গাজায় ইসরায়েলের বর্বর হামলায় অন্তত আরও ৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হবার ঘটনা ঘটেছে। এই ভূখণ্ডজুড়ে চালানো পৃথক কিছু হামলায় তারা নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি হামলার কারণে এখন পর্যন্ত রাফা ছেড়ে পালিয়েছেন ৮ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি।
আজ শুক্রবার এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজায় আকাশ ও স্থলপথ জুড়ে চালানো হামলায় কমপক্ষে ৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া রাফায় হামাসের যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের ব্যাপক লড়াই চলছে বলেও জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এবং হামাসের সশস্ত্র শাখা।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ট্যাংকগুলো রাফার আরও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়েছে, শহরের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা ইবনার দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং তিনটি পূর্ব শহরতলিতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে বাসিন্দারা বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইসরায়েলি বাহিনী আরও পশ্চিমে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা ইবনার প্রান্তে রয়েছে, যা ঘনবসতিপূর্ণ। তারা এখনও এটি আক্রমণ করেনি।’
তিনি রয়টার্সকে আরও বলেন, ‘আমরা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছি, এবং আমরা দেখছি যে সেনারা আক্রমণ করেছে এবং সেখান থেকে কালো ধোঁয়া উঠছে।’
এই মাসে গাজার উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে একযোগে ইসরায়েলি হামলার ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী সাহায্য প্রবেশের প্রধান প্রবেশ পথও বন্ধ করে দিয়েছে, যা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়াই রাফাতে স্থল হামলা শুরু করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা গাজার দক্ষিণের এই শহরটিতে হামলার জন্য ইসরায়েলকে ব্যাপকভাবে সমালোচনাও করেছে। তবে ইসরায়েল বলেছে, সেখানে হামাস যোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে তাদের অবশ্যই অগ্রসর হতে হবে।
গাজায় পরিচালিত প্রধান সাহায্য সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজিস বলছে, চলতি মে মাসের প্রথম দিকে ইসরায়েল রাফা শহরটিতে হামলা শুরু করার পর থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ৮ লাখেরও বেশি মানুষ রাফা থেকে পালিয়ে গেছেন।
গাজায় নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের জরুরি প্রতিক্রিয়া নেতা সুজে ভ্যান মিগান বলেছেন, অনেক বেসামরিক নাগরিক এখনও সেখানে আটকে আছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘রাফা শহরটি এখন তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বের সমন্বয়ে গঠিত: পূর্ব দিকটি মৌলিক যুদ্ধ অঞ্চল, মাঝামাঝি অঞ্চলটি ভৌতিক শহরে পরিণত হয়েছে এবং পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থানরত জনবহুল জনগোষ্ঠী শোচনীয় পরিস্থিতিতে বসবাস করছে।’
নৃশংস হামলার পাশাপাশি ইসরায়েল খাবার পানীয়, খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং গাজাজুড়ে বেশ কয়েকটি হাসপাতালও বন্ধ করতে বাধ্য করেছে তারা।
বৃহস্পতিবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে বিদ্যুৎ জেনারেটরে ‘কয়েক মিনিটের’ জ্বালানি অবশিষ্ট রয়েছে। জ্বালানি শেষ হলে ১৩০০ জন রোগীর সেবাও শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে।
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, গত বুধবার যুদ্ধে তাদের আরও তিন সৈন্য নিহত হয়েছে। এতে করে গত ২০ অক্টোবর থেকে গাজায় স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত ইসরায়েলি সেনাদের সংখ্যা বেড়ে ২৮৬ জনে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে ৩৫ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৮০ হাজার মানুষ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টার দিকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার নানা দিক উঠে আসে।
চেয়ারম্যানের প্রেসসচিব সালেহ শিবলীর বরাত দিয়ে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। গুলশানে নিজ বাসা থেকে বৈঠকে ভার্চুয়ালি অংশ নেন তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার।
ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, পারস্পরিক শুল্কহার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক এমিলি অ্যাশবি এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হুমায়ুন কবির।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট–আইসিই এজেন্টরা একটি গাড়ি থেকে টেনে–হিঁচড়ে বের করে নেওয়ার সময় চিৎকার করতে থাকা যে নারীর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি একজন প্রযুক্তিবিদ, এলজিবিটি ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী অধিকারকর্মী। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন ‘ফ্রেন্ডলি নেবারহুড ডিনায়েবল অ্যাসেট’ হিসেবে।
আলিয়া রহমান নামে ওই নারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তিনি পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং দীর্ঘদিন ধরে কোডিং ও প্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের নীতির পক্ষে কাজ করছেন এবং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায়—ফেডারেল এজেন্টরা আলিয়া রহমানের গাড়ির জানালা ভেঙে তাকে জোর করে টেনে বের করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক বিক্ষোভ চলাকালে আইসিইর গাড়ি চলাচলে বাধা দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটে রেনে নিকোল গুড নামের এক নারীর গুলিতে নিহত হওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, ওই এলাকার কাছেই।
ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়িচালক আলিয়া রহমান চিৎকার করে বলছিলেন, তিনি ‘শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন’ এবং ‘ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।’ এ সময় একাধিক মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্ট তাকে হাতকড়া পরিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়।
লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ৪৩ বছর বয়সি আলিয়া রহমান মিনিয়াপোলিসে বসবাসরত ‘কমিউনিটি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।’ কর্মজীবনে ফুল স্ট্যাক ডেভেলপার ও ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি একাধিক প্রযুক্তি-সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি কত দিন ধরে মিনিয়াপোলিসে বসবাস করছেন, তা স্পষ্ট নয়। তার সর্বশেষ প্রকাশ্যে পাওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, তিনি আইওয়ার সিডার ফলসে থাকতেন। এক্সে নিজের প্রোফাইলে আলিয়া রহমান নিজেকে উল্লেখ করেছেন—‘ফ্রেন্ডলি নেবারহুড ডিনায়েবল অ্যাসেট’ হিসেবে। তিনি নিউ আমেরিকার ওপেন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের একজন ফেলো ছিলেন। সেখানে তার প্রথম প্রকল্প ছিল পুলিশ কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা এবং সেগুলো কীভাবে নীতিমালার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে।
ওই ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে তার বায়োতে বলা হয়েছে, ‘তার কাজের ভিত্তি তৈরি হয়েছে আইন প্রণয়ন, নির্বাচন ও কমিউনিটি সংগঠনে বর্ণ ও ফৌজদারি বিচারসংক্রান্ত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের জন্য ১৫ বছরের সফটওয়্যার উন্নয়নকাজ এবং অতীতে একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে সরকারি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান উন্নয়নে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে।’
আলিয়া রহমান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই তিনি পরিবারের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে চলে যান। টেক ফর সোশ্যাল জাস্টিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শৈশবে দেখা ‘বিপ্লবী পরিবেশ’ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘আমি একটি দেশকে গড়ে উঠতে দেখেছি। আমি দেখেছি পোশাকশ্রমিকেরা—যাদের বেশির ভাগই নারী—রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে।’
আঞ্চলিক চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে এক বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন যে, তিনি তেহরানে কোনো সামরিক অভিযান চালাতে আগ্রহী নন।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডন ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনো যুদ্ধ চায় না এবং ইরানের পক্ষ থেকেও যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো অবস্থানে হামলা চালানো না হয়, সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ট্রাম্প তেহরানকে আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রদূত মোগাদ্দাম আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানে চলমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জনগণের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও মসজিদে হামলা চালাচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে টেলিফোনে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, এই ফোনালাপে আরাগচি ইরানের সীমান্ত রক্ষায় “দৃঢ়ভাবে” অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এর বিপরীতে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনীতি ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তুরস্কের পক্ষ থেকেও এই সংকট নিরসনে সংলাপের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যেকোনো প্রকার সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে ইস্তাম্বুলে সাংবাদিকদের জানান, “সংকটের সমাধান অবশ্যই সংলাপের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।”
তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান চাইলে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে কিংবা মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে পারে। মূলত ট্রাম্পের নমনীয় সুর এবং আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যস্থতার আহ্বানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানোর একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দক্ষিণ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ৪ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যার ফলে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইউরোপিয়ান-মেডিটেরানিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) রিখটার স্কেলে এই কম্পনের তীব্রতা ৪ দশমিক ২ বলে নিশ্চিত করেছে। শক্তিশালী এই ভূকম্পনটির কেন্দ্রস্থল ছিল দক্ষিণ ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ডিমোনা শহরের নিকটবর্তী অঞ্চলে।
ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড তাৎক্ষণিকভাবে লোহিত সাগর এলাকা এবং দক্ষিণ নেগেভ মরুভূমি জুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করে। এই সতর্কবার্তা জারির পর সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা ভূমি কেঁপে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। দেশটির জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড আদম (এমডিএ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি কিংবা বিশাল মাত্রার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ ঘিরে চলমান উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরব এক দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছে যে, তেহরানের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালাতে ওয়াশিংটন তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি পাবে না। রিয়াদের এই বার্তা কার্যত ইরানের প্রতি সৌদি আরবের নমনীয় অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সৌদি সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা এএফপি ও ডেইলি সাবাহ জানায়, মার্কিন সামরিক অভিযানের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সরাসরি তেহরানকে নিশ্চিত করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন সতর্কতার পরপরই সৌদি আরব আগেভাগেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে নিল। এর বিপরীতে ইরানও এক কড়া বার্তায় জানিয়েছে যে, তাদের ওপর কোনো নতুন আক্রমণ হলে তারা মার্কিন সামরিক ও নৌ-স্থাপনাগুলোর ওপর ভয়াবহ পাল্টা আঘাত হানবে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, সৌদি আরব ইরানকে স্পষ্টভাবে অবহিত করেছে যে তারা কোনো সামরিক অভিযানের অংশ হবে না এবং এ ধরনের অভিযানে সৌদি ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। সরকারের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে, এই অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরানকে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের এমন কঠোর ঘোষণা আঞ্চলিক রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো বৃহৎ সামরিক সংঘাত এড়ানোর সুদূরপ্রসারী কৌশল হিসেবেই রিয়াদ এই শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজার উত্তর অংশের জাবালিয়া এলাকায় বসবাসরত কিশোর ওমর হালাওয়ার জীবনের গল্পটি এখন এক করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ইসরায়েলি আগ্রাসনে ডান পা হারানো ওমর প্রায়ই মনের ভুলে দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। তার শরীর ভুলে যায় যে তার একটি পা নেই। জাবালিয়া এলাকায় তাদের অস্থায়ী শিবিরের পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পা। নিয়ম করে প্রতিদিন ওমর সেই কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকে, কখনও তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। নিজের এই পঙ্গুত্ব নিয়ে তার মনে এখন আর আফসোস নেই, বরং জন্ম নিয়েছে এক গভীর হতাশা ও ঘৃণা। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই কিশোর অকপটে বলেছে, তার আগেই তার পা জান্নাতে চলে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল তিন মাস আগে, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর। তখন যুদ্ধবিরতি চলছিল, কিন্তু সেই সুযোগের আড়ালেই ইসরায়েল স্থল হামলা চালায়। সেদিন অন্য সবার মতো ওমরও পানি আনতে রাস্তায় বেরিয়েছিল। সঙ্গে ছিল তার ১১ বছর বয়সী বোন লায়ান, ১৩ বছরের চাচাতো ভাই মোয়াথ হালাওয়া এবং সমবয়সী বন্ধু মোহাম্মদ আল সিকসিক। বাড়ির কাছেই একটি পানির ট্যাঙ্কার এসেছিল। ওমর ও তার সঙ্গীরা নিজেদের নিরাপদ ভেবে দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। এই হামলায় ওমরের চাচাতো ভাই ও বন্ধু ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ওমর ও তার বোন লায়ান প্রাণে বেঁচে গেলেও ওমরকে তার ডান পা হারাতে হয়। ওমরের মা ইয়াসমিন হালাওয়া জানান, অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরেই ওমর তার বন্ধুদের কথা জানতে চেয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে তারা আর বেঁচে নেই।
শারীরিক পঙ্গুত্বের পাশাপাশি মানসিক ট্রমা ওমর ও তার বোন লায়ানকে গ্রাস করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর সময় লায়ান জানালার কাঁচ ভেঙে আহত হয়েছিল। পরবর্তীতে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় রাস্তায় মাথাবিহীন মরদেহ দেখে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মা ইয়াসমিন জানান, লায়ান এখন ভয়ে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলে এবং ওমর সামান্য শব্দেও চমকে ওঠে। টাকার অভাবে তারা উত্তর গাজাতেই মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে তারা অন্তত ১৫ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ওমর প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ওঠে এবং তার চুল পড়ে যাচ্ছে। তবুও সে স্বপ্ন দেখে একটি কৃত্রিম পা পাওয়ার, যা দিয়ে সে আবার ফুটবল খেলবে এবং সমুদ্রে সাঁতার কাটবে।
ওমরের মতো একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে গাজার হাজারো শিশুকে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ফিলিস্তিনি শিশুরা বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানে বসবাস করছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ২০ হাজারই শিশু। আহত হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার শিশু, যাদের অনেকের জীবন চিরতরে বদলে গেছে। এছাড়া গাজায় অন্তত ৩৯ হাজার শিশু তাদের বাবা অথবা মা কিংবা উভয়কেই হারিয়ে এতিম হয়েছে। আধুনিক ইতিহাসে এমন এতিম সংকট আর দেখা যায়নি। ইউনিসেফের মুখপাত্র কাজেম আবু খালাফ জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পরেও ৯৫ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে এবং চার হাজারের বেশি শিশুর জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়া প্রয়োজন।
