ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বর্বরতা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে চলা ১৩ মাসের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৪৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিহত বেসামরিক এবং হামাস যোদ্ধাদের তালিকা পৃথকভাবে করেন না। তবে তারা বলেছে, নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ১৭ হাজারের বেশি জঙ্গিকে হত্যা করেছে। তবে এর স্বপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই । স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৪৪,০৫৬ জন নিহত এবং ১০৪,২৬৮ জন আহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, ধ্বংসস্তূপের নিচে বা চিকিৎসকরা যেতে পারেননি এমন জায়গায় হাজার হাজার মৃতদেহ চাপা পড়েছে।
মূলত হামাস যোদ্ধারাই এ যুদ্ধ শুরু করে। তারা গত বছরের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায়। তখন প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে। যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। এর চেয়ে জঘন্য কাজটি ছিল ২৫০ জন নিরপরাধ মানুষকে অপহরণ করে গাজায় নিয়ে আসা। প্রায় ১০০ জিম্মি এখনও গাজার ভেতরে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কতজন বেঁচে আছেন তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৮০ জনে পৌঁছেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ১৫ হাজারের বেশি আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম।
নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ইঙ্গিত দিল যেসব দেশ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। আইসিসির এ সিদ্ধান্তকে অনেক দেশ ও নেতা স্বাগত জানিয়েছে। নেতানিয়াহুসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্তরা সেসব দেশে গেলে তাদের গ্রেপ্তারের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মূলত নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরই এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু তাদের দেশের মাটিতে পা রাখলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ভেল্ডক্যাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ছাড়াও ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ও হামাস নেতা মোহাম্মদ দেইফের সঙ্গেও নেদারল্যান্ডস কোনো অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ করবে না। নেদারল্যান্ডস রোম সংবিধির সঙ্গেই থাকবে।
অস্ট্রিয়া: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গ গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটিকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করলেও তার অফিস বলেছে, রোম সংবিধির একটি পক্ষ হিসাবে অস্ট্রিয়া আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
বেলজিয়াম: দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে লিখেছে, যেখানেই অপরাধ সংঘটিত হোক না কেন দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই বেলজিয়ামের জন্য একটি অগ্রাধিকার, যা আইসিসির কাজকে পুরোপুরি সমর্থন করে। এতে বলা হয়, ইসরায়েল ও গাজায় সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচার করতে হবে, তা সে যেই ঘটাক না কেন।
কানাডা: কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, তিনি এই রায়কে সম্মান জানাবেন। টেলিভিশনের একটি সাক্ষাৎকারে ট্রুডোকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ট্রুডো জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে তিনি সম্মান জানাবেন। কারণ কানাডা আন্তর্জাতিক আইন মানতে দায়বদ্ধ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল জানিয়েছেন, আইসিসির পরোয়ানা রাজনৈতিক নয়। এটিকে অবশ্যই সম্মান করা ও বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত এবং আদালতের সব রাষ্ট্রপক্ষ, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রয়েছে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
ফ্রান্স: ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিস্টোফ লেমোইন বলেন, ফ্রান্স আইসিসির আইন অনুযায়ী কাজ করবে। তবে নেতানিয়াহু দেশে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না সে বিষয়ে কিছু না জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ‘জটিল আইনগত বিষয়’।
আয়ারল্যান্ড: প্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেছেন, এই পরোয়ানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আয়ারল্যান্ড আইসিসির ভূমিকাকে সম্মান করে।
ইতালি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেছেন, রোম মিত্রদের সঙ্গে বিবেচনা করবে কীভাবে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করা যায় এবং একসঙ্গে কাজ করা যায়। তারা আইসিসির পরোয়ানাকে সম্মান করেন বলে জানান।
জর্ডান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, আইসিসির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।
নরওয়ে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেন, আইসিসির ম্যান্ডেট ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আদালত সর্বোচ্চ ন্যায্যবিচারের মানদণ্ডের ভিত্তিতে মামলাটি এগিয়ে নেবে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: এক বিবৃতিতে সরকার আইসিসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, এটি ফিলিস্তিনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং সব রাষ্ট্রপক্ষকে রোম সংবিধিতে তাদের বাধ্যবাধকতা অনুসারে কাজ করার আহ্বান জানায়। আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়কে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
সুইডেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ড বলেন, সুইডেন ও ইইউ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমর্থন করে এবং এর স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষা করে। সুইডিশ আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
সুইজারল্যান্ড: সুইস ফেডারেল অফিস অফ জাস্টিস জানিয়েছে, রোম সংবিধির অধীনে আইসিসিকে সহযোগিতা করতে তারা বাধ্য। তাই নেতানিয়াহু, গ্যালান্ট বা মাসরি যদি সুইজারল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং আদালতে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেয় তবে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
তুর্কি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ পরিচালনাকারী ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে বিচারের আওতায় আনতে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা একটি আশাব্যঞ্জক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যুক্তরাজ্য: ব্রিটেন আইসিসির স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের এক মুখপাত্র। তবে নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যুক্তরাজ্য গ্রহণ করছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল। তার মতে, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ইরানকে সরাসরি সহায়তা করছে রাশিয়া। ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ জোটের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই অভিযোগ তোলেন। আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, ওয়াডেফুলের এই মন্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেন আগ্রাসন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। পুতিন আশা করছেন যে বিশ্বের নজর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ থাকলে ইউক্রেনে তার সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা ও বাধা কমে আসবে। তবে ওয়াডেফুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুতিনের এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না।
এই সংকট নিরসনে জার্মানি সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াডেফুল জানিয়েছেন যে, তিনি ইতিমধেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিওর সঙ্গে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং জার্মানির অনড় অবস্থান তুলে ধরেছেন। জার্মানি কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং সংঘাত পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যেকোনো কার্যকর ভূমিকা পালনে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
পরিশেষে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউক্রেন সংকট এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। একটির সমাধান ছাড়া অন্যটির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করে দেশটির কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি জনমনে 'বালেন শাহ' নামেই সমধিক পরিচিত। শুক্রবার (২৭ মার্চ) নেপালের প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে জানা গেছে, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত তার দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' (আরএসপি) গত ৫ মার্চের নির্বাচনে পার্লামেন্টের ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বালেন শাহ তার চিরচেনা নিজস্ব শৈলী বজায় রেখেছিলেন। প্রথাগত নেপালি টুপি ও সানগ্লাস পরে তিনি যখন শপথ নিতে আসেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কাঠমান্ডুর সাবেক এই মেয়র নেপালের দক্ষিণ সমতলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে প্রথম 'মাধেসি' প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক একদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের গাওয়া 'জয় মহাকালী' শিরোনামের একটি র্যাপ গান প্রকাশের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীকে ঐক্যের বার্তা দেন। ইউটিউবে মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়া সেই গানে তিনি নেপালের প্রতিটি ঘরে হাসি ও সুখ পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
বালেন শাহের এই বিজয় নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯০ সাল থেকে দেশটিতে ৩২টি সরকার দায়িত্ব নিলেও কোনোটিই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো তরুণ নেতৃত্বের জোয়ারে ধরাশায়ী হয়েছে। তবে নতুন এই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও পাহাড়সম। দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রতিদিন কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়া দেড় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে বালেন শাহের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। বালেন্দ্র শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীন তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা নেপালের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় নতুন সরকারের পাশে থাকবে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বালেন শাহ নেপালকে উন্নয়নের পথে কতটা এগিয়ে নিতে পারেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক পর্যায়ে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনই নির্ধারণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি করোনা মহামারীর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মস্কোতে ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।
পুতিনের মতে, বর্তমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি (হাইড্রোকার্বন), ধাতু এবং সার উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে, যা বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বৈঠকে তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতিকে করোনা মহামারীর সঙ্গে তুলনা করছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মহামারী যেমন বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের গতি মন্থর করে দিয়েছিল, তেমনি চলমান সংঘাতও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একই ধরনের স্থবিরতা তৈরি করতে পারে।
সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘এই মুহূর্তে এর সঠিক পরিণতি অনুমান করা খুবই কঠিন। এমনকি যারা সরাসরি এই সংঘাতের সাথে জড়িত, তারাও সম্ভবত বুঝতে পারছেন না শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে।’
চলমান সংঘাতের মধ্যেই জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে অতিরিক্ত শত শত কোটি ডলার আয় করছে ইরান। হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে সক্ষম একমাত্র বড় রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে ইরানি তেলের চাহিদা ও দাম—দুটোই বেড়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান দুইভাবে লাভবান হচ্ছে। একদিকে প্রধান ক্রেতা চীনের কাছে খুব কম ছাড়ে তেল বিক্রি করছে তারা, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হলেও ইরানের তেল রপ্তানি আগের মতোই প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলে স্থির রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খারগ দ্বীপের টার্মিনালে নিয়মিত বিশাল ট্যাংকার নোঙর করছে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগর পেরিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম আরও জোরদার হয়েছে।
অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি যেখানে কার্যত বাধাগ্রস্ত, সেখানে ইরান ঠিক বিপরীত পরিস্থিতিতে রয়েছে। এমনকি বাজার স্থিতিশীল রাখতে ওয়াশিংটন সমুদ্রপথে থাকা ইরানি তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যা তেহরানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করেছে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক রিচার্ড নেফিউ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ইরানকে তেল বিক্রির জন্য তোয়াজ করছে। অথচ ইরানি তেল বিক্রি বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল।
ট্যাংকারট্র্যাকারস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইরান দৈনিক গড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের তেল বিক্রি করছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এ আয় ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় ইরানি তেলের মূল্য ব্যবধান এখন মাত্র ২ ডলার ১০ সেন্টে নেমে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই ব্যবধান ১০ ডলারেরও বেশি ছিল। বাড়তি এই আয় ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সামরিক সক্ষমতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যখন উৎপাদন কমানো বা বিকল্প রুট খুঁজতে ব্যস্ত, তখন ইরান নির্বিঘ্নে খারগ দ্বীপ ও জাস্ক টার্মিনাল ব্যবহার করে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে। জাস্ক টার্মিনালটি হরমুজ প্রণালির বাইরে হওয়ায় অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি প্রণালি অতিক্রম করা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আদায় করছে তেহরান।
এদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো বড় ধরনের হামলা থেকে রক্ষা পেলেও কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাতের তেল-গ্যাসক্ষেত্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালায় ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ইরানের জ্বালানি খাতে হামলার হুমকি দিলেও পরে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে অবস্থান কিছুটা নরম করেন। তবে ইরান কোনো আলোচনার বিষয় অস্বীকার করে আক্রমণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
সুত্র- এনডিটিভি
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাধারণ নাগরিকদের মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আশপাশের এলাকা দ্রুত ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ বলেছে, ‘আমরা আপনাদের জোরাল পরামর্শ দিচ্ছি যে যেখানে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেসব এলাকা আপনারা অবিলম্বে ত্যাগ করুন, যাতে আপনাদের কোনো ক্ষতি না হয়।’ একই বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মার্কিন সেনাদের ‘যেখানেই পাওয়া যাবে’, সেখানেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা আইআরজিসির ‘পবিত্র দায়িত্ব।’
এদিকে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতজুড়ে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। শুক্রবার সকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তেহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে তারা আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি ইয়াজদে সামুদ্রিক মাইন তৈরির একটি স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের দিকেও পাল্টা হামলা চলতে থাকে। উপকূলীয় শহর নেতানিয়ার আকাশে রকেটের ধোঁয়ার রেখা দেখা গেছে বিভিন্ন ছবিতে। লেবাননের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতেও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘শত্রুপক্ষের’ ড্রোন হামলায় ‘জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতি’ হলেও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরবও একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সূত্র: আলজাজিরা
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) নেতা বালেন্দ্র শাহ। প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল শুক্রবার শীতল নিবাসে প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাধেসি সম্প্রদায়ের কোনো নেতা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
