ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে। সংসদের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৪০ আসনে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। আর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পেয়েছে ৯৯টি আসন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গতকাল বুধবার এইফল প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, অন্যান্য দলের মধ্যে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) পেয়েছে ৩৭টি, তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি, ডিএমকে ২২টি, তেলেগু দেসম পার্টি (টিডিপি) ১৬টি, জনতা দল (জেডি-ইউ) ১২টি, শিবসেনা (উদ্ভব) ৯টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপিএসপি) ৮টি ও শিবসেনা (এসএইচএস) ৭টি আসন।
লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) পাঁচটি আসন পেয়েছে। চারটি করে আসনে জয় পেয়েছে ওয়াইএসআরসিপি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট)-সিপিআই (এম)। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল), আম আদমি পার্টি (আপ) ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) তিনটি করে আসন পেয়েছে।
দুটি করে আসন পেয়েছে জনসেনা পার্টি (জেএনপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট) (লিবারেশন)-সিপিআই (এমএল) (এল), জনতা দল-জেডি (এস), ভিসিকে, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই), রাষ্ট্রীয় লোক দল (আরএলডি) ও জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএন)। এছাড়া বেশ কয়েকটি দল একটি করে আসনে জয় পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন। চূড়ান্ত ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স-এনডিএ জোট মোট আসন পেয়েছে ২৮৬টি। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট পেয়েছে মোট ২০২টি আসন।
এর আগে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে ৩০৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। তখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছিল ৩৫২টি আসন। একক দল হিসেবে এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিজেপি। তবে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ২৭২টি আসনে জিততে পারেনি তারা। তাই সরকার গঠনে এনডিএ জোট মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের।
২০১৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে ৫২টি আসন পেয়েছিল। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৯৪টি আসন। লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে সরকার গঠনে একটি দলকে ২৭২টি আসনে জয় পেতে হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতিমালার বিরুদ্ধে দেশটির বড় শহরগুলোতে আবারও বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ‘নো কিংস’ শিরোনামের এই বিক্ষোভ এবার তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে আগের বারগুলোতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের সমাগম ঘটেছিল।
বিক্ষোভের আয়োজকরা জানিয়েছেন, ইরানে যুদ্ধ, কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন কার্যকর এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নেমেছেন। আয়োজকদের ভাষ্যমতে, ‘ট্রাম্প আমাদের ওপর একজন স্বৈরশাসকের মতো শাসন করতে চান। কিন্তু এটি আমেরিকা, আর ক্ষমতার মালিক জনগণ- কোনো উচ্চাভিলাষী রাজা বা তার কোটিপতি বন্ধুদের হাতে ক্ষমতা নয়।’
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র এই বিক্ষোভকে ‘ট্রাম্প ডের্যাঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন’ বলে উপহাস করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই বিক্ষোভ নিয়ে কেবল সেই সব সংবাদদাতারাই আগ্রহী যাদের এটি কভার করার জন্য পয়সা দেওয়া হয়।
গত শনিবার ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্ক এবং লস অ্যাঞ্জেলেসসহ আমেরিকার প্রায় প্রতিটি বড় শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভকারীরা লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে অবস্থান নেন এবং ন্যাশনাল মল এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের কুশপুতুল প্রদর্শন করে তাদের অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
এবারের বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল মিনেসোটা। সেখানে গত জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে রেনি নিকোল গুড এবং অ্যালেক্স প্রেত্তি নামে দুই মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেন্ট পলে স্টেট ক্যাপিটল ভবনের সামনে আয়োজিত সমাবেশে ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন সেখানে তার অভিবাসনবিরোধী আইন নিয়ে লেখা গান ‘স্ট্রিটস অফ মিনিয়াপলিস’ পরিবেশন করেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারেও হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। জনসমাগমের কারণে পুলিশ ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। গত অক্টোবরের বিক্ষোভে শহরটির পাঁচটি বরো মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
সহিংসতা ও গ্রেপ্তার
বিক্ষোভ চলাকালীন লস অ্যাঞ্জেলেসে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার দাঙ্গাকারী রয়্যাল ফেডারেল বিল্ডিং ঘেরাও করে কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সিমেন্টের ব্লক ছুড়ে মারে। এতে দুই কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের কাছে ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ না মানায় আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জনতাকে সরাতে ‘নন-লেথাল’ বা অ-মরণঘাতী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ডালাসে পাল্টা-বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও বিতর্ক
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেওয়া এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের আপত্তি সত্ত্বেও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করার মতো পদক্ষেপ নিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া তিনি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প অবশ্য নিজেকে রাজা বা স্বৈরশাসক হিসেবে মানতে নারাজ। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে রাজা বলছে, কিন্তু আমি রাজা নই।’ তার মতে, একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতেই তিনি এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছেন। তবে সমালোচকদের দাবি, তার এসব পদক্ষেপ অসাংবিধানিক এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি।
বিশ্বজুড়ে সংহতি
আমেরিকার বড় বড় শহর ছাড়াও শেলবিভিল এবং হাউলের মতো ছোট শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, প্যারিস, লন্ডন এবং লিসবনের মতো আন্তর্জাতিক শহরগুলোতেও প্রবাসী মার্কিনিরা জড়ো হয়ে ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তার অভিশংসন দাবি করেছেন।
গত অক্টোবরে ‘নো কিংস’ র্যালিতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এবারও শিকাগো, বোস্টন, ন্যাশভিল এবং হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।
গণহত্যাকারী ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিয়ে ইরানে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটাতে গিয়ে নিজ দেশে নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন যুদ্ধবাজ এই নেতা। এখন তার নিজের চেয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। ক্রমেই বাড়ছে বিক্ষোভ, হামলা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয়, প্রশাসনিক দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায়। এতে এখন পর্যন্ত দুই বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানায়, ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের রয়্যাল ফেডারেল বিল্ডিং হাজারো বিক্ষোভকারী ঘিরে ফেলেছেন। তারা ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ওপরও হামলা করছেন। এ অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, প্রায় ১ হাজার বিক্ষোভকারী ভবনটি ঘিরে ফেলে। বিবৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হামলায় দুই কর্মকর্তা সিমেন্টের ব্লকের আঘাতে আহত হয়েছেন এবং তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ৩০০টিরও বেশি ইভেন্টে আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষ সমবেত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ঘটনা ঘটল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে এবার নতুন এক শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইরান। ইরান এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি চাইছে। একই সঙ্গে এই নৌপথ ব্যবহার করা জাহাজগুলো থেকে নিয়মিত টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। টোল থেকে বছরে কয়েক শত কোটি ডলার আয় হতে পারে। তবে ইরানের এমন পরিকল্পনা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহণ করা হয়। দীর্ঘ দিন ধরেই ইরান এ পথকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছে ইরান।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা যে কত সহজ ও সস্তা, তা ইরান এবার ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। আয়ের নতুন উৎস হিসেবে তারা এখন একে কাজে লাগাতে চাচ্ছে।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক জলপথে এমন খবরদারি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং বিশ্ববাসীকে এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম ভাষণেই স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধের সুযোগ ইরান কোনোভাবে হাতছাড়া করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি সত্যিই টোল আদায় শুরু করতে পারে, তবে তাদের মাসিক আয় মিসরের সুয়েজ খালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন এ পথ দিয়ে যাওয়া প্রতিটি বড় তেলবাহী ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার ফি নিতে পারলে ইরানের মাসে আয় হবে ৮০ কোটি ডলারেরও বেশি।
অবশ্য, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাসকা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে টোল আদায়ের এ দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে এরই মধ্যে কিছু জাহাজ নিরাপদ পারাপারের জন্য ইরানকে গোপনে মোটা অঙ্কের অর্থ দিচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে, যা এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের এক মাস পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে ওয়াশিংটন। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক রণকৌশলের অংশ হিসেবে কয়েক হাজার নতুন মার্কিন নৌ ও মেরিন সেনা ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে এসব সেনা সদস্যকে ঠিক কোন দেশের কোন সামরিক ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে, তা কৌশলগত কারণে গোপন রাখা হয়েছে। তবে এই বিশাল সেনাবহর ওই অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ এখন তার নির্ধারিত দায়িত্বের এলাকায় অবস্থান করছে। জাহাজটির অপারেশনাল এরিয়া বা কার্যক্রমের পরিধি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত। ইউএসএস ত্রিপোলির নেতৃত্বে একটি বিশেষ ‘অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’ এই মিশনে অংশ নিচ্ছে, যেখানে প্রায় ৫ হাজার অভিজ্ঞ নাবিক ও মেরিন সেনা রয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এই রণতরীটি এর আগে জাপানের উপকূলীয় অঞ্চলে মোতায়েন ছিল, যা এখন জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় সরিয়ে আনা হয়েছে।
