ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আজ বুধবার ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ ইরাক সফরে গেছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মাসুদ পেজেশকিয়ান এই প্রথম বিদেশ সফরে গেলেন। ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায়। এই হামলায় ইরাকের সাদ্দাম হোসাইন সরকারের পতন হয়। এর পর থেকে ইরাকে অব্যাহতভাবে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে চলছে তেহরান। বর্তমানে ইরাকে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, পেজেশকিয়ান তার এই সফর সামনে রেখে বলেন, তেহরান ও বাগদাদের মধ্যে বেশ কিছু চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা আছে। তিনিসহ তার সফরসঙ্গীরা ইরাকের রাজধানী বাগদাদে দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ভারতশাসিত কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরে মসজিদগুলো নিয়ে পুলিশের নতুন তথ্যসংগ্রহ কার্যক্রম ঘিরে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে।
সম্প্রতি কাশ্মীর পুলিশ একটি চার পৃষ্ঠার ফরম বিতরণ শুরু করেছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘মসজিদ প্রোফাইলিং’। এতে মসজিদের আদর্শিক মতবাদ, প্রতিষ্ঠার সাল, অর্থের উৎস, মাসিক ব্যয়, জমির মালিকানা এবং একসঙ্গে কতজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন-এমন নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ফরমের বাকি অংশে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে মোবাইল নম্বর, ইমেইল, পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক হিসাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য। এমনকি আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকেন কি না সেসব বিষয়ও তথ্য দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
শ্রীনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ নওয়াজ খান বলেন, ‘এত বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য কেন প্রয়োজ তা আমাদের বোধগম্য নয়। সংঘাতপূর্ণ একটি অঞ্চলে এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ পরিবারগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
একই ধরনের ফরম কাশ্মীরের মাদ্রাসাগুলোর কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। কাশ্মীরের শীর্ষ ধর্মীয় জোট মুত্তাহিদা মজলিস-ই-উলামা (এমএমইউ) এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেছে, মসজিদ ধর্মীয় উপাসনা ও সমাজসেবার স্থান। এর অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে এভাবে হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটি একে মুসলিম সমাজের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরির চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে।
কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এ পদক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘মসজিদকে অপরাধস্থলে পরিণত করা হচ্ছে। সরকার কি একইভাবে মন্দির, গুরুদ্বারা বা গির্জার ক্ষেত্রেও এমন তথ্য সংগ্রহ করবে?’
তবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির কাশ্মীর মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর বলেন, অতীতে কিছু মসজিদ রাজনৈতিক প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তাই স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে নজরদারি প্রয়োজন।
২০১৯ সালে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সীমিত হওয়ার অভিযোগ আসছে। প্রধান জামিয়া মসজিদ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং ঈদের জামাতে বিধিনিষেধ আরোপ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যে কোনো হামলাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রোববার (জানুয়ারি) তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই হুঁশিয়ারি দেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা বা ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন- এমন জল্পনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে পেজেশকিয়ান বলেন, আমাদের দেশের মহান নেতার ওপর হামলা মানেই ইরানি জাতির বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ঘোষণা।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ ও এতে হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। ইরানের প্রিয় জনগণের জীবনে যদি কষ্ট ও সীমাবদ্ধতা থাকে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং অমানবিক নিষেধাজ্ঞা।
এর আগে গত শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির প্রায় ৪০ বছরের শাসনের অবসান চেয়ে তাকে ‘একজন অসুস্থ মানুষ’ বলে আখ্যা দেন। ট্রাম্প বলেন, খামেনির উচিত নিজের দেশ ঠিকভাবে চালানো ও মানুষ হত্যা বন্ধ করা।
ইরানে সর্বশেষ অস্থিরতার সূচনা হয় গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন ও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে তেহরান থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে, যেখানে শাসন পরিবর্তনের দাবিও ওঠে।
