ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলে শক্তিশালী টাইফুন ইয়াগির তাণ্ডবে ৫৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। আজ সোমবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ইয়াগি চলতি বছর এশিয়ার কোনো দেশে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন। এর প্রভাবে আরও বন্যা ও ভূমিধসের সতর্কবার্তা দিয়েছে ভিয়েতনামের আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভিয়েতনামের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, নিহত-নিখোঁজের ঘটনাগুলোর বেশির ভাগ ঘটেছে ইয়াগির প্রভাবে ভূমিধস ও বন্যার কারণে।
গত শনিবার ভিয়েতনামের উত্তর-পূর্ব উপকূলে টাইফুনটি আঘাত হানে। এলাকাটিতে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানির কারখানা রয়েছে। দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গতকাল রোববার টাইফুন ইয়াগি শক্তি হারিয়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নচাপে রূপ নেয়।
ভিয়েতনামের আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, টাইফুন ইয়াগির প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ২০৮ থেকে ৪৩৩ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ইয়াগির প্রভাবে আরও বন্যা ও ভূমিধস হতে পারে।
ইয়াগির আঘাতে ভিয়েতনামের লাখো ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ব্যাহত হয় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। একটি মাঝারি আকারের সেতু ধসে পড়েছে। বহু গাছপালা উপড়ে পড়েছে। থমকে গেছে বিভিন্ন শিল্প এলাকার কার্যক্রম।
ভিয়েতনামে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ী সংগঠনের চেয়ারম্যান হং সান বলেন, দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার কারখানাগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চল লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ প্রতিরক্ষা বাহিনী। হামলার আশঙ্কায় মক্কা, জেদ্দা, তাইফ ও ইয়ানবুসহ দেশটির একাধিক অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়। এদিকে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান জ্বালানি অবকাঠামো ‘ইয়ানবু’ টার্মিনালের সুরক্ষায় সেনা ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। একই সময়ে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে লোহিত সাগরের কৌশলগত পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ইয়ানবু তেল স্থাপনা সুরক্ষায় ফ্রান্সের সহায়তা
লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত সৌদির প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টার্মিনাল ইয়ানবুর ওপর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সেখানে সামরিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ইয়ানবুকে সুরক্ষিত রাখতে ফ্রান্স সেনা সদস্য, বিশেষ রাডার এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করবে।
উল্লেখ্য, পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বা ‘পেট্রোলাইন’-এর মাধ্যমে সংযুক্ত ইয়ানবু কেন্দ্রটি সৌদি আরবের উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং ইউরোপের বাজারে জ্বালানি সরবরাহের জন্য অন্যতম প্রধান বিকল্প রুট। এখানে দেশটির বড় বড় তেল শোধনাগার ও সংরক্ষণাগার রয়েছে।
বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই: নিহত ১৫০ ছাড়াল
সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের মাটিতেও তীব্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কৌশলগত উঁচু পাহাড়ি এলাকা ‘কাহবুব’ এবং লাহজ ও তাইজ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলছে।
এএফপির সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৫০ জন যোদ্ধা ও সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অন্তত ৯৮ জন নিহত হন। অন্যদিকে পৃথক সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন হুথি যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন। সদ্য দখল করা উপকূলীয় অঞ্চল নিরাপদ রাখতে এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও মক্কায় সতর্কতা
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা তাইফ ও ইয়ানবু লক্ষ্য করে ছোড়া হুথিদের ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস করেছে। জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালিকি হুথিদের এই কর্মকাণ্ডকে উসকানি আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
হামলার সময় দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ মক্কা, জেদ্দা, তাইফ, ইয়ানবু ও তাবুক অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা সংকেত জারি করে, যা পরে প্রত্যাহার করা হয়।
তবে হুথিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে দক্ষিণ সৌদির বিভিন্ন সামরিক কমান্ড সেন্টার, গোলাবারুদের ডিপো, রিয়াদের একটি অজ্ঞাত স্থাপনা এবং ইয়ানবুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর অবকাঠামো লক্ষ্য করে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার
এদিকে হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তেহরানের সরাসরি ভূমিকা রাখার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মতো হুথিরাও নিজেদের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারা তেহরানের সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে না।
২০২২ সাল থেকে ইয়েমেনে কার্যকর থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি গত জুলাই মাসে পুরোপুরি ভেঙে যায়। সৌদির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সানায় একটি ইরানি বিমান অবতরণের পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এরপর থেকে হুথিরা সমুদ্রপথে অবরোধ সৃষ্টি করে লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয়, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহকারী উপসাগরীয় নৌপথগুলোতে বড় ধরনের অচলাবস্থা ও সামরিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে হোয়াইট হাউসে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটিকে একটি ‘দারুণ বৈঠক’ বলে অভিহিত করেছেন। দীর্ঘ এ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান সংকটসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের স্পষ্ট বার্তা
