ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে। সংসদের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৪০ আসনে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। আর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পেয়েছে ৯৯টি আসন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গতকাল বুধবার এইফল প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, অন্যান্য দলের মধ্যে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) পেয়েছে ৩৭টি, তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি, ডিএমকে ২২টি, তেলেগু দেসম পার্টি (টিডিপি) ১৬টি, জনতা দল (জেডি-ইউ) ১২টি, শিবসেনা (উদ্ভব) ৯টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপিএসপি) ৮টি ও শিবসেনা (এসএইচএস) ৭টি আসন।
লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) পাঁচটি আসন পেয়েছে। চারটি করে আসনে জয় পেয়েছে ওয়াইএসআরসিপি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট)-সিপিআই (এম)। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল), আম আদমি পার্টি (আপ) ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) তিনটি করে আসন পেয়েছে।
দুটি করে আসন পেয়েছে জনসেনা পার্টি (জেএনপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট) (লিবারেশন)-সিপিআই (এমএল) (এল), জনতা দল-জেডি (এস), ভিসিকে, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই), রাষ্ট্রীয় লোক দল (আরএলডি) ও জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএন)। এছাড়া বেশ কয়েকটি দল একটি করে আসনে জয় পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন। চূড়ান্ত ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স-এনডিএ জোট মোট আসন পেয়েছে ২৮৬টি। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট পেয়েছে মোট ২০২টি আসন।
এর আগে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে ৩০৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। তখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছিল ৩৫২টি আসন। একক দল হিসেবে এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিজেপি। তবে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ২৭২টি আসনে জিততে পারেনি তারা। তাই সরকার গঠনে এনডিএ জোট মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের।
২০১৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে ৫২টি আসন পেয়েছিল। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৯৪টি আসন। লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে সরকার গঠনে একটি দলকে ২৭২টি আসনে জয় পেতে হয়।
পবিত্র রমজান মাসে টানা ১২ দিন আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখায় ইসরায়েলের প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের আট দেশ। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসও।
বুধবার (১১ মার্চ) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, জেরুজালেমের পুরোনো শহর ও সেখানে অবস্থিত উপাসনালয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে ইসরাইলের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং ধর্মীয় স্থানে অবাধ প্রবেশাধিকারের নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আল-আকসা মসজিদ বা আল-হারাম আল-শরিফ এলাকায় ইসরাইলের এই পদক্ষেপ অবৈধ ও অযৌক্তিক। মন্ত্রীরা এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা জানান।
তারা আরও বলেন, দখলকৃত জেরুজালেম কিংবা সেখানকার ইসলামিক ও খ্রিস্টান ধর্মীয় স্থানের ওপর ইসরাইলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আল-আকসা মসজিদের পুরো এলাকা শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত। জর্ডানের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জেরুজালেম ওয়াকফ ও আল-আকসাবিষয়ক দপ্তরই এ স্থানের বৈধ ও একমাত্র প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসরায়েলকে অবিলম্বে আল-আকসা মসজিদের ফটক বন্ধ রাখা বন্ধ করার, জেরুজালেমের পুরোনো শহরে প্রবেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এবং মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের চলমান লঙ্ঘন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান করা হয়।
এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী বলছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে পুরোনো শহরে প্রবেশ ও ইবাদতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখা ফিলিস্তিনিদের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা এ তথ্য জানায়।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এটি ইতিহাসে একটি বিপজ্জনক নজির এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে ভারতীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের দুটি তেলবাহী জাহাজ ‘পুষ্পক’ এবং ‘পরিমল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো এখনো নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি ছিল দুই নেতার মধ্যে তৃতীয়বারের মতো আলোচনা, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়েও কথা হয়।
