকাতে অভিযান চালিয়েছিল ভারতীয় নৌবাহিনী। তারা একটি যুদ্ধজাহাজ দিয়ে ছিনতাইকৃত জাহাজটি আটকাতে সক্ষম হন।
খবরে বলা হয়েছে, এরপর ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার এমভি রুয়েনের কাছে যায়। তখন সেটি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী জাহাজে থাকা জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করতে বলেছে এবং জাহাজটিতে আটকে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। এই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে তারা- যোগ করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী।
এই ঘটনার ৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশ করা হয়েছে। আট সেকেন্ডের ওই ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায়, এক জলদস্যু হেঁটে ডেকে এসে ছিনতাইকৃত জাহাজটির ওপরে উড়তে থাকা একটি হেলিকপ্টারের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি ছুড়ছে, দুইবার গুলি ছোড়ে সে।
বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী বলেছে, চলতি সপ্তাহে সোমালিয়ার উপকূলের অদূরে বাংলাদেশের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় জলদস্যুরা সম্ভবত তাদের ছিনতাই করা জাহাজ রুয়েনকে ব্যবহার করেছে।
ভারতীয় নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা এখন আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিয়ে সোমালি জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের জন্য চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, সোমালি জলদস্যুদের হাতে পড়া বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ থেকে পাওয়া এসওএসে ভারতীয় নৌবাহিনী বৃহস্পতিবার সাড়া দিয়েছিল, এর এক দিন পর এ ঘটনাটি ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করেছে। ইরানও পাল্টা হামলা করছে। ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধ বিশ্বে ভয়াবহ খাদ্য সংকট ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা। অনলাইন আরটি’তে প্রকাশিত এক খবরে একথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের কৃষকদের জন্য সময়টা অত্যন্ত সংবেদনশীল। বসন্তকালীন চাষাবাদের মৌসুম শুরু হয়েছে। আর এই সময়ে সারের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সাধারণ ভোক্তারা যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় প্রভাব হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি সারের দামও দ্রুত বাড়ছে এবং সারের কাঁচামালের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
চলমান সংঘাত সার উৎপাদনের পুরো শৃঙ্খলকে প্রভাবিত করছে। বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে আধুনিক সার কীভাবে তৈরি হয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস নাইট্রোজেনের সঙ্গে হাইড্রোজেন মিশিয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করা হয়। পরে সেই অ্যামোনিয়া থেকে তৈরি হয় ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং ইউরিয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট (ইউএএন)। এগুলোকে একত্রে নাইট্রোজেনভিত্তিক সার বলা হয়। কৃষকরা ফসফরাস ও পটাশিয়ামভিত্তিক সারও ব্যবহার করেন। তবে নাইট্রোজেন সারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। বিশ্বব্যাপী মোট সারের ব্যবহারের প্রায় ৫৯ শতাংশই নাইট্রোজেন সার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সার ছাড়া পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদনই সম্ভব হতো না।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অ্যামোনিয়া উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বৈশ্বিক সার উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং রাশিয়া। তবে ইরান, সৌদি আরব এবং কাতার যথাক্রমে বিশ্বের নবম, দশম ও একাদশ বৃহত্তম উৎপাদক। বিশ্বের নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরু থেকেই এই প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৭ মার্চ সেখানে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করত প্রায় ১২৯টি জাহাজ। ফলে বিপুল পরিমাণ সার বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ছিল ৪৬৪ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৪ ডলার।
শুধু ইউরিয়া নয়, কৃষিতে ব্যবহৃত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সালফার, যা জীবাশ্ম জ্বালানির উপজাত। এর দামও চীনের বাজারে একই সময়ে ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রপথে জাহাজের জ্বালানি ব্যয় এবং বীমা খরচের দ্রুত বৃদ্ধি।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু সারই উৎপাদন করে না, তারা বিদেশি সার কারখানার জন্য গ্যাসও রপ্তানি করে। যুদ্ধের কারণে কাতার হঠাৎ করেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজার থেকে এক ধাক্কায় প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়েছে ভারতের সার শিল্পে। ভারতীয় ইউরিয়া উৎপাদকরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং কিছু কারখানা বন্ধ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর। অর্থাৎ খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সারের দাম বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে খাদ্যের দাম ২০১৯ সালের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাশিয়ার গ্যাসের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের এলএনজির ওপর নির্ভর করছে।