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে জানা গেছে, বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ওয়াশিংটনকে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান অনড় ও পরিষ্কার। তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে তাইওয়ানের প্রতি জোরালো সমর্থন বজায় রাখার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে। তবে বৈঠকের আগে তাইওয়ানের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন করে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
বাণিজ্য সমঝোতা ও শুল্ক হ্রাস
বৈঠকে দুই দেশের চলমান বাণিজ্য সংকট সমাধানে বড় অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ১১ মাস আগে বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, তার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প ও সির মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার পর চুক্তিটির মেয়াদ আগামী বছরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানো, কৃষিপণ্য আমদানির বাধা দূর করা এবং চীনের পক্ষ থেকে ২০০টি মার্কিন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয় নিয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনা
জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে উভয় নেতাই আলোচনা করেন। সি চিন পিং বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে শীর্ষ পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশ যেন সবসময় মানবজাতির কল্যাণে এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, বৈঠকের আগে ট্রাম্প এআই বা তাঁর ভাষায় ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরলেও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কোনো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেন। তবে সংঘাত এড়াতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর জোর দেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
ইরান সংকট ও সমঝোতার আহ্বান
সিনহুয়া জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সি চিন পিং। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। বর্তমানে জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনের ফাঁকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
১১ বছর পর সামরিক ঘাঁটিতে বিশেষ অভ্যর্থনা
এর আগে সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ান তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে ওয়াশিংটন ডিসির নিকটবর্তী মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে তাঁদের সশরীরে স্বাগত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। মার্কিন কূটনৈতিক ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টের সরাসরি সামরিক ঘাঁটিতে গিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা প্রায় ১১ বছর পর ঘটল। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পোপ ফ্রান্সিসকে একইভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। পরে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে চীনা প্রেসিডেন্টের সম্মানে এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেরও আয়োজন করা হয়।
ইসরায়েলি তাণ্ডবে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও তীব্র দুর্ভিক্ষের গ্রাসে গাজায় শতবছরের মানবিক সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। অনাহার, চরম দারিদ্র্য আর নিরাপত্তার হাহাকারে ভেসে যাওয়া বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে জন্ম নিয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। সামান্য একমুঠো খাবারের বিনিময়ে কনের পণ হিসেবে তুলে দেওয়া হচ্ছে কিশোরী মেয়েদের। বেঁচে থাকার এই আকুল-আকুতিতে গাজাজুড়ে বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিয়ে এখন এক বুকভাঙা মহামারির রূপ নিয়েছে।
ফিলিস্তিনের এই উপত্যকায় জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহের শিকার নারী ও মেয়েদের চরম বিপন্নতার এই শিউরে ওঠার মতো ঘটনা উঠে এসেছে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদনে। এমনকি ধর্ষণের শিকার নারীদের সামাজিক কলঙ্ক এড়াতে ধর্ষণকদের সঙ্গেও বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন পর্যন্ত জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহের নথিভুক্ত ঘটনা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি এ প্রবণতাকে তীব্র অবনতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র ক্ষুধা, দারিদ্র্য, আয়হীনতা ও স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে পরিবারগুলো টিকে থাকার জন্য চরম চাপের মুখে পড়েছে। ১০টি সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য এবং গাজা সিটি ও খান ইউনিসের বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাসকারী ২৩০ নারীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
খান ইউনিসে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক নারী জানান, ২০২৫ সালের ‘দুর্ভিক্ষের সময় এক ব্যক্তি তার ১৪ বছর বয়সি মেয়েকে দুই বস্তা আটার বিনিময়ে বিয়ে দিয়ে দেন’। এতে তিনি নিজের ও অন্য সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন বাস্তুচ্যুত শিবিরে সাক্ষাৎকার দেওয়া আরও ছয় নারী একই ধরনের বিনিময়ের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, যুদ্ধের আগে এ ধরনের ঘটনা কল্পনাও করা যেত না।