এদিকে সরকারের অনুরোধে ইরান আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশের জন্য তেলবাহী জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হবে না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌ করিডরটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সদর দপ্তর ও দুটি বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ড্রোন হামলার লক্ষ্য ছিল তেল আবিবে অবস্থিত শিন বেতের প্রধান কার্যালয় এবং দুটি সামরিক বিমান ঘাঁটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (আইআরএনএ) জানিয়েছে, হামলাগুলো চালানো হয়েছে ‘পালমাচিম’ ও ‘ওভদা’ বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে।
এর মধ্যে ‘পালমাচিম’ বিমান ঘাঁটি ভূমধ্যসাগর উপকূলের কাছে ইয়াভনে শহরের পশ্চিমে অবস্থিত, আর ‘ওভদা’ বিমান ঘাঁটি ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। তবে এ হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইল কোনো মন্তব্য করেনি।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে আরও ৬ জাহাজে হামলা
ইরাকের জলসীমায় তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরকবোঝাই ইরানি বোটের হামলায় গত বুধবার এক ক্রু সদস্য নিহত ও দুটি জাহাজ ভস্মীভূত হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে আরও চারটি জাহাজে প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা) হামলার পরপরই এ ঘটনা ঘটল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর সাম্প্রতিকতম এই হামলা ইরান যুদ্ধের এক বড় ধরনের বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্য) হামলার শিকার হওয়া জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৬টিতে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে পারস্য উপসাগর ও সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ রুট দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের জন্য ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি তেল রপ্তানি বন্ধের চেষ্টা করে, তবে ওয়াশিংটন আরও কঠোরভাবে দেশটিতে আঘাত হানবে। তিনি তেল কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, ‘ইরানের নৌবাহিনীর প্রায় সবটাই এখন ধ্বংস হয়ে গেছে।’
ইরাকি বন্দর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) গভীর রাতে হামলার শিকার হওয়া জাহাজ দুটি হলো মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘সেফ সি বিষ্ণু’ ও মাল্টার পতাকাবাহী ‘জেফিরোস’। জাহাজ দুটি ইরাক থেকে জ্বালানি পণ্য বোঝাই করেছিল।
ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা সোমো জানিয়েছে, ‘সেফ সি বিষ্ণু’ জাহাজটি তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ একটি ইরাকি কোম্পানি ভাড়া করেছিল। আর ‘জেফিরোস’ জাহাজ বসরা গ্যাস কোম্পানির জ্বালানি পণ্য নিয়ে যাচ্ছিল।
সোমো আরও জানিয়েছে, ইরাকি জলসীমার ভেতর এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের সময় দুটি জাহাজই আক্রান্ত হয়।
ভারতে প্রথমবারের মতো নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘ ১৩ বছর শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকা দিল্লির যুবক হরীশ রানাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা চিকিৎসা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই সিদ্ধান্তকে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরীশ রানার বয়স এখন ৩২ বছর। তিনি এক সময় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের পাঁচতলা থেকে পড়ে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার পর তার মেরুদণ্ডে মারাত্মক ক্ষতি হয়। এরপর থেকে তিনি কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তার শরীরের চারটি অঙ্গই কার্যত অচল হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের ভাষায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি এমন এক অবস্থায় ছিলেন যেখানে বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার কোনো অনুভূতি বা সচেতনতা ছিল না। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও তার কোনো বোধ ছিল না। তিনি নিজে নড়াচড়া করতে পারতেন না। কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে তার শ্বাসপ্রশ্বাস এবং শরীরের ন্যূনতম কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে হরীশের বাবা মা আদালতের দ্বারস্থ হন। তারা আদালতের কাছে আবেদন জানান যে তাদের ছেলেকে কৃত্রিমভাবে জীবিত রাখার চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া হোক। পরিবারের দাবি ছিল দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এক ধরনের যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও বাস্তব সম্ভাবনাও নেই।
এই আবেদন সামনে আসার পর বিষয়টি ভারতের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কারণ ভারতে প্রত্যক্ষ বা সক্রিয় ইউথানেশিয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ চিকিৎসকের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর ব্যবস্থা করা আইনসম্মত নয়। তবে পরোক্ষ বা প্যাসিভ ইউথানেশিয়া নিয়ে আগে থেকেই কিছু সীমিত আইনি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্যাসিভ ইউথানেশিয়া বলতে বোঝায় রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত জীবনদায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া অথবা বন্ধ করে দেওয়া। এই মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয়।