কিন্তু এখন সেই সরবরাহও ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপের অনেক সার কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কোম্পানি গ্রুপা আজোটি এসএ (গ্রুপা আজোটি এসএ) মার্চের শুরুতে নতুন অর্ডার নেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। কারণ ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। পরে বাজারদর অনুযায়ী কয়েক দিন পর আবার অর্ডার নেয়া শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে রয়েছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো।
জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদান, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া এবং মোজাম্বিক- এই ছয়টি দেশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা সারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুদানে ব্যবহৃত সারের ৫৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত সারের ৩৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। উন্নয়নশীল দেশের কৃষকরা সাধারণত উৎপাদন খরচ বাড়লে তা সামাল দিতে পারেন না। ফলে দ্রুত খাদ্য ঘাটতি তৈরি হয় এবং অনেক সময় তা দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে।
তেল-গ্যাসের বাজারের মতো সারের বাজারেও উচ্চ দাম কিছু দেশের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ রাশিয়া। বেলারুশ-সহ এই দুই দেশ বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির সার উৎপাদন ৩.৫ শতাংশ বেড়ে ৬৫.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে- যা একটি নতুন রেকর্ড।
যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া ও বেলারুশের সারের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল ‘রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করা।’ কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল হয়েছে। রাশিয়া তার সার রপ্তানি ঘুরিয়ে দিয়েছে ব্রিকস দেশগুলোর দিকে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব দেশে রাশিয়ার সার রপ্তানি ৬০ শতাংশ বেড়েছে। দেশটির কৃষকেরাও এখন তুলনামূলক সস্তা সার পাচ্ছেন। ফলে রাশিয়ায় নতুন ধনী শ্রেণি তৈরি হচ্ছে।
ফোর্বস-এর ২০২৬ সালের বিলিয়নিয়ার তালিকা অনুযায়ী, গত বছর রাশিয়ায় নতুন যে ১৪ জন ডলার বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭ জনই কৃষি ও খাদ্য খাত থেকে সম্পদ অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন আলেকজান্দর তাকাচেভ, বৃহৎ কৃষি প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকমপ্লেক্স-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ভাদিম মশকোভিচ, বৃহৎ খাদ্য কোম্পানি রুসাগ্রোর নিয়ন্ত্রক। এছাড়া সার ব্যবসায়ী আন্দ্রেই মেলনিচেঙ্কো এবং দিমিত্রি মাজেপিন-এর সম্পদও ইউরোপের সারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আরও বেড়েছে।
সৌদি আরবে অবস্থানরত আমেরিকান নাগরিকদের দেশ ছাড়ার জন্য জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। দূতাবাস বলেছে, যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে এখনই সৌদি আরব ত্যাগ করা উচিত।
রোববার (১৫ মার্চ) মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক গণমাধ্যম গলফ নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বরাতে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পররাষ্ট্র সচিব রুবিও ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে আমেরিকান নাগরিকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে।
দূতাবাস আরও জানায়, রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম বিমানবন্দর খোলা এবং কার্যকর রয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদি আকাশপথে নিয়মিত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যাত্রীরা ফ্লাইটের আগে সরাসরি এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপডেট যাচাই করতে হবে। যারা দেশ ছাড়তে পারছেন না, তাদের জন্য দূতাবাস নির্দেশ দিয়েছে—বাড়ি বা কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিশ্চিত করুন এবং প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধসহ অন্যান্য জিনিস সংগ্রহ করুন।
দূতাবাস সব আমেরিকান নাগরিকদের সতর্ক করে জানিয়েছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, অপ্রয়োজনীয় চলাচল এড়িয়ে চলতে হবে এবং দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সর্বশেষ নির্দেশনা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলার শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছে আটকা পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে জাহাজটি প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেও ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, বিএসসির মালিকানাধীন ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ নামের জাহাজটি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করে। তবে ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় জাহাজটি শেষ পর্যন্ত পথ পরিবর্তন করে আবার পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যায়।
এ ঘটনায় জাহাজটির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সহায়তা চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএসসি। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ম্যারিটাইম ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি এখন শারজা উপকূলের বহির্নোঙর এলাকায় অবস্থান করছে।
