শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের সাহায্য করতে যাওয়া একটি মাছ ধরার নৌকা বুধবার ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় ডুবে গেছে। স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, সেখান থেকে ছয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং কয়েকজন স্রোতে ভেসে গেছে। খবর এএফপির।
পশ্চিম আচেহর ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের নন্দা ফেরদিয়ানিয়াহ বলেন, পশ্চিম আচেহর জেলেদের কাছ থেকে আমরা খবর পেয়েছি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহনকারী একটি নৌকা মেউলাবোর কাছে সাগরে ডুবে গেছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে এক জেলে রোহিঙ্গাদের নৌকাডুবির দৃশ্য দেখতে পান।
তিনি বলেন, জেলেদের নৌকা তাদের কাছে আসতেই তারা সবাই নৌকায় উঠে পড়ে। তারা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ হওয়ায় জেলেদের নৌকাটিও ডুবে যায়।
রিজেন্সির জেলে সম্প্রদায়ের সেক্রেটারি জেনারেল পাওয়াং আমিরুদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম আচেহর কুয়ালা বুবন সৈকতে রোহিঙ্গাবাহী নৌকাটি ডুবে যায়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া খবরে বলা হয়েছে, একটি রোহিঙ্গাবাহী নৌকা ডুবে গেছে এবং তারা উল্টে যাওয়া নৌকার হালে উঠে নিজেদের রক্ষা করেছে। আরও কয়েকজন প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। স্থানীয় জেলেরা এ পর্যন্ত ছয়জনকে উদ্ধার করেছে, চারজন নারী ও দুইজন পুরুষ।
স্থানীয় তল্লাশি ও উদ্ধার সংস্থা জানিয়েছে, উপকূল থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে রোহিঙ্গাবাহী নৌকাটিকে ডুবে যেতে দেখা গেছে। আমিরুদ্দিন বলেন, শরণার্থীরা বলেছে যে তারা মিয়ানমার থেকে এসেছিল এবং থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে তারা ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় আচেহ প্রদেশের দিকে যায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বলেছে, ‘তারা এই ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দশ-বিশজনের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে’ উদ্ধার করা প্রয়োজন, তবে সঠিক সংখ্যাটি নিশ্চিত করতে পারেনি।
তল্লাশি ও উদ্ধার সংস্থা জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় একটি দল নৌকায় করে প্রাদেশিক রাজধানী বান্দা আচেহ ত্যাগ করেছে এবং বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে তারা ডুবে যাওয়া এলাকায় পৌঁছাবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাব মতে, গত বছর অক্টোবরের পর থেকে দুই হাজার রোহিঙ্গা এসেছে। মিয়ানমারের এই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়ে গত এক বছরে যারা ইন্দোনেশিয়ায় পালিয়ে এসেছে, বিশেষ করে আচেহতে, এরা তাদেরই অংশ।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে নভেম্বর, যখন সমুদ্র শান্ত থাকে, রোহিঙ্গারা কাঠের নৌকায় চড়ে থাইল্যান্ড এবং মুসলিম-প্রধান বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমায়।
জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) জানুয়ারি মাসে জানায়, ২০২৩ সালে মিয়ানমার বা বাংলাদেশ থেকে পালানোর সময় যে ৫৬৯ জন রোহিঙ্গা মারা গিয়েছিলেন- এই সংখ্যা ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চ। কয়েক মাস ধরে রোহিঙ্গারা ইন্দোনেশিয়া আসছেন। ইউএনএইচসিআর বলছে, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত ১,৭৫২ জন উদ্বাস্তু, যাদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ এবং উত্তর সুমাত্রা প্রদেশে এসেছেন। ২০১৫ সালের পর এটাই এই মুসলিম-প্রধান দেশে সবচেয়ে বেশি আগমন।
নেপালের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কেপি শর্মা ওলি টানা কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি চারবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ২০২৫ সালে জেন-জি আন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
বিক্ষোভে অন্তত ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর ছয় মাসও হয়নি। এর মধ্যেই ৭৩ বছর বয়সি এই নেতা আবারও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করছেন।
সিপিএন-ইউএমএলের প্রধান ওলি আগামী ৫ মার্চের নির্বাচনে সংসদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা করছেন।
তবে নিজ নির্বাচনী এলাকাতেই তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ৩৫ বছর বয়সি র্যাপার থেকে মেয়র হওয়া বালেন্দা শাহ, যিনি নিজেকে তরুণদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। এর আগে ওলি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভোট চেয়েছেন।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল ওলি সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে। তবে প্রকৃত কারণ ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও গভীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনক্ষোভ।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ওলি বিক্ষোভকারীদের টার্গেটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন, যখন ক্ষুব্ধ জনতা তার বাসভবন, সংসদ ভবন ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আগুন দেয়।
পদত্যাগপত্রে ওলি বলেন, তিনি আশা করেন, তার সরে দাঁড়ানো রাজনৈতিক সমাধান ও সংকট নিরসনের পথে সহায়ক হবে।
জানুয়ারিতে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশনের কাছে বক্তব্য দেন, যা ওই প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ঘটনা খতিয়ে দেখছে।
ওলি দাবি করেছেন, তিনি কখনোই পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেননি। তিনি বলেন, আমি গুলি করার কোনো আদেশ দিইনি।
বরং তিনি সহিংসতার জন্য অনুপ্রবেশকারী ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী শক্তিকে দায়ী করেছেন।
সব সংকট সত্ত্বেও ওলি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। গত ডিসেম্বরে তিনি বিপুল ভোটে আবারও সিপিএন-ইউএমএলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন এক ভোরের অপেক্ষায় রয়েছে হিমালয়কন্যা নেপাল। যুব নেতৃত্বাধীন ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতাধর সরকারের পতনের পর আগামী ৫ মার্চ দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজ সোমবার থেকে এই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা দেশটির গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে এক চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে নেপালের প্রায় ৩ কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেবেন, যারা গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন নেপাল গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
২০২৫ সালের উত্তাল জনস্রোতের পর দেশটির হাল ধরেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বর্তমানে নির্বাচন পর্যন্ত দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মজার বিষয় হলো, তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে হাজার হাজার তরুণ কর্মীর দীর্ঘ আলোচনার পর, যা নেপালের রাজনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক তরুণ প্রজন্মের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে নেপালের ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদ বা লোকসভা গঠিত হবে। এর মধ্যে ১৬৫ জন সদস্য সরাসরি জনগণের ভোটে এবং বাকি ১১০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সমানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি পদত্যাগ করবেন।
নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে আধিপত্য বিস্তারকারী প্রবীণ নেতাদের জন্য এবারের নির্বাচন বড় ধরনের অস্তিত্বের লড়াই হতে যাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এখনো কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) নেতৃত্বে থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের প্রার্থীদের ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, মাওবাদী আন্দোলনের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহালও বিভিন্ন কমিউনিস্ট গোষ্ঠীকে নিয়ে লড়াইয়ে রয়েছেন। তবে বড় পরিবর্তন এসেছে নেপালের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসে। পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দলটির নেতৃত্বে এসেছেন ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপা, যাঁকে কেন্দ্র করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এছাড়া র্যাপার থেকে মেয়র হওয়া বলেন্দ্র শাহ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য ওলির বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করে এবারের নির্বাচনকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের পাশাপাশি নেপালের ভোটারদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের বিশাল শ্রমশক্তির প্রায় ৮২ শতাংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত এবং দেশটির মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ১ হাজার ৪৪৭ ডলার। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নেপালের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ বর্তমানে বিদেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশটির মোট জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। যদিও প্রবাসীরা এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, তবে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রবাসী জনশক্তির প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী এই কৌশলগত ভূখণ্ডে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে দুই প্রতিবেশী দেশই এই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে। সব মিলিয়ে আগামী ৫ মার্চের নির্বাচন নেপালের জন্য কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি দেশটির ভবিষ্যৎ কাঠামোর এক ঐতিহাসিক রূপান্তর হতে যাচ্ছে।
চীনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব চন্দ্রবর্ষ বা ‘লুনার নিউ ইয়ার’ শুরু হয়েছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক মানব স্থানান্তর প্রক্রিয়া, যাকে চীনা ভাষায় ‘চুনইউন’ বলা হয়। লাখ লাখ মানুষ নিজ পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসব কাটাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন। কেউবা ফিরছেন নাড়ির টানে পৈতৃক ভিটায়, আবার অনেকে দীর্ঘ এই ছুটি কাজে লাগিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। এই বিশাল যাত্রীবহর চীনের পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের উৎসবের একটি বিশেষ দিক হলো সরকারি ছুটির মেয়াদ এক দিন বাড়িয়ে মোট নয় দিন করা হয়েছে। দীর্ঘ এই অবসরের ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। চীনের শীর্ষ ভ্রমণ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এবার ঘরোয়া গন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের উষ্ণ দ্বীপপ্রদেশ হাইনানে। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুষারাবৃত চাংবাই পাহাড় এখন তুষারক্রীড়া প্রেমীদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের পরিবহন অবকাঠামো এই বিশাল জনস্রোত সামাল দিতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।
শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, এবার আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে চীনা নাগরিকদের মধ্যে। আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চীনা পর্যটকদের জন্য ভিসামুক্ত যাতায়াতের সুবিধা চালু হওয়ায় রাশিয়ার গন্তব্যগুলো এবার নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবে চীনের পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিনের প্রিয় গন্তব্য জাপানের আকর্ষণ এবার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
চীন সরকার কেবল নিজেদের নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতেও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশ সুবিধা সম্প্রসারণ করার ফলে ইউরোপের বহু দেশসহ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিকরা এখন কোনো প্রকার আগাম ভিসা ছাড়াই সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত চীনে অবস্থান করতে পারবেন। বেইজিংয়ের এই নীতি পর্যটন বাণিজ্যে বড় ধরনের গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, চীনের লুনার নিউ ইয়ার উৎসব কেবল একটি ঘরোয়া আনন্দ আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক পর্যটন ও মানব স্থানান্তরের এক বিস্ময়কর নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোতে ইসরাইলি পণ্য বর্জনের আন্দোলন এখন আর কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা রাজপথের প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলন এখন সাধারণ কর্মীদের কর্মস্থল থেকে শুরু করে দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আয়ারল্যান্ডের একটি সুপারমার্কেট কর্মীর ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ এখন পুরো মহাদেশজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে ওই কর্মী যখন চেকআউট কাউন্টারে ইসরাইলি ফল ও সবজি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাটি ইউরোপের অন্যান্য কর্মীদের জন্য একটি নজির হিসেবে কাজ করছে যে, নৈতিক কারণে তারা ইসরাইলি পণ্য স্পর্শ করতে বা বাজারজাত করতে অস্বীকার করতে পারেন।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং নরওয়ের মতো দেশগুলোর প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়নগুলো এমন প্রস্তাব পাস করেছে যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো কর্মীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরাইলি পণ্য নাড়াচাড়া করার জন্য জোর দেওয়া যাবে না। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ‘কো-অপারেটিভ’ এবং ইতালির ‘কো-অপ অ্যালেঞ্জা ৩.০’-এর মতো নামী রিটেইল চেইনগুলো গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে বেশ কিছু ইসরাইলি পণ্য তাদের বিক্রয় তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা এই পরিস্থিতিকে ১৯৮৪ সালে আয়ারল্যান্ডের ‘ডান স্টোরস’ কর্মীদের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সাথে তুলনা করছেন। সেই আন্দোলনের সূত্র ধরেই আয়ারল্যান্ড প্রথম পশ্চিমা দেশ হিসেবে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইসরাইলের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নাগরিক ও পেশাজীবী নেতৃত্বাধীন চাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে শুরু করেছে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ইসরাইল বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। স্পেন ও স্লোভেনিয়া ইতোমধ্যে দখলকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্লোভেনিয়া ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে এবং স্পেন ২০২৬ সালের শুরু থেকেই এই আইন কার্যকর করেছে। এমনকি নেদারল্যান্ডসেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভের পর সংসদ সদস্যরা অবৈধ বসতির পণ্য নিষিদ্ধ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। আয়ারল্যান্ডে বর্তমানে ‘অকিউপাইড টেরিটরি বিল’ পাসের প্রক্রিয়া চলছে, যা কার্যকর হলে ইসরাইলি বসতির পণ্য আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে। যদিও আয়ারল্যান্ডের অনেক রাজনীতিবিদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি লবিস্টদের পরোক্ষ চাপের কারণে এই বিলটি পাসের ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই বর্জন আন্দোলন রুখতে ইসরাইল সরকার ও তাদের পন্থি সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সক্রিয়তা শুরু করেছে। বিভিন্ন লবিস্ট গ্রুপ সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে, ইসরাইলি পণ্য বর্জন করলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ইসরাইলের কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইউরোপে এই বর্জন আন্দোলন পর্যবেক্ষণ ও দমনে লক্ষাধিক ইউরো খরচ করে বিভিন্ন আইনি সংস্থা নিয়োগ করেছে। পাশাপাশি জার্মানির মতো দেশগুলোতে এই আন্দোলনকে ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এর অর্থায়ন বন্ধের প্রস্তাবও পাস করা হয়েছে। তবে লবিস্টদের তৎপরতা সত্ত্বেও ইউরোপের বাজার ও রাজনীতিতে ইসরাইল এখন এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি, যেখানে তারেক রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। ১৭ বছরের দমন-পীড়ন শেষে এই বিজয়কে নেতা–কর্মীরা এক নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তার বলছেন এই জয় দেশটির জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক বাঁক পরিবর্তনই নয়; বরং এটি ভারত, পাকিস্তান ও চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণ পুনর্নির্ধারণের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত এবং শেখ হাসিনা যুগের অবসান ঘটিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘আমূল পরিবর্তনের’ সংকেত দিচ্ছে। খবর আল জাজিরার।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে হাসিনার সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে ভারত দ্রুতই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। এই বছরের শুরুতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন, যা ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্কের দিকে ফিরে আসার জোরালো তাগিদ থাকবে, যদিও তা হাসিনার আমলের মতো অতটা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা হবে না। তবে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যা এবং বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো দুই দেশের সম্পর্কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সমীকরণ: ভারতের ক্ষেত্রে যেখানে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে, পাকিস্তান সেখানে নতুন সুযোগ দেখছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি সরকারের আমলে এই গতি আরও বাড়বে। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সালমান বশির আল জাজিরাকে বলেন, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের ভারতের প্রতি দীর্ঘ সময় পক্ষপাতিত্বের অবসান ঘটিয়েছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দ্বার উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তান তাদের তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের কাছে বিক্রির আগ্রহও দেখিয়েছে। সালমান বশিরের মতে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীন আরও কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের সঙ্গে কি নতুন অধ্যায় শুরু হবে: বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনার আমলে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। শুক্রবার চীনের দূতাবাস বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ লিখতে প্রস্তুত।
অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের মতে, বিএনপি সম্ভবত চীনের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করবে, যা তাদের পূর্ববর্তী সরকারের সময়ও দেখা গিয়েছিল। তবে একই সঙ্গে এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিষয়ে মার্কিন বিরোধিতার মুখেও পড়তে হতে পারে ঢাকাকে।
ঢাকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা: তারেক রহমান যখন ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার সামনে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ‘মহা-শক্তির প্রতিযোগিতা’ সামলানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (সবার আগে বাংলাদেশ) নীতির ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ বিশ্লেষক প্রবীণ দোনথি মনে করেন, এই নির্বাচনী রায় দক্ষিণ এশিয়াকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। এটি এখন আর কারো ‘পেছনের উঠোন’ হয়ে থাকবে না। ঢাকা সম্ভবত ভারত ও চীনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে এবং একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ চাইবে।
নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে মোটরসাইকেল আরোহী বন্দুকধারীদের ভয়াবহ তাণ্ডবে অন্তত ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নাইজার রাজ্যের বোরগু এলাকার তিনটি গ্রামে এই নৃশংস হামলা চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলাকারীরা গ্রামগুলোতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে এবং বেশ কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। তুঙ্গা-মাকেরি গ্রামে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই তাণ্ডবে সেখানে ছয়জন নিহত হন এবং বেশ কিছু মানুষকে অপহরণ করা হয়।
এরপর বন্দুকধারীরা কোনকোসো গ্রামে ঢুকে পড়ে, যেখানে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। মানবিক সহায়তা প্রদানকারী কিছু সূত্রের দাবি, নিহতের সংখ্যা ৩৮ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
কোনকোসো গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা ভোরের দিকে গ্রামে ঢুকে পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার সময় অনেককে গুলি করে এবং কয়েকজনের গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পিটসা নামক আরেকটি গ্রামেও হামলা চালিয়ে একটি পুলিশ স্টেশন জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নাইজেরিয়ার এই অঞ্চলে আইএসআইএস সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মুক্তিপণ আদায়কারী ডাকাত দলগুলোর সক্রিয়তা গত কয়েক বছরে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বোরগু এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবুর কাছে ওই অঞ্চলে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
নাইজেরিয়ার এই নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করার পর দেশটির ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
যদিও নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের ওপর পরিকল্পিত হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহিংসতায় খ্রিস্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে মার্কিন সামরিক বাহিনী সোকোতো রাজ্যে বিমান হামলা চালিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীদের দমনের চেষ্টা করলেও উত্তরাঞ্চলে এই ধরনের রক্তক্ষয়ী হামলা অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির কিছু অংশ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে চুক্তির কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭-বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ আলোচনার মধ্যমে এই শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপের পর একটি অভিন্ন শুল্ক চুক্তির খসড়া প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকে পাঠায়। যেসব দেশ এই চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়— তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ৩০ আগস্ট নতুন হার নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের পর পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়। এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।
