যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে আবারও হোয়াইট হাউসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই জয় অনেক দিক থেকেই ঐতিহাসিক। তিনিই হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ফৌজদারি মামলার আসামি। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুবার জয় পেয়েছেন তিনি। চার বছর আগে জো বাইডেনের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিলেও এবার ট্রাম্পের অসাধারণ প্রত্যাবর্তন দেখেছে সারাবিশ্ব। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ন্যাটো
নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় ট্রাম্পকে একাধিকবার বলতে শোনা গেছে, তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ ‘একদিনে বন্ধ’ করে দিতে পারেন। তবে সেটা কীভাবে করবেন সেই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য তিনি কিছু বলতে চাননি। গত মে মাসে ট্রাম্পের দুই প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানের লেখা এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা উচিত। তবে কিয়েভের রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনায় প্রবেশের বিষয়কে শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করা উচিত।
রাশিয়াকে ‘প্রলুব্ধ’ করতে, পশ্চিমারা ন্যাটোতে ইউক্রেনের বহু কাঙ্ক্ষিত অন্তর্ভূক্তিকে বিলম্বিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টারা বলেছিলেন, ইউক্রেন যে রাশিয়ার দখল থেকে তাদের সব অঞ্চল ফিরে পেতে পারে, সেই আশা ত্যাগ করা উচিত নয়। তবে এই আলোচনা হওয়া উচিত বর্তমানের ‘ফ্রন্ট লাইনের’ ভিত্তিতে। যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি ন্যাটোর ভবিষ্যত সম্পর্কিত কৌশলগত ইস্যুতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এই মুহূর্তে ৩০টিরও বেশি দেশ ন্যাটোর অংশ। কিন্তু ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এই জোটের বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির সুযোগ ইউরোপ নিচ্ছে বলেও অতীতে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তবে ন্যাটো থেকে সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেবেন কি না সেটা একটা বিতর্কের বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্য
ইউক্রেনের মতোই মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অর্থ হলো তিনি গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের ইতি টানবেন। কিন্তু তা তিনি কীভাবে করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেননি। তিনি বারবার দাবি করেছেন, জো বাইডেনের পরিবর্তে যদি তিনি ক্ষমতায় থাকতেন তাহলে ইরানের ওপর তার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির কারণে হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ করতো না। অনুমান করা যায়, ক্ষমতায় এসে তার দ্বিতীয় মেয়াদেও ট্রাম্প সেই নীতিই মেনে চলার চেষ্টা করবেন যার ভিত্তিতে তার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে এনেছিল। সে সময় ইরানের ওপর বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে ফিলিস্তিনিরা ট্রাম্প প্রশাসনকে বয়কট করেছিল। কারণ ফিলিস্তিনিদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও জেরুজালেমের প্রতি তাদের (ফিলিস্তিনিদের) দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি ওয়াশিংটন।
ফিলিস্তিন আরও ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়ে যখন ট্রাম্প তথাকথিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মধ্যস্থতা করেছিলেন যাকে ইসরায়েল এবং বেশ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হিসাবে দেখা হয়। এই মধ্যস্থতার সময় শর্ত হিসাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ফিলিস্তিনকে মেনে নিতে হয়নি। এর পরিবর্তে, এই চুক্তিতে সামিল দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে উন্নত মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছিল। এতে ধীরে ধীরে আরও কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে ফিলিস্তিন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বেশ কয়েকটি বিবৃতি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি গাজায় চলমান যুদ্ধের অবসান চান। কিন্তু নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার একটা জটিল সম্পর্ক রয়েছে, যা মাঝে মাঝে ‘অকার্যকর’ অবস্থারও সম্মুখীন হয়েছে। তবে এটা ঠিক যে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ প্রয়োগ করার ক্ষমতা তার রয়েছে।
চীন ও বাণিজ্য
চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি সে দেশের বৈদেশিক নীতির কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষমতায় থাকাকালীন, ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে সে দেশের ‘কৌশলগত প্রতিযোগী’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। একইসঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ক্ষেত্রে চীনা আমদানির ওপর শুল্কও আরোপ করেছিলেন। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেইজিংও শুল্ক আরোপ করে। এই ‘দ্বন্দ্বের’ অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু ততদিনে কোভিড মহামারীর প্রকোপ দেখা দেয়। দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি হয় যখন ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেন। সে সময় বাইডেন প্রশাসন দাবি করে, তারা চীন নীতির প্রতি আরও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই চীনা আমদানির ক্ষেত্রে ট্রাম্প-প্রশাসনের শুল্ককেই বজায় রেখেছে তারা।
বাণিজ্য নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, উৎপাদন এবং সেই সংক্রান্ত কাজে মার্কিনদের অগ্রাধিকারের বিষয়ে জুড়ে দিয়ে ভোটারদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইস্পাতের মতো ঐতিহ্যবাহী মার্কিন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী চাকরির সুযোগ কমে আসার একটা বড় কারণ কারখানার অটোমেশন এবং উত্পাদনগত পরিবর্তন। এর পেছনে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং অফ-শোরিংর মতো কারণ তুলনামূলক ভাবে কমই দায়ী। ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে একই সঙ্গে বিপজ্জনক এবং একজন অত্যন্ত কার্যকর নেতা হিসাবে প্রশংসা করেছেন।