বিএসসি সূত্র জানায়, ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল জাহাজটি। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে তা জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। কিন্তু ঠিক পরদিনই ইরানকে লক্ষ্য করে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালালে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় জাহাজটি নতুন পণ্য বহনের পরিকল্পনা বাতিল করে নিরাপদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সেই অনুযায়ী হরমুজের দিকে যাত্রা শুরু করলেও পথে নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়ায় জাহাজটি আর অগ্রসর হয়নি।
নাবিকদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ জাহাজটি হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখের প্রায় ৬৬ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছালে ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়। একই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডও নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে জাহাজটি পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে।
‘এমভি জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল একপ্রকার বন্ধই আছে। সেখানে কয়েকটি জাহাজে মিসাইল বা ড্রোন হামলাও হয়েছে। গত মঙ্গলবারে একটি চীনা জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বলে শুনেছি। গত দুই দিন কোনো জাহাজের মুভমেন্ট ছিল না।
তিনি বলেন, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মুম্বাই, জাহাজ ভাড়াকারী প্রতিষ্ঠান এ গন্তব্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। সে কারণে আমরা শারজাহ বন্দরের অদূরে জাহাজ নোঙ্গর করে আছি।
জয়যাত্রার সব নাবিক সুস্থ এবং তাদের মনোবল অটুট রয়েছে জানিয়ে বিএসসি এমডি মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজে সব ধরনের খাবার ও সুপেয় পানি পর্যাপ্ত রয়েছে, জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলও রয়েছে। আগামী কয়েক মাস এসবের কোনো সমস্যা হবে না। নাবিকদের নিরাপদে থাকার জন্য নিয়মিত বিভিন্ন পরামর্শ আমরা দিয়ে যাচ্ছি।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, জাহাজটি আপাতত শারজার নোঙর এলাকায় রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কাতার থেকে নতুন করে পণ্য বহনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর অলভিয়া বন্দরে অবস্থানরত বাংলাদেশের জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। ওই হামলায় জাহাজের প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন এবং পরে আটকে পড়া ২৮ নাবিককে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জ্বালানিমন্ত্রীর অনুরোধে বিষয়টি তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রণালি ও তার আশপাশে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার দুবাই উপকূলের কাছে ‘সোর্স ব্লেসিং’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে আগুন লাগলেও জাহাজের নাবিকেরা প্রাণে বেঁচে যান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পারস্য উপসাগরে বর্তমানে প্রায় ১১০টি তেলবাহী ট্যাংকারসহ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্ব শিপিং কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জো ক্রামেক বলেন, সংঘাতে জড়িত না থাকলেও নাবিকেরা এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন।
কেনিয়ায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় গত এক সপ্তাহে অন্তত ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এক সপ্তাহ আগে প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪২। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। রাজধানী নাইরোবিতে পানির স্তর দ্রুত বাড়তে থাকায় একটি মিনিবাস পানিতে আটকে পড়ে। পরে উদ্ধারকারীরা সেখান থেকে ১১ জনকে উদ্ধার করেন। একই রাতে পানিতে প্লাবিত একটি বাড়ি থেকে দুই শিশুকেও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেনিয়া রেড ক্রস।
গত সপ্তাহজুড়ে ভারি বৃষ্টির ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব কমই দেখা গেছে। অনেক নদীর পানি তীর ছাপিয়ে আশপাশের এলাকায় ঢুকে পড়েছে। এতে অসংখ্য বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে এবং সড়ক, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রোববার এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, ফলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রবল বর্ষণ ও তার ফলে সৃষ্ট বিধ্বংসী বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
মৃতদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর বাসিন্দা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরটির দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াও বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে।
কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি শহরের বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থাও পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বন্যার প্রভাব শুধু কেনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়াতেও বন্যা ও ভূমিধসে দক্ষিণাঞ্চলে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার পেছনে নানা কারণ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণ হয়ে ওঠা বায়ুমণ্ডল অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বে গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো না হলে তাপমাত্রা আরও বাড়তে থাকবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় নিহতের সংখ্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীর হামলায় অন্তত ২২৩ জন নারী এবং ২০২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। নিহতের এই মিছিলে ৩ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং ৫ বছরের কম বয়সি ১২টি শিশুও রয়েছে।
রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তেহরান জানিয়েছে, কেবল প্রাণহানিই নয়, বর্বরোচিত এই হামলায় ৪১ জন শিশু গুরুতর জখম হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যৌথ সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ইরানের প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও রয়েছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি আগ্রাসনে ইরানের স্বাস্থ্য খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সারাদেশে অন্তত ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যা দেশটির চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। যুদ্ধের ডামাডোলে আহতদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ হাসপাতালগুলো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ইরান পাল্টা আঘাত শুরু করেছে। ইসরায়েল ছাড়াও জর্ডান, ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ইসরায়েলের পুলিশ সদর দপ্তর এবং একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক কৃত্রিম উপগ্রহ যোগাযোগ কেন্দ্রে শক্তিশালী চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। রোববার ভোরের দিকে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রোববার সকালে ইসরায়েলের বিশেষ পুলিশ ইউনিটের প্রধান কার্যালয় ‘লাহাভ ৪৩৩’ এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি ও কৃত্রিম উপগ্রহ যোগাযোগ কেন্দ্র ‘জিলাত’ লক্ষ্য করে এই জোরালো হামলা চালিয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে আক্রান্ত স্থাপনাগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান কিংবা এই হামলার ফলে কী ধরনের বা কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে চালানো ক্রমাগত হামলার জেরে ইসরায়েলে গত ২৪ ঘণ্টায় শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলমান এই সংঘাতের প্রভাবে গত এক দিনে অন্তত ১০৮ জন আহত ব্যক্তিকে দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এই ব্যক্তিরা ঠিক কীভাবে আহত হয়েছেন, সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আহতদের একটি অংশ ইরান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা লেবানন থেকে আসা রকেটের আঘাতে সরাসরি জখম হয়েছেন। এ ছাড়া আক্রমণের সতর্ক সংকেত শোনার পর দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে পড়েও অনেকে আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ১৯৫ জন ব্যক্তিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বর্তমানে তাঁদের মধ্যে ৮১ জন নাগরিক বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পুরো অঞ্চল জুড়েই এখন চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে এবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত বিমান ঘাঁটিতে একযোগে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। রোববার (১৫ মার্চ) সংঘটিত এই হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিয়ে ওই অঞ্চলে চরম উত্তজনা দেখা দিলেও সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা রিয়াদ মহানগরের আকাশে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে চারটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ত্রিমুখী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব ক্রমাগতভাবে ইরানের নিশানায় পরিণত হচ্ছে।
তেহরান এই যুদ্ধে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো, মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকেও হামলার জন্য বেছে নিয়েছে। রিয়াদের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক এই হামলাগুলোর জেরে সৌদি আরবে এ পর্যন্ত অন্তত দু’জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইরানের এমন আক্রমণাত্মক কৌশলে আঞ্চলিক তেল রাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরণের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একই ধরণের তাণ্ডব চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, তারা আরব আমিরাতের ‘আল-ধাফরা’ বিমান ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে বিধ্বংসী আক্রমণ চালিয়েছে। অভিযানে তারা একযোগে ১০টি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র এবং নাম প্রকাশ না করা বেশ কিছু ড্রোন ব্যবহার করেছে। যদিও এই হামলায় আমেরিকান সৈন্যদের ঠিক কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের এমন সরাসরি আঘাত যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