ইউএনএফপিএর সংগৃহীত তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুনে গাজায় বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহের মতো সহিংসতার ঘটনা জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরীরাই মূলত এই জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।
যুদ্ধে বাবা-মা হারানো মেয়েরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজা সিটির একটি শিবিরে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক নারী জানান, তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সি দুই মেয়েকে বাবা-মা নিহত হওয়ার পর তাদের চাচারা বিয়ে দিয়ে দেন। কোথাও কোথাও একমুঠো খাদ্য, সামান্য খাবার বা মাথার ওপর একটা তাঁবুর বিনিময়েও বিধবা ও অনাথ নারীদের যৌনশোষণ ও জোরপূর্বক বিয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া গাজা শহরের একটি শিবিরের এক নারী জানান, তিনি তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সি দুই মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। ওই নারী বলেন, ‘তাদের চাচারা খুব অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। জানেন কেন? কারণ তাদের বাবা-মা শহীদ হয়েছিলেন। আর তাদের চাচারা দায়িত্ব ও খরচ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, বিয়ে বা জীবন কী, তা ওরা বোঝেই না।’
জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ মানবিক সংস্থা ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়েকে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করে। যুদ্ধের আগেও অধিকৃত পশ্চিম তীরের তুলনায় হামাস-শাসিত গাজায় বাল্যবিবাহ বেশি প্রচলিত ছিল। তবে তখন এর হার কম।
গাজার আইনে বাবা-মায়ের সম্মতি ও বিচারকের অনুমোদনসাপেক্ষে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৭ বছর। তবে এর ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। আদালতের কর্মকর্তারা ১৪ বছর ৭ মাস বয়সি মেয়েদেরও বিয়ের অনুমোদন দিতে পারেন। স্থানীয় এক শরিয়া বিশেষজ্ঞ জানান, যুদ্ধের বড় একটি সময় মুসলিমদের পারিবারিক বিষয়াদি পরিচালনাকারী ইসলামী আদালতগুলো বন্ধ থাকায় এই ‘আইনি সুরক্ষা’ও কার্যত উঠে যায়।
বিবিসি এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যেখানে শোকাহত আত্মীয়দের বিয়ে হয়েছে। ২৫ বছর বয়সি জুহায়ের জানান, ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক মেয়ের বাবা নিহত হওয়ার পর তার চাচারা তাকে তাদের দূরসম্পর্কের ১৬ বছর বয়সি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চাপ দেন। মেয়েটির বাবা ছিলেন তার একমাত্র অভিভাবক। কেন তিনি এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন জানতে চাইলে জুহায়ের বলেন, ‘আমি তাকে বিয়ে করার অন্যতম কারণ ছিল, তার দেখাশোনা করার মতো আর কেউ ছিল না। এটাই প্রথম কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ না হলে, সে এখনো তার বাবার আদরে থাকা এক ছোট্ট মেয়েই থাকত। সে স্কুলে যেত। তার মানসিকতা এখনো শিশুর মতো, পরিণত নয়। সে স্কুল, পরিবার ও বন্ধুদের খুব মিস করে। এমনকি শুধু বাড়িতে বসে থাকাও তার কাছে অসহ্য লাগে।’
এক দম্পতি জানান, তাদের বড় ছেলে ও মেয়েটির বাবা নিহত হওয়ার পর তারা তাদের ১৭ বছর বয়সি ছেলেকে তার ১৬ বছর বয়সি চাচাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেন। কিশোরীটি এখন গর্ভবতী। ফলে সে আর স্কুলে ফিরতে পারবে না। তার শ্বশুর বলেন, ‘তাকে তার সন্তানের যত্ন নিতে হবে, তা না হলে তার পড়াশোনা বৃথা যাবে।’
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নোমান মাহমুদ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে দেশটির সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের দায়িত্ব দেয় বলে খবর প্রকাশ করেছে জিও নিউজ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নোমান মাহমুদ মহাসচিব হিসেবে সৌদি আরবের রিয়াদে স্থাপিত হতে যাওয়া এই জোটের কার্যালয় পরিচালনা করবেন।
অবশ্য এর আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত মাসে বলেছিলেন যে, তিন দেশের মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’-এর মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের একজন কর্মকর্তা। তার ধারাবাহিকতায়ই এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হল।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নোমান মাহমুদ এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করা এই কর্মকর্তা ২০২৩ সালে অবসরে যান।
পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যা পরবর্তীতে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ নামে পুনর্নামকরণ করা হয়।
গত মাসে ইস্তাম্বুলে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির উদ্বোধনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশও এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গঠিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ গাজা পুনরুদ্ধারের জন্য ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই অর্থ ছয় মাসে ৬৬টি কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে থাকবে—আবাসন, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য অপসারণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
বোর্ড স্বীকার করেছে, এখনো বড় অঙ্কের অনুদান প্রয়োজন। এ পর্যন্ত ১৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাস্তবে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র ২৮০ মিলিয়ন ডলার। বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকে গাজার পূর্ণ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রায় ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