আন্দোলন জোরালো হলে ৮ জানুয়ারি ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ও ফোন পরিষেবা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বৈশ্বিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি আড়াল করা, যোগাযোগ দমন এবং স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনা রুখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এতে বহু ইরানি কার্যত বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে ও ‘নিজেদের প্রতিষ্ঠান’ দখল করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সহায়তা আসছে। একই সময় ইরানে হামলা আসন্ন- এমন প্রচারও বাড়তে থাকে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলার খুব কাছাকাছি চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে। আঞ্চলিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ায় ট্রাম্প সাময়িক বিরতির সিদ্ধান্ত নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত নয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কার্যকারিতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সংযমের আহ্বান জানান।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরানে হামলা সত্যিই খুব কাছাকাছি ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত হামলার নির্দেশ আর দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তেহরানের নেতাদের ধন্যবাদ জানান। তার দাবি, তারা ৮০০ জনের নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা থেকে সরে এসেছে। এর মধ্যে ছিলেন ২৬ বছর বয়সি এরফান সোলতানি, যিনি চলমান অস্থিরতার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম ইরানি বিক্ষোভকারী।
অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পোশাকের দোকানে কর্মরত সোলতানি তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের কারাজ শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর গ্রেপ্তার হন। বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। গ্রেপ্তারের পর থেকে সোলতানির পরিবার তার অবস্থার বিষয়ে খুব কম তথ্য পেয়েছিল। তবে সপ্তাহ শেষে পরিবার তার সঙ্গে দেখা করতে সক্ষম হয় ও নিশ্চিত হয় যে তিনি জীবিত।
এদিকে, গত কয়েক দিন ধরে ইরানে আর কোনো বড় বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। দেশটির রাস্তাঘাটে শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে। তবে শনিবার রাতে তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ঘরের জানালা থেকে খামেনিবিরোধী স্লোগান দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ইরানে ইন্টারনেট চালুর ইঙ্গিত, রাষ্ট্রীয় টিভি হ্যাক
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট সেবা শিগগির চালু করা হতে পারে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দেশটির জ্যেষ্ঠ এক সংসদ সদস্যের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
এছাড়া রোববার গভীর রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে।
ইরান সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শীর্ষ পর্যায়ের সংস্থাগুলো ইন্টারনেট চালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই সেবা চালু করা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে ইরানে অস্থিরতা চরমে ওঠার ঠিক আগের দিনগুলোয় ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল হওয়ায় বিক্ষোভ দমন ও সহিংসতার নানা তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানের রাজপথ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে। তবে সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
তিনি আরও জানান, সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটেছে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায়।
বিরোধীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। তবে ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর দাবি, বিদেশি শক্তির মদদে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হাসপাতাল ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে।
রোববার হ্যাকিংয়ের সময় টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দায় ‘ইরানের জাতীয় বিপ্লবের প্রকৃত খবর’ শিরোনাম ভেসে ওঠে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ওই সময় ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র রেজা পাহলভির বার্তা সম্প্রচারিত হয়। সেই সঙ্গে জনগণকে সরকারবিরোধী বিদ্রোহে নামার আহ্বান জানানো হয়।
দেশটির আরেক সংসদ সদস্য ও কট্টরপন্থি নেতা হামিদ রাসায়ি বলেন, ‘ঢিলেঢালা সাইবারস্পেস নিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অভিযোগের প্রতি কর্তৃপক্ষের আগেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল।’
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষমতার রাজনীতির পথে হাঁটছে। ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতিনির্ধারণী মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে বহুপাক্ষিক সমাধান এখন আর কার্যকর নয়। মার্কিন ক্ষমতা ও প্রভাব প্রয়োগই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং কখনো কখনো সেই প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে পাশ কাটিয়েই করা হচ্ছে।’
মূলত ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির প্রেক্ষাপটে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যেই গুতেরেস এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমতার নীতি বর্তমানে চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে বারবার জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা করলেও গুতেরেস স্বীকার করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন মানতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কার্যত দুর্বল এবং এর প্রকৃত ক্ষমতা মূলত বড় শক্তিগুলোর হাতেই সীমাবদ্ধ। মহাসচিবের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো আর বিশ্ব বাস্তবতাকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে না এবং সেখানে থাকা ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষ করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগের কারণে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক সকল উদ্যোগ বারবার ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গুতেরেসের মতে, বড় শক্তিগুলোর এই একপাক্ষিক প্রভাব ন্যায়সঙ্গত সমাধানের পরিবর্তে কেবল স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরকে পাঠানো এক চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে তার পূর্বতন দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প তার চিঠিতে আক্ষেপ প্রকাশ করে লেখেন, ‘প্রিয় জোনাস: ৮টির বেশি যুদ্ধ বন্ধ করার পরও আপনার দেশ আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায়, আমি আর কেবল শান্তির কথাই ভাবার বাধ্যবাধকতা অনুভব করি না। যদিও শান্তি সবসময়ই কেন্দ্রে থাকবে, তবে এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী ভালো ও যথাযথ, তা নিয়েও ভাবতে পারি।’ পিবিএস নিউজআওয়ারের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশ্যে আসা এই চিঠির সত্যতা পরবর্তীতে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উক্ত চিঠিতে ট্রাম্প শুধুমাত্র নোবেল ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব নিয়েও জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দাবি করেন যে, রাশিয়ার বা চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, ‘ডেনমার্ক এই ভূখণ্ডকে রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না… গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমাদের সম্পূর্ণ ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্ব নিরাপদ নয়।’ নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী স্টোর জানিয়েছেন যে, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের সাথে যৌথভাবে তারা ট্রাম্পকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত উচ্চ শুল্কারোপের বিরোধিতা করা হয়েছিল; মূলত সেই বার্তারই কঠোর জবাব দিয়েছেন ট্রাম্প।
এদিকে নোবেল পুরস্কার সংক্রান্ত ট্রাম্পের দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্টোর ব্যাখ্যা দেন যে, এই পুরস্কার নরওয়ে সরকার নয় বরং একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন কমিটি প্রদান করে থাকে। তবে ট্রাম্প তার অবস্থানে অনড় থেকে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পুনরায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানান এবং দাবি করেন যে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করার উপযুক্ত সময় এখনই। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী অবশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তাদের পূর্বতন অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং তারা উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপের অনুরোধ জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তা ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রোববার স্থানীয় সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই বার্তা দেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা ইরান রাষ্ট্র হিসেবে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবে।
পেজেশকিয়ান কেবল হুঁশিয়ারি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে যে রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ চলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে যে আর্থিক কষ্ট ও দুরবস্থা নেমে এসেছে, তার মূল কারণ হলো মার্কিন সরকার ও তাদের মিত্রদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক নিষেধাজ্ঞা। তার মতে, বিদেশি শক্তির এই অর্থনৈতিক আগ্রাসনের ফলেই দেশের জনগণ আজ সংকটের মুখে পড়েছে।
এদিকে পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্যের ঠিক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ৩৭ বছরের শাসনের অবসানের ডাক দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প মন্তব্য করেন যে, ইরানে এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, খামেনি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজের দেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছেন এবং নজিরবিহীন সহিংসতা ও দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি খামেনির কর্মকাণ্ডকে দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে অভিহিত করেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বর্তমানে চরম অস্থিতিশীল। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রার ভয়াবহ দরপতন এবং অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, যা রোববার থেকে আংশিকভাবে সচল হয়েছে বলে নেটব্লকস জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, দেশজুড়ে চলা এই সহিংস বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বলেও ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং হতাহতের এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানে চলমান দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিরাপত্তা কর্মীও রয়েছেন।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) একজন ইরানি কর্মকর্তার বরাতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। তিনি ‘নিরপরাধ ইরানিদের’ হত্যার জন্য ‘সন্ত্রাসী এবং সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে আরও বলেন, ‘উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দিশ এলাকায় সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই অঞ্চলে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয় এবং অতীতের সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটিয়েছে।’
কর্মকর্তা আরও বলেন, মৃতের সংখ্যা দ্রুত এতো বৃদ্ধি পাবে তা মোটেই আশাযোগ্য নয়। ইসরায়েল এবং বিদেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রাস্তায় নেমে আসা ব্যক্তিদের সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছে।’
ইরানি কর্তৃপক্ষ এই নিয়মিত অস্থিরতার জন্য বিদেশী শত্রুদের বিশেষ করে ইসরায়েলকে দায়ী করেছে, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান শত্রু। যারা জুন মাসে ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক (এইচআরএএনএ) অধিকার গোষ্ঠী শনিবার জানিয়েছে, ইরান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৩০৮ জনে পৌঁছেছে। এছাড়া দেশটির এই সংঘাতে আরও ৪ হাজার ৩৮২ জনের বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।এছাড়াও এইচআরএএনএ ২৪ হাজারেরও বেশি গ্রেপ্তারের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে।
প্রসঙ্গত, নরওয়েতে অবস্থিত ইরানি কুর্দি অধিকার গোষ্ঠী হেনগাও জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি এলাকাগুলোতে।
ভেনিজুয়েলার ইতিহাস আমাদের সামনে এক কঠিন কিন্তু অপরিহার্য প্রশ্ন তুলেধরে- প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য কি সত্যিই একটি দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে? তেলের বিপুল ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার বর্তমান বাস্তবতা এই প্রশ্নের উত্তরকে গভীর সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়। দেশটির অভিজ্ঞতা দেখায়, সম্পদ যদি সঠিক নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা উন্নয়নের বদলে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিতে পারে। স্পেনীয় উপনিবেশ স্থাপনের বহু আগে ভেনিজুয়েলার ভূখণ্ড ছিল আরাওয়াক, কারিবসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। তারা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিকাজ, শিকার ও মাছ ধরার মাধ্যমে জীবন গড়ে তুলেছিল। ষোড়শ শতকে স্পেনীয় উপনিবেশবাদ এই স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেয়। ইউরোপ থেকে আসা রোগ, জোরপূর্বক শ্রম ও সহিংসতা আদিবাসী সমাজকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। উপনিবেশিক অর্থনীতি কোকো ও কফির মতো কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং ভূমি ও ক্ষমতা সীমিত একটি শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্বাধীনতার পরও রয়ে যায়।
উনিশ শতকের শুরুতে সিমন বলিভারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন ভেনিজুয়েলাকে রাজনৈতিক মুক্তি দিলেও অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর দেশটি দীর্ঘদিন সামরিক শাসন, আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে আটকে থাকে। সাধারণ মানুষের জীবন তখনও দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রের সীমিত উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ শতকের শুরুতে তেলের আবিষ্কার ভেনিজুয়েলার জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দেয়। ১৯২২ সালে মারাকাইবো অঞ্চলে তেল উত্তোলন শুরু হলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক হয়ে ওঠে। তেল রপ্তানি থেকে বিপুল রাজস্ব আসতে থাকে, শহরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, অবকাঠামো গড়ে ওঠে। কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে একটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়—অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্প খাত অবহেলিত হয় এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য গড়ে ওঠে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, বিশেষ করে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে ভেনিজুয়েলার মাথাপিছু আয় লাতিন আমেরিকার মধ্যে অন্যতম উচ্চ ছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটে। ১৯৭০-এর দশকে তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার তেল শিল্প জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএ গঠন করে। তবে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব তেল আয়ের সঠিক ব্যবহারকে ব্যাহত করে। উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তা ছিল ভঙ্গুর এবং তেলমূল্যের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল।
এই ভঙ্গুরতা প্রকট হয়ে ওঠে ১৯৮০-এর দশকে তেলের দাম কমে গেলে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ঋণ সংকট ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ১৯৮৯ সালে ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘কারাকাসো’ গণবিক্ষোভ রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার বিশ্বাস ভেঙে পড়ার প্রতীক হয়ে ওঠে। দমন-পীড়নের মাধ্যমে সেই সংকট সামাল দেওয়া হলেও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা গভীর হয়।
এই প্রেক্ষাপটে হুগো চাভেজের উত্থান ঘটে। ১৯৯৮ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেন। তেল আয়ের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু হয়। প্রথম দিকে এসব উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনমান উন্নত করে। তবে অর্থনীতির বৈচিত্র্য না এনে আরও বেশি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ এবং তেলনির্ভরতা ভবিষ্যতের সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
চাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে বৈশ্বিক তেলের দাম পতনের সঙ্গে সঙ্গে সংকট চরম আকার ধারণ করে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানোর ফলে দেশটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়ে। খাদ্য ও ওষুধের সংকট, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ পানির অনিয়মিত সরবরাহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার দীর্ঘ ও সংঘাতময় সম্পর্ক। ঠান্ডা যুদ্ধোত্তর সময়ে তেল ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হুগো চাভেজ ও পরবর্তী সময়ে নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শিক বিরোধ প্রকট হয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, বিশেষ করে তেল খাতকে লক্ষ্য করে। এসব নিষেধাজ্ঞা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে—রপ্তানি কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতির মাধ্যমে।
ভেনিজুলার বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি দেশের সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ ভুল সিদ্ধান্তের ফল নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা ও শক্তির ভারসাম্যও সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে কোনো দেশই বহিরাগত চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না।
ভেনিজুয়েলার ইতিহাস তাই শুধু একটি দেশের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়; এটি সব সম্পদসমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সুশাসন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও মানবকেন্দ্রিক নীতির বিকল্প নয়। ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সম্পদ ব্যবহারের প্রজ্ঞা।
লেখক: ক্যামব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আর্কটিক মহাসাগরের বরফ গলতে শুরু করায় রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট এবং কানাডার নর্থওয়েস্ট প্যাসেজের মতো নতুন নৌপথগুলো উন্মুক্ত হচ্ছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই পরিবর্তন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকা সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল। তবে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি এবং কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলের অনেক জলরাশি সঠিকভাবে মানচিত্রায়িত না হওয়া এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা যেকোনো বড় দুর্ঘটনা সামাল দেওয়া কঠিন করে তুলছে। যদিও ইউক্রেন সংকটের প্রেক্ষাপটে আর্কটিক কাউন্সিলের কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তবুও বিজ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর কূটনৈতিক পথ এখনো খোলা রয়েছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের তাগিদে নিকেল ও কোবাল্টের মতো প্রয়োজনীয় খনিজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বিশ্বের নজর পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর তলদেশের দিকে। বিশেষ করে চীন নিয়ন্ত্রিত খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে গভীর সমুদ্রের খনিজ ভাণ্ডার আহরণে সরকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় এবং খননের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কায় বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ এই কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় খনিজ আহরণ নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল সিবেড অথরিটি এখনো খনন চূড়ান্ত করতে না পারায় নরওয়ের মতো দেশগুলো ২০২৯ সাল পর্যন্ত তাদের লাইসেন্স স্থগিত রেখেছে। পরিবেশগত ঝুঁকি এড়াতে বিএমডব্লিউ, ভলভো ও গুগলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোও আপাতত গভীর সমুদ্রের খনিজ ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছে।
সমুদ্রের এই বহুমুখী সংকটের মধ্যে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ উপকূলীয় জনপদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অনেক দেশ ‘হাই সিজ ট্রিটি’ অনুমোদন করে, যা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সংরক্ষিত এলাকা গঠনের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যৌথভাবে মাছ ধরার কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে সমুদ্রের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তির ওপরই এখন নির্ভর করছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক টেকসই নিরাপত্তা। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে সমুদ্রের এই ত্রিমুখী সংকট—নৌপথের প্রতিযোগিতা, খনিজ আহরণ এবং অতিরিক্ত মাছ ধরা—মোকাবিলা করাই এখন বিশ্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ইন্দোনেশিয়ার নিখোঁজ ছোট প্লেনের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকারীরা। প্লেনটি দেশটির সুলাওয়েসি দ্বীপের একটি পাহাড়ি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্লেনটিতে ১১ জন আরোহী ছিলেন যাদের সকলেই নিখোঁজ রয়েছে।
বিমানে আটজন ক্রু সদস্য এবং সামুদ্রিক বিষয় ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন কর্মকর্তা ছিলেন। তারা আকাশপথে সামুদ্রিক নজরদারি মিশনের অংশ হিসেবে যাত্রা করছিলেন।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) জাভা দ্বীপের জাকার্তা থেকে দক্ষিণ সুলাওয়েসি প্রদেশের রাজধানী মাকাসারের উদ্দেশে যাত্রাপথে প্লেনটি রাডার থেকে হারিয়ে যায়।
মাকাসার অনুসন্ধান ও উদ্ধার দফতরের প্রধান মুহাম্মদ আরিফ আনোয়ার জানিয়েছেন, রোববার (১৮ জানুয়ারি) সকালে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে উদ্ধারকারী দল মাউন্ট বুলুসারাউংয়ের ঢালে জঙ্গলে একটি বিমানের জানালার অংশ দেখতে পায়। পরে স্থলে থাকা উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে বিমানের মূল কাঠামো ও পেছনের বড় অংশ উদ্ধার করে যা পাহাড়ের উত্তর দিকের খাড়া ঢালে ছড়িয়ে ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার বলেন, বিমানের প্রধান অংশগুলোর সন্ধান পাওয়ায় অনুসন্ধান এলাকা অনেকটাই সীমিত করা সম্ভব হয়েছে। এখন আমাদের যৌথ উদ্ধার দল মূলত যাত্রী ও ক্রুদের খোঁজে মনোযোগ দিচ্ছে, বিশেষ করে কেউ জীবিত থাকলে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বিমানটি ছিল একটি টার্বোপ্রপ এটিআর- ৪২-৫০০ যা ইন্দোনেশিয়া এয়ার ট্রান্সপোর্ট পরিচালনা করছিল। শেষবার এটি দক্ষিণ সুলাওয়েসির মারোস জেলার পাহাড়ি লিয়াং-লিয়াং এলাকায় শনাক্ত হয়।
দক্ষিণ সুলাওয়েসির হাসানউদ্দিন সামরিক কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল বাঙ্গুন নাওকো জানিয়েছেন, প্রবল বাতাস, ঘন কুয়াশা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হলেও রোববার স্থল ও আকাশপথে অনুসন্ধান অব্যাহত ছিল।
জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থার প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা ঘন কুয়াশায় ঢাকা সরু ও খাড়া পাহাড়ি পথে হেঁটে ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
উল্লেখ্য, ১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়ায় যোগাযোগের জন্য ছোট প্লেন ও ফেরির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি একাধিক প্লেন দুর্ঘটনা, বাস দুর্ঘটনা ও ফেরি ডুবে যাওয়ার মতো পরিবহন দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে।
ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের মুখে বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ওয়াশিংটনে সপরিবারে বসবাসকারী ৬৫ বছর বয়সি এই সাবেক রাজপুত্র দৃঢ়তার সাথে বলেন, প্রশ্নটি এখন আর ‘যদি’ নয় বরং ‘কখন’ সরকার পড়বে তার ওপর নির্ভর করছে। তিনি নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে রূপান্তরের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর মতে, সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪২৮ ছাড়িয়েছে, যদিও অন্যান্য সূত্রমতে এই সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা হলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিলেও গত দুই সপ্তাহে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেননি, বরং সম্প্রতি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়েছে এবং এর জন্য তিনি তেহরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ট্রাম্পের এমন নরম অবস্থানে পাহলভি তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যেন তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার মতো ভুল না করেন এবং ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।
রেজা পাহলভি তার বক্তব্যে ইরানের এলিট বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর ওপর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী হামলার জোরালো দাবি জানান। এছাড়া তিনি বিশ্বের সব দেশকে ইরানের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করার এবং দেশটিতে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর বিষয়ে সহায়তা করার অনুরোধ করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে ক্ষমতায় এলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক গড়বেন এবং ইসরাইলের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য ‘সাইরাস অ্যাকর্ড’ নামক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করবেন।
ইরানের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাহাড় সমান সমালোচনা থাকলেও পাহলভি দাবি করেন, তিনি কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চান যা পরে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সরকার ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে।
তার বাবার আমলের দমন-পীড়ন নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ইতিহাস লেখার দায়িত্ব ইতিহাসবিদদের, তিনি এখানে নতুন ইতিহাস গড়তে এসেছেন। ভাষণের শেষে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করেন, তিনি ইরানে ফিরে যাবেন এবং দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবেন।
নিকোলাস মাদুরো সরকারের দমন-পীড়ন এবং গুম হওয়ার শঙ্কায় দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এরমাঝেই জানতে পারেন শান্তিতে নোবেল পেতে যাচ্ছেন। তড়িঘড়ি করে তাই ভেনিজুয়েলা থেকে পালানোর পরিকল্পনা করেন।
ঝড়-বৃষ্টির মাঝে দীর্ঘ সময়ের লড়াইয়ের পর সমুদ্রে তাকে নিরাপদে নেওয়ার সেই গল্প শুনিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উদ্ধারকারী দল গ্রে বুল। তাদের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখানো হয়, কিভাবে মারিয়া পালিয়ে নরওয়ে পৌঁছান। খবর সিএনএন’র
গ্রে বুলের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তাল সমুদ্রে একটি ছোট নৌকা থেকে মাচাদোকে একটি দ্রুতগতির নৌযানে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ভিডিওতে মাচাদো নিজেই নিশ্চিত করেন যে তিনি ‘জীবিত এবং নিরাপদ’ আছেন। ভেনিজুয়েলায় আত্মগোপনে থাকার কয়েক মাস পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্যে আসা।
উদ্ধারকারী দলটির প্রতিষ্ঠাতা ব্রায়ান স্টার্ন জানান, এই অভিযানে ভেনিজুয়েলার উপকূল থেকে নৌকায় রওনা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক জলসীমায় গিয়ে মাচাদোকে তুলে নেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উদ্ধারকারী দলটি মাঝ সাগরে আরেকটি নৌকায় অপেক্ষা করছিলেন।
শুক্রবার প্রকাশিত দুই মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর রাতে মাচাদো কীভাবে দ্বিতীয় নৌকাটিতে পৌঁছে সেটিতে ওঠেন। মাচাদোর নৌকার আলো দূর থেকে দেখা গেলে স্টার্নকে বলতে শোনা যায়, ‘ওই যে ওরাই’। মাচাদোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্টার্ন তাকে নৌকায় তুলতে সাহায্য করেন, ভিডিওতে সেটি দেখা যায়নি যদিও।
নৌকায় ওঠার সময় স্টার্নকে বলতে শোনা যায়, ‘হাই, মারিয়া। আমার নাম ব্রায়ান। আপনাকে পেয়ে ভালো লাগছে। আমি আপনাকে নিরাপদে নিয়েছি।’ জবাবে মাচাদো বলেন, ‘আমি খুব ভিজে গেছি, খুব ঠাণ্ডা লাগছে।’
ভিডিওর পরের অংশে দেখা যায়, গাঢ় রঙের জ্যাকেট ও টুপি পরে মাচাদো সরাসরি ক্যামেরার দিকে কথা বলছেন, ‘আমি মারিয়া কোরিনা মাচাদো। আমি জীবিত। আমি নিরাপদ এবং গ্রে বুলের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ।’
ভিডিওর শেষদিকে স্টার্ন ও তার দলের সঙ্গে মাচাদোর কয়েকটি স্থির ছবি দেখানো হয়। ছবিগুলোর ওপর স্টার্নের কণ্ঠ শোনা যায়, যেখানে তিনি নিশ্চিত করেন যে তারা সফলভাবে তার কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। এসময় স্টান বলেন, তারা ভেনিজুয়েলার কাছের দ্বীপ কুরাসাওর দিকে যাত্রা করছেন।
স্টার্ন জানান, দীর্ঘ, ঠান্ডা ও টানটান উত্তেজনাপূর্ণ যাত্রার পর তারা ভোরের দিকে তীরে পৌঁছান। সেখান থেকে মাচাদো একটি বিমানে করে নরওয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন এবং পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
গ্রে বুল জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানটি প্রায় ১৬ ঘণ্টা ধরে চলে এবং এর বেশিরভাগ অংশই উত্তাল সমুদ্রে গভীর রাতে। এই দলটি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক নাগরিকদের উদ্ধারে কাজ করে। স্টার্নের নেতৃত্বে তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০০টি অভিযান পরিচালনা করেছে।
শুক্রবারের (১৬ জানুয়ারি) আগে মাচাদো নিরাপত্তাজনিত কারণে উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। এ বিষয়ে সিএনএন তার দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেও জবাব পায়নি।
তবে শান্তিতে নোবেল পাওয়া মাচাদো জানিয়েছিলেন, তিনি মার্কিন সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন। তবে বিস্তারিত বলতে চাননি। সেসময় মাচাদো বলেন, ‘একদিন আমি সব বলব। কারণ এখন আমি তাদের ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না।
মাচাদোকে উদ্ধারের এই অভিযানটি অজ্ঞাত দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে বলে জানিয়েছে গ্রে বুলের অধিনায়ক স্টার্ন। তিনি নিশ্চিত করে বলেছেন, মার্কিন সরকারের সরাসরি কোনো সহায়তা এখানে ছিল না। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, সমুদ্রে তাদের উপস্থিতির বিষয়ে তার দল মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল।
আমেরিকার বিশেষ অভিযানে ভেনিজুয়েলার সরকারপ্রধান মাদুরো স্বস্ত্রীক আটক হয়েছেন। তাকে মাদকপাচারের মামলায় আদালতে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডেলিস রদ্রিগেজ। তবে দেশটির বিরোধী দলের নেতা ও নোবেল শান্তি পাওয়া মাচাদো এখন কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। তবে বিশ্বের বেশ কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি ইউরোপের বাইরে থাকতে পারেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আল হাবতুর গ্রুপ কর্মীদের জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের আমিরাতি কর্মীদের বিয়ে ও পরিবার গঠনে উৎসাহিত করতে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মী বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেই তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হবে ১৬ লাখ টাকা সমপরিমাণ অর্থ। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর সন্তান জন্ম দিলে এই সুবিধা আরও বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে।