যে ৭টি কাজকে প্রাধান্য দিতে চান ট্রাম্প
অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন: ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করারও অঙ্গীকার করেছিলেন। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী- এ ধরনের বিপুল পরিমাণ অভিবাসী বের করে দেওয়ার বিষয়টি আইনগত এবং যৌক্তিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এ বিষয়টি মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে।
অর্থনীতি, ট্যাক্স ও শুল্ক: নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা যে দুটি ইস্যুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার একটি অর্থনীতি। তবে ট্রাম্প আগেই মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ফের কমে আসার আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে এটি বেশ উচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে পণ্যের দামকে সরাসরি প্রভাবিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত।
জলবায়ু নীতিমালা সংস্কার: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় এসে শতাধিক পরিবেশ সুরক্ষা আইন প্রত্যাহার এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন। এবারও তিনি পরিবেশ সংক্রান্ত আইন শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মূলত, মার্কিন গাড়ি শিল্পকে সহায়তা করার লক্ষ্যে তিনি এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ: ইউক্রেনে টানা আড়াই বছর ধরে আগ্রাসন চালাচ্ছে রাশিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তায় রশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা করছে কিয়েভ। রাশিয়ার সাথে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই সংঘাত শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ ইস্যু: প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে সমর্থকদের আপত্তি থাকার পরও কমলা হ্যারিসের বিপরীতে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে জাতীয়ভাবে গর্ভপাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করবেন না। ২০২২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের ওপর সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করে। গর্ভপাতের অধিকার ছিল কমলা হ্যারিসের নির্বাচনী প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের দিন গর্ভপাতের অধিকার সংরক্ষণ বা সম্প্রসারণের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটগ্রহণ করা হয়। ট্রাম্প নিজে বারবার বলেছেন, গর্ভপাত নিয়ে রাজ্যগুলোর নিজেদের আইন করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় জড়িতদের ক্ষমা: ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা হয়। জো বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যৌথ অধিবেশনের সময় সেখানে হামলা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েক হাজার উন্মত্ত সমর্থক। ওই দাঙ্গায় পুলিশ সদস্যসহ নিহত ৫ জন প্রাণ হারান। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে হওয়া এই হামলার ঘটনায় ট্রাম্পের উসকানি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ট্রাম্প বরারবই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
জ্যাক স্মিথকে অব্যাহতি: সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন ক্ষমতা গ্রহণের ‘দুই সেকেন্ডের মধ্যে’ তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথকে চাকরিচ্যুত করবেন। বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগে এবং গোপনীয় তথ্যের ভুল ব্যবস্থাপনার অভিযোগে দুটি পৃথক অভিযোগ করেছেন।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কিছু মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, ট্রাম্পের আইনজীবী দল এবং মামলা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু মামলা বন্ধের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। তবে, কিছু ক্ষেত্রে তাকে দায়মুক্তির বাইরে রাখার ব্যবস্থা কার্যকর হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে যে, তেহরান তাদের আকাশসীমায় ইসরায়েলের একটি যুদ্ধবিমানে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এটি এ ধরনের তৃতীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ইতিপূর্বে স্বীকার করেছিল যে ইরানের আকাশসীমায় তাদের একটি যুদ্ধবিমান বিমান-বিধ্বংসী আক্রমণের মুখে পড়েছিল। তবে তাদের দাবি অনুসারে, বিমানটি সফলভাবে হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী’ অভিযান শেষ করেছে। এদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের আকাশে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, রিফুয়েলিং বা জ্বালানি বহনকারী উড়োজাহাজ এবং যুদ্ধবিমানসহ ২০০-এর বেশি আকাশযান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের নেতাদের নওরোজ বা ফারসি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, একনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে মস্কো সবসময় তেহরানের পাশে রয়েছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, পুতিন ইরানি জনগণের প্রতি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্মানের সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। একইসঙ্গে তারা দাবি করেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-এর হত্যাকাণ্ডকে ‘নৃশংস’ বলে আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানান পুতিন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মস্কো ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে রাশিয়া-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যদিও ক্রেমলিন এই তথ্যকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় রাশিয়া একটি মিত্র হারিয়েছে। তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি চুক্তি রয়েছে, যদিও প্রকাশিত নথিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত নেই। পাশাপাশি রাশিয়া বরাবরই জানিয়ে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক তা তারা চায় না। কারণ তাদের আশঙ্কা, ইরান এমন অস্ত্র তৈরি করলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের শুরুতে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও গত তিন সপ্তাহ ধরে ইরানের অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদ এখন ইরানকে ‘উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার’ পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সৌদি আরব তাদের কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটি মার্কিন বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে।