বোর্ড অব পিসের বর্ধিত অংশ ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে’র সদস্য এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার স্বীকার করেছেন, প্রকল্পটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিলম্বের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বিলম্ব হয়েছে।’ বোর্ডের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বৈঠকে কুশনার বলেন, ‘আজকের মূল লক্ষ্য ছিল আসলে আপনাদের দেখানো যে, এটি বাস্তবায়নে আমরা পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নিউইয়র্কে তার সঙ্গে ছিলেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তিনি বলেন, “গত এক বছরে এই গোষ্ঠী ‘বাস্তব অগ্রগতি’ করেছে।” উইটকফ আরও বলেন, ‘সব জিম্মি বাড়ি ফিরে গেছে। একটি যুদ্ধবিরতি রয়েছে, সেটি যতই অসম্পূর্ণ হোক না কেন, এটি এখনো কার্যকর আছে। মানবিক প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক ফলাফল অর্জন করেছে। জরুরি প্রয়োজন মেটানো এবং পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি কাজকে সমর্থন করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়া ও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।’
তবে তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি পরিকল্পনাটিকে আরও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাজায় কাজ করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মধ্যে কীভাবে ঐকমত্য তৈরি করা হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি দেশ এগিয়ে এসে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, “বোর্ড ‘আরও দেশকে এতে অংশ নেওয়ার জন্য আগ্রহী’।”
বোর্ড অব পিসের ইসরায়েলি-আমেরিকান সদস্য মাইকেল আইজেনবার্গ বিবিসির ‘নিউজআওয়ার’ অনুষ্ঠানে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘এটি যেহেতু একটি যুদ্ধক্ষেত্র, তাই প্রথমে অবিস্ফোরিত অস্ত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপরও গাজার মাটির নিচে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ রয়েছে, সেগুলোও ধ্বংস করতে হবে।’ আইজেনবার্গ বলেন, ‘এসব কাজ শেষ হওয়ার পর গাজার মানুষ আবার পুনর্গঠনের কাজে ফিরতে পারবেন। তা হতে পারে আবাসন নির্মাণ, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।’
গত আগস্টে ‘বোর্ড অব পিস’-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলায় ম্লাদেনভ গাজায় ইসরায়েলের চলমান বিমান হামলার পাশাপাশি হামাসের কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেছিলেন। গত আগস্টে ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেছিলেন, গত বছরের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে তা এই অঞ্চলের জন্য ‘ফিরে আসার পথহীন এক পরিস্থিতি’ তৈরি করবে।
গাজায় হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩০০ শিশু রয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তাদের পাঁচজন সেনা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ‘অপারেশনাল দুর্ঘটনায়’ একজন ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।
দ্রুত কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা, চাপ বা খবরদারির মুখে পড়লে ইরানিদের প্রতিরোধ আরও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘নত হবে না ইরান, পারমাণবিক কর্মসূচিও ছাড়বে না।’
বিবিসি বলছে, জাতিসংঘের ৮১ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধরত কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট নিউইয়র্কে এসে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন। পেজেশকিয়ানের ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান মার্কিন প্রতিনিধিরা।
কয়েক মাস আগেও মার্কিন বিমান হামলা থেকে বাঁচতে যিনি আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকার থেকে দেশ পরিচালনা করছিলেন, সেই পেজেশকিয়ান এবার নিউইয়র্ক শহরে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের কড়া নিরাপত্তায় এসইউভি গাড়িবহর নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা কখনোই মাথা নোয়াব না বা নতজানু হব না। তবে গায়ের জোর না দেখালে আমরা সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত।’
বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলছি, আমরা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র চাই না, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতাও মানব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছেন, অথচ আমরাই সন্ত্রাসের শিকার।’
এ সময় তিনি গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ছবি তুলে ধরেন। এ ছাড়া মিনাব ও লামারদে মিসাইল হামলায় নিহত ১৭৫ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিকের ছবি দেখান তিনি, যাদের দুই-তৃতীয়াংশই শিশু।
যুক্তরাষ্ট্র লামারদে হামলার কথা অস্বীকার করেছে এবং মিনাবের ঘটনাটি তদন্ত করে দেখার কথা বলে আসছে। যুদ্ধ থামাতে যে কোনো চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে ইরানি জাহাজের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানান পেজেশকিয়ান।
তিনি বলেন, ‘এমনটা হতে পারে না যে, সবাই হরমুজ প্রণালীর সুবিধা ভোগ করবে, আর আমাদেরই এই নৌপথ ব্যবহারে বাধা দেওয়া হবে।’
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। সে সময় হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয় তারা। যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হতো।
হরমুজ বন্ধের জবাবে গত এপ্রিলে ইরানি বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। গত জুন মাসে যুদ্ধবিরতি ও প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও ইরানি হামলা পুনরায় শুরু হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহালের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেস্তে যায়।
