ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে। সংসদের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৪০ আসনে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। আর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পেয়েছে ৯৯টি আসন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গতকাল বুধবার এইফল প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, অন্যান্য দলের মধ্যে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) পেয়েছে ৩৭টি, তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি, ডিএমকে ২২টি, তেলেগু দেসম পার্টি (টিডিপি) ১৬টি, জনতা দল (জেডি-ইউ) ১২টি, শিবসেনা (উদ্ভব) ৯টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপিএসপি) ৮টি ও শিবসেনা (এসএইচএস) ৭টি আসন।
লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) পাঁচটি আসন পেয়েছে। চারটি করে আসনে জয় পেয়েছে ওয়াইএসআরসিপি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট)-সিপিআই (এম)। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল), আম আদমি পার্টি (আপ) ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) তিনটি করে আসন পেয়েছে।
দুটি করে আসন পেয়েছে জনসেনা পার্টি (জেএনপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট) (লিবারেশন)-সিপিআই (এমএল) (এল), জনতা দল-জেডি (এস), ভিসিকে, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই), রাষ্ট্রীয় লোক দল (আরএলডি) ও জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএন)। এছাড়া বেশ কয়েকটি দল একটি করে আসনে জয় পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন। চূড়ান্ত ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স-এনডিএ জোট মোট আসন পেয়েছে ২৮৬টি। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট পেয়েছে মোট ২০২টি আসন।
এর আগে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে ৩০৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। তখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছিল ৩৫২টি আসন। একক দল হিসেবে এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিজেপি। তবে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ২৭২টি আসনে জিততে পারেনি তারা। তাই সরকার গঠনে এনডিএ জোট মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের।
২০১৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে ৫২টি আসন পেয়েছিল। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৯৪টি আসন। লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে সরকার গঠনে একটি দলকে ২৭২টি আসনে জয় পেতে হয়।
বিদেশ সফরে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তায় নানা ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বিষয় বেশ অস্বাভাবিক। বিদেশ সফরকালে পুতিনের ব্যবহৃত মল-মূত্রসহ শারীরিক বর্জ্যও সংগ্রহ করে রাশিয়ায় নিয়ে যান তার নিরাপত্তারক্ষীরা। উদ্দেশ্য—বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে যেন তার শারীরিক অবস্থা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো তথ্য না যায়।
সম্প্রতি ভারত সফরকে কেন্দ্র করে পুতিনের এই বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা আবারও আলোচনায় এসেছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সফর শেষে পুতিনের ব্যবহৃত বর্জ্য বিশেষভাবে সংগ্রহ করে সিলগালা করা ব্রিফকেসে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের বডিগার্ডরা তার ব্যবহৃত মল-মূত্র সংগ্রহ করে বিশেষ ব্যাগ বা পাত্রে সংরক্ষণ করেন। পরে সেগুলো সিলগালা করে নিরাপত্তার সঙ্গে বিমানে তোলা হয়। বিদেশ সফরে পুতিনের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
সাবেক বিবিসি সাংবাদিক ফরিদা রুস্তমোভা জানিয়েছেন, পুতিন ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার নেতৃত্বে আসার পর থেকেই বিদেশ সফরে এ ধরনের ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছেন। এমনকি সফরকালে তার ব্যবহারের জন্য বিশেষ বহনযোগ্য টয়লেটও রাখা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুতিনের বর্জ্য রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষাকে দেখানো হয়েছে। মানুষের মল-মূত্রের নমুনা বিশ্লেষণ করেও শরীরের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এসব নমুনা সংগ্রহ করতে পারলে পুতিনের শারীরিক অবস্থা, সম্ভাব্য রোগ বা চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাশিয়া সেই ঝুঁকি এড়াতেই এত কঠোর ব্যবস্থা নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পুতিনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রাশিয়ার ফেডারেল প্রোটেক্টিভ সার্ভিস (এফএসও) বিদেশ সফরের এসব বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করে। তার দৃশ্যমান নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি কাজ করেন প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এসবিপি) বিশেষ প্রশিক্ষিত সদস্যরা।
শুধু বর্জ্য সংগ্রহ নয়, পুতিনের খাবার নিয়েও নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তার খাবারে বিষপ্রয়োগ ঠেকাতে রান্নার আগে উপাদান পরীক্ষা করা হয়। খাবার পরিবেশনের আগে নিরাপত্তারক্ষীরা তা পরীক্ষা করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশ সফরে পুতিনের যাতায়াত ব্যবস্থাও অত্যন্ত সুরক্ষিত। তার জন্য ব্যবহৃত রুশ তৈরি আউরাস সেনাট লিমুজিনকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সজ্জিত রাখা হয়। পাশাপাশি তার বিশেষ বিমানেও থাকে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম।
পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার এই বিস্তৃত আয়োজনের মধ্যে মল-মূত্র সংগ্রহ করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে অস্বাভাবিক হলেও এর পেছনে রয়েছে তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যও যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠতে পারে, পুতিনকে ঘিরে নেওয়া এই ব্যবস্থা তারই ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান কোনো অবস্থাতেই নতি স্বীকার করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার ভারতীয় ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, সামরিক ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। খাদ্য সরবরাহ, নিরাপদ পানি, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে বিপন্ন করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সংঘাত যদি সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই হয়ে থাকে, তবে কেন সাধারণ নাগরিকদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপাদান ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—সে বিষয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তোলেন।
বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তির আধিপত্যবাদী আচরণের বিরোধিতা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, কোনো শক্তিশালী দেশেরই অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈরী আচরণের মোকাবিলায় চড়া মূল্য দিতে হলেও ইরান তার জাতীয় মর্যাদা ও নীতিগত অবস্থান থেকে কখনো পিছু হটবে না। একই সঙ্গে নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মানবাধিকারবিষয়ক দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রভাবশালী জোট ব্রিকসের বহুল প্রতীক্ষিত ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মিলনে যোগ দিতে বিশ্বমঞ্চের প্রভাবশালী নেতারা নয়াদিল্লিতে সমবেত হয়েছেন। সম্মেলনে সশরীরে অংশ নিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছান। এ ছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানসহ জোটভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে সমগ্র নয়াদিল্লি জুড়ে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্বনেতাদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ভিভিআইপি করিডোর ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপ্রযুক্তির বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মোটরকেডের গতিবিধি এবং রাজধানীর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মতো সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবারের শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার প্রচলন ত্বরান্বিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্যসূচি হিসেবে স্থান পাচ্ছে। রবিবার পর্যন্ত নির্ধারিত এই সম্মেলনে জোটের মূল ১১টি সদস্য রাষ্ট্র ও ১০টি অংশীদার দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন আমন্ত্রিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পর সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যুক্ত হয়।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক আগে গঠিত এই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে। পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর একক বিকল্প হয়ে ওঠার পথে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্রিকস প্ল্যাটফর্মটি মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন বিকল্প শক্তির বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে বদলে গিয়েছিল বিশ্বের ইতিহাস। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভেনিয়ার একটি নির্জন মাঠে চারটি বিমান হামলায় প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার মানুষ। এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের শোক, স্বজন হারানোর বেদনা এবং সামাজিক ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ভয়াবহ ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী। নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে জড়ো হন নিহতদের স্বজন, সহকর্মী, উদ্ধারকর্মী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সাবেক চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে, যে মুহূর্তে প্রথম বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হেনেছিল, নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এরপর হামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।
এবারের আয়োজনে যুক্ত হয়েছে বিশেষ তাৎপর্যের আরেকটি নীরব মুহূর্ত। প্রচলিত ছয়টি নীরবতার পাশাপাশি সপ্তম নীরবতা পালন করা হয় সেই হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্মরণে, যারা হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলা ও বাতাসের সংস্পর্শে এসে দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণ হারান।