এই বিশাল সেনা মোতায়েনের মধ্যেই কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইরানে সরাসরি স্থলবাহিনী মোতায়েন না করেই যুক্তরাষ্ট্র তার নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জনে সক্ষম হবে। রুবিও আরও দাবি করেন যে, চলমান এই সংঘাত খুব বেশি দীর্ঘায়িত হবে না। তাঁর মতে, যুদ্ধ কয়েক মাস নয়, বরং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইতিবাচক পরিণতির দিকে যেতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন মূলত আকাশ ও সমুদ্রপথের আক্রমণ এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেই তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর নতুন করে এই বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য অবরোধের হুমকির মুখে মার্কিন এই অবস্থান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে আলোচনার প্রস্তাব এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি—ওয়াশিংটনের এই দ্বিমুখী অবস্থান তেহরানকে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউএসএস ত্রিপোলির এই উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিয়ে এসেছে।
উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন একদল অভিবাসী। সমুদ্রপথে যাত্রা শুরুর পর ছয় দিন ও খাদ্য ও পানি ছাড়া সমুদ্রে ভেসে থাকতে থাকতে ২২ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় সেখান থেকে ২১ বাংলাদেশিসহ মোট ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গ্রিস কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ক্রেটা দ্বীপের কাছ থেকে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ ২৬ জনকে উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে একজন নারী ও একজন অপ্রাপ্তবয়স্কও রয়েছে। পরবর্তীতে জানানো হয়েছে, জীবিতদের মধ্যে ২১ বাংলাদেশি, চারজন দক্ষিণ সুদান এবং একজন চাদের নাগরিক রয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, পাচারকারীদের নির্দেশেই এই কাজ করা হয়েছে। এ সময় দুইজন গুরুতর অসুস্থ যাত্রীকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, নৌকাটি ২১ মার্চ তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথে তারা দিক হারিয়ে ফেলে এবং ছয় দিন ধরে খাদ্য ও পানি ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষ দুইজন দক্ষিণ সুদানের নাগরিককে আটক করেছে। তাদেরকে মানবপাচারকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, নৌকাটি ক্রেটা দ্বীপের দক্ষিণে লেরপেটরা থেকে প্রায় ৫৩ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৮৭ জন। একইভাবে ফ্রন্টেক্স জানিয়েছে, ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা নিয়ে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে সরবরাহকৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। সংঘাত শুরুর আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল। তবে ইরানে আগ্রাসনের পর প্রণালিটি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সংকীর্ণ এই প্রণালির দুই পাশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইরানি গণমাধ্যম জানায়, প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের জন্য আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট।
তাসনিম ও ফার্স সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানের বরাতে একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইন বিভাগ তা চূড়ান্ত করবে।
ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ফি আদায় করা হবে। তার ভাষায়, ‘এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। অন্যান্য করিডরে যেমন পণ্য পরিবহনের সময় শুল্ক দিতে হয়, হরমুজ প্রণালিও তেমন একটি করিডর। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, তাই জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোর শুল্ক দেওয়া স্বাভাবিক।’
তবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত দুই সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি টোল ব্যবস্থা চালু করেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থা লয়েডস লিস্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে। এর পরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও এলএনজি বহনকারী মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরানের আইআরজিসি।
এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রণালিটি উপসাগরীয় অধিকাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানির একমাত্র পথ হওয়ায় বিভিন্ন দেশ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেছে।
গত রোববার ইরানের সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি জানান, কিছু জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের খরচ রয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ফি নিতে হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ প্রণালির দুই পাশে অপেক্ষা করছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, অনেক জাহাজ দীর্ঘ বিকল্প পথ নেওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষা করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছে।
১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে মাত্র ১৬টি জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু রেখে প্রণালি অতিক্রম করেছে। একই সময়ে আরও চারটি কার্গো জাহাজ পার হয়েছে।
আইন পাস না হলেও গত দুই সপ্তাহে ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির অনুমোদিত রুট ব্যবহার করে চলাচল করেছে। এ ক্ষেত্রে জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি-সংযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহাজের প্রয়োজনীয় তথ্য—যেমন নথি, আইএমও নম্বর, মালামাল, ক্রুদের নাম ও গন্তব্য—জমা দিতে হয়।
পরবর্তীতে আইআরজিসি নৌবাহিনী যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিলে একটি বিশেষ কোড প্রদান করে এবং নির্দিষ্ট রুট নির্দেশনা দেয়। প্রণালিতে প্রবেশের পর রেডিওর মাধ্যমে ওই কোড যাচাই করা হয়। অনুমোদন পেলে ইরানি নৌবাহিনী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নেয়। অনুমতি না থাকলে কোনো জাহাজকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোর জাহাজ ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজ শর্তসাপেক্ষে চলাচল করতে পারবে। ইতোমধ্যে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, মিশর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
কিছু জাহাজ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি পরিশোধ করেছে বলেও জানা গেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ভারত দাবি করেছে, তাদের জাহাজ কোনো ফি দেয়নি।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনের বিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং তা স্থগিত করা যায় না। তবে ইরান দাবি করছে, তারা এই আইনে বাধ্য নয়, কারণ তারা এটি অনুমোদন করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালিটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইরান ও ওমানের জলসীমা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে, তখন এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে—জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের দামে।’
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত এখনই শেষ হচ্ছে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আয়োজিত এক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে এবং দেশটির ভেতরে এখনো অন্তত ৩ হাজার ৫শ ৫৪টি কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু মার্কিন হামলার তালিকায় বাকি আছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার পরই কেবল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদিও তিনি আগে কয়েকবার এই যুদ্ধে জয়ের দাবি করেছিলেন, তবে মিয়ামির ভাষণে তিনি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে, বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তবে একই সঙ্গে তিনি খুব দ্রুতই এই যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত ইতি টানার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সংগতি রেখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ‘জি-৭’ জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন তার নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনে সঠিক পথেই রয়েছে।
তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ইরানে কোনো ধরনের স্থলবাহিনী না পাঠিয়েই কেবল আকাশপথ ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে। রুবিওর এই মন্তব্য মূলত তেহরানের ওপর ক্রমাগত বিমান হামলা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানের ধারাবাহিকতাকে সমর্থন করে, যা গত এক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে ওয়াশিংটন যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট ‘টার্গেট লিস্ট’ ধরে কাজ করছে।
৩ হাজার ৫শ ৫৪টি লক্ষ্যবস্তু বাকি থাকার অর্থ হলো ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ এখনো সক্রিয় রয়েছে, যা ধ্বংস করাকে ট্রাম্প তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। তবে সরাসরি স্থল অভিযান এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলের পেছনে মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান এবং ‘লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যবর্তী এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনার মুহূর্ত তৈরি করেছে। ট্রাম্প একদিকে যেমন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার কথা বলছেন, অন্যদিকে হামলার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন, যা অনেকটা দ্বিমুখী কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য সত্ত্বেও যুদ্ধের ময়দানে ইরানি বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধ এবং কৌশলগত অবস্থান আগামী দিনগুলোতে সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করবে। আপাতত হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এটি পরিষ্কার করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি আলোচনার কোনো পথ সহজ হচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) কয়েক দফায় চালানো এই নজিরবিহীন হামলায় বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আকাশপথে আসা একাধিক ড্রোন বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনা লক্ষ্য করে আঘাত হানে, যার ফলে ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। তবে এই বড় ধরনের হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থায় বড় ধরনের যান্ত্রিক ক্ষতি হলেও কোনো যাত্রী বা বিমানকর্মী হতাহত হননি। হামলার পরপরই বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং আকাশে অবস্থানরত বিমানগুলোকে সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন এবং রাডার ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর বিমানবন্দরের একটি অংশ থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কুয়েতের এই গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটি বারবার শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এর আগে গত বুধবারও এই বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ডিপোতে ড্রোন হামলার ফলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে দীর্ঘক্ষণ লড়াই করতে হয়। কুয়েত সরকার এই ধারাবাহিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সরাসরি প্রতিবেশী দেশ ইরানকে দায়ী করে আসছে। তেহরানের সঙ্গে চলমান আঞ্চলিক ও সামরিক বিরোধের জের ধরে কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে কুয়েত জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। বিমানবন্দরের চারপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাডার ব্যবস্থা সংস্কারের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। সব মিলিয়ে এই ড্রোন হামলা কুয়েতের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে যুক্তরাজ্যজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামাল দিতে না পেরে ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল সংখ্যক পেট্রোল পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী লন্ডনসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২ পাউন্ডের রেকর্ড স্পর্শ করার উপক্রম হয়েছে, যা সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নাভিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। অনেক পাম্পের প্রবেশপথে 'তেল নেই' কিংবা 'বিক্রি বন্ধ' লেখা নোটিশ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে এক নজিরবিহীন দৃশ্য।
