গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। টানা সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চালানো এই হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনি। বর্বর এই আগ্রাসনে নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। জাতিসংঘও এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি জানায়, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহত ফিলিস্তিনিদের অন্তত ৫৬ শতাংশই নারী ও শিশু। বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
জাতিসংঘ বলছে, গাজা যুদ্ধে নিহত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ৫৬ শতাংশ নারী ও শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে চলা ইসরায়েলের নিরলস আগ্রাসনে অন্তত ৩৫ হাজার ১৭৩ জন নিহত হয়েছেন।
মূলত গাজা কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত বলেছে, উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পুরুষ, ২০ শতাংশ নারী এবং ৩২ শতাংশ শিশু এবং ৮ শতাংশ বয়স্ক মানুষ রয়েছেন।
মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেছেন, নতুন এই পরিসংখ্যাটি এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা তথ্যগুলোর মধ্যে ‘সবচেয়ে ব্যাপক’।
তিনি জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, অজ্ঞাত পরিচয়ের ক্ষেত্রে একই অনুপাত প্রয়োগ করলে এবং নিহত বয়স্ক নাগরিকদের অর্ধেক নারী হলে এটা আশা করা যেতেই পারে যে, নিহত ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মধ্যে অন্তত ‘৫৬ শতাংশ নারী ও শিশু’ রয়েছে।
তিনি বলেন, তারপরও এটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না, কারণ হাজার হাজার মানুষ এখনও সম্ভবত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়া তাদের মধ্যে আরও বেশি সংখ্যক নারী এবং শিশু থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ নারী ও শিশুরাই সাধারণত বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন।
মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, সুতরাং ‘ন্যূনতম পরিসংখ্যানগত গণনা’ থেকে বলা যায়, গাজায় নিহতদের ৬০ শতাংশ নারী এবং শিশু হতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘের শিশু নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রধান বলেছেন, গত বছরের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ১৯০ জনেরও বেশি জাতিসংঘ কর্মী নিহত হয়েছেন।
ক্যাথরিন রাসেল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ‘সেবা করার সময় মানবতাবাদীদের অবশ্যই সবসময় সুরক্ষিত রাখতে হবে।’
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে নির্বাহী সরকার প্রধান হিসেবে আড়াই দশক পূর্ণ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে তিনি যেভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করেছেন, তা নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে রয়েছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নসহ সার্বিক পর্যালোচনায় তার এই দীর্ঘ শাসনামলের অর্জন, ব্যর্থতা ও পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
নরেন্দ্র মোদির বিরোধীরা শুরু থেকেই তার কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে আসলেও, তার সমর্থকদের কাছে তিনি বরাবরই উন্নয়নের প্রতীক। এর মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় তার ‘গুজরাট মডেল’-কে। এই মডেলে ব্যাপক শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং দেশের একটা বড় অংশে চরম দারিদ্র্য অনেকটাই কমেছে। এছাড়া সরাসরি কল্যাণমূলক সাহায্য প্রদান, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি হ্রাসের মতো কিছু দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ তাকে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখেছে।
তবে এত সাফল্যের পরও মোদির এই দীর্ঘ শাসনকাল পুরোপুরি ত্রুটিহীন বা একমুখী নয়। অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। চীন বা অন্যান্য এশীয় দেশগুলো যেভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে ঐতিহ্যবাহী কৃষি খাত থেকে বের করে আধুনিক শিল্পকারখানায় চাকরি দিয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনটি অত্যন্ত ধীরগতির। গত ২৫ বছর ধরে দেশের জিডিপিতে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় কারখানা ও কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব এখনো ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। মোদির এই আড়াই দশকের শাসনামলে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনীতিতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা যেভাবে জোরালো হয়েছে, তার জেরে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নানাভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, বিদ্বেষমূলক আক্রমণ, মসজিদ লক্ষ্য করে হামলা এবং সরকারি বুলডোজার দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করার মতো ঘটনাগুলো দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এসব নীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চরিত্র চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের কঠোর ও জোরালো শাসনপদ্ধতির কারণে সমাজের একটি অংশের মধ্যে একধরনের ক্লান্তি বা বিরক্তি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া আগের মতো অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকছে কি না—তা নিয়ে সমালোচকদের উদ্বেগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বিগত ২৫ বছরে নরেন্দ্র মোদি ভারতকে অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বটে, তবে দেশের ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার, স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমাজে সবার জন্য আস্থার পরিবেশ ও ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ যাওয়া বাকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুপক্ষ থেকেই পরস্পরবিরোধী বার্তা এসেছে। এসব ডামাডোলে দুই দেশের মধ্যে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধ আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার দিকে যাচ্ছে, নাকি শান্তিচুক্তির পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মূলত আলোচনার দরজা খোলা রেখে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে জানা গেছে খবরটি।