নয়ডা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসকদের একটি বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করা হয়। তাদের দায়িত্ব ছিল হরীশ রানার শারীরিক অবস্থা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা এবং আদালতকে একটি রিপোর্ট দেওয়া। মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টে জানানো হয় যে হরীশ রানার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় রয়েছেন। তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কার্যত নেই।
এই রিপোর্ট এবং কেন্দ্র সরকারের মতামত বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিয়ে একাধিক পর্যায়ে শুনানি চালায়। গত বছরের শুনানিতে আদালত এই মামলাকে অত্যন্ত কঠিন সমস্যা বলে উল্লেখ করেছিল। আদালতের মতে এটি কেবল একটি আইনি প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানবিকতা চিকিৎসা নীতি এবং জীবনের মর্যাদা।
অবশেষে গত মঙ্গলবার বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ এই মামলার রায় ঘোষণা করে। আদালত হরীশ রানাকে কৃত্রিমভাবে জীবিত রাখার চিকিৎসা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারপতিরা সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক হ্যামলেটের একটি লাইন উল্লেখ করেন। সেই বিখ্যাত বাক্যটি হল টু বি অর নট টু বি।
আদালত ইঙ্গিত দেয় জীবনের অস্তিত্ব এবং মৃত্যুর প্রশ্ন কখনও কখনও গভীর নৈতিক এবং মানবিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে ভারতে সক্রিয় ইউথানেশিয়া এখনও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই রায় সেই আইনের কোনও পরিবর্তন ঘটায় না। তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এবং তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
আদালত আরও জানিয়েছে এই মামলায় দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত হরীশ রানার চিকিৎসার অবস্থা এবং দীর্ঘ সময় ধরে তার শারীরিক পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত রোগীর পক্ষে কোনটি বেশি মানবিক এবং কল্যাণকর সেই বিষয়টি। এছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণার সময় সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকারকে একটি আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে। আদালতের মতে নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে স্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে এমন জটিল পরিস্থিতিতে পরিষ্কার নির্দেশনা পাওয়া যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এই রায় ভারতের চিকিৎসা নীতি এবং মানবাধিকার বিষয়ক আলোচনায় নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।
একই সঙ্গে এটি পরিবার চিকিৎসক এবং আদালতের সামনে জীবনের শেষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। হরীশ রানার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যে মানসিক সংগ্রামের মধ্যে ছিল এই রায় তাদের জন্য এক ধরনের পরিসমাপ্তি নিয়ে এল বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতে এই প্রথম কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হল। ফলে এই রায় দেশজুড়ে চিকিৎসা নৈতিকতা মানবাধিকার এবং আইনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।
ইরান বনাম ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ বাহিনীর মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ৪০,০০০-এর বেশি মার্কিন নাগরিক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এতসংখ্যক নাগরিককে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
সহকারী সচিব ডিলান জনসন জানিয়েছেন যে গত সোমবার (৯ মার্চ) পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার যা গত ২৪ ঘণ্টায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য মার্কিন প্রশাসন ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এখন পর্যন্ত দুই ডজনেরও বেশি বিশেষ চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে।
এ ছাড়া প্রায় ২৭,০০০ আমেরিকানকে সরাসরি নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং যাতায়াত-সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় বিশেষ বাস ও চার্টার ফ্লাইটের মাধ্যমে উদ্ধার কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে ডিলান জনসন জানান, অঞ্চলের বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ১,২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানও দমে থাকেনি। ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ডিলান জনসন সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেন, ‘স্টেট ডিপার্টমেন্ট মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে ইচ্ছুক প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে। নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই উদ্ধার অভিযান আরও কয়েক দিন চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি চলমান যুদ্ধের ময়দানে এক হামলায় আহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তিনি গুরুতর জখম হননি এবং বর্তমানে নিবিড় নিরাপত্তায় সুস্থ আছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ও সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ইউসুফ পেজেশকিয়ানও মোজতবা খামেনির সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন।
