যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে আবারও হোয়াইট হাউসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই জয় অনেক দিক থেকেই ঐতিহাসিক। তিনিই হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ফৌজদারি মামলার আসামি। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুবার জয় পেয়েছেন তিনি। চার বছর আগে জো বাইডেনের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিলেও এবার ট্রাম্পের অসাধারণ প্রত্যাবর্তন দেখেছে সারাবিশ্ব। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ন্যাটো
নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় ট্রাম্পকে একাধিকবার বলতে শোনা গেছে, তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ ‘একদিনে বন্ধ’ করে দিতে পারেন। তবে সেটা কীভাবে করবেন সেই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য তিনি কিছু বলতে চাননি। গত মে মাসে ট্রাম্পের দুই প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানের লেখা এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা উচিত। তবে কিয়েভের রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনায় প্রবেশের বিষয়কে শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করা উচিত।
রাশিয়াকে ‘প্রলুব্ধ’ করতে, পশ্চিমারা ন্যাটোতে ইউক্রেনের বহু কাঙ্ক্ষিত অন্তর্ভূক্তিকে বিলম্বিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টারা বলেছিলেন, ইউক্রেন যে রাশিয়ার দখল থেকে তাদের সব অঞ্চল ফিরে পেতে পারে, সেই আশা ত্যাগ করা উচিত নয়। তবে এই আলোচনা হওয়া উচিত বর্তমানের ‘ফ্রন্ট লাইনের’ ভিত্তিতে। যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি ন্যাটোর ভবিষ্যত সম্পর্কিত কৌশলগত ইস্যুতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এই মুহূর্তে ৩০টিরও বেশি দেশ ন্যাটোর অংশ। কিন্তু ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এই জোটের বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির সুযোগ ইউরোপ নিচ্ছে বলেও অতীতে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তবে ন্যাটো থেকে সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেবেন কি না সেটা একটা বিতর্কের বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্য
ইউক্রেনের মতোই মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অর্থ হলো তিনি গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের ইতি টানবেন। কিন্তু তা তিনি কীভাবে করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেননি। তিনি বারবার দাবি করেছেন, জো বাইডেনের পরিবর্তে যদি তিনি ক্ষমতায় থাকতেন তাহলে ইরানের ওপর তার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির কারণে হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ করতো না। অনুমান করা যায়, ক্ষমতায় এসে তার দ্বিতীয় মেয়াদেও ট্রাম্প সেই নীতিই মেনে চলার চেষ্টা করবেন যার ভিত্তিতে তার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে এনেছিল। সে সময় ইরানের ওপর বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে ফিলিস্তিনিরা ট্রাম্প প্রশাসনকে বয়কট করেছিল। কারণ ফিলিস্তিনিদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও জেরুজালেমের প্রতি তাদের (ফিলিস্তিনিদের) দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি ওয়াশিংটন।
ফিলিস্তিন আরও ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়ে যখন ট্রাম্প তথাকথিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মধ্যস্থতা করেছিলেন যাকে ইসরায়েল এবং বেশ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হিসাবে দেখা হয়। এই মধ্যস্থতার সময় শর্ত হিসাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ফিলিস্তিনকে মেনে নিতে হয়নি। এর পরিবর্তে, এই চুক্তিতে সামিল দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে উন্নত মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছিল। এতে ধীরে ধীরে আরও কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে ফিলিস্তিন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বেশ কয়েকটি বিবৃতি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি গাজায় চলমান যুদ্ধের অবসান চান। কিন্তু নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার একটা জটিল সম্পর্ক রয়েছে, যা মাঝে মাঝে ‘অকার্যকর’ অবস্থারও সম্মুখীন হয়েছে। তবে এটা ঠিক যে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ প্রয়োগ করার ক্ষমতা তার রয়েছে।
চীন ও বাণিজ্য
চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি সে দেশের বৈদেশিক নীতির কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষমতায় থাকাকালীন, ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে সে দেশের ‘কৌশলগত প্রতিযোগী’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। একইসঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ক্ষেত্রে চীনা আমদানির ওপর শুল্কও আরোপ করেছিলেন। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেইজিংও শুল্ক আরোপ করে। এই ‘দ্বন্দ্বের’ অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু ততদিনে কোভিড মহামারীর প্রকোপ দেখা দেয়। দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি হয় যখন ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেন। সে সময় বাইডেন প্রশাসন দাবি করে, তারা চীন নীতির প্রতি আরও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই চীনা আমদানির ক্ষেত্রে ট্রাম্প-প্রশাসনের শুল্ককেই বজায় রেখেছে তারা।