আরটি চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই ডব্লিউটিও ট্রিপস চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে নতুন কোনও শর্ত আরোপিত হয়নি। অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ পূর্বেই আইএলও, ট্রিপস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করে। পারস্পারিক বাণিজ্যচুক্তির বিধানাবলি বাস্তাবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে— সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায়, সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিতে ট্রেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য আরটি-হারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে, ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।
চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সাথে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণাপত্র সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি সই অপেক্ষমান। যেসব চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে— তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ-মার্কিন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কতিপয় মিল রয়েছে।
এক. কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে— ওই দুটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনও চুক্তি সই করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে এই চুক্তি সইয়ের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত এআরটি’র খসড়ায় এ ধরনের কোনও বিধান নেই।
দুই. উৎপত্তির নিয়মের লেখার মধ্যে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের পরিমাণ নির্ধারিত নেই। ফলে লেখা অনুযায়ী পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।
তিন. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্তিম ফাইবার টেক্সটাইল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য উক্ত দেশে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উক্তরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
চার. এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূণ্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অপরদিকে, বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন। এইচএস কোড-কে অফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অফার লিস্টের এর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
(ক) ৪৯২২টি ট্যারিফ লাইনকে চুক্তি সই দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ইতোমধ্যে শূন্য রয়েছে)।
(খ) ১৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।
(গ) ৬৭২টি ট্যারিফ লাইন এর শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)
(ঘ) ৩২৬টি ট্যারিফ লাইন কে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত সিইপিএর অফার তালিকা এর ৮১টি ইএমএফএন ট্যারিফ লাইন কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।
উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
পাঁচ. এআরটি পেপারলেস ট্রেড, আইপিআর এনফোর্সমেন্ট, ই-কমার্স স্থায়ী স্থগিতাদেশ সমর্থন, নন-ট্যারিফ বাধা ও টিবিটি হ্রাস, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট, গুড গভর্নেন্স ও নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি আইপিআর সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি যোগদান প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে।
ছয়. বাণিজ্য চুক্তিতে ই-কমার্স এ স্থায়ী স্থগিতাদেশকে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে মেডিকেল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে উক্ত দেশের এফডিএর সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশনের পূর্বানুমতি ব্যাতীত আমদানির সুযোগ, এফএমভিএসএস-কে স্বীকৃতি, রিম্যানুফেকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা, খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসপিএস মেজার্সকে স্বীকৃতি প্রদান, ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহ উল্লেখ রয়েছে।
এগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলোজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (অ-জীবিত পরিবর্তিত জীব না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি, জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং এমআরএল-কে স্বীকৃতি, উদ্ভিদ ও উদ্ভিদ পণ্যের আমদানিতে বাজার প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন, ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, এন্টিকরাপশন সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও-এর এগ্রিমেন্ট অন ফিসারিজ সাবসিডিকে গ্রহণ করা ও অবৈধ অপ্রকাশিত এবং অনিয়ন্ত্রিত (আইইউইউ) এর ক্ষেত্রে সাবসিডি প্রদান না করা, পরিবেশ রক্ষায় এ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজসম্পদ ও বন্যপ্রাণির অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম আইন কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাত. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলোজিতে সিবিপিআর, পিআরপি, পিডিপিও ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উক্ত দেশ হতে বোয়িং ক্রয়, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
আট. কোনও দেশের পক্ষেই চুক্তি বাতিল করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে প্রস্থান ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাংলাদেশ-মার্কিন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রঢতানিতে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে।