ইউসুফ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জানান, তিনি শীর্ষ নেতার আহত হওয়ার খবর শোনার পরপরই নির্ভরযোগ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, মোজতবা খামেনি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে তাঁর আঘাতের ধরণ বা এই হামলার বিস্তারিত জানানো হয়নি, তবুও এই ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি আরও জটিল মোড় নিয়েছে।
প্রয়াত সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় সন্তান মোজতবা খামেনিকে গত রবিবার এক জরুরি অধিবেশনে ৮৮ জন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বাসভবনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ এক প্রলয়ংকরী বিমান হামলায় আলি খামেনির মৃত্যুর পর নেতৃত্বের এই শূন্যতা তৈরি হয়। ওই হামলায় খামেনি পরিবারের আরও বেশ কয়েকজন সদস্যসহ উচ্চপদস্থ অনেক সামরিক কর্মকর্তা প্রাণ হারান। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে মোজতবার কাঁধেই ন্যস্ত হয় দেশের নেতৃত্বের ভার।
মোজতবা খামেনি ব্যক্তিগত জীবনে ইতিপূর্বে কখনও কোনো সরকারি দায়িত্বে ছিলেন না কিংবা কোনো নির্বাচনেও অংশ নেননি। তবে ৫৬ বছর বয়সী এই নেতা তাঁর বাবার সময় থেকেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। বিশেষ করে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শক্তি ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্য ও নিয়ন্ত্রণ তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইসরায়েলের ওপর পাল্টা আক্রমণ জোরদারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বিশ্বকে নিজের অনমনীয় মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলেও চলমান যুদ্ধের আবহে ইরানের এই শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংগতিনাশক সংঘাত এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১০ দিনের টানা লড়াইয়ে অন্তত ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে জানান, আহত সেনাসদস্যদের মধ্যে অন্তত আটজনের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে এই হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে। গুরুতর আহতদের বর্তমানে বিশেষায়িত ব্যবস্থায় উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা হলেও বিস্ফোরণের তীব্রতার কারণে অনেকের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মস্তিষ্কে বড় ধরণের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেহরান অত্যন্ত মারমুখী অবস্থানে রয়েছে এবং তারা কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত তেলের স্থাপনা, বিমানবন্দর, হোটেল এবং কূটনৈতিক মিশনগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরানের পক্ষ থেকে চালানো এসব হামলায় কুয়েত ও সৌদি আরবে ইতিমধেই সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের কৌশলগত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরণের অস্থিরতা শুরু হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর বড় ধরণের হামলা ও হতাহত হওয়ার খবর মিললেও পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইরানের সক্ষমতাকে খাটো করেই দেখছেন। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন মন্তব্য করেছেন যে ইরান হয়তো লড়ছে, কিন্তু তারা আদতে মার্কিনদের কল্পনার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। তবে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উত্তাপ কমাতে কোনো পক্ষই ছাড় দিচ্ছে না। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে ইরানে তাঁদের হামলার তীব্রতা অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিপরীতে ইরানের পক্ষ থেকেও কোনো প্রকার নমনীয়তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না; দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ যেকোনো ধরণের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফ জানিয়েছেন যে তাঁরা ট্রাম্পের কোনো ধরণের হুমকিতে পিছু হটবেন না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কড়া বার্তায় ইরানকে চরম সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রণালিতে পেতে রাখা প্রতিটি মাইন দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। এই পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে এমন নজিরবিহীন সামরিক ধ্বংসলীলার শিকার হতে হবে যা ইতিপূর্বে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এমন বিপরীতমুখী অবস্থান পুরো বিশ্বকে এক নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা ও প্রলয়ংকরী যুদ্ধের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের লাগাম টেনে ধরতে দ্রুত আলোচনার পরিবেশ তৈরি না হলে পরিস্থিতির আরও শোচনীয় রূপ নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইরানের পক্ষ থেকে হামলার শিকার হওয়া অবস্থায় তেহরানের পক্ষে কোনও ধরনের মধ্যস্থতা করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কাতার। বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ আল-খুলাইফি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন।