বাণিজ্য নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, উৎপাদন এবং সেই সংক্রান্ত কাজে মার্কিনদের অগ্রাধিকারের বিষয়ে জুড়ে দিয়ে ভোটারদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইস্পাতের মতো ঐতিহ্যবাহী মার্কিন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী চাকরির সুযোগ কমে আসার একটা বড় কারণ কারখানার অটোমেশন এবং উত্পাদনগত পরিবর্তন। এর পেছনে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং অফ-শোরিংর মতো কারণ তুলনামূলক ভাবে কমই দায়ী। ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে একই সঙ্গে বিপজ্জনক এবং একজন অত্যন্ত কার্যকর নেতা হিসাবে প্রশংসা করেছেন।
যে ৭টি কাজকে প্রাধান্য দিতে চান ট্রাম্প
অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন: ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করারও অঙ্গীকার করেছিলেন। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী- এ ধরনের বিপুল পরিমাণ অভিবাসী বের করে দেওয়ার বিষয়টি আইনগত এবং যৌক্তিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এ বিষয়টি মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে।
অর্থনীতি, ট্যাক্স ও শুল্ক: নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা যে দুটি ইস্যুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার একটি অর্থনীতি। তবে ট্রাম্প আগেই মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ফের কমে আসার আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে এটি বেশ উচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে পণ্যের দামকে সরাসরি প্রভাবিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত।
জলবায়ু নীতিমালা সংস্কার: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় এসে শতাধিক পরিবেশ সুরক্ষা আইন প্রত্যাহার এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন। এবারও তিনি পরিবেশ সংক্রান্ত আইন শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মূলত, মার্কিন গাড়ি শিল্পকে সহায়তা করার লক্ষ্যে তিনি এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ: ইউক্রেনে টানা আড়াই বছর ধরে আগ্রাসন চালাচ্ছে রাশিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তায় রশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা করছে কিয়েভ। রাশিয়ার সাথে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই সংঘাত শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ ইস্যু: প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে সমর্থকদের আপত্তি থাকার পরও কমলা হ্যারিসের বিপরীতে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে জাতীয়ভাবে গর্ভপাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করবেন না। ২০২২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের ওপর সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করে। গর্ভপাতের অধিকার ছিল কমলা হ্যারিসের নির্বাচনী প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের দিন গর্ভপাতের অধিকার সংরক্ষণ বা সম্প্রসারণের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটগ্রহণ করা হয়। ট্রাম্প নিজে বারবার বলেছেন, গর্ভপাত নিয়ে রাজ্যগুলোর নিজেদের আইন করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় জড়িতদের ক্ষমা: ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা হয়। জো বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যৌথ অধিবেশনের সময় সেখানে হামলা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েক হাজার উন্মত্ত সমর্থক। ওই দাঙ্গায় পুলিশ সদস্যসহ নিহত ৫ জন প্রাণ হারান। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে হওয়া এই হামলার ঘটনায় ট্রাম্পের উসকানি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ট্রাম্প বরারবই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
জ্যাক স্মিথকে অব্যাহতি: সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন ক্ষমতা গ্রহণের ‘দুই সেকেন্ডের মধ্যে’ তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথকে চাকরিচ্যুত করবেন। বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগে এবং গোপনীয় তথ্যের ভুল ব্যবস্থাপনার অভিযোগে দুটি পৃথক অভিযোগ করেছেন।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কিছু মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, ট্রাম্পের আইনজীবী দল এবং মামলা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু মামলা বন্ধের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। তবে, কিছু ক্ষেত্রে তাকে দায়মুক্তির বাইরে রাখার ব্যবস্থা কার্যকর হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আহত হয়েছেন। ইসলামাবাদে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর সময় স্লিপ করে পড়ে তিনি আহত হয়েছেন। এতে তার কাঁধে ফ্র্যাকচার হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিষয়টি তার ছেলে আলি দার নিশ্চিত করেছেন।