বর্তমান এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও স্বতন্ত্র জ্বালানি বিক্রেতারা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম লভ্যাংশে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও পাইকারি বাজারে তেলের দাম যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, খুচরা বাজারে সেই অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকসান এড়াতে যখনই তাঁরা সামান্য মূল্য বৃদ্ধি করছেন, তখনই সাধারণ গ্রাহকদের তীব্র অসন্তোষ ও সামাজিক ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়ে অনেক মালিক লোকসান ঠেকাতে তাঁদের পাম্পগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা মূলত ব্রিটিশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি স্থবিরতা তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাজারমূল্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিযোগিতা ও বাজার কর্তৃপক্ষ (সিএমএ) নজরদারি কঠোর করেছে। গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে তেল পাওয়ার সুবিধা দিতে সরকার সম্প্রতি ‘ফুয়েল ফাইন্ডার’ নামক একটি বিশেষ ডিজিটাল স্কিম চালু করেছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা রিয়েল-টাইম মূল্য জানতে পারছেন। যদিও এই পদক্ষেপটি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু বড় বড় চেইন শপগুলোর তুলনায় ছোট ও স্বাধীন পাম্পগুলোর ওপর এটি বাড়তি প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করেছে। ফলে অনেক ছোট পাম্প মালিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা করছেন।
এরই মধ্যে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে সরকারের ৫ পেন্স জ্বালানি শুল্ক ছাড় বাতিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার যে বিশেষ শুল্ক ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় তেলের প্রকৃত খুচরা মূল্য এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত প্রশমিত না হলে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি বাজারের এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে না। সব মিলিয়ে তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং পাম্প বন্ধের এই হিড়িক ব্রিটিশ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন সরকারের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইউক্রেন ও সৌদি আরব। শুক্রবার (২৭ মার্চ) জেদ্দায় সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যকার এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং ইউক্রেন সংকটের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা, যা উভয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সৌদি আরব সফরের অংশ হিসেবে যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকের আগেই এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। জেলেনস্কি তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন যে, ইউক্রেন বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সৌদি আরবের সঙ্গে ভাগ করে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মূলত দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসার ফলে ইউক্রেনের যে কারিগরি ও রণকৌশলগত অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, সেটিই এই চুক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
উল্লেখ্য যে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিলেন। বিশেষ করে ইউক্রেনের আকাশসীমায় ইরানের তৈরি কামিকাজি ড্রোন সফলভাবে মোকাবিলা করার যে অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে, সেটি এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। জেলেনস্কির এই প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব সৌদি আরবসহ কয়েকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইউক্রেনের প্রায় ২০০ জনেরও বেশি অভিজ্ঞ সামরিক প্রযুক্তিবিদ দায়িত্ব পালন করছেন, যা এই চুক্তির কার্যকারিতাকে আরও জোরালো করেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ সফর শেষে শনিবার (২৮ মার্চ) প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির জেদ্দা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে রাজকীয় মর্যাদায় বিদায় জানাবেন মক্কা অঞ্চলের উপ-গভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশআলসহ সৌদি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে কেবল ইউক্রেন ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই শক্তিশালী হবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইউক্রেনীয় প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি এক নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতাকে আরও আধুনিক করতে সহায়তা করবে।
নেপালে গত বছরের রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভ ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে রাজধানী কাঠমাণ্ডুর উপকণ্ঠে নিজ বাসভবন থেকে তাদের আটক করা হয়।
২০২৫ সালে নেপালে দুর্নীতিবিরোধী এক ভয়াবহ ছাত্র-যুব বিদ্রোহ শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই সময় বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন।
সরকার গঠিত একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, তারা গুলি চালানো বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা করেননি, বরং তাদের অবহেলার কারণেই এত প্রাণহানি ঘটেছে। এই অপরাধে তাদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে।
র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া জনপ্রিয় নেতা বলেন্দ্র শাহ গত ৫ মার্চের নির্বাচনে জয়লাভের পর শুক্রবার (২৭ মার্চ) নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
শপথ গ্রহণের মাত্র এক দিন পরেই এই বড় ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হলো।