ধ্বংসস্তূপের মৃত্যু থামেনি: ৯/১১-এর দিন নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ জন দমকলকর্মী প্রাণ হারান। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল সেখানেই শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ এবং পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ধুলার সংস্পর্শে আসা আরও ৬০০ জনের বেশি ফায়ারফাইটার পরবর্তী সময়ে মারা গেছেন। শুধু ২০২৬ সালেই এ ধরনের কারণে ২৬ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে।
সাবেক ফায়ারফাইটার প্যাট্রিক হোয়েলানের পরিবারের সদস্যরা এখনো সেই সময়ের ক্ষোভ ও প্রশ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তার ছেলে মনে করেন, হামলার পর উদ্ধারকর্মীদের যে পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল, সেটি নিরাপদ ছিল না। নিরাপদ বাতাসের আশ্বাসের বিপরীতে পরবর্তী বছরগুলোতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা সেই দাবিকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বদলে গেছে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র: ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বরাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্তরে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন।
বিমানবন্দর ও সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বিশ্ব। ৯/১১-পরবর্তী সেই পরিবর্তনের প্রভাব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দৃশ্যমান।
এর পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয় গভীর বিভাজন। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধ বেড়ে যায়। ২৫ বছর পরও সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি অনেক পরিবারের কাছে বেদনার।
নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকে এ বছরের স্মরণানুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার জন্য কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এতে ৯/১১-এর স্মরণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে আসে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে পুরোনো ইতিহাস: ৯/১১-এর ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা সেই দিনের কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি বহন করে না। হামলার সময় যারা শিশু ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন মধ্যবয়সে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ৯/১১ মূলত ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
তবু সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত শোক। ফ্লাইট ১১-এর ক্যাপ্টেন জন ওগনোওস্কির মেয়ে ক্যারোলিন ওগনোওস্কি এ বছর প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। বাবার সমাধিতে সন্তানকে নিয়ে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রজন্ম বদলালেও হারানোর শূন্যতা বদলায় না।
বাবাকে স্মরণ করে তার আকুতি—তার বাবা কোনোদিন নাতিকে দেখে যেতে পারেননি, আর তার সন্তানও কোনোদিন জানতে পারবে না তার নানা কেমন মানুষ ছিলেন। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৯/১১-এর ইতিহাস এবং সেদিনের নায়কদের গল্প পৌঁছে দেওয়াকে তিনি নিজেদের দায়িত্ব মনে করেন।
২৫ বছর পরও অমলিন ক্ষত: সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে নিউইয়র্কের আকাশরেখা, বদলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বদলেছে বিশ্বরাজনীতির গতিপথ। কিন্তু ৯/১১-তে প্রিয়জন হারানো মানুষের কাছে ২৫ বছরও যথেষ্ট দীর্ঘ সময় নয়।
গ্রাউন্ড জিরোর নীরবতা, স্বজনদের চোখের জল এবং উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—৯/১১ শুধু ২০০১ সালের একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি এমন এক ক্ষত, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও ছড়িয়ে আছে।
একটি ভয়াবহ সকাল থেকে শুরু হওয়া সেই অধ্যায়ের ২৫ বছর পূর্ণ হলো। শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হলো নিহতদের, স্মরণ করা হলো উদ্ধারকর্মীদের আত্মত্যাগ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ৯/১১ যতই পুরোনো হোক, স্বজন হারানো মানুষের কাছে সেই দিনের বেদনা এখনো তাজা।
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার আমেরিকান নাগরিক আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন।
গবেষণাপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রতি পাঁচজনের একজন শৈশবে অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন কিংবা কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই বেড়ে উঠেছেন। এই ধর্মান্তরিত অংশের মধ্যে ১৭ শতাংশ খ্রিস্টধর্মসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুশাসন থেকে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন এবং অবশিষ্ট ৩ শতাংশ ব্যক্তি কোনো ধরনের ধর্মীয় পরিচয় ছাড়া বড় হয়ে পরবর্তীতে এই বিশ্বাসকে বেছে নিয়েছেন। পিউ রিসার্চের পর্যালোচনায় আরও প্রকাশ পেয়েছে, ইসলাম গ্রহণের হারের দিক থেকে বিশ্বের ১৩টি দেশের তালিকায় বর্তমানে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ২০১৭ সালের এক জরিপেও দেখা গিয়েছিল, দেশটিতে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলিমদের প্রায় অর্ধেক পূর্বে প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ২০ শতাংশ ক্যাথলিক খ্রিস্টান মতাবলম্বী ছিলেন।
সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার, তথ্য পাওয়ার সহজলভ্যতা এবং ইসলামের জীবনাচরণের প্রতি সাধারণ মানুষের কৌতূহল বৃদ্ধির ফলেই অনেক আমেরিকান প্রথাগত জীবনধারা পরিবর্তন করে এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আমেরিকার সামগ্রিক সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় ধর্মান্তরের এই ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক রূপান্তর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধকালীন প্রতিকূলতার মধ্যেই আগে থেকে মজুত রাখা যন্ত্রাংশ কাজে লাগিয়ে ভূগর্ভস্থ কারখানায় পুনরায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করেছে ইরান। মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই তথ্য সামনে এনেছে। ফলে তেহরানের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পূর্ববর্তী সাফল্য দাবি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের সমরাস্ত্র কারখানা ও বিভিন্ন স্থাপনায় উপর্যুপরি আঘাত হানা সত্ত্বেও দেশটি তরল এবং কঠিন—উভয় জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় সংযোজনের কাজ জোরকদমে এগিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের খোজির সমরাস্ত্র কারখানাসহ বিভিন্ন সুড়ঙ্গভিত্তিক ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিমান হামলা প্রতিহত করতে আরও গভীর ও সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরির চেষ্টাও চালাচ্ছে তেহরান। যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির মতো অবাধ উৎপাদন সম্ভব না হলেও এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে অবরোধ থাকলেও বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ মজুত দিয়েই সীমিত পরিসরে সংযোজন চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
এই সমরাস্ত্র পুনরুৎপাদন প্রমাণ করছে যে তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সমূলে বিনাশ করা কতটা জটিল। দীর্ঘমেয়াদি এই ক্ষয়যুদ্ধে একদিকে ইরান নিজের অভ্যন্তরীণ মজুত ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ছে, অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের সমরাস্ত্রের ভান্ডার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তাল ইনবার বলেন, ‘স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো আবার তৈরি করা যায়। অন্য দেশ থেকেও নতুন উপাদান কেনা যায় এবং সেগুলো স্থাপনাগুলোতে মজুত করা যায়। ইরান যে তার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে না, এমনটা ভাবতে হলে অত্যন্ত সরল বিশ্বাসী হতে হবে।’
ক্ষেপণাস্ত্র পুনরুৎপাদনের বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক সামরিক কাঠামো চরমভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেবেন না।’ এদিকে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল জানিয়েছেন যে তেহরানের ‘ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ সামরিক শিল্পভিত্তির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করেছে’ যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আক্রমণ সক্ষমতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে’।
চলতি গ্রীষ্মে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সুযোগে ইরান নিজেদের অস্ত্রাগার পুনর্গঠনে পূর্ণ মনোযোগ দেয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুমান, চুক্তির পর হরমুজ প্রণালি বিষয়ক আলোচনার ফাঁকেই সীমিত আকারে এই কাজ শুরু হয় এবং মজুত রসদ দিয়ে দেশটির শত শত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা রয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো ও সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসন জানান, ইরানের ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গগুলোতে আগে থেকেই প্রচুর পরিমাণ স্বয়ংসম্পূর্ণ ওয়ারহেড, ক্ষেপণাস্ত্র কাঠামো ও দিকনির্দেশক প্রযুক্তি সংরক্ষিত ছিল। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলতে পারি, আবার সম্ভবত কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্রও হতে পারে।’
ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে টান পড়লেও ইরানের অস্ত্রাগারে এখনো কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এর মধ্যে সহজে বহনযোগ্য ও নিখুঁত নিশানার ‘খেইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্র অন্যতম। এমনকি সম্প্রতি জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ক্লাস্টার ওয়ারহেডের উপস্থিতিও দেখা গেছে। অথচ গত এপ্রিলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়েছে। তৎকালীন বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা অবশিষ্ট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাটি খুঁড়ে বের করছেন, কিন্তু সেগুলো প্রতিস্থাপনের কোনো সক্ষমতা আপনাদের নেই। আপনাদের কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প নেই, আক্রমণাত্মক বা প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা পুনরায় পূরণ করার কোনো সক্ষমতা নেই।’
সম্প্রতি উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু এবং সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বারগুলো ইরান বিস্ময়কর গতিতে সংস্কার করে কার্যকর করেছে, যা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে কাঁচামাল তৈরির কিছু রাসায়নিক ও শিল্প মিক্সার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পূর্ণ শক্তিতে ফেরা এখনো কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌশল বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেভস্কির মতে, ‘আপনি স্থাপনা ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এর পুনর্গঠন সক্ষমতা পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও দ্রুত এবং এটি বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ইরান যে এত বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো তৈরি করেছিল, তার কারণ ছিল তারা এ ধরনের হামলার আশঙ্কা করেছিল।’
কূটনৈতিক দোলাচল ও জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বরাতে বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) উভয় দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও বেইজিংয়ের অবস্থান ছিল বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন এবং বৃহস্পতিবার সকালেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়া-কুন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে সফরটি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর মতো কোনো তথ্য তার কাছে নেই।
২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, যাতে ভারতের ২০ জন সেনাসদস্যসহ উভয় পক্ষের প্রাণহানি ঘটে। সেই বৈরী আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সাত বছরের ব্যবধানে এই প্রথম ভারত সফরে যাচ্ছেন চীনা রাষ্ট্রপ্রধান। এর আগে ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে শেষবার ভারত সফর করেছিলেন তিনি। এছাড়া ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো দ্বিপাক্ষিক সফরে এবং ২০১৬ সালে গোয়ায় আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ভারতে গিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতির প্রভাব এবং সম্প্রতি মোদির চীন সফরের পর উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বরফ গলতে শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুতে কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে উভয় নেতা ঐকমত্য পোষণ করেন যে, দুই দেশ পরস্পরের প্রতিযোগী নয় বরং সহযোগী এবং উভয়ের প্রবৃদ্ধি একে অন্যের জন্য কোনো হুমকি না হয়ে বরং নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
সীমান্ত উত্তেজনার জেরে ভারতীয় বাজারে চীনা বিনিয়োগে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, সম্প্রতি সৌরশক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাতে তার কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ১৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয় এবং চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে তা আরও ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খোদ বেইজিংয়ের পক্ষ থেকেই সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতের প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক স্তরে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেলেও অর্থনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক আস্থার সংকট এখনও বিদ্যমান। ভারতের বাজারে শীর্ষ চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিওয়াইডি’ এবং ‘গ্রেট ওয়াল মোটরস’-এর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রস্তাব এখনও আটকে রয়েছে এবং নিরাপত্তা শঙ্কায় চীনের ‘অ্যালিপে’ সেবার আবেদন নাকচ করেছে ভারত। অপরদিকে চীনও ভারতে উন্নত শিল্প যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, কাস্টমসে চালান আটকে রাখা এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ভিসা প্রাপ্তিতে কড়াকড়ির মতো কৌশল বজায় রেখেছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লিতে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক জটিলতা নিরসনে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে না গেলে নিজের সমর্থকদের ‘জাহান্নামে যাবেন’ বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেক্সাসের ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী সম্মেলনে যোগ দিয়ে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে সমর্থকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের শপথ করানোর পর তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সমবেত দলীয় সমর্থকদের একটি বিশেষ শপথ পাঠ করান ট্রাম্প। ওই শপথে বলা হয়, তারা আমেরিকার ইতিহাসের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্টের’ প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা বজায় রাখবেন এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ৩ নভেম্বর বা তার আগেই ভোট নিশ্চিত করবেন। এ সময় ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে রসিকতার ছলে ট্রাম্প সমর্থকদের পাল্টা কৌশলের ইঙ্গিত দেন এবং চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, নির্বাচনে ভোট না দিলে তারা সোজা জাহান্নামে যাবেন।
ভাষণদানকালে ট্রাম্প নিজের মেয়াদের বিভিন্ন সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দাবি করেন, বিগত ১৯ মাসে তিনি নির্বাচনী সকল প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বগতি, ওষুধের মূল্য হ্রাস, প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার সাফল্য তুলে ধরে তিনি জানান, তার নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্ধকার পরিস্থিতি পেরিয়ে সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে।
সাধারণত মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর অতীত ইতিহাস থাকলেও, ট্রাম্প সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় জানান। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ফিরে এলে সাধারণ মানুষের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে এবং অপরাধীদের অবাধে ছেড়ে দেবে।
এর আগে সম্মেলনের প্রারম্ভিক বক্তব্যে বক্তব্য রাখেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি অভ্যন্তরীণ যেকোনো নীতিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও কোনো কট্টরপন্থী কিংবা আমলাতন্ত্রের হাতে ক্ষমতা না ছেড়ে রিপাবলিকানদের জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তৎপরতা মূলত ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্যান্সকে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যাওয়ারই অংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তার বিপরীতে ২০২৭ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতের যাবতীয় ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে রাজি হয়েছে বলিভিয়া। বৃহস্পতিবার দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করা হয় বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
এর আগে গত জুলাই মাসে আইএমএফ জানায়, বলিভিয়ার নতুন মধ্য-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজের প্রশাসনের সঙ্গে ৩৬ মাস মেয়াদি এই ঋণ সহায়তা প্যাকেজের বিষয়ে একটি রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে দেশের ভঙ্গুর আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই বৃহস্পতিবার ওই ঋণচুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি উন্মোচন করে দেশটির সরকার।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে জ্বালানি তেলের বিপুল ভর্তুকি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে জ্বালানিতে মোটা অঙ্কের অর্থ জোগাতে গিয়ে বলিভিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র টান পড়েছিল, যার ফলে অপরিহার্য পণ্য ও জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকটে পড়েছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগার।
গত বছরের নভেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই প্রেসিডেন্ট পাজ ভর্তুকি ব্যবস্থা অবসানের ঘোষণা দেন এবং স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্ববাজারের সমপর্যায়ে নিয়ে আসেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে সাধারণ জনগণের চাপ কমাতে প্রশাসন ফের ভর্তুকি দিয়ে দাম ধরে রাখার চেষ্টা চালায়।
তবে আইএমএফের নতুন কাঠামো অনুসারে, অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, তা প্রশমিত করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলিভিয়া সরকার। এই চুক্তি বাস্তবায়নে এখনো দেশটির জাতীয় কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
এই সংস্কারের বিষয়ে দেশটির অর্থমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান মোরালেস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আইএমএফের চাপে পড়ে বলিভিয়া এসব নীতি গ্রহণ করছে না; বরং পূর্ববর্তী বামপন্থী প্রশাসনের রেখে যাওয়া ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট’ কাটিয়ে ওঠার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সরকার বিশেষ করে কৃষিখাতের মতো বড় পর্যায়ের ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজেলের দর দ্বিগুণ করেছে। এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি চোরাচালানের ফলেই অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। মূল্যবৃদ্ধির জেরে কিছু বিক্ষোভ দেখা গেলেও তা গত মে ও জুন মাসের মতো দেশকে স্থবির করে দেওয়া বড় ধরনের গণআন্দোলনের রূপ নেয়নি।
চলমান ইরান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক গ্রাহকদের কাছে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে কাতার। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয়ের জোর তৎপরতা শুরু করেছে দেশটি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ সংশ্লিষ্ট অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি যুক্তরাষ্ট্রের চালু থাকা এবং নির্মাণাধীন বিভিন্ন প্রকল্প থেকে গ্যাস আমদানির উপায় খুঁজছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কোনো উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে সরবরাহ নিশ্চিত করার এমন পদক্ষেপ কাতারের জন্য এই প্রথম। একসময় বিশ্ববাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি একাই জোগান দিত দেশটি। তবে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠা কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় তাদের নিয়মিত সরবরাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে কাতারকে বিকল্প উৎসের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
যুদ্ধাবস্থা তৈরির আগে ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান থেকে এলএনজি উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল কাতার। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই জ্বালানি অবকাঠামোটি সংঘাতের শুরুর দিকেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। অবকাঠামোগত এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
