সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের সময় তীব্র প্রবাহ ও অসহনীয় গরমে মৃত হজযাত্রীদের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এই হজযাত্রীদের অর্ধেকেরও বেশি অনিবন্ধিত ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির টালিতে সৌদি হজযাত্রীদের প্রাণহানির এই সংখ্যা জানানো হয়েছে।
সৌদির সরকারি প্রশাসন, মক্কার বিভিন্ন হাসপাতাল এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের তথ্য সহায়তার ভিত্তিতে মৃত হজযাত্রীদের সংখ্যাগত ওই টালি করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সেই টালির সর্বশেষ অবস্থা থেকে এই সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, হজ পালনের সময় নিহতদের তালিকায় বৃহস্পতিবার নতুন করে মিসরের আরও ৫৮ হজযাত্রীর নাম যুক্ত হয়েছে। আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কূটনীতিক এএফপিকে বলেছেন, হজ পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সহস্রাধিক হজযাত্রীর মধ্যে কেবল মিসরেরই নাগরিক আছেন ৬৫৮ জন।
তিনি বলেছেন, সৌদিতে মারা যাওয়া মিসরীয়দের প্রায় ৬৩০ জনই অবৈধভাবে হজ করতে গিয়েছিলেন। যে কারণে তারা প্রখর তাপপ্রবাহ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে যাত্রীদের জন্য যেসব সুবিধা ও পরিষেবা বরাদ্দ করেছে সৌদির সরকার, সেসব থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। অবৈধভাবে সৌদিতে প্রবেশ করা এই যাত্রীরা এমনকি থাকা, খাওয়া এবং এয়ার কন্ডিশন সুবিধাও পাচ্ছেন না।
চলতি বছর হজ শুরু হয়েছে গত ১৪ জুন থেকে। সৌদির আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে মক্কার তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। বুধবারও মক্কার তাপমাত্রা ছিল ৫১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
মিসরের বাইরে জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকরাও রয়েছেন মৃত হজযাত্রীদের তালিকায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার হজ করতে মক্কায় গিয়ে মারা গেছেন ২৭ জন বাংলাদেশি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৮ লাখ হজযাত্রী এবার হজ করতে সৌদি গেছেন। বিদেশি হজযাত্রীদের অনেকেই মক্কার তীব্র গরমে অভ্যস্ত নন। তা ছাড়া এই হজযাত্রীদের মধ্যে এমন হাজার হাজার যাত্রী রয়েছেন, যারা বিধি মেনে সৌদিতে আসেননি। যেসব হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশই অবৈধভাবে সৌদিতে প্রবেশ করেছিলেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রশাসন।
এ ছাড়া হজের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন বহুসংখ্যক হজযাত্রী। এই গরমে নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থাকা এই হজযাত্রীদের সবাই বেঁচে আছেন— এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই সামনের দিনগুলোতে মৃত হজযাত্রীদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবে পবিত্র হজের সময় পদদলন, তাঁবুতে অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় গত ৩০ বছরে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যে কারণে হজের আনুষ্ঠানিকতা নিরাপদে সম্পন্ন ও হজযাত্রীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে সৌদি সরকার। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষ বর্তমানে চরম তাপদাহ থেকে হজযাত্রীদের রক্ষা করতে গিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
ট্রাভেল অ্যান্ড মেডিসিন জার্নালের চলতি বছরের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা তাপ প্রশমনের প্রচলিত কৌশলগুলোকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। আর জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্সের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৌদি আরবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় হজযাত্রীরা ভবিষ্যতে ‘‘চরম বিপদের’’ সম্মুখীন হবেন।
সৌদির এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশটিতে প্রত্যেক দশকে আঞ্চলিক তাপমাত্রা গড়ে শূন্য দশমিক ৪ সেন্টিগ্রেড হারে বাড়ছে এবং প্রশমন ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তাপদাহ পরিস্থিতি ক্রমাগতভাবে খারাপ আকার ধারণ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডকে একীভূত করার পক্ষে মন্তব্য করেছেন। শনিবার আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, আয়ারল্যান্ড যদি এক হয়ে যায়, সেটা হবে চমৎকার একটা বিষয়।
ট্রাম্প বলেন, আমি কোনো ঝামেলা তৈরি করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের বলছি, আমি আয়ারল্যান্ডকে একীভূত দেখতে চাই। একদিন না একদিন এটা হবেই... আমার মনে হয়, এটা খুবই সুন্দর একটা ব্যাপার হবে।
