আফগানিস্তানে মিক্সড মার্শাল আর্ট (এমএমএ) নিষিদ্ধ করেছে তালেবান সরকার। সরকারের ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এ কথা বলেছেন। ইসলামি আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ওই ক্রীড়া কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টোলোনিউজকে বলেছেন, খেলাটি কেবল ধর্মের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণই নয়, এটি যথেষ্ট নৃশংস। এতে মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে।
আফগানিস্তানের নৈতিকতা মন্ত্রণালয়ের অধীন নীতি পুলিশ এই আইন পাস করিয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে তালেবানের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ‘শরিয়া আর ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে এই খেলাটি সংঘর্ষপূর্ণ। এ কারণেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।’
এমএমএ বর্তমান বিশ্বের আর সব দেশের মতো আফগানিস্তানেও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খেলা। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে এই খেলার অসংখ্য ভক্ত তৈরি হয়েছিল। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এমএমএ কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে পড়ছিল। ২০২১ সালে ‘মুখে ঘুষি মারা হয়’ এমন খেলা আইনত দণ্ডনীয় বলে ঘোষণা করে সরকার।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এমএমএ খেলোয়াড়রা অভিযোগ করেছে, তালেবানের কর্মকর্তারা তাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার পর বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। শিপিং ডেটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের দুই প্রবেশমুখে বর্তমানে শত শত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ১৫০টি বিশালাকার ট্যাংকার এখন হরমুজ প্রণালির বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর ফেলে অবস্থান করছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজি বাহী জাহাজের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া প্রণালির অপর প্রান্তেও কয়েক ডজন জাহাজ স্থির দাঁড়িয়ে আছে।
শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, শনিবার সকালে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর পুরো অঞ্চল নতুন করে যুদ্ধের কবলে পড়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ জাহাজ এখন ইরাক, সৌদি আরব এবং কাতার উপকূলের কাছে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণহরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ: বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোট এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালির এই ‘চোকপয়েন্ট’ বা সরু মোড়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজগুলো এমনভাবে অবস্থান করছে যেগুলোকে ‘ভাসমান তেলের পাহাড়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ইতোমধ্যে বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউস নিরাপত্তার স্বার্থে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। শিপিং তথ্য বলছে, কাতারের মতো এলএনজি জায়ান্ট এবং সৌদি আরবের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি কার্যক্রম এখন পুরোপুরি থমকে যাওয়ার পথে। এই অচলাবস্থার ফলে কেবল জ্বালানি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজ সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিন বিশ্ববাজারে লেনদেন শুরু হতেই তেলের দাম ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, ইরানে হামলার আগে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, হামলা যদি সীমিত পরিসরে হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ মার্কিন ডলার করে বাড়তে পারে। তবে খামেনি নিহত হওয়ার পর এই পূর্বাভাস থেকে সরে এসেছেন বিশ্লেষকেরা। তারা এখন বলছেন, সোমবার দিনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে হয়তো তেলের দাম ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জি বলেছে, সোমবার সপ্তাহের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসাবে ব্যারেলপ্রতি তেলের বেড়ে ৯০ ডলারে ঠেকতে পারে। অবশ্য আজ রোববার যদি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, তাহলে এতটা নাও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আবার তেলসমৃদ্ধ ওপেক জোট এবং রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী বড় দেশগুলো যদি উৎপাদন বাড়াতে সম্মত হয়, তাহলেও দরবৃদ্ধি খুব একটা হবে না।
রাইস্টাড বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহন যদি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম হয়তো ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম-পরিচয় জানায়নি কর্তৃপক্ষ। অবশ্য বিভিন্ন সূত্র বলেছে, নিহত ওই বাংলাদেশির নাম সালেহ আহমদ। তিনি ইরানের আজমান প্রদেশে কর্মরত ছিলেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কুয়েতে ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সালেহ আহমদ সেখানে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যায় ইফতারের পর কাজে বের হলে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তার। নিহত সালেহ আহমেদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা এলাকার বাসিন্দা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সালেহ আহমেদ ইফতার শেষে জরুরি খাদ্য পানীয় সরবরাহের কাজে বের হন। তার সঙ্গে আরও একজন সহকর্মী ছিলেন। হঠাৎ আকাশে আগুনের মতো উজ্জ্বল একটি বস্তু দেখা যায়। মুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সালেহ আহমেদ গুরুতর আহত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন। তার শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরে সিভিল ডিফেন্স ও পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠায়। আজ রোববার সকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। তবে এখনো এ বিষয়ে আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