আলি দার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আহত হওয়া সত্ত্বেও তার পিতা দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইসহাক দার আজ মিসরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বাগত গ্রহণের সময় আহত হলেও দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আলহামদুলিল্লাহ সেরার মতোভাবে শেষ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত ৯টার দিকে পরিবারের পরামর্শে মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়। আলী দার জানিয়েছেন, এক্স-রে পরীক্ষায় কাঁধে হালকা ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছে এবং সামনের কয়েক দিনে ওষুধ ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ডন জানিয়েছে, চার দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সময় এ ঘটনা ঘটেছে। এ বৈঠকে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। বৈঠকটি গালফ অঞ্চলে চলমান সংঘাত প্রশমনে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেছেন, সংঘাত ‘কারও পক্ষেই লাভজনক নয়’। এটি ‘শুধু মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না।’
ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র, তখন দেশটির মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। সেই দিকটি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার দিকে মনোযোগ ঘোরাতে বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইসরায়েলপন্থী নীতিকে ঘিরে সে দেশের জনমনে বাড়তে থাকা ক্ষোভ সম্পর্কে দেশটির প্রশাসনের আরও সজাগ হওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে এক মাস ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে রোববার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন পেজেশকিয়ান। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গত শনিবারের ‘নো কিংস’ বিক্ষোভের কথা তোলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, মার্কিন সমাজের একটি অংশ এখন দেশের নীতিনির্ধারণে বাইরের প্রভাব নিয়ে ক্রমে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।
পেজেশকিয়ান এ বিক্ষোভকে মার্কিন সমাজের গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। এই বাস্তব পরিস্থিতির কথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক (এআই) বিশেষজ্ঞদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এআই বিশেষজ্ঞদের উচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানানো যে ‘তার দেশের মানুষ ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। মার্কিন নাগরিকেরা ‘ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার’ দেওয়ার নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর রাজত্ব চালানো ‘ইসরায়েলি রাজাদের’ ব্যাপারে তারা (মার্কিন নাগরিকেরা) ক্লান্ত।’
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। হামলার শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এরপর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা এক মাস ধরে চলছে।
এর মধ্যে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরব যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ইরান আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতার কথা বলছে।
এদিকে ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলার পর বাজান ওয়েল রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঘাতপ্রাপ্ত এলাকাটি বাজান তেল শোধনাগারের অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবকাঠামোর ভেতরে বা তার কাছাকাছি। এর আগেও বিভিন্ন হামলায় এই শোধনাগারটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। আগের হামলাগুলোতে মিসাইলের স্প্লিন্টারের আঘাতে এই স্থাপনায় স্থানীয়ভাবে ক্ষয়ক্ষতি এবং সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছিল, তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়া সরকার তাদের দেশের জ্বালানি তেলের ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে এবং এর অপব্যবহার রোধে এক কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আগামী বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে দেশটির কোনো পেট্রোল স্টেশনের স্বয়ংক্রিয় পাম্প টার্মিনালে বিদেশি ক্রেডিট কিংবা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে আর জ্বালানি কেনা যাবে না। মূলত স্থানীয় নাগরিকদের জন্য বরাদ্দকৃত সাশ্রয়ী মূল্যের জ্বালানি যেন কেবল তারাই ভোগ করতে পারেন এবং বিদেশি নাগরিক বা যানবাহনের মাধ্যমে পাচার বন্ধ করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার দেশীয় বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় মন্ত্রণালয়ের এনফোর্সমেন্ট মহাপরিচালক দাতুক আজমান আদম এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এই পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পেট্রোলের অবৈধ ব্যবহার এবং সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। বিগত দিনে দেখা গেছে, বিদেশি নম্বরপ্লেটযুক্ত অনেক যানবাহন স্বয়ংক্রিয় পাম্পে সরাসরি বিদেশি কার্ড ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছিল। যেহেতু পাম্পগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়, তাই কোন গাড়ি বা ব্যক্তি কতটুকু তেল নিচ্ছে, তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা কর্তৃপক্ষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মহাপরিচালক আজমান আদমের মতে, অনেক পেট্রোল স্টেশনে ১৫টির বেশি পাম্প থাকায় পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে সবকিছুর ওপর তদারকি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিদেশি কার্ড ব্যবহারের এই সুযোগটি পাচারকারী ও অযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য সিস্টেমের একটি বড় ফাঁকফোকর হিসেবে কাজ করছিল। ১ এপ্রিল থেকে এই নিয়ম কার্যকর হলে স্বয়ংক্রিয় টার্মিনালগুলোর ওপর নজরদারি করা অনেক সহজ হবে এবং ভর্তুকির অর্থ সঠিক জায়গায় ব্যয় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশটির তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে সরকার। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেশ কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যেই তাদের সিস্টেম আপডেট করে ফেলেছে এবং বাকিরা আগামী ১ এপ্রিলের ডেডলাইনের মধ্যেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে বলে মন্ত্রণালয় ধারণা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সাহসী উদ্যোগের ফলে বিদেশি যানবাহনের মাধ্যমে ভর্তুকিযুক্ত পেট্রোল পাচার বা এর অন্যায্য ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আরোপিত কর অর্ধেক করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিস। সোমবার (৩০ মার্চ) এক সরকারি ভাষণে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রধানমন্ত্রী আলবেনিস জানিয়েছেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এই বিশেষ কর ছাড় কার্যকর থাকবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ২৬.৩ অস্ট্রেলিয়ান সেন্ট কমে আসবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর ফলে ৬৫ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ফুয়েল ট্যাংক পূর্ণ করতে সাধারণ গ্রাহকদের প্রায় ১৯ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সাশ্রয় হবে। সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের ওপর আরোপিত যাবতীয় চার্জও আগামী তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার, যা নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও এটি সাধারণ মানুষের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে দেশটির ন্যাশনাল রোডস অ্যান্ড মোটরিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএমএ)। সংগঠনের মুখপাত্র পিটার খৌরি এক বিবৃতিতে মন্তব্য করেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে প্রতি লিটার তেলের দাম প্রায় ৩৩ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরকারের এই কর হ্রাসের সুফল বর্তমান উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে খুব একটা দৃশ্যমান নাও হতে পারে। তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ সরকারের কর নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা তেলের আকাশচুম্বী মূল্য।
জ্বালানি পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া সরকার এখনো নাগরিকদের জন্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক বিধিনিষেধ বা রেশনিং ব্যবস্থা জারি করেনি। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ জনগণকে অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার এড়িয়ে চলতে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকটের মাঝেও দেশটির জরুরি মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভে ৩৯ দিনের পেট্রোল এবং প্রায় ৩০ দিনের ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোকেও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতে পারে। আপাতত তিন মাসের এই কর ছাড়ের মাধ্যমে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। তবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতারই একটি প্রতিফলন।
মিয়ানমারে চলমান দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের মধ্যেই এক বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আং হ্লেইংকে দেশটির পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) মিয়ানমারের সংসদ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। গত সাধারণ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে মাঠ প্রায় শূন্য করে ফেলায় মিন আং হ্লেইংয়ের এই মনোনয়ন ছিল অনেকটা নিশ্চিত। মূলত তাঁর দুজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে নামমাত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হলেও তাঁদের জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
পাঁচ বছর আগে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা এই জেনারেলের জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার এই পথটি বেশ আগে থেকেই সুপরিকল্পিত ছিল। যদিও ২০২১ সালের সেই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছেন। মিন আং হ্লেইং এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন যখন দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই কয়েক বছরে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশটির একটি বিশাল অংশ এখনো জান্তা বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নতুন গঠিত এই সংসদের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যই মিন আং হ্লেইংয়ের প্রতি অনুগত, যা তাঁর ক্ষমতাকে আরও নিষ্কণ্টক করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হতে হলে তাঁকে সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে ক্ষমতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতেই তিনি তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী জেনারেল ইয়েউইনও-কে পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি নতুন ‘পরামর্শক কাউন্সিল’ গঠন করেছেন, যা তাঁকে পর্দার আড়াল থেকে সামরিক ও বেসামরিক উভয় প্রশাসনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই প্রশাসন মূলত বর্তমান সামরিক সরকারেরই একটি সম্প্রসারিত সংস্করণ হতে যাচ্ছে, যা এখন কেবল একটি ‘বেসামরিক আড়ালে’ পরিচালিত হবে। মিন আং হ্লেইং কিংবা তাঁর সহযোগীরা ক্ষমতা দখলের পর থেকে বিরোধীদের ওপর যে কঠোর দমননীতি চালিয়ে আসছিলেন, তাতে পরিবর্তনের কোনো জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। এই ধরণের সাজানো নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এখন এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বেঁচে আছেন কি না—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য সংশয় ও দাবির দুই দিনের মাথায় রাশিয়ার মস্কো থেকে একটি বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছেন মোজতবা। বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা এই ইরানি নেতা তাঁর লিখিত বার্তায় চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এবং ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়ানোয় ইরাকের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। রবিবার ইরানি সংবাদমাধ্যম আইএসএনএ নিউজ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এক নতুন কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকের শিয়াপন্থি মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মোজতবা খামেনি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরানের কঠিন সময়ে ইরাকের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ জনতা যে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মূলত গত রবিবার বাগদাদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ইরাকের শিয়াপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ইসলামিক সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইরাক’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পরপরই মোজতবা খামেনির এই আনুষ্ঠানিক বার্তাটি জনসমক্ষে আসে, যা তাঁর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে গত ২৭ মার্চ শুক্রবার ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আয়োজিত ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ প্রায়োরিটি’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ফোরক ভাষণ দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ফলে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, "ইরানের নেতারা সবাই এখন মৃত। তাদের সর্বোচ্চ নেতা (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) আর নেই, তিনি মারা গেছেন; আর তাঁর ছেলে (মোজতবা) হয় মারা গেছেন, নয়তো অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন।" ট্রাম্পের এই বক্তব্যের দুই দিনের মধ্যেই মোজতবা খামেনির বার্তা আসায় হোয়াইট হাউসের দাবি এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই এক ভয়াবহ বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। সেই একই হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রী, কন্যা ও নাতিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও প্রাণ হারান। মোজতবা নিজে সেই হামলায় গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরান তাঁকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দাবি করলেও ইরানি সূত্রগুলো বরাবরই বলে আসছে যে, তিনি কেবল পায়ে আঘাত পেয়েছেন এবং তাঁর জীবন হুমকির মুখে নেই।
যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে গত ১২ মার্চ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ আমন্ত্রণে উন্নত চিকিৎসার জন্য রুশ সামরিক বিমানে চেপে মস্কো পৌঁছান মোজতবা খামেনি। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার একটি সামরিক হাসপাতালে নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মস্কো থেকে পাঠানো তাঁর এই সর্বশেষ বার্তাটি মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের একটি পরোক্ষ জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মোজতবা খামেনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, আহতাবস্থায় থাকলেও তিনি সক্রিয় রয়েছেন এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ঘটনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এক ভয়াবহ সামরিক ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও অত্যাধুনিক এডব্লিউএসিএস (AWACS) নজরদারি বিমান ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিধ্বস্ত বিমানের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এর সত্যতা যাচাই করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। এই ঘটনাটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সরাসরি সংঘাতকে এক নতুন ও জটিল মোড়ে নিয়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মাত্র দুই দিন আগে, যখন ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওই বিমান ঘাঁটিতে সরাসরি হামলার হুমকি প্রদান করে। পরবর্তীতে তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তাদের সফল অভিযানে একটি বিশেষ নজরদারি বিমান এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে বিধ্বস্ত বিমানের নম্বর পরিষ্কারভাবে দেখা যাওয়ায় এবং ফ্লাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, হামলার সময় সেখানে অন্তত ছয়টি এ ধরনের বিমান মোতায়েন ছিল। এর ফলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানটি মূলত ‘বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি’ মডেলের, যা আকাশপথে নজরদারি ও শত্রু পক্ষের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই হামলার ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে সচল থাকা এডব্লিউএসিএস বিমানের সংখ্যা ১৬টি থেকে কমে ১৫টিতে দাঁড়িয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বিমান হারানো পেন্টাগনের জন্য যেমন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি, তেমনি কৌশলগত দিক থেকেও এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও গোয়েন্দা নজরদারির