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলা চালানোর যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে একই দিনে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এদিকে এসবের মধ্যেই জানা যায়, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আবারও তেহরান সফরে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা আলোচনা চালাচ্ছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা। আলজাজিরার খবর বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন একদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খোলা রাখছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও গোলাবারুদের মজুত বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু সেনাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সামরিক কার্গো বিমান দেশটির নেগেভ অঞ্চলের ওভদা ও নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে। এ ছাড়া আরও কিছু বিমান জর্ডান, সৌদি আরব ও কাতারে পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরানে অনির্দিষ্টকাল ধরে চলা যুদ্ধের আশঙ্কা নেই। তার বিশ্বাস, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন। ফক্স নিউজকে ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের আরও অনেক কাজ বাকি আছে। তবে আমি আপনাদের একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারি, আরেকটি চিরস্থায়ী যুদ্ধ নিয়ে যদি কেউ উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন, ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই এমন যুদ্ধ চলতে দেবেন না।’
এদিকে ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক পরিকল্পনাকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ব্রেট সিলভিয়াকে বরখাস্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা আবার শুরু করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার সকালে কাতারের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চিঠি পাঠানোর খবর প্রসঙ্গে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তেহরান ওই বার্তা পেয়েছে। তবে এখনও এর জবাব দেওয়া হয়নি।
পৃথকভাবে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরানে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। সে বৈঠকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে আলোচনা হয় গতকাল।
এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সময় মাইনে আঘাত লেগে চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এর এক দিন আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, তারা ওই নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো থেকে বাধা সরিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পরিষ্কার করেছে। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় অনুমোদনহীন দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টার সময় নিয়ম লঙ্ঘনকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজ মাইনের আঘাতে বিস্ফোরিত হয় এবং আগুন ধরে যায়।’
পরে বৃহস্পতিবার ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, প্রণালীর পূর্ব দিকে আরেকটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লেগেছে। জাহাজটি ‘সীমাবদ্ধ ও বিপজ্জনক এলাকায়’ চলাচলের সময় মাইনে আঘাত পেয়েছিল।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথম তিনটি জাহাজ তাদের সব রাডার ও নৌ চলাচল-সংক্রান্ত ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। পাশাপাশি আইআরজিসির নৌবাহিনীর সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করেছিল তারা। তবে এসব ঘটনা ঠিক কখন ঘটেছে কিংবা জাহাজগুলো কোন দেশের পতাকা বহন করছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও বৃহস্পতিবার রাতে জানিয়েছে, ওমানের খাসাবের প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বা ৪৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর তারা পেয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর সংস্থাটি জানায়, আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে এবং জাহাজের নাবিকরা নিরাপদে রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়ে হুতিদের নতুন দাবির পর গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত বছরের যুদ্ধের সময় তেল আবিবের প্রতি জার্মানির সমর্থনের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। একই সঙ্গে ইরানের জনগণের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ‘ধ্বংসাত্মক আঘাত’ হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। খবর দ্য মিডল ইস্ট আইয়ের।
ইউরোপের জ্বালানি ব্যয় ১০ হাজার কোটি ইউরো (প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলার) বেড়ে যাওয়ার জন্য চলমান সংঘাতকে দায়ী করে জার্মানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন আরাগচি।
তিনি বলেন, ‘গত বছর ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা শুরুর সময় জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ওই হামলাকে ‘‘ইউরোপের নোংরা কাজ করে দেওয়া’’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।’
আরাগচি বলেন, ‘১০ হাজার কোটি ইউরো কিছুই নয়, এর তুলনায় আমাদের জনগণের ক্ষতি করার সাহস দেখানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী যে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানবে, তা অনেক বড়।’
নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া যাবে না: উত্তর কোরিয়া
তিনি আরও বলেন, ‘আগের মতো কোনো সীমারেখা এখন আর কার্যকর নয়।’
ইসরায়েলে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের থেকে বেশি আসন পেয়েছে। কিন্তু কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি ও রাআম পেয়েছে আটটি। সরকার গঠনের জন্য ৬১ জন পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থন জরুরি। সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে তৎপরতা শুরু হয়েছে।
নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটে আছে দক্ষিণপন্থি এবং অতি দক্ষিণপন্থিরা। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটে আছে মধ্যপন্থি ও উদারপন্থিরা। দুটি আরব-ইসরায়েলি লিস্ট-এ থাকা দলগুলো ১৯টি আসনে জিতেছে। এখন যা পরিস্থিতি তাতে সরকার গঠন করতে গেলে এই আরব দলগুলোকে সরকারে নিতে হবে অথবা তাদের সমর্থন জোগাড় করতে হবে প্রধান দুই জোটকে।
বামপন্থি-প্রগতিবাদী ডেমোক্র্যাট নেতা ইয়াইর গোলান জানিয়েছেন, তিনি বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর ল্যাপিদ এবং আরব রাআম পার্টির মনসুর আব্বাসের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কথা বলেছেন। তিনি আইজেনকটের সঙ্গে দেখা করার পর এক্সে পোস্ট করে বলেছেন, ইসরায়েলকে বাঁচানোর জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। এই অবস্থায় নেতানিয়াহুবরোধী আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট আরব দলগুলোর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত হাত মেলায় কি না সেটা দেখার।
ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরেই বড় ধাক্কা খেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তার দল লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে রক্ষণশীল হেরাডি ইহুদিদের দল হিসেবে পরিচিত ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) বিরোধী শিবিরের সহযোগী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি। ইসরায়েলি চ্যানেল-১২ এতে দাবি করা হয়েছে, ইউটিজে নেতৃত্ব এমন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে নেতানিয়াহুকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলে একটি নতুন সরকার গঠনের আশা দেখা যাচ্ছে।
তবে সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে কি না সেটিও দেখার অপেক্ষায় আছেন অনেক ইসরায়েলি। সরকার গঠনের আরেকটি বিকল্প হলো, নেতানিয়াহু এবং আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করুক। কিন্তু তাতে মধ্যপন্থি ভোটদাতারা বিরূপ হবেন। ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ইসলামপন্থিদের নিয়ে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সেক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের বাদ দিয়ে কট্টরপন্থিদের ইহুদিদের বাদ দিয়ে একটি মধ্যপন্থি ইহুদিদের নিয়ে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চলছে।
ইউক্রেনের কাছে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ অনুমোদনের কথা জানায়। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক মূল্য ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউক্রেনকে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে অনুমোদন পেলেও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুত হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া সাধারণত কয়েক বছর সময় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, অনুমোদন পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো উৎপাদিত হয়নি। ২০৩০-এর দশকের শুরুর কয়েক বছর আগে সেগুলো সরবরাহের সম্ভাবনা কম।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সরবরাহের সময় এগিয়ে আনতে পেন্টাগনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে পরে নতুন উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একজন।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে আরও বেশি ইন্টারসেপ্টর বা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র চেয়ে আসছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।
ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের উত্তেজনাও বেড়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে একটি ডিজেল চুক্তির ঘোষণা দেন। পাশাপাশি রুশ তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের অনীহার কারণে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করেন।
জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করলেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অনুমোদনের জন্য প্রায় এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় রয়েছে ইউক্রেন।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরের একটি জনাকীর্ণ রেল প্ল্যাটফর্মে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হন। একই দিনে দুটি প্রাদেশিক শহরে হামলায় আরও পাঁচজন এবং সন্ধ্যায় রাজধানী কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত হন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ের অনুদানের অর্থে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মূল্য পরিশোধ করবে ইউক্রেন। ইউএস জাম্পস্টার্ট কর্মসূচির মাধ্যমে এ অর্থ ব্যবস্থাপনা করা হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউক্রেন সাপোর্ট লোন থেকে পাওয়া অর্থও ব্যবহার করা হবে। এ বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থায়ন থাকছে না।
পেন্টাগনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জাম্পস্টার্ট কর্মসূচির আওতায় মিত্র দেশগুলোর অনুদান দিয়ে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র, বিভিন্ন পরিষেবা ও প্রশিক্ষণ কেনা হয়। রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে দেশটির আত্মরক্ষায় সহায়তা করাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
এর আগে গত আগস্টে এ কর্মসূচির আওতায় ৮২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩ হাজার ৩৫০টি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হয়েছিল। জোন ৫ টেকনোলজিস ও কোঅ্যাসপায়ার নামের দুটি কোম্পানি এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর বিক্রির ক্ষেত্রে প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন।
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মিত্র দেশগুলোকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করছে, অন্যদিকে নিজেদের সামরিক অভিযানেও গোলাবারুদ ব্যবহার করছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত জুলাইয়ে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য লকহিড মার্টিনকে সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ দেয় মার্কিন সেনাবাহিনী। লকহিড জানিয়েছে, এ চুক্তির ফলে ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ পিএসি-৩ এমএসই ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা তিন গুণ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া আরকানসাসের ক্যামডেন কারখানায় কর্মীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৫০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি বছরে ২ হাজার প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা জানিয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দ্রুতই ইতি টানবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কীভাবে এই রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার অবসান ঘটবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা তিনি তুলে ধরেননি। আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে গত শুক্রবার কানসাস সিটির বেতারকেন্দ্র কেসিএমওকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন তিনি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে ওয়াশিংটন ইরানে কোনো সামরিক আক্রমণ চালাবে না বলে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি সেখানে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। আমাদের এমন নিশ্চয়তা প্রয়োজন, যাতে (ইরান) কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে।’
দুই দেশের মধ্যকার এই লড়াই থামাতে বর্তমানে মধ্যস্থতার ভূমিকায় রয়েছে কাতার। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে গতকাল আবারও তেহরানে পৌঁছান কাতারি প্রতিনিধিরা, যা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বিত প্রক্রিয়ারই অংশ বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা। পাশাপাশি তেহরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের সাথে সরাসরি সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আল–জাজিরা ওয়াশিংটন পোস্টের সূত্রে বিষয়টি প্রকাশ করলেও তেহরান এখনো এতে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
শান্তি আলোচনার এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের প্রত্যাশায় বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমস্ত মজুত হস্তান্তর করতে হবে। বিপরীতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, দেশটির বন্দরে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধের অবসান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিক থেকে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি এবং জব্দকৃত অর্থ ফেরত দেওয়াসহ সাত দফা দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক আলোচনার তোড়জোড়ের মাঝেই অবশ্য নতুন করে আগ্রাসনের প্রস্তুতিও জারি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা। আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার ইরানে পুনরায় হামলা পরিচালনার সম্ভাব্য রূপরেখা সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বিস্তারিত অবহিত করেছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা গেছে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচন শেষেই দেশটিতে যৌথ অভিযান চালানোর ব্লুপ্রিন্ট চূড়ান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এমনকি সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই অভিযানের লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে ইরানের নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন জাতীয় অবকাঠামো।
বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে আল–জাজিরা জানিয়েছে, ওয়াশিংটন মূলত সামরিক চাপ বজায় রেখেই আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখার দ্বৈত কৌশল অনুসরণ করছে। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নতুন করে কোনো তীব্র সংঘাতে না জড়ালেও ভোট শেষ হলে পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় নিতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেছেন যে ট্রাম্প এই লড়াইকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে দেবেন না। তবে চলমান সংকটের চূড়ান্ত সমাধান শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে মিলবে নাকি নতুন সামরিক পদক্ষেপে গড়াবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল সামরিক শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন হিসাব-নিকাশ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার তথ্য সামনে এসেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীতে মাইন বিস্ফোরণ ও তেলবাহী জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সামরিক উত্তেজনা কমার স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে, বাড়ছে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উদ্বেগ।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের নতুন বিস্তার: রয়টার্সের বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে ইরান অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম আমদানি করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার মাধ্যমে এই বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন, রাশিয়া, জার্মানি, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রকেটের জ্বালানি তৈরির উপকরণ, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ভারী ট্রাক ও শিল্প সরঞ্জাম আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশি শেল কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী এবং তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ তথ্য ইরানের বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থার সক্ষমতা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলেও দেশটির সামরিক সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের এই সক্ষমতার পেছনে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের ইরান পর্বতময় ভূখণ্ড, বিস্তৃত মরুভূমি এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনার সুবিধা কাজে লাগিয়েছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটির প্রতিরক্ষানীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তেহরান।
দেশটির সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও এ বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।
ইরানের আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে বিস্ফোরণে চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লেগেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও ওমানের খাসাবের উত্তর-পূর্বে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর জানিয়েছে। তবে এসব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু তেল পরিবহন নয়, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাও চাপে পড়ে। ফলে যুদ্ধের প্রতিটি নতুন ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রয়টার্সের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও ১০৩ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ব্রেন্টের দাম ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে: হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়েমেনের হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় ছয়টি হামলা চালানো হয়েছে।
হুতিদের দাবি অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল রাস তানুরা তেল শোধনাগার, আবকাইকে সৌদি আরামকোর স্থাপনা, রাবিগ তেল শোধনাগার এবং রিয়াদ ও দাম্মামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নাজরানে সৌদি সামরিক বাহিনীর একটি সদর দপ্তরেও হামলার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। তবে সব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন নাগরিক আহত হয়েছেন এবং একটি বাড়ি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ। ফলে রাস তানুরা ও আবকাইকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন ও পরিশোধন অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা বাজারে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সমীকরণ: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তেহরান সফরের অভিজ্ঞতাও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের মধ্যে রাজধানী তেহরানে নগরজীবন পুরোপুরি থেমে যায়নি। রাস্তায় যানবাহনের চলাচল, গণপরিবহন ও রেস্তোরাঁয় মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিমানবন্দর থেকে শহরে যাওয়ার পথেও যুদ্ধের প্রকাশ্য চিহ্ন খুব বেশি দেখা যায়নি।
সামাজিক ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নারীদের পোশাক ও চলাফেরায় আগের তুলনায় শিথিলতা লক্ষ করা গেছে। ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে যে প্রতিবাদ হয়েছিল, তার পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে তিন দিনের সফরে একটি দেশের সামগ্রিক জনমত নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সফরকালে বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশ এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে জনসমাগম দেখা গেছে। এতে যুদ্ধের মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় সংহতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
ইরানের ইতিহাসেও বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ ও প্রতিরোধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের নেতৃত্বে তেলশিল্প জাতীয়করণ এবং ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সমর্থনপুষ্ট অভ্যুত্থানে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এসব অভিজ্ঞতা ইরানের পশ্চিমাবিরোধী রাজনৈতিক মনোভাব গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। তেহরানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠক এবং কাতারের মধ্যস্থতার উদ্যোগ সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা।
চাপ বাড়ছে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে: মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে জাহাজের বিমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন আমদানিপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল ও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির অবনতি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ সংকটের আরেকটি দিক হলো, যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থেকেও বাংলাদেশকে এর অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নিয়েও নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞানীতি—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ইরানের প্রতিরোধের সক্ষমতা যেমন সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও ক্রমেই বাড়ছে। তাই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ তৈরি করা।
এখনই চালু হচ্ছে নামার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকার ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) কার্যক্রম। ১ নভেম্বরের মধ্যে ২০২৭ অর্থবছরের ডিভি লটারির আবেদন নেওয়া শুরু করার যে আদেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিলেন, মার্কিন আপিল আদালত তাতে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের স্থগিত করে রাখা ডিভি লটারির চাকা আপাতত থমকেই রইল।
ঘটনাটি শুরু হয় ‘রেড ইগল ল’ নামের একটি অভিবাসন আইন সংস্থার মামলাকে কেন্দ্র করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর নতুন বছরের ডিভি লটারি চালু না করায় সংস্থাটি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। গত ১৪ অক্টোবর নিম্ন আদালত আদেশ দেন যে, রোববারের (১ নভেম্বর) মধ্যেই আবেদন নেওয়া শুরু করতে হবে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার সেই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে জরুরি আবেদন করে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তিন বিচারকের আপিল বেঞ্চ ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়ে নিম্ন আদালতের সেই আদেশটি আটকে দেন।
আপিল আদালত অবশ্য পরিষ্কার বলেছেন, পররাষ্ট্র দফতর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ডিভি লটারি বন্ধ রেখেছে, যা একদমই অনুচিত। তবে মামলাকারী আইন ফার্মটির এই বিষয়ে সরাসরি আইনি অধিকার (লিগ্যাল স্ট্যান্ডিং) রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিচারকেরা। তাদের মতে, এই আইনটি বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি, কোনো ল ফার্মের ব্যবসার জন্য নয়।
১৯৯০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ডিভি লটারির মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের কম অভিবাসনের দেশগুলো থেকে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষকে লটারির ভিত্তিতে গ্রিন কার্ড দেওয়া হতো। হুট করে এই আবেদন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার আমেরিকার স্বপ্নপ্রত্যাশী মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় পড়েছেন।
অন্যদিকে, হেরে গেলেও মাঠ ছাড়ছে না আইন সংস্থাটি। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত পড়াশোনা বা কাজের ভিসায় থাকা কোনো বিদেশি নাগরিককে সামনে রেখে খুব শিগগিরই তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি লড়াইয়ে নামবে। আপাতত আপিল আদালতে মূল মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধই থাকছে গ্রিন কার্ডের এই স্বপ্নদুয়ার।
সূত্র: নিউজউইক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাইগঞ্জে আয়োজিত এক রাজনৈতিক জনসভায় গরু জবাই, সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব ইস্যুতে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সমাবেশে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাজ্যে কোনো গরু জবাই করা হলে পরিণতি অত্যন্ত খারাপ হবে। একই সঙ্গে তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) মাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্বী শরণার্থীদের স্থায়ী নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়েও তিনি কথা বলেন।
সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় সনাতন ধর্মের বিশ্বাসের প্রসঙ্গ টেনে গরু রক্ষার পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন শুভেন্দু। তিনি উল্লেখ করেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে গরু অত্যন্ত পবিত্র এবং এর কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেউ যেন ‘গোমাতা’র ওপর আঘাত না হানে; আর যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে, তবে তাঁর চেয়ে কঠোর বা খারাপ কেউ হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
গরু সুরক্ষার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার জনসংখ্যা ও অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গটিও বক্তব্যে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেন এই বিজেপি নেতা। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এর বিপরীতে যেসব হিন্দু শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের দেশের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিধিমালার আওতায় দ্রুত বৈধ নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধরনের অবৈধ প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসা চলতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন শুভেন্দু অধিকারী। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সংহতি ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের জাতীয়তাবিরোধী কার্যক্রম যেন সংঘটিত হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই সীমান্ত এলাকার অবৈধ মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় চালুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে তেহরানে পৌঁছেছে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং বাংলাদেশের জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এই তথ্য জানায়। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবে। মধ্যপ্রাচ্যে আট মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকির মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে সম্প্রতি কয়েকটি দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তেহরান সফরের ধারাবাহিকতায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কাতারের প্রতিনিধিদলের এই সফরের ঠিক এক দিন আগে ইরানি গণমাধ্যম প্রকাশ করে যে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেশটির নিরাপত্তাপ্রধান জেনারেল মোহসেন রেজায়ির উদ্দেশে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি হস্তান্তর করা হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ জানায়, গত সপ্তাহে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিটি গত রোববার রেজায়ির কাছে পৌঁছানো হয়। অন্যদিকে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ উল্লেখ করেছে, চিঠিতে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তের চেয়ে মূলত সম্ভাব্য আলোচনার একটি কার্যকর কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির পর শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে কাতার ও পাকিস্তানের সমন্বিত মধ্যস্থতা অব্যাহত রয়েছে; যার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার মস্কোয় এক বৈঠকের ফাঁকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সংকট সমাধানে চলতি সপ্তাহে তেহরান সফর করেছেন পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও, যারা গত আগস্টে মক্কায় একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হন। ওই হামলার জবাবে ইরান আঞ্চলিক মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহনকারী কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনও ইরানের বন্দরগুলোতে সরাসরি নৌ-অবরোধ আরোপ করে দেশটির তেল রপ্তানি ও বহির্বাণিজ্য মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলে।
বিদ্যমান এই অচলাবস্থা নিরসনে বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে তেহরান দুই মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের সামনে সাতটি শর্ত পূরণ করার দাবি জানিয়েছে তেহরান। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের রাষ্ট্রীয় আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত করা, দেশটির জ্বালানি তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বন্দরগুলোতে আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা।
পশ্চিমা বিশ্বের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করে পাঁচ হাজারের বেশি গোপন ও ছায়া সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাঁচামাল আমদানি করছে ইরান। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সুবিশাল নেটওয়ার্কের কেবল একটি সংস্থাই ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ১৮ মাসে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি (২.৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার মূল্যের সামরিক উপকরণ আমদানি করেছে। এসব আমদানিকৃত পণ্যের তালিকায় রয়েছে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক উপাদান, উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ, সূক্ষ্ম শিল্পযন্ত্র এবং শত শত ভারী সামরিক সহায়ক ট্রাক।
ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিক্স’-এর সহায়তায় ইরানের প্রায় ১৯ হাজার আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র, ব্যাংকিং রেকর্ড ও করপোরেট দলিল বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সাধারণত ‘এমওডি’ দিয়ে শুরু, যা তেহরানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক বিভাগের ঠিকানায় নিবন্ধিত। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইরানের প্রভাবশালী বাণিজ্যিক সংগঠন ‘বোনিয়াদ’ এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। কাগজপত্রে সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দেখানো হলেও মূলত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে ২০১৩ সালের দিকে এগুলোর বড় অংশ গড়ে তোলা হয়েছিল। পর্যালোচিত মোট চালানের ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি কোনো বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর হয়নি; বরং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী এবং তেল বিক্রির মাধ্যমে বিদেশে রক্ষিত তহবিল থেকে এসব দেনা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নামের একটি নির্দিষ্ট সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং ৪৩৫টি ইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে, যা ছদ্মবেশী মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক হিসেবে ব্যবহারোপযোগী। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের হাত ঘুরে হাজার হাজার টয়োটা হিল্যাক্স, ল্যান্ড ক্রুজার ও টুন্ড্রা ট্রাক সংগ্রহ করেছে তেহরান। নথিপত্র অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর ঠিক আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চীন থেকে ৯৩ মেট্রিক টন টাইটানিয়াম ও শত শত টন রাসায়নিক দ্রব্য এনেছে দেশটি। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে পাঁচটি চালানে মোট ৭৬ লাখ ডলার মূল্যের ডেটোনেটর আমদানি করা হয়, যার একটি চালান পৌঁছেছিল চলতি বছরের জুনে। এসব সামরিক চালান মূলত রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে, মধ্য এশিয়া হয়ে স্থলপথে ট্রাকে এবং চীন থেকে কার্গো বিমানের মাধ্যমে ইরানে পৌঁছেছে।
এমন সামরিক প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদরেজা আরেফ ঘোষণা করেছেন, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দেশটির বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অতীতের ১২ দিনের বা ৪০ দিনের যুদ্ধের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যখন তেহরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কূটনীতির মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই তথ্য প্রকাশ্যে এলো। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ২০০৬ সালের জাতিসংঘের পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা, ২০১৮ সালে ওয়াশিংটনের পরমাণু চুক্তি থেকে প্রস্থান এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পরও ইরানের এই সরবরাহ লাইন সচল থাকার বাস্তবতা বিদ্যমান বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম ভুটানের গাসা জেলায় একটি হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক হড়পা বানের কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাসা জেলার শিনতাফু হ্রদে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যার জেরে মো ছু নদীর জলস্তর হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়ে তীরবর্তী এলাকায় তীব্র বন্যা দেখা দেয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, বন্যার তোড়ে মো ছু নদীর তীরে অবস্থিত দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ ‘গাসা ছাছু’র অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি ভেসে গেছে। তবে ঝুঁকি আঁচ করতে পেরে আগেই ওই এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। মো ছু নদীর উৎপত্তিস্থলে থাকা শিনতাফু হ্রদটিকে ভুটানের ১৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়; এর আগে ২০২১ সালের ২৬ আগস্টও এক হড়পা বানে মো ছু নদী গতিপথ পরিবর্তন করে এই উষ্ণ প্রস্রবণটি ভাসিয়ে নিয়েছিল।