নিহত সালেহ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে কাজ করছিলেন। দেশে তার মা, স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
সালেহ আহমেদের চাচাতো ভাই মাহবুব আলম চৌধুরী বলেন, সন্ধ্যার তার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তবে কী কারণে মৃত্যু হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। তার মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কুয়েতে ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। তারা সরকারি ফারওয়ানিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন।
রোববার কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত ড্রোন হামলায় চারজন বাংলাদেশি কর্মী আহত হন।
কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন রোববার কুয়েতের ফারওয়ানিয়া হাসপাতালে ড্রোন হামলায় চিকিৎসাধীন প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসা এবং তাদের সার্বিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। পশ্চিমা বিশ্বের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুর সংবাদে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইসরায়েলের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘কাতার টুডে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাজধানী তেহরানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলার অংশ হিসেবেই আহমাদিনেজাদের বাসভবনে এই আক্রমণ চালানো হয়।
উক্ত অভিযানের বিষয়ে তথ্য প্রদানকালে “ইসরায়েলের একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।” এছাড়া হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে “সূত্রটি বলেছেন, ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অংশ হিসেবে আহমেদিনেজাদের বাড়ি টার্গেট করা হয়।”
উল্লেখ্য যে, মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ইরানের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। কট্টরপন্থি রাজনৈতিক আদর্শ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন। বিশেষ করে ২০০৯ সালের নির্বাচনে পুনরায় জয়লাভের পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তিনি। তার শাসনামলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দেশটির চরম বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর বেইত শেমেশে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, এই হামলায় আরও ৮ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। রোববার (১ মার্চ) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
রবিবার জেরুজালেম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বেইত শেমেশ শহরে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় জরুরি সেবা সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের তথ্যমতে, সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন।
উক্ত হামলার ভয়াবহতা সম্পর্কে সংস্থাটির মুখপাত্র জাকি হেলার এক টেলিভিশন বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘বেইত শেমেশে সরাসরি আঘাতে ৮ জন নিহত হয়েছেন।’
উল্লেখ্য যে, এর আগে ইরানের রাজধানী তেহরানের বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকাসহ মোট ৭টি স্থানে হামলার খবর পাওয়া যায়। তবে ওইসব হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু কিংবা আক্রান্তরা সামরিক বা সরকারি বাহিনীর সাথে যুক্ত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে তীব্র উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ ও ‘গুণ্ডামি’ হিসেবে অভিহিত করেছে উত্তর কোরিয়া। রোববার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলা ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের এক চরম লঙ্ঘন। পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এমন আধিপত্যবাদী আচরণ এবং আগ্রাসন কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না এবং এই ধরণের আগ্রাসনের যুদ্ধ বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানায় উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের এই কড়া প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে একটি নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তেহরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নতুন করে বিমান হামলা শুরু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে। এই যৌথ হামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়ায় ইরানও অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই ঘটনার কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো এক শোকবার্তায় খামেনির মৃত্যুকে ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। পুতিন আরও বলেন, এই হামলা মানবিক নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোর এমন অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন এক বিশাল নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবরে ভারতের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তরপ্রদেশে ব্যাপক উত্তেজনা ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় খামেনির নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে নিজেদের ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শ্রীনগর, বুদগাম এবং লখনউয়ের সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে শ্রীনগরের ঐতিহাসিক লালচক। সেখানে বিশাল জনতা খামেনির ছবি হাতে নিয়ে শোক মিছিলে অংশ নিয়েছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে ছিল আমেরিকা ও ইসরায়েল বিরোধী তীব্র স্লোগান। বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের নারীদের আহাজারি ও বুক ফাটানো কান্নায় সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শ্রীনগরের সাইদা কাদাল ও বুদগামের মতো শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত বনধ পালিত হচ্ছে। উপত্যকার বিশিষ্ট আলেম মীরওয়াইজ উমর ফারুক এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে শোক পালনের ডাক দিয়েছেন।
বিক্ষোভের আঁচ কাশ্মীরের গণ্ডি পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউতেও পৌঁছেছে। সেখানেও শিয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে এবং হামলাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। লখনউয়ের ঐতিহাসিক ইমামবাড়া সংলগ্ন এলাকায় শোকাতুর নারীদের বিলাপ করতে দেখা গেছে। কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও প্রশাসন কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।
বর্তমানে জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে। যেকোনো ধরণের সংঘাত এড়াতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল দিচ্ছে পুলিশ। খামেনি হত্যার এই ঘটনা ভারতের এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় ও আবেগীয়ভাবে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে, যা সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সজাগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে ওঠার নেপথ্যে কূটনৈতিক পর্দার আড়ালের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’। পত্রিকাটির এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গত মাসে ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার টেলিফোন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর জন্য প্রবল চাপ দিয়েছিলেন। জনসমক্ষে শান্তি ও সংলাপের কথা বললেও আড়ালে সৌদি যুবরাজের এই দ্বিমুখী অবস্থান এখন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে সবসময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ভান করছিলেন। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। একইসঙ্গে তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি, আড়ালে তিনি ট্রাম্পকে সামরিক অভিযানের জন্য ক্রমাগত উৎসাহিত করে আসছিলেন।
শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম জোরদারের অভিযোগকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘ভারী ও নিখুঁত বোমাবর্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন যে, প্রয়োজন হলে এই আক্রমণ পুরো সপ্তাহজুড়ে অথবা তারও বেশি সময় ধরে বিরতিহীনভাবে চলতে পারে। মার্কিন-ইসরায়েলি এই আগ্রাসনের জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে, যার ফলে দুবাই, আবুধাবি, দোহা এবং রিয়াদের মতো প্রধান শহরগুলো এখন সংঘাতের কবলে পড়েছে।
এদিকে, নিজের ভূখণ্ড ব্যবহৃত না হওয়ার দাবি সত্ত্বেও ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইরানের এই আক্রমণকে ‘স্পষ্ট ও কাপুরুষোচিত’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। রিয়াদের দাবি, তারা আগেই পরিষ্কার করেছিল যে তাদের আকাশসীমা হামলার জন্য ব্যবহৃত হবে না, তবুও এই আক্রমণ চালানো হয়েছে—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াশিংটন পোস্টের এই ফাঁস হওয়া তথ্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সৌদি আরবের প্রকৃত ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সমীকরণকে এক জটিল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
আগামী এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিতব্য পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজ শেষে গতকাল শনিবার কলকাতার রাজ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা মনোজ আগরওয়াল এই তালিকা জনসমক্ষে আনেন। প্রকাশিত এই নতুন তালিকায় দেখা গেছে, রাজ্যজুড়ে অন্তত ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। বড় ধরনের এই পরিবর্তনের ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় ৫৮ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে ভোটারের সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৪ জনে। তবে এই তালিকার একটি বড় অংশ, অর্থাৎ ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নাম বিভিন্ন তথ্যগত ত্রুটির কারণে বর্তমানে ‘শুনানি সাপেক্ষে বিবেচনাধীন’ রাখা হয়েছে। এসব ভোটার শুনানিতে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে ধাপে ধাপে তাঁদের নাম তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে, এবার রাজ্যে নতুন ভোটার হয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৭ জন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব কেন্দ্র দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে ভোটার তালিকায় বড় আকারের রদবদল হয়েছে। খসড়া তালিকায় এখান থেকে ৪৪ হাজার নাম বাদ পড়ার পর চূড়ান্ত তালিকায় আরও ২ হাজার ৩৪২ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে ভবানীপুর কেন্দ্রে চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২০১ জনে, যেখানে অন্তত ১৪ হাজার ভোটার এখনও বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছেন। বিপরীতে, মমতার প্রতিপক্ষ ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৮ জন হয়েছে।
বিবেচনাধীন থাকা ৬০ লাখ ভোটারের ধর্মীয় ও অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তালিকার মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ ৯ হাজার ৬১৩ জন ভোটার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের, যাঁদের অধিকাংশই মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ভোটারের নাম বাদ যেতে পারে। সেই তুলনায় সংখ্যাটি কম হলেও প্রায় ৬৪ লাখ নাম বাতিলের ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসকে হতাশ ও চিন্তিত করে তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এখন বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা ভোটাররা শেষ পর্যন্ত শুনানিতে টিকবেন কি না, তা নিয়ে যেমন সংশয় রয়েছে, তেমনি বাদের তালিকায় থাকা বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোট প্রদানের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার এই বিশাল ওলটপালট রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইকে আরও জটিল করে তুলল।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আকস্মিক মৃত্যুতে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো এক বিশেষ শোকবার্তায় তিনি এই ঘটনাকে একটি ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই শোকাবহ মুহূর্তে পুতিন ইরানের সরকার ও জনগণের প্রতি তাঁর আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট তাঁর বার্তায় এই সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, খামেনির এই মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি মানবিক নৈতিকতার সমস্ত আদর্শের পরিপন্থী। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ধরণের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি বিশ্বশান্তির জন্য এক বড় হুমকি। পুতিনের মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা আধুনিক বিশ্বের কূটনৈতিক ও আইনি কাঠামোর প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে।
উল্লেখ্য যে, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ যৌথ বিমান হামলায় তেহরানে নিজ কার্যালয়ে সপরিবারে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া এই কড়া বিবৃতিটি তেহরান ও মস্কোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পুতিনের এই শোকবার্তা ইরানকে এই সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরণের নৈতিক সমর্থন জোগাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফগানিস্তানে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির ফেডারেল পার্লামেন্টারি বিষয়ক মন্ত্রী ড. তারিক ফজল চৌধুরি। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের সামরিক অভিযান সমাপ্তি সংক্রান্ত খবরগুলোকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, পাকিস্তান তার অভিযান বন্ধ করেছে বলে যে প্রচার চালানো হচ্ছে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
ড. তারিক ফজল চৌধুরি জানান, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও কৌশলগত স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে পাকিস্তান বিমান বাহিনী এবং ড্রোনের ফুটেজ গণমাধ্যমে সরবরাহ করা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে ভিডিও প্রকাশ বন্ধ করার অর্থ এই নয় যে অভিযান থেমে গেছে। মূলত জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই ভিডিও প্রচার স্থগিতের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং পাকিস্তান তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সামরিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আফগান সীমান্তে বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমনের কোনো ইঙ্গিত আপাতত নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তি দূর করতেই মূলত সরকার এই কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রচারণায় কিছুটা গোপনীয়তা অবলম্বন করলেও সামরিক কমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী ড্রোনের হামলা ও অন্যান্য অভিযান যথারীতি বলবৎ রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর প্রথম দফার হামলায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ৪০ জন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। রোববার (১ মার্চ) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইডিএফ এই অভিযানের বিস্তারিত প্রকাশ করে একে ইরানের পক্ষ থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে একটি ‘পূর্বপ্রস্তুতিমূলক আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই হামলা পরিচালনা করা হয়েছে বলে দাবি করছে ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ।
আইডিএফের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে তেহরানের একটি নির্দিষ্ট সরকারি কমপাউন্ডে যখন ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দ একটি জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন, ঠিক তখনই ৩০টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান। এই হামলায় পুরো কমপাউন্ডটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নিহতদের মধ্যে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল আব্দুলরহিম মোসাভিও রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত অত্যন্ত উন্নত গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে এই হামলাটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে, নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ের সাতজন সদস্য তখন একই স্থানে অবস্থান করছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই অভিযানের সফলতায় বড় ভূমিকা পালন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ইরানের শীর্ষ নেতাদের শনিবার সকালে ওই বৈঠকে বসার খবরটি সিআইএ আগেভাগেই জানতে পারে এবং সেই তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করে। আমেরিকার কাছ থেকে পাওয়া এই তথ্যের ভিত্তিতেই ইসরায়েল তাদের হামলার পূর্বনির্ধারিত সময় পরিবর্তন করে দিনের আলোতেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তেহরান সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে এই বিধ্বংসী হামলা চালানো হয়।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলি জঙ্গিবিমানগুলো ওড়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। আইডিএফ দাবি করেছে, এই আক্রমণের ফলে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কমান্ড চেইন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একযোগে তেহরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালানোর ফলে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এই অপারেশনটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের অপূরণীয় ক্ষতির পরপরই নিজেদের সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান। গত শনিবারের ভয়াবহ অভিযানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর তাঁর শূন্য পদে নতুন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ ওয়াহিদিকে। আজ রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নতুন আইআরজিসি প্রধান আহমেদ ওয়াহিদি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। এর আগে তিনি দেশটির প্রতিরক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তাঁর এই নিয়োগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, কারণ ২০২২ সালে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য তিনি বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একজন অভিজ্ঞ ও কঠোর সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ওয়াহিদিকে দায়িত্ব দিয়ে ইরান তাদের সামরিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ সামরিক আগ্রাসনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। নেতৃত্বের এই বিশাল শূন্যতা পূরণে কালক্ষেপণ না করেই তেহরান এই নতুন নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে আইআরজিসির নতুন কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইরান পাল্টা আঘাতের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ আমির হাতামি জানিয়েছেন, তাঁদের বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো পারস্য উপসাগর এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাঁরা ইতিমধ্যে অভিযানের কয়েকটি পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং শত্রুপক্ষকে উপযুক্ত জবাব দিতে তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এক নজিরবিহীন উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এক চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, ইরান আজ এমন এক শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যার ভয়াবহতা শত্রু পক্ষ আগে কখনো অনুভব করেনি। লারিজানির এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
লারিজানি তাঁর পোস্টে গতকালকের সামরিক অভিযানের সফলতা দাবি করে বলেন, ‘গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান, এবং তা সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।’ এরপরই তিনি আজকের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে লেখেন, ‘আজ আমরা তাদের এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করব, যা তারা আগে কখনও অনুভব করেনি।’ তাঁর এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ইরান আজ আরও বড় পরিসরে এবং ভিন্ন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে যাচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, আলি লারিজানির এই হুমকির ভাষা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আগের এক সতর্কবার্তার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরান আজ বড় ধরণের হামলার ঘোষণা দিলেও তাদের তা করা উচিত হবে না। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি ইরান হামলা চালায় তবে যুক্তরাষ্ট্রও এমন শক্তি প্রয়োগ করবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। লারিজানি যেন ট্রাম্পের সেই একই সুর ব্যবহার করেই পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই পাল্টাপাল্টি হুমকিতে পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে। খামেনি হত্যার পর ইরানের পক্ষ থেকে এই ‘অভূতপূর্ব’ আঘাতের ঘোষণা বিশ্ব সম্প্রদায়কে চরম উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আজ যদি ইরান তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী বড় কোনো হামলা চালায়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে এখন বিশ্ববাসীর নজর আজ ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।