ওমরের মতোই আরেক ভুক্তভোগী ১৩ বছরের কিশোরী রহাফ আল নাজ্জার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর-পশ্চিম গাজার সুদানিয়া এলাকায় খাবার আনতে গিয়ে ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টারের গুলিতে তার দুই পা বিদ্ধ হয়। অপুষ্টি ও তীব্র শীতের মধ্যে সে এখন নিদারুণ যন্ত্রণায় দিন পার করছে। তার মা বুথাইনা আল নাজ্জার জানান, অর্থাভাবে তিনি মেয়ের জন্য পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে পারেন না। রহাফ নিজের চোখের সামনে বাবাকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছে। আহত বাবাকে সে হামাগুড়ি দিয়ে তাবুর ভেতরে আনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বাবার শেষ কথাটুকু শুনেই তাকে বিদায় দিতে হয়। রহাফ এখন আবার স্কুলে ফেরার এবং ছবি আঁকার স্বপ্ন দেখে।
গাজার শিক্ষাব্যবস্থাও পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। গাজার শিক্ষা বিভাগের পরিচালক জাওয়াদ শেখ-খলিল জানান, এই যুদ্ধে তারা ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী হারিয়েছেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৯০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তাবু টাঙিয়ে প্রায় ৪০০টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা হলেও ইসরায়েল খাতা, কলম বা চকের মতো শিক্ষা উপকরণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বাহজাত আল আখরাস সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় স্কুল থেকে দূরে থাকা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ট্রমায় আক্রান্ত অনেক শিশুর মধ্যে স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের সমস্যা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যাচ্ছে।
ইরান কর্তৃপক্ষ সাময়িক নিষেধাজ্ঞার পর তাদের আকাশসীমা পুনরায় খুলে দিয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংক্রান্ত তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪ বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের আকাশসীমায় চলাচলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত নোটিশ বা নোটামের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর ফলে এখন একাধিক বিমানকে তেহরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে এবং ফ্লাইট চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইরান সরকার এর আগে আন্তর্জাতিক বেসামরিক ফ্লাইট ছাড়া সব ধরনের বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। সেই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তেহরানের আকাশসীমা সাধারণ বিমানের জন্য বন্ধ থাকবে। শুধুমাত্র বেসামরিক কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি পাওয়া নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক আগমন ও বহির্গমন ফ্লাইট চলাচলের সুযোগ পেয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আকাশসীমা বন্ধের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশটিতে তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যেই আকাশসীমা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি এল।
এদিকে ইরানের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়েছে বলে তাকে অবহিত করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। বিক্ষোভকারীদের প্রতি নিজের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অন্যদিকে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর ইচ্ছাকৃত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা ইরান সরকারকে সংযম প্রদর্শন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রয়োজনে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে এই জোট। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন যে, এই বিক্ষোভ ও অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন, যদিও ইরান সরকার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক এবং তেল সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তেল বিক্রি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে ইতোমধ্যেই ৫০ কোটি ডলার মূল্যের তেল বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ৪ জানুয়ারি ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক বিশেষ সেনা অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের সরকারি বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সেনাবাহিনী। বর্তমানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির একটি ফেডারেল কারাগারে বন্দি আছেন। মার্কিন প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সরবরাহের অভিযোগে আদালতে মাদুরো দম্পতির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের মাত্র তিন দিন পর অর্থাৎ ৭ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল আনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, প্রথম চালান হিসেবে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে আনা হচ্ছে। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় আসা তেলের প্রথম চালান বিক্রি করেই ৫০ কোটি ডলার আয় নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর গত ৯ জানুয়ারি শুক্রবার ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে বিভিন্ন মার্কিন তেল কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বৈঠকের পর তিনি ঘোষণা দেন যে, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে শীঘ্রই অন্তত ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসবে বলে তিনি আশা করছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরোক্ষভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেও অধিকাংশ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টিতে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া দেননি। বিশেষ করে মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সন মবিলের শীর্ষ নির্বাহী ড্যারেন উডস সাংবাদিকদের কাছে বিনিয়োগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয় এবং এটি বিনিময়ের অযোগ্য। তার মতে, সেখানে বিনিয়োগ করতে হলে আগে অনেক আইনি এবং বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। এসব নিশ্চিত হলেই কেবল বোঝা যাবে যে বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিগুলো কী রিটার্ন পাবে।