লোহিত সাগরের জেদ্দা বন্দরের কাছে অবস্থিত তায়েফ বিমান ঘাঁটিটি বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বিকল্প হিসেবে জেদ্দাকে কেন্দ্র করেই এখন হাজার হাজার মার্কিন সেনার রসদ সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি বিমান বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও ধাহরান ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন শুরু করলে যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যাবে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতও একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং দেশটি ইতোমধ্যে কয়েকশ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও তাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানি হামলায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে বর্তমানে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ওমান এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ যুদ্ধ হিসেবে দেখলেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, বন্ধুত্বের মর্যাদা না রাখায় এখন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রিয়াদের আছে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেলের মতে, আরব দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে এই কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কঠিন।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরব দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য ইসরায়েলের ওপর দিয়ে বিকল্প পাইপলাইন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে আরব শাসকরা এখনো একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন যাতে মুসলিম প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সরাসরি জোটভুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক দায় এড়ানো যায়।
ইরানের নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে শনিবার (২১ মার্চ) সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে একটি শক্তিশালী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে যে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটিতে হামলা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়নি এবং কেন্দ্রের আশপাশের বাসিন্দারা নিরাপদ রয়েছেন।
ইসরায়েলের কান পাবলিক ব্রডকাস্টার জানিয়েছে, মূলত মার্কিন বাহিনী এই হামলাটি পরিচালনা করেছে এবং স্থাপনাটি ধ্বংস করতে বিশেষ ধরনের ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধেও নাতাঞ্জ কেন্দ্রটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এবং সেই সময়েও মার্কিন সামরিক বাহিনী জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর ব্যবহার করেছিল। চলমান উত্তেজনার মধ্যে কেন্দ্রটি আবারও বড় ধরনের হামলার শিকার হলো। এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে জানিয়েছেন যে, ইরানের ওপর হামলার তীব্রতা এই সপ্তাহে আরও বহুগুণ বাড়ানো হবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, আইডিএফ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরানের কৌশলগত অবকাঠামো এবং শাসনব্যবস্থার ওপর আঘাত হানার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
তিনি আরও যোগ করেন, এই অঞ্চলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী প্রতিটি নিরাপত্তা হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী এবং জনগণ ঐক্যবদ্ধ থেকে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
ইরান যুদ্ধ নিয়ে হঠাৎ সুর নরম করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান ‘সামরিক অভিযান’ গুটিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২০ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সামরিক প্রচেষ্টা গুটিয়ে আনার কথা বিবেচনা করছি, কারণ আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’
তবে একই সময়ে তার প্রশাসন অঞ্চলটিতে অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ মেরিন মোতায়েন করছে এবং যুদ্ধ ব্যয়ের জন্য কংগ্রেসের কাছে আরও ২০০ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে, যা তার বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
এর মধ্যে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাহাজে তোলা ইরানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলেরও ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
প্রেসিডেন্টের বার্তার পরপরই হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী এই মিশন শেষ করতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল শনিবার অভিযানের তৃতীয় সপ্তাহ পূর্ণ হবে। ইরান সরকারকে পঙ্গু করে দিতে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী চমৎকার কাজ করছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম হোয়াইট হাউজ থেকে অভিযানের একটি সম্ভাব্য সময়সীমা উল্লেখ করা হলো।
ট্রাম্পের কণ্ঠে যুদ্ধ শেষের সুর শোনা গেলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’-এর প্রথম দিনেই তেহরান ও এর আশপাশে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালিয়েছে। গিলান প্রদেশের দাস্তাক গ্রামে শেল হামলায় অন্তত দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া সৌদি আরবের তেল সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলে ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রিয়াদ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বার্তায় মার্কিন-ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে একটি ‘ভয়াবহ ভুল গণনা’ বলে অভিহিত করেছেন। নওরোজ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি ইরানি জনগণের ধৈর্য ও সাহসিকতার প্রশংসা করেন।
সূত্র: আল-জাজিরা
ভারত মহাসাগরের দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান অন্তত দুটি মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্র দুটির মধ্যে একটি মাঝআকাশে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং অন্যটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। রয়টার্স জানিয়েছে যে, এই স্পর্শকাতর ঘটনার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটনে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস ও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রচেষ্টা তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে, যা তাদের আগের দাবির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
অথচ গত মাসেই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছিলেন যে, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র সক্ষমতার সমীকরণকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তেহরান। শনিবার (২১ মার্চ) স্থানীয় সময় ভোরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় পুরো শহরজুড়ে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ জানিয়েছে, দেশজুড়ে যখন ঈদ উদ্যাপন চলছিল, ঠিক সেই সময় রাজধানীর একাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়। এর আগে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী নিশ্চিত করেছিল যে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলার পর তারা ইরানের রাজধানীতেও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। তবে এই হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ভয়েস অব আমেরিকা-এর ফার্সি বিভাগের খবরে বলা হয়, তেহরানের পশ্চিমাঞ্চল একবাতান এলাকায় অবস্থিত আজাদি টাওয়ার এবং অলিম্পিক ভিলেজ সংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়েছে। এছাড়া তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে মাজান্দারান প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চল কেলারদাশতেও তীব্র বিস্ফোরণ ও যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার সময়কালও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। শুক্রবার ইরানি পরিবারগুলো যখন রমজানের শেষ দিন এবং ফার্সি নববর্ষ নওরোজ উদ্যাপনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় এই সামরিক অভিযান। ফলে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা।
এদিকে চলমান এই সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও কঠোর। ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তার আগ্রহ নেই। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চলাকালে যুদ্ধবিরতির কোনো যৌক্তিকতা নেই। তার এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল ও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি, বিশেষ করে চীন ও জাপানের মতো দেশের অংশগ্রহণ বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
এদিকে ইরানি ড্রোন প্রতিরোধে ইউক্রেনের ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি ব্যবহারের খবরও সামনে এসেছে। সব মিলিয়ে ঈদের সকালেই তেহরানের এই বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর ও নতুন সৌর বছর উপলক্ষে দেশবাসীসহ মুসলিম উম্মাহর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুজতবা খামেনি। এক লিখিত বার্তায় তিনি শান্তি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নেতা হিসেবে এটিই মুজতবা খামেনির প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তা, যা ইরানি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে। সংবেদনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই এই বার্তা প্রচারিত হয়।
এর আগে সোমবার (১৮ মার্চ) বিশেষজ্ঞদের পরিষদের বৈঠকে তাকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মুজতবা খামেনির নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছে সরকারের বিভিন্ন শাখা। বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা ও সামরিক সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলো তার প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করেছে বলে রাষ্ট্রীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র: বিবিসি
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনা মোতায়েনে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো-এর তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় জোটভুক্ত দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলেও অভিহিত করেন তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া ন্যাটো একটি কাগুজে বাঘ! তারা পারমাণবিক শক্তিধর ইরানকে থামানোর লড়াইয়ে যোগ দিতে চায়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘এখন সেই লড়াইয়ে সামরিকভাবে জয় হয়েছে, যেখানে তাদের জন্য ঝুঁকির পরিমাণ ছিল খুবই নগণ্য। অথচ তারা তেলের উচ্চমূল্য নিয়ে অভিযোগ করছে, যা দিতে তারা বাধ্য হচ্ছে।’’
আরও এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘কিন্তু তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সাহায্য করতে চায় না; যা একটি সাধারণ সামরিক কৌশল মাত্র এবং তেলের এই উচ্চমূল্যের একমাত্র কারণও এটিই।’’
মিত্রদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘অত্যন্ত কম ঝুঁকিতে এটি করা তাদের জন্য খুবই সহজ ছিল। কাপুরুষের দল, আর আমরা এটি মনে রাখব!’’