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি কারো বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং নিহত ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচারের সূচনা মাত্র।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দিক থেকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন এক বছরের বেশি স্থায়ী হলে ২০২৬-২৭ সময়ে উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট, আর মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এডিবি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার দৃশ্যপটে ২০২৬-২৭ সময়ে এই অঞ্চলের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি দশমিক ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা তুলনামূলকভাবে মাঝারি হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ হবে সবচেয়ে বেশি। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত, যা পুরো অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এডিবির মতে, সংঘাতের প্রভাব মূলত পড়ছে জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন, বাণিজ্য বাধা এবং আর্থিক পরিস্থিতি কঠোর হয়ে ওঠার মাধ্যমে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশের আমদানি-নির্ভরতার মাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণের নীতির ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব ভিন্ন হবে। তবে সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করবে। এডিবি ধরে নিয়েছে- জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সাময়িক হবে এবং বাজার স্বাভাবিক হলে ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসবে। কিন্তু উৎপাদক পর্যায়ের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকায় মূল্যস্ফীতির পতন প্রাথমিক বৃদ্ধির তুলনায় কম হবে। অর্থাৎ দাম বাড়ে লিফটে চড়ে, নামে সিঁড়ি দিয়ে, মানব সভ্যতার প্রিয় অর্থনৈতিক রীতি।
যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি হ্রাস পূর্ব এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় কম, তবু উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাস্তবে অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায়, দারিদ্র্য বাড়ায় এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেছেন, সরকারগুলোর উচিত বাজারের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা বাড়াতে পারে এমন নীতি গ্রহণ করা।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, সরকারগুলোকে দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে, আর্থিক সহায়তা হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বাজারের অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি যেখানে সম্ভব জ্বালানির চাহিদা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ মার্কিন ঘাঁটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি এ দাবি করেছেন। শুক্রবার (২৭ মার্চ) মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি জানান, পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত ১৭টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ১৭টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। সেগুলো ইতোমধ্যে ইরানি বাহিনী ধ্বংস করেছে। তিনি দাবি করেন, এসব ঘাঁটি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী।
তিনি ২০২৫ সালের ১৩ জুন শুরু হওয়া ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাত প্রসঙ্গে বলেন, ওই যুদ্ধের পর ইরান তাদের প্রতিরক্ষামূলক নীতি পরিবর্তন করে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে।
শেখারচি দাবি করেন, গত ৪৭ বছরে ইরান কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তবে কেউ ইরানের ওপর হামলা চালালে পাল্টা আঘাত করে শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা হবে।
তিনি বলেন, শত্রুকে শাস্তি দেওয়া এবং তাদের হুমকি সম্পূর্ণভাবে দূর না হওয়া পর্যন্ত ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল অব্যাহত থাকবে। ইরানের এ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিরাপত্তার নামে প্রভাবিত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আর আগের মতো হবে না এবং যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে চলতে হবে।
তিনি আঞ্চলিক মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আশ্রয় না দেয়। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশ যদি তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।
ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অটল থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল। তার মতে, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ইরানকে সরাসরি সহায়তা করছে রাশিয়া। ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ জোটের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই অভিযোগ তোলেন। আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, ওয়াডেফুলের এই মন্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেন আগ্রাসন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। পুতিন আশা করছেন যে বিশ্বের নজর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ থাকলে ইউক্রেনে তার সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা ও বাধা কমে আসবে। তবে ওয়াডেফুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুতিনের এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না।
এই সংকট নিরসনে জার্মানি সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াডেফুল জানিয়েছেন যে, তিনি ইতিমধেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিওর সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং জার্মানির অনড় অবস্থান তুলে ধরেছেন। জার্মানি কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং সংঘাত পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যেকোনো কার্যকর ভূমিকা পালনে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
পরিশেষে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউক্রেন সংকট এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। একটির সমাধান ছাড়া অন্যটির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।