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দেশ ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএস অ্যানার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে অন্তত ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুদ রয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের এক পঞ্চমাংশই রয়েছে এই দেশটিতে। তবে বিপুল মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম, যা গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল। ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল প্রাকৃতিকভাবে ভারী ও ঘন হওয়ায় এটি উত্তোলন ও পরিশোধনে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন হয়। তবে এই তেল পরিশোধন করে উৎকৃষ্ট মানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট এবং কারখানাসহ ভারী যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থানের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে কোপেনহেগেন। গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের সেনা উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডেনমার্ক সরকার। এরই অংশ হিসেবে ডেনমার্ক সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী কমান্ডের বেশ কয়েকটি ইউনিটকে সেখানে মোতায়েনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ডেনিশ সংবাদমাধ্যম ডিআর-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সেনাবাহিনীর এই বিশেষ ইউনিটগুলোর প্রধান কাজ হবে গ্রিনল্যান্ডে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে সেনা মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সামরিক অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণ করা। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ডেনমার্কের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল এনহেডস্লিস্টেন পার্টি। দলটির এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা গত সপ্তাহেই সরকারের কাছে এমন পদক্ষেপের অনুরোধ করেছিলেন। তিনি আরও জানান, ইউরোপের অন্যান্য দেশও গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তার মতে, গ্রিনল্যান্ডে যদি কোনো বড় শক্তি হামলা বা আগ্রাসন চালাতে চায়, তবে এই সেনা মোতায়েন হবে সেই শক্তির উদ্দেশে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অংশ হলেও রাজনৈতিকভাবে ডেনমার্কের অধীনস্থ বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। প্রায় ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের কিছু বেশি, যাদের সিংহভাগই ইনুইট জাতিগোষ্ঠীর। দ্বীপটি বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকলেও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এর ভূগর্ভে জ্বালানি তেলসহ বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। এখানকার বাসিন্দারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক হিসেবে গণ্য হন।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশে পরিণত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, স্থানীয় জনগণ চাক বা না চাক, যুক্তরাষ্ট্র এই ইস্যুতে পদক্ষেপ নেবে। ট্রাম্পের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে রাশিয়া বা চীন তা দখল করে নিতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। যদিও ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তবুও ট্রাম্প মনে করেন, কেবল চুক্তি বা ঘাঁটি দিয়ে নিরাপত্তা বা মালিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন রুখতে যুক্তরাষ্ট্রকেই দ্বীপটির দায়িত্ব নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া তরুণ বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির ফাঁসি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণের মৃত্যুদণ্ড বুধবার কার্যকর করার কথা ছিল। তবে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হেনগাও’ জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ এই দণ্ড কার্যকর করা থেকে বিরত থেকেছে। এরফানের আত্মীয় সোমায়েহ নিশ্চিত করেছেন যে দণ্ডটি কার্যকর করা হয়নি, তবে এটি পুরোপুরি বাতিলও করা হয়নি। ফলে পরিবারটি এখনো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এবং তারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
পেশায় একজন দোকানব্যবসায়ী এরফান সোলতানি ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠে কারাজ এলাকায় বসবাস করতেন। মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আটকের পর মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ সাজা ঘোষণা করা হয়। বিচার ব্যবস্থার এমন তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
রাজধানী তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শহর কারাজ থেকে যখন এরফানকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ওই এলাকায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং ক্র্যাকডাউন শুরু করে। গত সপ্তাহে দেশজুড়ে যে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এরফান তাদেরই একজন। আটকের পর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এরফানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১১ জানুয়ারি ইরানি কর্মকর্তারা এরফানের পরিবারকে ফাঁসির সাজার বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। অ্যামনেস্টির অভিযোগ, ইরানি কর্তৃপক্ষ ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বিচার ও নির্বিচারে ফাঁসি কার্যকর করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এরফানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হলেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও পরিবারের শঙ্কা এখনো কাটেনি।