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার দেশটির বেসরকারি ও সরকারি—উভয় খাতের কর্মীদের জন্য দৈনিক কর্মঘণ্টা কমানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দেশটির মানবসম্পদ ও এমিরেটাইজেশন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা জারি করে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রমজান মাসে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য স্বাভাবিক কর্মঘণ্টা থেকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা সময় কমানো হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী ও স্থানীয় চাকুরিজীবী বিশেষ এই সুবিধা ভোগ করবেন।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, সাধারণ সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সাধারণত ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও রমজান মাসে সেই সময়সীমা থেকে দুই ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে হ্রাস করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এই নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করাতে চায়, তবে সেই বাড়তি সময়কে ওভারটাইম হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও কাজের ধরন বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের জন্য নমনীয় কর্মঘণ্টা বা দূরবর্তী পদ্ধতিতে (রিমোট ওয়ার্ক) কাজ করার সুযোগ দিতে পারবে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি খাতের কর্মীদের জন্যও পৃথক ও সংক্ষিপ্ত সময়সূচি নির্ধারণ করেছে আমিরাত সরকার। নতুন সূচি অনুযায়ী, সরকারি দপ্তরগুলো সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন অর্থাৎ শুক্রবার অফিস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তবে বিশেষ জরুরি পরিষেবা বা ভিন্নধর্মী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগ চাইলে এই সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র মাসে কর্মীদের ধর্মীয় অনুশাসন পালন, ইবাদত-বন্দেগি এবং পরিবারের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া। প্রতি বছরই রমজান মাসে কর্মীদের কর্মব্যস্ততা কমিয়ে আত্মউন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ দিতে আমিরাত কর্তৃপক্ষ এই ধরনের নমনীয় নীতিমালা গ্রহণ করে থাকে। গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশটির কর্মপরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং কর্মীদের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এখন থেকেই দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন এই সময়সূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে এক নজিরবিহীন ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হলো দক্ষিণ এশিয়া। বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এই রাজ্যের একটি জাতীয় মহাসড়কে আজ রোববার দুপুরে অবতরণ করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বহনকারী ‘সি-১৩০জে’ সুপার হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিমান। জরুরি অবতরণ সুবিধার (ইএলএফ) অংশ হিসেবে নির্মিত এই বিশেষ মহাসড়ক কাম রানওয়েটি উদ্বোধন করতেই মোদি এই সামরিক বিমানে চড়ে সেখানে পৌঁছান। ভারতীয় বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাতীয় সড়ক-৩৭-এর মোরান অংশে নির্মিত এই পরিকাঠামোটি উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম জরুরি অবতরণ সুবিধা সম্পন্ন মহাসড়ক। ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই পদক্ষেপকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে একদিনের সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে চাবুয়া বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি সামরিক বিমানে করে মোরান বাইপাসের এই বিশেষ রানওয়েতে অবতরণ করেন। প্রায় ১০০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি অত্যন্ত শক্তিশালী করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এখানে অনায়াসেই বড় মাপের যুদ্ধবিমান ও ভারী পরিবহন বিমান ওঠানামা করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি জানিয়েছেন, এই ধরনের অবকাঠামো কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় এবং সাধারণ মানুষের সেবায় অনন্য ভূমিকা রাখবে। এখানে সর্বোচ্চ ৪০ টন ওজনের যুদ্ধবিমান এবং ৭৪ টন ওজনের বিশাল পরিবহন বিমান সফলভাবে অবতরণ করতে সক্ষম।
মহাসড়কে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি সেখানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি চিত্তাকর্ষক বিমান প্রদর্শনী উপভোগ করেন। প্রায় ৪০ মিনিটের এই মহড়ায় অংশ নেয় ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস যুদ্ধবিমান ছাড়াও রাশিয়ার সুখোই এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল ফাইটার জেট। এই প্রদর্শনী মূলত মহাসড়কটিকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রানওয়ে হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ ছিল। উল্লেখ্য যে, ভারতের প্রথম এই ধরনের মহাসড়ক রানওয়ে ২০২১ সালে রাজস্থানের বারমের জেলায় উদ্বোধন করা হয়েছিল। আসামের এই নতুন সুবিধাটি জরুরি অবস্থায় ডিব্রুগড় বিমানবন্দর বা পার্শ্ববর্তী বিমানঘাঁটিগুলোর বিকল্প হিসেবে সরাসরি ব্যবহৃত হবে, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জন্য এক বিশাল শক্তি যোগাবে।
ভৌগোলিকভাবে আসামের এই মোরান অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ৬০০ কিলোমিটার এবং রংপুর সীমান্তের দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের মতো। পাশাপাশি এই এলাকাটি চীন সীমান্তেরও বেশ কাছাকাছি। ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা নিরাপত্তার প্রশ্নে এই মহাসড়কটি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে। আজকের এই সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আসামে আরও বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন, যার মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত গুয়াহাটি ও উত্তর গুয়াহাটির সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুও রয়েছে। এই সেতুটি স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি যানজট নিরসনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মোদির এই সফর এবং মহাসড়কে সামরিক বিমানের অবতরণ ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন বারতা পৌঁছে দিল।