ক্ষেত্রে এটি বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই নজিরবিহীন হামলার খবর বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য করেনি। তবে বিমান চলাচলের তথ্য পর্যালোচনাকারী সংস্থাগুলো প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত এখন কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি মার্কিন সামরিক অবকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক চূড়ান্ত সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরণের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে চার সপ্তাহের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি তারা ইসরাইলের বেশ কিছু সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। হুথিদের এই পদক্ষেপকে ইরানের প্রতি সরাসরি সমর্থন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যদিও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরানের তুলনায় হুথিদের আঘাত কিছুটা সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে, তবে এর কৌশলগত প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথে তাদের নতুন করে তৎপর হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব বাণিজ্যের সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হুথিদের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর আগেও এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে গোষ্ঠীটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। বর্তমানে যদি তারা পুনরায় এই পথে জাহাজ লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইতিমধ্যে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, লোহিত সাগরে হুথিদের সক্রিয়তা সেই সংকটকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে তেলের দাম এবং পণ্য পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই হামলা নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনাগুলো এখন হুথিদের হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে হুথিদের এই ধরণের হঠকারী পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সরাসরি ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিরা এই যুদ্ধে ঠিক কতটা অগ্রসর হবে বা তাদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণ চলছে। তবে বড় ধরণের সামরিক পাল্টাপাল্টি আক্রমণ শুরু হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অন্যদিকে, এই নতুন সংঘাত ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি যখন কিছুটা স্থিতিশীলতা অর্জন করতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই আঞ্চলিক এই বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ইয়েমেনের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এতে করে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পুনরায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে হুথিদের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল ইসরাইলের সামরিক ক্ষতি নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য পথ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এক নতুন বিপদের ঘণ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজার মানুষ। রোববার (২৯ মার্চ) ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ খবর জানিয়েছে আল-জাজিরা।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত ২১৬ শিশুসহ মোট ২ হাজার ৭৬ জন নিহত হয়েছে। ১ হাজার ৭৬৭টি শিশুসহ আহত হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজার মানুষ। এ ছাড়া হামলায় ৩৩৬টি স্বাস্থ্য ও জরুরীসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর দফায় দফায় হামলা
গত ২৪ ঘণ্টায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর দফায় দফায় হামলা হয়েছে, যর মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও রয়েছে। তবে, এসব হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি কোন দেশ বা গোষ্ঠী।
গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম জানিয়েছে, আবুধাবিতে তাদের প্রধান কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে এবং এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওই হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইনেও হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রাডার ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে যে কোনো শান্তি আলোচনায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সেটি নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র এনরাহিম জোলফাকারি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিরুদ্ধে কোনো স্থল অভিযান বা ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনারা পারস্য উপসাগরে হাঙরের খাবারে পরিণত হতে পারে।
রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এমন আক্রমণ মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠোর ও অপমানজনক পরিণতি বয়ে আনবে।
ডনাল্ড ট্রাম্প-এর বারবার ইরানে স্থল অভিযান এবং পারস্য উপসাগরের দ্বীপ দখলের হুমকিকে অবাস্তব হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, এসব পরিকল্পনা বাইরের চাপের প্রভাবে নেওয়া হয়েছে, যা মার্কিন নেতৃত্বের অবস্থানকে অসঙ্গত ও অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে।