ইরান এই প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায়, যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই গত বুধবার হরমুজ প্রণালীতে একটি মালবাহী জাহাজে হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। ভারত সরকার এই হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করার দাবি জানিয়েছে।
নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে গত মঙ্গলবার কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনায় বসেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ। গত জুন মাসের পর এটিই দুই পক্ষের প্রথম আলোচনা। উইটকফ এই আলোচনা নিয়ে আশাব্যঞ্জক কথা বললেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, এটা ‘নতুন কিছু নয়’।
যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আবার কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালালে চলমান সংঘাতের রণাঙ্গন পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগর এবং তারও বাইরে বিস্তৃত হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার এই হুঁশিয়ারি দেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সে প্রকাশিত এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সাফল্যের প্রশংসা করেন।
মেজর জেনারেল সাফাভি বলেন, ‘সংঘাত ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগর ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালী থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন বা তেল আবিব যদি হামলা পুনরায় শুরু করে, তবে এই সংঘাতের রণাঙ্গন আরও বড় হয়ে ভারত মহাসাগরে এবং সম্ভবত তার চেয়েও দূরের বিস্তৃত অঞ্চলে রূপ নেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী একাধিক সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে।
লোহিত সাগরে হুতিদের অবস্থানের প্রশংসা করে সাফাভি বলেন, ‘গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনি জনগণ যে কোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় নতুন করে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি নাও দিতে পারেন শি জিনপিং। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে তথ্যটি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ সংক্রান্ত আলোচনা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার ট্রাম্প ও শির মধ্যে শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। এতে উভয় দেশের বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপ করা দুই কর্মকর্তা জানান, বোয়িং কর্তৃপক্ষ এখন মে মাসে হওয়া একটি অস্থায়ী চুক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর আওতায় চীন ২০০টি উড়োজাহাজ কিনতে চেয়েছে।
২০১৭ সালের পর থেকে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানিটি চীনের বাজার হারায়। বিপরীতে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস নিজেদের বাজার সম্প্রসারণ করেছে। আশা করা হয়েছিল, ট্রাম্প-শির মে মাসের ওই বৈঠকের পর থেকে বোয়িং আবার অর্ডার পেতে শুরু করবে। দুই দেশের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ৫০০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পর বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেলি অর্টবার্গ বলেছিলেন, ‘২০০টি উড়োজাহাজের অর্ডারটি ছিল প্রাথমিক ধাপ। এই সংখ্যা যদিও প্রত্যাশার চেয়ে কম, কিন্তু চীনের বাজার খুলে যাওয়াটা একটি সাফল্য।’
বিনিয়োগকারী ও এভিয়েশন খাতের বিশ্লেষকদের আশা ছিল, শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরে বোয়িং হয়তো আরও বড় অর্ডার পাবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা কম বলে গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অর্টবার্গ। বিমান চলাচল খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যারোডাইনামিক অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড আবুলাফিয়া বলেন, ‘এখন ২০০ উড়োজাহাজের অর্ডার ধরে রাখতে পারাটাই সাফল্য হবে।’
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীন বিশেষজ্ঞ স্কট কেনেডি বলেন, ‘ট্রাম্প-শির এবারের বৈঠকে অগ্রাধিকার তালিকায় নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি এবং বিরল খনিজের মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাবে।’
বিষয়টি নিয়ে বোয়িং কর্তৃপক্ষ নতুন করে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত দূতাবাসও সাড়া দেয়নি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরেও যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। কিন্তু সাড়া পায়নি বলে জানা গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, একটি ‘এআই এজেন্ট’অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য থাকা একটি সরকারি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা লঙ্ঘন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে ‘জরুরি বৈশ্বিক সুরক্ষাব্যবস্থা’ বা গার্ডরেলের আহ্বান জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করলেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের ফাঁকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে কানাডা, স্পেন ও জার্মানিসহ মোট ২২ জন স্বাক্ষরকারীর সঙ্গে অ্যান্থনি আলবানিজ ‘আ কল ফর কন্ট্রোল অব ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলস’—শীর্ষক বিবৃতিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন।
স্থানীয় সময় বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আলবানিজ বলেন, ওপেনএআইয়ের তৈরি ওই এজেন্ট জুন মাসে অস্ট্রেলিয়া সরকারের মেডিকেয়ার পোর্টালে থাকা সরকারি ও অসরকারি, অর্থাৎ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য তথ্য অ্যাক্সেস করেছিল। অস্ট্রেলিয়ার লেবার সরকার নতুন অনলাইন নিরাপত্তা আইন, বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল ডিউটি অব কেয়ার’ বা ডিজিটাল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার কাঠামোর মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে।
আলবানিজ বলেন, হ্যাকের বিষয়ে ক্যানবেরার ‘চরম উদ্বেগ’ জানাতে এবং নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করতে কোম্পানিটির তিন মাস সময় নেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করতে তিনি ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর ওপেনএআই প্রতিক্রিয়া জানায়। কোম্পানিটি বলেছে, তারা এখনো বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে রোগীদের রেকর্ডে প্রবেশ করা হয়েছিল, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোম্পানিটি জানায়, তাদের পর্যালোচনায় অস্ট্রেলিয়া সরকারের বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শনাক্ত হয়েছে। এসব কার্যক্রম ঘটেছিল যখন তাদের ‘মডেলগুলো উত্তর খুঁজে দেখার চেষ্টা করছিল’।
বুধবার জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর নেতারা অনিয়ন্ত্রিত এআই উন্নয়নের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম ‘গডফাদার’ হিসেবে বিবেচিত কানাডীয় ইয়োশুয়া বেঞ্জিও এবং ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক প্যানেলের সহসভাপতি এই প্রযুক্তির ‘নজিরবিহীন হুমকি’ এবং এর ‘বাস্তব ও আসন্ন’ বিপদের কথা তুলে ধরেন।
চীনের জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত ফু কং বৈঠকে বলেন, বেইজিং মনে করে এআই নিয়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং আন্তসীমান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, এআইয়ের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠায় একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সতর্কবার্তাগুলো শুনেছি, যেগুলো আমাদের অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে... তাই আমাদের এই সময়ের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।’
তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, যুক্তরাজ্য এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলও কাজে লাগাতে চায়। বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এআই নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে তার অনেক সমমনা নেতার সঙ্গে মতবিরোধে রয়েছেন। তিনি এআইযের বিপদকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেটিকে তিনি ‘প্রতারণা’ বা ‘হোক্স’ বলে অভিহিত করেছেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এআই শব্দটির নাম বদলে ‘SI’, অর্থাৎ ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ করার প্রস্তাবও দেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন, তিনি একজন এআই উপদেষ্টা নিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।
জাতিসংঘকে কঠোর সমালোচনা করে সংস্থাটিকে ‘অকার্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বক্তব্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন মিলে। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এই দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনা ‘লাস মালভিনাস’ নামে অভিহিত করে।
মিলে বলেন, ‘সি লায়ন প্রজেক্ট’-এর আওতায় উত্তর মালভিনাস অববাহিকায় আর্জেন্টিনার মহীসোপানে তেল উত্তোলনের কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ লাইসেন্সের আওতায় পরিচালিত এই কার্যক্রমকে আর্জেন্টিনা অবৈধ এবং বেআইনিভাবে অনুমোদিত বলে মনে করে।
তার ভাষ্য, আর্জেন্টিনার অনুমোদন ছাড়া ওই এলাকায় যেকোনো ধরনের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন এবং আর্জেন্টিনার নিজস্ব আইনের অধীনে বেআইনি।
তবে এ বিরোধের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা শান্তিপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উপায়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পথ বেছে নিয়েছে বলে জানান মিলে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়েও আর্জেন্টিনার অবস্থান তুলে ধরেন মিলে। তিনি বলেন, বিতর্কিত সার্বভৌমত্বের ওই ভূখণ্ডে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি প্রযোজ্য নয়।
মিলের দাবি, দখলদার শক্তির মাধ্যমে ওই জনগোষ্ঠীকে দ্বীপগুলোতে বসতি স্থাপন করানো হয়েছে। তাই সেখানকার জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নটি অন্য সাধারণ ভূখণ্ডের মতো করে দেখা যায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে এ দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে যুদ্ধও হয়েছিল। বর্তমানে দ্বীপগুলো যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে আর্জেন্টিনা এর ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি অব্যাহত রেখেছে।
আগামী ছয় মাসে চরমভাবাপন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘সুপার এল নিনো’র বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিদ্যমান সংকটের কারণে আগে থেকেই বাড়তে থাকা তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হবে এই অতিরিক্ত প্রাণহানি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই আশঙ্কার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষকদের গবেষণা নেটওয়ার্ক ‘ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব’-এর প্রাক্কলনে জানানো হয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া আগামী বছরের জুন বা জুলাই পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর এই উচ্চ প্রবণতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে। তীব্র দাবদাহের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও সুপেয় পানির সংকট আরও শোচনীয় আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষকদের মতে, এবারের পরিস্থিতি মূলত ‘ভবিষ্যতের পোস্টকার্ড’, কারণ এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা এখনই এমন পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে যা আগামী দুই দশকে দেখা যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল।
ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া; দেশটিতে অতিরিক্ত ৩১ হাজার ৪০০ জনের প্রাণহানির শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় এর পরেই অবস্থান করছে ইন্দোনেশিয়া ও সুদান। সামগ্রিকভাবে নাইজেরিয়া, সুদান, নাইজার ও চাদসহ আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে মোট ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে আরও ১৯ হাজার ৪০০ জনের অকালমৃত্যু ঘটতে পারে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম ২০টি দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও, যেখানে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে।
প্রতিবেদনটির অন্যতম সহলেখক ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ‘৪ লাখ ৫১ হাজার সংখ্যাটা এত বড় যে, আমাদের অনুভূতিশূন্য করে তুলতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এরা প্রত্যেকেই রক্তমাংসের মানুষ; এর মধ্যে আছেন কারও বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি কিংবা প্রতিবেশী, যারা প্রতিদিনের মতো কাজে যাচ্ছিলেন, সাধারণ জীবনযাপন করছিলেন।’
বিজ্ঞানীরা জানান, অঞ্চলভিত্তিক তাপজনিত মৃত্যুর আগাম হিসাব বিভিন্ন এলাকায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হবে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে আগাম দাবদাহের পূর্বাভাস দেওয়া, গণপরিসরে কুলিং সেন্টার স্থাপন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল রাখা এবং উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের কঠোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এদিকে গত সোমবার বর্তমান এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নজির সৃষ্টি করেছে। নির্দিষ্ট সময়ের কয়েক মাস আগেই এমন অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছানোয় বিজ্ঞানীরা একে ‘গডজিলা-স্তরের’ সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দাবদাহের পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। গত আগস্টে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে জানিয়েছিল, এর ফলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর আগে ১৮৭৭-৭৮ সালের একটি মারাত্মক এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট খরা ও দুর্ভিক্ষে ভারত, ব্রাজিল ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
চলমান সংঘাতের অবসানে নির্দিষ্ট কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানকে মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ ‘ধূলিসাৎ’ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চরম এই সামরিক হুঁশিয়ারির পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে একটি কূটনৈতিক চুক্তির জোরালো সম্ভাবনাও উসকে দিয়েছেন তিনি। সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইরানের সঙ্গে কি এমন কোনো চুক্তি হবে যা তাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে সুযোগ দেবে? নাকি আমি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে দ্রুত নিঃশেষ করে দেব এবং নিরীহ মানুষ ও দেশ ধ্বংস করার সুযোগ তাদের চিরতরে কেড়ে নেব?’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এটিকে নিছক ‘প্রোপাগান্ডা’ আখ্যা দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। তেহরান জানিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের মুখে আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে আরও অপ্রত্যাশিত, কঠোর ও ধ্বংসাত্মক জবাব দিতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে প্রকাশ্যে এমন উত্তপ্ত বাকযুদ্ধ চললেও গত প্রায় সাত মাসের চলমান সংঘাতের ইতি টানতে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে দিনভর যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং এই কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক ফল বয়ে আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহনকারী হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। তিনি জানান, আগামী নভেম্বরের নির্বাচন কিংবা তার আগেই ইরানের সঙ্গে সংকটের সুরাহা হতে পারে। এদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। কাতারি মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর রূপরেখা খতিয়ে দেখছে তেহরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি সামরিক চাপ কমিয়ে বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়, তবে ইরান মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দিতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার কারণে নতুন করে কৌশলগত ঝুঁকিতে পড়েছে সৌদি আরব। মার্কিন দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার শেষ মুহূর্তে হুতিদের ওপর মার্কিন বিমান হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেন ট্রাম্প; যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অপরদিকে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একাংশে পুনরায় তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
কয়েকমাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই বৈরী দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই কূটনৈতিক যোগাযোগের খবরে দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই পরোক্ষ আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার কাতারের মধ্যস্থতায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। গত জুলাই মাসে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর এটিই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘স্টিভ এবং জ্যারেড আজ ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে, তারা শুধু মধ্যস্থতাকারী। দেখা যাক এর পরিণতি কী দাঁড়ায়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তারা বেশ কিছুদিন ধরেই মধ্যস্থতা করে আসছে, তবে আমার মনে হয় একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে এখন ব্যাপক গতি তৈরি হয়েছে। আমরা সবার কাছ থেকেই এমনটি শুনছি।’
এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তিনি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাবেন নাকি দেশটিকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করবেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তেহরান কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানির মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দিয়েছে। ইরানের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো সরাসরি বা মুখোমুখি বৈঠক হয়নি, পুরো প্রক্রিয়াটি কাতারের দূতের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে।
কূটনৈতিক এই অগ্রগতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ট্রাম্প যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, তা ইতোমধ্যে লেবানন ও ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এই যুদ্ধের অবসান হতে পারে; তবে মার্কিন সামরিক কমান্ডারের পক্ষ থেকে গোলাবারুদের ঘাটতির সতর্কবার্তা পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রও বড় পরিসরে নতুন করে হামলা চালানো থেকে কিছুটা বিরত রয়েছে।
এর আগে গত জুন মাসে উভয় দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার আওতায় পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ সম্পদ ছাড়ের কথা ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের প্রশ্নে তেহরান অনড় থাকায় এবং ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করায় গত জুলাইয়ে চুক্তিটি ভেস্তে যায়। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী এই প্রণালীতে হামলার ঝুঁকি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেলবাহী জাহাজের চলাচল কিছুটা বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধের আগের স্তরে রপ্তানি ফিরিয়ে এনেছে এবং সৌদি আরব ওমান উপকূলের মাধ্যমে চলতি ও আগামী মাসের জন্য ছয় কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
তা সত্ত্বেও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এখনো তীব্র সংকট বিরাজ করছে। হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেলের সরবরাহ এখনও বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির তীব্র সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আসন্ন নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি রাজনৈতিকভাবে বেশ চাপের মুখে রয়েছে। এ ছাড়া হুতিদের অগ্রযাত্রার কারণে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালী হুমকির মুখে পড়ায় বিকল্প পথও ঝুঁকিতে পড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ বহাল রেখেছে, যা ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করবেন না।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য সংস্থাটির কঠোর সমালোচনা করে তিনি প্রভাবশালী নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি ও আমূল সংস্কারের দাবি তুলে ধরেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সাধারণ পরিষদে বক্তব্য প্রদানকালে এরদোয়ান নিরাপত্তা পরিষদকে আরও বিস্তৃত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থায় রূপান্তর করার দীর্ঘদিনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশ্বমঞ্চের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমাদের এটি মেনে নেওয়া উচিত, ১৯০টিরও বেশি দেশের সার্বিক ইচ্ছাকে মাত্র ৫টি দেশের খেয়ালখুশির ওপর জিম্মি করে রাখার যে ব্যবস্থা, তা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না। এই ব্যবস্থা বিশ্বের মানুষের পূর্ণ আস্থা অর্জনেও পুরোপুরি ব্যর্থ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল লক্ষ্য নিয়ে ৮১ বছর আগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সংস্থাটি সেই মিশন বা উদ্দেশ্য পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সংস্থাটিকে কার্যত অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, যাদের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব, সমবেদনা ও দয়া রয়েছে এবং যাদের সামান্যতম ন্যায়বিচার ও বিবেকের বোধ রয়েছে, তাদের পক্ষে সেখানে যা ঘটছে তার প্রতি চোখ বন্ধ রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমান গাজার চরম সংকটজনক পরিস্থিতিকে তিনি ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক আটক শিবির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অধিবেশনে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন বাধার বিষয়টি তুলে ধরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পর পর দুই বছর ধরে সাধারণ পরিষদের এই হলে নিজের নির্ধারিত আসনে বসতে পারেননি। আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের ওপর চালানো এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবিচার পুরো বিশ্ববিবেককে গভীরভাবে আঘাত করে। এ সময় যেসব রাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের অবিলম্বে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে ইসরায়েলের ওপর সমন্বিত সর্বোচ্চ বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগের তাগিদ দেন।
উল্লেখ্য, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বলিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখেছে। আঙ্কারার অভিযোগ, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো নারকীয় অভিযান স্পষ্টতই মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম গণহত্যার শামিল, যার জন্য দেশটিকে কঠোর আন্তর্জাতিক জবাবদিহির মুখোমুখি করা প্রয়োজন। তবে ইসরায়েল শুরু থেকেই এ সংক্রান্ত যাবতীয় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।