সিরিয়া থেকে ৫ হাজার ৭০০-এরও বেশি সন্দেহভাজন আইএস বন্দিকে সফলভাবে ইরাকে স্থানান্তর সম্পন্ন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। দীর্ঘ ২৩ দিনব্যাপী এক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার বিভিন্ন আটক কেন্দ্র থেকে এসব যোদ্ধাকে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছে। মূলত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতিগত পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য কারাগার ভাঙার ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন বাহিনী এই বিশালসংখ্যক বন্দিকে নিরাপদে ইরাকে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই চাঞ্চল্যকর খবরের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে।
সেন্টকমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সুদীর্ঘ অপারেশনটি অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে উত্তর-পূর্ব সিরিয়া থেকে ইরাকে একটি বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে শেষ দফার বন্দিদের পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই অভিযান সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব বন্দি কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) পরিচালিত বিভিন্ন কারাগারে আটক ছিলেন। তবে সম্প্রতি সিরিয়ার সরকারি বাহিনী উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে শুরু করলে বন্দিদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়। কারাগার ভেঙে বন্দিদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক সরকার এই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
ইরাকের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল জুডিশিয়াল কো-অপারেশনের (এনসিআইজেসি) পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মোট ৫ হাজার ৭০৪ জন আইএসআইএল বন্দি ইরাকে পৌঁছেছেন। এদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৩ জন সিরীয় নাগরিক এবং ৪৬৭ জন ইরাকি। এছাড়া ৭১০ জন বিভিন্ন আরব দেশের এবং ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৯৮০ জনেরও বেশি বিদেশি যোদ্ধা রয়েছেন। বিশাল এই বন্দিবহর এখন থেকে ইরাকের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারগুলোতে অবস্থান করবে এবং আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার আল-হোল ও পার্শ্ববর্তী শিবিরের পরিস্থিতি গত কয়েক বছরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আইএসের স্বজনদের রাখা এসব শিবিরে সম্প্রতি পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে এবং সেখান থেকে অধিকাংশ বিদেশি পরিবার তাদের নিজ দেশে ফিরে গেছে। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে আইএস যে নারকীয় সহিংসতা চালিয়েছিল, তা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সহায়তা অপরিহার্য ছিল। ২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় গোষ্ঠীটিকে পরাজিত করার পর হাজার হাজার সন্দেহভাজন যোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে এসডিএফের বিভিন্ন শিবিরে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে এসব বন্দির বিচার প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন সেন্টকমের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়কে আরও সুসংহত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে। আজ রোববার গাজার উত্তর ও দক্ষিণ অংশে পৃথক দুটি হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্র নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে এটি লঙ্ঘন করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই দিনে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও বোমাবর্ষণ করেছে, যা ওই অঞ্চলের ভঙ্গুর শান্তি পরিস্থিতিকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিকিৎসা সূত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের ‘ইয়েলো লাইন’ সংলগ্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর একটি শক্তিশালী হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামলাটি ইসরায়েলি সেনাদের নির্ধারিত তথাকথিত নিরাপদ সীমানার বাইরে ঘটেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের অবস্থান ছিল। অন্যদিকে, উত্তর গাজার আল-ফালুজা এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় নেওয়া একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। আল-শিফা হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। এই হামলার পর এলাকাটিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই হামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও তাদের দাবি, উত্তর গাজার একটি ভবনে সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতির খবর পেয়ে তারা সেখানে অভিযান চালিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, অন্তত দুজনকে হত্যা করা হয়েছে যারা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ছিল। তবে এসব দাবির পক্ষে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় বেসামরিক স্থাপনা ও তাঁবুতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
একই সময়ে লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও প্রায় প্রতিদিনই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠছে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আকাশপথে ইসরায়েলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের মহড়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের যুদ্ধের সংকেত দিচ্ছে।
গাজা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ বারের বেশি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই সময়ের মধ্যে অন্তত ৫৯১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ হাজার ৫৯০ জন আহত হয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে গাজায় এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। যুদ্ধের ভয়াবহতায় অঞ্চলটির প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ বর্তমানে খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসার অভাবে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এমন প্রাণহানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তি প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কঠোর একটি খসড়া আইন অনুমোদন করেছে ইতালির ডানপন্থি সরকার। জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা এই বিলে সবুজ সংকেত দেওয়ার মাধ্যমে অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই নতুন আইনের আওতায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকা আটকাতে অস্থায়ী নৌ-অবরোধের মতো কঠিন নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, যদি ইতালি সরকার মনে করে যে অভিবাসীদের আগমনের ফলে দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় ‘ব্যতিক্রমী চাপ’ তৈরি হচ্ছে কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তবে তারা নির্দিষ্ট জাহাজগুলোকে প্রবেশে সরাসরি বাধা দিতে পারবে। বিশেষ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অনুপ্রবেশের সুনির্দিষ্ট হুমকি থাকলে কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ৩০ দিন পর্যন্ত জলসীমায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা পাবে, যা পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সমুদ্রপথে অননুমোদিত যাতায়াত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ইতালির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই রুট ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করায় মেলোনি সরকার শুরু থেকেই একে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে আসছে।
আইনের প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, যারা এসব নিয়ম লঙ্ঘন করে ইতালির জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করবে, তাদের জন্য ৫০ হাজার ইউরো পর্যন্ত বড় অংকের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো জাহাজ বা সংস্থা বারবার একই ধরনের নিয়ম অমান্য করে, তবে সংশ্লিষ্ট নৌকা বা জাহাজ বাজেয়াপ্ত করারও কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারে নিয়োজিত বেসরকারি দাতব্য সংস্থাগুলোর জাহাজকে লক্ষ্য করেই এই জরিমানার বিধান আনা হয়েছে। এছাড়া নতুন এই আইন কার্যকর হলে ইতালিতে পা রাখার আগেই অভিবাসীদের আশ্রয় আবেদনের প্রক্রিয়াটি আলবেনিয়ার মতো তৃতীয় কোনো দেশের কেন্দ্রে সম্পন্ন করার সরকারি পরিকল্পনা আবারও সচল করার পথ সুগম হবে। ইতিপূর্বে আদালতের বিভিন্ন রায়ে এই ‘আউটসোর্সিং’ প্রক্রিয়াটি স্থগিত থাকলেও নতুন আইনের মাধ্যমে সরকার একে পুনরায় কার্যকর করতে চাইছে।
প্রস্তাবিত বিলে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইতালির জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের কেবল তাদের নিজ দেশে নয়, বরং এমন কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হতে পারে যাদের সঙ্গে রোমের বিশেষ প্রত্যাবাসন চুক্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তির রেশ ধরেই মেলোনি সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া এই খসড়া বিলটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ইতালির সংসদের উভয় কক্ষে উত্থাপন করা হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনার পর উভয় কক্ষে পাস হলে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে। রোম আশা করছে, এই আইন দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে মধ্য-ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগমনের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। শনিবার দিবাগত রাতে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। মূলত ইমরান খানের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে তাঁর সমর্থকদের তীব্র আন্দোলন ও বিরোধী জোটের বিক্ষোভের মুখে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, হাসপাতালে স্থানান্তরের পর ইমরানের শারীরিক অবস্থার সামগ্রিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তাঁর প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা প্রদান করা হবে।
সম্প্রতি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে ইমরান খান তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গোহর আলী খান, বিরোধী দলীয় নেতা আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস এবং মাহমুদ খান পাকিস্তানের পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এছাড়া খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রীও কে-পি হাউজে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এই সম্মিলিত চাপের মুখে ইমরান খানকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইমরান খানের চোখের চলমান চিকিৎসার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। মন্ত্রী আরও জানান, ইমরান খানের স্বাস্থ্যের বিস্তারিত প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হবে। একই সাথে তিনি এই ইস্যুটি নিয়ে কোনো ধরনের গুজব না ছড়াতে এবং এটি নিয়ে রাজনীতি না করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
দেশটির সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরীও এ বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, একজন কারাবন্দি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যেসব মানবাধিকার প্রাপ্য, তার সবই ইমরান খানকে দেওয়া হবে। উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি থাকা এই জনপ্রিয় নেতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁর দলের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে চরম উদ্বেগ কাজ করছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দ্রুতই তাঁকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।