এদিকে চলমান এই সংঘাত অদূর ভবিষ্যতে থামার কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক তথ্যানুযায়ী, ইরান এই লড়াইকে আরও দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, এ যুদ্ধ ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে। মূলত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধাবস্থার এই আশঙ্কাই কাতারকে মার্কিন এলএনজি বাজারের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।
তবে মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামোতে কাতারের পূর্ব অভিজ্ঞতা এ প্রক্রিয়ায় বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত ‘গোল্ডেন পাস এলএনজি’ প্রকল্পে কাতারের উল্লেখযোগ্য মালিকানা রয়েছে, যেখান থেকে গত এপ্রিলেই গ্যাস রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি নিজস্ব বাণিজ্যিক শাখা ‘কাতারএনার্জি ট্রেডিং’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিবহনের সক্ষমতাও প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছে পারস্য উপসাগরের এই প্রভাবশালী দেশটি।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় কিংদাও বন্দরে সংস্কারকাজে নিয়োজিত একটি মালবাহী জাহাজে ছড়িয়ে পড়া আগুনে পুড়ে কমপক্ষে ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ওই কার্গো জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতকালে মোট ৪২ জন আরোহী উপস্থিত ছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট এক প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার কিছু সময় পর কিংদাওয়ের বেইহাই শিপবিল্ডিং ডকইয়ার্ডে মেরামতাধীন জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রকাশিত ছবির বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, জাহাজটির নাম ‘ওশান মেলোডি’। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ভেসেলফাইন্ডার জানিয়েছে, জলযানটি লাইবেরিয়ার পতাকার অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার অবিরাম চেষ্টার পর দুপুর আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সেখান থেকে ১২ জনকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা সম্ভব হয়েছে এবং দগ্ধ পাঁচজনকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট জাহাজটি মেরামতের জন্য জিয়াংসু প্রদেশ থেকে কিংদাও বন্দরে এসে পৌঁছায় এবং আগামী রোববার বন্দরটি ত্যাগ করার কথা ছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্য কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ভয়াবহ এই ঘটনার পরপরই চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন। যেকোনো দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ ও ভবিষ্যতে বড় আকারের বিপর্যয় ঠেকাতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
একই সাথে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সম্ভাব্য পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। কর্মক্ষেত্রের বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
বেইহাই শিপবিল্ডিং প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জাহাজ নির্মাতা চায়না স্টেট শিপবিল্ডিং করপোরেশনের (সিএসএসসি) অধীনস্থ একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের এটি দ্বিতীয় নজির। এর আগে গত ১৩ আগস্ট দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের একটি শিপইয়ার্ডে বিস্ফোরণের ঘটনায় এক দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছিল।
ধারাবাহিক উসকানিমূলক তৎপরতার অভিযোগ এনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের চরম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে আবুধাবিকে একাধিকবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা তা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয় যে, ইউএইর ভূমিকা এমন এক সীমায় পৌঁছেছে যা আর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য কিংবা সহনশীলতার পর্যায়ে পড়ে না এবং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখার যাবতীয় কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে গেছে। এই সিদ্ধান্তের আলোকে আলজিয়ার্সে দায়িত্বরত আমিরাতি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের বার্তা জানিয়ে দেওয়া হয় এবং সব কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলজিয়ার্স ও আবুধাবির মধ্যকার মতবিরোধ ক্রমাগত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট; আলজেরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার ঘোর বিরোধী হলেও ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইউএই এবং আলজেরিয়ার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী মরক্কো তেলআবিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতর পশ্চিম সাহারা সংকটেও দুই দেশ সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। আরব আমিরাত পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন দিয়ে সেখানে নিজস্ব কনস্যুলেট পরিচালনা করছে, অন্যদিকে আলজেরিয়া অঞ্চলটির স্বাধীনতার দাবিদার পলিসারিও ফ্রন্টকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন জোগাচ্ছে। সমান্তরালে সাহেল অঞ্চলে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার এবং একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্কে অবনতি দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে।