মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল বুধবার নাভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়।
করোনা শনাক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে করে ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশে রওনা দেন বাইডেন। সেখানে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে তার দায়িত্ব পালন করবেন।
উড়োজাহাজে ওঠার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ভালো বোধ করছি।’
এর আগে ২০২২ সালেও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
গ্রিনল্যান্ড দখল বা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার বিষয়ে হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা একেবারেই অর্থহীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো অধিকার নেই।
মেটে ফ্রেডেরিকসেন আরও বলেন, ড্যানিশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশের কোনো একটিকেও যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ত করার অধিকার নেই।
ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য এসেছে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলারের একটি টুইটের পর। ওই টুইটে তিনি গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ‘শিগগিরই’ শব্দটি লিখে পোস্ট করেন।
এর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। তিনি গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করে এমন দাবি করেন। ফ্রেডেরিকসেনের বক্তব্যের পরও ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি; বরং আরও জোর দিয়ে একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন।
ডেনিশ সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘খুব স্পষ্ট’ ভাষায় কথা বলছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ডেনমার্ক ও সেই সূত্রে গ্রিনল্যান্ড ন্যাটো সদস্য ও জোটের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার পায়। পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারে ডেনমার্ক এরই মধ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জোরালোভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করছি, একটি ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের বিরুদ্ধে এবং আরেকটি দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করতে, যারা খুব স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে যে তারা বিক্রির জন্য নয়।
এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নিজের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, আর ডেনমার্ক সেটা করতে পারবে না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত কেটি মিলারের পোস্টের জবাবে একটি বন্ধুসুলভ বার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক মিত্র দেশ এবং ডেনমার্ক তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে।
এই কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ এর আগের দিন শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। ওই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা চালাবে ও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
ভেনিজুয়েলায় হামলা করার আগ থেকেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলে ট্রাম্প। এমনকি এ জন্য তিনি শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে, কারণ দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিপুল মজুত রয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছে, যা ডেনমার্কে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করেন প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ। ১৯৭৯ সাল থেকে অঞ্চলটি ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা চান। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা রয়েছে।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রতি কড়া বার্তা দেন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ইয়াইর লাপিদ। তিনি বলেন, ভেনিজুয়েলায় যা ঘটছে, তা তেহরানের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে জোরপূর্বক সরানোর ঘটনা এমন সময় ঘটলো, যার মাত্র কয়েকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দেন।
তিনি বলেন, এখন আমি শুনছি যে ইরান আবারও তাদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যদি তারা তা করে, তাহলে আমাদের তাদের ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা তাদের ধ্বংস করবো। আমরা তাদের ধ্বংস করে দেবো।’
যুদ্ধের শঙ্কা জোরদার
যদিও কারাকাস ও তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধের পটভূমি আলাদা, তবু বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা জোরদার করছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, নতুন এক ধরনের আইনহীনতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করছে এবং যুদ্ধকে আরও সম্ভাব্য করে তুলছে। তার মতে, হয় ট্রাম্প সীমিত পরিসরে সরকার পরিবর্তনের ধারণায় আকৃষ্ট হচ্ছেন, অথবা ইসরায়েলকে একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে—দুটি ক্ষেত্রেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে চাপ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলো গতি পাচ্ছে।
আবদি আরও বলেন, মাদুরোর অপহরণ ইরানকে এমন পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করতে পারে, যা সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা ঘটাবে। এর মধ্যে সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা বা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগেই পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
আত্মসমর্পণ করবে না ইরান
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মরতাজাভি বলেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ চাপের নীতি স্পষ্ট করেছে, যা কূটনীতির পথকে আরও সংকুচিত করছে।
তিনি বলেন, তেহরান থেকে যা শোনা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়—এই প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তারা আগ্রহী নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কার্যত পূর্ণ আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, এতে সংঘাতের পথই প্রশস্ত হচ্ছে এবং ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
ইরান–ভেনিজুয়েলার ঘনিষ্ঠতা
ইরান–ভেনিজুয়েলা জোট প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদুরো সরকার মাদক পাচার নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা মধ্যপ্রাচ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে।
মাদুরো অপসারিত হওয়ায় ইরানের আগে থেকেই সীমিত মিত্রের সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি ক্ষয়ের পর এই ধাক্কা তেহরানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান সরকার দ্রুতই ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতিসংঘের সদস্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মারাত্মক লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রুবিও ইঙ্গিত দেন, মাদুরোকে অপহরণ ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শত্রুর কাছে তারা নতি স্বীকার করবেন না।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভেনিজুয়েলার ভেতরেও মাদুরো অপসারণে এখনো সরকার ভেঙে পড়েনি। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এতে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত রয়েছে। ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেন, তার দাবি না মানলে রদ্রিগেজকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ইরান নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা ওয়াশিংটনকে অন্যত্র, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ থেকে সাময়িকভাবে হলেও বিরত রাখতে পারে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
ইরানে ‘কঠিন হামলার’ হুমকি ট্রাম্পের
ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর এবার ইরানকে সরাসরি হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে যদি আবারও বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব শক্ত আঘাত’ হানবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
রোববার গভীর রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি তারা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার কথায়, অতীতের মতো যদি ইরানে মানুষ হত্যা শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খুব কঠোর প্রতিক্রিয়া আসবে।
ট্রাম্প এর আগেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের প্রাণহানি হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে।
এদিকে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে। সোমবার সকালে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি কর্মকর্তাদের বক্তব্য সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ইহুদবাদী সত্তা’ ইরানের জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানার যেকোনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, ভেনিজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান ও বক্তব্যকে ‘ঔপনিবেশিক যুগের চিন্তাধারা’ বলে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওয়াশিংটনের মন্তব্যগুলো আসলে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যই প্রকাশ করছে।
সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসমাইল বাঘাই বলেন, ইরান ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও তেহরানের পররাষ্ট্রনীতিতে এই নীতিই অনুসরণ করা হবে।
ভেনেজুয়েলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দেশটির শাসনভার নেওয়ার কথা ভাবছেন—এমন খবরের প্রতিক্রিয়ায় বাঘাই বলেন, অতীতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার স্লোগান তুলে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তারা খোলাখুলিভাবেই বলছে, আসল বিষয় ভেনিজুয়েলার তেল।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে আটকের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে কলম্বিয়া ও কিউবার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। গত রোববার গভীর রাতে প্রেসিডেন্টর বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কলম্বিয়ার বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, পেত্রোর শাসনামলে কলম্বিয়া বর্তমানে চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন উৎপাদন ও সরবরাহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি পেত্রোকে একজন ‘অসুস্থ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করে সাফ জানিয়ে দেন যে, কলম্বিয়ার বর্তমান শাসন ব্যবস্থা এভাবে বেশিদিন চলতে দেওয়া হবে না।
কলম্বিয়ায় সরাসরি কোনো সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, এ ধরনের একটি পরিকল্পনা তাঁর কাছে বেশ ‘ভালো’ বা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে, যা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের নতুন সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। কলম্বিয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প কিউবা নিয়েও তাঁর কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তবে তাঁর মতে, কিউবার বর্তমান সরকারের পতনের জন্য হয়তো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ হিসেবে তিনি দেশটির চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। ভেনেজুয়েলা থেকে আসা জ্বালানি তেল ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবা বর্তমানে কার্যত দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং যে কোনো সময় দেশটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের দাবি, কিউবান-আমেরিকানরা এই সম্ভাব্য পরিবর্তনে অত্যন্ত আনন্দিত হবেন। ট্রাম্পের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে ব্যাপক উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া মজলিশে ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান ও ভারতের লোকসভার সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়াইসি।
সম্প্রতি এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ওয়াইসি বলেন, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘এক বোন’ বসে আছেন—তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া হোক। তিনি বলেন, মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকার রাজ্যের জনগণকে বলছে যে তারা বাংলাদেশিদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে দিল্লিতে থাকা ওই ব্যক্তিকেও বাংলাদেশে পাঠানো হোক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস-এর খবরে বলা হয়েছে, ওয়াইসি বলেন, ‘মহারাষ্ট্র সরকার বলছে তারা বাংলাদেশিদের বের করে দিয়েছে। তাহলে মোদি জির বোন হিসেবে দিল্লিতে যে বসে আছেন, তাকেও বাংলাদেশে পাঠান।’ এ সময় সমাবেশে উপস্থিত জনতা হর্ষধ্বনিতে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানায়।
ওয়াইসি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, যদি তারা চান হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠানো হোক, তাহলে স্লোগান দিতে। তার আহ্বানে জনতা ‘নারায়ে তকবির’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেয়। পরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, মোদি জি, এই আওয়াজ শুনুন। তাকে নিয়ে যান, তাকে বের করে দিন, তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দিন।
এর আগেও ওয়াইসি বাংলাদেশের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বিহারের পূর্ণিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) বিহারে তথাকথিত বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আশ্রয় দিচ্ছে।
এ অভিযোগের জবাবে ওয়াইসি বলেন, বিহারে কোনো বাংলাদেশি নেই, বিশেষ করে সীমাঞ্চল এলাকাগুলোতে—যেখানে আগের নির্বাচনে তার দল ভালো ফল করেছিল। তিনি বলেন, মোদিজি বলছেন বিহারে বাংলাদেশি আছে। কিন্তু বিহারে বা সীমাঞ্চল অঞ্চলে কোনো বাংলাদেশি নেই। তবে আপনার দিল্লিতে বাংলাদেশ থেকে আসা এক বোন বসে আছেন। তাকে সীমাঞ্চলে আনুন, আমরাই তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেব।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি সেনাসদস্যও রয়েছেন বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউইয়র্ক টাইমস এক জ্যেষ্ঠ ভেনিজুয়েলান কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্কিন হামলায় নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনিজুয়েলার মাটিতে সেনা নামানোর আগে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে বড় পরিসরে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করতে ১৫০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়। ফলে সামরিক হেলিকপ্টারগুলো নিরাপদে সেনা নামাতে সক্ষম হয়। পরে সেই সেনারাই মাদুরোর অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালায়।
হতাহতের সংখ্যা কিংবা অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সময় গত শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানোকে ‘শক্তিশালী চমকপ্রদ প্রদর্শন’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে।’
এদিকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল কৌঁসুলিরা গত শনিবার একটি অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছেন। এতে মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের অভিযোগসহ একাধিক অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে, যা লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান চীনের
যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের জোরপূর্বক আটককে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক আটক এবং দেশ থেকে বের করার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘ সংস্থার উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে, ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাতের চেষ্টা বন্ধ করতে এবং সকল বিষয় আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালত জানিয়েছে।
গতকাল রোববার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার শূন্যতা এড়াতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে বলা হয়, প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকার পরিচালনার বৈধতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আইনগত কাঠামো প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে আদালত আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আপাতত ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থা কার্যকর হলো।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করলে দেশটিতে সরাসরি সেনা মোতায়েন করা হবে না।’ নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে বহুবার কথা বলেছি, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন।’
ট্রাম্প আরও জানান, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ভেনিজুয়েলার ক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেন, ‘ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন, তাহলে সেখানে সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। পাল্টা হুমকিতে তিনি বলেছেন, ইরান শত্রুদের কাছে মাথা নত করবে না, বরং শত্রুরা ইরানের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য হবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই দুদেশের শীর্ষ নেতার এমন কথার লড়াই চলেছে। খামেনি জানিয়েছেন, তার দেশে চলা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবন প্রভাবিত হচ্ছে। মুদ্রার ওঠানামা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
তবে এসব সমস্যার জন্য তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন। একই সঙ্গে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। খামেনি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য হলেও সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
খামেনি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপে বসেন এবং দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের সঠিক পথে ফেরানোরও নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের হুমকি অবশ্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও ভালোভাবে নেননি। তিনি ট্রাম্পের হুমকিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আরাঘচির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও বক্তব্য এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং তা সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপের শামিল।
তিনি বলেন, জনসম্পদের ওপর অপরাধমূলক হামলা ইরান কোনোভাবেই সহ্য করবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানি সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইরানে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে এসেছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও তুলে নেওয়ার ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কলম্বিয়ার অনুরোধে সোমবার (৫ জানুয়ারি) এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে যেখানে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের আলোচনায় বর্তমান সংকটের বিভিন্ন দিক উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর আগে অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসেও ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ দুই দফা বৈঠক করলেও সাম্প্রতিক এই অভিযানের ফলে পরিস্থিতি এখন আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় একটি সুশৃঙ্খল ও সঠিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনই দেশটি পরিচালনা করবে। তবে এই পরিচালনা প্রক্রিয়ার কাঠামো বা পদ্ধতি ঠিক কেমন হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। এই পদক্ষেপকে 'ঔপনিবেশিক যুদ্ধ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মোনকাদা একটি প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত সরকারকে ধ্বংস করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এই অভিযানের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন যে, এটি কোনো শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা নয় বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ। তিনি মাদুরোকে একজন অবৈধ স্বৈরশাসক ও মাদক-সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে সোমবারের বৈঠকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের লোকসভার সদস্য এবং অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ওয়াইসির এই কড়া রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
জনসভায় ওয়াইসি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, মহারাষ্ট্র ও মুম্বাইয়ের জনগণের কাছে সরকার দাবি করছে যে তারা বাংলাদেশিদের বিতাড়িত করেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি মোদিকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করেন যে, সরকার যদি সত্যিই অনুপ্রবেশকারীদের সরাতে চায়, তবে দিল্লিতে বসে থাকা ‘বোনকে’ কেন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে জনসভায় উপস্থিত সমর্থকরা ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
ওয়াইসি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণের এই দাবি শুনুন এবং দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে বের করে বাংলাদেশে পৌঁছে দিন। এটিই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিহারে এক নির্বাচনী সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি যখন বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, তখনও ওয়াইসি পাল্টা জবাবে শেখ হাসিনাকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
সে সময় বিহারের পূর্ণিয়ায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ওয়াইসি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি বাংলাদেশিদের উপস্থিতির বিষয়ে চিন্তিত হন, তবে যেন দিল্লি থেকে তাঁর সেই ‘বোনকেও’ ফেরত পাঠান। তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে, বিতর্কিত ওই ব্যক্তিকে যদি সীমাঞ্চল অঞ্চলে আনা হয়, তবে তাঁরা নিজেরাই তাঁকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। ওয়াইসির এসব বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অনড় অবস্থান ও ভারত সরকারের নীতির প্রতি তীব্র সমালোচনা পুনরায় সামনে এলো।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে একটি সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলের মজুতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ওয়াশিংটনের এত গভীর আগ্রহের নেপথ্যে আসলে কী কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রহের মূল কারণ লুকিয়ে আছে দুই দেশের জ্বালানি তেলের গুণগত মানের ভিন্নতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পদক্ষেপ মূলত তাদের নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও মজবুত করার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি তেলের মজুত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হলেও সেই তেল মূলত হালকা প্রকৃতির, যাকে প্রচলিত ভাষায় ‘সুইট ক্রুড’ বলা হয়। এই ধরনের তেল গ্যাসোলিন বা পেট্রোল তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হলেও শিল্পকারখানা বা ভারী যানবাহনের জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে যে অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত ভারী ও ঘন। এই ‘হেভি ক্রুড’ বা ভারী তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, অ্যাসফল্ট এবং শিল্পকারখানার ভারি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য। ফলে নিজেদের হালকা তেলের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি বিষয়।
তেলের গুণগত মানের পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহের একটি বড় কারণ। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ভৌগোলিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করতে যে পরিমাণ পরিবহন ব্যয় ও সময় প্রয়োজন হয়, ভেনেজুয়েলা থেকে তা সংগ্রহ করতে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হবে। ইআইএ-এর হিসেব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক সরবরাহের মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই বিশাল অব্যবহৃত মজুতকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইরানে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুমকির মুখে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার প্রচারিত এক বিশেষ বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই কোনো বহিঃশত্রুর চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগকে তিনি যৌক্তিক বলে অভিহিত করলেও, যারা সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছেন বা দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছেন, তাদের কঠোরভাবে দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বৈধ দাবি নিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের কথা শোনা হবে, তবে দাঙ্গাকারীদের সাথে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং তাঁদের এই দুর্দশার কথা খামেনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যদিও সরকারিভাবে মাত্র তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়েছে। কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা ‘হেংগাও’ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সশস্ত্র চড়াও হয় এবং তাঁদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধারে সরাসরি এগিয়ে আসতে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও ট্রাম্প তাঁর সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেননি, তবে তাঁর এই অবস্থান তেহরানকে আরও রক্ষণাত্মক ও কঠোর হতে বাধ্য করছে।
নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রার দরপতন ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক অঞ্চলে সরকার সাধারণ মানুষের জন্য পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা একে অপরকে রাজপথে নামার আহ্বান জানাচ্ছেন। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই খামেনি নতি স্বীকার না করার এই বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় চাপকেই মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি ইরানকে এক নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এর আগে শনিবার ভোরে তাঁকে একটি গোপন সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছিল, যেখান থেকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তাঁকে নিউ ইয়র্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ডিইএ) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁকে ব্রুকলিনের এই বিশেষ ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে এই কারাগারটি এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে মার্কিন প্রশাসন। আদালত সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে তাঁকে এই অভিযোগগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। মাদুরোর পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীকেও নিউ ইয়র্কের আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে, যদিও তাঁর বর্তমান অবস্থান বা শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। উল্লেখ্য যে, নিকোলাস মাদুরো শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং বিষয়টিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রুকলিনের এই মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারটি বন্দিদের জন্য অত্যন্ত ‘কুখ্যাত’ এবং ‘ভয়ঙ্কর’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর আগে ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং জনপ্রিয় র্যাপার পি ডিডির মতো অতি পরিচিত ও হাই-প্রোফাইল বন্দিদের এখানে রাখার ফলে কারাগারটি বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। এই কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অত্যন্ত নিম্নমানের এবং এখানে প্রায়ই চরম সহিংসতা ও দাঙ্গার মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এমনকি জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বন্দিদের সুচিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘদিন নির্জন কারাকক্ষে আটকে রাখার মতো অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি বৈরী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার লক্ষ্যে দেশটিতে চালানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতর্কিত সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে যেমন ভেনেজুয়েলার সরকারি বাহিনীর সেনাসদস্য রয়েছেন, তেমনি বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকার হয়েছেন। ভেনেজুয়েলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, মার্কিন বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মূলত মাদুরোর অবস্থান লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হলেও রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
অভিযানের কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার মাটিতে সরাসরি পদাতিক সেনা নামানোর আগে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এজন্য প্রায় ১৫০টিরও বেশি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল, যারা আকাশ থেকে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা বলয় ধ্বংস করে দেয়। আকাশপথ নিরাপদ হওয়ার পর মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টারগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কমান্ডো সদস্যদের নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দেয়। এই বিশেষ বাহিনীই পরবর্তীতে সরাসরি লড়াইয়ের মাধ্যমে মাদুরোর অবস্থানস্থল নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গত শুক্রবার স্থানীয় সময় শেষ রাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কেবল নিকোলাস মাদুরো নন, বরং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেন্সকেও মার্কিন বিমান বাহিনী আটক করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে। এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, মাত্র চার দিন আগে তিনি এই অভিযানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। তিনি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পুরো অভিযানটিকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সাথে তুলনা করেছেন। যদিও এই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে এই ঘটনাটি দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অনুপস্থিতিতে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ডেলসি রদ্রিগেজকে এই গুরুদায়িত্ব প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এছাড়া প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সরকার পরিচালনার জন্য কোন ধরনের আইনি কাঠামো প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে আদালত আরও বিস্তারিত পর্যালোচনা ও আলোচনা চালিয়ে যাবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আটক করার খবরের পর থেকেই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতুহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তবে দেশটিতে সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়বে না। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন এবং তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আরও জানান যে, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ডেলসি রদ্রিগেজের একাধিকবার কথা হয়েছে এবং তিনি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাষ্ট্রক্ষমতা এখন কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—সেই সমীকরণে রদ্রিগেজের এই দায়িত্ব গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত এই নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমেই ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং মাদুরোর আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী দিনে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত রদ্রিগেজ ও ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমন্বয় ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে কী পরিবর্তন নিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।