লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গ্রুপ মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল সিরিয়ার দামেস্কোতে দেশটির কনস্যুলেট ভবনে হামলায় উচ্চ-পর্যায়ের ইরানী বিপ্লবী গার্ডদের (আইআরজিসি) হত্যার জন্য ‘চরম শাস্তি’ পাবে।
গত ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হিজবুল্লাহ তার মিত্র হামাসের সমর্থনে ইসরায়েলের সাথে প্রায় প্রতিদিনই আন্তঃসীমান্তে গুলি বিনিময় করছে।
হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘অবশ্যই, শত্রুদের শাস্তি ও প্রতিশোধ না নিয়ে এই অপরাধকে ক্ষমা করা যাবে না।’
আইআরজিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা জাহেদি এবং আরেকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হাদি হাজি রাহিমিসহ সাতজন আইআরজিসি সদস্য নিহত হয়েছে।
ব্রিটেন-ভিত্তিক যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে আট ইরানি, দু’জন সিরিয়ান এবং একজন লেবানিজ। এদের সবাই যোদ্ধা।
হিজবুল্লাহ বলেছে, জাহেদি ‘লেবাননে প্রতিরোধের কাজকে বিকাশ ও অগ্রসর করার জন্য বহু বছর ধরে সমর্থন, ত্যাগ এবং অধ্যবসায়কারী প্রথম একজন।’
অবজারভেটরি জানিয়েছে, জাহেদি প্যালেস্টাইন, সিরিয়া এবং লেবাননের জন্য ইরানের অভিজাত কুদস ফোর্সের নেতা হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি তার সহযোগী এবং তিনটি দেশের একই কুদস ফোর্সের প্রধান স্টাফসহ নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল বলেছে, তারা প্রকাশিত রিপোর্ট সম্পর্কে এই মুহুর্তে কোনো মন্তব্য করবে না, তবে ইরানি কর্মকর্তারা গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল এবং ইরানের মিত্রদের সঙ্গে আরও সহিংসতার আশঙ্কায় কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি সেনাসদস্যও রয়েছেন বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউইয়র্ক টাইমস এক জ্যেষ্ঠ ভেনিজুয়েলান কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্কিন হামলায় নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনিজুয়েলার মাটিতে সেনা নামানোর আগে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে বড় পরিসরে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করতে ১৫০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়। ফলে সামরিক হেলিকপ্টারগুলো নিরাপদে সেনা নামাতে সক্ষম হয়। পরে সেই সেনারাই মাদুরোর অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালায়।
হতাহতের সংখ্যা কিংবা অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সময় গত শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানোকে ‘শক্তিশালী চমকপ্রদ প্রদর্শন’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে।’
এদিকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল কৌঁসুলিরা গত শনিবার একটি অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছেন। এতে মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের অভিযোগসহ একাধিক অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে, যা লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান চীনের
যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের জোরপূর্বক আটককে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক আটক এবং দেশ থেকে বের করার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘ সংস্থার উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে, ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাতের চেষ্টা বন্ধ করতে এবং সকল বিষয় আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালত জানিয়েছে।
গতকাল রোববার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার শূন্যতা এড়াতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে বলা হয়, প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকার পরিচালনার বৈধতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আইনগত কাঠামো প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে আদালত আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আপাতত ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থা কার্যকর হলো।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করলে দেশটিতে সরাসরি সেনা মোতায়েন করা হবে না।’ নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে বহুবার কথা বলেছি, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন।’
ট্রাম্প আরও জানান, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ভেনিজুয়েলার ক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেন, ‘ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন, তাহলে সেখানে সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। পাল্টা হুমকিতে তিনি বলেছেন, ইরান শত্রুদের কাছে মাথা নত করবে না, বরং শত্রুরা ইরানের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য হবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই দুদেশের শীর্ষ নেতার এমন কথার লড়াই চলেছে। খামেনি জানিয়েছেন, তার দেশে চলা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবন প্রভাবিত হচ্ছে। মুদ্রার ওঠানামা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
তবে এসব সমস্যার জন্য তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন। একই সঙ্গে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। খামেনি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য হলেও সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
খামেনি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপে বসেন এবং দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের সঠিক পথে ফেরানোরও নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের হুমকি অবশ্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও ভালোভাবে নেননি। তিনি ট্রাম্পের হুমকিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আরাঘচির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও বক্তব্য এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং তা সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপের শামিল।