পেশাগতভাবে র্যাপার ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন্দ্র শাহ ২০২২ সালে কাঠমান্ডু সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করে আলোচনায় আসেন। সে নির্বাচনে তিনি প্রচলিত বড় দলগুলোর প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে হারিয়ে চমক দেখান।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মেয়রের পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি আরএসপিতে যোগ দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে ঝাপা-৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করেন, যা ওই আসনে তাঁর শক্ত অবস্থান ভেঙে দেয়।
শপথ নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ জন মন্ত্রীকে দায়িত্বভার অর্পণ করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আরএসপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. স্বর্নিম ওয়াগলে। সুদান গুরুংকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি পান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন শিশির কানাল।
সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় পেয়েছেন খড়কা রাজ (গণেশ) পৌডেল এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দীপক সাহকে। শিক্ষা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন শস্মিত পোখরেল। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিক্রম তিমিলসিনা। কেন্দ্রীয় ও ভূমি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সাবেক সাংবাদিক প্রতিভা রাওয়াল। শক্তি ও সেচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ।
কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন গীতা চৌধুরী। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সবিতা গৌতম। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সিতা বদি এবং গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সুনীল লামসাল। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিশা মেহতাকে।
উল্লেখ্য, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি গত বছরের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে ফেসবুকসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেন। এতে করে ক্ষিপ হন দেশটির তরুণরা। তারা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ওলির সরকারের পতন ঘটান। নেপালের তরুণরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং এলিট শ্রেনির শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যার ফলাফল দেখা যায় সর্বশেষ নির্বাচনে। যেখানে পুরোনো রাজনীতিবিদদের বেশিরভাগ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে প্রায় ১০ হাজার স্থলসেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আরও দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পাবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে এই মোতায়েনের মধ্যে পদাতিক ইউনিটের পাশাপাশি সাঁজোয়া যানও থাকতে পারে। নতুন সেনারা যুক্ত হবে ইতোমধ্যে মোতায়েনের নির্দেশ পাওয়া ৫ হাজার মেরিন সদস্য এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার প্যারাট্রুপারের সঙ্গে, যা পুরো অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি তৈরি করবে। তাদের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের মূল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ-এর অপারেশনাল রেঞ্জের মধ্যে তাদের রাখা হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, মিত্রদের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, তিনি ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত’ করবেনই।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি অ্যানা কেলি বলেন, সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত সব ঘোষণা প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকেই আসবে।
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব সময় সব ধরনের সামরিক বিকল্প খোলা থাকে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। টহল ও সম্ভাব্য হামলার উদ্দেশ্যে চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ ব্যবহার শুরু করেছে তারা, যা যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির আরও বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এই মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এটি প্রথমবার, যখন সক্রিয় কোনো সংঘাতে এ ধরনের নৌযান ব্যবহারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল ওয়াশিংটন।
ড্রোন বোটগুলো কেবল নজরদারির জন্য নয়, প্রয়োজন হলে আত্মঘাতী হামলার মতো আক্রমণাত্মক কাজেও ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলে জানা গেছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, চালকবিহীন নৌবহর গঠনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল মার্কিন নৌবাহিনী। তবে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এখন এসব নৌযান সরাসরি অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিস্ফোরকবাহী স্পিডবোট দিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরে আঘাত হানার পর থেকেই এই প্রযুক্তি আলোচনায় আসে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানও পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য সমুদ্র-ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এসব ড্রোন নৌযান ব্যবহার করে সরাসরি কোনো আক্রমণ চালিয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, মেরিল্যান্ডভিত্তিক ‘ব্ল্যাক-সি’ প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই নৌযানগুলো ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো ‘গ্লোবাল অটোনোমাস রিকনেসান্স ক্রাফট’ বা ‘জিএআরসি’ নামে পরিচিত।