অন্যদিকে ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে ইসরায়েলও। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আল জাজিরা এবং এএফপি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘাতের প্রভাবে ১০৮ জন ইসরায়েলিকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ইরানের সরাসরি মিসাইল এবং লেবানন থেকে আসা রকেটের আঘাতের পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মানুষের অতিরিক্ত ভিড় ও হুড়োহুড়ির ফলেই এই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলে অন্তত ৩ হাজার ১৯৫ জন নাগরিক চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ বর্তমানেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সব মিলিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন ইরানের রকেট ও ড্রোনের গোঙানিতে এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলার সাক্ষী হচ্ছে। আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর এমন সরাসরি সামরিক সংঘাতে আন্তর্জাতিক মহলে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের মাধ্যমে দেশটি ত্যাগ করার জন্য এই বিশেষ সতর্কবার্তায় অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে দেশটির বর্তমান প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মূলত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে পুরো অঞ্চলে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আকাশপথে সাধারণ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই যেন নাগরিকরা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই দূতাবাস থেকে এই জরুরি নির্দেশনা জারি করা হলো।সূত্র অনুযায়ী, পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কঙ্গো-ব্রাজাভিলে রোববার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটির ৮২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ডেনিস সাসু নএনগুয়েসো’র চার দশকের শাসন আরও পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘায়িত হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। সাসু এন্গুয়েসোর বিরুদ্ধে ছয় জন প্রার্থী দাঁড়িয়ে আছেন। তবে প্রধান বিরোধীদল বিভক্ত ও কার্যত অনুপস্থিত থাকায় তিনি সহজেই বিজয়ী হওয়ার পথে বলেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সাবেক প্যারাট্রুপার কর্নেল সাসু ন্গুয়েসো ইতোমধ্যেই আফ্রিকার দীর্ঘমেয়াদি নেতা হিসেবে পরিচিত। এ তালিকায় আরও রয়েছেন— ইকুয়েটোরিয়াল গিনিয়ার তেওদোরো ওবিয়াং ন্গুয়েমা এম্বাসোগো ও ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া।
নিরীক্ষকরা মনে করছেন, এই নির্বাচনে ভোটর উপস্থিতি রেকর্ড কম হতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রেসিডেন্ট সাসু এনগুয়েসো দেশটি ঘুরে ভোট দাতাদের ভোটকক্ষে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারণা শুক্রবার শেষ হয়েছে। সুরক্ষার বিষয়টি তার শেষ নির্বাচনী সভায় ব্রাজাভিলে হাজার হাজার উৎসাহী সমর্থকের সামনে উত্থাপন করা হয়। যদিও তিনি দেশের কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছেন, মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিরোধীদলীয় কর্মীদের ওপর হয়রানির অভিযোগ নিয়মিত তুলে ধরছে।
২০১৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী নেতা জেন-মারি মিশেল মোকোকো ও আন্দ্রে ওকম্বি স্যালিসা দুই জনই ‘আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে ২০ বছরের কারাগারের সাজা ভোগ করছেন।
প্রেসিডেন্ট তার নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থনৈতিক অর্জনের কথাও তুলে ধরেছেন। দেশটির অবকাঠামো আধুনিকায়ন, গ্যাস ও কৃষিক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে কঙ্গোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তেলের রফতানির আয়ের তিন-চতুর্থাংশই দেশীয় রাজস্ব দেয়। তেলের আয়ের কারণে ২০২৫ সালে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশ ধরা হয়েছে। তবুও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে জীবনযাপন করছে।
সরকারের সমালোচকরা বলছেন, দেশের বৃদ্ধি মূলত সিনিয়র কর্মকর্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল তেল রাজস্ব সঞ্চয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যেই একাধিক মামলা হয়েছে ও তদন্ত চলছে।
যদিও সাসু এনগুয়েসোর পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত, সংবিধান অনুযায়ী ২০৩১ সালে তিনি আর নির্বাচন করতে পারবেন না। তিনি বলেছেন, ‘আমি চিরকাল ক্ষমতায় থাকব না। তরুণ প্রজন্মেরও সুযোগ আসবে।’
তবে তিনি কোনও নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীর নাম প্রকাশ করেননি। সাসো এনগুয়েসো প্রথমবারের মতো ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত একদলীয় ব্যবস্থার অধীনে কঙ্গো-ব্রাজাভিলের নেতৃত্ব দেন এবং প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে হেরে যান। ওই নির্বাচনী বিজয়ী ১৯৯৭ সালে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন।
সাব-সাহারান আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ, কঙ্গো-ব্রাজাভিল হাইড্রোকার্বনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা রফতানি আয়ের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। ভোট কেন্দ্রগুলো স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ১৫তম দিন ছিল (১৪ মার্চ) শনিবার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে ইরান। দেশটি ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাত ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
সৌদিতে ইরানের হামলায় ৫টি মার্কিন প্লেন ক্ষতিগ্রস্ত
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) প্লেন ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় প্লেনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। বর্তমানে প্লেনগুলোর মেরামতের কাজ চলছে। এই হামলায় কেউ নিহত হয়নি বলেও জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।
ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে কোনো দেশকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার কথা বলে আসছে রিয়াদ। এর মধ্যেই ইরানের হামলায় সৌদির বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে।
আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিতে এবং বাহরাইন ও কুয়েতের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর ‘টানা কয়েক দফায়’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরিকে উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছেন। হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ঘাঁটিগুলোর মধ্যে আবুধাবির আল-দাফরা এবং বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটির নাম উল্লেখ করেছেন আইআরজিসির নৌপ্রধান।
আলিরেজা আরও দাবি করেন, এই হামলায় প্যাট্রিয়ট রাডার সিস্টেম, যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাংক নিশানা করা হয়েছিল।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ১২ চিকিৎসাকর্মী নিহত
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। শনিবার (১৪ মার্চ) লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণ লেবাননের বুর্জ কালাউইয়া শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওই হামলায় ১২ জন চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও নার্স নিহত হয়েছেন। এর আগে সাওয়ানেহ শহরে পৃথক এক হামলায় হিজবুল্লাহ এবং তাদের সহযোগী সংগঠন আমাল মুভমেন্ট সংশ্লিষ্ট দুই প্যারামেডিক নিহত হন।
এদিকে, ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরান ও হিজবুল্লাহ নতুন করে হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ হামলায় বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। উত্তরের আপার গ্যালিলি অঞ্চলে হামলা হয়েছে। এই এলাকা লেবানন সীমান্তের কাছে হওয়ায় সেখানে হিজবুল্লাহর রকেট হামলারও শঙ্কা রয়েছে।
ইসরায়েলের দিকে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান
ইসরায়েলের দিকে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এয়ারোস্পেস বাহিনীর কমান্ডার জানিয়েছেন, ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর দিকে এক ও দুই টন ওজনের মোট ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং সবগুলোই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে।
আইআরজিসির এয়ারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি বলেন, এই অভিযানে ‘দখলদার ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ এয়ারোস্পেস ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’
ইরানের বিরুদ্ধে ২,৫০০ মেরিন সেনা মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের
জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থানরত ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা এখন ইউএসএস ত্রিপোলি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে রওনা হয়েছেন। ইউএসএস ত্রিপোলি একটি উভচর যুদ্ধজাহাজ (অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ)। এ জাহাজ থেকে মেরিন সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হতে পারে।
প্রয়োজনে কোনো সংকটে সাড়া দেওয়া বা ইরানের কোনো অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো অভিযানে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে এদেরই প্রথম স্থলসেনা হিসেবে মোতায়েন করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও মেরিন বাহিনী স্থল ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রেই অভিযান পরিচালনা করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং শিগগিরই সংঘাত শেষ করার তেমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ৬ জন নিহত
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে ৬ মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি আবাসিক ভবনে ওই হামলা চালানো হয়। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের একটি হেলিপ্যাডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন দেশটির একজন কর্মকর্তারা। এর আগে আল জাজিরা এরাবিকের এক প্রতিবেদক জানান, হামলার পর দূতাবাস এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলার সময় সেখানে বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেনও বেজে ওঠে।
চলমান ইরান যুদ্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের মুখে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণের ভয়ে অনেকটা ‘চুপ’ থাকার কৌশল নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, বিশ্বব্যবস্থায় শক্তিধর দেশগুলোই শেষ কথা বলে। আন্তর্জাতিক আইন বা চুক্তি অনেক সময়ই সেই শক্তির ব্যবহার ঠেকাতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ভারত পশ্চিমা মিত্রদের সমালোচনা করেছিল, যখন তারা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমালোচনা করছিল।
ভারতের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের নীতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্রই প্রকাশ করে—যেখানে স্বার্থই প্রধান।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধেও ভারতের অবস্থান
২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আক্রমণ করে, তখনো ভারত মস্কোর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেয়নি। দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা যুক্তি দিয়েছিলেন, বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তিধর দেশগুলো বরাবরই নির্মম আচরণ করে এবং তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ অনেকটাই ভণ্ডামি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখনো একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। মার্চে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা ডায়লগে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত পশ্চিমাদের জন্য এবং পশ্চিমাদের দিয়েই তৈরি।