তিনি বলেন, জনসম্পদের ওপর অপরাধমূলক হামলা ইরান কোনোভাবেই সহ্য করবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানি সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইরানে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে এসেছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও তুলে নেওয়ার ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কলম্বিয়ার অনুরোধে সোমবার (৫ জানুয়ারি) এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে যেখানে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের আলোচনায় বর্তমান সংকটের বিভিন্ন দিক উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর আগে অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসেও ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ দুই দফা বৈঠক করলেও সাম্প্রতিক এই অভিযানের ফলে পরিস্থিতি এখন আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় একটি সুশৃঙ্খল ও সঠিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনই দেশটি পরিচালনা করবে। তবে এই পরিচালনা প্রক্রিয়ার কাঠামো বা পদ্ধতি ঠিক কেমন হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। এই পদক্ষেপকে 'ঔপনিবেশিক যুদ্ধ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মোনকাদা একটি প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত সরকারকে ধ্বংস করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এই অভিযানের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন যে, এটি কোনো শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা নয় বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ। তিনি মাদুরোকে একজন অবৈধ স্বৈরশাসক ও মাদক-সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে সোমবারের বৈঠকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের লোকসভার সদস্য এবং অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ওয়াইসির এই কড়া রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
জনসভায় ওয়াইসি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, মহারাষ্ট্র ও মুম্বাইয়ের জনগণের কাছে সরকার দাবি করছে যে তারা বাংলাদেশিদের বিতাড়িত করেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি মোদিকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করেন যে, সরকার যদি সত্যিই অনুপ্রবেশকারীদের সরাতে চায়, তবে দিল্লিতে বসে থাকা ‘বোনকে’ কেন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে জনসভায় উপস্থিত সমর্থকরা ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
ওয়াইসি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণের এই দাবি শুনুন এবং দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে বের করে বাংলাদেশে পৌঁছে দিন। এটিই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিহারে এক নির্বাচনী সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি যখন বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, তখনও ওয়াইসি পাল্টা জবাবে শেখ হাসিনাকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
সে সময় বিহারের পূর্ণিয়ায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ওয়াইসি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি বাংলাদেশিদের উপস্থিতির বিষয়ে চিন্তিত হন, তবে যেন দিল্লি থেকে তাঁর সেই ‘বোনকেও’ ফেরত পাঠান। তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে, বিতর্কিত ওই ব্যক্তিকে যদি সীমাঞ্চল অঞ্চলে আনা হয়, তবে তাঁরা নিজেরাই তাঁকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। ওয়াইসির এসব বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অনড় অবস্থান ও ভারত সরকারের নীতির প্রতি তীব্র সমালোচনা পুনরায় সামনে এলো।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে একটি সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলের মজুতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ওয়াশিংটনের এত গভীর আগ্রহের নেপথ্যে আসলে কী কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রহের মূল কারণ লুকিয়ে আছে দুই দেশের জ্বালানি তেলের গুণগত মানের ভিন্নতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পদক্ষেপ মূলত তাদের নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও মজবুত করার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি তেলের মজুত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হলেও সেই তেল মূলত হালকা প্রকৃতির, যাকে প্রচলিত ভাষায় ‘সুইট ক্রুড’ বলা হয়। এই ধরনের তেল গ্যাসোলিন বা পেট্রোল তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হলেও শিল্পকারখানা বা ভারী যানবাহনের জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে যে অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত ভারী ও ঘন। এই ‘হেভি ক্রুড’ বা ভারী তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, অ্যাসফল্ট এবং শিল্পকারখানার ভারি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য। ফলে নিজেদের হালকা তেলের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি বিষয়।
তেলের গুণগত মানের পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহের একটি বড় কারণ। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ভৌগোলিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করতে যে পরিমাণ পরিবহন ব্যয় ও সময় প্রয়োজন হয়, ভেনেজুয়েলা থেকে তা সংগ্রহ করতে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হবে। ইআইএ-এর হিসেব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক সরবরাহের মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই বিশাল অব্যবহৃত মজুতকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইরানে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুমকির মুখে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার প্রচারিত এক বিশেষ বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই কোনো বহিঃশত্রুর চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগকে তিনি যৌক্তিক বলে অভিহিত করলেও, যারা সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছেন বা দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছেন, তাদের কঠোরভাবে দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বৈধ দাবি নিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের কথা শোনা হবে, তবে দাঙ্গাকারীদের সাথে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং তাঁদের এই দুর্দশার কথা খামেনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যদিও সরকারিভাবে মাত্র তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়েছে। কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা ‘হেংগাও’ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সশস্ত্র চড়াও হয় এবং তাঁদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধারে সরাসরি এগিয়ে আসতে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও ট্রাম্প তাঁর সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেননি, তবে তাঁর এই অবস্থান তেহরানকে আরও রক্ষণাত্মক ও কঠোর হতে বাধ্য করছে।
নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রার দরপতন ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক অঞ্চলে সরকার সাধারণ মানুষের জন্য পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা একে অপরকে রাজপথে নামার আহ্বান জানাচ্ছেন। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই খামেনি নতি স্বীকার না করার এই বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় চাপকেই মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি ইরানকে এক নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এর আগে শনিবার ভোরে তাঁকে একটি গোপন সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছিল, যেখান থেকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তাঁকে নিউ ইয়র্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ডিইএ) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁকে ব্রুকলিনের এই বিশেষ ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে এই কারাগারটি এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে মার্কিন প্রশাসন। আদালত সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে তাঁকে এই অভিযোগগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। মাদুরোর পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীকেও নিউ ইয়র্কের আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে, যদিও তাঁর বর্তমান অবস্থান বা শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। উল্লেখ্য যে, নিকোলাস মাদুরো শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং বিষয়টিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রুকলিনের এই মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারটি বন্দিদের জন্য অত্যন্ত ‘কুখ্যাত’ এবং ‘ভয়ঙ্কর’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর আগে ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং জনপ্রিয় র্যাপার পি ডিডির মতো অতি পরিচিত ও হাই-প্রোফাইল বন্দিদের এখানে রাখার ফলে কারাগারটি বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। এই কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অত্যন্ত নিম্নমানের এবং এখানে প্রায়ই চরম সহিংসতা ও দাঙ্গার মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এমনকি জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বন্দিদের সুচিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘদিন নির্জন কারাকক্ষে আটকে রাখার মতো অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি বৈরী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার লক্ষ্যে দেশটিতে চালানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতর্কিত সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে যেমন ভেনেজুয়েলার সরকারি বাহিনীর সেনাসদস্য রয়েছেন, তেমনি বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকার হয়েছেন। ভেনেজুয়েলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, মার্কিন বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মূলত মাদুরোর অবস্থান লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হলেও রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
অভিযানের কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার মাটিতে সরাসরি পদাতিক সেনা নামানোর আগে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এজন্য প্রায় ১৫০টিরও বেশি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল, যারা আকাশ থেকে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা বলয় ধ্বংস করে দেয়। আকাশপথ নিরাপদ হওয়ার পর মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টারগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কমান্ডো সদস্যদের নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দেয়। এই বিশেষ বাহিনীই পরবর্তীতে সরাসরি লড়াইয়ের মাধ্যমে মাদুরোর অবস্থানস্থল নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গত শুক্রবার স্থানীয় সময় শেষ রাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কেবল নিকোলাস মাদুরো নন, বরং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেন্সকেও মার্কিন বিমান বাহিনী আটক করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে। এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, মাত্র চার দিন আগে তিনি এই অভিযানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। তিনি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পুরো অভিযানটিকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সাথে তুলনা করেছেন। যদিও এই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে এই ঘটনাটি দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অনুপস্থিতিতে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ডেলসি রদ্রিগেজকে এই গুরুদায়িত্ব প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এছাড়া প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সরকার পরিচালনার জন্য কোন ধরনের আইনি কাঠামো প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে আদালত আরও বিস্তারিত পর্যালোচনা ও আলোচনা চালিয়ে যাবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আটক করার খবরের পর থেকেই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতুহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তবে দেশটিতে সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়বে না। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন এবং তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আরও জানান যে, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ডেলসি রদ্রিগেজের একাধিকবার কথা হয়েছে এবং তিনি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাষ্ট্রক্ষমতা এখন কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—সেই সমীকরণে রদ্রিগেজের এই দায়িত্ব গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত এই নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমেই ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং মাদুরোর আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী দিনে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত রদ্রিগেজ ও ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমন্বয় ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে কী পরিবর্তন নিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রচার ও ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে এক বছরেই তার নির্দেশে বিশ্বের অন্তত সাতটি দেশে শক্তিশালী বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’র (এসিএলইডি) পর্যবেক্ষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
এসিএলইডি আল জাজিরাকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে ড্রোন বা বিমান ব্যবহার করে মোট ৬২২টি বোমা হামলা চালিয়েছে। এই হামলাগুলো বিদেশে যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে ভোটারদের দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
গত এক বছরে কোন কোন দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?
এসিএলইডির পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৫ সালে মোট সাতটি দেশে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ৬টিই মুসলিমপ্রধান দেশ।
ভেনিজুয়েলা এবং ক্যারিবীয় সাগর
শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক হামলা চালানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বিগত কয়েক মাসে মাদক পাচারবিরোধী অভিযানের নামে ভেনিজুয়েলার ভূখণ্ড ও জলসীমায় হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এরমধ্যে গত ডিসেম্বরের শেষে সপ্তাহে ভেনিজুয়েলার ভূখণ্ডে একটি ডকিং ফ্যাসিলিটিতে হামলা চালানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে।
মূলত চলতি বছরের আগস্ট থেকে ক্যারিবীয় সাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে যৌক্তিক ও ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করছে। তবে তবে একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে- ভেনিজুয়েলা সীমান্ত পেরিয়ে মাদক পরিবহনের একটি প্রধান উৎস নয়।
পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ছোট নৌকাগুলোতে হামলা শুরু করে। ধারণা করা হয়- তখন থেকে অন্তত ৩০টি ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, জাহাজগুলো ভেনেজুয়েলার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো দ্বারা পরিচালিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে ট্রেন ডি আরাগুয়া গ্রুপ এবং কলম্বিয়ান ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি। তবে এর পক্ষে কোনও প্রমাণ তারা দেয়নি।
১৬ ডিসেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলায় কমপক্ষে ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে এসব মৃত্যুকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে ২ সেপ্টেম্বরের হামলায় ‘ডাবল ট্যাপ’—অর্থাৎ প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকাকালে দ্বিতীয় দফা হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে।
নাইজেরিয়া
গত ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সোকোতো রাজ্যে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী, যা ছিল দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক অভিযান। ওয়াশিংটনের দাবি, আইএসআইএল (আইএস)–সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এই হামলার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে নাইজেরিয়া সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ও টেড ক্রুজসহ সিনিয়র রিপাবলিকান নেতারা নাইজেরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ‘খ্রিস্টান গণহত্যায়’ মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে নাইজেরিয়া সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, দেশটিতে চলমান সহিংসতায় মুসলিম ও খ্রিস্টান—উভয় সম্প্রদায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সোমালিয়া
সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আল-কায়েদা–সংশ্লিষ্ট আল-শাবাব এবং আইএসআইএল-এর একটি শাখার বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এখান থেকে বেশিরভাগ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করলেও, ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন তাদের পুনরায় মোতায়েন করে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সোমালিয়ায় বিমান হামলার মাত্রা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, চলতি বছর সোমালিয়ায় অন্তত ১১১টি হামলা চালানো হয়েছে, যা বুশ, ওবামা ও বাইডেন প্রশাসনের সময়কার সম্মিলিত হামলার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব বিমান হামলায় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
গত মাসে সোমালিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি হামলায় ৭ শিশুসহ অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত সোমালিয়ায় বেসামরিক নিহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ্যে জানায় না।
সিরিয়া
গত ১৯ ডিসেম্বর সিরিয়ায় আইএসআইএল-এর ৭০টি অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক সপ্তাহ আগে পালমিরায় এক বন্দুকযুদ্ধে দুই মার্কিন সেনা এবং একজন দোভাষী নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। যদিও কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ট্রাম্প সরাসরি আইএসআইএল-কে এর জন্য দায়ী করেছেন।
নিহত দুই সেনা সদস্যের নিজ রাজ্য আইওয়ার নামানুসারে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন হকআই’। এই হামলায় জঙ্গিদের বেশ কয়েকটি অস্ত্রাগার ধ্বংস হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্প সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা বললেও, ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি সন্ত্রাসীদের দমনে ‘চরম প্রতিশোধ’ নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন।
ইরান
চলতি বছরের ১৩ জুন শুরু হওয়া ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাতের শেষ দিনে সরাসরি যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। গত ২২ জুন ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা— ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান ‘বি২’। এতে ওই স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলা করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার কয়েকঘণ্ট পরই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
ইয়েমেন
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের হামলার প্রতিবাদে ২০২৪ সালের শুরু থেকেই ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে এই অভিযানে হামলা আরও তীব্র হয়। ওমানের মধ্যস্থতায় মে মাসে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন হামলায় ইয়েমেনের বন্দর, বিমানবন্দর, রাডার সিস্টেম এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অভিযানে তারা প্রায় ৫০০ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তবে ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ১২৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ নাগরিক।
ইরাক
গত ১৩ মার্চ ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে আইএসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর। এতে আইএসআইএল-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবদুল্লাহ ‘আবু খাদিজা’ নিহত হন। ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ে এই অভিযানটি চালানো হয়। ট্রাম্প এই সফলতার প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘শক্তির মাধ্যমেই শান্তি আসবে।’
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর দেশটির বিরুদ্ধে আর কোনও পদক্ষেপ বা হামলা চালানো হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সিনেটর মাইক লি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে মাইক লি লিখেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন- মাদুরো মার্কিন হেফাজতে থাকায় ভেনিজুয়েলায় আর হামলা চালানো হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাদুরোর গ্রেফতারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন করতে যারা কাজ করছিলেন তাদের সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষার জন্য ভেনিজুয়েলায় মধ্যরাতে এসব হামলা চালানো হয়েছে।’
এর আগে, এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে সিনেটর লি বলেছিলেন, ‘আমি অধীর আগ্রহে এটা জানতে অপেক্ষা করছি যে, যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন না নেওয়া, সাংবিধানিকভাবে এই পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিতে পারে কিনা।’
নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবির পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাদুরো ও তার স্ত্রীর ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ চেয়েছেন ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
রাষ্ট্রীয় টিভি ভিটিভিতে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট নিকোলাম মাদুরো ও ফাস্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস বেঁচে আছেন আমাদের এমন তথ্য জানানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি।’
এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনিজুয়েলা এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর একটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। অভিযানে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ তবে মাদুরোকে কীভাবে আটক করা হয়েছে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এমনকি তারা জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন সেটিও বিস্তারিত জানাননি তিনি।
তিনি আরও জানান, ‘এই অপারেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে মিলে করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে। আজ স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়) মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হবে।’
এদিকে দেশজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো।
লেবাননে নিযুক্ত জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী শান্তিরক্ষা বাহিনীর (ইউনিফিল) ওপর দুই দফায় গুলি চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী। গত শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের কফর শৌবা এলাকায় টহলরত শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে মেশিনগান থেকে গুলি ছোড়া হয়। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্লু লাইন-এর দক্ষিণ ভাগ থেকে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইউনিফিল।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শুক্রবার কফর শৌবা এলাকায় টহলরত শান্তিরক্ষীদের ওপর অন্তত ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এ হামলা শান্তিরক্ষীদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মিটার দূরে আঘাত হানে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী টহল কার্যক্রম শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতির বিষয়টি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে জানানো হয়েছিল।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, প্রথম হামলার ২০ মিনিটের মধ্যে একই এলাকায় আরেকটি টহল দলের ওপর মেশিনগান থেকে প্রায় ১০০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।
তবে সংস্থাটির তথ্য মতে, উভয় ঘটনায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহত হয়নি। ঘটনা ঘটেনি। দুই ক্ষেত্রেই গুলিবর্ষণ হয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্লু লাইন-এর দক্ষিণে অবস্থিত একটি সামরিক অবস্থান থেকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে ‘ফায়ার বন্ধ’ করার অনুরোধ জানিয়েছে।
সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে এবং এটি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে বলে সতর্ক করেছে ইউনিফিল। শান্তিরক্ষীদের ওপর বা তাদের আশপাশে হামলা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৭০১-এর গুরুতর লঙ্ঘন।
সংস্থাটি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রতি শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে বা তাদের নিকটে আগ্রাসী আচরণ ও হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর টহল দলগুলো প্রায়ই ইসরায়েলি সেনাদের বিভিন্ন ধরনের সহিংস আচরণের মুখে পড়ে। এসবের মধ্যে লেজার টার্গেটিং ও সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণের ঘটনাও রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক এসব ঘটনাকে আগে ‘চরম বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এর আগে গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে লেবাননে আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা বিভিন্ন হামলায় লেবাননে চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১৭ হাজারের বেশি আহত হন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩৩৫ জন নিহত এবং ৯৭৩ জন আহত হয়েছেন।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সেনাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার কথা থাকলেও তারা আংশিকভাবে প্রত্যাহার করে। এখনও সীমান্তবর্তী পাঁচটি সামরিক চৌকিতে সেনা উপস্থিতি বজায় রেখেছে ইসরায়েল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবর এএফপি, সিএনএন, আল জাজিরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের হামলা’ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে বন্দি করে ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় মার-এ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলন হবে বলেও জানান ট্রাম্প।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ভেনেজুয়েলাজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ভেনেজুয়েলায় হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। কারাকাসের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে এমন ছবিও প্রকাশ পেয়েছে। ভেনেজুয়েলার সরকার এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন হিসেবে প্রত্যাখ্যান ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর রাজধানীর আশপাশের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার কথিত মাদকবাহী নৌযানের সঙ্গে যুক্ত একটি ডকিং এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর প্রেসিডেন্ট মাদুরো দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির পর এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলাগুলো ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজসম্পদ দখলের চেষ্টা। এসব হামলাকে তিনি তীব্র ভাষায় নিন্দা জানান।
তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই আগ্রাসন চালাচ্ছে। নতুন এই হামলা ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্থলভিত্তিক হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে।