শ্রীলঙ্কার নব-নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে সোমবার কলম্বোতে এক অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় এক টেলিভিশনে তা দেখা গেছে। কলম্বো থেকে আজ এএফপি এ খবর দিয়েছে।
২০২২ সালে দ্বীপ দেশটিতে মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিলে ব্যাপক গণ বিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজা পাকসের দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে শনিবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে এক সময়ের প্রান্তিক বামপন্থী মার্কসবাদী পার্টির নেতা দিশানায়েকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৮ জন প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ী হন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য বাংলাদেশকে নন-ফ্যামিলি পোস্টিং বা পরিবার ছাড়া কর্মস্থল হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত নির্বাচনের প্রাক্কালে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নয়াদিল্লি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে চরমপন্থি ও উগ্রপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে হুমকির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে শেষ পর্যন্ত পরিবার ও নির্ভরশীল সদস্যদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলো।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সতর্কতামূলক এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে অবস্থিত চারটি সহকারী হাইকমিশনে কর্মরত কর্মকর্তাদের পরিবার ও নির্ভরশীলদের দ্রুত ভারতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবার সরিয়ে নেওয়া হলেও কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রমে কোনো ভাটা পড়বে না। সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ঢাকাসহ সব কটি মিশন খোলা থাকবে এবং কূটনীতিকরা পূর্ণ জনবল নিয়ে তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যাবেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে কতজন ভারতীয় কূটনীতিক কর্মরত রয়েছেন বা তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া কূটনীতিকদের পরিবার ঠিক কবে নাগাদ ভারত অভিমুখে রওনা হবেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এই প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও আর্থিক নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করেছেন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি উল্লেখ করে তিনি জানান, শক্তিশালী দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রচলিত নিয়মনীতির অবক্ষয় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। কার্নি তার ভাষণে উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা কোনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং বড় ধরনের এক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’ তার মতে, বিশ্ব আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং বর্তমানে বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্য দেশগুলোর ওপর অনৈতিক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।
কানাডার মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এই নতুন বাস্তবতা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে মন্তব্য করেন মার্ক কার্নি। তিনি উল্লেখ করেন, আগেকার ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ থেকে কানাডা অনেক সুবিধা পেলেও এখন বড় শক্তিগুলোর চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে সেই নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বড় শক্তিগুলোকে এককভাবে খুশি করার চেষ্টা না করে মাঝারি দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি আলোচনার টেবিলে না থাকলে খাবারের মেনুতে পরিণত হবেন’। কার্নি মনে করেন, মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এখন আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই এবং তাদের অবশ্যই নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কানাডার মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এখন প্রশ্নটা এটা নয় যে আমরা মানিয়ে নেব কি না। আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নিজেদের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে মানিয়ে নেব, নাকি আরও বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজ করব?’
কানাডা ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান উত্তজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কার্নির এই ভাষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে আমেরিকার ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডা ও ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার পতাকায় ঢাকা একটি মানচিত্র পোস্ট করেছেন, যা এক প্রকার দখলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই আশঙ্কার মধ্যেই গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, কানাডার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘আগ্রাসন’ মোকাবিলার জন্য গেরিলা কৌশলের বিশেষ প্রতিরক্ষা মডেল বা পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের হুমকি এবং বড় শক্তিগুলোর এমন একতরফা প্রভাব বিস্তারের মানসিকতা এবারের দাভোস সম্মেলনের পরিবেশকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।
স্পেনের বার্সেলোনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একটি যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে রেললাইনের পাশের দেয়ালে আছড়ে পড়লে এর চালক নিহত হন এবং অন্তত ৩৭ জন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং বাকি ৩২ জন বিভিন্ন মাত্রায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। গত রোববার দক্ষিণ স্পেনে ৪০ জনের প্রাণহানির রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে দেশটিতে এটি দ্বিতীয় বড় ট্রেন দুর্ঘটনা।
কাতালুনিয়া আঞ্চলিক ফায়ার ইন্সপেক্টর ক্লাউডি গালার্দো জানিয়েছেন যে, উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে “ট্রেন থেকে সব যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।” দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের ভেতরে একজন যাত্রী আটকা পড়লেও পরবর্তীতে উদ্ধারকারীরা তাকে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হন। বর্তমানে আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। একই সময়ে বার্সেলোনায় আরেকটি কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত হলেও সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
দেশটির রেল কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক প্রবল ঝড় ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে রেললাইনের ওপর পাথর পড়ে থাকায় ট্রেনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাইনচ্যুত হচ্ছে। বর্তমানে স্পেনের উপকূলীয় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উচ্চসতর্কতা জারি করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতির মধ্যেই পর পর দুটি বড় রেল দুর্ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সূত্র: বিবিসি।
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী, পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী দীর্ঘকালীন বৈরী সম্পর্ক এখন এক নজিরবিহীন উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে, যেখানে উভয় রাষ্ট্রই একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে। ওয়াশিংটন কর্তৃক তাদের একটি বিশেষ বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে পাঠানোর প্রেক্ষিতে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা তাদের হাতে থাকা সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত হানবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, তাদের এই অবস্থান কোনো ফাঁকা বুলি নয় বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “একটি সর্বাত্মক সংঘাত অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং তা ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের দেওয়া কাল্পনিক সময়সীমার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে।” আরাগচির মতে, এমন যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের ওপর এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক হুঁশিয়ারি। ট্রাম্প নিউজ নেশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুনরায় হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি তাকে হত্যার অপচেষ্টা চালায় তবে দেশটিকে “পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা হবে”। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের জবাবে ইরানের জেনারেল আবুলফজল শেকারচি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, তাদের সর্বোচ্চ নেতার ওপর কোনো আঘাতের সামান্যতম আভাস পাওয়া গেলে তারা কেবল “আক্রমণকারীর হাত কেটে দেবেন না, বরং পুরো অঞ্চলে মার্কিনদের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় অবশিষ্ট রাখবেন না।” এই পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে এবং তারা ট্রাম্পকে সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
সামরিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ইতিমধ্যে মালাক্কা প্রণালী পার হয়ে ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে, যেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছাতে মাত্র কয়েক দিন সময় লাগবে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এর সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নিয়ে মুখ খোলেনি, তবে ভারত মহাসাগরে এর উপস্থিতি তেহরানের জন্য বড় ধরনের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছিল, যা মূলত যুদ্ধের প্রস্তুতিরই একটি অংশ।
এদিকে বাইরের সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরান অভ্যন্তরীণভাবেও চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটিতে এখন সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন চলমান রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে এবং ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এই প্রাণহানির জন্য বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করছে এবং নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার বলে স্বীকার করেছে। বাইরের সামরিক হুমকি এবং ভেতরের বিশাল গণঅস্থিরতার এই দ্বিমুখী চাপে তেহরান এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা।
জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরানকে অবিলম্বে নিখোঁজ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে এবং সাম্প্রতিক বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য রাখার সময় গ্রোসি সতর্ক করে বলেন, এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না এবং একটা সময় তাকে স্বীকার করতে হতে পারে যে এই বিপজ্জনক উপাদানগুলো কোথায় আছে, তা তার জানা নেই।
আইএইএ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ঘোষিত ১৩টি পারমাণবিক স্থাপনা তারা পরিদর্শন করেছে, যেগুলো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নাতানজ, ফোর্দো এবং ইসফাহানের মতো তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। গ্রোসি জোর দিয়ে বলেন, এসব স্থাপনায় আসলে কী ঘটেছে এবং সেখানে থাকা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান কী, সে বিষয়ে ইরানকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম যদি আরও সমৃদ্ধ করা হয়, তবে তা দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
গত সাত মাস ধরে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যাচাই করা যায়নি, যদিও নিয়ম অনুযায়ী মাসিক ভিত্তিতে এই পরিদর্শন হওয়ার কথা ছিল। পরিদর্শনে বিলম্বের কারণ হিসেবে গ্রোসি ইরানের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করেন। তবে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে দেশের পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে, ফলে শিগগিরই পরিদর্শকদের কাজ পুনরায় শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গ্রোসি স্মরণ করিয়ে দেন যে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি মেনে চলা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি বাধ্যতামূলক।
আপাতত পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া না গেলেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইরানের সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন আইএইএ প্রধান। তিনি জানান, অচলাবস্থা কাটাতে আগামী দিন বা সপ্তাহের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে তার বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যার লক্ষ্য হলো নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ছাড়াই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।
গাজার যুদ্ধ বন্ধ এবং উপত্যকাটির পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস অদূর ভবিষ্যতে জাতিসংঘের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন মন্তব্য করেছেন যা বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৮০ বছর আগে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও ট্রাম্পের এই নতুন উদ্যোগের কারণে সংস্থাটি এখন অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন যে তার তৈরি করা এই বোর্ড জাতিসংঘের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রভাবশালী বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি এই পদে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল থাকবেন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি এই বোর্ডের নেতৃত্ব চালিয়ে যেতে পারবেন বলে জানা গেছে। গাজা সংকট নিরসনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হলেও এর কার্যপরিধি যে ক্রমান্বয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে যাচ্ছে, তা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই বোর্ডে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং আর্থিক শর্তাবলি নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, বোর্ড অব পিসের স্থায়ী সদস্যপদ লাভের জন্য আগ্রহী দেশকে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার অনুদান প্রদান করতে হবে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন এই বোর্ডে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থের বিনিময়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী পর্ষদের সদস্যপদ পাওয়ার এই প্রক্রিয়া কূটনৈতিক মহলে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প তার এই বোর্ডের সদস্য হওয়ার জন্য বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এর মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে সতর্কতা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যেহেতু পুতিন ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তাই তাকে এমন একটি শান্তি পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জাপানের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যার দায়ে ৪৫ বছর বয়সী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারা অঞ্চলের ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন।
২০২২ সালের জুলাই মাসে নারা শহরে এক নির্বাচনী প্রচারণায় ভাষণ দেওয়ার সময় ঘরে তৈরি বন্দুক দিয়ে আবেকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন ইয়ামাগামি, যার ফলে ৬৭ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যু হয়। গত অক্টোবরে মামলার প্রথম শুনানিতেই ইয়ামাগামি নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক শিনিচি তানাকা এই হত্যাকাণ্ডকে “জঘন্য” বলে অভিহিত করেন। তিনি তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, “বড় জনসমাবেশে বন্দুক ব্যবহার করাটা যে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নৃশংস অপরাধ, তা স্পষ্ট।” রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই অপরাধকে আধুনিক জাপানের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাজা কমিয়ে ২০ বছরের মধ্যে রাখার আবেদন করলেও আদালত তা আমলে নেননি। আসামিপক্ষের যুক্তি ছিল, ইউনিফিকেশন চার্চকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিপর্যয়ই ইয়ামাগামিকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করেছিল।
তদন্ত ও আদালতের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে যে, ইয়ামাগামির মা ইউনিফিকেশন চার্চে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করায় তাদের পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। শিনজো আবে একবার ওই চার্চের একটি অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা প্রদান করায় ইয়ামাগামি তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু বানান। এই হত্যাকাণ্ডের পর জাপানের ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাথে বিতর্কিত ওই ধর্মীয় সংগঠনের সম্পর্কের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে, যা দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মোট ৩ হাজার ১৮৮ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা শিনজো আবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার বিশেষ সখ্য ছিল। আবের প্রস্থান জাপানের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে উঠতে এলডিপিকে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো ধরনের ভয়ভীতি, দাদাগিরি বা 'গুণ্ডামি'র কাছে ইউরোপ কখনোই মাথা নত করবে না। গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর না করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা ট্রাম্প দিয়েছেন, তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে মাক্রোঁ ইউরোপের সার্বভৌমত্ব ও সম্মানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। আটলান্টিকের দুই পাড়ের কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে যখন অন্য ইউরোপীয় নেতারা সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন, তখন মাক্রোঁ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের সমালোচনা করলেন।
মাক্রোঁ তার বক্তব্যে বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ কখনোই শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম মেনে নেবে না। তার মতে, এমনটা মেনে নিলে ইউরোপ ধীরে ধীরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। বিশ্ব রাজনীতি নীতিহীনতার দিকে ঝুঁকলেও ইউরোপ তার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না বলে তিনি হুশিয়ারি দেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্বরতার চেয়ে আইনের শাসন এবং গুণ্ডামির চেয়ে সম্মানই ইউরোপের কাছে বেশি পছন্দের। শারীরিক অসুস্থতার কারণে, বিশেষ করে চোখের রক্তনালী ফেটে যাওয়ায় সুরক্ষার জন্য বক্তব্যের সময় মাক্রোঁকে এভিয়েটর সানগ্লাস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের পণ্যের ওপর আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হবে। বিশেষ করে ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন তিনি। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মাক্রোঁ দাভোসে বলেন, ওয়াশিংটনের এই লাগাতার শুল্ক আরোপ এবং একে ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অকার্যকর।
এর আগে ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে মাক্রোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে দেন, যেখানে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা এবং জি-৭ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব ছিল। এদিকে, দাভোসে দুই নেতার মুখোমুখি সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মাক্রোঁ জানিয়েছেন তিনি বুধবারের আগেই দাভোস ত্যাগ করবেন, অথচ ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার কথা বুধবার। তবে ফাঁস হওয়া বার্তায় দেখা গেছে মাক্রোঁ বৃহস্পতিবার প্যারিস সফরের জন্য ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যদিও ট্রাম্প সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন প্রধান শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শ্রমিক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বর্ষপূর্তির দিনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে তার অভিবাসন দমননীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের হাতে মার্কিন এক নারী নাজেহাল হওয়া এবং ৩৭ বছর বয়সী রেনে গুডকে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, ওয়াশিংটনসহ নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলের মতো ছোট শহরগুলোতেও শত শত বিক্ষোভকারী রাজপথে নেমে এসেছেন। শহরগুলোর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় বিক্ষোভকারীরা ‘নো আইসিই, নো কেকেকে, নো ফ্যাসিস্ট ইউএসএ’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, দেশটিতে অবৈধভাবে বসবাসরত লাখ লাখ অভিবাসীকে বহিষ্কারের বিষয়ে তারা জনম্যান্ডেট পেয়েছে, তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকই ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) ও অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করছেন।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ‘নো হেইট, নো ফিয়ার, রিফিউজিস আর ওয়েলকাম হিয়ার’ স্লোগান তুলে রাজপথে অবস্থান নেন। একই সময়ে নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফেতে হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাজ্য ক্যাপিটলে আয়োজিত ‘স্টপ আইসিই টেরর’ সমাবেশে অংশ নেয়। ইন্ডিভিজিবল ও ৫০৫০১-এর মতো বামপন্থী সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও তৃণমূল সংগঠন এসব প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এসব সংগঠন মূলত অভিবাসী আটক কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমের ঘোর বিরোধিতা করছে।
টেক্সাসের এল পাসোর একটি কেন্দ্রে গত দেড় মাসে আটককৃত তিন অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনা এই বিক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদী আন্দোলন এখন দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সান ফ্রান্সিসকো ও সিয়াটলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সূত্র: রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের নতুন গুঞ্জন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরের প্রেক্ষিতে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হয়, তবে ইরান তার সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত হানবে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এবারের পরিস্থিতি আগের মতো হবে না এবং ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে লেখা এক মতামত কলামে আব্বাস আরাগচি এই হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি লিখেছেন, ২০২৫ সালের জুনে সংঘাত চলাকালে ইরান পরিস্থিতি বিবেচনায় যে সংযম প্রদর্শন করেছিল, এবার আর তেমনটি ঘটবে না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, ইরান যদি নতুন করে হামলার শিকার হয়, তবে তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কোনো প্রকার সীমাবদ্ধতা না রেখেই সর্বস্ব দিয়ে পাল্টা হামলা চালাবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুন মাসে দখলদার ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর দুই পক্ষের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়, যা ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিল। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় শক্তিশালী বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার তেহরান আগেভাগেই ওয়াশিংটনকে কড়া বার্তা দিল।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার কলামে উল্লেখ করেছেন যে, তার এই বক্তব্য কোনো ফাঁকা হুমকি নয়, বরং এটাই আসন্ন বাস্তবতা। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রতিপক্ষকে ভালোভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত। আব্বাস আরাগচি লিখেন, একজন কূটনীতিক এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধকে ঘৃণা করেন, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।
সম্ভাব্য যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে আরাগচি লিখেছেন, যদি একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী। তিনি মনে করেন, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের যে সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি ব্যাপ্তির কথা বোঝাচ্ছে, বাস্তবতা হবে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ভয়াবহ ও দীর্ঘ। এই যুদ্ধ কেবল নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে গ্রাস করবে এবং বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের ওপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে তুলনামূলকভাবে সংযত ও হিসাবি অবস্থান নিয়েছেন জোহরান মামদানি। অভিষেক ভাষণে ‘র্যাডিক্যাল’ আখ্যা পাওয়ার ভয়ে নিজের নীতির সঙ্গে আপস করবেন না-এমন দৃঢ় বার্তা দিলেও ক্ষমতায় বসার পর বাস্তব শাসনকাজে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সতর্ক কৌশল বেছে নিচ্ছেন।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের ‘স্টেট অব দ্য স্টেট’ ভাষণে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার (প্রি-কিন্ডারগার্টেন) সম্প্রসারণে অর্থায়নের ঘোষণা এলে মামদানি দাঁড়িয়ে করতালি দেন, যদিও পরিকল্পনাটি তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে কর না বাড়িয়ে ‘রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ’-এর প্রস্তাব এলে তিনি বসেই থাকেন, অথচ ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর দাবিতে মামদানি ও তার সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার।
ওভাল অফিসে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির টেক্সট ও ফোনালাপ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি গভর্নর হোকুলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। রাজ্য নেতৃত্বের সহযোগিতায় তার উচ্চাভিলাষী এজেন্ডার কিছু প্রাথমিক অগ্রগতিও হচ্ছে।
তবে বাজেট বাস্তবতা মামদানিকে আপসের পথে ঠেলে দিতে পারে। সিটি কম্পট্রোলারের এক প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি এবং আগামী বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঘাটতির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
মেয়র হিসেবে এখন পর্যন্ত মামদানির কার্যক্রম অনেকটাই প্রচলিত প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ- প্রতিদিন একাধিক কর্মসূচি, নীতিগত ঘোষণা, সেতুর র্যাম্প সংস্কার, জনশৌচাগার স্থাপন, আবাসন নির্মাণ ও ব্যবসায়িক লাইসেন্সে জটিলতা কমানোর উদ্যোগ। তিনি ও তার স্ত্রী রামা দুয়াজি কুইন্সের ভাড়ানিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে সম্প্রতি আপার ইস্ট সাইডের গ্রেসি ম্যানশনে উঠেছেন।
গভর্নরের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
মামদানি ও হোকুল দুজনই মেয়র–গভর্নরের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন পেছনে ফেলতে আগ্রহী। হোকুলের শিশু যত্ন ও ব্যয়সংকোচনের ওপর জোর মামদানির নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার পরিকল্পনা নিউইয়র্কজুড়ে বিনা বা স্বল্পমূল্যের শিশু যত্ন বাড়াবে, যা মামদানির সর্বজনীন শিশু যত্ন প্রস্তাবের একটি ভিত্তি হতে পারে।
তবে মামদানি ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর অবস্থান থেকে সরে আসছেন না। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ক সিটির জন্য অতিরিক্ত স্থায়ী রাজস্ব প্রয়োজন। ১০ লাখের বেশি ভোটার ধনীদের ও বড় করপোরেশনের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন।’
ইসরায়েল ও ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে চাপ
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মামদানি সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা দুটি নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন, যেগুলো ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং ইসরায়েলবিরোধী বিনিয়োগ প্রত্যাহার কর্মসূচিতে শহরের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল। এতে ইসরায়েল সরকার ও নিউইয়র্কের কিছু ইহুদি নেতার সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