তার মতে, এই ব্যবস্থা যদি এখন ভেঙে পড়ে, সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এতে ভারত ও গ্লোবাল সাউথের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দিল্লিতে উদ্বেগ
ভারতের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের অনেকেই এই আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি বন্ধ থাকে, তাহলে ভারতের জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।
মার্কিন সিদ্ধান্তে অসন্তোষ
রাইসিনা ডায়ালগ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল ভারত সাময়িকভাবে কিনতে পারবে। কিন্তু এতে কৃতজ্ঞতার বদলে অনেক ভারতীয় নীতিনির্ধারকের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেন ভারতের হাতে ‘অনুমতির চিঠি’ ধরিয়ে দিয়েছে।
এই অস্বস্তি আরও বেড়ে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্ষেত্রে যে ভুল করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রেও সেই ভুল করবে না।
মোদি সরকারের নীরবতার কারণ
কূটনীতিকদের মতে, এসব ঘটনার পরও মোদি সরকারের নীরবতার প্রধান কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা। ২০২৫ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধে জড়ায়। এমনকি স্বল্পস্থায়ী ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনার সময়ও ওয়াশিংটন পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক উন্নত করার ট্রাম্পের আগ্রহ ভারতের কৌশলগত হিসাবকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
ভারসাম্য নীতির সীমাবদ্ধতা
ভারত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি তারা। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ এবং আফগানিস্তানে স্থলপথে প্রবেশের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দিল্লির অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ভারসাম্য নীতি ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে না। বরং দেশটি একই সঙ্গে বহু জায়গার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বড় ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য আরও নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৯৫ লাখ ভারতীয় কাজ করেন, যারা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান। যদি মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে চীন আরও বেশি রুশ তেল কিনতে পারে। এতে রাশিয়া চীনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে সমস্যাজনক। কারণ ভারত একদিকে রাশিয়ার অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও চীনের প্রভাব
জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে ভারত যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় পদক্ষেপ নেয়, তাহলেও নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ বড় পরিসরে সোলার প্যানেল, উইন্ড টারবাইন এবং ব্যাটারি সরবরাহে সবচেয়ে সক্ষম দেশ হচ্ছে চীন। ফলে সেই ক্ষেত্রেও ভারতের নির্ভরতা বাড়তে পারে।
জাপান সাগরে উত্তর কোরিয়া পর ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে দাবি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করার পরিকল্পনার মধ্যেই উত্তর কোরিয়া এ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল। খবর রয়টার্সের।
গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জাপানের কোস্টগার্ড বাহিনী এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী।
উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ বিরল কোনো ঘটনা নয়। কারণ, গত দু’দশক ধরেই জাপান সাগর, পূর্ব চীন সাগর ও কোরিয়া প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করছে পিয়ংইয়ং। বেপরোয়াভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কারণে ২০০৬ জালে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে জাতিসংঘ, কিন্তু পিয়ংইয়ংকে দমানো যায়নি।
উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ বছর আগে দেশটিতে থাড মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি ওয়াশিংটন সিউল-কে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে থাড।
দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক জুংআং এ বিষয়য়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। জুংআং-কে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিউং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাড সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে খুশি নয় সিউল।
জুনআং- এ এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই জাপান সাগরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার নির্দেশ দিলেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।
ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিতসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে তেহরান। তবে এক্ষেত্রে একটি শর্ত রাখা হবে—তেলের দাম মেটাতে হবে চীনা মুদ্রা ইউয়ান-এ।
ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের পথ সুগম করতে একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইরান সরকার। বিশ্ববাজারে তেলের লেনদেন মূলত ডলারে হয়ে থাকে। কেবল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা রাশিয়ার তেলের কারবার চলে রুবল বা ইউয়ানে।