এক শক্তিশালী বিমান হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান মুখপাত্র জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাঈনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (২০ মার্চ) এক মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি প্রাণ হারান বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতভর চালানো এক শক্তিশালী বিমান হামলায় নাঈনি নিহত হন। গত দুই থেকে তিন বছর ধরে তিনি আইআরজিসি-র প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় মাধ্যমের জনসংযোগ ও গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনি একাই সামলাতেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল শুরু থেকেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে তারা আইআরজিসি-র সেই নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যারা সরাসরি দেশটির সরকার ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সুরক্ষা দিতো।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বর্তমানে হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কৌশলই ইরানের ওপর প্রয়োগ করছে। এই কৌশলের মূলে রয়েছে প্রতিপক্ষের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারকে খুঁজে বের করে সুনির্দিষ্টভাবে নির্মূল করা।
মূলত ইরানের শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শাসনব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিতে আইআরজিসি একটি বিশেষ বাহিনী হিসেবে গঠিত হয়েছিল। তবে সম্প্রতি বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কমান্ডাররা ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় চলে এসেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃক আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে দায়ের করা গণহত্যার মামলায় জার্মানি আর ইসরাইলকে সমর্থন বা সহায়তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জিউইশ নিউজ সার্ভিস (জেএনএস) এমন তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডে গণহত্যার অভিযোগের বিপরীতে বার্লিন ইসরাইলের পক্ষে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করলেও, বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে দেশটি।
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র জোসেফ হিন্টারসেহার সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের পক্ষে জার্মানির আর কোনো হস্তক্ষেপ বা মধ্যস্থতা থাকবে না।
বার্লিনের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন জার্মানি নিজেই আইসিজে-তে নিকারাগুয়ার দায়ের করা একটি পৃথক মামলার মোকাবিলা করছে। নিকারাগুয়ার পক্ষ থেকে জার্মানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে দেশটি ইসরাইলকে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে গণহত্যার কাজে সমর্থন জুগিয়েছে।
হিন্টারসেহার এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলেন, জার্মানি এখন নিকারাগুয়া কর্তৃক শুরু হওয়া আইসিজে-র আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি বর্তমানে ইসরাইলের মামলায় মনোযোগ না দিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সেই আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল জার্মানি, তবে সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা।
শুক্রবার এক ফেসবুক বার্তার মাধ্যমে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বজুড়ে এবং নিজ দেশে বসবাসরত সকল মুসলিম ধর্মাবলম্বীকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
ইংরেজি ও আরবিতে ‘ঈদ মোবারক’ লেখা একটি বিশেষ কার্ডসহ প্রকাশিত সেই পোস্টের ক্যাপশনে মন্ত্রণালয় লিখেছে, ‘আমাদের ইসরায়েলি ও বিশ্বের সব মুসলিম বন্ধুদের ঈদুল ফিতর মোবারক।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঈদ উদযাপনের এই ক্ষণে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আরও বলা হয়েছে, ‘এই উৎসব শান্তি, আনন্দ এবং আরও উজ্জ্বল দিনের জন্য যৌথ আশা নিয়ে আসুক।’ সাধারণত প্রতি বছর রমজান ও ঈদের সময় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে এমন বার্তা দেওয়া হলেও বর্তমান সময়ের চরম আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে এবারের এই শুভেচ্ছাবার্তাটি বিশেষভাবে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আলজাজিরার শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পশ্চিম জেরুজালেমে অবস্থিত ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, শীর্ষ কর্মকর্তাদের এবং কয়েক ডজন নাবিককে হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এই আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’র ‘বীরদের রক্তের বদলা’ এবং দেশটির গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব হত্যার প্রতিশোধ নিতে তারা এই হামলা চালিয়েছে। তবে এই ড্রোন হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটেছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে জানা যায়, গত ৪ মার্চ ভারত থেকে মহড়া শেষে দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যাতে ৮০ জনের বেশি নৌ-সেনা নিহত হন। এর পরপরই চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব নিহত হওয়ার ঘটনাটি উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। মূলত এই দুই ঘটনার পালটা জবাব হিসেবেই ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ ওই দপ্তরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।