কুইন্সে একটি সিনাগগের বাইরে বিক্ষোভে হামাস সমর্থন ও উসকানিমূলক স্লোগানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মামদানির প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি হওয়ায়ও সমালোচনা হয়। পরে তিনি ভাষাটিকে ‘ভুল’ বলে নিন্দা জানান এবং উপাসনালয়ে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পুলিশ ইস্যুতে সংযম
এর আগে আইনসভা সদস্য হিসেবে পুলিশের কড়া সমালোচক ছিলেন মামদানি। মেয়র নির্বাচনী প্রচারে তিনি সেই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে বহাল রাখেন, যা মধ্যপন্থিদের প্রশংসা পায়।
জানুয়ারির শুরুতে পুলিশ জড়িত এমন দুটি প্রাণঘাতী ঘটনার পর মামদানি মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সংযম দেখান। তিনি বলেন, চলমান তদন্তে ‘আগাম সিদ্ধান্ত’ টানবেন না এবং জননিরাপত্তায় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এতে পুলিশ বেনেভোলেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্যাট্রিক হেনড্রির প্রশংসাও পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির প্রথম সপ্তাহগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত ‘কোর্স কারেকশন’। সিটি হলে বসার পর তিনি প্রচারণার সময়ের তুলনায় কম তাৎক্ষণিক ও বেশি হিসাবি অবস্থান দেখাচ্ছেন। তার এমন আচরণ ক্ষমতায় থাকার সময় স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গাজাকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি এমন এক উদ্যোগ যা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করবে।
শুরুতে বলা হয়েছিল, গাজা উপত্যকায় শাসন কাঠামো পরিচালনার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি উদ্যোগটির একটি নথি হাতে পেয়েছে মিডল ইস্ট আই। সেখানে ফিলিস্তিনবিষয়ক তথ্য উল্লেখ নেই। বরং আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, ‘বোর্ড অব পিস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। যা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, নির্ভরযোগ্যতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতে কাজ করবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তখনই কার্যকর হবে যখন কোনো কিছুর বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সমাধান করা হবে।’
বোর্ড অব পিসের চেয়ারম্যান হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তার হাতে কোনো দেশকে সদস্য করা কিংবা অপসারণের ক্ষমতা থাকবে। বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত তখনই বাতিল হবে, যখন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। প্রথম বছরে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার মাধ্যমে কোনো দেশ ৩ বছরের জন্য বোর্ডের সদস্য হতে পারবে।
উদ্যোগটির ধারণা প্রকাশের পর থেকে, কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানকে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, প্রথমে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। গত রোববার মিসর, ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশও আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তারা যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বোর্ডে থাকবেন কি না তা সোমবার পর্যন্ত জানা যায়নি।
গাজার জন্য ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ কী
১৬ জানুয়ারি গাজা উপত্যকার জন্য ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ড’-এর ধারণা প্রকাশ করে হোয়াইট হাউস। এটি হলো অঞ্চলটির পরবর্তী সরকার গঠন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সংস্থা। কূটনীতি, উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কৌশলগত ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সাতজন ব্যক্তিকে এই এক্সিকিউটিভ বোর্ডে রাখা হয়েছে।
প্রত্যেক সদস্যকে গাজায় স্থিতি স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সম্পর্ক তৈরি, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ তহবিল সংগ্রহ ও তা ব্যবহারের কাজ করবেন। তবে নির্বাচিত সাত ব্যক্তির কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন তা সোমবার পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক্সিকিউটিভ বোর্ডের প্রতিদিনের কাজ ‘বোর্ড অব পিস’কে জানানোর জন্য দুজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাও নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া, গাজার জন্য একজন হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং স্থিতি রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক বাহিনীর (আইএসএফ) কমান্ডারের নামও ঘোষণা করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এই ঘোষণাগুলো এরই মধ্যে ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, এক্সিকিউটিভ বোর্ডের কোনো সদস্যই ফিলিস্তিনি না। পুরুষ সদস্যদের মধ্যে সবাই ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ। বোর্ড নিয়ে হামাস তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও গাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম পক্ষ ইসলামিক জিহাদ বলেছে, এটি কেবল ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করবে।
এক্সিকিউটিভ বোর্ডের ৭ সদস্য কারা
‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ডের’ সদস্য তালিকায় প্রথম নামটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। এরপরে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনার। বাকি সদস্যদের মধ্যে আছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় ভাঙ্গা, বিলিয়নিয়ার ও অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক রোয়ান ও রোবার্ট গ্যাব্রিয়েল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন গ্যাব্রিয়েল। মার্ক রোয়ানের প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত। টনি ব্লেয়ারের সময় যুক্তরাজ্য ইরাক যুদ্ধে জড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি দূত থাকাকালে তিনি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়পক্ষের দ্বারা সমালোচিত হন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি যুক্তরাজ্যে ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ডের (জেএনএফ) হয়ে কাজ করেছেন। কূটনীতিতে অনভিজ্ঞ স্টিভ উইটকফ একজন ইহুদি-আমেরিকান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার। আর মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
বোর্ড অব পিসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কারা
নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন- আরিয়েহ লাইটস্টোন ও জোশ গ্রুয়েনবাউম। লাইটস্টোন ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ইসরায়েলে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি অবৈধ ইসরায়েলি বসতি আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক। এ ছাড়া তিনি বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
জোশ গ্রুয়েনবাউম সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গাজা রিভিয়েরা’ পরিকল্পনায় জেরার্ড কুশনারের সঙ্গে কাজ করেছেন।
গাজা প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি কী
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ প্রতিষ্ঠিত হয় গত বছরের অক্টোবরে। ১৫ জানুয়ারি এটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হলেও কমিটির সদস্যদের তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। তবে মিডল ইস্ট আইয়ের দেখা একটি তালিকা অনুযায়ী, কমিটির নেতৃত্ব দেবেন ফিলিস্তিন পরিকল্পনাবিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথ।
গত রোববার সাংবাদিকদের আলি শাথ জানান, এই সংস্থা গাজায় মূল পরিষেবা পুনঃস্থাপন এবং ‘শান্তির সমাজ’ গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। শাথ বলেন, ‘এই সংস্থা বোর্ড অব পিসের নির্দেশনা মেনে কাজ করবে। সহায়তা করবেন দুজন হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ। সংস্থাটি অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনতেও কাজ করবে।’
পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি শপিংমলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। এ ঘটনায় এখনো ৩৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন করাচির মেয়র মুর্তজা ওয়াহাব।
পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) করাচির এম এ জিন্না রোডে অবস্থিত গুল প্লাজায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাতে চারতলা এই শপিংমলটিতে আগুন লাগে। প্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময়ের চেষ্টার পর রোববার আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে ধোঁয়া ছড়ানো আবর্জনা থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়ায় গত সোমবার দমকল বাহিনীকে ফের অভিযান চালাতে হয়। আগুনে ভবনটির একটি অংশ ধসে পড়েছে। মলটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি দোকান ছিল।
সারা রাত ঘটনাস্থলে অবস্থান করা মেয়র মুর্তজা ওয়াহাব জানান, উদ্ধারকারী দলগুলো এখন শপিংমলটির বেসমেন্টে তল্লাশি চালাচ্ছে। করাচি জেলা প্রশাসন, জরুরিসেবা সংস্থা ও করাচি মেট্রোপলিটন করপোরেশনের (কেএমসি) যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ভবনের ছাদ পরিষ্কার করতে ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘উদ্ধারকারীরা আবর্জনা পরিষ্কার করছে এবং মলটির ছাদে পার্ক করা গাড়িগুলো ক্রেনের মাধ্যমে সরানো হচ্ছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মেয়র ওয়াহাব বলেন, ‘নিখোঁজ সবাইকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। ততদিন কেএমসির সব বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকবে এবং ভারী যন্ত্রপাতিও ঘটনাস্থলে রাখা হবে।’
করাচি দক্ষিণ জেলার পুলিশের উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ আসাদ রেজা গত সোমবার রাতে ডনকে জানান, এখন পর্যন্ত আবর্জনার ভেতর থেকে ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেহের কেবল কিছু অংশ পাওয়া গেছে।
উদ্ধারকারী সংস্থা ১১২২-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আবিদ জালাল বলেন, ‘মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া দেহাংশ একই ব্যক্তির নাকি আলাদা আলাদা মানুষের—তা ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা যাবে না।
মেয়র জানান, আগুন নেভানোর কাজ শেষ হলেও এখনো ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়া চলছে। গুল প্লাজার ‘জাইন’ নামের এক দোকানের মালিক বলেন, ‘আগুন লাগার সময় মলের ভেতরে কয়েকশ মানুষ ছিলেন। আমাদের চোখের সামনেই দোকানগুলো পুড়ে গেল। মালপত্র বের করার সুযোগই পাইনি। অনেক মানুষ তখন ভেতরে ছিল, আমার কয়েকজন বন্ধুর এখনো কোনো খোঁজ নেই।’
এক পথচারী জানান, আগুন লাগার পর দোকান মালিকরা ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
ভবনটিতে প্লাস্টিক, ফোম, কাপড় ও পারফিউমের মতো দাহ্য উপাদান থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। তিনি সিন্ধু প্রদেশ সরকারকে অঞ্চলজুড়ে থাকা সব বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা বিস্তৃতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।