আল-খুলাইফি উল্লেখ করেন, কাতার ও ওমান উভয় দেশই ইরান ও পশ্চিমের মধ্যে ‘সেতুবন্ধন’ তৈরির কাজ করে আসছিল। তা সত্ত্বেও এই দুই দেশ হামলার শিকার হয়েছে।
কাতারি এই মন্ত্রী বলেন, হামলার মুখে থেকে আমাদের পক্ষে এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। এটি ইরানকে বুঝতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো ইরানের শত্রু নয়, কিন্তু ইরানিরা এই বিষয়টি বুঝতে পারছে না।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান সংঘাত এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে জাহাজ চলাচল স্থায়ীভাবে স্তব্ধ করতে ইরান সমুদ্রের তলদেশে মাইন মোতায়েন করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা উঠে আসার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে। কৌশলগত এই জলপথে ইরানি নৌবাহিনীর এমন তৎপরতায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১০ মার্চ) তাদের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় সফল অভিযান চালিয়েছে। ওই অভিযানে ইরানের অন্তত ১৬টি মাইন মোতায়েনকারী জাহাজ ‘ধ্বংস’ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এছাড়া পেন্টাগন জানিয়েছে, তাঁরা মূলত ইরানের মাইন স্থাপনকারী বিশেষ নৌযান এবং মাইন মজুত করার গুদামগুলো লক্ষ্য করে লক্ষ্যভেদী বিমান হামলা পরিচালনা করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে সব ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই নজিরবিহীন সামরিক উত্তজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইরান যদি প্রণালিতে কোনো মাইন পেতে থাকে, তবে তা যেন অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। ট্রাম্প বলেন, যদিও আমাদের কাছে সব সময় নিখুঁত তথ্য পৌঁছাচ্ছে না, তবে তেহরান যদি আমাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়, তবে তাদের অপূরণীয় সামরিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। ট্রাম্পের এই সরাসরি হুমকি প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে ওয়াশিংটন যে কোনো মাত্রার যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাঁড়াশি আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের অনমনীয় অবস্থান আরও শক্ত করেছে। দেশটির উপকূল ঘেঁষা এই পথটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল স্তম্ভ, কারণ এখান দিয়েই প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমান সংঘাতের ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কায় রয়েছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মাইন স্থাপনের চেষ্টাটি মূলত মার্কিন ও ইসরায়েলি নৌবাহিনীর চলাচলকে সীমিত করার একটি কৌশল। তবে ট্রাম্পের এই পাল্টা চ্যালেঞ্জ এবং সাগরে ক্রমাগত হামলার ফলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে তেলের উচ্চমূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা কতদিন স্থায়ী হয় এবং তেহরান ট্রাম্পের এই চূড়ান্ত সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করে কি না, সেটিই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন সময়ের সাথে সাথে বিধ্বংসী এক মহাপ্রলয়ের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।
ইরানে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে এ যাবৎকালের অন্যতম ভয়াবহ এবং কঠোরতম সরকারি পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানে যে মাত্রার ইন্টারনেট বিভ্রাট চলছে, তা বিশ্বজুড়ে রেকর্ড করা যেকোনো সরকারি ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্যে অন্যতম তীব্র।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের নাগরিকদের বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় অফলাইনে বা ইন্টারনেট সংযোগবিহীন অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। নেটব্লকসের তথ্যানুসারে, এটি ইরানের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউন। এর আগে কেবল জানুয়ারি মাসের বিক্ষোভের সময় দেশটিতে এর চেয়ে দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সরকার দেশজুড়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বিক্ষোভ দমনে পরিকল্পিতভাবে এই ব্ল্যাকআউট কার্যকর করেছে। নেটব্লকস তাদের পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছে যে এই শাটডাউন কেবল সাধারণ যোগাযোগকেই ব্যাহত করছে না, বরং দেশটির অর্থনীতি এবং ডিজিটাল অধিকারের ওপর এক মারাত্মক আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিমাপে ইরানের এই অবস্থান এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌ করিডরটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের অনুরোধে ইরান আশ্বাস দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাংলাদেশের তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজে কোনো বাধা দেওয়া হবে না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তা জানাতে অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধরত দেশটি। তাই দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর মধ্যে বৈঠক হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন ও ভারত। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা নেওয়ার জন্য সরকার যোগাযোগ রাখছে।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজন হলে চীন সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