শুক্রবার সকালে বন্যার জল পুনোখা জং থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের কাবেসা গেওগের স্রিগাং এলাকা অতিক্রম করে ভাটির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ভুটান সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পুনোখার গুমা গেওগের অধীন দোছুখা-জোমলিংথাং-রিৎসা চিওগে কৃষিকাজে সেচ সুবিধার জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে স্থাপিত আধুনিক সৌর সেচ ব্যবস্থাটি হড়পা বানে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অকেজো হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জোমলিংথাং এলাকায় পুনোখা-গাসা মহাসড়কের একটি অংশ ঢেকে ফেলে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
হিমবাহ হ্রদের পানি ভাটির দিকে নেমে আসতে থাকায় সীমান্তবর্তী ভারতীয় ভূখণ্ড প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে ভুটান সরকার অবিলম্বে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম প্রশাসনকে সতর্ক করেছে। আসামের ধুবড়ি এবং পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পাহাড়সহ আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলাকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোচবিহারে উত্তর ভুটান থেকে উৎপন্ন হয়ে পরবর্তীতে আসামের ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হওয়া সংকোষ নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আলিপুরদুয়ার পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অমিত কুমার শ জানান, সব প্রশাসনিক সংস্থা তৎপর রয়েছে এবং আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের (সিডব্লিউসি) বন্যা পূর্বাভাস পর্যবেক্ষণ অধিদপ্তর পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার এবং আসামের ধুবড়ি জেলার জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, পুনাৎসাংছু বা সংকোষ নদীর উচ্চ অববাহিকায় হড়পা বানের কারণে ভাটির দিকে নদীর পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে বাড়তে পারে এবং পরবর্তী ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে এই পানি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় জেলাগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নদী অববাহিকার স্থানীয় প্রশাসনকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ বজায় রাখতে এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক আক্রমণে জড়িয়ে পড়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে মার্কিন কংগ্রেসে দলগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের মেয়াদের শেষ দুই বছরে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা থাকায় রিপাবলিকানদের পক্ষে মাঠে নেমে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জোর প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে বেশ কিছুদিন রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে থাকার পর সম্প্রতি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে একের পর এক আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কড়া সমালোচনা করছেন ওবামা।
এই নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে গত বুধবার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টার নিকটবর্তী শহর মরোতে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে অংশ নেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেখানে তিনি ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের পক্ষে প্রচার চালান এবং ভোটারদের তাঁকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান। এই আসনে অসফকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলেছেন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ও আইনপ্রণেতা মাইক কলিন্স। সমাবেশে ওবামা আটলান্টায় সমাহিত নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপস্থিত জনতাকে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বার্তা দেন।
সমাবেশের বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক আরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন ওবামা। তিনি উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচনে কেবল রাজনৈতিক জয়-পরাজয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ওবামা বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি মিথ্যাচার, প্রতারণা কিংবা অন্যকে ভয় দেখানোর মতো আচরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয় এবং অর্থই যদি মানুষের মর্যাদা ও মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তবে কোনোভাবেই দেশের ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমতা এবং ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
এদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে, যার ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে প্রায় রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক আধিপত্য ও শক্ত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখনও অটুট রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পক্ষে রাখতে দলের ভোটারদের বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার লক্ষ্যে আক্রমণাত্মক প্রচার কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন তিনি।