ইরানে চলমান তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে তেহরানে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য। বুধবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ব্রিটিশ নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে নিরাপত্তা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, চলমান পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ফলে দূতাবাসের সকল কর্মকর্তা ও কর্মীকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। আপাতত দূর থেকে বা রিমোটলি দূতাবাসের অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ।
বিবৃতিতে ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের আপাতত ইরানে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া যারা বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন, তাদেরকে যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে সাবধানে চলাফেরা করতে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা সজাগ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই আন্দোলনের মূল সূত্রপাত দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতিকে কেন্দ্র করে। বছরের পর বছর ধরে মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে ইরানি রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলেছে।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ইরানের সাধারণ জনগণ হিমশিম খাচ্ছে। এই দুরবস্থার প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। মূলত সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় প্রতিটি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছে।
বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখার পাশাপাশি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চলমান এই ভয়াবহ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখনো থমথমে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে ফক্স নিউজ। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এই পদক্ষেপ কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিং পদ্ধতি পুনরায় মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে। এ তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে রাশিয়া ও ইরানের নামও রয়েছে। তবে এতে ভারতের নাম নেই। মূলত আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর সে দেশের সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন- এমন আশঙ্কায় ‘পাবলিক চার্জ’ আইনের অধীনে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়।
ফক্স নিউজ ডিজিটালের হাতে আসা স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি মেমোতে দেখা গেছে, কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বিদ্যমান আইনের অধীনে এসব দেশের ভিসা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভাগটি বর্তমানে তাদের স্ক্রিনিং এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া পুনরায় মূল্যায়ন করছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্বজুড়ে মার্কিন কনস্যুলারগুলোতে পাঠানো একটি বার্তায় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয় তারা যেন ইমিগ্রেশন আইনের ‘পাবলিক চার্জ’ বিধানের অধীনে কঠোর নতুন নিয়মটি প্রয়োগ করেন।
নতুন নির্দেশনায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভর করতে পারে এমন সব আবেদনকারীকে ভিসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আবেদনকারীর স্বাস্থ্য, বয়স, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, আর্থিক অবস্থা এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে কিনা- এমন সব বিষয় বিবেচনা করা হবে। এর ফলে বয়স্ক বা অসুস্থ আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে। এছাড়া যাদের অতীতে সরকারি নগদ সহায়তা গ্রহণের ইতিহাস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে- আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ, বার্বাডোজ, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ দ্য কঙ্গো, ডোমিনিকা, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, রিপাবলিক অফ দ্য কঙ্গো, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডাইনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তাঞ্জানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান এবং ইয়েমেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনালাপে এ আহ্বান জানান তিনি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এর আগে, ইরানে বিক্ষোভের পেছনে কার আছে, সে বিষয়টিও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন ফিদান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির প্রেক্ষাপটে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে হাকান ফিদান বলেন, ইরানের বিক্ষোভগুলো ‘বিদেশ থেকে দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা প্রভাবিত এবং তারাই উসকানি দিচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে তিনি ইসরায়েলের একটি গোয়েন্দা সংস্থার নাম উল্লেখ করেন।
ফিদান বলেন, ‘মোসাদ এটি গোপনও করছে না। তারা নিজেদের ইন্টারনেট ও টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাচ্ছে।’