বিশ্বের জ্বালানি-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশছোঁয়া। ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর তেলের দাম যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এখন তা সেই সীমাকেও ছাপিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধানিষেধ জারি হলে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার কাজে তার ‘বিরাট প্রভাব’ পড়বে বলে শুক্রবার সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সংস্থাটির মানবিক বিষয়-সংক্রান্ত আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল টম ফ্লেচার বলেন, ‘এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল থমকে গেলে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। খাদ্য, ওষুধ ও সারের মতো জরুরি সামগ্রী সরবরাহ করা যেমন কঠিন হয়ে পড়বে, তেমনই বাড়বে এসবের পরিবহন খরচও।’
এদিকে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে ইরানের খারগ দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ওই দ্বীপের সমস্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তু ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দিয়েছে আমেরিকা। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রিত হয় এই খারগ দ্বীপ থেকে।
হরমুজে নিরাপত্তা নিশ্চিত সহজ নয়: যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ নয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিছু দেশ ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত জটিল এলাকা। বড় পরিসরে কোনো জাহাজ চলাচল সেখানে নিরাপদে নিশ্চিত করার আগে আমাদের বর্তমান সামরিক লক্ষ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।’
এ ব্যাপারে এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছিলেন, বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত নয়, কারণ এখন ইরানে হামলা চালাতে ব্যস্ত তাদের বাহিনী।’ তবে এ মাসের শেষ নাগাদ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ইরান প্রণালিটি অবরুদ্ধ করতে পারে—এমন পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল কি না। জবাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানান হেগসেথ। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি তিনি।
অন্যদিকে, কিছু দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত রাভানচি।
এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাখত রাভানচি বলেন, ‘কিছু দেশ ইতোমধ্যে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং আমরা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ নিয়েছে, তারা যেন হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ না পায় সেটাই দেখছি আমরা।’
এ সময় তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরান নৌ-মাইন পেতে রেখেছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘একেবারেই না। এটি সত্য নয়।’
নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার প্রতিশোধ নেবে ইরান
ভারত মহাসাগরে ইরানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’ হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি এ ঘোষণা দেন।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল হাতামি বলেন, ‘আইআরআইএস দেনা-এর ক্রুরা একটি শান্তিপূর্ণ মিশন শেষ করে ইরানে ফিরে আসছিল। সে সময় সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে জাহাজটিতে হামলা চালিয়ে শতাধিক ক্রুকে হত্যা করা হয়। আমরা এই হামলার উপযুক্ত জবাব দেবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইআরআইএস দেনা-এর ক্রুরা ইরানের নৌবাহিনীর ইতিহাসে দেশপ্রেম, সাহস এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে থাকবেন। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।’
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্রের বিশাখাপত্তমে আন্তর্জাতিক নৌ-মহড়া ‘মিলন ২০২৬’ আয়োজন করা হয়। ৭০টিরও বেশি দেশ এই মহড়ায় নিজেদের এক বা একাধিক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে অংশ নেয়। এসব দেশের মধ্যে ছিল ইরানও। নিজেদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দেনা নিয়ে মহড়ায় অংশ নিয়েছিল ইরান।
মহড়া শেষে ইরানে ফেরার পথে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় ধ্বংস হয়ে যায় আইআরআইএস দেনা। জাহাজটিতে থাকা ১০৪ জন ক্রুর মধ্যে ৯৪ জনই নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৮৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী। শুক্রবার এসব মরদেহ তেহরানকে ফেরত দিয়েছে কলম্বো।
ইরানে জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা চীনের
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানে ২ লাখ ডলারের জরুরি মানবিক সহায়তা দেবে চীন। শাজারাহ স্কুলে হওয়া হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এই সহযোগিতার কথা জানানো হয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, সাধারণ মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচারে হামলার নিন্দা জানায় বেইজিং।
তিনি বলেন, ‘স্কুলে হামলা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন এবং মানবতা ও মানব বিবেকের মৌলিক সীমা অতিক্রম করেছে।’ মুখপাত্র আরও জানান, চীনের রেড ক্রস সোসাইটি ইরানে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দিতে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে ২ লাখ মার্কিন ডলারের জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।