ইরান সোমবার (৯ মার্চ) রাতভর ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপণায় ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। হামলায় তেলআবিবের স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ধ্বংস করার দাবি তেহরানের। ইরানের এলিট ফোর্স আইআরজিসি জানিয়েছে, তেলআবিবের স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রটি ছিল ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধবিমানের বিমানঘাঁটির অন্যতম প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র।
একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের আত্মঘাতী ড্রোন হামলায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়। খবর তাসনিম নিউজের। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই স্থাপনাটি ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধবিমানের স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করেছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির হত্যার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন সিনিয়র সামরিক কমান্ডার এবং বেসামরিক ব্যক্তিও ছিলেন।
ইরানজুড়ে সামরিক ও বেসামরিক উভয় স্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে উল্লেখযোগ্য হতাহত হয়েছে এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করছে। ইসরায়েলের দখলকৃত অঞ্চল এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তরঙ্গ দিয়ে আমেরিকান এবং ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে।
অন্যদিকে, ইরানের ৫ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু গত ১০ দিনে ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়েছে।
সেন্টকোম থেকে দেওয়া বিবৃতি অনুসারে, ধ্বংস হওয়া এসব সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান রয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ।
একই হামলায় ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গিভর আহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে ইরানের গতিবিধির ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনায় তিনি সরাসরি তেহরানকে দায়ী করে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল সম্মেলনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে বলেন যে, ইরান আরব দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার মূলে হস্তক্ষেপ করছে এবং অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করতে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নজিরবিহীন বিষয় হলো, বর্তমান সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে সরাসরি আক্রমণ না করে তিনি মূলত ইরানের ভূমিকা নিয়েই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যা আসাদ শাসনামলের চিরচেনা ইরান-ঘনিষ্ঠ নীতি থেকে সিরিয়ার একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে ইরাক ও লেবাননের নেতৃত্বের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে লেবাননের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সিরিয়া তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। শারা মনে করেন, লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত অপরিহার্য। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শারা’র নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ ও ইরানি মিলিশিয়ারা লড়েছিল, যা বর্তমান সম্পর্কের এই ফাটল ও প্রেসিডেন্টের অনমনীয় অবস্থানের পেছনে কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের নেপথ্যে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বড় ধরণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়াকে নতুন করে গড়তে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রায় ২১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এই বিপুল পরিমাণ তহবিল ও দেশ পুনর্গঠনে পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সমর্থন ও ফান্ড পেতে সিরিয়া এখন একটি ‘দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল’ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ইমেজ তৈরি করতে মরিয়া। সে কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা এড়িয়ে বরং ইরান ও তার প্রক্সিদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিচ্ছে দামেস্ক।
এছাড়া বর্তমান নেতৃত্বের সাথে সৌদি আরব ও কাতারের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সিরিয়ায় সৌদি বিনিয়োগের এক বিশাল দ্বার খুলে গেছে, যার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ৫ বিলিয়ন ডলারের আলেপ্পো বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প অন্যতম। সম্প্রতি সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রাণ হারানোয় সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও শোক জানানোর পাশাপাশি তেহরানের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছে। সব মিলিয়ে সিরিয়ার এই নতুন অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি এখন আর তেহরানের একক বলয়ে নেই, বরং নিজেদের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করছে।