এক বিবৃতিতে হকিন্স বলেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে জিএআরসির মতো ড্রোন নৌযান ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। এ বিশেষ প্ল্যাটফর্মটি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমর্থনে টহল দেওয়ার সময় সফলভাবে ৪৫০ ঘণ্টারও বেশি পানিতে ভেসে থেকে ২ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ অতিক্রম করেছে।
বর্তমানে ব্যবহৃত অন্য কোনো ড্রোন ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি। একইভাবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাক-সি’ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে চলমান শোক ও উত্তেজনার মধ্যেই তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তের একটি ছবি জনসমক্ষে এসেছে। তেহরান থেকে প্রকাশিত এই চিত্রটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম দ্য ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার জীবনের শেষ এই ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল মায়াদিন ইংলিশ দাবি করেছে, খামেনির মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে এটিই ছিল তাঁর শেষ ছবি।
প্রকাশিত এই ছবিতে তাঁকে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে অবস্থানরত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের ঠিক আগমুহূর্তে ছবিটি ধারণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, অভিযানের প্রথম দিনেই সকালে নিজ দপ্তরে অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিহত হন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি সেই সময় জানিয়েছিল যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক হামলায় সকালের দিকেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রাণ হারান। সে সময় তিনি তাঁর কার্যালয়ে দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পন্ন করছিলেন।
তেহরানের সাথে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই মালয়েশীয় জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মালয়েশিয়ার জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে “দ্রুত ছাড়পত্র” দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এ জন্য তিনি ইরানের প্রেসিডেন্টকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে সাধারণ জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁদের তেলবাহী ট্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও বর্তমানে কাজ চলছে। তবে ঠিক কতটি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ পেয়েছে বা এর পেছনে কোনো বিশেষ শর্ত ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাধারণত নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণকারী মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় মালয়েশিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দেশটি অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় “ভালো অবস্থায়” আছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের অন্যতম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালয়েশিয়াকে তাদের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে মালয়েশিয়া সরকার ভর্তুকিযুক্ত পেট্রলের ব্যক্তিগত বরাদ্দ হ্রাস এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যায়ক্রমে বাসা থেকে কাজ করার পদ্ধতি চালুর মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। আনোয়ার ইব্রাহিম আরও বলেন, “খাদ্য সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে, দাম বাড়বে সার ও জ্বালানিরও। তাই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এমন অনেক দেশ আছে, যাদের ওপর এর প্রভাব মালয়েশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। তবে তার অর্থ এই নয়, মালযেশিয়া পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত।”
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন জাহাজগুলোর জন্য এই পথ খোলা রাখা হয়েছে, যদিও জলপথটিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে তেহরান। এদিকে ইরানের পার্লামেন্টে হরমুজ প্রণালিতে টোল ব্যবস্থা চালুর একটি প্রস্তাবিত আইনও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে কোনো কোনো জাহাজের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবির অভিযোগও উঠেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের পরিসংখ্যান বলছে, সংঘাত শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত, বর্তমানে সেই সংখ্যাটি আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত হামলার প্রেক্ষাপটে ইরান ও লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাতে দুই দেশে ব্যাপক হারে মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। একই সময়ে লেবাননে ইসরাইলি স্থল অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ, ফলে দুই দেশ মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লাখে।
প্রায় এক মাসের সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা অন্তত এক হাজার ৫০০ জনে পৌঁছেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়ে দেশটির ৮৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল এবং হাজার হাজার বসতবাড়ি। রাজধানী তেহরানেও বিপুলসংখ্যক আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানায়, হামলার পর থেকে ইরানের মানুষ নিরাপত্তার খোঁজে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, তুরস্ক ও আজারবাইজানের সীমান্ত এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেশত্যাগী মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে লেবাননের পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনীর নির্দেশে দক্ষিণাঞ্চলের লিটানি নদী থেকে জাহরানি নদী পর্যন্ত এলাকা খালি হয়ে পড়েছে, যার ফলে দেশের প্রায় ১৪ শতাংশ ভূখণ্ড জনশূন্য হয়ে গেছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতি পাঁচজনের একজন এখন বাস্তুচ্যুত। আশ্রয় সংকটে বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায় কিংবা যানবাহনে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ লেবানন ছেড়ে সিরিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে, যাদের অর্ধেকই শিশু।
যুদ্ধের অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। কাসমিয়েহ, আল-কানতারা ও খর্দালিসহ একাধিক প্রধান সেতুতে হামলা চালানো হয়েছে, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরির চেষ্টা। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদে সরে যাওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা জোরদার না হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই পথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আর নির্ভরশীল নয়। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকার নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রচুর তেল মজুত থাকায় এই সংকটে দেশটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।
যদিও পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এবং অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম মাঝে মাঝে ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, তবুও ট্রাম্পের মতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন তাদের এক শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক মাসে জ্বালানির দাম গ্যালন প্রতি এক ডলারের বেশি বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে তিনি অঙ্গরাজ্যগুলোকে তেলের ওপর কর স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর স্থগিত করার বিষয়ে তিনি এখনই প্রস্তুত নন, তবে প্রয়োজনে এটি একটি বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানকে জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার ‘বিপজ্জনক ভুল’ বলে অভিহিত করলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বিষয়টিকে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে তুলনা করে নিজের ভূমিকার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে ইরান একটি ‘উপহার’ দিয়েছে বলে রহস্যময় মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প, তার ব্যাখ্যায় তিনি জানান, পাকিস্তান পতাকাবাহী আটটি তেলের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।
ট্রাম্পের মতে, এটি আলোচনার জন্য ইরানের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত এবং তিনি দাবি করেন যে ইরান পর্দার আড়ালে চুক্তির জন্য যোগাযোগ করছে। ইরান আলোচনার কথা অস্বীকার করলেও ট্রাম্প তাদের ‘চতুর দরকষাকষাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজের অবস্থানে অটল রয়েছেন।
এদিকে ইরান সংকটের প্রভাবে সার ও চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ নীতিমালার পরিকল্পনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত বছর বাণিজ্য যুদ্ধের সময় কৃষকদের ১২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি এবারও সংকটের মুখে থাকা কৃষকদের পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন। সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আমেরিকার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ কৌশলের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর ওপর প্রশাসনের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার লাহোর থেকে পিটিআইয়ের পাঞ্জাব প্রদেশের প্রধান সংগঠক আলিয়া হামজা মালিককে গ্রেফতার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতারের পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁর বর্তমান অবস্থান বা তাঁকে ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
আলিয়া হামজা মালিক পিটিআইয়ের রাজনীতির ময়দানে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নারী নেত্রী এবং পাঞ্জাব প্রদেশে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু আইনি জটিলতায় জর্জরিত। এর আগে বিভিন্ন মামলায় তাঁকে ১০ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং মানবাধিকার মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৯ মে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
পিটিআইয়ের এই প্রভাবশালী নেত্রীর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে লাহোরসহ পুরো পাকিস্তানে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দণ্ডাদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ৯ মে-র সেই সহিংস ঘটনার পর থেকে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআইয়ের অসংখ্য শীর্ষ ও স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেককেই ইতোমধ্যে কারাবরণ করতে হয়েছে অথবা তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলিয়া হামজা মালিকের মতো একজন সক্রিয় সংগঠককে গ্রেফতার করার ফলে পাঞ্জাব প্রদেশে পিটিআইয়ের সাংগঠনিক শক্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে দলের প্রধান ইমরান খানের কারাবাসের মধ্যে যখন দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের ধরপাকড় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় পিটিআই সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তবে প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, দেশের আইন ও শান্তি বজায় রাখতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আলিয়া হামজাকে ঠিক কোন অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে এবং তাঁর আইনজীবীরা পরবর্তীকালে কী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।