দুবাইয়ের প্রখ্যাত ধনকুবের এবং আল হাবতুর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খালাফ আল হাবতুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো আমিরাতি নাগরিক বিয়ে করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার দিরহাম বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। এছাড়া বিয়ের দুই বছরের মধ্যে ওই দম্পতির ঘরে নতুন অতিথি বা সন্তান আসলে অনুদানের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২ লাখ টাকার সমান।
খালাফ আল হাবতুর তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, বিবাহ এবং পরিবার গঠনকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখেন না, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শক্তিশালী জাতি এবং স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। সরকার যেভাবে যুবসমাজকে পারিবারিক জীবন শুরু করতে সহায়তা করে, ঠিক তেমনি দেশের সচ্ছল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত এমন বাস্তবমুখী ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ১৫ লাখে পৌঁছালেও সেখানে স্থানীয় নাগরিকদের হার মাত্র ১৫ শতাংশ। জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে এবং স্থানীয় নাগরিকদের পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেশটির সরকার দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে। আল হাবতুর গ্রুপের এই উদ্যোগ মূলত বেসরকারি খাতে আমিরাতি নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং তাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই ঘোষণা সরকারি প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে এবং তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে।
ইরানে গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনে অন্তত ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে দেশটির সরকার। রবিবার দেশটির একজন আঞ্চলিক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় হতাহতের তথ্য যাচাই-বাছাই করে কর্তৃপক্ষ এই পরিসংখ্যান পেয়েছে। সরকারি ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৫০০ সদস্য রয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং সশস্ত্র দাঙ্গাবাজরা নিরীহ ইরানিদের হত্যা করেছে।
সরকারি ওই কর্মকর্তা জানান, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ও সর্বাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই অঞ্চলে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সক্রিয়তা এবং অতীতের সহিংসতার রেকর্ডের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল এবং বিদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র সরবরাহ করছে। ইরান সরকার বরাবরের মতোই দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য বিদেশি শত্রুদের দায়ী করেছে, যার মধ্যে তাদের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নামও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণহানির দাবি করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। রবিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমস ইরানি চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহতদের অধিকাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ এবং বিক্ষোভে আহতের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার। ইরানি-জার্মান চক্ষু চিকিৎসক প্রফেসর আমির পারাস্তা সানডে টাইমসকে জানান, এবারের দমন-পীড়নে মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের মাথা, গলা ও বুকে গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া শটগানের গুলিতে প্রায় ৭০০ বিক্ষোভকারী দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ শনিবার জানিয়েছিল, তাদের তথ্যমতে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩০৮ জনে পৌঁছেছে এবং আরও ৪ হাজার ৩৮২ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সংস্থাটি আরও জানায়, বিক্ষোভ চলাকালীন ইরানি কর্তৃপক্ষ ২৪ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও নিশ্চিত করেছে যে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সবচেয়ে সহিংস রূপ ধারণ করেছিল।
উল্লেখ্য, গত মাসের শেষ দিকে ইরানে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ গত ৭ ও ৮ জানুয়ারি চরম আকার ধারণ করে। সে সময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এবং ব্যাপক দমন-পীড়নের ফলে বর্তমানে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দেশে সাধারণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও তারা নিষিদ্ধ স্টারলিংক ইন্টারনেট ব্যবহার করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে হতাহতের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।