জোলফাকারি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সামরিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছে যার সিদ্ধান্ত মার্কিন বাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তার মতে, অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা প্রতিনিয়ত গুরুতর হুমকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘাঁটি ছেড়ে বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় আশ্রয় নিয়েছে, তবে সেখানেও তারা নিরাপদ নয় এবং হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, ইরানি বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো হামলার জবাব দিতে অপেক্ষা করছে। তার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগ্রাসন ঘটলে আক্রমণকারী বাহিনী ধ্বংস, আটক বা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের ইরানের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভুল সিদ্ধান্ত বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেন। তার মতে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং যেকোনো বাস্তব আগ্রাসনের জবাব দৃঢ়ভাবে দেওয়া হবে।
ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভয়ে জীবন বাঁচাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন মার্কিন সেনারা। তেহরানের হামলার ভয়ে ঘাঁটি ছেড়ে নিকটবর্তী হোটেল ও অফিস স্পেসে কাজ করতে শুরু করেছেন তারা। এতে সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্য টেলিগ্রাফের।
মার্কিন ও আঞ্চলিক ঘাঁটিতে শতাধিক বার হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন স্যাটেলাইট সংস্থাগুলো অন্তত ১৪ দিন ধরে ছবি প্রকাশে বিলম্ব করেছে। যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ক্রমাগত হামলার ফলে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে থাকা ১৩টি মার্কিন ঘাঁটির মধ্যে অনেকগুলোই প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
এসব ঘাঁটির মধ্যে কুয়েতের আলি আল সালেম সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে, মোট ২৩ বার। এর পরেই রয়েছে ক্যাম্প আরিফজান এবং ক্যাম্প বুহরিং। এগুলোতে ১৭ বার হামলা চালানো হয়েছে। এই তিনটি ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, হ্যাঙ্গার, যোগাযোগ অবকাঠামো, স্যাটেলাইট যন্ত্রপাতি, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ বার, বাহরাইনে ১৬ বার, ইরাকে ৭ বার, কাতারে ৬ বার, সৌদি আরবে ৬ বার এবং জর্ডানে ২ বার হামলা চালিয়েছে। আলি আল সালেমে হামলায় একটি বড় গুদাম ধ্বংস হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ঢালু ছাদযুক্ত একটি হ্যাঙ্গার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি কাতারের আল উদেদ বিমান ঘাঁটিতে একাধিক অ্যান্টেনা এবং স্যাটেলাইট অ্যারের ধ্বংসাবস্থা দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে সেনাদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি ভবনের মধ্যে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
ইরানি সূত্র দাবি করেছে, এই হামলাটি ইরানের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে উন্নত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড সিস্টেমের যন্ত্রাংশ রাখা চারটি স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে ইরান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি সমীক্ষা অনুসারে, যুদ্ধের শুরু দিকেই ইরানের চালানো হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার (৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ক্ষতি হয়েছে। যার মধ্যে জর্ডানে অবস্থিত একটি আমেরিকান থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) রাডার এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য অবকাঠামোতে আঘাত হানার ঘটনা রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা যদি কোনো কারণে ফলপ্রসূ না হয় তবে ইরানজুড়ে এক ভয়াবহ ‘চূড়ান্ত হামলার’ পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন।
এই পরিকল্পনায় ইরানে ব্যাপক বিমান হামলার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের স্থলবাহিনী নামানোর চিন্তাও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
অন্যদিকে সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ইয়াল হুলাতা বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার আগে এমন কোনো স্পষ্ট অর্জন চাইছেন যা ইরানকে কোনো প্রতীকী বিজয় দাবি করতে দেবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গোপন আস্তানায় অবস্থানরত ৫ শতাধিক মার্কিন সেনার ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই তথ্য জানিয়েছেন।
আল জাজিরা ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত ইরানি সেনা কর্মকর্তা জোলফাগারির বিবৃতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী দুবাইয়ের দুটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ওই স্থানগুলোতে ৫০০-এর বেশি মার্কিন সেনা লুকিয়ে ছিল। এই হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, দুবাইয়ের একটি হোটেল এবং উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন ড্রোন ইউনিটের কর্মকর্তাদের জমায়েত লক্ষ্য করে কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কুয়েতের আল-শুয়াইখ বন্দরে অবস্থানরত ছয়টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজেও কাদের-৩৮০ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
মার্কিন সেনাদের ‘আক্রমণাত্মক সেনাবাহিনী’ হিসাবে অভিহিত করে জোলফাগারি বলেন, ‘আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী আক্রমণ এবং এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হওয়ার পর তারা প্রাণভয়ে পালিয়েছে এবং ঘাঁটির বাইরে আত্মগোপন করেছে।’
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বিস্তৃত সংঘাতের নতুন পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শনিবার গোষ্ঠীটি ইসরায়েল অভিমুখে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার ঘোষণা দেয়, যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও।
মূলত গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় হুথিরা এখন ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিরোধী লড়াইয়ে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।
হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’ বা আল্লাহর সাহায্যকারী। ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন আল-হুথির নেতৃত্বে জাইদি শিয়া মতবাদের পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে ‘বিলিভিং ইয়ুথ’ নামে একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬২ সালের গৃহযুদ্ধের পর ইয়েমেনে সুন্নি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জাইদিরা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই বঞ্চনা দূর করতে এবং প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের ওয়াহাবি মতাদর্শের প্রভাব রুখতে আল- হুতি তার আন্দোলন গড়ে তোলেন।
২০১৪ সালে হুতি বাহিনী ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে সৌদি-সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের দমনে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে এটি একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়। ২০২২ সালে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও ছয় মাস পর তার মেয়াদ শেষ হয়, যদিও বর্তমানে সেখানে পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ স্তিমিত রয়েছে।
হুতিদের প্রধান শক্তি ও মিত্র হলো ইরান। ২০১৪ সাল থেকে ইরান ও সৌদি আরবের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুতিদের প্রতি তেহরানের সমর্থন ও সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি পায়। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর এক রিপোর্ট জানায়, ইরান এই গোষ্ঠীকে সমুদ্র মাইন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে। হুতিরা বর্তমানে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মূলত ইসরায়েল ও পশ্চিমাবিরোধী একটি আঞ্চলিক জোট।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, হুতিদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ এবং ধ্বংসক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। শুরুতে ইরানের পাঠানো যন্ত্রাংশ দিয়ে ইয়েমেনে অস্ত্র সংযোজন করা হলেও এখন তারা অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইতিপূর্বে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে ড্রোন ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে তারা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন জাহাজেও হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে গোপনে স্থল হামলার ছক কষছেন।
রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ এক প্রতিবেদনে এ খবর জানায়।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ বলেন, শত্রুপক্ষ প্রকাশ্যে আলোচনার বার্তা পাঠাচ্ছে এবং গোপনে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের বীর যোদ্ধারা মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ইরানি মাটিতে পা রাখামাত্রই তাদের পুড়িয়ে মারা হবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের ৩ হাজার ৫শত সেনার আগমনের ঘোষণা দিয়েছে।
সেন্টকম আরও জানায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি তার ‘দায়িত্বের এলাকায়’ পৌঁছেছে। যদিও জাহাজটির নির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। তবে সেনারা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় অবস্থান নেবেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানটি ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। মার্কিনিদের কাছে এ বিমান মাত্র ১৬টি ছিল। বিশেষ রাডার থাকা বিমানটি আগাম সতর্কতা দেওয়া ও আকাশ নিয়ন্ত্রণের কাজ করত। সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
গত শুক্রবার সৌদির প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। এ সময় এ বিমানটিকে টার্গেট করা হয়। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১২ সেনাও আহত হন। এছাড়া একই হামলায় কয়েকটি রিফুয়েলিং বিমানও ধ্বংস হয়।
অনলাইনে প্রকাশিত নতুন ফুটেজে দেখা গেছে, বোয়িং ই-৩ সেনট্রি মডেলের বিমানটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কয়েকজন আরব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একাধিক রিফুয়েলিং বিমানের সঙ্গে এই বিশেষ বিমানটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বিমান উন্নত প্রযুক্তির রাডার ব্যবহার করে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে থাকা যুদ্ধবিমান ও মিসাইল শনাক্ত করতে পারে। এতে করে আকাশ থেকে সেনা কমান্ডারদের এটি যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক চিত্র দিতে পারে।
এটি ধ্বংসের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ মডেলের মাত্র ১৬টি বিমান ছিল। কয়েক দশক আগে যেটির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০টি।
সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ই-৩ সেন্ট্রি ফ্লিটের বিমান সহজে রিপ্লেস করা যায় না। আর যদিও রিপ্লেস করতে হয় তাহলে আনতে হবে ই-৭ ওয়েজটেইল বিমান। যেগুলোর একেকটির দাম ৭০০ মিলিয়ন ডলার।