প্রধানমন্ত্রী মার্টিন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ট্রাম্পের কথা শুনেও তিনি নীরব থাকেন। লন্ডনে অবশ্য এ মন্তব্য ভালো লাগেনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আয়ারল্যান্ড একীভূত হওয়ার প্রশ্নে বার্নহামের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর আগে বুধবার পার্লামেন্টে উত্তর আয়ারল্যান্ডে গণভোটের সম্ভাবনা নিয়ে বার্নহাম বলেছিলেন, এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই যেখানে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আরও একটা গণভোট চায়। পরিস্থিতি না বদলালে কোনো গণভোট হবে না।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাবে কি না, সেই সিদ্ধান্তের গণভোট ডাকার ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাতেই রয়েছে। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘দ্য ট্রাবলস’ নামের প্রায় তিন দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটেছিল।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রধান ইউনিয়নিস্ট দল ডিইউপির নেতা গ্যাভিন রবিনসন স্পষ্ট করে বলেছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ট্রাম্প ঠিক করবেন না। সেখানকার জনগণই ঠিক করবে। তিনি যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও জানেন নির্বাচন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডন, ডাবলিন বা ওয়াশিংটনের কোনো কথার ওপর নির্ভর করে এ সিদ্ধান্ত হবে না।
জনমত জরিপগুলোতে এখনো অধিকাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকলেও ব্যবধান কমছে। বিশেষ করে ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগের পর একীভূত আয়ারল্যান্ডের আলোচনা আবার জোরালো হয়েছে।
সফরে ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলির সঙ্গেও দেখা করেন। ২০১৯ সালে ট্রাম্প যখন আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন, তখন শ্যানন বিমানবন্দরে কনলি তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলেন। এবারও ট্রাম্পের সফরকে ঘিরে ডাবলিনে যুদ্ধবিরোধী ও ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। অনেকে মার্কিন সামরিক নীতি, আয়ারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা এবং গাজায় ইসরায়েলের
প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সফরের নিরাপত্তায় বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
রাজনৈতিক সম্মেলন মানেই মূলত গুরুগম্ভীর আয়োজন। তবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে এসে ব্যাতিক্রম ঘটালেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। শনিবার সন্ধ্যার এক অনুষ্ঠানে বলিউডের জনপ্রিয় গান গেয়ে উপস্থিত অতিথিদের আনন্দে মাতান তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজনে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে রয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। সম্মেলনের নৈশভোজে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর কুমারের ১৯৬৫ সালের জনপ্রিয় গান ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’ পরিবেশন করেন। এস ডি বর্মনের সুরে ও মাজরুহ সুলতানপুরীর কথায় গানটি ‘তিন দেবিয়াঁ’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল।
লাইভ পিয়ানোর সঙ্গতে আনোয়ারের গান দ্রুতই অনুষ্ঠানের সবার নজর কাড়েন। কূটনীতি ও রাজনীতির আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মুহূর্তটি পরিণত হয় উষ্ণ সাংস্কৃতিক বিনিময়ে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গাওয়ার একটি ভিডিও শেয়ার করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, গুরু, একটু গান গাওয়ার অনুমতি দেবেন? ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তার গায়কির প্রশংসা করেন।
ভারতীয় গান ও সিনেমার প্রতি আনোয়ারের ভালোবাসা অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও তিনি কিশোর কুমারের একই গান পরিবেশন করেছেন। ২০২৪ সালে দিল্লির একটি অনুষ্ঠানে তিনি মুকেশের জনপ্রিয় গান ‘দোস্ত দোস্ত না রাহা’ও গেয়েছিলেন।
হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতিও আনোয়ারের আগ্রহ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি এর আগে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) ও পুরোনো তামিল চলচ্চিত্রের গানের প্রতি আনোয়ারের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া যাত্রীবাহী জাহাজ ‘ভিরগো ট্রান্সপোর্ট-৮’-এর ১০৩ জন আরোহীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। এ ছাড়া উদ্ধার তৎপরতা চলাকালে একজনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নৌযানটিতে থাকা অবশিষ্ট নিখোঁজ যাত্রী ও ক্রুদের সন্ধানে সমুদ্রজুড়ে এখনও ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে।
রবিবার সকালে পূর্ব জাভা প্রদেশের সুরাবায়া বন্দর থেকে কালিমানথান প্রদেশের বানজারমাসিনের উদ্দেশে যাওয়ার পথে জাহাজটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্তে নৌযানটিতে সর্বমোট ২৪৩ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য অবস্থান করছিলেন। বানজারমাসিন উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানকালে নৌযানটি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটির জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে সেটির সর্বশেষ চিহ্নিত অবস্থানের দিকে হেলিকপ্টার ও বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ পাঠায়।
উদ্ধারকাজ চলাকালে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ অনুসন্ধানকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সুদায়ানা জানান, আড়াই মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢেউ অতিক্রম করে উদ্ধারকর্মীদের ওই অঞ্চলে কাজ করতে হচ্ছে। বৈরী পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘জাহাজগুলোর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি আমাদের ৪০ মিটার দীর্ঘ বাসারনাসের জাহাজটিও বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
উল্লেখ্য, প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য নৌযানই অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে প্রায়ই আকস্মিক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং দুর্বল নিরাপত্তা বিধিমালার কারণে দেশটিতে বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী জিজান প্রদেশে একটি মসজিদসহ একাধিক বসতবাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, জিজানের আল-তুয়াল এলাকায় সংঘটিত এই আকস্মিক হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোকে নিশানা করে পরিচালিত এ ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এই হামলার পর সৌদি-ইয়েমেন সীমান্ত রেখায় পুনরায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
হামলার দায় স্বীকারের ক্ষেত্রে হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরাহ এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। এর আগে গত মঙ্গলবারও দেশটির আভা, খামিস মুশাইত, জিজান এবং নাজরান অঞ্চলে একযোগে বড় ধরনের হামলা চালায় হুথিরা, যাতে নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছিলেন।
সীমান্তবর্তী হামলার পাশাপাশি সম্প্রতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী কৌশলগত অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সরকারি বাহিনীর ওপর জোরালো স্থল অভিযান শুরু করেছে হুথি গোষ্ঠী। কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং স্থানীয় দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৫০ সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় সীমান্ত অঞ্চলে আপেক্ষিক শান্তি বজায় থাকলেও সাম্প্রতিক এসব ধারাবাহিক হামলায় সেখানে পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে দুই শতাধিক আরোহী নিয়ে চলাচলকারী একটি বড় যাত্রীবাহী জাহাজের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পূর্ব জাভা প্রদেশ থেকে বোর্নিও দ্বীপের দক্ষিণ কালিম্যানতানে যাওয়ার পথে নৌযানটি নিখোঁজ হওয়ার পর রবিবার ভোর থেকেই সমুদ্রজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির নৌ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী কার্যালয়ের তথ্যমতে, ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়া বন্দর থেকে দক্ষিণ কালিম্যানতানের বানজারমাসিনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল 'ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮' নামের ওই যাত্রীবাহী জাহাজটি। রবিবার ভোররাত আনুমানিক ২টার দিকে যানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে বানজারমাসিন অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যালয়ের প্রধান আই পুতু সুদায়ানা জানান, 'জাহাজটি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ার তথ্য পাওয়ার পরপরই এর পরিচালনাকারী সংস্থা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানায়।'
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বানজারমাসিনের একটি জেটি থেকে প্রায় ১৪৮ কিলোমিটার (৯২ মাইল) দূরে জাভা সাগরে অবস্থানকালে জাহাজটির সর্বশেষ সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। নৌযানটির আনুষ্ঠানিক তালিকা বা ম্যানিফেস্ট অনুসারে এতে মোট ২৪১ জন যাত্রী অবস্থান করছিলেন। জাহাজটির পরিচালনাকারী সংস্থা পিটি ভার্গো ইয়োয়েল রিহি জানিয়েছে, শনিবার সকাল ১০টা ১৩ মিনিটে সুরাবায়া বন্দর থেকে জাহাজটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঘটনা জানার পরপরই বানজারমাসিনের বাচিরিহ সার্চ জেটি থেকে আধুনিক উদ্ধারকারী দল ও নৌযান সম্ভাব্য শেষ অবস্থানের দিকে পাঠানো হয়েছে। সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে নিখোঁজ যাত্রী ও ক্রুদের সন্ধানে সব ধরনের লজিস্টিক সক্ষমতা নিয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে ‘সব ধরনের যুদ্ধ পদক্ষেপের’ কঠোর সমালোচনা তথা সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা করার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ (ইউএনএসসি) বিশ্বের বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘কাঠামোগত সংস্কারের’ দাবি এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনায় জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে জোটের এই যৌথ ঘোষণাপত্র উন্মোচন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিশ্বনেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকায় এবারের সম্মেলনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
ব্রিকস কী?
ব্রিকস হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত একটি জোট। এ অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক জোটটি ২০০৬ সালে গঠিত হয়েছিল এবং ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন ২০০৯ সালে প্রথম ব্রিক শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়। এর এক বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটে যোগ দেয়।
২০২৩ সালে সদস্যপদের আবেদন জানানোর পর মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই সময়ে আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ডিসেম্বরে নির্বাচিত দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেই বিশ্ব পরাশক্তি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালানোর কারণে শেষ পর্যন্ত এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে।
ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে এই জোটে যোগদান করে। বর্তমানে ব্রিকস বিশ্বের ১১টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করে রয়েছে।
যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণায় সম্মত ব্রিকস
টানা সাত মাস ধরে যুদ্ধের দাবানলে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য। আঞ্চলিক এই সংঘাতের প্রভাবে ভুগছে পুরো বিশ্ব। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন।
শনিবার প্রথম দিনের সম্মেলনেই যে কোনো প্রকার একতরফা যুদ্ধের কড়া নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণাপত্রে একমত হয়েছে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো। তবে এই ঘোষণাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ থাকছে না। শীর্ষ সম্মেলনে জোটের শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণাপত্র অনুমোদন করবেন।
এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রমতে, মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা দুই সদস্য রাষ্ট্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসনে নিবিড় আলোচনার পর চূড়ান্ত এই সমঝোতায় পৌঁছায় সদস্য দেশগুলো।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে কূটনৈতিক এই বড় অগ্রগতির খবর আসে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পুনরায় ছড়িয়ে পড়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তারের ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থার আবহেই এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তেহরান ও আবুধাবির তীব্র মতপার্থক্য কোনো যৌথ ইশতেহার প্রকাশে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে আগস্টে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত করলে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
তবে কূটনীতিকদের ধারাবাহিক মধ্যস্থতায় অবশেষে দুই পক্ষই গৃহীত যৌথ ভাষার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। আয়োজক দেশ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ ইশতেহারের বিষয়বস্তু নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য না করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও একতরফা আগ্রাসনের বিপরীতে গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান দেশগুলোর সুদৃঢ় ঐক্যের বার্তা বহন করে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিঅ) মতো পশ্চিমা-প্রভাবিত বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ভারসাম্য আনায় জোর দিচ্ছে জোটটি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতারা।
নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক সংহতি
এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফরাসি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটিক্সিস’র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশ রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বনেতারা আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের মাধ্যম ও নতুন উপায় নিয়েও আলোচনা করবেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, তবে তারা কিন্তু মার্কিন ডলারকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করবে না। ক্রেমলিন বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নতুন দিল্লিতে চলতি সপ্তাহের শীর্ষ সম্মেলনে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্যের নিষ্পত্তির বিষয়ে ব্রিকস অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে রাশিয়া।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘তক্ষশীলা ইনস্টিটিউট’র জিওস্ট্রেটেজি প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের মধ্যে ব্রিকস নেতারা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, তা মূলত সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেগুলোর ঝুঁকি দূর করার প্রাথমিক পদক্ষেপ।’
এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনটির গুরুত্ব যেখানে
‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’র বিশিষ্ট ফেলো ইয়ান লেসার আল জাজিরাকে জানান, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের পটভূমিতে এই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে গ্লোবাল সাউথের (দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নশীল বিশ্ব) শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সাথে তার শক্তিশালী সম্পর্কের বিষয়টি প্রদর্শনের একটি সুযোগ করে দেবে।
তিনি বলেন, এটি রাশিয়া ও চীনের জন্য ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতি থেকে মুক্ত থাকতে চাওয়া এবং নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চাওয়া অনেক দেশের মনোভাবকে কাজে লাগানোরও একটি সুযোগ প্রদান করছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনটি তার সময়ের দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরের দ্বিতীয় চীন-মার্কিন শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক পরপরই এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক রাষ্ট্রীয় সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্নেল ঝো বো আল জাজিরাকে বলেন, ব্রিকস নেতাদের একত্রিত হওয়া নতুন কিছু নয় এবং এটি তাদের বার্ষিক সম্মেলনেরই অংশ। তবে এ বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন—এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বেইজিং ও নতুন দিল্লির সম্পর্ক বেশ শীতল ও তিক্ত ছিল। তাই এই শীর্ষ সম্মেলনটি প্রেসিডেন্ট শি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য তাদের বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসনের একটি উপযুক্ত সুযোগ।
ইসরায়েলি-দখলকৃত সিরিয়ার ভূখণ্ডে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সফরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতানিয়াহুর এই সফরকে ‘অবৈধ প্রবেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) প্রকাশিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বুধবার সিরিয়ার ইসরায়েল-অধিকৃত এলাকায় নেতানিয়াহুর সফর দেশটির ‘সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য অবমাননা।
বিবৃতিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ‘লঙ্ঘন ও আগ্রাসন’ বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নতা চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদ, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
বুধবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ার ইসরায়েল-অধিকৃত জাবাল আল-শেখ এলাকায় সফর করেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি দাবি করেন, জাবাল আল-শেখ থেকে ইয়ারমুক নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ইসরায়েল নজিরবিহীন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে।
নেতানিয়াহুর এই সফরকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের অবৈধ লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের চুল-মেকআপে খরচ ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার
২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের দেশ-বিদেশের সরকারি কার্যক্রমে চুল সাজানো, মেকআপ এবং আনুষঙ্গিক প্রতিনিধিত্ব ব্যয় বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার খরচ করেছে দেশটির সরকার। তথ্য অধিকার আইনে করা এক আবেদনের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইনজীবী ইয়ারা উইঙ্কলার-শালিত তথ্য অধিকার আইনে আবেদনটি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট চুল ও মেকআপ ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই হয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারার সময়ে।
প্রকাশিত নথির একাধিক জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হেয়ারস্টাইলিস্ট ও মেকআপ শিল্পীদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য গোপন রাখার কারণ হিসেবে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে মাসভিত্তিক ব্যয়ের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর সময়ের আশপাশের সময়ের ব্যয়ও এতে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজাতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ডলার এবং মেকআপের জন্য ১ হাজার ৫৮০ ডলার খরচ করেছে রাষ্ট্র।
শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবরেই প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজানোর জন্য ৮১০ ডলার ব্যয় করা হয়। বিভিন্ন সরকারের সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৩ সালে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ডলার। এর আগের বছর ২০২২ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২৭ হাজার ৬০০ ডলার।
২০২৫ সালে এ ধরনের ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন সফরের সময় মেকআপ ও চুল সাজাতে ১৩ হাজার ৫০০ ডলার খরচ হয়। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন সফরেও একই খাতে ব্যয় হয়েছিল ১১ হাজার ৫০০ ডলার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর হাতে আসা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর এবং এর কাছাকাছি একাধিক স্থানে অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তার ঘটিয়েছে চীন। যার মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন ভবন, পাকা সড়ক এবং একাধিক হেলিপ্যাডসহ নানা স্থাপনা। এ কারণে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রত্যন্ত সীমান্ত গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী জানিয়েছে, চীনা সেনাবাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি ও শিকারের জমি ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
হিমালয়ের দুর্গম এই অংশের সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক দাবি-পাল্টা দাবি রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে ভারতীয় বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন। স্যাটেলাইট চিত্রে ফুটে ওঠা এই রূপান্তর সীমান্তবর্তী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অরুণাচল প্রদেশে সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা তাকোক ম্রা। পুরো অরুণাচল প্রদেশকেই চীন নিজেদের অংশ দাবি করে একে ‘জাংনান’ বা ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে ডাকে। ম্রা জানান, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে তিনি চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত।
ম্রা বলেন, ‘চীনারা এখন আমাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করছে। এই ভূখণ্ড থেকেই আমরা খাবার সংগ্রহ করি, বেঁচে থাকি এবং জীবিকা নির্বাহ করি; এটা আমাদেরই জমি। তারা ইতোমধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা ঠিক কত কিলোমিটার জায়গা দখল করেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, তবে তারা অনেক বড় এলাকা দখল করে নিয়েছে।’
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফর করছেন।শনিবার তিনি নয়াদিল্লী পৌঁছান। সেখানে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তম চীনা প্রতিনিধি দলের এই সফরকে কেন্দ্র করে উভয় সরকারই সীমান্ত উত্তেজনাকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, ২০২০ সালে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার প্রাণহানি ঘটানো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো কোনো অচলাবস্থা সীমান্তে নেই।
তবে স্যাটেলাইট চিত্র এবং সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের সাক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চিত্রগুলোতে বিতর্কিত ভূখণ্ডে চীনাদের ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, যা এখনো দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে।
ভ্যান্টর-এর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্রে বিশ্লেষকরা আপার সুবনসিরি উপত্যকায় একাধিক স্থানে সাম্প্রতিক নির্মাণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। তাকোক ম্রার গ্রাম ‘গেলেমো’ এই অঞ্চলেই অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংস্থা ‘জেনস’-এর তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে স্পষ্ট নির্মাণযজ্ঞ দেখা গেছে। এই এলাকাটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জেনসের বিশ্লেষকরা বলেন, ‘স্যাটেলাইট চিত্র নিশ্চিত করছে যে সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় সম্প্রতি নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে।’ তারা আরও যোগ করেন, স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ভারত ও চীন উভয়ের দাবি করা সীমান্তরেখা বসালে দেখা যায়—এই অবকাঠামোগুলোর কিছু অংশ দুই দেশেরই দাবি করা বিতর্কিত অঞ্চলের একেবারে ভেতরে পড়েছে।
ঝারি শহরের দক্ষিণে একটি স্থানে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল—যার প্রথম কাঠামো চোখে পড়ে ওই বছরের আগস্টে—যা এখনো চলমান রয়েছে। স্থানটিতে জমি সমান করা, প্রকৌশল যানের উপস্থিতি এবং সিমেন্ট তৈরির প্ল্যান্ট বসানোর প্রমাণ মিলেছে। বিশ্লেষকরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, এটি সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শহরের ভেতরে অপর একটি নির্মাণস্থল সামরিক স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনাও সমানভাবে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কাছাকাছি একটি সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে এবং খাড়া ঢাল কমানো হয়েছে—এমন উন্নয়ন সাধারণত ভারী সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়া সহজ করে এবং বছরজুড়ে সড়ক ব্যবহারের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হয়।
লহুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের বদলে একটি নতুন বড় হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়েছে এবং এর আরও দক্ষিণে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড গড়ে তোলা হয়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টের সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত একটি ভবনের ছাদ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রমাণ করে নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। ভবনের নকশা, সামরিক যানের সাথে মিল থাকা গাড়ির উপস্থিতি এবং সংলগ্ন প্রশিক্ষণ এলাকা দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে এটি সম্ভবত একটি সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে শহরের সঙ্গে সংযোগকারী একটি নতুন সড়কও তৈরি করা হয়েছে।
এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই অভিযোগগুলো সামনে এলো যখন চীন-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর—যা দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল—শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম দিল্লি সফর। এই সফরে তার সঙ্গে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার একটি বিশাল প্রতিনিধি দল রয়েছে।
লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে তীব্র উত্তেজনার জেরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এবার একাই বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের বরাতে জানা গেছে, প্রয়োজনে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সহায়তা ছাড়াই রিয়াদ এ অভিযান শুরু করতে পারে। তবে সৌদি আরব এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রও আপাতত হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে না।
দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এবিসি নিউজ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালাতে তারা প্রস্তুত। ওয়াশিংটন বর্তমানে রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা দিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত হুতিদের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই ওয়াশিংটনের। তবে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি আরও বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে গিয়ে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সৌদি যুবরাজ যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চাইছেন। তবে তিনি এটিকে তাৎক্ষণিকভাবে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেননি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে চায় ওয়াশিংটন। তবে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুতিদের হামলা আরও বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদিসংশ্লিষ্ট জাহাজে হুথিদের হামলা বাড়ায় পুরো অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে বাব-এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক নৌচলাচল বন্ধ বা ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্নের মুখে মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা
সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে গত মাসে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে। হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও সংহতি জানালেও সৌদি আরবের পাশে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি চুক্তির অংশীদার তুরস্ক ও পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত সংঘাতে সরাসরি না জড়িয়ে রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা ও ড্রোন সক্ষমতাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দিতে পারে দেশ দুটি।
গত সপ্তাহে সৌদি আরবে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দেয় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। হামলায় বেসামরিক স্থাপনাসহ দেশটির চারটি শহর ও একটি তেল শোধনাগার আক্রান্ত হয়।
এ হামলার পর মূলত দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, তেল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে সৌদি আরব কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে এবং দ্বিতীয়ত, দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মক্কা চুক্তি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
হুতিদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই সরাসরি সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেয়নি।
গত মাসে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সে হিসাবে সৌদি আরবে হামলার পর চুক্তির সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
বিদেশ সফরে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তায় নানা ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বিষয় বেশ অস্বাভাবিক। বিদেশ সফরকালে পুতিনের ব্যবহৃত মল-মূত্রসহ শারীরিক বর্জ্যও সংগ্রহ করে রাশিয়ায় নিয়ে যান তার নিরাপত্তারক্ষীরা। উদ্দেশ্য—বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে যেন তার শারীরিক অবস্থা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো তথ্য না যায়।
সম্প্রতি ভারত সফরকে কেন্দ্র করে পুতিনের এই বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা আবারও আলোচনায় এসেছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সফর শেষে পুতিনের ব্যবহৃত বর্জ্য বিশেষভাবে সংগ্রহ করে সিলগালা করা ব্রিফকেসে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের বডিগার্ডরা তার ব্যবহৃত মল-মূত্র সংগ্রহ করে বিশেষ ব্যাগ বা পাত্রে সংরক্ষণ করেন। পরে সেগুলো সিলগালা করে নিরাপত্তার সঙ্গে বিমানে তোলা হয়। বিদেশ সফরে পুতিনের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
সাবেক বিবিসি সাংবাদিক ফরিদা রুস্তমোভা জানিয়েছেন, পুতিন ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার নেতৃত্বে আসার পর থেকেই বিদেশ সফরে এ ধরনের ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছেন। এমনকি সফরকালে তার ব্যবহারের জন্য বিশেষ বহনযোগ্য টয়লেটও রাখা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুতিনের বর্জ্য রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষাকে দেখানো হয়েছে। মানুষের মল-মূত্রের নমুনা বিশ্লেষণ করেও শরীরের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এসব নমুনা সংগ্রহ করতে পারলে পুতিনের শারীরিক অবস্থা, সম্ভাব্য রোগ বা চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাশিয়া সেই ঝুঁকি এড়াতেই এত কঠোর ব্যবস্থা নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পুতিনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রাশিয়ার ফেডারেল প্রোটেক্টিভ সার্ভিস (এফএসও) বিদেশ সফরের এসব বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করে। তার দৃশ্যমান নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি কাজ করেন প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এসবিপি) বিশেষ প্রশিক্ষিত সদস্যরা।
শুধু বর্জ্য সংগ্রহ নয়, পুতিনের খাবার নিয়েও নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তার খাবারে বিষপ্রয়োগ ঠেকাতে রান্নার আগে উপাদান পরীক্ষা করা হয়। খাবার পরিবেশনের আগে নিরাপত্তারক্ষীরা তা পরীক্ষা করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশ সফরে পুতিনের যাতায়াত ব্যবস্থাও অত্যন্ত সুরক্ষিত। তার জন্য ব্যবহৃত রুশ তৈরি আউরাস সেনাট লিমুজিনকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সজ্জিত রাখা হয়। পাশাপাশি তার বিশেষ বিমানেও থাকে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম।
পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার এই বিস্তৃত আয়োজনের মধ্যে মল-মূত্র সংগ্রহ করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে অস্বাভাবিক হলেও এর পেছনে রয়েছে তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যও যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠতে পারে, পুতিনকে ঘিরে নেওয়া এই ব্যবস্থা তারই ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান কোনো অবস্থাতেই নতি স্বীকার করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার ভারতীয় ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, সামরিক ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। খাদ্য সরবরাহ, নিরাপদ পানি, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে বিপন্ন করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সংঘাত যদি সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই হয়ে থাকে, তবে কেন সাধারণ নাগরিকদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপাদান ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—সে বিষয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তোলেন।
বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তির আধিপত্যবাদী আচরণের বিরোধিতা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, কোনো শক্তিশালী দেশেরই অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈরী আচরণের মোকাবিলায় চড়া মূল্য দিতে হলেও ইরান তার জাতীয় মর্যাদা ও নীতিগত অবস্থান থেকে কখনো পিছু হটবে না। একই সঙ্গে নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মানবাধিকারবিষয়ক দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রভাবশালী জোট ব্রিকসের বহুল প্রতীক্ষিত ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মিলনে যোগ দিতে বিশ্বমঞ্চের প্রভাবশালী নেতারা নয়াদিল্লিতে সমবেত হয়েছেন। সম্মেলনে সশরীরে অংশ নিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছান। এ ছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানসহ জোটভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে সমগ্র নয়াদিল্লি জুড়ে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্বনেতাদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ভিভিআইপি করিডোর ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপ্রযুক্তির বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মোটরকেডের গতিবিধি এবং রাজধানীর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মতো সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবারের শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার প্রচলন ত্বরান্বিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্যসূচি হিসেবে স্থান পাচ্ছে। রবিবার পর্যন্ত নির্ধারিত এই সম্মেলনে জোটের মূল ১১টি সদস্য রাষ্ট্র ও ১০টি অংশীদার দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন আমন্ত্রিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পর সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যুক্ত হয়।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক আগে গঠিত এই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে। পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর একক বিকল্প হয়ে ওঠার পথে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্রিকস প্ল্যাটফর্মটি মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন বিকল্প শক্তির বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে বদলে গিয়েছিল বিশ্বের ইতিহাস। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভেনিয়ার একটি নির্জন মাঠে চারটি বিমান হামলায় প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার মানুষ। এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের শোক, স্বজন হারানোর বেদনা এবং সামাজিক ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ভয়াবহ ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী। নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে জড়ো হন নিহতদের স্বজন, সহকর্মী, উদ্ধারকর্মী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সাবেক চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে, যে মুহূর্তে প্রথম বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হেনেছিল, নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এরপর হামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।
এবারের আয়োজনে যুক্ত হয়েছে বিশেষ তাৎপর্যের আরেকটি নীরব মুহূর্ত। প্রচলিত ছয়টি নীরবতার পাশাপাশি সপ্তম নীরবতা পালন করা হয় সেই হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্মরণে, যারা হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলা ও বাতাসের সংস্পর্শে এসে দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণ হারান।
ধ্বংসস্তূপের মৃত্যু থামেনি: ৯/১১-এর দিন নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ জন দমকলকর্মী প্রাণ হারান। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল সেখানেই শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ এবং পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ধুলার সংস্পর্শে আসা আরও ৬০০ জনের বেশি ফায়ারফাইটার পরবর্তী সময়ে মারা গেছেন। শুধু ২০২৬ সালেই এ ধরনের কারণে ২৬ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে।
সাবেক ফায়ারফাইটার প্যাট্রিক হোয়েলানের পরিবারের সদস্যরা এখনো সেই সময়ের ক্ষোভ ও প্রশ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তার ছেলে মনে করেন, হামলার পর উদ্ধারকর্মীদের যে পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল, সেটি নিরাপদ ছিল না। নিরাপদ বাতাসের আশ্বাসের বিপরীতে পরবর্তী বছরগুলোতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা সেই দাবিকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বদলে গেছে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র: ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বরাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্তরে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন।
বিমানবন্দর ও সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বিশ্ব। ৯/১১-পরবর্তী সেই পরিবর্তনের প্রভাব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দৃশ্যমান।
এর পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয় গভীর বিভাজন। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধ বেড়ে যায়। ২৫ বছর পরও সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি অনেক পরিবারের কাছে বেদনার।
নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকে এ বছরের স্মরণানুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার জন্য কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এতে ৯/১১-এর স্মরণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে আসে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে পুরোনো ইতিহাস: ৯/১১-এর ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা সেই দিনের কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি বহন করে না। হামলার সময় যারা শিশু ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন মধ্যবয়সে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ৯/১১ মূলত ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
তবু সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত শোক। ফ্লাইট ১১-এর ক্যাপ্টেন জন ওগনোওস্কির মেয়ে ক্যারোলিন ওগনোওস্কি এ বছর প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। বাবার সমাধিতে সন্তানকে নিয়ে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রজন্ম বদলালেও হারানোর শূন্যতা বদলায় না।
বাবাকে স্মরণ করে তার আকুতি—তার বাবা কোনোদিন নাতিকে দেখে যেতে পারেননি, আর তার সন্তানও কোনোদিন জানতে পারবে না তার নানা কেমন মানুষ ছিলেন। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৯/১১-এর ইতিহাস এবং সেদিনের নায়কদের গল্প পৌঁছে দেওয়াকে তিনি নিজেদের দায়িত্ব মনে করেন।
২৫ বছর পরও অমলিন ক্ষত: সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে নিউইয়র্কের আকাশরেখা, বদলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বদলেছে বিশ্বরাজনীতির গতিপথ। কিন্তু ৯/১১-তে প্রিয়জন হারানো মানুষের কাছে ২৫ বছরও যথেষ্ট দীর্ঘ সময় নয়।
গ্রাউন্ড জিরোর নীরবতা, স্বজনদের চোখের জল এবং উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—৯/১১ শুধু ২০০১ সালের একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি এমন এক ক্ষত, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও ছড়িয়ে আছে।
একটি ভয়াবহ সকাল থেকে শুরু হওয়া সেই অধ্যায়ের ২৫ বছর পূর্ণ হলো। শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হলো নিহতদের, স্মরণ করা হলো উদ্ধারকর্মীদের আত্মত্যাগ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ৯/১১ যতই পুরোনো হোক, স্বজন হারানো মানুষের কাছে সেই দিনের বেদনা এখনো তাজা।